ব্লগে আমার ১৮ বছর পূর্তি




এমনি একদিন  ২০০৭ । অনলাইন   একটি ই- ম্যাগাজিন সম্পাদনার কাজ করি। অবনী অনার্য  পাকা লেখক। তার থেকে লেখা নিয়ে আমার ই- ম্যাগাজিন সমৃদ্ধ। যার  হাতে খালিল জিবরান এর কাব্যগ্রন্থ 'দি ম্যাড ম্যান'-এর  অনুবাদ  'উন্মাদ' প্রথম লিখিত হয়। অনলাইনে  ই-বুক হিসাবে  আমি তা প্রকাশ করি। তখন অনুবাদটি খুবই পাঠক সমাদর পেয়েছিল। আমার সকল লেখকদের সাথে যোগাযোগ হতো ইয়াহু চ্যাট গ্রুপের মাধ্যমে (খুব সম্ভবত) । খুব সম্ভবত বললাম কারণ আমার ফেসবুকের যাত্রা ২০০৯ এর মে  মাস থেকে। তখন তো চ্যাট প্ল্যাটফর্ম বলতে ইয়াহু ছিল সবচেয়ে বিশাল।   

 ২০০৭ -এ অবনী  সামু ব্লগের কথা বললেন। সিডর এর ঝড়ের সময়ের কথা । ২০০৭ এর নভেম্বর। বাপ্পার সাথে যিনি গান গাইতেন সঞ্জীব -দা তিনি সেই ঝড়ের দিন মারা গেছেন, তাই ঐ সময়ের কথা  মনে আছে। আমি  অবনীর   লেখার লিংক ধরে সামু ব্লগ দেখলাম।  তিনি যদিও সামুতে  আরো আগে থেকে লেখেন। https://www.somewhereinblog.net/blog/aunarjoblog ব্লগে লেখার সমাহারে আমি অভিভূত। ৩১শে অগাস্ট ২০০৭  থেকে  আরেকটা নতুন ই ম্যাগাজিনের  সম্পাদনা শুরু করেছিলাম। সেই ম্যাগাজিনের জন্য লেখা সংগ্রহ শুরু হলো  ডিসেম্বর মাস থেকে এ ব্লগের লেখকদের থেকে। কত না লেখা পেয়েছি সামু থেকে । লেখকরা খুব আন্তরিকতার সাথে আমাকে তাঁদের লেখা ছাপাবার অনুমতি দিতেন। সামু -র লেখা যেন এক একটা হীরার খন্ড। সামু ব্লগ যেন মণি মাণিক্যে ভরপুর।

তারও অনেক পরে একটু সাহস করে   ভাবলাম আমিও ব্লগে কিছু লিখি। কিন্তু আমি তো লিখি না।  লেখা সম্পাদনা করি। তাহলে কি লেখা যায়? সবচেয়ে সোজা একটা বিষয় - 'নাসা'র সাইট থেকে গ্যালাক্সির বিবরণ দিয়ে কিছু লেখা যায়।

সেই প্রথম  ২০০৮ এ এসে সামুতে পোস্ট  লিখলাম 'অ্যান্টেনা' গ্যালাক্সির কথা।  https://www.somewhereinblog.net/blog/humaira_haroon/28800831

সামু তার সিস্টেমে দেখাচ্ছে প্রথম পোস্টের তারিখ  ২১শে মে ২০০৮; এমনি এক দিন শুধু ১৮ বছর আগে। তখন  ফ্লরিডা থেকে মাত্র এসেছি ঢাকায়। ঢাকা থেকে ফোন নাম্বার দিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলে লগ- ইন করলাম। । আমার আমেরিকান বন্ধু সিন্ডি আমার বাংলা লেখা পড়তে না পারলেও গ্যালাক্সির ছবি দেখে খুব খুশী। বললেন  এই গ্যালাক্সিটাকে 'ক্যন্ডি ফ্লসের' মতো দেখাচ্ছে , মানে আমরা যাকে বলি শন পাপড়ি।

