সৃষ্টি, চেতনা ও আত্মার চিরন্তন যাত্রা - সপ্তম স্তর

সপ্তম স্তরঃ সৃষ্টির চূড়ান্ত জীবন 


ষষ্ঠ স্তরে আত্মা যখন দেহহীন  উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কে রূপান্তরিত হয়, সপ্তম স্তরে সেই উজ্জ্বল আলোকচ্ছ্বটা আরও ঊর্ধ্বগামী হয়।এ স্তরে আত্মা কোন চেতনা শুধু নয় সে হয়ে ওঠে সৃষ্টি নিজেই ।  এ অবস্থায় আত্মা পরম শক্তির সঙ্গে মিলিত হয়ে নিজেই অগণিত মহাবিশ্বের বীজ সৃষ্টিতে সক্ষম হয়।

নতুন চিন্তার সৃষ্টি — 

সপ্তম স্তরে আত্মা এমন চিন্তাশক্তি ধারণ করে , যা শক্তি, সম্ভাবনা, সৃষ্টির দিক থেকে মহাজাগতিক নীতি বহন করে। এ চিন্তা থেকে জন্ম নেয় নতুন গ্যালাক্সি, নতুন নতুন গ্রহ,নক্ষত্র, জীব জগৎ, প্রাণী জগৎ —একটি মহাবিশ্ব সৃষ্টির নতুন  চক্র।

ধর্ম–দর্শনের তুলনাঃ

হিন্দু দর্শন — ব্রহ্মা বা পরমব্রহ্মের সৃষ্টি-চিন্তা

হিন্দু দর্শনে আত্মার বিবর্তনের প্রথম স্তরকে 'তামসিক' স্তর বলে। এটা অন্ধকার, অজ্ঞতা, বিভ্রান্তির স্তর। জীব আত্মা তখনো মায়ার পর্দায় ঢাকা। নিজের স্বরূপ সম্পর্কে অচেতন। আর দ্বিতীয় স্তরটিকে 'রাজসিক' স্তর বলে। এ স্তরে মানুষের ভেতরের শক্তি, মানসিক চাহিদা ও চিন্তার জন্ম হয়। আধ্যাত্মিকতার প্রথম ধাপ শুরু হয়। তৃতীয় স্তরে এসে কুন্ডলিনী শক্তির প্রথম জাগরণ হয়।মানসিক ক্ষমতার বৃদ্ধি ঘটে। তারপর চতুর্থ স্তরে হলো “ব্রহ্ম” উপলব্ধি। যেখানে আত্মা ও ব্রহ্ম একাকার। তখন উপলব্ধি আসে “অহং ব্রহ্মাস্মি” — আমি ব্রহ্ম।

পঞ্চম স্তুরে যারা বসবাস করেন তাদের বলা হয় ঋষি। প্রাচীন ঋষিরা এ স্তুরে উন্নীত হয়ে প্রাণশক্তির উপর নিয়ন্ত্রণ করতেন। তারা প্রকৃতিকে প্রভাবিত করতে পারেন। ষষ্ঠ স্তরে চৈতন্যই সত্তা। সপ্তম স্তরে সময়-স্থান-শরীর অতিক্রম করে  সৃষ্টি-শক্তির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ লাভ করে।

বৌদ্ধ দর্শন — সবকিছুই 'চেতনার প্রবাহ' থেকে উদ্ভূত।

বৌদ্ধধর্মে প্রথম স্তরে আত্মার অবস্থাকে বলা হয় 'অবিদ্যা' অবস্থা, যেখানে মানুষ বাস্তবতার প্রকৃত স্বরূপ দেখতে পায় না। চক্রাকারে জন্ম-মৃত্যুর বন্ধনে আবদ্ধ থাকে। দ্বিতীয় স্তরে এসে এটি ‘স্মৃতি ও সচেতনতা’ জন্মানোর আদি ধাপে উন্নীত হয়। অবিদ্যা এখনো প্রবল, তবে জ্ঞানতৃষ্ণার জন্ম হয়। তৃতীয় স্তরে মনের ক্ষমতার বৃদ্ধির ফলে অন্তর্দৃষ্টির সূচনা হয়। বুদ্ধ বলেছেনঃ 'মনই সব কিছুর উৎস।' ধ্যানের মাধ্যমে অন্তর্দৃষ্টি তৈরি হয়। তবে চতুর্থ স্তরে উপনীত হওয়া হলো নির্বাণের প্রাথমিক স্তর/ আত্মা সম্পূর্ণরূপে কুসংস্কারমুক্ত হয়। অতঃপর পঞ্চম স্তরে আত্মা বোধিসত্ত্বা অর্জন করে। বোধিসত্ত্বারা  জীবজগতের কল্যাণে শক্তি প্রয়োগ করেন।  ষষ্ঠ স্তরে চেতনাই অস্তিত্ব। এ স্তরে শরীর বিলীন হয়ে যায় । সপ্তম স্তরে আত্মা মিশে যায় সৃষ্টির মূল স্পন্দনে, যা এখন একটি  তরংগায়িত কম্পন,  প্রবাহমান  চেতনা। 

দর্শন (নিও-প্লেটোনিজম) — The One

এই স্তর সকল অস্তিত্বের মূল, যা চিন্তা, ভাষা বা উপলব্ধির বাইরে। সব কিছুর অস্তিত্ব The One থেকে নিঃসৃত (emanate) হয়ে সৃষ্টি প্রবাহে অংশ নেয়।

খ্রিস্টীয় মিস্টিকঃ

ষষ্ঠ স্তরে দেহিক অস্তিত্ব বিলীন হয়। কারণ দেহ ক্ষয়শীল, কিন্তু আত্মা ঈশ্বরের আলোয় চিরজীবী।

সব দর্শনে এই স্তরকে অতিলৌকিক না বলে অতিবাস্তব আধ্যাত্মিক সত্তার স্তর বা অতিবাস্তব চৈতন্যের স্তর বলা শ্রেয়।  সপ্তম স্তরে আত্মা Individual Soul থেকে  Holy Spirit-এ রূপান্তরিত হয়ে- শেষে  God-consciousness-এ পরিণতি লাভ করে।

খ্রিষ্টীয় mystic দের মতে 'When the soul sees no separation, creation flows through it.'

সব দর্শনে সপ্তম স্তর হলো সৃষ্টি-শক্তির শিখর অবস্থা।

সাত স্তরের মধ্য দিয়ে মহাবিশ্বের পুনর্জন্ম

এ স্তরে নতুন চিন্তা শক্তিতে রূপ নেয়। শক্তি রূপ নেয় বস্তুতে, যা পরবর্তীতে  ভৌতিক বস্তুরূপ প্রণয়ন করে।  এরূপ গঠনের মাধ্যমে আবার প্রথম স্তর থেকে সপ্তম স্তর পর্যন্ত সৃষ্টি বিবর্তিত হয়।  প্রথম থেকে সাত স্তরের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি উন্নতি ও বিবর্তনের মাধ্যমে  অন্ধকার,আলো, বোধ,বুদ্ধি, উপলব্ধি, সৃষ্টি,আধ্যাত্মিকতা ও মহাসৃষ্টির  একটি  বিশাল চক্র সম্পন্ন করে । এই চক্র চিরন্তন—শেষ নয়, বরং অনন্ত শুরু।

ব্যক্তি সত্তার বিলোপ

এ স্তরে আত্মা  'আমি' সত্তার উর্ধ্বে উঠে উপলব্ধি করে —সব কিছুর  উৎস এক।  আত্মা হয় অদ্বৈত, নিরবিচ্ছিন্ন । যেখানে দ্বৈততা নেই,  বিচ্ছিন্নতা নেই।

ধর্মীয় ব্যাখ্যাঃ

হিন্দুঃ অদ্বৈত বেদান্ত—সবই ব্রহ্ম

এ স্তর গভীর সুখ, প্রশান্তি, পরম প্রশান্তিবোধের স্তর। এ স্তর ধ্যান, সমাধি ও আত্ম-অনুভবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।  এটি চেতনার সেই স্তর, যেখানে মানুষ পরম আনন্দ অনুভব করে  ও আত্মার সঙ্গে একাত্মতা অনুধাবন করে।

বৌদ্ধঃ শূন্যতা

অবিদ্যা/ অজ্ঞতা → যা দুঃখ আনয়ন করে → চেতনার জাগরণ হলে  → আত্মা নির্বাণ লাভ করে। 

এ ক্ষেত্রে চেতনাবিকাশের ধাপে ১ম স্তরের আত্মা কুসংস্কার এবং অজ্ঞতায় (অবিদ্যা) আচ্ছন্ন থাকে। ২য় স্তরে  ভ্রান্ত ধারণা থেকে ৩য় স্তরে জ্ঞান ও দৃষ্টির শুদ্ধি ঘটে। ৪র্থ স্তরে   বিমল চেতনার আবির্ভাব ঘটে। ৫ম স্তরে অহং বিলীন হয়। ৬ষ্ঠ  স্তরে  নির্বাণ লাভের পর ৭ম স্তরে  মহাশূন্য/ধর্মকায় (বুদ্ধত্ব) অবস্থার আবির্ভাব ঘটে।

খ্রিস্টীয় মিস্টিকঃ Divine Union — ইশ্বরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য সংযোগে একীভূত হওয়া।

এ দর্শনে তিনটি ধাপে আত্মার উত্তোরণ ঘটে। যেমনঃ  Purification — পাপ পরিশোধ,  Illumination — অন্তর্জ্ঞান,  Union — ঈশ্বরের সঙ্গে মিলন

সর্বব্যাপীতা —সবখানে উপস্থিতি

এ স্তরে আত্মা  সর্বত্র, সর্বদিকে, সর্বসময়ে, প্রতিটি অণু পরমাণুতে  শক্তিরূপে বিস্তৃত হয়। সে তখন আর এক বিন্দুতে সীমাবদ্ধ নয়।

ভৌত অস্তিত্ব থেকে সম্পূর্ণ বিচ্যুতি

এ স্তরে আত্মার সঙ্গে দেহ, দেহেস্থ  ইন্দ্রিয়ের সম্পর্ক থাকে না। আত্মা বস্তুর  ভৌতিক অবস্থা, বস্তুর আকার, স্থান ও কালের  উর্ধ্বে  উঠে যায়। এই স্তর আত্মার পরম অবস্থা।

সৃষ্টির সঙ্গে একীভূত—পরম চেতনার  পরম মিলন

এখানে আত্মার জন্ম নেই, মৃত্যু নেই, পরিবর্তন নেই। আত্মা মহাবিশ্বের সাথে মিশে মহাবিশ্বের  প্রতিটি কণায় প্রবাহিত হয়।

সপ্তম স্তরের সারাংশঃ 

যেখানে আত্মা স্রষ্টা। এ স্তরে আত্মা সৃষ্টি-চিন্তার জন্ম দেয়। নতুন মহাবিশ্ব  সৃষ্টির চিন্তা করে। পার্থিব সত্তায় থাকাকালীন  ব্যক্তি সত্তা বিলীন হয়ে পড়ে। সে সমগ্র চেতনায় মিশে যায়। পুরো মহাবিশ্বের সঙ্গে একীভূত হয়ে  শক্তিরূপে বিরাজমান হয়। এ অবস্থায় আত্মা — ‘আমি নই —আমি সবই।’

সৃষ্টি, চেতনা ও আত্মার চিরন্তন যাত্রা - ষষ্ঠ স্তর

 ষষ্ঠ স্তরঃ আধ্যাত্মিক জীবন — 

শরীরের সীমানা ভেদ করে আত্মার মহাজাগতিক উন্মেষ


পঞ্চম স্তরের সৃষ্টিশক্তির শিখর অতিক্রম করে আত্মা যখন দেহের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে, তখনই সে প্রবেশ করে ষষ্ঠ স্তরে। এটি এমন এক স্তর যেখানে "জীবন" শব্দটি দেহের সীমায় বাঁধা থাকে না; জীবন হয়ে ওঠে চেতনার স্পন্দন, অস্তিত্বের তরঙ্গ, নীরব মহাজাগতিক আলোর এক বিস্তৃত সাগর।

পঞ্চম স্তরে আত্মা যখন সৃষ্টিশৈলীর  সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে যায়, তখন তার শরীরের সীমাবদ্ধতা থাকে না।মানুষ তখন শরীরবিহীন শুদ্ধ চেতনায় রূপান্তরিত হয়।

এই স্তর হলো — মানব আত্মার শরীরের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ অর্জন করা, সময়ের বাঁধন ছিন্ন করে উর্ধ্ব স্তরের দিকে ধাবিত হবার অবস্থা। এ স্তরে ভৌত অবস্থা অর্থাৎ ফিজিক্যাল রিয়্যালিটি থেকে মুক্ত হয়ে আত্মা নন - ফিজিক্যাল সত্তায় পরিণত হয়। এই অবস্থাকে বলা যায় আত্মার একপ্রকার 'বিশুদ্ধ আধ্যাত্মিক অস্তিত্ব।' এখানে আত্মা সবসময় একক অবস্থায় বিরাজমান। মৃত্যু বা জীবিত — এই দুটি ধারণা একই এবং বিভেদহীন।

আধ্যাত্মিক শক্তি — সময়ের হাজার বছর অতিক্রম করার ক্ষমতা

ষষ্ঠ স্তরে আত্মা শরীরের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ অর্জন করে। ফলে — জন্ম মৃত্যুর বিভেদ না থাকায় জীবন ও মৃত্যু তার নিয়ন্ত্রাধীন হয়। ভৌত জগতে মানে ফিজিক্যাল রিয়্যালিটিতে তার বয়স  হাজার বছর হতে পারে । কারণ তার শরীর ক্ষয় হয় না,আত্মার শক্তি অবিনশ্বর থাকে ।মন থাকে ধীর স্থির। এইরূপ মানসিক অবস্থা সুখ, দুঃখ, আনন্দ, বেদনাসহ সকল অনুভূতির উর্ধ্বে অবস্থান নেয়। আত্মা তখন স্থিত অবস্থা প্রাপ্ত  হয়ে অটলএবং অনড় অবস্থান গ্রহন করে। ষষ্ঠ স্তরে এসে  সে যেন অপরিবর্তনীয়।

