বাবা ছেলের এক রা...



রত্নার বিয়ে হয়েছে আজ চার দিন। নতুন বাড়ি, নতুন ঘর, নতুন শ্বশুরবাড়ি, নতুন বর। ৭ই নভেম্বর ১৯৯৫। দিনটি ঝকঝকে সুন্দর। হালকা শরতের ছোঁয়া। সবকিছু ঝলমলে। নতুন জায়গায় এসে রত্না বেশ খুশি। আবার কেন জানি একটু হাঁপিয়ে উঠছে মাঝে মাঝে। কারণ সে জানে না। তবে কেমন জানি তার নতুন বরটিকে বেশি শান্ত আর বেশি চুপচাপ মনে হচ্ছে। নতুন নতুন শাড়ি পরে, গয়না পরে, হাত ভর্তি সোনার চুরি পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে সারা বাড়িময়। নতুন বউ পেয়ে সবাই খুশি। বড্ড খুশি। রত্নারও ভালো লাগছে সবকিছু । শুধু খটকা একটা জায়গায়, বরটি যেন কেমন! খুব বেশি শান্ত। সুশ্রী চেহারার মাঝারি ধরণের তিরিশ ঊর্ধ  হয়নি এখনো। মায়া ভরা মুখশ্রী। ভীষণ ভীষণ শান্ত এবং চুপচাপ। মাঝে মধ্যে দুই একটা কথা হয়তোবা বলে। 

আজ সন্ধ্যায় বরের কলিগরা এসেছেন বাসায় নতুন বউ দেখবে বলে। আদিব ছুটি নিয়েছে সাত দিনের। নতুন বিয়ে তো! তবে হানিমুনে যাবার কোন প্ল্যান সে করেনি এখনো। হয়তোবা করবে। তখন হয়তোবা আবারো ছুটির দরখাস্ত করবে তার বসের কাছে। তার বস মহাশয় খুবই আন্তরিক। তার খুব খেয়াল রাখে। আদিবের বাবা কোনো না কোনো ভাবে তার বসকে খুব খুশি করে দিয়েছে। আর সেজন্যই বোধহয় সেই বসও আদিবের উপর খুব খুশি। উনিও আসতে চেয়েছিলেন আজ সন্ধ্যায়। কিন্তু আদিবের সমবয়সী তিন কলিগ এসে হাজির। কিন্তু তিন বন্ধু আসছে বলে রত্না খেয়াল করে দেখলো আবিদুর ও তার বাবা খুবই বিরক্ত। মোটেই খুশী না।

রত্না তাদের সাথে দেখা করল। কথা হলো, গল্প হলো। অনেক অনেক দিন পর রত্নার যেন মনে হলো সে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে। এই চারদিন কি তাহলে চুপ থাকতে থাকতে এক বন্দি দশায় পড়েছিল রত্না? 

আজ অতিথিদের সাথে গল্প শেষে ওর মনে হচ্ছে যেন কত কতদিন সে কথা বলে না। ও যেন এক বন্দিশালায় বন্দি। কিন্তু বাড়িতে তো সকলেই আছেন। সকলেই মিশুক। মিশছে কথা বলছে। উপরের তলায় থাকেন শ্বশুর শাশুড়ি। তার উপরতলায় থাকে তার ননাস। স্বামীসহ সাত বছরের একটি কন্যা সন্তান নিয়ে। সবাই খুবই মিশুক। কিন্তু রত্নার কিসের এত নিঃসঙ্গতা? ছেলেটি কথা বলে না তাই। কিন্তু কেন কথা বলে না? কেন ছেলেটি এত চুপচাপ? যদিও বা ছেলেটি দু’ একটা শব্দ উচ্চারণ করে, কিন্তু খুব নিচু স্বরে। অস্বাভাবিক রকমের শান্ত, নম্র এবং অসম্ভব রকমের ভালো। একটু ভাবুক ভাবুক ভাবও আছে। নিজে নিজে কি যেন ভাবে সারাক্ষণ সিলিং এর দিকে তাকিয়ে। দু হাতের আঙ্গুল ধ্যানের ভঙ্গিতে উপরের দিকে রেখে সে তাকিয়ে থাকে সিলিং এর দিকে মাথাটা বালিশে রেখে । সারাক্ষণ।  রত্নাকে কেউ যেন মনে করিয়ে দেয় এক ধ্যান মগ্ন ঋষি বা একজন অত্যন্ত ভাবুক সাইন্টিস্ট। হতে পারে সাক্ষাৎ আইনস্টাইন। বর যদি আইনস্টাইন হয়েই থাকে তাহলে তো তার থেকে গর্বের আর কিছুই হতে পারে না। স্বামী যেন এইমাত্র একটা সূত্র আবিষ্কার করে ফেলবে। 