তারপর থেকে আরো অনেক অনেক  গ্যালাক্সি নিয়ে একটু একটু করে লেখা দিয়েছি।   

সামু আমাদেরকে ভাবতে শিখিয়েছে, ইন্টার-অ্যাক্ট করতে শিখিয়েছে, লিখতে শিখিয়েছে। রাত দিন একাকার হয়ে যেত। কোথা দিয়ে সময় যেত টের পেতাম না।শুধুই সামু-তে বিচরণ।

সামুর কাছে আমরা সব সময় কৃতজ্ঞ।                                                                               

  • চিত্রঃ ব্লগ লিখেছি ১৮ বছর ১৯ ঘন্টা
জীবনের অষ্টাদশে যখন পা দিয়েছিলাম তখন বুঝিনি ১৮ -তে পড়ার কি মজা।   তারপর আরো বহু দশক অতিক্রম করে আবারো  ফিরে পেলাম সেই অষ্টাদশ। এবারের উপলব্ধিই অন্যরকম।


একবার ধরতে পারলে


কলার বোনটা যখন ব্লাউজের ফাঁক দিয়ে প্রমিনেন্ট হতো, লিজার্ড আঁতকে উঠে উল্টো দিকে কাত হয়ে পড়ে যেত।

 এই মরোক্কর বেদুইন সুন্দরী তার সামনে এলো কোথা থেকে ?

ভাগ্যে তো জুটে শুটকি মাছ। পচী।

 নিজে যেমন পচা শুটকি, তেমনি একটা দুর্গন্ধময় শুটকিকে নিয়ে তার ইটিশ পিটিশ। ঘর করে না ওর সাথে। নাকি করে কে জানে? ঘরে তো কেউ থাকতেই চায় না তার সাথে। কিন্তু এক ঘন্টার জন্য কি মৌটুসীকে ডেকে তার ঘরে নিয়ে যাওয়া যাবে না? কায়দা করতে হবে । বুদ্ধি আঁটতে হবে। অবশ্য বুদ্ধিতে তার থেকে পারদর্শী আর কে আছে?

 আজ যদিও পচী, শুটকিকে বলেছে তাকে নিয়ে যেতে হবে কলেজে । প্রফেসর অজিত রয় চৌধুরীর সাথে দেখা করবে। এম.ফিলে ভর্তির সুযোগ পাওয়া যায় কিনা সেটা আলাপ করবে। এবার বলে প্রচুর ছেলেমেয়ে এম.ফিলে ভর্তি হয়েছে। রেকর্ড নাম্বার। তার মাঝে অম্বার ভাইয়ের যে বউটা আছে না রত্না, সেও ভর্তি হয়েছে। প্রফেসর লিজার্ড কলেজে যাওয়ার পথে পচীকে নিয়েই কলেজে যাবে। প্রফেসর অজিতের অফিস তো তার কক্ষের পাশেই। বেশি দূরে না। সুতরাং অসুবিধা কি? 

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মুখে পাউডার মাখতে মাখতে পিছনে ফিরে তাকাল পচী। ধোঁয়ায় টান দিতে দিতে আনমোনা হয়ে পচীর দিকে তাকিয়ে  লিজার্ড তাকে দেখছে আর  ভাবছে, ‘এ কেমন জিনিস জুটে আমার ভাগ্যে? পচীর বুকটা তো একেবারেই সমান। খায় না ? নাকি অপুষ্টিতে ভুগে  এই অবস্থা হয়েছে তার, কে জানে! তবে তাকে স্লিম বলা যায় না। শুটকি মানে তো শুটকি।‘

 এসব ভাবতে ভাবতেই পচী তার দিকে তাকালো। বলে উঠলো, ‘কি ভাবছো আনমোনা হয়ে?