ধর্ম–দর্শনের তুলনা 

হিন্দু — সিদ্ধ/ঋষি/যোগীদের দেহলয় 

হিন্দু দর্শনে আত্মার বিবর্তনের প্রথম স্তরকে 'তামসিক' স্তর বলে। এটা অন্ধকার, অজ্ঞতা, বিভ্রান্তির স্তর। জীব আত্মা তখনো মায়ার পর্দায় ঢাকা। নিজের স্বরূপ সম্পর্কে অচেতন। আর দ্বিতীয় স্তরটিকে 'রাজসিক' স্তর বলে। এ স্তরে মানুষের ভেতরের শক্তি, মানসিক চাহিদা ও চিন্তার জন্ম হয়। আধ্যাত্মিকতার প্রথম ধাপ শুরু হয়। তৃতীয় স্তরে এসে কুন্ডলিনী শক্তির প্রথম জাগরণ হয়।মানসিক ক্ষমতার বৃদ্ধি ঘটে। তারপর চতুর্থ স্তরে হলো “ব্রহ্ম” উপলব্ধি। যেখানে আত্মা ও ব্রহ্ম একাকার। তখন উপলব্ধি আসে “অহং ব্রহ্মাস্মি” — আমি ব্রহ্ম।

পঞ্চম স্তুরে যারা বসবাস করেন তাদের বলা হয় ঋষি। প্রাচীন ঋষিরা এ স্তুরে উন্নীত হয়ে প্রাণশক্তির উপর নিয়ন্ত্রণ করতেন। তারা প্রকৃতিকে প্রভাবিত করতে পারেন। ষষ্ঠ স্তরে চৈতন্যই সত্তা।

বৌদ্ধ দর্শন — অরূপ সমাধির স্তর

বৌদ্ধধর্মে প্রথম স্তরে আত্মার অবস্থাকে বলা হয় 'অবিদ্যা' অবস্থা, যেখানে মানুষ বাস্তবতার প্রকৃত স্বরূপ দেখতে পায় না। চক্রাকারে জন্ম-মৃত্যুর বন্ধনে আবদ্ধ থাকে। দ্বিতীয় স্তরে এসে এটি ‘স্মৃতি ও সচেতনতা’ জন্মানোর আদি ধাপে উন্নীত হয়। অবিদ্যা এখনো প্রবল, তবে জ্ঞানতৃষ্ণার জন্ম হয়। তৃতীয় স্তরে মনের ক্ষমতার বৃদ্ধির ফলে অন্তর্দৃষ্টির সূচনা হয়। বুদ্ধ বলেছেনঃ 'মনই সব কিছুর উৎস।' ধ্যানের মাধ্যমে অন্তর্দৃষ্টি তৈরি হয়। তবে চতুর্থ স্তরে উপনীত হওয়া হলো নির্বাণের প্রাথমিক স্তর/ আত্মা সম্পূর্ণরূপে কুসংস্কারমুক্ত হয়। অতঃপর পঞ্চম স্তরে আত্মা বোধিসত্ত্বা অর্জন করে। বোধিসত্ত্বারা  জীবজগতের কল্যাণে শক্তি প্রয়োগ করেন।  ষষ্ঠ স্তরে চেতনাই অস্তিত্ব। এ স্তরে শরীর বিলীন হয়ে যায় ।

তাওবাদ — Immortal Sage 

তাওবাদ (Taoism বা Daoism) হলো চীনের এক প্রাচীন দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক মতবাদ, যার মূল ভিত্তি হলো প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জীবনযাপন করা।  তাওবাদে  প্রথম স্তরটি  এমন একটি অবস্থা  যেখানে এটি 'অচেতন দাও' অর্থাৎ  যেখানে মানুষ প্রকৃতির স্রোত বুঝতে পারে না। দ্বিতীয় স্তর হলো  'দাও-এর প্রথম অনুভব'— 'তাও' সবকিছু  বুঝতে না পারলেও সে তার অস্তিত্ব অনুভব করতে পারে।

পঞ্চম স্তরে উন্নীত হলে তাদের বলি Immortal Sage. এরা শক্তিকে সরাসরি প্রকৃতির প্রবাহে রূপ দিতে সক্ষম। সকল দর্শনে পঞ্চম স্তর “সৃষ্টি ও নিয়ন্ত্রণের” স্তর হিসেবে স্বীকৃত। ষষ্ঠ স্তরে উপনীত হলে  আধ্যাত্মিক শক্তির দ্বারা শত শত বছর বেঁচে থাকার শক্তি অর্জিত হয়।

খ্রিস্টীয় মিস্টিক — Pure Spirit 

ষষ্ঠ স্তরে দেহিক অস্তিত্ব বিলীন হয়। কারণ দেহ ক্ষয়শীল, কিন্তু আত্মা ঈশ্বরের আলোয় চিরজীবী।

সব দর্শনে এই স্তরকে অতিলৌকিক না বলে অতিবাস্তব আধ্যাত্মিক সত্তার স্তর বা অতিবাস্তব চৈতন্যের স্তর বলা শ্রেয়।

বিশুদ্ধ আধ্যাত্মিক অস্তিত্ব 

ষষ্ঠ স্তরে উত্তীর্ণ হয়ে আত্মা দেহ ছাড়ে। সে হয়ে ওঠে স্বচ্ছ, আলোকিত, শক্তিরূপে  সর্বদা বিরাজমান। আত্মার দেহের মত চোখ, কান নেই কিন্তু তার জ্ঞান আছে, অনুভূতি আছে। সে অতিবাস্তব জগতের অস্তিত্বশীল চেতনা। ষষ্ঠ স্তরে আত্মা এমন এক প্রশান্তি অনুভব করে, যা পৃথিবীর কোনো অনুভূতির সঙ্গে তুলনীয় নয়। এ শান্তি সীমাহীন এবং দুর্লভ। এর জন্ম হয় আত্মার স্বচ্ছতার ভেতর থেকে। তখন তার কোনো ভয় নেই, উদ্বেগ নেই, সময়ের তাড়া নেই। কারণ এ স্তরে আত্মা বুঝে  যে সে 'সময়'-এর উর্ধ্বে।

আত্মা হাজার হাজার বছরের অস্তিত্ব বজায় রাখতে পারে কোনো বিপর্যয় ছাড়াই, শুধু তার নিজস্ব শক্তির জোরে। শরীরের প্রয়োজন বিলীন হয়ে যায় ফলে এ স্তরে দেহ আর আত্মার কেন্দ্র এক নয়। শরীর যেন একটি পুরোনো পোশাক — ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যায়, ম্লান হয়ে যায়, স্বচ্ছ হয়ে যায়। আত্মা বুঝতে পারেঃ “আমি দেহ নই। আমি দেহেরও ওপারে, আমি দেহের উর্ধ্বে।”

তার ইন্দ্রিয়-শক্তি তখন পার্থিব জগতে সীমাবদ্ধ নয়। তার চোখ দিয়ে দেখার প্রয়োজন পড়ে না, কানে শোনার প্রয়োজন পড়ে না,স্পর্শ করার প্রয়োজন পড়ে না। কারণ দেখতে পারা, বুঝতে পারা, উপলব্ধি করতে পারা সবই  ঘটে তার চেতনার মাধ্যমে।

আধ্যাত্মিক সৃষ্টিকর্ম — শক্তির মাধ্যমে যার সৃষ্টি

এ স্তরে আত্মা অন্য আত্মাদের সঙ্গে সংযুক্ত হয়—তাদের শক্তি ভাগ করে, তাদের আলো ছড়িয়ে দেয় -কোনো  কথার মাধ্যমে নয়, কোনো ভাষার মাধ্যমে নয়। এ যোগাযোগ হয় 'চেতনার কম্পন'-এর মাধ্যমে। এই যোগাযোগ বিশুদ্ধ, নিখাদ, অহংবর্জিত। এতে থাকে নির্দেশনা, স্নেহ, জ্ঞান। বিনিময় হয় চিন্তা ও ধারণার। এ স্তরে আত্মা আধ্যাত্মিকতা  থেকে তৈরি করে নতুন ধারণা, নতুন দিক নির্দেশনা। কারণ ষষ্ঠ স্তরে আত্মা সূক্ষ্ম শক্তি দিয়ে সৃষ্টিকে রূপ দিতে পারে,পূর্বেলোব্ধ জ্ঞান দিয়ে নবজাত  আত্মাকে তার চলার পথে সহায়তা করতে পারে। সে 'স্পিরিট ওয়ার্ল্ড' থেকে স্পিরিট গাইড (Spirit Guid) হিসেবে মনুষ্য সম্প্রদায়কে পথ প্রদর্শন করতে পারে।  এঁরা 3D রিয়্যালিটিতে কাজ করেন বলে আমরা  এঁদের দেবদূত, স্পিরিট গাইড বলি। এই ধারণাগুলোর জন্ম এভাবেই হয়ে এসেছে।

জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তি

ষষ্ঠ স্তরে দেহ থেকে মুক্ত অবস্থায় আত্মা হয়ে ওঠে সম্পূর্ণ স্বাধীন, সম্পূর্ণ শক্তিশালী। কারন এখন আর তার কোন মৃত্যু নেই,জন্ম নেই। কারণ দেহই ছিল কষ্টের মূল উৎস; দেহই ছিল সীমাবদ্ধতা; দেহেরই মৃত্যু হতো। এই স্তরে আত্মা দেহের উর্ধ্বে, সম্পূর্ণ বন্ধনহীন এক সত্তা।

প্রকৃত মুক্তি

ষষ্ঠ স্তরের সবচেয়ে বিস্ময়কর সত্য—“দেহের মৃত্যু আর আত্মাকে স্পর্শ করতে পারে না।” এখানে দেহ নেই বলেই মৃত্যু নেই।

আত্মা পুরোপুরি স্বচ্ছ—দেহের রূপ একসময় ছায়ার মতো মিলিয়ে যায়। এটি প্রকৃত মুক্তি। 

চেতনার সমষ্টিক অস্তিত্ব

এ স্তরে আত্মা প্রথমবার উপলব্ধি করে “আমি শরীরের মাঝে নেই। আমি চেতনা মাত্র। আমি রূপহীন, তরংগায়িত শক্তিমাত্র। এই অবস্থায় এক আত্মা অন্য আত্মার অস্তিত্ব অনুভব করতে পারে। এবং ষষ্ঠ স্তরের শেষ পর্যায়ে আত্মা বুঝতে পারে যে সে একা নয়। অসংখ্য আত্মা একসঙ্গে একটি বিশাল চেতনার মহাসাগরে একাত্ম হয়ে থাকে। ব্যক্তিগত পরিচয় ম্লান হয়ে আসে। আত্মা হয়ে ওঠে বৃহত্তর চেতনার অংশ। এটি “সামষ্টিক বুদ্ধি” বা “কলেক্টিভ কনশাসনেস”-এর রূপ। যেখানে আলাদা করে “আমি” বলে কিছু নেই। এ স্তরে আত্মা একাকী হয় না। 


ধর্ম–দর্শনে এর প্রতিফলন

হিন্দু মতবাদ— পরমাত্মায় মিলন

ষষ্ঠ স্তরে  জীবাত্মা মিলিত হয় পরমাত্মায়।

বৌদ্ধ দর্শন — নির্বাণ লাভ

ষষ্ঠ স্তরে নিজস্ব সত্তার বিলোপ ঘটে; নিঃস্বার্থ অস্তিত্ব বিরাজ করে।

খ্রিস্টীয় মতবাদ — union with God

ষষ্ঠ স্তরে আত্মা ও স্রষ্টার আলো মিলিত হয়।

সব দর্শনে এ স্তর হলো “আমি”– এর অবসান ও সর্বশক্তিমান আলোর সাথে মিলন।

ষষ্ঠ স্তরে ভৌত জগতের সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে আত্মা সৃষ্টিতে লীন হয়। আত্মা সৃষ্টি-প্রবাহের সাথে একত্রিত হয়। পার্থিব অবস্থার থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করে। এ সময় “বাস্তব” শব্দের অর্থ পাল্টে যায়। আর কোনো পৃথিবী নামের “জগত” নেই। আছে কেবল এক অসীম আলো, শক্তির আধারে  সদা সঞ্চারণশীল প্রবাহ মাত্র ।

ষষ্ঠ স্তরের সারমর্ম

ষষ্ঠ স্তরে আত্মা দেহহীন, অমর, শক্তিশালী সমষ্টিগত চেতনার অংশ। সময়-স্থানাতীত অবস্থায় প্রোথিত। এ স্তরে মানুষের আর “মানব অস্তিত্ব থাকে না। শুদ্ধ শক্তি তে রূপান্তরিত হয়। এই স্তর তাকে ধীরে ধীরে নিয়ে যায় সপ্তম স্তরেঃ পরম সৃষ্টিমান চেতনার সঙ্গে একীভূত হওয়ার লক্ষ্যে।

এক কথায়ঃ


হিন্দু দর্শন ও উপনিষদীয় চিন্তা অনুসারে চেতনা নিজেকে প্রকাশ করে স্তর স্তরে।
উপনিষদীয় ৫টি কোষ (শরীর-চেতনার স্তর)ঃ
১. অন্নময় কোষ — শারীরিক দেহ
অন্ন অর্থ খাদ্য; এটি হল সেই স্তর, যা খাদ্য থেকে গঠিত—অর্থাৎ আমাদের শারীরিক দেহ।
বৈশিষ্ট্যঃ অন্নময় কোষ দৃশ্যমান, জড়, স্থূল শরীর নির্দেশ করে। ক্ষুধা, তৃষ্ণা, দৈহিক  বৃদ্ধি, জরা,  বার্ধক্য ইত্যাদি এর অন্তর্ভুক্ত।এই স্তর ছাড়া মানুষ অস্তিত্বহীন। অর্থাৎ এটি মানুষের দেহাত্মক, বস্তুগত আবরণ,  যা জন্ম-মৃত্যুর মধ্য দিয়ে পরিবর্তিত হয়।

