Sunday, September 27, 2026

জীবন যেন স্রোতের মাঝে ভাসমান দ্বীপের মতো

 

১৯৮৪ সাল। স্কুলের অফিস রুমে গিয়েছি বেতন দেবার জন্য। লাইনে অপেক্ষা আমি আর আমার লাল ঝুটি বন্ধুটি। আমাদের খুঁজে খুঁজে ঐ ভীড়ের মাঝে পুষি এলো। আদর করে পুষি ডাকতাম ওকে। বেতন দিতে নয়।  ও হাঁটু গেড়ে বসে আমাদের দুজনাকে  অডিও ক্যাসেটের কভার পেইজের পেছনে ছাপানো একটি  লিরিক দেখালো, Islands in the Stream.

কিশোরী মনে দাগ কেটেছিল প্রথম এই ভালবাসার গানটি শুনে। 

এটি একটি বিখ্যাত ইংরেজি গান, যা ডলি পার্টন (Dolly Parton) এবং কেনি রজার্স (Kenny Rogers) দ্বৈতকণ্ঠে গেয়েছেন।  গানটি ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত হয় এবং এটি রচনা ও সুর দিয়েছিলেন বিখ্যাত সংগীতশিল্পী Bee Gees-এর সদস্যরা।

গানটিতে এক ধরনের মধুর ভালোবাসার গল্প বলা হয়েছে, যেখানে দুটি মানুষ নিজেদের ভালোবাসার জগতে একে অপরের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে—তারা যেন স্রোতের মাঝে ভাসতে থাকা দ্বীপের মতো, যাদের মাঝে আর কেউ নেই। গানটির কথায় আছে একান্ত ভালোবাসা, একে অপরের প্রতি বিশ্বাস ও নির্ভরতাবোধ, এবং একসঙ্গে নতুন পৃথিবীর খোঁজে এগিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত।

“Islands in the Stream” মুক্তির পরপরই বিশ্বজুড়ে দারুণ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল এবং এটি আজও ক্লাসিক লাভ সং 'classic love song' হিসেবে বিবেচিত হয়। গায়ক দু'জনার কন্ঠ ও অনবদ্য সুরের জন্য এই গানটি এখনো   মানুষের হৃদয়ে স্থান করে আছে। 

গানের কিছু পঙক্তির ভাবানুবাদ  করলে যেমন শোনায় —

দুই নদীর মাঝে দ্বীপের মতো
এটাই তো আমরা
মাঝখানে কেউ নেই
তবে ভুল কীভাবে হতে পারে আমাদের?
চলো, ভেসে যাই দূর অন্য জগতে
সকল নির্ভরতা নিয়ে, একে অপরের সাথে, 
এক প্রিয় থেকে আরেক প্রিয়ার কাছে।। 

আজ গানটি আবার শুনতে ইচ্ছে করছিল, আর তখন ভাবছিলাম কোথাও যদি চলে এতে পারতাম যেখানে সেই দ্বীপের দেখা মিলবে। পঙতিমালার ইউটিউব লিংক 


Saturday, September 19, 2026

জীবনের স্টেশনে


রেল স্টেশনে অপেক্ষা। ট্রেন আসছে। এখনো ঐ দূরে। কিন্তু তার আগমন  দেখলেই  আমার ভেতরে এত কন কন করে উঠে  কেন জানি না। কেন এই কষ্ট বারবার হয়? জানি না। বলেও বুঝাতে পারবো না। 

মনে হয় এ যেন  জন্ম জন্মান্তেরে সেই ছেড়ে আসা রেল স্টেশন, যেখানে আমি একা,  ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছি। আগেও কোন এক জন্মে এমন ভাবে অপেক্ষা  করতাম।

আজ জীবনের স্টেশন থেকে আমার চাচা বিদায় নিয়েছেন। 

এই মাত্র খবর পেলাম। (১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬, রাত ৮টা)

জীবনটা এমনই । রেলস্টেশনে এসে এক সময়ে আমরা সকলে জড়ো হই। সবার সাথে তখন দেখা হয় । তারপর যার যার সময় হলে  একে এক করে চলে যাই যার যার গন্তব্যে।

Monday, September 14, 2026

রাগ ইমনের তৃষ্ণা

Yanni তার piano তে অজান্তে ইমনের সুর তুলেছে কয়েক সেকেন্ডের জন্য ।আমার চোখে পানি এসে গিয়েছিল।  তখন মনে হয়েছে আমাদের রাগ এর স্টাইল গুলো ওদের ভাষায় (সুরের বাদ্যযন্ত্রে) উপস্থাপন করার কেউ নেই কেন। কারো মাথায় আসে না কেন। আমি তো কোন মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে নাই। সরোদ আর এস্রাজ আর সেতার নিয়ে থাকলে ওরা জানবে কিভাবে? ওরা মানে সমগ্র বিশ্ব। তাই এগুলোর সাথে পিয়ানো ,বেহালা প্রয়োজন। ইমন, আশাবরী, মেঘ সব সব কিছু আমি আনতে চেয়েছি ।কিন্তু  সুযোগ ছিল না। এখন AI আছে আর আছে তার পিছনে আমাদের দেশের  মিউজিক ইঞ্জিনিয়ার।
 Yanni -রএই উপস্থাপনায়  রাগ ইমন আসবে এই পরিবাশনায়। যদিও তার অজান্তে। অজান্তে এজন্য কারণ পরে সে অন্য সুরের রাজ্যে পাড়ি দেবে। 
১ঃ৩৩ এ 'সা' ধরলো। 
১ঃ৪৩ এ ইমনের রেশ -এ পড়লো।
১ঃ৪৫ এ কড়ি 'মা' , এবং  ইমনে প্রবেশ করলো। 
১ঃ৫৫ পর্যন্ত পাক্কা ইমন।
২.০১ এ শেষ। 
কিন্তু তখনি ভেবেছি আমি একবার যদি বলে আসতে পারতাম ওনাকে পুরোটাই পিয়ানো মূর্ছনায় ইমন করেন!  লিংক  https://www.youtube.com/watch?v=5CV_UEUv0Ck

এটা ১৯৯২ সালের কথা। 

[রাগ পরিচয়ঃ রাগ ইমন -এর অপর নাম ইমন কল্যাণ , যা কল্যাণ ঠাঁটের অন্তর্ভুক্ত। রাগ ইমনের সুরের কোমলতা অপূর্ব এক মাধুর্য এনে দেয়। রাগ ইমন সাধারণত সন্ধ্যাবেলা পরিবেশন করা হয়। সন্ধ্যার নরম আলোয় রাগ ইমন পরিবেশন শ্রোতাদের মনে এক অনন্য প্রশান্তি ও সৌন্দর্যের অনুভূতি ছড়িয়ে দেয়।
রাগ ইমন-এর আরোহঃ
নি রে গা মা পা ধা নি র্সা
(এখানে মা কড়ি )
অবরোহঃ
র্সা নি ধা পা, মা গা রে সা
(এখানেও মা কড়ি )

পকড়ঃ নি রে গা রে নি গা মা( কড়ি), পা মা গা মা (কড়ি) গা রে সা]

আজ ২০২৬ সালে এসে ৩৪ বছর পর, পিয়ানো তে রাগ ইমন তুলবার সুযোগ পেয়েছি। আমার পিয়ানো বাদনে রাগ ইমনঃ  https://www.youtube.com/watch?v=XeyiPcZJwsc
সেদিন সেখানে একজন পিয়ানো বাদক ছিলেন। তিনি সুর শুনে জানতে চাইলেন কি সুর। সুরের রূপ কি? আরোহ ও অবরোহ, পকড় শুনালাম। তারপর  রাগ মেঘ  বাজিয়ে শুনিয়েছি। মেঘের স্টাইল কিভাবে বৃষ্টিকে ডেকে আনে তা বলেছি। তিনি সুর উপলব্ধি করতে পেরেছেন।  
পাশে লেক অন্টারিও। তার পাশে দাঁড়িয়ে পিয়ানোতে রাগ মেঘ- 'শ্যামা তন্বী আমি মেঘ বরণা'। লিংকঃ  https://www.youtube.com/watch?v=Uld_FOAYahI
সহজ সুর হিসাবে মালকোশ -ও দেখিয়ে দিয়েছি। মালকোশ -এর বন্দিস 'শোনো লো বাঁশীতে ডাকে আমার -ই ঘন শ্যামঃ https://www.youtube.com/watch?v=e1rOdQkSuZAপিয়ানোতে আমার বাদন, রাগ মালকোশ]
সুরের মাঝে মীর দিতে না পারলে রাগের স্টাইল অক্ষুণ্ণ থাকে না। সেগুলো যদিও পরের ধাপ।

১৪/০৯/২০২৬ 

বিকাল ৫টা

Tuesday, September 8, 2026

শেইপ শিফটার – বেজী


হেমন্তের সোনালী সকাল। 

২০০৯ এর সেপ্টেম্বর ।এই  সময়টায় প্রতিদিন সকালে হাঁটতে বের হয় সুমনা। সারা রাস্তা ধরে সোজা হেঁটে চলে যায় মন্ট্রিয়ালে শহরের শেষ প্রান্তে ।সেখানে একটা বাংলাদেশী কাপড়ের দোকান আছে। পাশে গ্রোসারি আছে। বাসা থেকে বের হলে দেড় কিলোমিটারের দূরত্ব হবে। 

আজ সাপ্তাহিক ছুটির দিন। দল বেঁধে পথচারীরা ঘুরতে বের হয়েছে। তাদের পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা পথ এগিয়ে এলো সুমনা একটা দলের সাথে। তার নিজের দেশেরই তিনজন মহিলা হাঁটছে একসাথে। একজন দেখতে হুবহু কলেজের ছেলে কণ্ঠের সেই জয়া নামের মেয়েটির মতন। আরেকজন শ্রীলঙ্কান চেহারার নাদিরা আন্টির মতন।  ব্যক্তিত্ব যেন  হুবুহু সেই আন্টির মত। চেহারাও একদম একরকম। মনে হচ্ছে নাদিরা আন্টির মত দুই পিস মানুষ ভগবান সৃষ্টি করেছিল। তার একজনের সাথে সুমনার আজ এখানে দেখা হয়ে গিয়েছে। আরেকজনের সাথে যেমন দেখা হয়েছিল তার বাল্যকালে। সেই সময়ের দেখা হওয়া আন্টিকে সুমনা তার মায়ের বান্ধবী হিসেবে দেখেছে।  আর আজ আরেক কপি সামনে এসে পড়েছে তার চলার পথের সঙ্গী হিসাবে। পথচারী হিসেবে। ক্ষণিকের সহচরীও  বলা যেতে পারে। তৃতীয় জন গড় বাঙালি মেয়েদের থেকে বেশ খানিকটা লম্বা। তিনজনের  মাঝে সে বেশ সুঠাম দেহের অধিকারী। হাঁটার মধ্যে একটা লিডারশিপ ভাব আছে। সুমনা তার সাথে তাল মিলিয়ে অত লম্বা লম্বা পদক্ষেপে চলতেই পারে না। তাই তিন মহিলার পিছে পড়ে যাচ্ছে বারবার। তবে বিদেশ-বিভূঁয়ে বাংলা কথা শুনলেই মনে হয় কর্ণ কুহরে  মধুর বাণী এসে পড়ল । তাই তার খুব ভাল লাগছে।সুমনা তাদের গল্প শুনতে শুনতে হাঁটছে।  নিজেদের কথায় মহিলারা ভীষণ মশগুল। তারা তিনজন বান্ধবীও হতে পারে।

কিন্তু হেঁটে হেঁটে তাদের গন্তব্য যে সুমনার মতই হবে, সেই শহরের শেষ মাথায় অবস্থিত ওই বাঙালি কাপড়ের দোকানের কাছে,  তা সুমনা বুঝতে পারেনি। তাদের গল্প শুনতে ওর ভীষণ ভালো লাগার আরেকটা কারণ, ঐ ছেলে গলার জয়ার কপিকে দেখে।  কলেজের এই দ্বিতীয় পিস  জয়াকে দেখে বারবার অবাক হচ্ছে। কন্ঠই শুধু নয়, এরও ব্যক্তিত্বে হুবুহু মিল পাচ্ছে জয়ার সাথে । অদ্ভুত লাগছে এই ভেবে যে, এই  তিন জনের মাঝে দুজনেই তার পূর্ব পরিচিতদের ডুপ্লিকেট কপি। 

এরকম মিল কেন আজ তার পাশে এসে পড়ল? 