 লিজার্ডের একটাই উত্তর, ‘রেডি হয়ে থাকলে চলো।‘ 

দুজনে রিক্সা করে ঘটর মটর করে কলেজে এসে হাজির হতেই প্রিন্সিপালের ল্যাবে  লিজার্ডের ডাক পড়ল। প্রিন্সিপালের ল্যাবেই অম্বার ভাইয়ের ওই বউটি আছে না রত্না, সে সম্প্রতি কাজ নিয়েছে। ল্যাবের সামনেই দাঁড়ানো সে। লিজার্ড পচীর কানে কি যেন বলল। রত্না বুঝতে পারলো না। ল্যাবে ঢুকে  লিজার্ড মহাশয় অধ্যক্ষের সাথে কথা বলতে শুরু করল। তাই  ল্যাবের একটু বাইরের দিকে দাঁড়িয়ে আছে রত্না। পচীর দিকে তাকিয়ে রত্না ভাবতে শুরু করল, ‘এটাই কি প্রফেসর লিজার্ডের স্ত্রী? কিন্তু ঐ মহিলা বলে তাকে ছেড়ে গেছে। চলে যাবার সময়ে কলেজে এসে সব শিক্ষকদের বলে গেছে তার স্বামীর কথা। স্বামী প্রবর সারাক্ষণ সিগারেটের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে। তাই  তার স্ত্রীর প্রতি কোন আকর্ষণ অনুভব করেনা।'  

এমন কিছুই তো শুনেছিল রত্না। তাহলে এই সাত সকালে প্রফেসরের সাথে কলেজে আসা এই পচা শুটকি  মার্কা মহিলাটা কে? 

ওরে বাবা! 

কেমন যেন ডাইনির মত করে রত্নাকে দেখছে। 

রত্নাকে চেনে নাকি? নাকি লিজার্ড মহাশয়  ল্যাবে প্রবেশ করার প্রাক্কালে পচীকে বলে গেছে,  ‘এটাই সেই মেয়ে। অম্বার ভাইয়ের বউ - রত্না।‘

অম্বা তাদের  পারিবারিক পর্যায়ের প্রিয় এক বন্ধু। লিজার্ডের স্ত্রী আর অম্বা মিলে রত্নার গল্প করে লিজার্ডের কান ঝালাপালা করে দিয়েছিল একবার। রত্না  তো লিজার্ডের কলেজেরই  ছাত্রী। মানে তারই তো ছাত্রী। সুতরাং  এই ছাত্রীর ঘাড়টা মটকানো এবং পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেওয়া লিজার্ডের জন্য কোন ব্যাপারই না। তার বদলে কি পাবে প্রফেসর?  অম্বার বাবা লিজার্ডকে লক্ষ লক্ষ টাকা দিবে। 

অম্বার বাবার এতে আগ্রহ কেন? 

কারণ অম্বার বাবা বহু আগ্রহ করে তার প্রতিবন্ধী ছেলেকে বিয়ে দিয়েছিল রত্নার সাথে। ছেলের বউ বলে কথা। চাকরের মত থাকবে, মুখে একটা টু শব্দ করবে না- তা না- বউখানা কিনা ভেগে গেল? তার শ্বশুরের সকল প্ল্যান ভেস্তে দিয়ে ভেগে গেল! চেয়েছিল, ছেলে যেহেতু  লায়েক না, সে নিজে ছেলের বউকে ঘরে আটকে একদিন খেয়ে দিলেই তো সব কাজ সারা হয়ে যাবে। পেটে বাচ্চা এনে দিলে ছেকের বউ কি আর মুখ খুলবে? তার প্রতিবন্ধী ছেলেটার না হয়ে এই ফাঁকে কপাল খুলে যাবে। 