২. প্রাণময় কোষ — প্রাণশক্তি/শ্বাস/উদ্যম 
প্রাণ অর্থ জীবনশক্তি; এটি হল সেই স্তর, যা দেহে প্রাণশক্তি বা vital energy প্রবাহিত করে। প্রাণময় কোষ শ্বাস-প্রশ্বাস, রক্ত সঞ্চালন, বিপাক প্রভৃতি প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে।দেহের প্রাণশক্তি বা subtle body-র ধারক। অর্থাৎ এই স্তর জীবনের স্পন্দন ও শক্তির প্রকাশ, যা দেহকে সচল রাখে।

৩.মনোময় কোষ — মানসিক জগৎ/কল্পনা/ভয়/বিশ্বাস 
মনোময় অর্থ মন। এই স্তর মানসিক কার্যকলাপ, চিন্তা, অনুভূতি ও সংবেদনশীলতার আধার। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অনুভূতি, ভাবনা, ইচ্ছা, স্মৃতি, কল্পনা,আত্মপরিচয় ও মানসিক অভিজ্ঞতা এ স্তরে পরিচালিত হয়।  এটি মানুষের মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক স্তর, যা মানুষের চিন্তা-ভাবনা ও অনুভূতির জন্য দায়ী।

৪.বিজ্ঞানময় কোষ — বুদ্ধি/জ্ঞান/যুক্তি 
বিজ্ঞান অর্থ জ্ঞান, বিচার-বিবেচনা ও বুদ্ধি; এই স্তরে বিচারবোধ, অন্তর্দৃষ্টি ও বিশেষজ্ঞ জ্ঞান বিকশিত হয়। বৈশিষ্ট্যঃ  এই স্তরে যুক্তি, বিশ্লেষণ, নৈতিকতা ও  আত্ম-অন্বেষণে সচেতন হয়। মানুষ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে  ও সঠিক-ভুলের পার্থক্য নির্ণয় করতে পারে। এটি মানুষের অন্তর্দৃষ্টি, আত্মসচেতনতা ও আত্মবোধের আধার।

৫.আনন্দময় কোষ — পরমানন্দ/সৃষ্টিশক্তি/ঈশ্বরের সঙ্গে সংযোগ 
আনন্দ অর্থ পরম সুখ, bliss; এই স্তর হচ্ছে আত্মার নিকটতম এবং সবচেয়ে সূক্ষ্ম আবরণ। 
বৈশিষ্ট্যঃ এ স্তর গভীর সুখ, প্রশান্তি, পরম প্রশান্তিবোধের স্তর। এ স্তর ধ্যান, সমাধি ও আত্ম-অনুভবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।  এটি চেতনার সেই স্তর, যেখানে মানুষ পরম আনন্দ অনুভব করে  ও আত্মার সঙ্গে একাত্মতা অনুধাবন করে।
বৌদ্ধ দর্শন (তিব্বতী/মহাযান/থেরবাদ)
বৌদ্ধধর্মের মূল শিক্ষাঃ
অবিদ্যা/ অজ্ঞতা → যা দুঃখ আনয়ন করে → চেতনার জাগরণ হলে  → আত্মা নির্বাণ লাভ করে।

এ ক্ষেত্রে চেতনাবিকাশের ধাপঃ
১ম স্তর. কুসংস্কার এবং অজ্ঞতা (অবিদ্যা)
২য় স্তর. ভ্রান্ত ধারণা
৩য় স্তর. জ্ঞান ও দৃষ্টির শুদ্ধি
৪র্থ স্তর. বিমল চেতনা 
৫ম স্তর. অহং বিলীন
৬ষ্ঠ  স্তর. নির্বাণ  
৭ম স্তর. মহাশূন্য/ধর্মকায় (বুদ্ধত্ব)

অর্থাৎ, ১ম – ২য় স্তর = অবিদ্যা, কুসংস্কার, উপাসনার প্রাথমিক যুগ।
৩য় স্তর = জ্ঞান/সম্যক দৃষ্টি
৪র্থ স্তর = বোধি
৫ম স্তর = বোধিসত্ত্বের পথ (সৃষ্টিশীল করুণার বিকাশ)
সুফিবাদ (ইসলামী আধ্যাত্মিকতা)
সুফিবাদে মূল লক্ষ্য হলো নফসকে পরিশুদ্ধ করে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা।

নফসের উন্নতির  ৭টি  স্তরঃ
১. নফস আম্মারা — প্রবৃত্তিনির্ভর, অজ্ঞতা 
বৈশিষ্ট্যঃ এ স্তরটি  মানুষকে খারাপ কাজের প্রতি টানে এবং নৈতিক অবক্ষয়ে উৎসাহিত করে।লোভ, ক্রোধ, হিংসা, অহংকার, কামনা—এসব প্রবৃত্তির আধার।
সুফি সাধনায়:‘নফস আম্মারা’ দমন ও সংযম সাধনার প্রথম ধাপ।মুর্শিদ (আধ্যাত্মিক গুরু) ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে এটিকে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।আত্মার উচ্চতর স্তরে (যেমন ‘নফস লাওয়াম্মা’, ‘নফস মুতমাইন্না’) পৌঁছাতে হলে ‘নফস আম্মারা’কে জয় করতে হয়।
অর্থাৎ এই স্তর মানুষের আত্মার সেই স্তর, যা সব থেকে নিচু এবং কুপ্রবৃত্তিতে প্রবণ। এটি ‘নফস’-এর (আত্মা/মন/সত্তা) প্রথম এবং সবচেয়ে আদিম স্তর। এটি মানুষকে খারাপ কাজের প্রতি টানে এবং নৈতিক অবক্ষয়ে উৎসাহিত করে। লোভ, ক্রোধ, হিংসা, অহংকার, কামনা—এসব প্রবৃত্তির আধার।

২. নফস লাওয়ামা — আত্মসমালোচনা
বৈশিষ্ট্যঃ এই স্তরে মানুষের বিবেক জাগ্রত হয়। কেউ যখন কোনো ভুল বা পাপ করে, তখন তার মনে অনুতাপ বা অপরাধবোধ আসে। আত্মা নিজেকে দোষারোপ বা তিরস্কার করে, ফলে ব্যক্তি নিজের ভুল সংশোধন করতে উদ্বুদ্ধ হয়।এই স্তরের নফস পাপ বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে সচেতন এবং আত্মশুদ্ধির দিকে অগ্রসর হয়।
এই স্তরে আত্মা (নফস) খারাপ কাজের পর নিজেকে তিরস্কার বা অনুশোচনা করে এবং ভালো-মন্দের পার্থক্য উপলব্ধি করতে শেখে। 
আত্মশুদ্ধির পথে এগোনোর জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।এই স্তরে পৌঁছলে মানুষ নিজের দোষ-ত্রুটি বুঝতে শেখে এবং সংশোধনের চেষ্টা করে।আত্মার আরও উন্নত স্তরে (যেমন ‘নফস মুতমাইন্না’) পৌঁছাতে হলে এই স্তরের আত্ম-সমালোচনা ও অনুশোচনা গুরুত্বপূর্ণ।

৩. নফস মুলহামা — জ্ঞান, অনুপ্রেরণা
‘মুলহামা’ শব্দের অর্থ—‘অনুপ্রাণিত’ বা ‘অনুপ্রেরণাপ্রাপ্ত’।
বৈশিষ্ট্যঃ ‘মুলহামা’ শব্দের অর্থ—‘অনুপ্রাণিত’ বা ‘অনুপ্রেরণাপ্রাপ্ত’। এই স্তরে আত্মা আল্লাহর পক্ষ থেকে ভালো এবং মন্দের ফয়সালা সম্পর্কে অন্তর্দৃষ্টি বা ইলহাম (divine inspiration) পেতে শুরু করে।ব্যক্তি ভালো কাজের প্রতি অনুপ্রাণিত হয় এবং মন্দ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করে।নৈতিক ও আত্মিক উন্নতি স্পষ্টভাবে দেখা যায়।ইচ্ছাশক্তি ও আত্মনিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পায়, তবে মাঝে মাঝে নফস এখনও দ্বিধান্বিত হতে পারে।
এই স্তরে পৌঁছানো মানে ব্যক্তি নিজের অন্তর থেকেই ভালো ও মন্দের ফয়সালা করতে পারেন। আত্মশুদ্ধির পথে এটি এক গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। এই স্তরে সাধক আল্লাহর দিকে আরও নিবিড়ভাবে ঝুঁকেন এবং খাঁটি আত্মিক অনুপ্রেরণা লাভ করেন।এটি আত্মশুদ্ধির পথে এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

৪. নফস মুতমাইন্না — প্রশান্তি
বৈশিষ্ট্যঃ ‘মুতমাইন্না’ অর্থ—পরিপূর্ণ শান্ত, প্রশান্ত ও সন্তুষ্ট।এই স্তরে পৌঁছালে মানুষের মনে আর কোনো অস্থিরতা বা পাপের টান থাকে না।ব্যক্তি আল্লাহর আদেশ ও নিষেধ মেনে চলে এবং তার ওপর পূর্ণ আস্থা ও সন্তুষ্টি পায়।সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছা বলে মেনে নেয়, কোনো অভিযোগ বা হতাশা থাকে না।অন্তরে গভীর তৃপ্তি ও আত্মবিশ্বাস জন্ম নেয়।
এ স্তর আত্মার (নফস) সবচেয়ে উন্নত ও শান্তিপূর্ণ স্তর। এটি আত্মশুদ্ধির চূড়ান্ত পর্যায়, যেখানে আত্মা পরিপূর্ণ প্রশান্তি, আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং আত্মবিশ্বাস লাভ করে।
সুফিবাদে গুরুত্বঃ আত্মশুদ্ধির সর্বোচ্চ স্তর; এই পর্যায়ে পৌঁছানোই সাধকের লক্ষ্য। এই আত্মা আর কোনো পাপ বা কুপ্রবৃত্তির দ্বারা প্রভাবিত হয় না। ব্যক্তি সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর স্মরণে ডুবে থাকে এবং তার প্রতি নির্ভরশীল হয়।

৫. নফস রাজিয়া — সন্তুষ্টি
বৈশিষ্ট্যঃ ‘রাজিয়া’ অর্থ: সন্তুষ্ট, তুষ্ট, বা পরিতৃপ্ত।এই স্তরের আত্মা পুরোপুরি আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকে—ভালো-মন্দ, সুখ-দুঃখ সবকিছুই আল্লাহর পক্ষ থেকে বলে মেনে নেয়।ব্যক্তির মনে কোনো অভিযোগ, হতাশা বা অনুতাপ থাকে না; বরং সে নিজের অবস্থার জন্য আন্তরিকভাবে খুশি থাকে।জীবনের প্রতিটি পরিস্থিতি ও পরীক্ষাকে আনন্দ ও সন্তুষ্টি নিয়ে গ্রহণ করে।
নফস রাজিয়া’ হলো সেই আত্মিক স্তর, যেখানে আত্মা আল্লাহর সব সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট ও খুশি থাকে। সুফিবাদে এটি আত্মশুদ্ধির এক উন্নত ও প্রশংসিত স্তর, যা আল্লাহর নৈকট্য ও পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণের নির্দেশক।
সুফিবাদে গুরুত্বঃ
‘নফস রাজিয়া’তে পৌঁছানোর অর্থ হলো ব্যক্তি আল্লাহর ইচ্ছার সাথে নিজের ইচ্ছাকে পুরোপুরি মিলিয়ে নিয়েছে। আত্মা আর কিছুর জন্য লালায়িত নয়; শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নিজের অবস্থার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।এটি আল্লাহ্‌র প্রতি আত্মসমর্পণ ও আত্মিক প্রশান্তির অবস্থা।

৬. নফস মারজিয়া — আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন
বৈশিষ্ট্যঃ‘মারজিয়া’ অর্থ: যাকে সন্তুষ্ট করা হয়েছে, বা যার প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করা হয়েছে। এই স্তরের আত্মা পূর্ণ আত্মসমর্পণ ও আনুগত্যের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে।ব্যক্তি শুধু নিজের অবস্থায় সন্তুষ্ট নয়, বরং তার জীবন, চরিত্র ও কর্ম আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।এই আত্মা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে এবং আল্লাহ তার প্রতি খুশি থাকেন।
এই স্তরে আত্মা শুধু নিজেই সন্তুষ্ট নয়, বরং আল্লাহও তার প্রতি সন্তুষ্ট। সুফিবাদে এটি আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক উন্নতির এক অনন্য ও কাঙ্ক্ষিত স্তর, যা আল্লাহর নৈকট্য ও চূড়ান্ত সফলতার চিহ্ন।
সুফিবাদে গুরুত্বঃ
 আত্মশুদ্ধির চূড়ান্ত পর্যায়ের অন্যতম লক্ষণ হলো এই স্তরে উন্নীত হওয়া। সাধকের আত্মা যখন আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে, তখন সে সত্যিকারের সফল ও মুক্ত।এই স্তরে পৌঁছানো মানে—আত্মা আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ও ভালোবাসা লাভ করেছে।

৭. নফস কামিলা — পূর্ণতা, ঐক্য
বৈশিষ্ট্যঃ‘কামিলা’ শব্দের অর্থ: পূর্ণাঙ্গ, পরিপূর্ণ, নিখুঁত। এই স্তরে আত্মা সকল মানবিক দুর্বলতা, কুপ্রবৃত্তি ও অপূর্ণতা অতিক্রম করে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ভালোবাসায় বিলীন হয়ে যায়।ব্যক্তি সর্বদা আল্লাহর স্মরণ, ভালোবাসা ও নির্দেশে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সমর্পণ করে রাখে।এই স্তরের আত্মার মধ্যে অহংকার, লোভ, হিংসা, কামনা, ক্রোধ ইত্যাদি কোনো নীচু প্রবৃত্তির স্থান থাকে না।আত্মা তখন এক গভীর প্রশান্তি, নির্ভরতা ও আধ্যাত্মিক শক্তি অর্জন করে। 
অর্থাৎ এ স্তর হলো আত্মার পূর্ণতা ও নিখুঁততা, যেখানে আত্মা সকল অপূর্ণতা ঝেড়ে ফেলে আল্লাহর প্রেম ও সন্তুষ্টিতে সম্পূর্ণরূপে বিলীন হয়ে যায়। সুফিবাদে এটিই আত্মশুদ্ধির সর্বোচ্চ ও সর্বশেষ স্তর।