আজ খেয়াল করে দেখল রত্না তাদের দ্বিতীয় তলায় থাকার আয়োজন করা হলেও এই চারদিন আগেও ছেলেটির থাকার আস্তানা ছিল তার বাবা-মায়ের সাথে অপরতলায়। তার কাপড়-চোপড় সব ওখানেই রয়ে গেছে ওয়ারড্রোবে। রত্না কাপড় চোপড়গুলো আনতে গেলে বরকে সাথে নিয়েই গেল। কারণ বাড়ির সবকিছু তো এখনো চেনা হয়ে ওঠেনি। খুব নরম কন্ঠে আবিদ দেখিয়ে দিল ওয়ারড্রোবটা কোথায়? রত্না খুলে দেখে জিজ্ঞেস করে বলল, কোনগুলো তোমার কাপড়। আবিদুর বলল, সে জানে না। সে বলল, এখানে যত কাপড় আছে সবই তার এবং তার বাবার। অর্থাৎ তার বাবার এবং তার কাপড় জামা অধোবাস মানে  আন্ডারওয়ার সবকিছু এক জায়গাতেই থাকে। তখন রত্না বেশ একটু অবাক হয়েই বললো,’তুমি চেনো না কোনগুলো তোমার কাপড়? আমি কোনগুলো নিব তাহলে?’

আমতা আমতা করে খুব মাথা নিচু করে নিচু স্বরে আবিদুর বলল, না সে চিনে না। তাহলে এখানকার কাপড় চোপড় অধোবাসগুলো যা সে ব্যবহার করে সেগুলো তারও আবার তার  বাবারও। মানে আবিদুর তাহলে  জানে না তার বাবার টা কোনটা আর সে কোনটা ব্যবহার করছে এবং সেটা আদৌ তার বাবার কি না। 

রত্নার বেশ খটকা লাগে। শুধু একটা কথাই মনে হয়, অধোবাস যদি তার বাবার আর তার একই হয়, তাহলে কয়েকদিন পর তো তার বাবা বলবে যে বউও তাদের দুজনের। ছেলের বউকেও নিজের বউ মনে করতে কোন অসুবিধা হবে না। রত্না ভেবে দেখলো চারদিন আগে সেই বাসর রাতের দরজার ওপাশে আবিদুরের বাবা মানে তার শ্বশুরমশাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার পুত্রবধুকে এক দৃষ্টিতে একভাবে দেখছিল।  অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল বলে ব্যাপারটা রত্নার চোখে পড়েছিল। রত্না ভাবছিল তার শ্বশুর ওভাবে দরজার কোনা বরাবর পাশের ঘরটিতে দাঁড়িয়েই বা আছেন কেন আর তার দিকে এভাবে তাকিয়েই বা আছেন কেন! কি দেখছেন তিনি?  রত্নাকে দেখছেন? আর কেন এই সময় তার ছেলের কোন পাত্তা নাই? ছেলের তো আগমনের কোন নমুনাই দেখা যাচ্ছে না। বাড়িতে মহিলা আছে তিজন। আবিদুরের মা, বোন আর একটু খলবলে টাইপের চঞ্চলা প্রকৃতির, স্বামী পরিত্যক্তা খালাতো বোন।  মেয়েটি আবিদুরের সমবয়সীই হবে। রত্না ভাবলো এই তিনজন মিলে আবিদুরকে শল্যা দিচ্ছে কিনা যে, কিভাবে আজ বাসর করতে হবে। তাই আসতে তার এতো দেরী হচ্ছে।  

