Friday, August 31, 2007

কাব্যের ঘোর

~~ অনাম্নী স্বাক্ষর  

বয়সটা তখন নিতান্তই ছোট। পা ছড়িয়ে কান্না জুড়লে আকাশ তাকে ছুঁতেই হবে। ওইযে মাঠের শেষে আকাশ নেমে আসে, দিগন্ত যায় ছুঁয়ে, ওইখানেতেই আকাশ ছোঁয়া যায়। সারাবাড়ীতে উঠলো ভীষণ সোরগোল। কেউ মুখ বাঁকায়, কেউ বা করে করুণা। তবে একটা ব্যাপারেসব্বাই একমত দাদুর আদরে  বাঁদর হয়েছেমেয়েটা। ছোট্ট পায়ে আকাশমুখো হয়ে এক পা এক পা করে পৌঁছে গেলি তুই যৌবনবেলায়। ফেলেআসা কিশোরীবেলা তখনও ডাকে দুপুরের নির্জন ক্ষণে। বৃন্দার জ্বোরো–কপালে হাতখানি  রেখে কতগুলো দুপুর পার করেছিলি?  দূরন্ত কাশির দমকে রক্ত উঠে গড়িয়ে পড়েছিল তোরহাতে। সেই রক্তের মধ্যে কিলবিল করা জীবাণুগুলো তোকে ভয় পেয়েছিল। কিছুতেই ভাঙ্গতেপারেনি তোর ফুসফুসের দুয়ার। শুধু প্রসারিত করেছিল হৃদয়ের অলিন্দখানি। আজও একটুএকটু করে চলেছে সেই প্রসারণ।

সপ্তদশী তখননায়িকার ঘোরে। চলতে ফিরতে মুখ দেখে নেওয়া মুকুরে। শরৎ কিম্বা রবির নায়িকাদের সঙ্গেমিল খুঁজে হয়রান। আর তারই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নায়কের আসা যাওয়া। কেউ বা গোরারআর্ধেক শারিরীক, কেউ বা শচীশের আর্ধেক মানসিক। পুরোপুরি হয় না কেউ। তবু তারই মাঝেআধাআধি মন দেওয়া – নেওয়া খেলা। কখনো মৌনবটের নীচে স্তব্ধ দুপুর নিরালায়।কখনও শ্যাওলার দুখঘেরা একলা পুকুরঘাটে। নির্জন কাকচক্ষু জলে নিজেরই মুখখানি দেখেভালবেসে ফেলা। আকাশের ডানামেলা গভীর ছায়ায় খেয়ালী পানকৌড়ির অকারণ ডুব। অথচ নায়কেরবৃথা মান অভিমান। প্রতিসৃত সাত রঙে রামধনু মন নিয়ে নিজেকেই ভালবাসা, ওরা শুধুআয়নার স্বচ্ছতা  নিয়ে অপেক্ষায় থাকে।সত্যিটা ঢাকা পড়ে মিথ্যের ফাঁদে। প্রেম ঘুরে মরে মদনের শরে। তবু আমূল বিধঁলো নাকোন শর তোর প্রাণে। ডুব দিলি তুই প্রেমসায়রে তবু মৃত্যু হলো না তোর। নিভৃত প্রাণমরণ কামনায় জারিত করে আপনাকে। আশ্লেষে স্পর্শ করার অঙ্গীকার নিয়ে ডুব দেয় অবুঝউদাসীনতায়। ও মেয়ে তোর বেলা যে পড়ে এলো জলকে চল। 

পরিযায়ীপাখি উড়ে যায় সময়ের ফেরে। সপ্তদশ কখন যে বিশের কোঠা পেরিয়ে যায়, যেতে যেতে দেখেযায় তোর মুখখানি। তখনও সারা মাঠ জুড়ে সবুজের সমারোহ। মহুয়া মাতাল মন খুঁজে ফেরেআপনাকে। রোদ্দুর শরীর ছায়া ছায়া মন, একটু সবুজ অলিন্দের খোঁজ। কস্তুরিমৃগ তুইপাগলপারা হে। 