কিন্ত্য রত্না হাত থেকে ফস্কে গেলে প্রতিশোধের নেশায় উন্মত্ত  শ্বশুর লিজার্ডের সহায়তা চেয়েছিল।  এসব প্ল্যানে প্রফেসর লিজার্ড বেশ সাহায্য করেছে শ্বশুরকে।  এক সাবজেক্টে গোল্লাও পাইয়ে দিয়েছে রত্নাকে। পচী সব জানে। তাই রত্নাকে কলেজের এই অন্ধকার করিডোরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে একভাবে  দেখছে আর ভাবছেঃ কত কথাই না  শুনেছি এতদিন। আমরা সবাই মিলে কর্মও করেছি।  আর আজ সেই মেয়েটিকে দেখার সুযোগ হলো! বাবারে বাবা! মেয়েটার কি মাংস গা ভর্তি। কোন চাউলের ভাত খায় মেয়েটা? আমার গায়ে এত মাংস নাই কেন? মাংস থাকলে আজ লিজার্ড মহাশয়কে তো মুখে ভরে দিতে পারতাম সব। সুখেও ভরে দিতে পারতাম । 

পচীর  রানওয়ের মতো সমান বুকটা তখন কিছুটা না হয় উঁচু থাকতো। তার শুটকি মাছের মতন হাত –পাগুলোর  চামড়া টানটান থাকতো। গালে মুখে চর্বি থাকতো। ফেস পাউডার মাখলে তা সার্থক হতো। 

কিন্তু পচীর  কিছুই তো হলো না। এর মাঝেই অধ্যক্ষের ল্যাব থেকে প্রফেসর লিজার্ড বের হলেন। তার কথা শেষ। পচীকে নিয়ে এবার তিনি তার কক্ষে চলে যাবেন।  রত্নাকে চিনিয়ে দেবার জন্য  পচীকে নিয়ে  হাঁটতে হাঁটতে পিছন ফিরে তাকালেন। কিছু একটা বললেন। রত্না তাদের এসব কর্মকাণ্ড দেখে শুধু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। কলেজের ক্লাসরুমের সামনে এক প্রফেসর তার বগল-দাবা করে আনা,  তার হাঁটু অব্দি  লম্বা কোন মহিলার কানের কাছে মুখ নিয়ে  ফিসফিস করে কথা বলে  চলছে , আর তাদের  সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ছাত্রীকে দেখিয়ে দিচ্ছে। এই কর্মকান্ডগুলো যে তারা ঘটাচ্ছে তা  কেমন দেখায়, এ বিষয়ে তাদের হুঁশ কি কাজ করছে না? 

সব হুঁশ তারা নিমেষে যেন হারিয়ে ফেলছে। রত্না তাহলে সাধারণ ছাত্রী নয়!  রত্না হয়তো বা তাদের কোন এক গোপন গল্পের নায়িকা। 

এই ভাবনায় রত্নার বেশ আফসোস লাগলো। লিজার্ড সাপের মত পেঁচানো ভীষণ ছিপছিপে লম্বা একজন ব্যক্তি। কলেজে সে ব্যক্তিত্ববান ব্যক্তি। মুখে সবসময় নায়ক সুলভ সিগারেটের ধোঁয়া উড়েই চলছে। অমায়িক ব্যবহার । টের পাবার কোন উপায় নেই তার সাপের মতন লিকলিকে মানসিকতা। পাশে তার বগল দাবা করা আরো একটা তারই মতন শুটকি মাছ। শুটকির ভাগ্যে শুটকিই জুটে। যা তার ভাল লাগে না। তাই বিভাগের সুন্দরী ছাত্রী মরোক্কান সেই বেদুইন সুন্দরীর  কলার বোন, কোমরের বাঁক, শাড়ি পড়ার দিনে তার আঁচলের ফাঁক দিয়ে পেটের মসৃণ চামড়ার  নিচে নাভির  এক ঝলক  দেখে ফেলা , তার ভেতরের ফণাটাকে  হিসহিস করে  তোলে।  তখন লিজার্ডের শুধু ওই একটা কথাই মনে পড়ে - পচীর  সামনে পিছনের সমান শরীরখানা। আজকাল যত বয়স বাড়ছে তত  আর কেন জানি তার এসব ভালো লাগছে না। এমনকি মৌটুসীকে বাস্তবে হাতাতে না পারলেও, তাকে কল্পনা করে যে শুটকিকে ছুঁবে সে রুচিও  আর হচ্ছে না। প্রাক্তন স্ত্রী কলেজের  সবাইকে বলে গেছে  লিজার্ড  মহাশয় অক্ষম। একেবারেই অক্ষম। কিন্তু লিজার্ড  নিজে জানে সে কতটা সক্ষম। যদি মৌটুসীকে কায়দা করে একবার, তার কিলবিলে শরীর দিয়ে জাপটে ধরতে পারে, তাহলে তাকে পাটিসাপ্টার মতন করে এমন চাপ্টা করে দেবে, যে কেউ বলতে পারবে না  সে, অক্ষম।