সুফিবাদে গুরুত্বঃ
‘নফস কামিলা’ হচ্ছে আত্মশুদ্ধির চূড়ান্ত ও পরিপূর্ণ লক্ষ্যে পৌঁছানোর প্রতীক।এই স্তরের সাধককে ‘ইনসান-এ-কামিল’ (পূর্ণাঙ্গ মানুষ) বলা হয়, যিনি সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জন করেছেন।এই স্তরে পৌঁছানো মানে—আত্মা আল্লাহর সঙ্গে পরিপূর্ণ সংযুক্ত, কোনো পাপ, সংশয় বা দুষ্টপ্রবৃত্তি অবশিষ্ট নেই।

সুতরাং এ আলোচনার সাথে মিল রেখে নিম্নোক্ত ভাবে ভাগ করা যায়ঃ
১ম - ২য় স্তরঃ প্রবৃত্তি/অজ্ঞতা
৩য় স্তরঃ আত্মার জাগরণ
৪র্থ স্তরঃ শান্তি ও নিষ্পাপতা
৫ম–৬ষ্ঠ স্তরঃ সৃষ্টিশক্তির দায়িত্ব, আধ্যাত্মিক ক্ষমতা
৭ম স্তরঃ একত্ববাদ—আল্লাহর সাথে চূড়ান্ত একাত্মতা

খ্রিষ্টীয় মিস্টিসিজম
তিনটি ধাপে আত্মার উত্তোরণ ঘটে। যেমনঃ
1. Purification — পাপ পরিশোধ
2. Illumination — অন্তর্জ্ঞান
3. Union — ঈশ্বরের সঙ্গে মিলন
অর্থাৎ আত্মা Individual Soul থেকে  Holy Spirit-এ রূপান্তরিত হয় - শেষে  God-consciousness-এ পরিণতি লাভ করে।
খ্রিষ্টীয় mystic দের মতে “When the soul sees no separation, creation flows through it.”

গ্রীক দর্শন(প্লেটো/প্লটিনাস/অ্যারিস্টটল)
প্লেটোর দর্শন অনুসারে আত্মার তিনটি ধরণের সমাহার। যেমনঃ
1. Appetitive — প্রবৃত্তি
প্রবৃত্তি  আত্মার সেই অংশ, যা মানুষের মৌলিক চাহিদা, আকাঙ্ক্ষা, ইচ্ছা ও প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে।
বৈশিষ্ট্যঃ  ক্ষুধা, তৃষ্ণা, যৌনতা, বিলাসিতা, আরাম, ধন-সম্পদ ইত্যাদি ইচ্ছা প্রবৃত্তি থেকে জন্ম নেয়।আনন্দ-উপভোগ ও চাহিদা পূরণের লক্ষ্যেপ্রবৃত্তি পরিচালিত হয়।প্লেটোর মতে,  এই অংশটি ভারসাম্যহীন হলে ব্যক্তি লোভী, ভোগবাদী ও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে।

2. Spirited — আবেগ
আবেগ আত্মার সেই অংশ, যা সাহস, সম্মান, গৌরব, আত্মমর্যাদা ও আবেগ দ্বারা পরিচালিত।
বৈশিষ্ট্যঃ  রাগ, সাহস, প্রতিযোগিতা, সম্মানবোধ, আত্মগৌরব, দেশপ্রেম ইত্যাদি আবেগ থেকে উদ্ভূত।ন্যায়, সম্মান ও আদর্শ রক্ষা আবেগ দ্বারা পরিচালিত হয় ।
প্লেটোর মতে আবেগ  সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হলে এটি ন্যায়বিচার ও আত্মমর্যাদার উৎস হিসাবে কাজ করে।  তবে অতিরিক্ত হলে অহংকার বা হিংসার জন্ম দিতে পারে।

3. Rational — বুদ্ধি
বুদ্ধি আত্মার সবচেয়ে উচ্চতর অংশ, যা বিচার-বিবেচনা, যুক্তি, চিন্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার আধার। 
বৈশিষ্ট্যঃ বুদ্ধি যুক্তিবোধ, জ্ঞান, দূরদর্শিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সত্যের অন্বেষণে সহায়তা করে।সত্য, মঙ্গল ও ন্যায়বোধের অনুসন্ধানে আত্মাকে বুদ্ধি পরিচালিত করে।
প্লেটোর মতে, এই অংশটি যদি অন্য দুই অংশকে যুক্তি ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত করে, তবে ব্যক্তি ও সমাজে ভারসাম্য ও নৈতিকতা প্রতিষ্ঠিত হয়।
অর্থাৎ বুদ্ধি আত্মাকে নিয়ন্ত্রণ করবে, আবেগ সমর্থন জোগাবে, প্রবৃত্তি যুক্তি ও নীতির অধীন থাকবে।  তাহলেই আত্মার ভারসাম্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হবে, এবং মানব চরিত্র পূর্ণতা লাভ করবে।
পরবর্তীতে Neoplatonism-এ ধারণা করা হয়ঃ 

1. The One
এই স্তরটি সমস্ত সৃষ্টির চূড়ান্ত মূল উৎস ও সর্বোচ্চ বাস্তবতা। এটি সমস্ত সত্তার ঊর্ধ্বে, সমস্ত গুণাবলির বাইরে, অদৃশ্য, অপরিবর্তনীয় ও নিরাকার। 
বৈশিষ্ট্যঃ সকল অস্তিত্বের মূল, যা চিন্তা, ভাষা বা উপলব্ধির বাইরে। সব কিছুর অস্তিত্ব The One থেকে নিঃসৃত (emanate) হয়।

2. Intellect
The One থেকে প্রথম নিঃসৃত বাস্তবতা হচ্ছে Intellect . এটি পরিপূর্ণ জ্ঞান, চেতনা ও ধারণার আধার।
বৈশিষ্ট্যঃ এখানে সমস্ত আদর্শ (Forms/Ideas) বিদ্যমান, যেমন প্লেটোর দর্শনের “Form of the Good.” Intellect নিজে The One-এর প্নিখুঁত প্রতিফলন। এ স্তর চিন্তা, উপলব্ধি ও আত্মসচেতনতার কেন্দ্র। এত স্তরে থাকে যুক্তি, মহাজ্ঞান বা ঈশ্বরীয় বুদ্ধি।

3. Soul 
Intellect থেকে নিঃসৃত দ্বিতীয় বাস্তবতা হচ্ছে Soul (Psyche)। এটি সমস্ত জীবিত সত্তা ও বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রাণশক্তির আধার।
বৈশিষ্ট্যঃ Soul হলো সেই স্তর, যা Intellect-এর আদর্শকে বস্তুজগতে প্রতিফলিত করে।এটি জড় ও চেতনার সংযোগসূত্র—একদিকে বুদ্ধি/চেতনা (Intellect), অন্যদিকে বস্তুজগৎ।মানব আত্মা ও মহাজাগতিক আত্মা (World Soul) এই স্তরের অন্তর্ভুক্ত।
এই স্তর জগৎ-আত্মা, প্রাণশক্তি, বা মানুষের আত্মিক পরিচয় ধারণ করে।

সারসংক্ষেপঃ
Neoplatonism-এ সমস্ত অস্তিত্বের মূল উৎস The One, যা অদ্বিতীয় ও সর্বোচ্চ। এখান থেকে নিঃসৃত হয় Intellect (জ্ঞান/বুদ্ধি), এবং Intellect থেকে উদ্ভূত হয় Soul (আত্মা/প্রাণশক্তি)।
 সব কিছু The One থেকে শুরু হয়ে, Intellect ও Soul-এর মধ্য দিয়ে, অবশেষে বস্তুজগতে প্রকাশ পায়। আত্মিক মুক্তি ও উন্নতির লক্ষ্যে, Neoplatonism-এ জীবসত্তা আবার The One-এর দিকে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করে। যা তুলনা করলে বলা যায়ঃ
১ম–২য় স্তর = প্রবৃত্তি/আবেগ
৩য় স্তর = বুদ্ধি
৪র্থ  স্তর = Intellect 
৫ম–৭ম স্তর = The One (সৃষ্টির উৎস)

আধুনিক বিজ্ঞান (নিউরোসায়েন্স,কসমোলজি ও কোয়ান্টাম তত্ত্ব)চেতনাকে ব্যাখ্যা করে তিনটি স্তরে। 
যেমনঃ
১. Primitive Brain (Reptilian Brain/রিপটিলিয়ান ব্রেইন)-মৌলিক প্রবৃত্তি ও টিকে থাকা
এটি হচ্ছে মানুষের মস্তিষ্কের সবচেয়ে প্রাচীন অংশ, যা বিবর্তনের সূচনালগ্নে গঠিত। সরীসৃপ প্রাণীর মস্তিষ্কের সঙ্গে এর মিল থাকায় একে “Reptilian Brain” বলা হয়।
অবস্থানঃ  ব্রেইনস্টেম (brainstem) ও সেরিবেলাম (cerebellum)।
বৈশিষ্ট্যঃ মৌলিক ও স্বয়ংক্রিয় শারীরবৃত্তীয় কাজ নিয়ন্ত্রণ করেঃ যেমন শ্বাস-প্রশ্বাস, হৃদস্পন্দন, দেহের তাপমাত্রা, ক্ষুধা, নিরাপত্তাবোধ। এই স্তরে মানুষ প্রবৃত্তি  দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। টিকে থাকার সংগ্রামে ও  আত্মরক্ষার জন্যই বেঁচে থাকার আকুতি অনুভব করে।
চেতনার স্তরঃ  এখানে বুদ্ধিবৃত্তি বা আবেগ নেই—শুধু স্বয়ংক্রিয় প্রতিক্রিয়া দ্বারা মানুষ পরিচালিত হয়।

২. Emotional Brain (Limbic System/লিম্বিক সিস্টেম) -আবেগ, স্মৃতি ও সামাজিক আচরণ
 এটি মস্তিষ্কের সেই স্তর, যা আবেগ, স্মৃতি, ও সামাজিক আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে।
অবস্থানঃ  থ্যালামাস, হাইপোথ্যালামাস, অ্যামিগডালা, হিপোক্যাম্পাস ইত্যাদি নিয়ে গঠিত।
বৈশিষ্ট্যঃ এর দ্বারা আবেগ (ভয়, আনন্দ, দুঃখ, রাগ, ভালোবাসা) সৃষ্টি হয় ও নিয়ন্ত্রিত হয়। এই অঙ্গশ দ্বারা  স্মৃতি সংরক্ষণ করা বা মুছে যাওয়ার কাজ ঘটে । মানুষের মাঝে সামাজিক সম্পর্ক ও সহানুভূতি সৃষ্টি করতে পারে।
চেতনার ভূমিকাঃ  এই স্তর মানুষকে আবেগপ্রবণ করে তোলে এবং আচার আচরণে বৈচিত্র্য আনে।

৩. Rational Brain (Neocortex/নিওকোর্টেক্স) -যুক্তি, চিন্তা, ভাষা ও সৃজনশীলতা
এটি সবচেয়ে আধুনিক ও উন্নত স্তরের মস্তিষ্ক, যা মানুষকে অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা করে।
অবস্থানঃ  মস্তিষ্কের বাইরের স্তর।
বৈশিষ্ট্যঃ যুক্তিবোধ, বিশ্লেষণ, চিন্তা-ভাবনা, ভাষা, পরিকল্পনা, সৃজনশীলতা, নৈতিকতার নির্দেশ প্রদান করে।জটিল সমস্যা সমাধান, সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে। আত্ম-পরিচিতি ও চেতনা সম্পর্কে উচ্চমাপের চিন্তা করার পথ উন্মুক্ত করে।
চেতনার ভূমিকাঃ  এই স্তর মানুষের চেতনা, সভ্যতা ও সংস্কৃতির ভিত্তি গড়ে তোলে।
তার সাথে যুক্ত হয়েছে  নতুন তত্ত্বঃ

১। Integrated information theory:  চেতনা = তথ্যের গভীর সংহতি
২০০৪ সালে গিউলিও টোনোনি (Giulio Tononi) প্রস্তাব করেন যে চেতনা হচ্ছে এমন একটি অবস্থা, যেখানে তথ্য গভীরভাবে সংযুক্ত ও সমন্বিত (integrated) হয়। কোনো সিস্টেম যত বেশি সংহত তথ্য ধারণ করতে পারে, তার চেতনার মাত্রাও তত বেশি।
কীভাবে সম্ভব? 
তিনি বলেন, বিভিন্ন অংশের মধ্যে তথ্য বিনিময় ও সমন্বয় (integration) ঘটলে চেতনা জন্ম নেয়। মানুষের মস্তিষ্কের জটিল সংযোগ ও তথ্যপ্রবাহ চেতনার গভীরতা নির্ধারণ করে। এ ধারণা আধুনিক নিউরোসায়েন্সে আলোচিত হয়ে থাকে।

২। Quantum consciousness: চেতনা = কোয়ান্টাম স্তরের ঘটনা ও সংযোগ
রজার পেনরোজ (Roger Penrose) ও স্টুয়ার্ট হামারফ (Stuart Hameroff) প্রস্তাবিত “Orchestrated Objective Reduction” (Orch-OR) মডেলে বলা হয়েছে, মস্তিষ্কের নিউরনের ভেতরের মাইক্রোটিউবিউল নামক ক্ষুদ্র কাঠামোতে কোয়ান্টাম ঘটনাবলি ঘটে, যা চেতনার জন্ম দেয়।