মনের মানুষ খুঁজতে গেলিঅচিনপুরে তবু তার নাগাল পেলি নে। 

সময়টা তখনঅসময়ের গন্ডি পেরিয়ে যাবার পণ করে বসেছে, হঠাৎ দেখা হয়ে গেল সুজনের সঙ্গে। সু টাযদি হয় সুন্দর তবে জন অর্থে মানুষ। মানে পুরোটা জুড়ে একটা সুন্দর মানুষ। তবে ওই যেদেখার কথা বললুম ওইখানে আছে কিছু গোড়ায় গলদ। সুজন যে অশরীরী, তাকে কি শরীরে ধরাযায়? মন দিয়ে ছোঁয়া যায়। প্রেমজুরি তার ঝলকে উঠে মনের আবেগে। মারবি যখন মরবি তখন,তবু মরার কথা জানবি না। অথচ মেয়েটা সেইখানেই মরল। চোখের আলোয় দেখা হলো না শুধুশুনে শুনেই মরণ হলো চোখের বাহিরে।

প্রেম কিদেয়, বিনিময়ে কি বা চায়? সমস্ত প্রাত্যহিকতার বাইরে সে নিয়ে যেতে চায় বটে কিন্তুদামও সে কিছু ধরে। ব্যক্তিস্বরূপের পরীক্ষা হয় সেখানে।  সুজনের আয়নায় নিজেরই চিন–পরিচয়। নির্মেদ প্রেমে রাতভেজা শিশিরের স্পর্শ নিয়ে প্রেমের সংজ্ঞা ফাঁদলিমেয়ে। তবু তুই ঘ্রাণ নিলি নে শরীরে অবুঝ যন্ত্রণার। অস্ফুট চুম্বন স্ফুরণ পেল নাকোনদিন। অথচ ন হন্যতে তখনও আঁচড় কাটে ঠোঁটের কিনারায়। আলিঙ্গনের আকাঙ্ক্ষাপৃষ্ঠাবদ্ধ হয়ে যায় জীবনের পাতায়।

প্রকৃতির হাটেবাটে অনেকগুলো বসন্ত পার হয়ে আসে মেয়েটা।জীবনের পাতাগুলো ক্রমশ হলুদ। সেদিন রাতে আকাশ মেতেছে প্রলাপে। বর্ষার ঘনঘোর রাতকুহকে জাগিয়ে রাখে তোকে।  সহসা শরীর  মন্থন করে উঠে আসে অদম্য ইচ্ছা। একবার যাচাইকরে নিতে চায় নিজেকে। সুজনের প্রেমজুরিতে ঝঙ্কার ওঠে নিভৃতে।  থৈথৈ আকাঙ্ক্ষার ঘূর্ণিতে নিঃশব্দ বিগব্যাং ঘটেযায়। ক্রমশঃ প্রসারিত হতে থাকে ব্রহ্মান্ডের মতো। দূর থেকে আরো দূরে অশরীরী মন্থনে। ভেসে যায় যত সু যত কুআর সমাজের কঠিন বন্ধন। রাতের গভীরে নামে অঝোর বৃষ্টি। ভিজে যায় জীবন যৌবন অকারণ।গোপন প্রেম রাতের অন্ধকারে ঝাড়লন্ঠন জ্বালিয়ে দেয়। অশরীরী প্রেম তবু ছুঁয়ে যায়শরীরের কানায় কানায়। প্রেমের অলখদুয়ার খুলে কাব্য ওঠে ঝলকে। প্রেমজুরি বেয়ে উঠেআসে নতুন জগৎ, কাব্যের জগৎ।  

একসিন্ধুশরীরী আকাঙ্ক্ষা নিয়ে অকাল সন্ধিক্ষণ বিষ উদ্‌গিরণে বিহবল তবু মন্থনে অচঞ্চল। অবুঝপ্রেমের দারুণ দাহে বল্গাবিহীন তৃষ্ণা জ্বালায় পোড়ায় তবু সবুজাভ অব্যয়। অশ্রুরবৃষ্টিকাহিনী আঁচড় কাটে, ফোঁটা ফোঁটা হৃদয়ের গ্রন্থন তবু উদাসী অকারণ কাব্যের ঘোর।