জানে না এবং এ নিয়ে তখন সুমনা তেমন একটা মাথাও ঘামায় নাই।

২

পিশাচ বা ডাইনিরা সবার রূপ ধারণ করতে পারে বলে সে একবার শুনেছিল। কিন্তু তা বলে কোন মানুষকে পরিচিত কারো সাথে মিল আছে দেখে পিশাচের মাসতুতো ভাই মনে করা তো অন্যায় হবে।  এমন চিন্তা থেকে নিজেকে বিরত রেখেই সুমনা তাদের সাথেই পথ চলছিল।  বাংলায় গাল গপ্পো  ভাল লাগছে বিধায় একটু পিছিয়ে পিছিয়ে হাঁটা, আর গল্প শোনা। এভাবে যদিও সম্ভব না, কারণ দলনেতার ভারী লম্বা শরীর। তার পায়ের কদম বেশ বড়। 

হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ চোখের পলকের একটু ব্যবধানে সুমনার  মনে হল এদের দলনেতা যেন ৫ ফুট বেশি উচ্চতার একটা আস্ত লম্বা বেজী। 

একি দেখল সুমনা ? 

চোখের পলকের ব্যবধান মাত্র তো কয়েক মিলি সেকেন্ড । এক পলকে একটা অন্যরকম কিছু যেন তার চোখে পড়ে গেল? একটা বিশাল আকারের বেজী! এটা যেন ঐ মহিলার বদলে তা ভারী ভারী  পা ফেলে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে। 

নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছে না। সুঠাম দেহের এই মহিলার বদলে সুঠাম দেহের আস্ত একটা বেজী এলো কোথা থেকে? 

এই এন্টিটি, এই বস্তুটি  শেইপ শিফ্টার নাকি? একবার মানুষ  আরেকবার অন্য কিছু? 

নাকি ঠিক ওই সময় ওই স্থানে পোর্টাল ওপেন হয়ে ঝুপ্পুস করে মহিলার মাথার উপরে বেজী সদৃশ কোন কিছু নেমে এসেছিল ক্ষণিকের জন্য? কেনই বা আসবে?

এতগুলো প্রশ্ন মনের মাঝে ঘুরপাক খেতে খেতে দোকানের সামনে এসে তিনজন দাঁড়ালো। সুমনা তাদের পিছনে। তারপরও সবাইকে ফেলে সুমনা প্রবেশ করলো দোকানের ভেতর সবার আগে । ঈদ কালেকশনগুলো দেখতে দেখতে খেয়াল করল বেজীটা বাদে বাকি দুজন দোকানের ভেতর ঢুকেছে। কাপড় নাড়াচাড়া করছে। সুমনার এক নজরে সব কালেকশন দেখা শেষ। এবার বের হবার পালা।  ভারী কাঁচ ঠেলে  যেই না সে দোকানের  বাইরে পা রেখেছে,  কেউ যেন আকাশ বাতাস একাকার করে ভম ভম কন্ঠে বলা শুরু করলো,'এই তোমরা কোথায়? কি করছ ওখানে ? '

এত উদ্ভট স্বরে কে শব্দ করে উঠলো? 

সুমনা ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকালো। দেখল, সুমনা যতক্ষণ দোকানের ভেতরে ছিল ওই বেজীটা দোকানের বাইরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। দোকানে সে প্রবেশ করেনি। সুমনা বের হতেই তাকে দেখে তার কন্ঠ সচল হয়ে উঠেছে যেন। সে ভড়ভড় করে শব্দ করে দোকানে ঢুকবার আয়োজন শুরু করছে এবার। সচল হবার সুইচ অন্ হয়ে গেছে। এগিয়ে আসছে দোকানের দিকে। গলা দিয়ে অদ্ভুত  শব্দ করে  তারস্বরে জানান দিচ্ছে তাকে যে এবার সে আগাতে পারে  দোকানের ভেতরে থাকা বাকি দুজনের দিকে। 

কিন্তু কে আটকে রেখেছিল তাকে? 

আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে হঠাৎ ঠাঁয় দাঁড়ানো থেকে সচল   না হলে  সুমনা তার এহেন আচরণে এতটা অবাক হতো না। এতটা মনযোগও দিত না। বেজীটা যেন সুমনা বের হবার অপেক্ষায় ছিল। দোকানে প্রবেশ করার সময় গলায় কথার ভঙ্গীমায় এও জানান দিচ্ছে, যে 'তুমি যখন দোকানের ভিতর ছিলে আমি তখন ভিতরে ঢুকিনি।'

কিন্তু কেন? 

সুমনা কি করেছে তার?

বেজীটা লম্বা হয়ে শিড়দাঁড়ারর ওপর ভর করে  টান টান শরীর  ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল দোকানের দিকে চেয়ে। বাইরে তার এই অপেক্ষা। সুমনা ভেতরে থাকলে সে ভেতরে যাবে না। কেন সুমনাকে তার প্রতিপক্ষ মনে হয়েছে? সুমনার সাথে ফ্রিকোয়েন্সি মিলেনি বলে? কেন মিলেনি? ও কি এই পৃথিবীর আট দশটা মানুষের মত সত্যিকারের মানুষ না। নাকি প্রেতলোকের ডাইনী?  

৩

বেজীটাকি সত্যি চোখের ভুল ছিল? নাকি  সত্যি মানুষরূপে ঘুরে বেড়াতে এসেছিল মাটির ওপর কিছুক্ষণের জন্য?  তার বাকি দুই সংগী তো কাকতালীয় ভাবে সুমনার পূর্ব পরিচিতদের কপি। তাহলে অতীতের সেই দুজনাও কি এদের গোত্রের? হাব ভাবে তো সেই দু’জনও সুবিধার ছিলনা কোনদিন। 

আজ, দৃপ্ত পদভরে যে হেঁটে এতটা পথ সুমনার সাথে  আসতে পারে তার এমন কি হলো? তার  দোকানে প্রবেশ  করতে কেন এত সংকোচ শুরু হলো? 

সুমনা যতক্ষণ দোকানের ভেতরে ছিল বেজীটি সেখানে প্রবেশ করেনি। ঠিক যখনই সুমনা বেরিয়ে আসলো সে খলবল করা শুরু করলো। বলতে লাগলো , ‘কি এত দেখে মেয়েগুলো? কি করছে ওখানে?'  দোকানের ভারী কাঁচের দরজা টেনে দোকানে ঢুকছে আর বলেই চলছে  একই কথা।  

বেজীর এহেন কান্ড দেখতে দোকানে প্রবেশ করতে চেয়েছিল সুমনা। কিন্তু এক অজানা আশঙ্কায় দোকানে আর প্রবেশ করেনি। কেমন যেন  অস্বস্তি ভর করে বসেছিল। 

ডাইনীরা সবকিছুর রূপ ধারণ করতে পারে। তিনজনের এই দলে দুজন সুমনার পূর্ব পরিচিতদের রূপে এসেছে। তারা সবাই হয়তো বা পিশাচ লোক থেকে আগত মানুষরূপি পথচারী জাতীয় কিছু।  বাকি দুই সঙ্গীর সাথে পথ ধরে ধরে হেঁটে চলছে মানুষ রূপে। আর ঠিক তখনই সেই পথে এসে পড়েছে  সুমনা। চোখের কোন এক পলকে সুমনার কাছে  এড়াতে পারেনি তার আসল রূপ। সে জানে সুমনা তাকে দেখে ফেলেছে।  তার  চেহারা প্রকাশ হয়ে যাওয়ায় সে দোকানের ভেতর প্রবেশ করেনি। আর সুমনার সামনে আসে নি।

এবার যেভাবেই হোক পালাতে হবে।

কিন্তু কিভাবে পালাবে এর সামনে থেকে?

হয়তোবা কিছুক্ষণ মানুষরূপে হেঁটে  যাবে ওই রাস্তা ধরে। তারপর কোন এক সময়ে বাতাসে মিলিয়ে যাবে লোক চক্ষুর আড়ালে।

 ০৭/০৯/২০২৬


Monday, September 7, 2026

পোর্টালঃ সাইকেল চালক

গ্রীষ্ম শেষ হয়ে এসেছে। হেমন্তের শুরু। ফুলের আবরণে চারিদিকের গাছগুলো শোভিত।

২০০৯  এর সেপ্টেম্বরের শুরুর দিক।

এই সময় আলো ঝলমলে সকালে ঝিরঝিরে ঠান্ডা বাতাসের আবেশে বাড়ির বাইরে থাকতে খুব ভালো লাগে সুমনার। কিন্তু আজ কাজ আছে। দুই রাস্তা পরেই মান্ট্রিয়ল জেনারেল হাসপাতাল। ওখানে যেতে হবে ডাক্তার দেখাতে। কাঁধে রয়েছে ডাক্তারকে দেখানোর জন্য কাগজপত্রের ভারী ব্যাগ। বাসা থেকে দু’কদম গেলেই  মোড়। মোড় দিয়ে হেঁটে গেলে বড় একটা রাস্তা। ভেতরের দিকে রাস্তা বলে তেমন গাড়ি ঘোড়া নেই।। তবুও বাসা থেকে বেরিয়ে সাবধানে ডান বাম দেখে সুমনা রাস্তা পার হল।

সামনের ফুটপাতে পা রাখতেই পাশের ঝোপের আড়ালে ঝপাং একটা শব্দ। সুমনা চমকে তাকালো পাশের ঝোপে ঘেরা ফুটপাতের দিকে। কোথা থেকে যেন একজন সাইকেল চালক তার সাইকেল নিয়ে ঝোপের পাশে, ফুটপাতের খালি জায়গাটায় উদয় হয়েছে। এমন কড়া ব্রেক কষতে হয়েছে তাকে যে, ব্রেকের ধাক্কা না সামলাতে পেরে সাইকেল চালক নিজেই হতচকিত হয়ে পড়েছে। ব্রেকটা সে সুমনাকে দেখেই দিয়েছে। অর্থাৎ সময় মতো ব্রেক না কষলে সুমনা  নির্ঘাত তার চাকার নিচে পড়তো ।

কিন্তু কিভাবে এই লোকটির উদয় হলো এখানে?  রাস্তা পার হবার সময় সুমনা কাউকে তো সাইকেল চালিয়ে আসতে দেখে নি। হতে পারে ঝোপগুলো খুব বড়, তাই চোখে পড়েনি । এই ব্যাখ্যার মধ্যে সান্ত্বনা খুঁজে পাওয়া যায় বটে, তবে সাইকেল চালকের অবস্থা দেখে মনে হল সে যেন সুমনার থেকে  ইঞ্চি খানেক দূরে  এসে নিজেকে  কোন একভাবে থামাতে সক্ষম হয়েছে। এ একটা অসম্ভব ব্যাপার ছিল। তার জানার মধ্যেই ছিলনা এখানে কোন পথচারী আছে।  কিন্তু সামনে কে আছে তা সে দেখবে না?

দেখে নি কেন?

কারণ একটা হতে পারে আর তা হলো সামনে থেকে তো আসেনি। ও যে কোথাও থেকে ঝুপ্ করে পড়েছে । পড়ার পর দেখেছে নাকের ডগায় দাঁড়িয়ে আছে এক  আগুন্তক।

তাহলে কি ব্যাপারটা এমন হয়েছে যে, যখন সে আসবার উদ্যোগ নিয়েছে আর যখন সে  এসে পড়েছে – এই দুই সময় সূচির ফারাকে সুমনার অতর্কিত আগমন ঘটে গেছে  যা, তার জানা ছিল না। একমাত্র  আকাশ থেকে না পড়লে এটা না জানার কথা নয়।

আর এত বড় একটা সাইকেল আশপাশে  না দেখেই সুমনা ফুটপাতের ওই জায়গায় পা রাখবে? রাখতেই পারে।  আনমনে থাকলে কত কি হতে পারে! তাই হয়তো হয়েছে  -এই  ব্যাখ্যা নিজেকে দিয়েও সে  হিসাব মিলাতে পারে নি। কারণ এর পরের ঘটনা আরো চমকপ্রদক। আর তা হলো, সাইকেল চালকের এহেন কারবার দেখে, উল্টো দিক থেকে আসা এক মহিলা পথচারী তখন তার দিকে এমন তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে হাসলো যেন, এই দুইজন পথচারী একে অপরকে আগে থেকেই খুব ভালো চেনে।  লোকটির দৃষ্টি অনুসরণ করে সুমনা মহিলার দিকে তাকাল।  দুজনেই শ্বেত বর্ণের ফ্রেঞ্চ। নারীটির ভাবখানা এমন যেন, সে সাইকেল আরোহীকে বলতে চাইছে, ‘ এবার বুঝেছ তো সাইকেল চালাবার মজা?’