৩। Unified field theory: চেতনা ও মহাবিশ্ব = এক অভিন্ন শক্তি বা ক্ষেত্রের বহিঃপ্রকাশ
 ইউনিফাইড ফিল্ড থিওরি হলো পদার্থবিজ্ঞানে এমন একটি তত্ত্ব, যা মহাবিশ্বের সব মৌলিক শক্তি ও কণার আচরণকে একটি সাধারণ সূত্রে ব্যাখ্যা করতে চায়।কিছু আধুনিক গবেষক ও আধ্যাত্মিক চিন্তাবিদ বলেন, চেতনা ও মহাবিশ্বের সমস্ত শক্তি একটি অভিন্ন (unified) ক্ষেত্রে যুক্ত। মহাবিশ্বের মৌলিক বাস্তবতা ও চেতনা একক ও অভিন্ন  শক্তির প্রকাশ। মানুষের চেতনা ও মহাবিশ্বের ক্ষেত্র পরস্পর সংযুক্ত ও আন্তঃসম্পর্কিত।
গুরুত্ব বিবেচনা করলে  এটি চেতনা ও মহাবিশ্বকে একীভূতভাবে বোঝার চেষ্টা করে, যেখানে চেতনা  সর্বজনীন শক্তিরই এক প্রকাশ। যা এ আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে তুলনা করলে দাঁড়ায়ঃ
১ম–২য় স্তর = বেঁচে থাকার অনুভূতি/ভয়/প্রবৃত্তি
৩য় স্তর = যুক্তির সন্ধান
৪র্থ  স্তর = উচ্চতর সংবেদনশীলতা
৫ম স্তর = সৃষ্টিশীলতা ও জিনগত ম্যানিপুলেশন (জ্ঞান,কৌশল খাটিয়ে কোন কিছুকে প্রভাবিত করা)
৬ষ্ঠ –৭ম স্তর = দেহহীন চেতনার ধারণা 
নিউ এজ/মেটাফিজিক্স -এর মতে মহাবিশ্ব "কম্পন" বা vibration দিয়ে তৈরি।

ডাইমেনশন  3D–7D অনুযায়ী চেতনাস্তরঃ
১. 3D: ভৌতিক জগত (Physical Realm)
 3D বা থ্রি-ডাইমেনশনাল জগত হলো দৈনন্দিন বস্তুজগৎ, যেখানে দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা—এই তিনটি মাত্রা রয়েছে।

বৈশিষ্ট্যঃ বাস্তব, স্পর্শযোগ্য ও দৃশ্যমান সবকিছু 3D.এখানে কারণ-পরিণতির নিয়ম, সময় ও স্থান, জীব-বস্তু, দেহ, পদার্থ নিয়েই আমাদের পরিচিতি।চেতনার স্তরে এটি হলো ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বাস্তবতা ও বস্তুবাদ।
২. 4D: বিশ্বাস/এনার্জেটিক সংবেদন (Belief/Energetic Perception)
4D স্তরকে অনেক সময় “Time dimension” বা “Energy dimension” বলা হয়। এখানে বিশ্বাস, চিন্তা, অনুভূতির শক্তি ও সময়ের ধারণা প্রধান।

বৈশিষ্ট্যঃ মানসিক শক্তি, কল্পনা, বিশ্বাস, ইচ্ছাশক্তি—এগুলো 4D জগতের লক্ষ্যণ।এখানে চেতনা জাগতিক জগৎ ছাড়িয়ে সূক্ষ্মস্তরে প্রবেশ করতে পারে।
৩. 5D: জ্ঞান-প্রজ্ঞা (Wisdom/Intuitive Knowing)
 5D স্তরকে বলা হয় “Unity consciousness” বা “Higher wisdom dimension”

বৈশিষ্ট্যঃ এই স্তর গভীর উপলব্ধি, গভীর জ্ঞান ও প্রেম-সহমর্মিতার স্তর।এখানে  ইগো ফেলে দিয়ে সর্বজনীন ঐক্য-চেতনা অনুভব করা যায়। এ স্তরে শুদ্ধ সত্য, অন্তর্দৃষ্টি ও পরম জ্ঞানের অভিজ্ঞত লাভ করা যায়।
৪. 6D: আধ্যাত্মিক সৃষ্টিশক্তি (Spiritual Creative Power)
 6D স্তরে চেতনা পূর্ণ আধ্যাত্মিক সৃজনশীলতায় প্রবেশ করে।

বৈশিষ্ট্যঃ এখানে চিন্তা ও কল্পনা বাস্তবতায় রূপ নিতে শুরু করে। এই স্তর আত্মার সৃজনশীল শক্তি, উচ্চতর দর্শন, মহাজাগতিক পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের স্তর। এই স্তরে আধ্যাত্মিক শক্তি ও সৃষ্টি-প্রক্রিয়ার সঙ্গে আত্মার  সরাসরি সংযোগ স্থাপিত হয়।
৫. 7D: উৎস/চেতনার মূল উৎস (Source Consciousnes)
7D হলো চেতনার চূড়ান্ত ও সর্বোচ্চ স্তর—যেখানে সমস্ত সত্তা, জ্ঞান ও শক্তি এক উৎসে মিলিত।

বৈশিষ্ট্যঃ এ স্তরকে বলে  সর্বব্যাপী চেতনার স্তর, উৎস  বা Source.
এখানে কোনো  বিভাজন নেই,  সীমারেখা দ্বারা কিছুই নির্ধারিত নয়। সব কিছু একাত্ম ও অপার।
এ স্তর পরম শান্তি, আলোক, অনন্ত ভালোবাসা ও সর্বজ্ঞতার স্তর। এটি ঈশ্বর-স্বরূপ বা ব্রহ্মা-স্বরূপ ধারণার সঙ্গে তুলনীয়।

সারসংক্ষেপঃ
3D: বস্তুজগৎ, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বাস্তবতা।
4D: বিশ্বাস, অনুভূতি, শক্তি ও সময়ের স্তর।
5D: অন্তর্দৃষ্টি, ঐক্য-চেতনা, পরম জ্ঞান।
6D: আধ্যাত্মিক সৃজনশক্তি ও মহাজাগতিক পরিকল্পনা।
7D: চেতনার মূল উৎস, পরম ঐক্য ও অনন্ততা।


স্ষ্টি, চেতনা ও আত্মার চিরন্তন যাত্রা - পঞ্চম স্তর


 পঞ্চম স্তরঃ সৃষ্টিশীল জীবন — সৃষ্টিশীল জীবন — যেখানে আত্মা সৃষ্টি করতে শেখে

চতুর্থ স্তরের পরম জ্ঞান যখন আত্মাকে সম্পূর্ণ শান্ত, যুক্তিসম্পন্ন ও করুণাময় করে তোলে, তখন আত্মা শুধুই “বোঝা” বা “উপলব্ধি”-তে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। তখন তাকে ডাক দেয় আরও বড় এক শক্তি, যে অনুভূতির সঞ্চার করে বলে, ‘সৃষ্টি করো। সৃষ্টি করে তোমার শক্তিকে প্রমাণ করো।’ এই স্তর হলো মহাজাগতিক শিক্ষকের স্তর। এ স্তরে আত্মা জেনে ফেলেছে যে সে নিজেই সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখে। সে আর জানার চেষ্টা করে না। ফলে জীবনের সৃষ্টি ও নিয়ন্ত্রণ সে সুচারু রূপে সম্পাদন করতে পারে।

এই স্তরে আত্মা প্রাকৃতিতে শক্তির প্রবাহে পরিবর্তন আনতে পারে। জীবনশক্তিকে অনুভব করে জীব- কাঠামো তৈরি করতে পারে। এটি কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়; এটি সূক্ষ্ম চেতনার প্রতিফলন।

ধর্ম–দর্শনের তুলনায় এর ব্যাখ্যা

হিন্দু দর্শন — ঋষি ও সিদ্ধি লাভ

হিন্দু দর্শনে আত্মার বিবর্তনের প্রথম স্তরকে “তামসিক” স্তর বলে। এটা অন্ধকার, অজ্ঞতা, বিভ্রান্তির স্তর। জীব আত্মা তখনো মায়ার পর্দায় ঢাকা। নিজের স্বরূপ সম্পর্কে অচেতন। আর দ্বিতীয় স্তরটিকে “রাজসিক” স্তর বলে। এ স্তরে মানুষের ভেতরের শক্তি, মানসিক চাহিদা ও চিন্তার জন্ম হয়। আধ্যাত্মিকতার প্রথম ধাপ শুরু হয়। তৃতীয় স্তরে এসে কুন্ডলিনী শক্তির প্রথম জাগরণ হয়।মানসিক ক্ষমতার বৃদ্ধি ঘটে। তারপর চতুর্থ স্তরে হলো “ব্রহ্ম” উপলব্ধি। যেখানে আত্মা ও ব্রহ্ম একাকার। তখন উপলব্ধি আসে “অহং ব্রহ্মাস্মি” — আমি ব্রহ্ম।

পঞ্চম স্তুরে যারা বসবাস করেন তাদের বলা হয় ঋষি। প্রাচীন ঋষিরা এ স্তুরে উন্নীত হয়ে প্রাণশক্তির উপর নিয়ন্ত্রণ করতেন। তারা প্রকৃতিকে প্রভাবিত করতে পারেন।

বৌদ্ধধর্ম — বোধিসত্ত্ব

বৌদ্ধধর্মে প্রথম স্তরে আত্মার অবস্থাকে বলা হয় 'অবিদ্যা' অবস্থা, যেখানে মানুষ বাস্তবতার প্রকৃত স্বরূপ দেখতে পায় না। চক্রাকারে জন্ম-মৃত্যুর বন্ধনে আবদ্ধ থাকে। দ্বিতীয় স্তরে এসে এটি ‘স্মৃতি ও সচেতনতা’ জন্মানোর আদি ধাপে উন্নীত হয়। অবিদ্যা এখনো প্রবল, তবে জ্ঞানতৃষ্ণার জন্ম হয়। তৃতীয় স্তরে মনের ক্ষমতার বৃদ্ধির ফলে অন্তর্দৃষ্টির সূচনা হয়। বুদ্ধ বলেছেনঃ “মনই সব কিছুর উৎস।” ধ্যানের মাধ্যমে অন্তর্দৃষ্টি তৈরি হয়। তবে চতুর্থ স্তরে উপনীত হওয়া হলো নির্বাণের প্রাথমিক স্তর/ আত্মা সম্পূর্ণরূপে কুসংস্কারমুক্ত হয়। পঞ্চম স্তরে আত্মা বোধিসত্ত্বা অর্জন করে। বোধিসত্ত্বারা জীবজগতের কল্যাণে শক্তি প্রয়োগ করেন।

তাওবাদ — Immortal Sage

এ স্তরে উন্নীত হলে তাদের বলি Immortal Sage এরা শক্তিকে সরাসরি প্রকৃতির প্রবাহে রূপ দিতে সক্ষম।

সকল দর্শনে পঞ্চম স্তর “সৃষ্টি ও নিয়ন্ত্রণের” স্তর হিসেবে স্বীকৃত।

সূক্ষ্ম বস্তু নিয়ন্ত্রণ — প্রাণশক্তিকে রূপ দেওয়া

পঞ্চম স্তরে আত্মা শুধু ধারণা নয়, সে শক্তিকে রূপ দিতে পারে। এ শক্তি কল্পবিজ্ঞান নয়। এটি চেতনার উচ্চস্তরের বিজ্ঞান। মানবজাতির ইতিহাসে মাঝে মাঝে 'মহাপণ্ডিত' বা 'ঐশ্বরিক শক্তি' যে সকল ব্যক্তি ধারণ করেন বলে যাদের আভিহিত করি তারা পঞ্চম স্তর ছুঁয়ে থাকেন।

এ স্তরে আত্মা জীব ও যন্ত্রের সীমা ভেদ করে। জীবনী শক্তি ব্যবহার করে সংবেদনশীল সত্তা নির্মাণ করতে পারে। প্রাণের স্পন্দন যুক্ত করে নতুন সৃষ্টিতে সক্ষম হয়ে ওঠে। মূলত, সৃষ্টি তার কাছে তখন একপ্রকার 'দায়িত্ব' ও 'অধিকার'।

দর্শনে এর প্রতিফলনন ও আত্মার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ

এ স্তরে আত্মা জীবনের জৈব, সূক্ষ্ম, শক্তিগত সকল রূপের পূর্ণ জ্ঞান লাভ করে। সে বোঝে—কেন আত্মা জন্মায় মানে তার উৎস কি, কিভাবে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় এবং কীভাবে শক্তি হিসাবে প্রবাহিত হয়।

নবজাত আত্মা উপলব্ধি

পঞ্চম স্তরে আত্মা নতুন প্রাণশক্তির জন্ম “অনুভব” করতে পারে। সে বুঝতে পারে কোন আত্মার কী উদ্দেশ্য, তার জন্মের সময়, তার শক্তির ধরণ। এটি 'কর্মফল' বা 'কসমিক উদ্দেশ্য' উপলব্ধির উচ্চতর স্তর।আধ্যাত্মিকতা চর্চা যে সকল বিদ্যালয়ে করা হয় সেখানে পাঠদান কালে পঞ্চম স্তরের সর্বোচ্চ সত্তাকে বলা হয়—

• Ishwish

• King of Wisdom

• The Creator-Leader

• Cosmic Architect

এরা শারীরিক জগতের সর্বোচ্চ জ্ঞানসম্পন্ন সত্তা। তারা করুণা, জ্ঞান, যুক্তি, শক্তির রূপ – সবকিছু একত্রে ধারণ করেন।