মেয়ে তুই কাব্য করিস? চোদ্দটা আকাঙ্ক্ষাজুড়ে লাইন সাজাস। এরে তুই কাব্য বলিস? ছি ! হেতু দিয়ে জীবনখানা মাপ। অহেতুক কথাসাজিয়ে ধোঁয়াশা  লাগাস প্রাণে। লিখবি যদিখাড়া লাইনে লেখ। সমাজের সমস্যাটা বোঝ, তারপরেতে লেখ না কেন যত ইচ্ছে তোর। 

কাব্যের মোহ ভেঙে ভেঙেযায়। জীবনের সহজপাঠের পাতাখানি আবার উল্টে দেখা। কবি তো কেউ চায় না, সবাই যেনসমাজসংস্কারক! মিথ্যে হৃদয়, মিথ্যে হৃদয়ের আকাঙ্ক্ষা। অথচ আমার হৃদয় তোমার হৃদয়দিয়েই তো সমাজের হৃদয়খানি গড়া। 

ধুত্তোরিতোর নিকুচি করেছে আকাঙ্ক্ষায়। অ – হেতুবাদী হৃদয়মার্কা মতবাদখানা আস্তাকুঁড়েফেল রে মেয়ে। একটু বাস্তববাদী হ। নিজের ভেতর থেকে বেরিয়ে পৃথিবীটাকে দুচোখ মেলেদেখ্‌, কাব্যের জগতে বাজিমাৎ।

অমন অবুঝচোখে তাকাস কেন মেয়ে? আমিও বুঝি রে বিজ্ঞানের প্রথম সূত্রটা বাইরে থেকে আসেনি,এসেছে মানুষের ভেতরের জটিল আবর্তের উদ্‌ঘাটন থেকে। বাইরে থেকে কি কেউ যাত্রা করে? ভেতর থেকে যাত্রা করতে হয়। দেখিস নিজের ভেতরের জটিল আবর্তের জট খুলতে খুলতে আমরাএকদিন পৌঁছে যাব মানবতার দ্বারে। সেদিন তোকে ছেড়ে সমাজের অস্তিত্ব থাকবে না।সুজনের প্রেমজুরিতে কাব্য গেঁথে মেয়ে তুই পথে নামিস। গলা ছেড়ে তোর পেটেন্ট ছাড়িস ‘প্রেমজুরিতে প্রেম বাজেনা, প্রেমেতে বাজে প্রেমজুরি।’

Tuesday, April 17, 2007

অমিত্রার চিঠি


জানি আমি জানি সখি
যদি আমাদের দোঁহে হয় চোখাচোখি...

কে,কে বলে উঠলো অমন করে? 

আজও শুনতে পেলাম? কন্ঠস্বর অবিকল তার মত। 

কিন্তু এ কি সম্ভব? 

সুমন আসবেই বা কোত্থেকে আর কথাই বা বলবে কিভাবে? 

ও যে কোথাও নেই। ঘরের দুয়ার ছাড়িয়ে দূরের ঐ মাঠটা পেরিয়ে চেরি ফুলের বাগানে ঘেরা যে সমাধিস্থল সেখানেই তো সুমনকে রেখে আসা হয়েছে। সুমন এ ঘর ছেড়ে চলে গেল,আর আমার কি রইল? স্মৃতি। ওর কথা,ওর লেখা,ওর আঁকা ছবি,ওর কন্ঠে আবৃত্তি। রবিঠাকুরের মানসসুন্দরী পুরোটা কখনো পড়েনি। শুধু ঐ দুটো লাইন, তারপর একটু থেমে হেসে হেসে বাকী দুটো লাইন।

জানি আমি জানি সখি
যদি আমাদের দোঁহে হয় চোখাচোখি
সেই পরজন্ম পথে দাঁড়াবো থমকি
নিদ্রিত অতীত কাঁপি উঠিবে চমকি...