স্বপ্ন - ২

প্রফেসর এমিলিয়া গর্ডন। 

সুইডেনের উপসালা ইউনিভার্সিটির পলিটিকাল সাইন্স -এর শিক্ষিকা। সুদর্শনা, সুবচনা, ব্যক্তিত্ব সম্পন্না, মনোমুগ্ধকর একজন প্রিয় মানুষ আমার। আজ তাঁর লেকচার আছে সেমিনার রুমে। বাইরের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ থেকে  বেশ কয়েকজন গেস্ট লেকচারার আসবেন তাদের ছাত্র ছাত্রী সহ। তাই মনে মনে কিছুটা শিহরিত আমি। আজ যেন নতুন ভাবে আমার প্রফেসরকে দেখবো। এত বড় মাপের সেমিনারে আজই প্রথম যাচ্ছি। 

ক্যাম্পাসের আলো ঝলমলে দিন খুব একটা পাওয়া যায় না। আজ সকালটা যেন অন্যরকম লাগছে। আসলে বসন্তের আগমনে প্রকৃতির চেহারা খুব দ্রুত পাল্টাতে শুরু করে।  মাঠ পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচার থিয়েটারের রিসেপশান লবিতে প্রবেশ করতেই  সাক্ষাত পেলাম এমা-র। এমা প্রফেসর গর্ডনের একমাত্র কন্যা।  দশ বছর হলো এবার তার। অথচ আমার সাথে তার ভীষণ ভাব। আর ভাব হবেই না কেন? পড়াশোনার বাইরেও যে আমাদের আরেকটা যোগাযোগ আছে। আমার পিতার চাকরীর সুবাদে আমারা আর এমার পুরো পরিবার ক্যম্পাসের কাছে একই  পাড়ায় বসবাস করি।  সেদিক থেকে বিচার করলে প্রফেসর এমিলিয়ার পরিবার আর আমার বাবা, মা পারিবারিক ভাবে পরিচিত। আমি যখন হাই স্কুলে সবে উঠেছি, তখন এমা-দের  প্রতিবেশী হয়েছি। এমা তখন ছোট্টটি। তার দুই ঝুটি নিয়ে হাসিমুখে খেলতে আসতো। পাড়ার সকল ছেলে মেয়েরা ঘুরতাম, বেড়াতাম। আমাদের পাড়ার সামনের পার্কে খেলার মাঠে কত আনন্দ আমাদের। তখন থেকেই এমা আর আমি যেন বিশেষ ভাবে কাছের বন্ধু হয়ে গিয়েছি। বয়সের তফাৎ থাকলেও তা কখনো আমার মনে আসেনি। আসলে মনের তো বয়স নেই। অন্য কারো সাথে মনের মিল হওয়াটাই আসল কথা। 

সেই ছোট্ট এমা তারপর স্কুলে ভর্তি হলো। দেখতে দেখতে কতকগুলো বছর পার হয়ে গেল। আমি কলেজ পাশ করে সরাসরি ইউনিভার্সিটিতে। ছোট থেকেই এমা-র আম্মুকে আমি আমার প্রিয় ব্যক্তিত্বের তালিকায় রেখেছিলাম। 

আর এখন? 