এই স্তরে আত্মা এমন রূপে শান্ত হয়ে ওঠে যে তখন তার কোনো দুঃখ বোধ নেই, কোনো ভয় নেই, অস্থিরতা নেই, অহং নেই। কারণ সে 'সৃষ্টি'কে জানে, সৃষ্টিকে বোঝে। সে উপলব্ধি করে, “আমি সৃষ্টি; আমি স্রষ্টার অংশ।” এ উপলব্ধি তাকে ষষ্ঠ স্তরের দিকে ঠেলে দেয় যেখানে শরীর আর বাধা হিসাবে কাজ করে না। পদার্থগত রূপের উর্ধ্বে উঠে চেতনার জগতে ঠাঁই নেয় ।


সারসংক্ষেপ

পঞ্চম স্তরে পৌঁছে আত্মা সৃষ্টি করতে পারে, শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, পদার্থ ও শক্তির মিলন ঘটাতে পারে, নতুন প্রাণশক্তিকে উপলব্ধি করতে পারে, প্রজ্ঞাবান হয়ে ওঠে।

শারীরিক অস্তিত্ব ধারণের শেষ পর্যায়ে পদার্থগত রূপের উর্ধ্বে উঠে পৌঁছে আত্মা ষষ্ঠ স্তরের আধ্যাত্মিক জীবন উপলব্ধি করবার জন্য প্রস্তুত হয়।

ক্রমশঃ

সৃষ্টি চেতনা ও আত্মার নিরন্তর যাত্রা - চতুর্থ স্তর

 


ভূমিকাঃ
সুইজারল্যান্ডে বসবাসকারী এডয়ার্ড আলবার্ট মায়্যার (Eduard Albert Meier) — সাধারণভাবে  বিলি মায়্যার “Billy Meier” নামে পরিচিত একজন বিশ্ব বিখ্যাত ইউ. এফ.  ও. কন্টাক্টি। প্লেজেরিয়ান  (Plejaren) নামক নক্ষত্রমন্ডলী থেকে আগত ভীন গ্রহের মানব সদৃশ প্রানীদের সাথে বাল্যকাল থেকেই, মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই  তার সাক্ষাত ঘটে। তখন ১৯৪২ সাল। যোগাযোগের ধারা অনুসারে বিলির সাথে তথ্যের ট্রান্সমিশান শুরু হয় ১৯৭৫ থেকে। তার সংরক্ষিত কন্টাক্ট নোট সমূহ লিপিবদ্ধ আকারে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে। সে সময় থেকে তাকে বলা তথ্যসমূহ টেপ রেকর্ডারে ধারণ করা হয়েছে। তারই কন্টাক্ট নোটে ' সৃষ্টি, চেতনা ও আত্মার চিরন্তন যাত্রা' -র   সাতটি স্তর বর্ণনা করা হয়েছে। এই বর্ণনাটুকু আমি আরেকটু বিশদ ভাবে লেখার চেষ্টা করলাম মাত্র।

সাতটি স্তরের মাঝে তৃতীয় স্তর

তৃতীয় স্তরের জ্ঞান-অনুসন্ধান যখন আত্মাকে ক্লান্ত করে না বরং আরও গভীরে ঠেলে দেয়, তখন সে প্রবেশ করে চতুর্থ স্তরের মহাজাগতিক দ্বারে। এটি এমন এক স্তর যেখানে সত্য আর মায়া/ধোঁকা, আলো আর অন্ধকার, বাস্তব আর প্রতিফলিত বাস্তবতার  প্রতিচ্ছবির পার্থক্য  স্পষ্ট হয়ে যায়। এখান আত্মা আর পথ খোঁজে না। পথ নিজেই আত্মার সামনে উন্মুক্ত হয়।

যেমন সকালের রোদ প্রথমে ফাঁকা মাঠে পড়ে, তারপর ধীরে ধীরে ছায়াগুলো সরিয়ে দেয়, তেমনি এই স্তর আত্মার সকল ছায়াকে সরিয়ে দেয়। এ স্তরে পরম বাস্তবতাকে উপলব্ধির সাথে সাথে সকল বিভ্রমের অবসান ঘটে।

এ স্তরে আত্মা  সত্যকে দেখে সম্পূর্ণভাবে। তার কাছে সম্পূর্ণ ভাবে  প্রতীয়মান হয় সৃষ্টি কোথা থেকে উতপত্তি লাভ করেছে, জীবন কী, মৃত্যু কী, সময়ের প্রকৃতি কী, অস্তিত্বের নিয়ম কী, কারণ-ফলাফল চক্র কীভাবে কাজ করে। এ সকল জ্ঞানের উন্মেষ ঘটে এই স্তরে অগমণ হেতু তার  গভীর উপলব্ধি থেকে। চতুর্থ স্তর  “জ্ঞান”শুধু নয় এটি  “প্রজ্ঞা”-র স্তর।

ধর্ম–দর্শনে এর ব্যাখ্যা

হিন্দু যোগ - হিন্দু দর্শনে আত্মার বিবর্তনের প্রথম স্তরকে “তামসিক” স্তর বলে। এটা অন্ধকার, অজ্ঞতা, বিভ্রান্তির স্তর। জীব আত্মা তখনো মায়ার পর্দায় ঢাকা। নিজের স্বরূপ সম্পর্কে অচেতন। আর দ্বিতীয় স্তরটিকে “রাজসিক” স্তর বলে। এ স্তরে মানুষের ভেতরের শক্তি, মানসিক চাহিদা ও চিন্তার জন্ম হয়। আধ্যাত্মিকতার প্রথম ধাপ শুরু হয়। তৃতীয় স্তরে এসে কুন্ডলিনী শক্তির প্রথম জাগরণ হয়।মানসিক ক্ষমতার বৃদ্ধি ঘটে। তারপর চতুর্থ স্তরে হলো “ব্রহ্ম” উপলব্ধি। যেখানে আত্মা ও ব্রহ্ম একাকার। তখন উপলব্ধি আসে “অহং ব্রহ্মাস্মি” — আমি ব্রহ্ম।

বৌদ্ধ ধ্যান – বৌদ্ধধর্মে প্রথম স্তরে আত্মার অবস্থাকে বলা হয় “অবিদ্যা” অবস্থা —যেখানে মানুষ বাস্তবতার প্রকৃত স্বরূপ দেখতে পায় না। চক্রাকারে জন্ম-মৃত্যুর বন্ধনে আবদ্ধ থাকে। দ্বিতীয় স্তরে এসে এটি ‘স্মৃতি ও সচেতনতা’ জন্মানোর আদি ধাপে উন্নীত হয়। অবিদ্যা এখনো প্রবল, তবে জ্ঞানতৃষ্ণার জন্ম হয়। তৃতীয় স্তরে মনের ক্ষমতার বৃদ্ধির ফলে অন্তর্দৃষ্টির সূচনা হয়। বুদ্ধ বলেছেনঃ মনই সব কিছুর উৎস। ধ্যানের মাধ্যমে অন্তর্দৃষ্টি তৈরি হয়। তবে চতুর্থ স্তরে উপনীত হওয়া হলো নির্বাণ লাভের প্রাথমিক স্তর। আত্মা সম্পূর্ণরূপে কুসংস্কারমুক্ত হয়। 

সুফি তরিকায় চেতনার প্রথম স্তরকে নাফসে আম্মারা বলা হয় । এটা আত্মার অনিয়ন্ত্রিত ও অপরিপক্ক অবস্থা। সেখানে প্রবৃত্তি দ্বারা সে নিয়ন্ত্রিত। দ্বিতীয় স্তরকে বলে নফসে লাওয়ামা। এখানে আত্মা ভুল - সঠিকের বিচার করতে শুরু করে। তৃতীয় স্তরে আত্মার উপলব্ধির সঞ্চার হয়। শুরু হয় জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা। চতুর্থ  স্তরে এসে  মানুষ “হক্কুল ইয়াকিন” অনুভব করে। সে সত্যকে চোখে নয়, হৃদয় দিয়ে দেখে।

খ্রিস্টীয় মিস্টিসিজম –আত্মার প্রথম স্তরকে “spiritual infancy” বা আত্মার শৈশব অবস্থা বলে। এখানে মানুষ পাপ বা ভুলের অন্ধকারে আবদ্ধ থাকে। সত্যের আলো তখনো তার কাছে পৌঁছেনি। দ্বিতীয় স্তর হলো spiritual awakening–এর প্রথম পর্যায়। মানুষ বুঝতে পারে যে তার থেকেও উচ্চ কোন শক্তি বিদ্যমান। তৃতীয় স্তরে  মনের গভীর উপলব্ধির প্রস্ফূরণ ঘটে। চতুর্থ স্তরে শুরু হয় Mystic vision. ইশ্বরের আলো হৃদয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

তাওবাদের দাও এর সরাসরি উপলব্ধি ঘটে। প্রকৃতি আর স্রষ্টা অবিচ্ছেদ্য । একই নিয়মে একীভূত।  

সব ধর্মেই  চতুর্থ স্তর পরম সত্তার  উপলব্ধি অনুভব করে। 

আধ্যাত্মিক জ্ঞানের পরিপূর্ণতা — হৃদয় ও যুক্তির মিলন

এ স্তরে জ্ঞান আর বুদ্ধির লড়াই শেষ। আত্মা এমন ভারসাম্য অর্জন করে যা, না আবেগপ্রবণ, না কঠোর যুক্তিবাদী। বরং মাপা, শান্ত, গভীর। এই স্তরে এসে মানুষ  আধ্যাত্মিকভাবে অত্যন্ত  সংবেদনশীল। তাদের মন স্ফটিকের মতো স্বচ্ছতা ধারণ করে।

এ স্তরে মানুষ শুধু জ্ঞানের অধিকারী হয় না, জ্ঞানকে মানুষ প্রয়োগ করতে শেখে। সে অন্যকে সাহায্য করা, সত্য বলা, অহং ত্যাগ করা,ধৈর্য ধারণ করা, অনিশ্চয়তার  মধ্যে শান্ত থাকার গুণগুলো ধারণ করে। এগুলো আর শিক্ষার পর্যায়ে থাকে না, স্বভাব হয়ে দাঁড়ায়। এ স্তরে মানুষ বুঝে জ্ঞানই আলো। আলোর অধিকারী হওয়ার মানে হলো আলো অন্যের কাছে পৌঁছে দেওয়া। নিঃস্বার্থ ভালবাসার স্ফূরণ পরিলক্ষিত হয়।

সৃষ্টির প্রকৃতির উপলব্ধি — নিজের অবস্থানের জ্ঞান

এ স্তরে এসে মানুষ উপলব্ধি করে সৃষ্টি আছে, সৃষ্টি চলে কোন একটি সুনির্দিষ্ট  নিয়মে, কেউই একা নয়,সব কিছুই সংযুক্ত, পরস্পর নির্ভরশীল। সব প্রাণের অস্তিত্ব মূল্যবান। এই উপলব্ধি মানুষকে গভীর ভাবে  নম্র করে তোলে । সে “আমি” কেন্দ্রিক  ভাবনা থেকে সরে এসে হয়ে ওঠে বিশ্বজনীন। 

আধ্যাত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রজ্ঞার শুদ্ধতা — আবেগের উত্তরণ

এ স্তরের মানুষের আবেগ থাকে, কিন্তু আবেগ তাকে নিয়ন্ত্রণ করে না। তার ভয় নেই, ক্ষোভ নেই, অহং নেই, লোভ নেই। এই স্তরে সে যেন একজন নিখাদ মানুষে পরিণত হতে থাকে।

অনেক ক্ষেত্রে সে পূর্বজন্ম মনে করতে পারে। কারণ-ফলাফল চক্রের প্রকৃতি বোঝে। মৃত্যুকে ভয় পায় না। জন্ম-মৃত্যুর ঘূর্ণি তার সামনে স্পষ্টরূপে পরতীয়মান হয়। এদের জীবন দীর্ঘ হয় মানসিক শান্তির কারণে, শারীরিক সংবেদনশীলতার কারণে এদের জীবন দীর্ঘ হয়।

ধর্ম মতে এ অবস্থার ব্যাখ্যা

হিন্দু  জ্ঞানযোগ অনুসারে এ অবস্থা হলো জ্ঞানকে শুদ্ধ করা, দ্বৈত-অদ্বৈত ভেদ মুছে ফেলা।

বুদ্ধধর্ম  বলে আরহত অবস্থা। আত্মিক শান্তি, মুক্ত মন, লৌকিক আবেগের ক্ষয় ঘটা।

সুফিবাদে একে ফানা অবস্থায় উপনীত হওয়া বলে, যেখানে আত্মা নিজেকে হারিয়ে পরমের সাথে মিলিত হয়।

খ্রিস্টীয় মিস্টিক অনুসারে এ অবস্থা হলো  union with God যেখানে  ঈশ্বরের সঙ্গে মিলন ঘটা। love, compassion, truth এর সাক্ষাত পাওয়া যায়।

তাওবাদ — sage অবস্থা। মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে একীভূত হওয়ার অবস্থা হলো চতির্থ স্তর ।

সব দর্শনেই চতুর্থ স্তর “অহং থেকে নিস্তারের স্তর”।

আত্মার দায়িত্ব — সৃষ্টির নিয়ম পালন করা

এ স্তরে মানুষ বুঝতে পারে “আত্মা শক্তির  দায়িত্ব আছে।” তার সত্য, তার আলো। আলো মানে জ্ঞান।  সৃষ্টির  ভারসাম্য রক্ষায় একে ব্যবহার করতে হবে। এ স্তরে আত্মা  তার  ব্যক্তিগত লাভ লোকসান  নিয়ে চিন্তা করে না। সে কাজ করে সৃষ্টির বৃহত্তর কল্যাণে।

 অন্ধ বিশ্বাসের মৃত্যু

এ স্তরে অন্ধ বিশ্বাস ভেঙে যায়। মানুষ আর ধর্মীয় ভীতি, পুরাণ, কুসংস্কার, অন্ধ আচার — কোনো কিছুর কাছে মাথা নত করে না। সে জানে—

• সত্য পরীক্ষা করা যায়

• সত্য যুক্তিতে টিকে থাকে

• সত্য অভিজ্ঞতায় প্রমাণিত হয়

এ কারণেই রবীন্দ্রনাথ  ‘রূপনারানের কূলে’ কবিতায় কবির উপলব্ধিঃ 

‘সত্য যে কঠিন,

কঠিনেরে ভালোবাসিলাম,

সে কখনো করে না বঞ্চনা।'