আমায় চিনবে তো ঠিক ঠিক,আমায় প্রশ্ন করতো অবাক করে তাকিয়ে। সেই প্রশ্ন মনে মনে ঘুরে ফিরতো বার বার। আমার হৃদয়ে আমার অন্তরে যদি থাকে তোমার জন্য খোঁজ তা জানার জন্যই বুঝি কবির এই চরণ দুখানির সৃষ্টি। তাই বলতাম পরজন্ম পথে আমি যে খুঁজে ফিরব তোমায়। 

সুমন কি তাতেই আত্মহারা? তাই আমায় ছেড়ে যেতে ওর বুঝি আর কষ্টই রইলো না। কেন যে বলেছিলাম, ওকে আমি খুঁজে নেব। এখন যে আর কিছুই বলার নেই। ওর কন্ঠস্বর বারবার ধ্বনিত হয়ে আমার মন ভরিয়ে দিতে আসে, যেন ওকে খুঁজে নিই।

প্রতি বিকেলে বারান্দায় বসি। খোলা মাঠের ওপারেই তো সুমন সমাহিত। সুমন নয়,ওর দেহটা। ও যে আমার কাছে কাছেই আছে সব সময়। আমায় ঘিরে তার আসা যাওয়া,আমার অনুভবে। বারোটি বছর কেটে গেছে ওর চলে যাওয়ার। একটু বারের জন্য তো টের পায়নি। একবারের জন্য মনে হয়নি আমার সুমন সশরীরে আমার কাছে আর আসবে না। এত ভালবাসায় ঘেরা আমি। ওর মায়াজালে আচ্ছন্ন আমি। আমার প্রশান্তি, পূর্ণতা সব দিয়ে যেন ও আমায় ঘিরে রেখেছে। দুষ্টুমি করে মনে করিয়ে দেয়,

জানি, মনে হবে মম,
চিরজীবনের মোর ধ্রুবতারা- সম
চির পরিচয়- ভরা ওই কালো চোখ।
আমার নয়ন হতে লইয়া আলোক,
আমার অন্তর হতে লইয়া বাসনা
আমার গোপন প্রেম করেছে রচনা
এই মুখখানি। তুমিও কি মনে মনে
চিনিবে আমারে?

আমি না চিনলে আর কে চিনবে তোমায় সুমন? সেই বারোটি বছর আগে, তোমায় কি দেখেছিলেম তখনো? শুধু তো চিঠি লিখে উত্তর দেয়া,পেন ফ্রেন্ড হিসেবে পরিচয়। তারপর কত কথা। তুমি ছিলে ছায়া সুনিবিড় ইয়র্কশ্যায়ারের একটি গ্রামে। আর আমি,মন্ট্রিয়লের জনবহুল একটি অ্যাপার্টমেন্টে। আমার সমস্ত দিন,সমস্ত সন্ধ্যা কেটে যেত ভাবতে ভাবতে তুমি কেমন ভাবে ভালবাসো এত নির্জনতা। সারাদিনে তোমার ওখানে একটি পথিকের দেখা পাওয়া ভার। আর আমার এখানে জনাকীর্ণ পরিবেশে তোমার দেখা পাওয়া ভার। কথা যতই বলি না কেন কখনো ভাবিনি আমি তোমার প্রতি অনুরক্ত হব। এ আমার ভাবনারও অতীত ছিল যে! মন দেয়া কাকে বলে জেনেছি গল্প পড়ে। গল্পের নায়িকারাই পারে ও কাজটি করতে। আমার দ্বারা হবে না কখনোই। আর সেই আমিই কিনা তোমায় অবশেষে। আর তখনই তোমার জীবনের ঘন্টা বেজে উঠল। এমন ভাবেই কি ঠিক করে রেখেছিল নিয়তি? নিয়তি কি জানতো যে তোমার সময় হয়ে এসেছে? তাই চলে যাবার আগ দিয়ে নিয়তি তোমার জীবনের সকল পূর্ণতাকে একত্র করে তোমায় দিতে চেয়েছে। আর সেজন্য নির্বাচিত হয়েছিলাম আমি। আমি নির্দিষ্ট হলাম সেই মেয়েটি হিসেবে যে হবে তোমার মানসসুন্দরী।

আমার এতো সৌভাগ্য। তুমি বল,এ যেন তোমার সৌভাগ্য। তাই এত দূরত্বের বাধা না মেনে চলে এলে আমার কাছে। এলে তো এলে।