এখন তিনি আমার বিভাগে, আমার শিক্ষিকা। বা উলটো ভাবে বললে আমি এখন তাঁর ছাত্রী। 

সকাল বেলাটা একটু ধীর স্থির ছিল আজ। অন্য সকল দিনের চেয়ে আলাদা। কারণ আজ একটাই ক্লাস আর তা হলো সেমিনার অ্যাটেন্ড করা। তাই রিসেপশানের লবি পেরিয়ে একটু আগাতেই দেখি প্রফেসর গর্ডন আর এমা বসে আছে সামনের সোফায়। চারিদিকে  কাঁচের দেয়াল ফুঁড়ে আলো এসে পড়ছে সমস্ত সিটিং এরিয়াতে। এমার আম্মুকে ক্যাম্পাসের বাইরে, বাসায় দেখা হলে আন্টি বলে সম্বোধন করি। ডিপার্ট্মেন্টে অবশ্যই না। তবুও এমাকে দেখেই কিনা, ‘আন্টি’ সম্বোধন চলে এলো মুখে। ম্যাডাম দু' সপ্তাহ পরপর হোম ওয়ার্ক দেন তার সকল ছাত্র ছাত্রীদের জন্য। প্রশ্নগুলো এত কঠিন। মনে হচ্ছে পলিটিকাল সাইন্স শুধু নয়, এখানে যেন ইংরেজী সাহিত্যেরও কিছুটা ছোঁয়া আছে।  প্রথমটা সংজ্ঞা জানতে চেয়ে একটা প্রশ্ন। দ্বিতীয় প্রশ্নটা বুঝতে কষ্ট হচ্ছিল আমার।ম্যাডাম শব্দার্থ আলাদা আলাদা করে বুঝিয়ে দিলেন এত সুন্দর করে যে, আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম ম্যাডামের দিকে।

তারপর একটু সরে যেয়ে পাশে এসে  এমাকে বললাম, ‘ প্রশ্নগুলো লিখে রাখো প্লিজ। লিখেছ কি?’

কালচে নীল পেলিক্যান কালির ঝর্ণা কলমে গোটা গোটা অক্ষরে প্রশ্নগুলো লিখছে এমা।  অক্ষরগুলো সাজিয়েছে এমনভাবে যেন এমার হাত দিয়ে মুক্তো ঝরছে। প্রশ্ন বুঝিয়ে দিতেই সেমিনার হলে প্রবেশ করার সময় হয়ে এলো। 

প্রফেসর গর্ডন উঠে দাঁড়ালেন। 

সুইডিশ অরিজিন, ৬ ফুট মতন লম্বা, দোহারা গড়ন। আজ  তাঁকে কি যে সুন্দর লাগছে।   আজ বিশেষ লেকচার –এর দিন  বলে নয়। উনি বরাবরই সুরুচিসম্পন্ন। নিখুঁত, পরিপাটি ভাবেই নিজেকে উপস্থাপন করেন। পরণে থাকে কালো ভারী স্যুট, সাথে কোন উজ্জ্বল রঙের শার্ট। আমার সামনা সামনি ঠিক নয়, পাশ দিয়ে যখন দেখলাম উনি সোফা থেকে উঠে রওনা দিয়েছেন সেমিনার রুমের দিকে, তখন যেন তিনি অন্য এক ব্যক্তিত্ব। ধ্যানমগ্ন, চিন্তাশীল। নিজের ভাবনায় ডুবে গেছেন সম্পূর্ণ। চারপাশ তার কাছে এখন অচেনা। আমরা সবাই এখন তার কাছে অদৃশ্য। এক পা এগুতেই দেখলাম  আমার প্রিয় আন্টি, আমার শিক্ষক , প্রফেসর এমিলিয়া গর্ডন  তাঁর প্রস্তুতকৃত  লেকচার পরিবেশন করতে  শান্ত  ভঙ্গীতে  ধীর পদক্ষেপে হেঁটে যাচ্ছেন হলওয়ে ধরে ।   উনি উঠে দাঁড়াতেই আমি তাঁকে আপাদমস্তক দেখার সুযোগ পেয়েছি। এর পূর্বে তিনি কথার মাঝে উপস্থিত থাকলেও,   এত নিখুঁত ভাবে দৃশ্যমান ছিলেন না।