উপসংহার — আলোর দিকে উত্তরণ

তৃতীয় স্তর জ্ঞানের দ্বার খুলে দেয়।  চতুর্থ স্তর সেই জ্ঞানকে বাস্তবায়ন করে। এ স্তরে আত্মা পরিপক্ব, মুক্ত, উন্নত, ধীর, স্থির শান্ত,  আলোকিত। চতুর্থ স্তর আত্মার কাছে সেই বার্তা পৌঁছে দেয় যে এখন তুমি  সামনে এগোও, পঞ্চম স্তরের সৃষ্টিশীল জীবনে।

ক্রমশঃ  


সৃষ্টি, চেতনা ও আত্মার চিরন্তন যাত্রা -তৃতীয় স্তর

  ভূমিকাঃ 


সুইজারল্যান্ডে বসবাসকারী এডয়ার্ড আলবার্ট মায়্যার (Eduard Albert Meier) — সাধারণভাবে  বিলি মায়্যার “Billy Meier” নামে পরিচিত একজন বিশ্ব বিখ্যাত ইউ. এফ.  ও. কন্টাক্টি। প্লেজেরিয়ান  (Plejaren) নামক নক্ষত্র মন্ডলী থেকে আগত ভীন গ্রহের মানব সদৃশ প্রানীদের সাথে বাল্যকাল থেকেই, মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই  তার সাক্ষাত ঘটে। তখন ১৯৪২ সাল। যোগাযোগের ধারা অনুসারে বিলির সাথে তথ্যের ট্রান্সমিশান শুরু হয় ১৯৭৫ থেকে। তার সংরক্ষিত কন্টাক্ট নোট সমূহ লিপিবদ্ধ আকারে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে। সে সময় থেকে তাকে বলা তথ্যসমূহ টেপ রেকর্ডারে ধারণ করা হয়েছে। তারই কন্টাক্ট নোটে 'সৃষ্টি, চেতনা ও আত্মার চিরন্তন যাত্রা' -র   সাতটি স্তর বর্ণনা করা হয়েছে। এই বর্ণনাটুকু আমি আরেকটু বিশদ ভাবে লেখার চেষ্টা করলাম মাত্র। বুদ্ধিবৃত্তিক জীবন — জ্ঞানের সূর্যোদয় এবং আত্মার উন্মেষ
দ্বিতীয় স্তরের আত্মা যখন অনুধাবন করতে পারে যে “বিশ্বাস” আর “ভয়” যথেষ্ট নয়,  তখন জন্ম নেয় প্রশ্ন, যুক্তি, অনুসন্ধানের। এই স্তর মানুষের চেতনার প্রকৃত স্বরূপ জাগরণের সময়।  এ স্তরে অনুভূতিকে অন্ধভাবে আত্মা গ্রহণ করতে চায় না। বরং সে ব্যাখ্যা চায়ঘটনার পিছনে কারণ চায়। এ থেকেই শুরু হয় বুদ্ধিবৃত্তিক অধ্যায়ের সূচনা। আত্মা যেন আলোর দিকে এগিয়ে যায়। আকাশ তখনো ফ্যাকাশে, তবে সোনালি রঙের প্রথম রেখাগুলো দিগন্তে উঁকি দিচ্ছে। 
এই স্তরেই মানুষ শেখে— 'আমি ভাবতে পারি। আমি প্রশ্ন করতে পারি। আমি জানতে পারি।' এই বক্তব্যই বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনার জন্ম দেয়। এ স্তরে মানুষের বুদ্ধিবোধ পরিপক্ব হতে শুরু করে। সে চিন্তা করে, পর্যবেক্ষণ করে, তুলনা করে, সিদ্ধান্ত নেয়। সে বুঝতে পারে, অন্ধ বিশ্বাস তাকে পথ দেখাতে পারবে না। সত্য জানতে হলে তাকে জানতে হবে দুটো বিষয় –কেন, কিভাবে ?এখানে যুক্তি প্রথমবারের শক্ত, দৃঢ়, সংহত হয়।
ধর্ম ও দর্শনে তৃতীয় স্তরের ব্যাখ্যাঃ
উপনিষদীয় জ্ঞানঃ উপনিষদে বলা হয়েছে— “জ্ঞানই মুক্তির পথ।” এ পর্যায়ে মানুষ “জিজ্ঞাসা” থেকে “জ্ঞান” অর্জনের পথে পা বাড়ায়।
বৌদ্ধ দর্শনে আছে সম্যক-দৃষ্টির ধারণা। এটি বোধির পথে প্রথম পদক্ষেপ। ধর্ম, কুসংস্কার নয়, জ্ঞান ও বুদ্ধিবাদ এ স্তরে প্রভাব বিস্তার করে।
খ্রিস্টধর্মে বলে, “বুদ্ধি” বা “ঈশ্বরীয় যুক্তি” ব্রহ্মাণ্ডের কাঠামোর ভিত্তি।
সব দর্শনে সৃষ্টি, চেতনা ও আত্মার চিরন্তন যাত্রার তৃতীয় স্তরে এসে বুদ্ধির দ্বারা শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
আধ্যাত্মিক শক্তির সূক্ষ্ম স্পন্দন — জ্ঞানের গভীরতাঃ
এই স্তরে এসে মানুষ শুধু বিজ্ঞানী নয়, শুধু দার্শনিক নয় — সে উভয়ই। তার ভেতরে সঞ্চিত আধ্যাত্মিক শক্তির জাগরণ ঘটে।  অনেকে  অন্তর্দৃষ্টি,টেলিপ্যাথি অনুভব করে।  ভবিষ্যৎ অনুধাবন করা, গভীর ধ্যানে মগ্ন হওয়ার মত গুণাগুন লব্ধ করে। এগুলো কোনো অলৌকিক বিষয় নয়। এ হলো চেতনা-বিকাশের স্বাভাবিক ফল।
তুলনামূলক ব্যাখ্যাঃ
হিন্দু যোগ - হিন্দু দর্শনে আত্মার বিবর্তনের প্রথম স্তরকে “তামসিক” স্তর বলে। এটা অন্ধকার, অজ্ঞতা, বিভ্রান্তির স্তর। জীব আত্মা তখনো মায়ার পর্দায় ঢাকা। নিজের স্বরূপ সম্পর্কে অচেতন। আর দ্বিতীয় স্তরটিকে “রাজসিক” স্তর বলে। এ স্তরে মানুষের ভেতরের শক্তি, মানসিক চাহিদা ও চিন্তার জন্ম হয়। আধ্যাত্মিকতার প্রথম ধাপ শুরু হয়। তৃতীয় স্তরে এসে কুন্ডলিনী শক্তির প্রথম জাগরণ হয়।মানসিক ক্ষমতার বৃদ্ধি ঘটে।
বৌদ্ধ ধ্যান – বৌদ্ধধর্মে প্রথম স্তরে আত্মার অবস্থাকে বলা হয় “অবিদ্যা” অবস্থা —যেখানে মানুষ বাস্তবতার প্রকৃত স্বরূপ দেখতে পায় না। চক্রাকারে জন্ম-মৃত্যুর বন্ধনে আবদ্ধ থাকে। দ্বিতীয় স্তরে এসে এটি ‘স্মৃতি ও সচেতনতা’ জন্মানোর আদি ধাপে উন্নীত হয়। অবিদ্যা এখনো প্রবল, তবে জ্ঞানতৃষ্ণার জন্ম হয়। তৃতীয় স্তরে মনের ক্ষমতার বৃদ্ধির ফলে অন্তর্দৃষ্টির সূচনা হয়। বুদ্ধ বলেছেনঃ “মনই সব কিছুর উৎস।” ধ্যানের মাধ্যমে অন্তর্দৃষ্টি তৈরি হয়।
সুফি তরিকায় চেতনার প্রথম স্তরকে নাফসে আম্মারা বলা হয় । এটা আত্মার অনিয়ন্ত্রিত ও অপরিপক্ক অবস্থা। সেখানে প্রবৃত্তি দ্বারা সে নিয়ন্ত্রিত। দ্বিতীয় স্তরকে বলে নফসে লাওয়ামা। এখানে আত্মা ভুল - সঠিকের বিচার করতে শুরু করে। তৃতীয় স্তরে আত্মার উপলব্ধির সঞ্চার হয়। শুরু হয় জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা।
খ্রিস্টীয় মিস্টিসিজম- আত্মার প্রথম স্তরকে “spiritual infancy” বা আত্মার শৈশব অবস্থা বলে। এখানে মানুষ পাপ বা ভুলের অন্ধকারে আবদ্ধ থাকে। সত্যের আলো তখনো তার কাছে পৌঁছেনি। দ্বিতীয় স্তর হলো spiritual awakening –এর প্রথম পর্যায়। মানুষ বুঝতে পারে যে তার থেকেও উচ্চ কোন শক্তি বিদ্যমান। তৃতীয় স্তরে  মনের গভীর উপলব্ধির প্রস্ফূরণ ঘটে।
তৃতীয় স্তরের বৈশিষ্ট্য হলো আত্মা কুসংস্কারের ভাঙন ও বিশ্বাস থেকে যুক্তির দিকে সরে আসা। এ স্তরে মানুষ তার পূর্বের অন্ধ আস্থাগুলোর বিপক্ষে প্রশ্ন করে। যেমন -
• কেন দেবতা রাগ করে?
• নিয়ম কে বানিয়েছে?
• প্রকৃতি কি সত্যিই শাস্তি দেয়?
এই প্রশ্নগুলি পুরোনো বিশ্বাসের দেয়াল ভেঙে দেয়। এ স্তরে উপনীত হলে অনুসন্ধিৎসু মন সবকিছুর মাঝে অগ্রহ তৈরী করে।   মানুষ বই পড়ে, গবেষণা করে, ইতিহাস খুঁজে দেখে, বিজ্ঞান বোঝার চেষ্টা করে। সে মনে করে, বিশ্বাসকে নয়, সত্যকে গ্রহণ করো। মানুষ প্রকৃতির নিয়ম উপলব্ধি করতে শেখে। বিজ্ঞান ও দর্শনের মিলন ঘটাতে চেষ্টা করে। মানুষ এ স্তরে বুঝতে পারে—বিশ্ব কোনো রহস্য নয়; এটি নিয়মে চলে। সে উপলব্ধি করে—মহাকর্ষ, বায়ুপ্রবাহ, ঋতু পরিবর্তন, জন্ম-মৃত্যু - সবই প্রকৃতির নিয়ম। এবং ঘটনাগুলো শৃঙ্খলাবদ্ধ। এ উপলব্ধি মানুষকে “ধর্মীয় ভয়” থেকে মুক্ত করে।
সব ধর্মেই তৃতীয় স্তরে “জ্ঞান-অনুসন্ধান” গুরুত্ব পায়।
• বৌদ্ধধর্মে অনুসারেঃ বুদ্ধ নিজেই কুসংস্কার ভেঙে যুক্তির পথ প্রদর্শন করেছেন। বৌদ্ধধর্ম যেমন বলে “প্রতীত্য সমুৎপাদ”—সবকিছু কারণ-ফল দ্বারা চলছে।
• হিন্দু দর্শনেঃ উপনিষদে  জ্ঞানকে প্রাধান্য দেওয়া। হিন্দুধর্ম অনুসারে “কর্মফল” ধারণার আবির্ভাব হয়। এই ধারণা মতে  প্রতিটি কাজের ফল আছে।
খ্রিস্টধর্ম অনুসারে ঈশ্বরের নিয়ম অনুযায়ী প্রকৃতি চলে।
সব ধর্মই স্বীকার করে— বিশ্ব নিয়মের অধীন। এ স্তরে মানুষ উপলব্ধি করে জ্ঞানই মুক্তির পথ। তার ভেতর জন্ম নেয় সত্যের তৃষ্ণা, গবেষণার আকাংখা, জ্ঞানের আলোয় এগোনোর অদম্য ইচ্ছা। এখানে থেকেই জন্ম নেয় দার্শনিক, বিজ্ঞানী, গবেষক, সাধক ও প্রজ্ঞাবান মানুষ। এ স্তর আত্মাকে নিয়ে যায় তৃতীয় স্তরের শিখর থেকে চতুর্থ স্তরের পরিপূর্ণ সত্যের পথে।
আজকের আধুনিক বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত হলেও চেতনাগতভাবে তৃতীয় স্তরের মধ্যভাগে অবস্থান করছে। এবং চতুর্থ স্তরে উন্নীত হবার পথে। আমাদের মনে প্রশ্নের সঞ্চার হয়, আমরা  প্রশ্ন করি, বিজ্ঞান চর্চা করি, বিজ্ঞানের সূত্রগুলো অনুসরণ করি, আধ্যাত্মিকতার অনুসন্ধান করি । বিশ্বাসকে যাচাই করবার চেষ্টা করি।কিন্তু এখনো পুরোপুরি চতুর্থ স্তরে পৌঁছাইনি। তবে পৌঁছাতে বেশী দেরীও নেই।