দীর্ঘ অপেক্ষার পর আবিদুরের ঘরে প্রবেশের পথের দিকে তাকাতেই  রত্না দেখল আবিদুরের পরনের চুরিদারের কারণেই দেখা যাচ্ছে তার ধণুকের মতো বাঁকা আকৃতির পা। অনেকটা রিকেটস্ রোগীদের যেমন হয়। সেই পা ফেলে ফেলে আবিদ ঘরে প্রবেশ করছে। আবিদুর আসার পর পরই শ্বশুর প্রস্থান গ্রহণ করলেন। 

লাজুক আবিদ তারও অনেকদিন পর রত্নাকে বলেছিল যে, জন্মের সময় তার পা দুটো উল্টো ছিল। 

জ্বীনদের পা উল্টো থাকে – শুনেছিল রত্না। 

এ ছেলে জ্বীনে ধরা না তো? নাকি স্বয়ং জ্বীন? 

ফেরেশতাও হতে পারে, কে জানে ! এমন অমায়িক, নির্মল চিত্তের অধিকারী, বোকার মত সরল যে, কে জানে ফেরেশতা কিনা ।

………

৩১/১০/২০২৫
আরো গল্প -
স্টিকি ওরফে কাঠি বেগম
কাঠির কোপ
অম্বা যখন ননাস
আঁচিল

পান্ডা

 

সুমনার  দুইজন সহপাঠী ছিল বদিউল আলম বদি আর সাজু।  ডাক নামে তো তাদেরকে ক্লাসে টিচাররা সম্বোধন করতেন না, কিন্তু কোন না কোন ভাবে সুমনা জানতো যে তার ওই সহপাঠী বন্ধু দুটির নাম বদি আর সাজু।  তারা তাদের হরিহর আত্মা। আর তা না হলেও খুব কাছের তো বটেই। পাড়াতে  না হলেও ক্লাসে তারা দুজনেই একটু পান্ডা প্রকৃতির। সেই ১৯৮০ সালের কথা। সুমনা চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ে। তার স্পষ্ট মনে আছে তার ক্লাসেরই ছেলে দুটির কথা। কারণ স্কুলটি চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত কো-এডুকেশন ছিল। পঞ্চম শ্রেণী থেকে ছেলেরা আলাদা স্কুলে চলে যেত। আর মেয়েরা ম্যাট্রিক পর্যন্ত স্কুল সমাপ্ত করতো।

বদিউল তার বন্ধু সাজু  কখনো পান্ডাগিরি দেখায়নি কারোর সাথে। তবে সাজুর হাঁটা চলা ছোট থেকেই একটু মাস্তান টাইপের ছিল। আরেকটু বড় হয়ে গলির মোড়ে যেয়ে মাস্তানি করেছে কিনা পরবর্তীতে, তা সুমনা আর জানতে পারেনি। তবে গলিতে থাকলে ১৪/১৫  বছর বয়স থেকে ওভাবেই চলতে ফিরতে হয়; বেঁচে থাকার জন্য। না হলে গলির যে পরিবেশ, সে পরিবেশে টেকা দায়।  আর চলায় ফেরায় ১৪/১৫  বছরের ভাব  যদি বছরেই প্রকাশিত হয়, তাহলে সেই বাচ্চাটি একটু তো নয়, অনেক অনেক পাক্কু।