দুজনের যোগাযোগের ভাব দেখে সুমনার বুঝতে বাকী রইলো না  এই দুই ব্যক্তি  এই রিয়্যালিটির কেউ নয়। এদের একজন আজ পৃথিবী ভ্রমণকালে  রাস্তার এক পথচারীর সাথে ধাক্কা থেকে  কোন ভাবে  নিজেকে বাঁচিয়েছে। ঘটনা সামলে নেবার পর  হতবিহবল হয়ে পড়েছে।  ক্ষণিকের জন্য হলেও সেই অভিব্যক্তির চাক্ষুষ সাক্ষী হয়েছে তারই আরেক সংগী।  পৃথিবীর প্রতিটি স্থানে, প্রতিটা মুহূর্তে দৃশ্যমান হোক বা না হোক, ET রা হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে পার্থিব চেহারা নিয়ে মনুষ্য রূপে রক্ত মাংসের শরীরে  অথবা মাঝে মাঝে নন ফিজিক্যাল রূপে। এরাই তারা।

কখন কোন পোর্টাল বেয়ে  ঝুপ করে ফুটপাতের  মধ্যে তার আসার ক্ষণে  সুমনার  আগমণ ঘটবে, এমন  কি সে জানত?

নাহ্‌।

কারণ এই অংশটুকু  যে  প্রকৃতি ঠিক করে রেখেছে। তার পোর্টাল উন্মুক্তের ক্ষণে তার  হিসাবের পাশ কেটে  সুমনা  রাস্তা থেকে ফুটপাতে উঠবে।  অদ্ভুত ভাবে  পরস্পরের উপস্থিতির উপরিপাতন ঘটবে। মানে সঙ্গঘর্ষ হবে।  সুমনার এক্কেবারে মাথার উপরে হয়তোবা এই সাইকেল চালকটি তার সাইকেল নিয়ে পড়বে , না হয় তার  পাশ ঘেঁষে ধাক্কা লাগাবে।

কিন্তু না, সে সামলে নিয়েছে। সামলাতে যদিও তার ভীষণ কষ্ট হয়েছে। সুমনা নিজেই তা দেখেছে। তার দুর্দান্ত গতিশীল অবস্থা থেকে  সামলে নিয়ে হঠাৎ থামিয়ে ফেলার ঘটনাটা চালকের মুখে আতংক ও  আর্তনাদ সৃষ্টি করেছে। সুমনার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে শিস্‌ দেবার সুরে শব্দ করে উঠেছে। এই শব্দই সুমনা শুনেছে। অসম্ভব গতির পর ব্রেক কষার কোন শব্দ সে শুনেনি।

এখনো তার মনে পড়ে –আচমকা কি যেন উদয় হলো ঝোপের পাশে।  সামনা সামনি পথচারীকে অতর্কিতে  দেখার  পর সাইকেল চালকের  ক্ষীণ আর্তনাদ। চালকটি অবাক হয়ে ভেবেছিল  ঝপ্  করে পৃথিবীর ম্যাট্রিক্স –এ প্রবেশের সময় কিভাবে  সুমনার এত কাছ দিয়ে তার পোর্টাল উন্মুক্ত হয়ে পড়লো? কিভাবে বিশাল সংঘর্ষ  হতে গিয়েও হলো না। কিভাবে সে দক্ষতার সাথে অনিবার্য সংঘর্ষ সামলে নিল!

২

তারা তো সবসময়  হেমন্ত এলে, এ গ্রহের হেমন্তের ঝলমলে দিন উপভোগ করতে আসে।  রাস্তায় হেঁটে বেড়ায়, সাইকেল চালায়, জীবন কেমন তা জানার জন্য  মনুষ্যরূপ ধারণ করে। অন্য কোন সময় অন্য কোন রূপও তারা ধারণ করে ঘুরে বেড়ায়। কত ভাবেই না  এ গ্রহের জীবন যাপনের স্বাদ গ্রহণ করে। সুমনার দেশে থাকলে হয়তোবা পথের ধারে দাঁড়িয়ে ঝালমুড়ি, ফুচকা খাওয়ার স্বাদও গ্রহণ করত।

রাস্তার পথচারীদের মাঝে কয়জন এই বাস্তবতার আর কয়জন অন্য বাস্তবতা থেকে আগত তা  কি আমরা সত্যিই জানি? তারা যখন ইচ্ছে  তখন  পোর্টাল থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নেমে গিয়ে  যদি দুর্ঘটনাও ঘটায়, তাও আমাদের অজানাই থেকে যায়।

০৭ই সেপ্টেম্বর,২০২৬

Sunday, September 6, 2026

শেইপ শিফটার –দাঁড় কাক

শীত প্রায় চলেই এসেছে। 

অক্টোবর মাস, ২০০৯.

মন্ট্রিয়ল শহরে বেশ ঠান্ডা। ঝিরঝিরে ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা বেশ ভাল লাগে সুমনার। কিছুক্ষণ পরপর একটা করে ঠান্ডা ঝাপটা কোথা থেকে এসে যেন সারাটা শরীর আদর করে বুলিয়ে দেয়। দেশে তো হিমালয়ের ঠান্ডা বাতাস আছে। মন্ট্রিয়লের উত্তরে মেরু অঞ্চলের তুষার আবৃত পাহাড় আছে। প্রতিদিন সূর্য ঝলমল সকালে সুমনা বের হয়ে পড়ে তার কাজের উদ্দেশে। একটা একটা অলিগলি পার হতেই চোখে পড়ে মোড়ে মোড়ে একটা করে চার্চ। ঢাকাকে যদি মসজিদের শহর বলা যায়, মন্ট্রিয়লকে বলা যেতে পারে চার্চের শহর। 

আজ দিনটা যেন কেমন এক অদ্ভুত রকমের সুন্দর। বড় রাস্তার একদিকে গাছ দিয়ে ঢাকা। তার ছায়ার নিচ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে  একটু পর পর কারুকাজ খঁচিত প্রাচীন ইমারতের গীর্জাগুলো চোখে পড়ছে। রাস্তার ঐ পাড়ে নটরডাম স্কুল। দেখলেই সুমনা ভাবে, ‘একদিন আমি এ স্কুলে শিক্ষকতা করবো।’ কিন্তু তা কি সম্ভব? মাতৃভাষা ফ্রেঞ্চ না হলে তো স্কুলে শিক্ষকতা সম্ভব না। সুমনা ইউনিভার্সিটি অফ্  মন্ট্রিয়লে ছয় মাসের জন্য ভাষা শিক্ষার কোর্সে ভর্তি হবার সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু জানুয়ারির কঠিন শীতের বরফ পেরিয়ে সেই পাহাড়ের চূড়ায় ক্লাস করবার ভয়ে ভাষাটা আর শিখাই হয় নাই। যদিও ওই ছয় মাসের জ্ঞান নিয়ে স্কুলে তো শিক্ষকতা সম্ভব না,   তবে দোকানে কাজ করার জন্য, গ্রাহকের সাথে বাতচিৎ করার জন্য এধরণের কোর্সগুলো উপকারী। যেহেতু তা হয়নি তাই সুমনা ফ্রেঞ্চদের ভাষা বুঝেও না, বলতেও পারে না। কিন্তু ফ্রেঞ্চদের আদব কায়দা আর দৈহিক সৌন্দর্য্যর মুগ্ধতা নিয়ে ঘুরে বেড়ায় সারাক্ষণ।  মনে মনে ভাবে, ‘মন্ট্রিয়ল শহর, আমার শহর। আমি এই শহরের –ই  মেয়ে।’

এমন ভাললাগার চিন্তায় মগ্ন হতে না হতেই মাথা তুলে তাকালো পাশের কারুকাজ শোভিত গীর্জার দিকে। হুইল চেয়ারে চলাচল করা উপসনাকারীদের জন্য গীর্জার সামনে শক্ত স্টিলের রেলিং বসানো হয়েছে। এখন সকাল সাড়ে দশটা। চার্চের প্রার্থণার সময় শুরু হয়নি। গীর্জার সামনে পাকা করা উঠানে কিছু মানুষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর স্টিলের রেলিং –এ বসে আছে কৃষ্ণবর্ণের একটা মেয়ে। কালোস্যুটের ফরমাল পোশাকে মনে হচ্ছে মেয়েটি চার্চের কোন কাজের সাথে আজ যুক্ত। বয়স ২০/২২ বছর হবে। কাঁধ পর্যন্ত কালো চুল। কোকড়া নয়।  চোখ পড়তেই লক্ষ্য করলো মেয়েটি ঠাঁয় তাকিয়ে আছে তার দিকে। পলক ফেলে আবার তাকাতেই সুমনা দেখল ওখানে যেন একটা বিশাল দাঁড় কাক বসে আছে। মেয়েটি একদম উধাও।  এক ঝলকের তফাতে মেয়েটি উধাও? 

কোথাও নেই? এ কিভাবে সম্ভব? 

চোখের ভুল নয় তো। একটা দাঁড়কাক কেন দেখতে পাচ্ছে ওই জায়গায়?

মেয়েটি কেন তার দিকেই ঠাঁয় তাকিয়ে ছিল এত পথচারীর ভিড়ে?

সারাদিনের কাজ শেষে একটু শংকা নিয়েই সুমনা সেদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে এলো। কিছুতেই ভুলতে পারছে না মেয়েরূপী দাঁড়কাকটির কথা। মেয়ের জায়গায় এক ঝলকের জন্য একটা দাঁড়কাক দেখতে পাওয়া কেমন যেন এক এলোমেলো ব্যাপার।

২ 

সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত গড়াতেই শুরু হলো সুমনার গলা থেকে এক অদ্ভুত ঘড় ঘড় কাশির শব্দ।  এই শব্দ এতো কিম্ভুতকিমাকার যে, একবার একটু কাশলেই আশপাশের বাসার সবার কানে পৌঁছে যাচ্ছে এই শব্দ। তার বিল্ডিং –এর একতলা থেকে জানালা দিয়ে শব্দ পৌঁছে যাচ্ছে দোতলা, তিনতলা ছাড়িয়ে সেই চারতলায় । গলার স্বর পালটে কি এমন শব্দ শুরু  হলো ? তাও তো না? কোথা হতে আসছে এ শব্দ? সুমনার গলা চিরে আসা এই শব্দ তো সুমনার নয়। মনে হচ্ছে যেন কোন একটা যন্ত্র বসানো হয়েছে তার গলার ভেতরে।

ওর খুব ভয় লাগছে। খুব অসহায় লাগছে। আজ সকালে কাক রূপী মেয়েটার কথা মনে পড়ছে। পিশাচ যখন মানুষ রূপে আসে তার উপস্থিতি ধরে ফেলার মত অভিজ্ঞতা যে তখনো সুমনার হয়নি।

৩

ছয় বছর পরের কথা। 

২০১৫.

দেশের একটা কলেজে শিক্ষকতার কাজ নিয়েছে সুমনা। বিষয় গণিত এবং বিজ্ঞান।দেড় ঘন্টার  লেকচার ক্লাশে  খেয়াল করেছে একটি ছাত্রী ঘড়ি ঠিক ধরে এক ঘন্টা পর ক্লাশে প্রবেশ করে। পরনে পার্টির পোশাক। সাজগোজে পুরো ভারী  মেইক –আপ। তিনি আর কেউ না, ব্যাংকার বাবা মায়ের একমাত্র আদুরে কন্যা।  আব্দারের শেষ নেই। তার আবদার মেটাতে বাবা মায়ের চেষ্টার শেষ নেই। কিন্তু পড়াশুনায় তার মন নেই। শুধুই সবকিছুতে তার জিদ। সুমনা এসব তথ্য পেয়েছে প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে। এবার রেজাল্ট খারাপ হলে প্রধান শিক্ষক ডেকে পাঠালেন তার মাতা পিতাকে। তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, ছাত্রীর একাধারে সব বিষয়ে খারাপ নম্বর কেন। তাদের কন্যা বাসায় করে টা কি? বাড়ির কাজ? ঘরের কাজ? নাকি রান্নার কাজ?