একেবারেই এলে। 

আমায় ভরিয়ে দিয়ে শূন্য করে তারপর চলে গেলে।

সেই দিনটি এখনো এতো সুন্দর। তুমি আমার ঠিকানা চাইলে। আমি ঠিকই বুঝেছি তুমি আমায় দেখতে চাও। কিন্তু কবে আসবে তা বলতে চাওনি। আমিও জানতে চাই নি। একদিন বিকেলে দরজায় নক্। দরজা খুলে দেখি খুব সুন্দর একটি মানুষ আমার সামনে। আমি তো না জেনেই সেদিন নীল শাড়িটি পরেছিলাম। নাকি আমার মন জেনেছিল? তোমায় দেখতে দেখতে সবটুকু সময় আমার নিমেষেই যেন শেষ হয়ে গেল। সব কথা যেন বলা হয়ে গেল। বারবার তবুও তোমার অনুরোধ,মিত্রা কিছু বল। 

দশটি দিন যেন স্বপ্নের মত। তোমার দু’সপ্তাহের ছুটি। আবার চলে যেতে হবে ফিরে। এত কম সময়ে আমার সব কথা অনুভবে নিয়েছিলে তুমি। আমি তো বলিনি কিছুই। সেই ক'দিনে শহরের আনাচে কানাচে ঘুরেছ আমায় নিয়ে কত সন্ধ্যায়। 

এখনো সন্ধ্যা নামে,আমি তো কোথাও যাই না ঘুরতে। সময়ের ভারে ক্ষয়ে গিয়েছি অনেক। নিজেকে বেশ জড় মনে হয়। আবার তুমি যখন আসবে তখন আমার প্রাণ সঞ্চার করে দিও সুমন। তোমার বিনিময়ে নয়,তাহলে যে আবার তোমায় হারাবো।

যাবার দিন হঠাতই দুর্বল বোধ করে অসুস্থ হয়ে পড়লে। ডাক্তার, অ্যাম্বুলেন্স,হাসপাতাল করতে করতে তুমি শেষ। আর তুমি নেই। এখানকার মাটিই কি তোমায় টেনে এনেছিল? 

বড় ভাগ্যবতী মনে হয়েছিল আমার এইভেবে,আমার ভালবাসা তোমায় এনে দিয়েছে আমার কাছে। কিন্তু এভাবে?

আমি প্রতি বিকেলেই বারান্দায় বসি। খোলা মাঠের ওপারে সবুজ গাছের সারি। চেরি ফুলে ছেয়ে আছে এখন। ওখানে তুমি রয়েছ। আকাশে বাতাসে তোমার সুবাস। জীবনের সমাপ্তিই কি অনুভবের সমাপ্তি?। মন বলে তুমি আমায় অনুভব করো আর তাই আমার বেঁচে থাকা। তোমায় না পাওয়ার মাঝে এ যেন আমার বেশী করে পাওয়া।

-অমিত্রা

২০০৭


Wednesday, February 21, 2007

চিত্রনাট্যঃ রোদ্দুর মাখি


চরিত্রঃ

রমা (২৫ বছর)

সৌমেন (৪০ বছর)

দিপ্তী (বালিকা ৫ বছর) 

আবৃত্তিকার (কন্ঠ শুধু)

প্রথম দৃশ্য

অলস দুপুর । চারিধিক নিস্তব্ধ । কড়া রোদ বাইরে। টানা বারান্দা। সময় দুপুর ২টা বা ৩ টা। বারান্দার কোণে একটা হেলান দেয়া বেতের চেয়ার। আরেকটি ছোট আকারের ডাবল্ সোফা। সোফার পাশে ছোট টেবিল। পত্রিকা রাখা ওতে। একটা সেন্টার টেবিল। ফুলদানিতে ফুল সাজানো। হাতের এমব্রয়ড্রিবা ক্রুশের কাজের ম্যাট রাখা ফুলদানীর নিচে।

দ্বিতীয় দৃশ্য

একটি ঘর থেকে দেখা যাচ্ছে রমা বসে আছে বারান্দায়। সেলাই করছে। কি সেলাই করছে না। কিন্তু বেশ মনযোগের সাথে সেলাই করছে। ঘরটি একটি স্টাডি রুম। বইয়ের শেলফ্ গোটা তিনেক। বই ভরা। পড়ার টেবিলে কম্পিউটার মনিটর আছে । ঘরের দেয়ালে রবি ঠাকুরের মাঝারি আকারের পোর্ট্রেট ।