তবে বদিউলকে ওই নয় বছরে কখনোই মনে হয়নি যে তার শিশু সুলভ আচরণ আছে। জীবনের যে জটিলতার মাঝে সে বেড়ে উঠেছিল, তাকে দেখে সুমনার সবসময় মনে হতো, বদি তার সহপাঠী হলেও তার সমবয়সী যেন নয়। বদিউল যেন একটা আস্ত বড় মানুষ। আব্বু আম্মুদের মত। বদিউলের মায়ের তখন থেকে আরেকটা সুখ্যাতি ছিল বাংলাদেশের কালচারের পরিপ্রেক্ষিতে। তিনি ছিলেন ধূমপায়ি একজন মহিলা। বদির বড় বোনটি ছিল সুমনাদের থেকে বছর চারেকের বড়। বিদেশীদের মত দেখতে বলে সুমনা সেই আপাটার দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতো। অত ছোটবেলায়, তখন পাঁচ বছর হবে সুমনার, মনে হতো ওই আপাটা যেন মাত্র বিদেশ থেকে এসেছে। আসলে কোথা থেকে কিভাবে বদিউলেরর মা এই সন্তানটি এনেছিল, তা ওই পাড়ার কেউই জানতো না। আর ছোট বয়সে সুমনার তো এসব কথা জানার প্রশ্নই ওঠে না। তবে হ্যা, বড় হয়ে জানতে পেরেছে। আমাদের দেশের মানুষ তো শংকর জাতি। অনেক বাচ্চাই তো আছে  সাদাদের মত। বিশেষ করে ফ্রেঞ্চদের মত হয় দেখতে। তেমনই সুন্দর ছিল আপাটা।

একদিন অসুস্থতার কারণে সুমনা স্কুলে যেতে পারেনি। তার বাবা, বদিদের বাসার নম্বর ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘ক্লাসের পড়াটুকু ওর কাছ থেকে জেনে নাও।সুমনার কেমন জানি অস্বস্তি লাগছিল কিন্তু অত ছোট বয়সে কি ভাবে তার বাবাকে সে বুঝাবে তার অস্বস্তির কথা! তাই সে বুঝতে পারছিল ছিল না। বাধ্য হয়েই বদিউলেরর কাছ থেকে ফোনে পড়া টুকে নিল। ক্লাস ফোরের হোমওয়ার্ক। 

পরের দিন ক্লাসে গেলে সাজু এলো সুমনার কাছে। কালো মতন কোকড়া চুলের একটু ভালো স্বাস্থ্যের অধিকারী, গাট্টা গুট্টা ছেলে। একটু আফ্রিকান ট্রেইট ছিল তার। আর বদির চেহারাটা ছিল সেই ইউরোপিয়ানদের মত। তার বড় আপার মতই।

সাজুকে দেখলেই বারবার মনে হতো ছিনতাই, রাহাজানি কিছু একটা করে এসেছে এইমাত্র বোধহয়  ক্লাসে এসেছে। আর না করে থাকলে  আরেকটু বড় হলে মানে ১৪/১৫  বছর হলেই সে তার গলির মোড়ে  দাঁড়িয়ে পড়বে ওইসব কাজ করতে। এখন বদিউলের সাগরেদ সে। বদিউল তার ওস্তাদ। বদিউল তাকে যা বলে সে তাই করে। তাই আজ সে সাজুকে পাঠিয়েছে সুমনার কাছে, কিছু কথা জানাতে।  সাজু এসে বলল, অনেকটা রাস্তার ভাষায়, ‘আরেকবার যদি বদির বাসায় ফোন দিছোস, এক্কেরে উড়ায় দিমু। স্কুল থেইক্কা বাইর কইরা দিমু। 

ওরে বাবা!

তুই তোকারি করে কথা!