বাবা মায়ের উত্তর, কিছুই করে  না। তার শুধু রাগ আর রাগ। 

সুমনা দেরী করে ক্লাশে আসা ছাত্রীটিকে আজ নিয়ে সামনে বসিয়েছে। পুরো দেড় ঘন্টার ক্লাশে ছাত্রীটি একবারও চোখের পলক ফেলেনি। ঠাঁয় তাকিয়ে ছিল তার টিচারের দিকে। যেন তার মধ্য দিয়ে কোন এক সত্তা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে এই টিচার নাম্নী বস্তুটিকে। আগে কি তারা এমন কোন বস্তু দেখে নি?  চারপাশে সবাই এখন তার কাছে ‘অবজেক্ট – লক্ষ্যবস্তু। কে এই সত্তা যে এই নিরীহ ছাত্রীটির দেহে বাসা বেঁধেছে? খুঁজে খুঁজে নির্ঝঞ্ঝাট একটি সুখী পরিবারের এই নরম মনের মেয়েটিকে বেছে নেয়া হয়েছে। পিশাচ লোক থেকে তারপর কাউকে পাঠানো হয়েছে এর দেহে। ভূ-লোকে এসে তারা পর্যবেক্ষণের কাজ নেমেছে। তাদের আচরণ আর মেজাজের খপ্পরে পড়ে আচরণগত বৈষম্যের শিকার হবে এই আধারটি। ভয়ংকর শব্দে চারিদিক প্রকম্পিত করে তুলবে মাঝে মাঝে। 

৪

ক্লাশে একদিন সময় মত এসেছিল ছাত্রীটি।  কিন্তু ক্লাশে ঢুকবার প্রাক্কালে শুরু হল তার অতিপ্রাকৃত ভয়ংকরে সেই কাশি। যেমন সুমনাকে ধরেছিল সেই মন্ট্রিয়লে দাঁড়কাকটি। ছাত্রীটির স্বরে ভেসে আসা এই শব্দ চিনতে ভুল হয়নি সুমনার। দাঁড় কাক না হলেও পিশাচ লোকের কোন কিছুর নজর তো পড়েছেই। চলার পথে কখন কোন সময়ে ঝুপ্ করে পোর্টাল বেয়ে পিশাচরা নেমে  এসে কার গলাটা চেপে ধরবে কে জানে।

আজ ছাত্রীটির অসুস্থতা সুমনা নিজ চোখে দেখেছে। নিজের ওপর দিয়ে না গেলে বুঝতো না পিশাচদের ভয়ংকর আক্রমণ কেমন হতে পারে। অপরের দুরবস্থা উপলব্ধি করতে পারতো না। সুমনা এখন জানে - যদি মুক্তি না মেলে এই পিশাচের হাত থেকে, তাহলে জীবনের সমাপ্তি অনিবার্য। কিন্তু কিভাবে বুঝবে কোন স্থানে কখন এ রকমের অক্রমণ হতে পারে ? 

০৭/০৯/২০২৬

Tuesday, September 1, 2026

বম রাজার পুত্র

পূর্বকথা

কোন এক মধু পূর্ণিমার দিনে বম রাজার ঘরে তার প্রথম পুত্র সন্তানের আবির্ভাব ঘটে। বহু আকাংখিত পুত্রটির নামকরণ করা হয় পূর্ণ। পূর্ণিমার দিনে জন্ম বিধায় পূর্ণিমা থেকে পূর্ণ। ভাল নাম পূর্ণ বম।  একমাত্র সন্তান বলে তার  আবদার পূরণের কোন কমতি ছিল না। আদরে আহ্লাদের পূর্ণ বড় হতে থাকলো। পারলে আকাশ ফুঁড়ে স্বর্গও এনে দেবেন রাজা বাহাদুর তার পুত্রের হাতে। কিশোর বয়সে পদার্পণের সাথে সাথে গানের প্রতি তার ঝোঁক বাড়তে থাকলো। সাথে যুক্ত হলো তাকে দেয়া ইশ্বর প্রদত্ত ভরাট কন্ঠস্বর।  এর মাঝেই সংগীতে তার দিন দিন দক্ষতা বেড়েই চলছে। যৌবনে পদার্পণ করার সাথে সাথেই গোত্রের রীতি অনুসারে পূর্ণের বিবাহ সম্পন্ন হলো। 

আধুনিক শিক্ষা দীক্ষায় দীক্ষিত হয়ে সেই প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছেলেটি দেশের নামকরা ব্যান্ডগ্রুপে নিজেকে সসম্মানে যুক্ত করতে সক্ষম হলো। এক পর্যায়ে সে গ্রুপে কন্ঠ দিতে শুরু করলো। আর এটাই ছিল তার জীবনের ঘুরে দাঁড়াবার প্রথম মোড় বা যাকে বলে টার্নিং পয়েন্ট। তার সংগীত ক্যারিয়ারের শিখর চূড়ায় আরোহনের সিঁড়ি তার ব্যান্ড গ্রুপ। সুরেলা  ভরাট কন্ঠ আর হৃদয় ছোঁয়ানো সুরের কাজ এক নিমেষে সকল শ্রোতাদের মন জয় করে নিল। শুরু হলো সেলিব্রিটি জীবনে ভক্তদের আগমন। ভক্তদের ভালবাসায় একাকার এই ছোট্ট জীবনে এরপর মধুকরীদেরও অনুপ্রবেশ ঘটলো। আর তখন দেখা হলো শ্রাবনীর সাথে। 

শ্রাবণীর কামনায় ভরা দৃষ্টিতে পূর্ণ যেন হারিয়ে গেল কোন একসময়ে। 

শ্রাবণী তাকে এক সময়ে তার রাজ্য ত্যাগে বাধ্য করল। গান বাজনা উচ্ছন্নে গেল। স্ত্রী পুত্র পরিবারের মায়া মন থেকে উধাও হয়ে গেল। শ্রাবণীর মোহে অন্ধ হয়ে পূর্ণ তার পরিবার, গোত্র, সমাজ অস্বীকার করে গৃহত্যাগ করলো। রাতের এক অন্ধকারে বিজাতীয় মেয়ে শ্রাবন্তীকে নিয়ে পূর্ণ বম দেশান্তরী হলো।

১

শ্রাবণীর সংস্পর্শে পূর্ণ অনুভব করলো প্রেম কাকে বলে। নতুন করে চিনলো নিজেকে। অপার আনন্দে গা ভাসালো। একই সাথে পিছনে ফেলে আসা ঘর সংসার, পরিবার যে নিমেষে ধ্বংস হয়ে গেছে সে খেয়াল থেকে সম্পূর্ণ রূপে বিচ্যুত হয়ে নতুন জীবনকে আলিঙ্গন করলো। 

এভাবেই সব কিছুই ভালো কাটছিল তাদের।  শ্রাবণীর বাঁকা গালের হাসি, কামাতুর চাহনীতে পূর্ণ হারিয়ে গেছে নাকি শেষ হয়ে গেছে, সে নিজেই জানে না। কিন্তু জানে যে তার আর কিছুই চাইবার নেই। সে এখন পরিপূর্ণ। তাই কোন এক মধু পূর্ণিমার দিনে শ্রাবণীকে বিয়ে করবার সিদ্ধান্ত নিল। 

বিজাতীয় হয়েছে তো কি হয়েছে?

প্রেমের কোন জাতপাত আছে না কি?

কিন্তু বিয়ে করলে প্রেমিকা যে আর প্রেমিকা থাকে না তা কি পূর্ণ জানে? 

কিভাবে জানবে? প্রেমে তো এর আগে সে পড়ে নি। সমাজের জন্য  কর্তব্য মনে করে স্ত্রী গ্রহন করেছিল পূর্বে। কিন্তু সেই মিলনে তো প্রেম ছিল না। এবার প্রেম এসেছে জীবনে। প্রেমিকা কে আরো স্থায়ী বন্ধনে আবদ্ধ করবার জন্য তাকে স্ত্রী-র মর্যাদা দেবে। শ্রাবণী প্রেমিকা থেকে স্ত্রী হয়ে সংসার নামক যাঁতাকলের যাঁতায় এবার দায়িত্বের বেড়াজালে  আটকাবে। পিতা, পিতামহদের রাজকীয়  ঠাঁট বাটের মাঝে পূর্ণ-র তেমন কোন দায়িত্ব ছিল না। কিন্তু এই বিদেশে তার চলবে কি ভাবে? যথাসাধ্য চেষ্টা করছে। এতে প্রেমে থিতু আসেনি। যদিও প্রেমিকা এখন তার স্ত্রী। সংসারের চাহিদা অনুসারে   স্ত্রীরও সন্তান লাভের আকাঙ্খা কম নয়। কিন্তু কোন এক অজানা কারণে  তাদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন হচ্ছে না। বহু চেষ্টা করেও সন্তানের মুখ দেখা হলো না। দিন দিন শ্রাবণীর হতাশা বেড়ে চললো। 

শুরু হলো টুকটাক মনোমালিন্য। ছোটখাটো ভাল না লাগা। কথা কাটাকাটি। এক পর্যায়ে অনিচ্ছা আর ভীষণ রকমের বিরক্তবোধ। তাদের আর ইচ্ছেও করে না পরস্পরের মুখ দেখতে। তাহলে সব কিছু তুচ্ছ করে ফেলে আসা কোন এক কালের কোন এক প্রেম কোথায় গেল? রাজবংশের উত্তরাধিকার অস্বীকার করা, সংগীত থেকে বিরত রাখা –এ সবকিছু তো শ্রাবণীর জন্যই। তাহলে পূর্ণ কি পেল জীবনে –এই  প্রশ্ন আসে কেন বারবার তার মনে? পূর্ণ-র সব কিছু কি অপূর্ণতায় পর্যবাসিত হয়ে গেল?

শ্রাবণীর শরীরের বাঁকগুলো আর জায়গা মতো থাকছে না। কামনা উদ্রেককারী ভাব ভংগীমাগুলো নিমেষেই হারিয়ে যেতে শুরু করেছে।  সবাই বলে মানসিক আবসাদ থেকে এরকম হয়ে গেছে। সাপের আঁকা বাঁকা বাঁকগুলো নষ্ট হয়ে  শরীরটা একটা বেঢপ বেজীর আকার  ধারণ করেছে। 

এতদিন পার করে পূর্ণ কি তাহলে সব হারালো? না আছে শ্রাবণীর সেই মন, না আছে তার কামাতুর শরীরটা। কোথায় যাবে পূর্ণ? কি করবে সে? এই দশমণের বস্তার ভার আর যে সইতে পারছে না সে।  তবুও যে, সে সব কিছু সহ্য করে চলছে। কারণ ও এখন  বেঢপ আকারের হলেও সে –ই  তো তারই মনের নায়িকা। কিন্তু  সংবেদনশীলতা কি আছে? 

পূর্ণ বমের পাগল হবার দশা।  
মনে পড়ে, প্রথম দিকে তার ভক্ত থাকাকালীন শ্রাবণী মডেলিং করতো। টুকটাক দু’একটা নাটকেও কাজ করেছে। শ্রাবণী যখন পর্দায় আসতো দর্শকরা তার কামনায় ভরা চোখের চাহনী আর বাঁকা হাসির জন্য হন্যে হয়ে অপেক্ষা করতো। অভিনয়  প্রতিভা আছে, কি নাই তা নিয়ে তাদের মাথা ব্যথা ছিল না। সবাই বলতো শ্রাবনীর বাঁকা গালের হাসি অনন্য । এ হাসি  আর কারো নেই। সে যেন সাক্ষাত অপ্সরা। দেশের সব মডেলদের ছাড়িয়ে তার হাসিটুকু যে মদিরা সৃষ্টি করতে পারে তা আর কারো মাঝে নেই। 
পূর্ণ –ও  তখন ক্যারিয়ারের শীর্ষে। আর এই শীর্ষে থাকা দুই তারকার মিলনের নির্দেশ যেন কোন এক মহাজাগতিক নির্দেশে, স্বর্গ থেকেই আদিষ্ট হলো।  তাই হয়তো বা তাদের দুজনের সম্মিলিত পথচলা শুরু হয়েছিল। শুরু হয়েছিল দু’জনের অদৃষ্টের সম্মিলিত  অধ্যায়।   