পোশাক

তাঁতের ইস্ত্রি করা শাড়ী পড়া, হাল্কা এক রঙের। মাঝারি পার । রমা মাঝারি উচ্চতার মেয়ে, লম্বা নয়। শাড়ীর পাড়ে ডিজাইন আছে। শাড়ী পার্ট করে পরা নয়, একটু অগোছালো করে পরা।

সাজ

চুল খোঁপা করা। খোঁপায় ফুলের মালা জড়ানো থাকতে পারে। ছোখে কাজল নয়, মাস্কারা থাকবে।


তৃতীয় দৃশ্য

সৌমেন এসে রমার কাছে দাঁড়ালো। রমাকে দেখছে। এবার রমাকে বিস্তারিত ভাবে দেখানো আর ধ্বনিত কন্ঠে আবৃত্তি ।

কন্ঠ (আবৃত্তি )

'হয়তো জামায় বোতাম লাগাচ্ছিলে
দুপুর বেল বসে নিজের ঘরে
ফাঁকা বাড়ী নির্জনতায় ভরা
শব্দ শুধু বাথরুমে ফোঁটা ঝরে'

তৃতীয় দৃশ্য (চলবে)

রমাকে বিস্তারিত দেখানো। নিচ থেকে শুরু। শাড়ীর কুঁচিগুলো একের পর এক সাজানো পায়ের কাছে। ধীরে ধীরে ক্যামেরা উঠবে উপরে। কোলের কাছে এসে ক্যামেরা থামবে। কোলে একটা শার্ট, সাদা রঙের। শার্টে বোতাম লাগাচ্ছে রমা।

সৌমেনের কন্ঠ শুধু : রমা

চমকে উঠলো রমা। তাকালো মুখ তুলে, তার সামনে দাঁড়ানো ব্যাক্তিটির দিকে। দর্শক, রমার চমকে এবং অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকার expression দেখল।

সৌমেনের কন্ঠ শুধু ঃ কি করছো রমা?

দৃশ্য - ৪

দর্শক এবার সৌমেনকে দেখবে সামনা সামনি।

রমার পাশ দিয়ে সাইড টেবিলের সামনে সৌমেন রমার দিক করে দাঁড়ানো। আপাদমস্তক সৌমেনকে দেখানো হবে প্রথমে । চল্লিশ বছরের মাঝারি স্বাস্থ্য, লম্বা, চোখে পুরু চশমা। গম্ভীর কিন্তু স্নেহময় কন্ঠের অধিকারী। রমার দিকে তার দৃষ্টিতে আবেগ। হঠাৎ এসে রমাকে চমকে দিয়ে বেশ মজা পাচ্ছে। হাত দুটো পিছনে, একটু ঝুঁকে দাঁড়ানো।

কন্ঠ রমাঃ কই, কিছু না তো।

কন্ঠ সৌমেনঃ কিছু না। (বিরতি)  সত্যি ?

রমাঃ হ্যা (অবাক হবার সুরে)

সৌমেনঃ কিভাবে?

হঠাৎ করে হেসে ফেলল রমা। দৃশ্যটি খুব উপভোগ্য হতে হবে দর্শকদের কাছে। এখানে দর্শকদের ভালো লেগে যাবে রমাকে। এখন রমা আর সেলাই করছে না। শার্টটা কোলের উপর ফেলা।

কন্ঠ রমাঃ নাহ্ ! মানে কি আর করবো। একটু সেলাই (বিরিতি) তোমার শার্টটা । (বিরিতি)  বোতামটা লাগাচ্ছিলাম।

কন্ঠ সৌমেনঃ আর?

রমাঃআর কিছু না।

সৌমেনঃকিছু ভাবছিলে না?

আবার রমার হাসির ঝলক।

রমাঃ(চিন্তিত স্বরে ) ম্... জানি না (মাথা অবনত, লাজুক বিনম্র )

সৌমেনঃ আমি জানি

রমা অবাক হয়ে মাথা তুলে তাকালো সৌমেনের দিকে।

রমাঃ(কন্ঠে বিস্ম য়) কি?