এই প্রথম শুনলো সুমনা তার জীবনে, তুই তোকারি করে অনেকটা বস্তি স্টাইলের কথা। স্কুলটা যেহেতু গলির মোড়ের বস্তির স্কুল না, খুবই অভিজাত এলাকায় অভিজাত শ্রেণীর স্কুল, তাই সহপাঠীর কাছ থেকে বস্তির ভাষা, বস্তির অ্যাটিচিউড সুমনা একদমই আশা করেনি। ধরনের কথা শুনে আর ভাব দেখে সুমনা আকাশ থেকে পড়ল।

সুমনা এই প্রথম শিখল, এই প্রথম জানল থ্রেট কাকে বলে। টিফিন পিরিয়ড তখন। সাজুর সেই উক্তি শুনতে শুনতে সুমনা চারিদিকে চেয়ে খুঁজে বের করল বদি কোথায়। দেখলো ক্লাসের মাঝে দূরের জানালার দিকে মুখ করে পা দুটো ফাঁক করে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মানে  ক্লাসের দিকে পিঠ করে, জানালার দিকে মাথাটা  উঁচু করে, উদাস ভঙ্গীতে  দাঁড়িয়ে আছে। তার ওই কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়ানোই তার মাস্তানি ভাবের প্রকাশ ঘটাচ্দেছে। কোথা থেকে শিখেছে সে এসব স্টাইল করে পান্ডাগিরি দেখানো, সুমনা তা বুঝতে পারছিল না।

বন্ধু সাজুকে মিশনে পাঠিয়ে বদি এখন খবর পাবার আশায় অপেক্ষমান।

বদি সেইদিন (তার  নয় বছর বয়সেই) কোমরে হাত রেখে দাঁড়ানোর ভঙ্গিমা দিয়ে যা বুঝিয়েছে আর সাজুর দেয়া সেই থ্রেটে সাজু যা বলেছে, যেভাবে বলেছে, তা দেখে সুমনার  বুঝতে  বাকি ছিল না যে বড় হলে এই দুই দুইবান্দা নির্ঘাৎ গ্যাংস্টার হবে এবং এই পথ তাদের সুনিশ্চিত।  এখনই তো তারা পান্ডা। আসলে তাদের পান্ডাগিরি  এটাই প্রথম কিনা কে জানে তবে ক্লাসে সে নমুনা  সুমনাকে তারা সেদিনই দেখিয়ে দিয়েছে।

বাস্তবে কে কি হবে জীবনে, তা তার বাল্যকালের ব্যক্তিত্বই বলে দেয়। বড়রা শিশুদের মাঝে শিশুসুলভ আচরণ ছাড়া আর কিছুই খুঁজে পায় না। কিন্তু একজন শিশুর রাইভাল (প্রতিপক্ষ) আরেকজন শিশুই, যারা তাদের সম-জেনারেশন। তার ব্যক্তিত্বের ধরণ দিয়ে সে নিজেই  অন্যদের কাছে আবির্ভুত হয়। সেই কারণেই সেই ছোটবেলার ভাবটা  সহপাঠীরা যখন ছোট থেকেই দেখতে পায় তারাই  ভালো বুঝতে পারে তাদের সম্বন্ধে। তাদেরকে নিয়ে  একটা স্পেকুলেশন বা একটা ধারণা অন্যদের আপনা আপনিই গড়ে ওঠে, যা তাদের বাবা মা- জানে না, ভাইবোনও জানে না। আর যদি ক্রিমিনাল ব্যাকগ্রাউন্ডের ছেলে মেয়ে হয় তাহলে তো কথাই নেই। এই ভাব, এই ধরণ তারা প্রদর্শন করে প্রতি পদক্ষেপে,  জীবনের প্রতিটি স্তরে। স্কুলের অথরিটি, ক্লাস টিচার হয়তোবা টের পায়। আবার বাচ্চাটি খুব চালাক হলে, নিজেকে গুটিয়ে রাখলে টের নাও পেতে পারে।