২
আজ দু’দশক হয়ে গেছে শ্রাবণীকে ছেড়ে চলে এসেছে পূর্ণ তার পুরোনো সংসারে। শ্রাবণী নতুন করে জীবন শুরু করেছে। সংসারে মনোযোগ দিয়েছে। সে তার নতুন জীবনে দু’সন্তানের জননী। পূর্ণ তাকে পূর্ণতা দিয়ে তার মাতৃত্বের সাধ মিটাতে পারে নি। পূর্ণ –র  নিজের ঘরে তো সন্তান ছিল। বাচ্চাটি এখন বেশ বড়। বাবার সাথে তার দূরত্ব তৈরী হয়েছে। তারপরও তো তারই সন্তান। কিন্তু শ্রাবণীর সাথে সংসারটা কোন ভাবেই হলো না। তারা যতই চেষ্টা করে মন থেকে তাদের এই ব্যর্থ সম্পর্কের সময়টুকু মুছে ফেলতে, পারেনা। 
পূর্ণ ঘরে ফিরে নতুন করে চেষ্টা করেছে জীবনকে গুছিয়ে নিতে। নর্থ আমেরিকার যতগুলো বড় বড় শহর আছে সব জায়গায় তাদের কনসার্ট করবার ট্যুর শুরু হয়েছে।  চির চেনা সেই দুই দশক আগে হারিয়ে যাওয়া তার দরদী গলার সুর –মূর্ছনা এবার পৌঁছাবে প্রবাসীদের কাছে। 
আজ থেকে টানা তিন মাস নর্থ আমেরিকায় ট্যুর শুরু।  এয়ারপোর্টের ভেতর ভক্তরা যখনি পাচ্ছে তাকে  ঘিরে ধরছে। যাত্রীরা তাকে দেখে মহাখুশী। কেউ কেউ প্লেনের ভেতরে ঘিরে ধরে সেলফি তুলছে।পোশাক আশাকে তার কোন চাকচিক্য নেই। মলিন, রঙচটা ঢোলা একটা ট্রাউজার পরনে। গোল গলার রঙচটা, মলিন একটা মেরুন টি –শার্ট। পায়ে একটা ঢিলা ফিতার পুরানা স্যান্ডেল। প্রৌঢ় অবস্থায় চুলহীন মাথা ঢেকেছে পরচুলা দিয়ে। একদম বুঝা যায় না, কারণ ওদের জাতির চুল সব সময় নাইলনের মতন সুন্দর।  লাল, বাদামী রঙের লম্বা চুলের পরচুলা। বেশ মানিয়েছে। প্লেনের ভেতর সিটে  বসতে বসতে শুরু হল তার দলবলের হৈ চৈ। কত প্রাণোচ্ছ্বল দলের সকল সদস্য। সেলিব্রেটি বলে স্টুয়ার্ডরা,  এয়ার হোস্টেসরা আন্তরিকতার সাথে আপ্যায়নে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। ফার্স্ট ক্লাশ থেকে স্যুপ, কাটা লেবুর সালাদ, শরবত এনে দিচ্ছে। পূর্ণ দলের সবার সাথে তা ভাগ করে খাচ্ছে আর গল্পে মত্ত হয়ে আছে। দলের বড় ভাই সে। সবাইকে আগলে রাখাই তার কাজ। একবার বেশ উঁচু স্বরে বলে ফেললো একজন এয়ার হোস্টেসকে, ‘ ভাতের সাথে কি কাঁচা মরিচ পাওয়া যাবে?’  আমরা সবাই জানি দেশের খাবার বিদেশে যে স্বপ্নের মতন। আরো কত কথা তার। পুরোনো অভিজ্ঞতার সাথে মিলিয়ে দেখলো এবার যাত্রার সময়। তার জীবনে  আজকের ফ্লাইট সবচেয়ে দীর্ঘ হতে যাচ্ছে। তাও তারা সবাই খুশী। কারণ একটাই। বহু দিনের প্রতীক্ষিত ঢাকা – নর্থ  আমেরিকা সরাসরি ফ্লাইট অবশেষে চালু হয়েছে।

কি ফুরফুরে, লিডারশিপে পূর্ণ  তার ব্যক্তিত্ব! সবদিক দিয়ে একজন তারকা সে। কিন্তু চোখে মুখে তারপরও ধরা পড়ে ক্ষয়ে যাওয়া হৃদয়ের বিরামহীন রক্ত ক্ষরণ। শ্রাবণীর ঝড় জীবনকে ওলোট পালোট করে না দিলে জীবন তো তার গতিতে চলেই যাচ্ছিল। সেবার কলেজ  শেষ করতে করতে ঢাকায় এসেছিল গান গাইতে। দেখা হয়েছিল এক সাক্ষাত স্বর্গ থেকে নেমে আসা পরীর সাথে। এক দেখায় বলে বসেছিল, ‘আমায় বিয়ে করবে?’ সেই সময় আজকের মতন তার মনে তো কোন ক্ষরণ ছিল না। নিখাঁদ একটা মন শুধু স্বপ্ন দিয়ে ভরা ছিল। 
আর আজ? সবকিছু ভেঙ্গে চুরে চুরমার।
জীবন কি শুধু কষ্টই দেয়? ষাট বছর তো কিছুই না। অথচ যাত্রীদের সাথে বসে হাসতে হাসতে পূর্ণ বলছিল, ‘আরো যেন বিশ বছর বেশী বাঁচতে পারি।’

৩
এই প্রথম টানা ২১ ঘন্টা জার্নি করে শ্রাবণীর শহরে এসে পূর্ণ যখন নামলো তার  ভেতরটা কন্ কন্ করে উঠল। ভেতরে যতই পুড়ুক, দলের ছেলেদের সবসময় সে একটা কথা বলে –আনন্দ  আর হৈ চৈ করাই জীবন। 
যার ভরাট কন্ঠ শুনে শ্রাবণী পাগল হয়েছিল, সেই শ্রাবণী আজ ভীষণ ঠান্ডা। পূর্ণ-র সাথে সময়গুলো মনের মাঝে এলে সে অনুভূতিহীন হয়ে পড়ে। অথচ  তখন তার মোহের জাল ফেলে দলছাড়া করেছিল, সমাজ ছাড়া করেছিল বম রাজার পুত্র পূর্ণ বম-কে। শ্রাবণীর যাঁতাকলে সেই তখন থেকেই পূর্ণ ভাঙতে শুরু করেছে। অল্প সময়ে মুখে বলি রেখার আঁচড় ভেসে উঠেছে। আঁচড়গুলোকে কোন মেইক –আপ ঢাকতে পারেনি। তার ভক্তকুল এখনো জানে না, তাদের প্রিয় গায়কের মুখের ঐ আঁচড়গুলো শ্রাবণীর আঙ্গুলের বিষাক্ত স্পর্শে হয়েছিল নাকি অসময়ের বয়সের ভারে হয়েছিল। পূর্ণকে দেখলে সবার মনে এখনো এই একটা প্রশ্নই  জাগে।  

৪
এখন পূর্ণ কেমন আছে?
শ্রাবণীর অভাবে পূর্ণ  ভীষণ ভাবে নিঃস্ব। সবসময় এলোমেলো, পাগল পাগল একটা ভাব তার। তার অনুজ্জ্বল ক্ষয়িষ্ণু ত্বকের আবরণে ঢেকে যাওয়া রিক্ত শুষ্ক মুখটা দেখলে শুধু একটি কথাই মনে আসে আর তা হলো তার হৃদয় জুড়ে ছেয়ে থাকা  একটা নাম – শ্রাবণী।  নামটি তার মাঝে এতো স্পষ্ট  ভাবে  গেঁথে আছে যেন, তাকে দেখামাত্র সকলের মনে শ্রাবণী নামটি অনুচ্চারিত ভাবে উচ্চারিত হয়।  অদৃষ্ট দিয়ে আদিষ্ট এই নামটির মানুষ তার সত্তায় একাকার হয়ে আছে। এখন পূর্ণ –র একটা অংশ সে। এই নামটি এখন পূর্ণ –র একান্ত। এই নামটি পূর্ণ –র সকল অপূর্ণতা। 

সন্ধ্য ৮;১৫

০১/০৯/২০২৬

Saturday, August 8, 2026

কথোপকথন – ৩ প্রজেক্ট blue book

পূর্ব কথাঃ গ্রেইস- রা সাড়ে  তিনফুট থেকে চারফুট দীর্ঘ, ছোট খাটো, পাতলা গড়ন বিশিষ্ট এলিয়েন। চোখগুলো খুব বড়, নাক দৃশ্যমান নয়, ত্বক ছাই বর্ণের, অমসৃণ এবং  কুঁচকানো।উন্নত প্রযুক্তি সম্পন্ন। পুরোই টেলিপ্যাথিক।  প্রজননে অক্ষম। প্রজাতি প্রায় বিলুপ্তির পথে। টিকে থাকার জন্য ফিরে এসেছে অতীতে তাদের পূর্ব পুরুষের সাথে সংকর উৎপন্ন করে নতুন প্রজাতি সৃষ্টি করতে। 

প্রজেক্টের নাম- প্রজেক্ট ব্লু বুক। 

মার্চ ১৯৫২ হতে ডিসেম্বর ১৯৬৯ পর্যন্ত প্রজেক্ট ব্লু বুক –এর অধীনে ufo নিয়ে বিশদ গবেষণা করা হয়েছে। ৯ই জুন ১৯৬৪ সালে এই প্রজেক্ট থেকে গ্রেইস –এর  সাথে কথোপকথন প্রকাশিত হয়। মাহাবিশ্বের সৃষ্টি রহস্য, জাগতিক সময় ও আমাদের জগতে প্রাণের উদ্ভব কিভাবে হয়েছে সে বিষয়ে গ্রেইসের সাথে কথোপকথন অন্তর্ভুক্ত করা হলো।

পর্ব -১

কথোপকথনের বিষয়বস্তু –প্রাণ কি, জীবন কি। জগতের সৃষ্টি।

প্রশ্নকর্তার প্রথম প্রশ্ন ছিল,

- কোথা হতে এসেছ? উৎস কি? কোন গ্রহ থেকে ?  

-পৃথিবী থেকে।

- কিন্তু তুমি বলেছ, তুমি হাজার হাজার বছর আলোকবর্ষের পথ অতিক্রম করে এসেছ।কিভাবে সম্ভব? [এ কি সত্যি সম্ভব? আর এই পৃথিবী থেকেই যদি আসে তাহলে এত পথ পাড়ি দেবার প্রয়োজন কেন?]

- হ্যা সম্ভব। আমি এই পৃথিবীরই বাসিন্দা,কিন্তু তোমাদের ভবিষ্যত সময়য় কাল থেকে থেকে।সময় ভ্রমন করা মানে স্থানও ভ্রমন করা।

‘to travel in time is the travel in space. Offset spatial divergence’ 

[অর্থাৎ সময়ের সাথে ভ্রমন করতে গিয়ে পূর্ব অবস্থান থেকে বিচ্যুত হয়ে অন্য স্থানে পৌঁছানো। এক্ষেত্রে অবস্থানের স্থানাংকের (location -এর) পরিবর্তন ঘটে, যাকে গণিতের ভাষায় বিচ্যুতি (divergence) বলে।গ্রেইস ঠিক এই গাণিতিক শব্দটি ব্যবহার করেছে।কথোপকথনের সকল পর্যায়ে গ্রেইস কোন কথ্য ভাষা ব্যবহার করেনি।যদিও তারা প্রজাতি হিসাবে টেলিপ্যাথিক, কিন্তু আমাদের সাথে কথোপকথের জন্য ভাষা শিখেছে এবং বাকযন্ত্র ব্যবহার করে উচ্চারণ করে কথা বলাও শিখেছে।]

প্রশ্নকর্তা তার স্বল্প জ্ঞানে যা কুলায় তা দিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন যে,

- আমি কি ভবিষ্যত থেকে আগত ভীনগ্রহী এলিয়ানের সাথে কথা বলছি?

উত্তরে সে বলেছে,

- না। আমরা ভীনগ্রহী কোন প্রাণী নই। আমারা তোমাদেরই উত্তরসুরী।

- তাহলে ভবিষ্যত থেকে এখানে এসে কি করছ?[মানে এখন এই ‘সময়ে’ কি করছ?]

- (তোমাদের) পর্যবেক্ষণ করছি।নিউক্লিয়ার যুদ্ধের পর যখন সব প্রমাণ, সাক্ষ্য ধ্বংস হয়ে গেছে তখন থেকে পর্যবেক্ষণ করছি। সেই যুদ্ধে সামান্য সঙ্গখ্যক মানুষ বাঁচতে পেরেছিল।তারাই ছিল আমাদের পূর্ব পুরুষদের কয়েকজন। তখন থেকেই আমাদের পর্যবেক্ষণ শুরু। 

- বুঝলাম। এখন বল আমরা কিভাবে তোমাদের ‘সময়’– কে বুঝব?

- তোমরা বুঝবার ক্ষমতা রাখো না। তোমরা অনুধাবনে সক্ষম নও। এমনকি আমাদের আমাদের সময়ে আমাদের  আবিষ্কারগুলো সত্যতা গ্রহণ করে উপলব্ধি করবার সেই যোগ্যতা এখনো তোমাদের হয়নি। 

- একটু বিশদ্ ভাবে বুঝিয়ে দাও।

- মহাবিশ্বের উৎপত্তি হয়েছে প্রকৃতি থেকে।তোমরা যাকে তথাকথিত ‘জীবন’ নামে অভিহিত কর, সেই জীবনের ‘অর্থ’ বোঝার সক্ষমতা তোমাদের নেই। জীবনের প্রকৃতি, স্বভাব, বৈশিষ্ট্য বোঝার মত মানসিক সক্ষমতা তোমাদের নেই। 

- কি বলতে চাইছ? জীবনের ‘অর্থ’ নাকি জীবনের বৈশিষ্ট্য/ জীবনের প্রকৃতি?

- অর্থ (Meaning)হচ্ছে কোন কিছুর সাথে জুড়ে দেয়া একটা ধারণা। আর প্রকৃতি /বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বস্তুগত বাস্তবতা।

‘Meaning is something ascribed.

Nature is objective Reality.’

[গ্রেইস –এর বিশ্লেষণধর্মী উত্তর শুনে পাঠকরা নিশ্চয়ই দু’বার ভাববেন বিষয়বস্তুর প্রতি তাদের ধারণার গভীরতা সম্পর্কে।] প্রশ্নকর্তার পরবর্তী প্রশ্ন ছিল, 

-   সুতরাং তোমরা জান, এই মহাবিশ্ব কি ভাবে সৃষ্টি হয়েছে? ইশ্বর কি তা-ও জানো?