কালো স্যুট আর গাঢ় পারপেল -বেগুণী মিশ্রণের  উজ্জ্বল শার্ট  পরনে।  গৌরবর্ণ, প্রফেসর এমিলিয়া গর্ডন সুষমা মন্ডিত হয়ে  প্রবেশ করছেন সেমিনার রুমে। আমি আর এমা থাকবো দর্শকের সারিতে।

৩ 

এমাকে নিয়ে  পিছনের দিকে উঁচু চেয়ারগুলোতে বসতে গিয়ে বেশ অবাক হলাম। এমা যেন আরো ছোট্টটি হয়ে গেছে। এখন যেন সেই প্রথম দেখা চার বছরের টুক্টুক পায়ে হাঁটা এমা। এখন দেখছি সেই এমা-কে, যে আমাকে রাস্তার মাঝ দিয়ে হাঁটতে গেলে হাত ধরে টেনে কিনারায় নিয়ে আসতো আর বলতো, ‘বারবার রাস্তার মাঝে চলে যান কেন? রাস্তার মাঝ দিয়ে হাঁটতে হয় না তো।‘

আর আমি বুঝেই পেতাম না, খালি রাস্তার মাঝ দিয়ে হাঁটলে অসুবিধা কোথায়!

আজও বুঝি না।  

বুঝতে যে চাইও না। 

আমি চাই সেই ছোট্ট এমা আমাকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেক আমার চলার পথ। সারাটা জীবন যেন সে আমার চলার পথের সংগী হয়ে থাক। আর আন্টির প্রতিভা হবে আমাদের পাথেয় । ছোটদের স্নেহ করে কাছে টেনে নেয়া, অপরের প্রতি যত্নশীল হওয়া, আদর, ভালবাসা দিয়ে, বিপদে পাশে এসে সাহায্য করা – এই সব গুণের  অনন্য দৃষ্টান্ত আমার আন্টি, আমার প্রফেসর। 

প্রফেসর এমিলিয়া গর্ডন। 

ওনার ব্যক্তিত্ব আমাদের  কাছে আমাদের সমগ্র জীবনের একটা দিক নির্দেশনা। আমি ব্রত গ্রহণ করেছি এই আলোক উজ্জ্বল দিনে যে মহিমান্বিত রূপে আমি তাঁকে দেখেছি তেমনটাই যেন হতে পারি আমার জীবনে। কবে থেকে আন্টির সাথে আমার পরিচয়ের শুরু আমি জানি না। কারণ শুরু যখন আদি হয়ে দেখা দেয়, তাকে কোন সময় দিয়ে বাঁধা যায় না।

আমার স্বপ্নে আসা প্রফেসর  এমিলিয়া গর্ডন আমার প্রিয় আন্টি, আমার প্রিয় ব্যক্তিত্ব। 

এমার জীবনে তিনিই এমা-র অস্তিত্ব। কারণ  এমার অস্তিত্বের সূচনা তার মাঝ দিয়েই। আর আমার অস্তিত্ব তাঁর আলোকচ্ছ্বটায় । 

এমা  তাঁর সন্তান। 

আমি তাঁর সন্তানতুল্য । 

এই জীবনের শুরুতে আমাদের চলার পথে  তাঁকে পেয়ে সৃষ্টিকর্তার কাছে আমরা বিনীত ভাবে কৃতজ্ঞ।

............।



স্বপ্নের সময়ঃ  ৬ই মে  ২০২৬

সময় বিকাল সাড়ে তিনটা 

ব্লগে আমার ১৮ বছর পূর্তি

এমনি একদিন  ২০০৭ । অনলাইন   একটি ই- ম্যাগাজিন সম্পাদনার কাজ করি। অবনী অনার্য  পাকা লেখক। তার থেকে লেখা নিয়ে আমার ই- ম্যাগাজিন সমৃদ্ধ। যার  হ...