সাজু বাইরে থেকে আসা ছেলে। বদিউল, সুমনারা একই পাড়ার। তাই আরো পরে সুমনা তার স্কুলের অন্য বন্ধুদের কাছ থেকে জানতে পেরেছিল যে বদির বাবা তার মাকে  কোন এক হোটেল থেকে পরিচয়ের মাধ্যমে  ধরে এনেছিল। ভদ্র মহিলা অ্যালকোহলিক ছিলেন বিধায় পরবর্তীতে বেশিদিন বাঁচেননি। বাংলাদেশের সামাজিক পরিস্থিতিতে পরিবেশের পরিপ্রেক্ষিতে কোন্নারীরা অত্যাধিক ফাস্ট হয় এবং ফাস্ট লাইফ মেইনটেন করতে গিয়ে অ্যালকোহল সিগারেটে আসক্ত হয় তা সকলের জানা। আর নেশায় বুদ হয়ে থাকা নারীরা কিভাবে পতিব্রতা  হয়ে স্বামী সংসার  ধর্ম পালন করবে তাও মোটামুটি ধারণা করা যায়। কিন্তু ছোটবেলায় তো অত সব সুমনার জানার কথা নয়, বোঝারও কথা নয়। তবুও তো সুমনা আঁচ করেছিল যে বদিউল খুব একটা সুবিধার ছেলে নয়। বদিউল যে ভাল না তা সুমনা আঁচ করেই হয়তোবা সেদিন অনিচ্ছা প্রকাশ করেছিল তার সাথে  ফোনে কথা বলতে। সুমনার বাবা ওনার  দৃষ্টিকোণ থেকে বদিউলকে দেখেছেন একটা শিশু হিসেবে, সুমনার সহপাঠী বলে। উনি হয়তোবা বদির বাবা মায়ের কথা জানতেন। কিন্তু সেটা তো আমলে নেন- নাই এমনকি বদিউলকে ভয়ংকর মাত্রার পান্ডা হিসাবে বিবেচনাও করেন নাই।

 আসলে ডিস্টার্বড ফ্যামিলির সন্তানরা একটু বেশি যেন ইঁচড়ে  পাকা হয়। কারণ তারা খুব ছোট থেকেই ভায়োলেন্স, বিশেষ করে ফ্যামিলি ভায়োলেন্স দেখে বেড়ে ওঠে। সুমনার মত নিটোল, সুন্দর পারিবারিক পরিবেশ তাদের ভাগ্যে জোটে না। অথচ একটি সুন্দর পরিবার কতজনেরই না আকাঙ্ক্ষিত! আবার সুমনার এদিক থেকে আফসোস হয় এই ভেবে যে, ডিস্টার্বড ফ্যামিলির, বস্তি টাইপের ক্যাচাল দেখে যদি বড় হতে পারা যায়, তাহলে বুঝি বেশি ভালো হয়। কারণ ছোট থেকেই তখন ইঁচরে পাকা হওয়া যায়। যত সহজ সরল, ইনোসেন্ট ভাব থাকুক না কেন, এই কর্দমাক্ত, বিষাক্ত পৃথিবীর তিক্ত পরিবেশে যেখানে কি না একে ধরে, তাকে মেরে টিকে থাকাটাই বড্ড দায়, সেখানে  বদিউল বা সাজুর মত এরকম মাস্তানি ব্যক্তিত্ব নিয়ে বড় হলেই তো ভাল। তখন পান্ডামি করে সহজেই এই পৃথিবীতে টিকে থাকা সহজ হবে।

তারা তো নিশ্চয়ই এতদিনে তাদের মাস্তানি দিয়ে পান্ডাগিরি করে সমাজ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। কে জানে! 

ব্লগে আমার ১৮ বছর পূর্তি

এমনি একদিন  ২০০৭ । অনলাইন   একটি ই- ম্যাগাজিন সম্পাদনার কাজ করি। অবনী অনার্য  পাকা লেখক। তার থেকে লেখা নিয়ে আমার ই- ম্যাগাজিন সমৃদ্ধ। যার  হ...