- হ্যা জানি। we evolved past the need for superstition. 

[আমরা কুসংস্কারের উর্ধ্বে উঠে জ্ঞান আহরণের অন্বেষণে এগিয়ে গিয়েছে।জীবনে চলার পথে ইশ্বরের ধারণা, প্রাচীন ধর্মীয় কাহিনী যেখানে প্রয়োজন হয়, সেসব কুসংস্কার ছাড়াই আমরা এগিয়ে যেতে পেরেছি। তোমাদের এই সময়ে তোমরা এসবের মাঝে আবদ্ধ আছ। আমাদের সময়ে আমরা মিথ, কল্পকাহিনী, পুরাণ, রূপকথা থেকে মুক্ত। এসব কেন্দ্র করে আমাদের জীবন বহমান নয়।

- আরেকটু বিশদ বল। তোমার জ্ঞান দিয়ে আমায় আলোকিত কর।আমাদের মৃত্যুর পর কি হয়? [মানে প্রশ্নকর্তা বুঝাতে চাইছে, মৃত্যুর পর আত্মার কি হয়।]  উত্তরটা ছিল এমন,

- মৃত্যু ধারণাটা তোমাদের মানস প্রসূত।মৃত্যু বলে কিছু নেই। কারণ মৃত্যু হওয়া/ শেষ হয়ে যাওয়া এসব ধারণাগুলো প্রকৃতিতে নেই।তুমি প্রতিটা মুহূর্ত অনুভব করে যে অভিজ্ঞতা  অর্জন করছ তা-ই জীবন। আমি, সে, তারা -আমরা সকলেই প্রতিটা মূহূর্ত থেকে অভিজ্ঞতা অর্জন করছি।[সেটা হতে পারে দেহের মাঝে উপস্থিত থেকে বা দেহের বাইরে থেকে।] অভিজ্ঞতা গ্রহণের ক্ষেত্রে একজন থেকে আরেকজনের মাঝে পার্থক্য আছে। এই পার্থক্যটুকু তোমাদের কাছে ‘মৃত্যু’ নামে পরিচিত।[মৃত ব্যাক্তি দেহের মাঝে নাই কিন্তু সেও অভিজ্ঞতা অর্জনের মাধ্যমে এগুচ্ছে।সে নেই এমন ধারণ অমূলক।]

প্রশ্নকর্তা তখন বললেন, 

- তাহলে সোজাসাপ্টা বলা যায় মৃত্যু বলে কিছু নেই? আমার পরস্পর পরস্পরের জীবনকেই অনুভব করে চলছি?

- অনেকটা তাই। যেভাবে বুঝেছ তেমনই। 

[সময় যেহেতু কম, প্রশ্নকর্তা এ বিষয়ে আর আগালেন না। গ্রেইস খুব অসুস্থ ও দুর্বল বোধ করছিল।তাকে ইলেকট্রিক শকের মত কিছু দিয়ে জাগ্রত রাখা হচ্ছিল, যেন তার কাছ থেকে সামান্য যতটুকু সম্ভব ততটুকু তথ্য নেয়া যায়। তাকে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করার বিদ্যা পৃথিবীর মানুষের জানা নেই।তাই এই সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর পর্বে তাকে আবারো প্রশ্ন করা হলো,

- এই জগৎ কিভাবে তৈরী হয়েছে?কেন আমাদের জন্যই এ জগৎ, এতো নিখুঁত ভাবে তৈরী হয়েছে?

- সৃষ্টির মাঝে অসংখ্য জগৎ রয়েছে। অসীম সংখ্যক। প্রতিটির ভৌত ধর্ম ভিন্ন ভিন্ন, এবং সকল জগত প্রাণের ধারকও নয়। প্রাণকে ধারণ করতে পারে না। আমরা বর্তমান মানে আমরা যে আছি এর কারণ আমাদের জগৎ আমাদের ধারণ করতে পারে। 

- তাহলে নিউক্লিয়ার যুদ্ধ বাঁধিয়ে আমরা আমাদের ধ্বংস করি কেন?

- কারণ, তোমরা মতবাদ (dogma) নিয়ে চল। তোমরা মতবাদে বিশ্বাসী। মতবাদ হলো নির্দিষ্ট কিছু নীতি।তোমরা ঐ সকল নীতির ওপর গভীর বিশ্বাস স্থাপন করে আছ। রাজনোইতিক ও ধর্মীয় dogma.(Political and Religious dogma.) এই মতবাদ ভিত্তিক বিশ্বাস তোমাদের সকল সংঘর্ষের মূল কারণ।এই কারণে বিংশ শতকে তোমরা গণবিধ্বংসী মরণাস্ত্র ব্যবহার করার সুযোগ পাবা। আr তাতে করেই তোমাদের মানব প্রজাতি সম্পূর্ণ রূপে ধ্বংস হয়ে যাবে।  

- আরেকটা শেষ প্রশ্ন। নৈতিকতা কি?কিসের ওপর ভিত্তি করে তোমাদের নৈতিকতা, নীতিবোধ প্রতিষ্ঠিত?

- সহানুভূতি আর প্রমানের ওপর ভিত্তি করে।


পর্ব -২

কথোপকথনের বিষয়বস্তু - বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের সৃষ্টি।

প্রথম পর্ব শেষ হবার পর আবারো কিছু সময় ক্ষেপণ করে গ্রেইসকে জিজ্ঞাসা করা হয় যে, সে কথা বলার মত অবস্থায় আছে কি না। প্রশ্নকর্তার প্রশ্ন ছিল,

-তুমি বলছ যে, তুমি আমাদের ভবিষ্যত সময় থেকে এসেছ।বিবর্তন হয়ে ক্রমান্বয়ে তোমরা এমন রূপ ধারণ করেছ। তোমরা মানবজাতির উত্তরসূরি, কিন্তু রূপান্তরিত হয়ে আলাদা ভাবে বিবর্তিত এক নতুন প্রজাতি। তাহলে কিভাবে বুঝব যে তোমরা মানবজাতির উত্তরসূরি?

-আমরা মানব জাতিরই উত্তরসূরি।বিবর্তিত হতে হতে আমরা আর প্রজননে সক্ষম নই।তাই আমরা  নতুন প্রজাতি।

-তাহলে ইংরেজীতে কথা বল কিভাবে?

এরপর দীর্ঘক্ষণ নীরব ছিল সেই গ্রেইস। এরকম বোকার মতো প্রশ্ন শুনে হয়তোবা অবাক হয়ে গিয়েছিল। তাকে ভয় দেখিয়ে প্রশ্নকর্তা তখন বলল, 

-আমার কথার উত্তর দাও। নাহলে আবারো বিষাক্ত (স্কাপোলামিন /হায়সিন) ওষুধ প্রয়োগ করব।বুঝেছ কি বলছি? এবার বল, তোমরা ইংরেজী ভাষা কিভাবে বোঝ?

-তোমাদের প্রজাতিকে বুঝতে হলে এই ভাষা জানা আবশ্যক।

-সেজন্য ইংরেজী ভাষাকেই বেছে নিলে? তোমাদের তো ভীষণ বুদ্ধি।

-তা বলতে পারো।

-তোমরা দাবী কর যে তোমরা বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের সৃষ্টি সম্পর্কে জানো।যদিও এর ব্যাখ্যা এখন পর্যন্ত দাও নি। আমি আবারো জানতে চাই এই বিশ্ব ব্রহ্মান্ড কিভাবে সৃষ্টি হয়েছে? 

-এই সৃষ্টি রহস্য বুঝবার বা অনুধাবন করার ক্ষমতা তোমাদের নেই। সত্যকে গ্রহণ করবার মত উপযুক্ত তোমরা নও। 

-আমার প্রশ্নের উত্তর দাও।

[এখানে প্রশ্নকর্তার ধরণ দেখে একটা বিষয় স্পষ্ট যে, প্রশ্নকর্তা এই ভীনগ্রহী প্রানীটির প্রতি বেশ রূঢ় আচরণ করেছিল। গ্রেইস তার অসুস্থ শরীর নিয়ে আটক অবস্থায় আছে। তার ওপর বিষাক্ত ওষুধের প্রয়োগ হয়েছে । সে যতটুকু পেরেছে উত্তর দেবার চেষ্টা করেছে সে বলেছে,

-বিশ্ব ব্রহ্মান্ড তো সৃষ্টি হয়নি।এটা কিছু থেকেই সৃষ্ট নয়। 

-কিছু থেকে সৃষ্ট  না হলে তার অস্তিত্ব থাকতে পারে না। তুমি তো কিছু না থেকে সৃষ্টি করতে পার না।

 - এই ধারণাটাই ভুল।কিছু থাকতে হবে এরকম ভাবাটাই ভুল।[আদিতে কিছু আছে এবং তা থেকে সৃষ্ট হয়, এই ধারণাটি ভুল। ‘কিছু থেকে উতপত্তি হয়’ এই ধারণা তখনই আসে, যখন আমরা ভাবি আদি বলে কিছু আছে। কিন্তু এই ‘আদি– অন্ত’ধারণা যেখানে এক্সিস্ট করে না সেখানে  অসীম কিছু বিদ্যমান যা থাকার কোন হিসাব সময় দিয়ে করা যায় না। infinite existence. যেই থাকার কোণ শেষ এই, কোন শুরুও ছিল না। আর সে কারণেই কোন ‘স্রষ্টা’র হাত থেকে এই বিশ্ব ব্রহ্মান্ড গড়ে আসেনি। তাই এই ‘এক্সিস্ট’ করাটা বা এই ‘উপস্থিতি’র কোন স্রষ্টা নেই।সে তার স্বকীয় মহিমায় বিদ্যমান।[খুব সম্ভবত এখানে কোন কিছুর উপস্থিতি বলতে বুঝিয়েছে শক্তির উপস্থিতি বা শক্তি থেকে উদ্ভুত চেতনার উপস্থিতি।অর্থাৎ বিশ্ব ব্রহ্মান্ড সৃষ্টির আগে ছিল শুধুই চেতনা বা ‘কনসাশনেস -‘বোধ’। এই চেতনা কোথাও থেকে সৃষ্ট নয়। চেতনা সব সময়ই বিদ্যমান। চেতনা তার স্ব-ইচ্ছায় প্রনোদিত হয়ে তার সত্তার (ক্ষুদ্রাংশের)রূপান্তর ঘটিয়ে এক পর্যায়ে  3D রিয়্যালিটি তে প্রকাশিত (manifest) হয়েছে। এই স্তরে আমরা বস্তুকে স্পর্শ করে অনুভব করি, চোখ দিয়ে দর্শন করি। তাপ, চাপ অনুভব করি। শব্দ শ্রবণ করি।5D, 7D থেকে শুরু করে আরো উচ্চ ডাইমেনশানে ভৌত গুণাবলী পাল্টে যায়। সেখানে দেহ এবং তার পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের প্রয়োজন হয় না। পদার্থ তখন পার্থিব অবস্থা থেকে অপার্থিব অবস্থায় প্রকাশিত হয়। মানুষের বোধ, চেতনাগত অবস্থায় (শরীরবিহীন অবস্থায়) বিদ্যমান থাকে। চেতনা –র প্রকাশ বিদ্যমানতা অসীম এবং ‘সময়’-এর উর্ধ্বে। এই বোধ পূর্ব থেকেই ছিল। সবসময় –ই থাকবে।]

কথোপকথনের এক পর্যায়ে প্রশ্নকর্তা বললেন, 

-কিন্তু তুমি তো (কোন একসময়ে) বলেছিলে জগৎ সমূহ সৃষ্টির এক আদি অবস্থা আছে। তার একটি মৌলিক রূপ রয়েছে।

-হ্যা বলেছি। ব্যাপারটা এমন যে, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাগে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সত্তার সমন্বয়ে এই মহাবিশ্ব বিরাজ করে।তোমাদের ভাষায় , তোমাদের চিন্তার ব্যাপ্তিতে এর ব্যাখ্যা দেয়া কঠিন।

-তাহলে বিশ্ব ব্রহ্মান্ড কি অলৌকিক ভাবে গঠিত হয়েছে?[অর্থাৎ গ্রেইসের কথা অনুযায়ী বিশ্ব ব্রহ্মান্ড  কেউ সৃষ্টি করেনি?]