সৌমেনঃ যা ভাবছিলে তাই জানি।

রমাঃ কি বলতো?

সৌমেনঃ ভাবছিলে (বিরতি) আমি কখন ফিরব।

রমা সৌমেন দুজনেই হেসে ফেলল। (পাশ থেকে দেখান হবে দৃশ্যটি ) এক সাথে দুজনা দুজনের নাম ধরে ডেকে উঠলো। অবাকও হলো। তারপর দুজনে চুপ।

রমাঃকি বলছিলে, বল।

সৌমেনঃতুমি বল।

রমাঃসৌমেন তুমি বল।

শ্রোতা এবার প্রথম শুনবে সৌমেনের নামটি রমার কন্ঠে ।

সৌমেনঃ কিসের শব্দ ? টুপ টুপ

রমাঃ জল পড়ছে।

সৌমেন পাশে এসে বসলো রমাকে ঘেঁষে। হাত কোলের ওপর। রমার দিকে ঝুঁকে বলল,

সৌমেনঃ আর কোথাও জল পড়ছে না?

এ সবটুকু রমার দিক থেকে দেখান শেষ হলে সৌমেনের দিক থেকে রমাকে দেখানো হবে। রমা অবাক হয়ে সৌমেনের দিকে তাকাবে। রমার ক্ষণিক ক্ষণিক অবাক হয়ে যাওয়াটা দর্শকদের ভাল লাগাতে হবে।

রমাঃ নাহ্ তো। (বিরতি) আর কোথায় জল পড়বে?

সৌমেনঃ তোমার মনে। (কন্ঠে আবেগ)

রমা হেসে ফেলল, লজ্জা অবনত মুখ।

রমাঃ আমার মন?

সৌমেনঃ হ্যা তোমার মনে। আমি যে শুনতে পাচ্ছি। জল প্রপাতের শব্দ ।

রমার বিস্ময়ে সৌমেনের দিকে তাকিয়ে থাকা। যেন সৌমেন ঠিকই ধরে ফেলেছে। সৌমেনের মুখে হাসি।

দৃশ্য -৫

সময়টা সকাল ১১টা। রমা বসে আছে বারান্দায়। গালে হাত। চেয়ারের হাতলে ভর করে বসে আছে বেতের চেয়ারে। ভাবছে আনমনে। এটাও পাশ থেকে নেয়া।

পোশাক

হাল্কা এক রঙের তাঁতের শাড়ী। চুল খোলা।

কন্ঠ (বালিকা) ঃ মা

দৃশ্য -৬

রমা চোখ মেলে তাকালো পাঁচ বছরের মেয়েটির দিকে । রমার চোখ মেলে তাকানো দর্শক দেখবে। চোখের দৃষ্টি হতে হবে প্রশান্তিময় ও স্নেহভরা ।

সজ্জাঃ চোখের সজ্জা খুব সচেতন ভাবে করতে হবে। এবার কাজল থাকতে পারে, মাস্কারা অবশ্যই। 

দৃশ্য -৭

রমা যার দিকে তাকালো এবার তাকে দেখান হবে। পাঁচ বছরের মেয়ে, ফ্রক পড়া । দুই বেণী বা দুই ঝুটি। এক বেণী বা এক ঝুটি নয়।

কন্ঠ (দিপ্তী ):মা (গলায় উৎসাহের ছোঁয়া), একটা জিনিস দেখবে ?

রমাঃ কি রে দিপ্তী

আঙ্গুল তুলে ঘরের কম্পিউটারের মনিটর দেখাল।

দিপ্তীঃ আমার আঁকা ছবি।

রমাঃ কখন আঁকলি রে মা, এ ছবি।

দিপ্তীঃ আজ সকালে, একটা গাছ। দূরে ঝলমলে রোদ্দুর ।

রমাঃ তোর্ ঘরজুড়েই যে রোদ্দুর ।

দৃশ্য -৮

রমা উঠে প্রবেশ করবে ঘরে। ঘর থাকে দেখান হবে। পাশে দিপ্তী । রমা কম্পিউটারের সামনে এসে দাঁড়াবে। দর্শকরা এবার স্ক্রিনে তার আঁকা ছবিটা দেখবে।