-বিশ্ব ব্রহ্মান্ড অলৌকিক ভাবে নয় স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে গঠিত হয়েছে।এটা অস্তিত্বের চিরন্তন ধারায় একটা অবশ্যম্ভাবী ঘটনা।‘The universe is a spontaneous event and inevitable within the eternity of existence.’ [event মানে যা ঘটে থাকে। কোন একটি ঘটনা।কিন্তু এমন যে সে পূর্বে ছিল। এখন ঘটছে না। আমাদের টাইম স্পেস রিয়্যালিটির পরিপ্রেক্ষিতে ইভেন্ট-কে বুঝে নিতে হবে যে, একটি ঘটনা যা ঘটে। পূর্বে ঘটেছিল বা ভবিষ্যতে ঘটবে এমন নয়। higher realm- এ সময় exist করে না। higher realm, টাইম-স্পেস দ্বারা গঠিত নয়।সুতরাং event মানে বর্তমান একটা অবস্থা যা, বর্তমান কালে ঘটে চলছে। আমাদের চিন্তার গন্ডী 3D reality দ্বারা  আবদ্ধ। সুতরাং চেতনা হতে প্রকাশিত ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশকে কোন ইভেন্ট হিসাবে বুঝতে আমাদের পক্ষে (3D reality –র গন্ডী পেরিয়ে) বুঝতে দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে।] গ্রেইস আরো বলেছে,

- অসীম সংখ্যার বিশ্ব থাকলেও তারা সকলে প্রাণ ধারণের উপযুক্ত পরিবেশ বজায় রাখতে পারে না। তোমাদের এই বিশ্বই প্রাণের ধারক হিসাবে প্রকাশিত হয়েছে। তাই তোমরা exist কর।অন্য বিশ্বে অন্য ধরণের সৃষ্টি আছে। তারাও (এক ও অভিন্ন) চেতনার অন্যরকম বহিঃপ্রকাশ।কিন্তু এসব তোমাদের বোধগম্যের উর্ধ্বে। [তাই আমরা যাকে life বলি, প্রাণ  বলি, গ্রেইস তাকে  so called life বলেছে। তখন প্রশ্ন কর্তা তাকে আর প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করে জিজ্ঞাসা করেছে,]

- আমাদের বিশ্বে ‘প্রাণ’ কি তাহলে হঠাৎ করে প্রকাশিত হলো?

- এই বিশ্বে? অবশ্যই। হঠাৎ করেই হলো। কারণ এই বিশ্বই একমাত্র প্রাণ ধারণে সক্ষম একটা বিশ্ব, যার বহিঃপ্রকাশ হঠাত-ই হয়েছে। তবে ‘জীবন’ ভৌত অবস্থার-ই একটা অবশ্যম্ভাবী আত্মপ্রকাশ। ‘In this universe, life as you call it, is an inevitable consequence of the Universes’ physical properties.’     

[3D রিয়্যালিটি তে /বাস্তবতায় আমরা পঞ্চ ইন্দ্রিয় দ্বারা অনুধাবন করতে পারি। এই বাস্তবতার ভৌত অবস্থাকে অনুধাবন করতে পারার নামই জীবন। অন্য বাস্তবতায় এবং অন্য ডাইমেনশানে ভৌত অবস্থা অন্য রকম। সেই অবস্থায় যে অস্তিত্ব বিদ্যমান তাদের ইন্দ্রিয়ের কাজ সে অনুযায়ী ক্রিয়াশীল।]

প্রশ্নকর্তা বললেন,

-অর্থাৎ নির্দিষ্ট কোন নিয়ম ছাড়া উদ্দেশ্যহীন, এলোপাথাড়ি ভাবে আমরা মানুষেরা সৃষ্টি হয়ে গিয়েছি?

-হ্যা। অনেকটা দৈব ভাবে সৃষ্ট বলা যেতে পারে। তোমরা থাক কি, না থাক তা দিয়ে তোমাদের বিশ্বের কিছুই যায় আসে না। কারণ এই বিশ্বের অভ্যন্তরে যতগুলো জগৎ আছে তারা যে কোন সময়ে চারপাশের কত ধরণের এলোমেলো ঘটনা ঘটে সেগুলো দ্বারা ধংস হয়ে যেতে পারে। যেমন সুপার নোভার বিস্ফোরণে, সূর্য থেকে নির্গত সৌর রশ্মির বিকিরণে, উল্কার পতনে, গ্রহাণুর সংঘর্ষে।কিন্তু এতে কি তোমাদের চারপাশের জগতের কিছু যায় আসে? আর যদি নাই-ই যায় আসে, তাহলে কি বলা যায় না, তোমাদের জীবন একটা উদ্দেশহীন হঠাৎ সৃষ্টি। সেজন্যই বলি, তোমাদের সৃষ্টির পিছনে যে সত্য (বাস্তবতা) লুক্কায়িত আছে, সেই সত্যকে গ্রহণ করবার মতো মানসিক ক্ষমতা তোমাদের নেই।

গ্রেইসের বক্তব্য অনুসারে প্রশ্নকর্তা এই পর্বের আলোচনায় এবার উপসংহার টানতে চাইলেন।তিনি বেশ গভীর চিন্তা করে ফেলেছেন ইতোমধ্যে। তাই বললেন,

- আমাদের জগৎ যদি আমাদের প্রতি নিরুত্তাপই থাকে তাহলে তো আমরা শুধু এলোপাথাড়ি এক সৃষ্টি শুধু নয়, তার থেকেও অনেক বেশী রকমের উদ্দেশ্যহীন, আকস্মিক, কাকতালীয় এক সৃষ্টি! তাহলে এই জগৎ তো অর্থহীন। সেক্ষেত্রে বেঁচে থাকারই বা অর্থ কি? কোন অর্থ নেই।

- অর্থ আছে।অর্থ বলতে বুঝায় তোমার চেতনা দ্বারা তুমি কি বুঝ।‘অর্থ’ তোমার চিন্তার মাঝে অবস্থান করে। তোমরা মানুষেরা, অর্থ –কে কল্পনা কর। যা কল্পনা কর তাকে রহস্যময়, অলৌকিক, গোপনীয় পরিকল্পনা মনে করে নিজেকে ভুল ধারণায় পরিচালিত কর। প্রকৃতপক্ষে ‘অর্থ’ বলতে তা বোঝায় না। ‘Your species conjures meaning but operates under the false belief that meaning is the mystical plan. It is not.

গ্রেইস তারপর বলেছে, অর্থ মানে হলো, যা তুমি ভাব/ যা তুমি বুঝ/যা তুমি সৃষ্টি কর। Meaning is what you make.


পর্ব -৩ 

কথোপকথনের বিষয়বস্তু –সময়ের সংজ্ঞা। 

সময় (Time) বলতে কি বুঝায়। 

পরবর্তী কথোপকথন হয়েছে Time নিয়ে। পূর্বেই বলেছি আটককৃত এই গ্রেইসের সাথে প্রশ্নকর্তা বেশ তাচ্ছিল্যের স্বরে, উদ্ধত ভঙ্গিমায়, রূঢ় কন্ঠে তার আচরণের বহিঃপ্রকাশ দেখিয়েছেন।তার প্রশ্ন ছিল,

-সময় নিয়ে কথা বলতে চাই। তুমি কি জান সময় কাকে বলে?

উত্তরে গ্রেইস বললো,

- সময় হলো self winding mechanism. [অর্থাৎ স্বয়ংক্রিয় ভাবে আবর্তনশীল একটা ব্যবস্থা।]

 আরো বলেছে, সময় হলো Perpetual rotor. [চিরকাল ধরে অবর্তিত হবার প্রক্রিয়া।অথবা বলা যায় চিরস্থায়ী আবর্তনের একপ্রকার কৌশল বা ব্যবস্থা। বা বলা যায় চিরস্থায়ী ভাবে ঘূর্ণায়মান এক প্রক্রিয়া। কোন কাজ বা কোন ঘটনা 3D রিয়্যালিটিতে কিভাবে বাস্তব রূপ  নেবে, সেটি বুঝানো হয় সময় দিয়ে।] 

সময়ের  সংজ্ঞা দিতে গিয়ে আরো বলেছে, 

সময় হলো one of the most intricate and exquisite creation of man.[সময় হলো, মানুষ কর্তৃক সৃষ্ট সবচেয়ে জটিল এবং অসাধারণ সৃষ্টি সমূহের একটি সৃষ্টি।

-তাহলে এত জটিল একটা বিষয়ের জন্য তো একটা সৃষ্টিকর্তা প্রয়োজন, তাই না? আমাকে বিস্তারিত বলো। আমাকে বলো যে, এত জটিল কৌশল ব্যবস্থা কিভাবে স্রষ্টা ছাড়া অস্তিত্ব লাভে সক্ষম ? [মানে বিদ্যমান থাকা সম্ভব?]

- বললাম তো। তোমরা এ বিষয়ে বুঝবার মতো মানসিক ভাবে উপযুক্ত নও এবং সত্যটাকে মেনে নিতেও সক্ষম নও।

-তাহলে বলো, এই আমি কিভাবে অস্তিত্ব নিয়ে বেঁচে আছি স্রষ্টার হাত ছাড়া? 

-বেঁচে আছ কারণ তুমি আছ, তাই তুমি বেঁচে আছ । তুমি আছ বলেই তুমি অস্তিত্ব অনুভব কর। তুমিই তোমার অস্তিত্ব। তুমি সব সময় বিদ্যমান। যদি তা না হতো, তাহলে তোমার এই ‘থাকা’–টা হতো না।এই মহাবিশ্বে যতগুলো জগৎ আছে তার প্রায় সবগুলোই বিশৃংখলায় পূর্ণ। শুধু তোমাদের জগতটা কাকতালীয় ভাবে (বা আকস্মিক ভাবে) বলতে পার, এই ধরণের স্থিতিশীল গ্রহকে ধারণ করছে। এখানে প্রানের সঞ্চার ঘটলে তাকে টিকিয়ে রাখার উপযুক্ততা এই গ্রহের আছে। 

-  এ রকম গ্রহ আমাদের জগতে আরো আছে?

-ট্রিলিয়ন সংখ্যক আছে।

- তাহলে কাকতালীয় ভাবে কি করে প্রাণের অস্তিত্ব পৃথিবীতে আছে?

-কাকতালীয় ঠিক নয়। সঠিক ভাবে বললে বলা যায়, টিকে থাকার সম্ভবনা আছে তাই আছে। প্রাণ সঞ্চারের সম্ভবনা আছে তাই আছে। পরিসংখ্যনগত ভাবে সফল হওয়ার সম্ভাবনা (statistical likelihood)বেশী, তাই টিকে আচে। 

ধরে নিলাম ট্রিলিয়ন সংখ্যক জগতে প্রাণের অস্তিত্ব প্রকাশিত হবার সম্ভবনা ট্রিলিয়ন সংখ্যক। কিন্তু কোথাও তা ঘটেনি। শুধু এই গ্রহেই প্রাণের সঞ্চার ঘটেছে। সে কারণেই পৃথিবী নামক গ্রহটি এত অসাধারণ, এতো গুরুত্ব পূর্ণ।ধরো, ট্রিলিয়ন সংখ্যক সম্ভবনার মাঝে একটি সম্ভবনা হলো তোমাদের অস্তিত্ব।অস্তিত্ব প্রকাশের পর অণবিক সমন্বয় ঘটে তা ভাগে ভাগে বিভক্ত হয়ে নিঃশেষ হয়ে যাবার সময় তার একটি অনুলিপি রেখে যায়। এটাই ছিল তোমাদের প্রাণের উৎসের প্রথম পর্যায়।[অর্থাৎ জীন তৈরী হচ্ছে]। অবশেষে তোমাদের জীবনের শুরু।[অর্থাৎ DNA গঠনের প্রারম্ভিক পর্যায় উত্তীর্ণ।] 

প্রশ্নকর্তা তখন জানতে চাইলেন,

- আনবিক সংযোগের এই সমন্বয় সাধন কেন বিশেষ ধরণের (একটি অনন্য সাধারণ) ঘটনা?

- দুটো বৈশিষ্ট্যের কারণে।আণবিক মিশ্রণ, প্রতিলিপি তৈরী করতে পারে। এবং (জীনগত) পরিবর্তন সাধন করতে পারে। যদি এই পরিবর্তন দুর্বল হয় তাহলে তার অস্তিত্ব থাকে না। [অর্থাৎ জীন দুর্বল হলে সে আর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে না।] পরিবর্তন শক্তিশালী হলে তার বিকাশে সমৃদ্ধি আসে।উন্নতি সাধিত হয়। সামনের দিকে এগিয়ে চলে। জীন গত পরিবর্তন শক্তিশালী হয়ে সূক্ষ্ম (প্রথম ধাপে) আণুবীক্ষণিক জীবে রূপান্তরিত হয়।আরো পরিবর্তনের মাধ্যমে জটিল গঠণ লাভ করে বিকশিত হতে থাকে। ঐরকম হাজারো লক্ষের মাঝে একটা সম্ভাব্য ফলাফল হলে তোমরা। [হাজারো লক্ষের অণবিক সজ্জার ফলে উদ্ভুত একটা ফলাফল তোমরা।]হাজারো লক্ষের মাঝে একটা উত্তরসূরি তোমরা। যদি এই ঘটনার সূত্রপাত না হতো, তোমাদের এই বেঁচে থাকা, মানে তথাকথিত এই জীবনের উৎপত্তি হতো না। তোমরা হাজারো লক্ষ সম্ভবনার মাঝে একটা সফল সম্ভবনা। সেজন্যই তোমরা, তোমাদের অস্তিত্ব, তোমাদের গ্রহ, তোমাদের জগৎ -সব কিছুই এত অসাধারণ।   

০৯/০৮/২০২৬

.........।।




Sunday, July 19, 2026

শায়েরী

 



ফুল যখন ফুটলো

তখন সুবাস নেবার কেউ নেই।

**

(জীবনের) ছোট ছোট ইচ্ছেগুলো থেকে জীবন বঞ্চিত করেছে

কিন্তু তারপরও বঞ্চনা ঠাহর করতে পারি না। 

**

Monday, July 13, 2026

কথোপকথন - ২ কিন্নর

পূর্বকথাঃ

সাজু আর আমি ক্লাসরুমের সামনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে। গত কালের নৃত্যগীত  সন্ধ্যার আয়োজন নিয়ে কথা বলছিলাম।কথোপকথনের মূল বিষয়  নৃত্যগীতের আয়োজন নিয়ে নয়, বরং নৃত্য পরিবেশনকারী 'সুদর্শন পুরুষ' মালবিকা – কে নিয়ে। 

কথোপকথনঃ

-অসহ্য

-কি অসহ্য?

-ওর অঙ্গভঙ্গী।

-অঙ্গভঙ্গী বলছো কেন? এটা তো  নাচ।

- এটা কোন নাচ হলো? হাত পা ছুঁড়লেই নাচ হয়?

-আজকাল হয়। শুধু নাচই হয় না। উচ্চাংগ নৃত্যও হয়।মালবিকার সজাগোজ দেখ না? দরবারে নৃত্য পরিবেশনের সময়ে বাঈজীরা এমন পোশাকেই আসতো। 

-এখানে কোন দরবার হচ্ছে না কি?

- না তা হচ্ছে না। তবে নৃত্য পরিবেশনকারী মনে হয় তোমার মন ছুঁতে পারেনি। তোমার চোখে ওকে সুন্দরী  রমনী মনে হয়নি তাই না?

- রমনী? এই ছেলে কিভাবে রমনী হবে?

- আমার চোখে অবশ্য সে সুদর্শন পুরুষ।তাই আমার ভাল লেগেছে। তোমার ভাল লাগেনি কারণ তোমার দৃষ্টিতে সে 'সুদর্শনা' মানে সুদর্শন রমনী হতে পারে নি।

- একটা মানুষ একজনের চোখে পুরুষ আরেকজনের চোখে রমনী হবে কিভাবে?

- কিন্নর যারা, তার হো তাই-ই।নারী পুরুষ উভয় সত্তার বাস এক দেহে। যেমন মালবিকা।আমি তাকে পুরুষ রূপে দেখেছি তাতেই ভাল লেগে গেছে। তুমি তাকে নারী রূপে দেখতে পেলে বাদ বাকী কিছু খেয়ালেই আসতো না। তার অংগভঙ্গীকে কেরিকাচার মনে হতো না। নৃত্যে পরিবেশনকে ছন্দের তালে তালে শৈল্পিক উপস্থাপন  মনে হতো। আমার  কি মনে  হয় জানো? 

-কি মনে হয়?

-মালবিকা শতভাগ কিন্নর হয়ে উঠতে পারে নি। এখনো পুরুষালী ভাবটা অর্ধেকের বেশী রয়ে গেছে। সমান সমান নারী, পুরুষ হলে তোমার আর আমার কাছে সে 50/50 ব্যালেন্স হয়ে যেত।

- কিন্নররা তো প্রাচীন পুরাণ অনুসারে অর্ধেক মানুষ আর অর্ধেক দেবতা । তাই নয় কি? সেখানে তারা দেবতাদের জন্য সংগীত পরিবেশন করে। আমাদের ডাইমেনশানে এসে সেই মানুষেরও দুই ভাগ আছে - নারী ও পুরুষ। বেশ জটিল ক্রোমোজম-বিভাজন এবং এর সজ্জা। আর দেবতাদের  ক্রোমোজমের সজ্জা তো জানি-ই না। ঐটুকু তো একদম অজানা। 

-হ্যা, বেশ জটিল ক্রোমজোমের সজ্জা। আমি একজন চ্যনেলারের কাছ থেকে তথ্য পেয়েছি যে, 7D -র সত্তারা অর্ধেক মানুষ আর অর্ধেক অ্যাঞ্জেলিক। সুতরাং ভেবে দেখ, তাদের কি জটিল ক্রোমজোমের বিন্যাস! তাদের গুণাবলী আমাদের ধারণারও উর্ধ্বে। এখন কিন্নরদের কথা ভাব। যদি তারা  5D এরও উর্ধ্বের সৃষ্টি হয়, এবং সেখান হতে 3D তে এসেছে সুর, বাদ্য আর নৃত্যের ঝংকারে অনুরণন ঘটাতে, কিন্তু প্রাপ্ত সম্মান না পেয়ে, প্রাপ্ত অধিকারের অভাবে তারা ভিক্ষা করে , ভাঁড়গিরি করে জীবন যাপন করছে।  কি কঠিন দুঃসহ তাদের জীবন। এই ইঙ্কারনেশানে পথ চলা তাদের জন্য কতটাই না দুর্বিষহ। সবকিছুতে শুধু বাধা আর তুচ্ছ তাচ্ছিল্য। 

-নিশ্চয়ই । এরা আমাদের কাছে, না পুরুষ না নারী । কিন্তু গোড়ায় যেখানে এরা সৃষ্ট হয়েছে, সেখানে কিন্নরদের-ও  স্ত্রী জাত আছে। তাদের বলে ‘কিন্নরী’। পুরাণ মতে, কিন্নররা সাধারণত হিমালয়ের কল্পিত গন্ধর্বপুর বা কুবেরের আলকা নগরীতে বাস করত। তাদের বাসস্থান ছিল দেবতাদের স্বর্গীয় রাজ্যে, বিশেষত হিমালয় পর্বতমালায়—গন্ধমাদন, কৈলাস, এবং মেরু পর্বতের আশেপাশে। এখনো বসবাস করে ।কিন্তু সেই উচ্চ ডাইমেনশান তো আমরা দেখতে পাই না। তাই না?  পুরাণে বলা আছে, দেবতারা যখন আনন্দ করেন, তখন কিন্নররা তাদের জন্য গান ও নাচ পরিবেশন করেন। গন্ধর্ব ও কিন্নর উভয়েই স্বর্গীয় সংগীতজ্ঞ হিসেবে পরিচিত।

-ঠিকই ধরেছ। এদের ক্রোমোজম বিন্যাস, পুরাণ অনুসারে যদি ১০০+ হয় তাহলে বেশীর ভাগ বিন্যাসই তো আমাদের অজানা এবং misunderstood. খেয়াল করো, ব্রহ্মার সাত জন মনোজাত পুত্র ছিল।

-মনোজাত মানে? 

- জানি না, তবে আমার মনে হয় মনোজাত মানে manifested হওয়া, অভিব্যক্ত হওয়া। ব্রহ্মার সেই সাত মানসপুত্ররা হলো- ভৃগু, মরীচি, অত্রি, অঙ্গিরা, ক্রতু, পুলহ, পুলস্ত্য। মরীচি ও ক্রতুর কন্যা- অরুন্ধতীর মিলনে বিশ্ব সৃষ্টিতে বিভিনন্ন ধারায়  বংশের  উতপত্তি হয়। ভেবে নিলাম বংশ মানে প্রজাতি। এসব বংশের মাঝে রয়েছে দেবতা, অসুর, নাগ,অপ্সরা, প্রাণীকুল, ১০০+গন্ধর্ব/ কিন্নর, চিত্রসেন (যারা গায়ক জাতি)। এরা ক্রমান্বয়ে বিস্তৃতি লাভ করে সৃষ্টি জগতকে বৈচিত্র্যময় করে তোলে। অর্থাৎ বহু রকমের  DNA সৃষ্টি হয়ে গেল ।তার মাঝে কিন্নর একটি প্রজাতি হিসেবে সৃষ্টি হলো। এরা ‘আধা-মানব, আধা-দেবতা’-র DNA এর সংমিশ্রণ।  পৌরাণিক ধারণায়, কিন্নররা স্বর্গীয় সংগীতজ্ঞ । এদের শরীরে মানুষ ও পাখির বৈশিষ্ট্য থাকে। কিন্নররা স্বর্গীয় রক্ষক (খোজা।) এরা সঙ্গীত, নৃত্য,সুর, সভা গায়কদের সাথে সম্পর্কযুক্ত কাজে পারদর্শী।

আবার অন্য দিক দিয়ে ভেবে দেখ, আমাদের প্ল্যানেট যখন উচ্চ ডাইমেনশানের দিকে এগুবে তখন পৃথিবী উৎস বা সোর্সের কাছাকাছি চলে আসবে। মানুষরা আর 3D  তে আবদ্ধ থাকবে না। তাদের মস্তিষ্কের left hemisphere, right hemisphere একই সাথে কার্যশীল হবে। তখন মানুষের মাঝে দুই সত্তা মানে নারী সত্তা, পুরুষ সত্তার উপরিপাতন হবে।  একই দেহে  দুটি সত্তা প্রকাশিত হয়ে, একই সঙ্গে কার্যশীল হবে।  ক্রোমজোমের গঠন নির্ঘাৎ এক থাকবে না। 

-এক থাকবে না। তাহলে কি 5D তে সব মানুষেরা ভাবেসাবে  কিন্নরদের মত হবে?

- হ্যা। এবং খেয়াল কর, সেই স্বর্গলোকের কিন্নর -এর প্রতিভূ এই ডাইমেনশানের কিন্নর। যদি দেবতাদের (ধরে নিলাম কোন একপ্রকার ET – দের ) ক্রোমজোম ওদের মাঝে থেকে তাহলে তাদের জটিল এই ক্রোমজমের বিন্যাসে দেবতাদের মতন সেই গুণটাও নিশ্চয়ই আছে?

- কোন গুণটা? সেই অভিশাপ দেয়ার ব্যাপার?

-হ্যা । সেই গুণ - তারা যদি কষ্ট পেয়ে মন থেকে শাপ দেয় তাহলে তা ফলে যায়।

-কি সাংঘাতিক!

-এই ডাইমেনশানে  DNA লক্ (অকার্যকর) থাকলে এই গুণ সুপ্ত থাকতে পারে। কিন্তু ১০০+ গন্ধর্ব/কিন্নর এর সৃষ্টি দেখে মনে হয় কমপক্ষে ১০০ প্রকার ক্রমোজম সজ্জা তৈরী হয়ে আছে LGBQT স্পেকট্রামে, যা আমরা জানি না। তবে আমরা যত উচ্চ ডাইমেনশানে উন্নীত হবো, ততই উৎসের দিকে ফিরে যেতে যেতে বহু ধরণের ক্রোমজোমের সজ্জা আমাদের কাছে প্রতীয়মান হবে।মানে প্রকৃতিতে অবস্থিত বহুধরণের সৃষ্টি অবলোকন করতে পারবো। উপরের দিকে পৌঁছুতে পৌঁছুতে  ব্রহ্মার সাত মানসপুত্রের দেখা পাব। তাদের বংশের সকল ধারা দেখতে পাব। কিন্নরদের প্রকৃতি, বৈশিষ্ট্যসমূহ,গুণ, ক্ষমতা সম্বন্ধে জানতে পারবো। তারা আর আমাদের কাছে তাচ্ছিল্যের পাত্র হবে না ।এই 3-ডাইমেনশানে তাদের ভাঁড়ামি করে জীবিকা নির্বাহ করতে হবে না। তারা নিজেরাও জানবে তারা কোথা থেকে আগত। তারা জানবে যে তারা কক্ষপথ থেকে ছিটকে পড়া পথচ্যুত উল্কা পিন্ড নয়। তাদের এইরূপ অস্বাভাবিক দৈহিক গঠন নিয়ে পৃথিবীতে আসার কি কারণ তা জানতে পারলে কেউ –ই তাদেরকে তাদের প্রাপ্ত সম্মান ও অধিকার থেকে বঞ্চিত করবে না।তারা আর হাসি ঠাট্টার পাত্র  হবে না। তাদেরকে তামাশা করে, মানবেতর জীবন যাপন করে বাঁচতে হবে না।

.....।.।

১৩/০৭/২০২৬ 

জীবন যেন স্রোতের মাঝে ভাসমান দ্বীপের মতো

  ১৯৮৪ সাল। স্কুলের অফিস রুমে গিয়েছি বেতন দেবার জন্য। লাইনে অপেক্ষা আমি আর আমার লাল ঝুটি বন্ধুটি। আমাদের খুঁজে খুঁজে ঐ ভীড়ের মাঝে পুষি এলো। ...