দৃশ্য - ৯

রমা মাথা ঘুরিয়ে জনালার দিকে তাকাবে। জানালা ঠিকরে পড়ছে রোদের আলো, সমটা সকাল। রমা জানালার কাছে এসে দাঁড়াবে। পাশ থেকে রমাকে পুরো দেখিয়ে মুখটা দেখান হবে। রমা জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। আবৃত্তিকারের কন্ঠে ধ্বনিত হবে

কন্ঠ (আবৃত্তিকার)

'হয়তো হঠাৎ পাশের ঘরে উঁকি 
জেগে উঠলো হাসি তোমার ঠোঁটে 
গোটা ঘর জুড়ে রোদ্দুর ঝলমলে 
দূর থেকে ছোঁড়া উষ্ণতা ফুটে উঠে'

দৃশ্য - ১০

সৌমেন এসে রমার কাছ ঘেঁষে রমার পিছনে এসে দাঁড়াবে। দর্শ ক তা দেখবে। সৌমেনের হাত প্যান্টের পকেটে। 

দৃশ্য - ১১

রমার কানের কাছে মুখ নেবে সৌমেন, যা দর্শক দেখবে রমার সামনের কোণ থেকে। দর্শক দেখেবে সৌমেনের মুখ, রমার কানের কাছে।

সৌমেনঃ জানালাটা খুলে দিই।

দৃশ্য - ১২

রমা কাঁধ ফিরে সৌমেনকে দেখবে যা রমাকে সৌমেনের পাশ থেকে দেখান হবে।

সৌমেনঃ অরণ্য জুড়ে ফাগুনের আঁকা আঁকি (বিরতি)। মন কি বলছে জানো?

রমাঃ কি?

সৌমেনঃ সারা গায়ে আজ ঝলমলে রোদ মাখি

দৃশ্য - ১৩

রমা ঘুরে দাঁড়ালো সৌমেনের দিকে। মাথা অবনত।

দৃশ্য -১৪

দর্শক দেখবে সৌমেন তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রমার দিকে। প্রচন্ড আলোর ছটা দৃশ্যমান হবে। সৌমেন রমা আলোর ছটায় ধীরে ধীরে অদৃশ্য হতে থাকবে। আবৃত্তিকারের কন্ঠ ধ্বনিত হবে।

কন্ঠ (আবৃত্তিকারের )

'বাতাস কি আজ একটু শিরশিরে 
অরণ্য জুড়ে ফাগুনের আকাআকি 
মন কি বলছে জানালাটা খুলে দিয়ে
সারা গায়ে আজ (বিরিতি) ঝলমলে রোদ মাখি।'

মূল কবিতার শেষের লাইনটিতে প্রশ্নবোধক চিহ্ন আছে। ওভাবে নয় বরং প্রশান্তির ছোঁয়ায় শেষ লাইনটি উচ্চারিত হবে।

সমাপ্ত

............

মূল কবিতা

রোদ্দুর মাখি /রানা পাল

হয়ত জামায় বোতাম লাগাচ্ছিলে 
দুপুরবেলা বসে নিজের ঘরে 
ফাঁকা বাড়ি নির্জনতায় ভরা 
শব্দ শুধু বাথরুমে ফোঁটা ঝরে

দূর থেকে ছোঁড়া উষ্ণতা ফুটে ওঠে
হয়ত হঠাৎ পাশের ঘরে উঁকি 
জেগে উঠল হাসি তোমার ঠোঁটে 
গোটা ঘর জুড়ে রোদ্দুরে একাকার 

বাতাস কি আজ একটু শিরশিরে 
অরণ্য জুড়ে ফাগুনের আঁকাআঁকি 
মন কি বলছে, জানলাটা খুলে দিয়ে 
সারা গায়ে আজ ঝলমলে রোদ মাখি?
২০০৭

জীবন যেন স্রোতের মাঝে ভাসমান দ্বীপের মতো

  ১৯৮৪ সাল। স্কুলের অফিস রুমে গিয়েছি বেতন দেবার জন্য। লাইনে অপেক্ষা আমি আর আমার লাল ঝুটি বন্ধুটি। আমাদের খুঁজে খুঁজে ঐ ভীড়ের মাঝে পুষি এলো। ...