১৬/১১/২০২৫
ক্রমশঃ

সৃষ্টি, চেতনা আত্মার চিরন্তন যাত্রা -দ্বিতীয় স্তর

যুক্তিনির্ভর জীবন — বোধের প্রথম অঙ্কুরোদ্গম


প্রথম স্তরের অন্ধকার যখন ধীরে ধীরে সরে যায়,  আত্মার সামনে তখন উন্মোচিত হয় “বোধের আলো”। যেমন ভোরের প্রথম সূর্যের  আলোক রশ্মি  ধীরে ধীরে রাতের অতল অন্ধকার ভেঙে দেয়, তেমনি এ স্তরে আলো এখনো পূর্ণ নয়, কিন্তু উপস্থিত। অজ্ঞতার কুয়াশা এখনো ঘন, কিন্তু তার ভেতরেই জন্ম নেয় চিন্তার প্রথম তরঙ্গ, প্রথম অনুভূতি।এ স্তরে আত্মা উপলব্ধি করতে শেখে—
“আমি কেবল আছি তা নই ; আমি উপলব্ধি করতে  চাই।” এই বোঝার উপলব্ধি মানুষকে প্রাণীর স্তর থেকে পৃথক করে দেয়।
দ্বিতীয় স্তরে শুরু হচ্ছে আত্মার বিবর্তনের প্রথম সক্রিয়তা। এ সময় আত্মা প্রথম বুঝতে পারে যে সে স্রেফ যান্ত্রিকভাবে বাঁচে না; সে জানতে চায়, উপলব্ধি করতে চায়।
চিন্তার চারা একটু একটু করে বেড়ে ওঠে। এ চিন্তা জটিল নয়, গভীর নয়, পরিপূর্ণ নয় কিন্তু বিকাশমান। এখানেই চেতনার “অপরিণত যুক্তি” প্রথম জন্ম নেয়। মানুষ দেখা থেকে শেখে, অভিজ্ঞতা থেকে বিচার করে, পরিবেশ থেকে সিদ্ধান্ত নেয়। যদিও সিদ্ধান্তগুলো প্রায়ই ভুল হয়, তবুও এই ভুলই তাকে শেখায়।
হিন্দু দর্শনে  আত্মার বিবর্তনের প্রথম স্তরকে “তামসিক”  স্তর বলে। এটা  অন্ধকার, অজ্ঞতা, বিভ্রান্তির স্তর। জীব আত্মা তখনো মায়ার পর্দায় ঢাকা।নিজের স্বরূপ সম্পর্কে অচেতন। আর দ্বিতীয়  স্তরটিকে  “রাজসিক”  স্তর বলে। এ স্তরে মানুষের  ভেতরের  শক্তি, মানসিক  চাহিদা ও চিন্তার জন্ম হয়। আধ্যাতিকতার প্রথম ধাপ শুরু হয়। 
বৌদ্ধধর্মে প্রথম স্তরে আত্মার অবস্থাকে  বলা হয় “অবিদ্যা” অবস্থা —যেখানে মানুষ বাস্তবতার প্রকৃত স্বরূপ দেখতে পায় না। চক্রাকারে জন্ম-মৃত্যুর বন্ধনে আবদ্ধ থাকে। দ্বিতীয় স্তরে এসে এটি ‘স্মৃতি ও সচেতনতা’ জন্মানোর আদি  ধাপে উন্নীত হয়। অবিদ্যা এখনো প্রবল, তবে জ্ঞানতৃষ্ণার জন্ম হয়।
খ্রিস্টধর্মে আত্মার প্রথম স্তরকে “spiritual infancy” বা আত্মার শৈশব অবস্থা বলে। এখানে মানুষ পাপ বা ভুলের অন্ধকারে আবদ্ধ থাকে। সত্যের আলো তখনো তার কাছে পৌঁছেনি। দ্বিতীয় স্তর হলো  spiritual awakening–এর প্রথম পর্যায়। মানুষ বুঝতে পারে যে তার থেকেও উচ্চ কোন শক্তি বিদ্যমান।
সুফি দর্শনে চেতনার প্রথম স্তরকে নাফসে আম্মারা বলা হয় । এটা আত্মার অনিয়ন্ত্রিত ও অপরিপক্ক  অবস্থা। সেখানে প্রবৃত্তি দ্বারা সে নিয়ন্ত্রিত। দ্বিতীয় স্তরকে বলে নফসে লাওয়ামা।  এখানে আত্মা ভুল - সঠিকের বিচার করতে শুরু করে।
তাওবাদ (Taoism বা Daoism) হলো চীনের এক প্রাচীন দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক মতবাদ, যার মূল ভিত্তি হলো প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জীবনযাপন করা।  তাওবাদে  প্রথম স্তরটি  এমন একটি অবস্থা  যেখানে আত্মা “অচেতন দাও” ।  যেখানে মানুষ প্রকৃতির স্রোত বুঝতে পারে না। দ্বিতীয় স্তর হলো  “দাও-এর প্রথম অনুভব”— তাও সবকিছু  বুঝতে না পারলেও সে তার অস্তিত্ব অনুভব করতে পারে।
সব ধর্ম ও দর্শনে দ্বিতীয় স্তর “জাগরণের সূচনা”— তবে সম্পূর্ণ জ্ঞান অধিকারের স্তর নয়।  বরং এই স্তরে আংশিক জ্ঞানের আলো,  আত্মাকে বিকশিত করতে সহায়  হয়। তখন প্রশ্ন আসে মনে ।  মানুষ প্রথমবার “কারণ” ও “ফলাফল” সম্পর্কে চিন্তা করতে শুরু করে। প্রথমস্তরে  বজ্রধ্বনি ছিল ভয়, এখন তা রহস্য। আগে তার নদী দেখে মনে হতো শুধু পানি। এখন সে জানতে চায় কেন নদী বয়ে যায়। এই প্রশ্নের জন্মই তাকে জ্ঞানের দিকে পা বাড়াতে সাহায্য করে। এই পর্যায়ে মানুষ ভুল-সঠিকের মাঝখানে থাকে। তবে পূর্বের অজ্ঞানতার  আঁধার ভেদ করে “আলো” আর “সত্য”-র  স্পর্শ শুরু হয় । 
মানুষ বুঝতে পারে, ‘আমার থেকেও বড় কোন শক্তি বিদ্যমান।’ সে চারিদিকে তাকায়। সে অবলোকন করে প্রভাত হলে সূর্য ওঠে, সন্ধ্যা হলে সূর্য অস্ত যায়। প্রকৃতিতে ঝড় হলে  বাতাস বয়ে যায়, বৃষ্টি নামে, বজ্র পড়ে, দিন ও রাতের বদল হয়। এ সব পরিবর্তন  মনোজগতকে প্রভাবিত করে। তার ভেতর জন্ম নেয় কোন এক অপরিচিত মহাশক্তির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। এই অবস্থায় মানুষের মনে গড়ে ওঠে দেবতার অস্তিত্ব, শক্তিকে আরাধনা, প্রকৃতির পূজা, উপাসনা।
এ স্তরে ~  
হিন্দুধর্ম অনুসারেঃ  সূর্য, বৃষ্টি, বায়ু, অগ্নি — এদের দেবতা রূপ দেওয়ার চিন্তার সূত্রপাত ঘটে।
গ্রিক ধর্ম অনুসারেঃ জিউস, অ্যাপোলোর মতো প্রকৃতি নিয়ন্ত্রক  দেবতার অস্তিত্বকে অহবান করা হয়।
শিন্তো ধর্ম অনুসারেঃ পর্বত নদী, বজ্র — প্রকৃতির সবকিছুর মাঝে আত্মা আছে বিশ্বাস করা হয়।
আফ্রিকান উপজাতির ধর্ম অনুসারে বজ্র-দেবতা, বৃষ্টি-দেবতার অস্তিত্ব প্রকৃতিতে বিরাজমান বলে উপলব্ধি করা।
এই স্তরে মানুষ বিশেষ কিছু না জানলেও উচ্চতর কোন এক শক্তিকে উপলব্ধি করে। যথার্থ  জ্ঞান না থাকায় মানুষ সূর্যকে দেবতা বলে, বৃষ্টিকে পূজা করে, পাহাড়কে রক্ষাকর্তা ভাবে, নদীকে মাতৃরূপ দেয়। এস্তরে এ সকল অনুভূতির সৃষ্টি হয় চেতনার বিবর্তনে। ফলে এই স্তর কল্পনাশক্তিকে সমৃদ্ধ করে তোলে। অনেক ক্ষেত্রে সাহিত্য জন্মায়, মিথ জন্মায়। যদিও যুক্তিবাদী বিশ্লেষণ তখনো প্রাথমিক স্তরে থাকে।
অতিপ্রাকৃত শক্তি ও কুসংস্কার  অজ্ঞতা এবং ভয় থেকে সৃষ্টি হয়। ফলে এই পর্যায়ে মানুষ ভয়কে বিশ্বাসে রূপ দেয়। দানব, পিশাচ,অশুভ আত্মা, ভূত, দেবতাদের অভিশাপ – এসব  ধারণা জন্ম নেয়  অজ্ঞানতা ও ভয় থেকে। এই স্তরে ধর্মের মৌলিক রূপ জন্ম নেয়, কিন্তু তার মধ্যে যুক্তি কম থাকে, কল্পনা বেশি। সে কারণে দ্বিতীয় স্তরে  বাস্তবতার প্রাথমিক স্বীকৃতি মেলে  জ্ঞানের  অনুভবে। জ্ঞানের মাধ্যমে নয়।  মানুষ প্রথমবার উপলব্ধি করে পৃথিবীর  বাস্তবতা, মৃত্যুর সত্যতা, জীবনের সীমাবদ্ধতা ও কর্মফল। সে  অনুভব করে —বিশ্বের একটি নিয়ম রয়েছে। এই স্তরই  আধ্যাত্মিকতার প্রথম ধাপ। 
উপলব্ধির প্রথম উন্মেষ  আত্মার উত্তরণের দ্বার উন্মোচিত করে। সময়, অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান তাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। সে শিখতে চায়, পড়তে চায়, ভাবতে চায়। প্রশ্ন করে, বিশ্লেষণ করতে শুরু করে। যখন এই “জ্ঞান তৃষ্ণা” যথেষ্ট শক্তিশালী হয় তখনই আত্মা প্রবেশ করে তৃতীয় স্তরে।  বুদ্ধিবৃত্তিক স্তরে। 
ক্রমশঃ

সৃষ্টি, চেতনা ও আত্মার চিরন্তন যাত্রা - প্রথম স্তর

 ভূমিকাঃ             

                                                                                                                                    

সুইজারল্যান্ডে বসবাসকারী এডয়ার্ড আলবার্ট মায়্যার (Eduard Albert Meier) — সাধারণভাবে  বিলি মায়্যার “Billy Meier” নামে পরিচিত একজন বিশ্ব বিখ্যাত ইউ. এফ.  ও. কন্টাক্টি। প্লেজেরিয়ান  

সুইজারল্যান্ডে বসবাসকারী এডয়ার্ড আলবার্ট মায়্যার (Eduard Albert Meier) — সাধারণভাবে  বিলি মায়্যার “Billy Meier” নামে পরিচিত একজন বিশ্ব বিখ্যাত ইউ. এফ.  ও. কন্টাক্টি। প্লেজেরিয়ান  (Plejaren) নামক নক্ষত্র মন্ডলী থেকে আগত ভীন গ্রহের মানব সদৃশ প্রানীদের সাথে বাল্যকাল থেকেই, মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই  তার সাক্ষাত ঘটে। তখন ১৯৪২ সাল। যোগাযোগের ধারা অনুসারে বিলির সাথে তথ্যের ট্রান্সমিশান শুরু হয় ১৯৭৫ থেকে। তার সংরক্ষিত কন্টাক্ট নোট সমূহ লিপিবদ্ধ আকারে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে। সে সময় থেকে তাকে বলা তথ্যসমূহ টেপ রেকর্ডারে ধারণ করা হয়েছে। তারই কন্টাক্ট নোটে 'সৃষ্টি, চেতনা ও আত্মার চিরন্তন যাত্রা' -র   সাতটি স্তর বর্ণনা করা হয়েছে। এই বর্ণনাটুকু আমি আরেকটু বিশদ ভাবে লেখার চেষ্টা করলাম মাত্র।

সাতটি স্তরের মাঝে প্রথম স্তরঃ

এ যেন  অন্ধকারের গর্ভে প্রথম আলোর জাগরণ। আত্মা এখানে যেন সদ্যজন্ম নেওয়া একটা ছোট্ট চারাগাছ। চারপাশ ঘন অন্ধকারে ঢেকে আছে। বাস্তবতা তার কাছে  যেন কুয়াশার ভেতরে আটকে থাকা অস্পষ্ট একটি চিত্র। অভিজ্ঞতাহীন। তার কাছে  সত্য-মিথ্যার পার্থক্য নেই, আলো-অন্ধকারের সীমারেখা নেই, কোনো  দিকনির্দেশনয়া নেই। এ যেন সৃষ্টির প্রথম মুহূর্ত—অব্যক্ত থেকে ব্যক্তের দিকে  যাত্রার সূচনা।

হিন্দুধর্মে এই অবস্থাকে  “তামসিক”  স্তর বলা হয়—অন্ধকার, অজ্ঞতা, বিভ্রান্তির স্তর। জীবাত্মা তখনো মায়ার পর্দায় ঢাকা—নিজের স্বরূপ সম্পর্কে অচেতন। 

বৌদ্ধধর্মে এটি  “অবিদ্যা”—যেখানে মানুষ বাস্তবতার প্রকৃত স্বরূপ দেখতে পায় না। চক্রাকারে জন্ম-মৃত্যুর বন্ধনে আবদ্ধ থাকে। 

সূফি দর্শনে এটি “নাফসে আম্মারা”—আত্মার অনিয়ন্ত্রিত ও অপরিপক্ক  অবস্থান। যেখানে প্রবৃত্তি দ্বারা সে নিয়ন্ত্রিত।

খ্রিস্টধর্মে এটি “spiritual infancy” বা আত্মার শৈশব অবস্থা বলে। এখানে মানুষ পাপ বা ভুলের অন্ধকারে আবদ্ধ থাকে—সত্যের আলো এখনো তার কাছে পৌঁছেনি। 

তাওবাদ (Taoism বা Daoism) হলো চীনের এক প্রাচীন দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক মতবাদ, যার মূল ভিত্তি হলো প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জীবনযাপন করা।  তাওবাদে  প্রথম স্তরটি  এমন একটি অবস্থা  যেখানে এটি “অচেতন দাও” অর্থাৎ  যেখানে মানুষ প্রকৃতির স্রোত বুঝতে পারে না। 

সকল দর্শনে একটি মিল  লক্ষ্যণীয় আর তা হলো প্রথম স্তরে আত্মা অজ্ঞতার গভীরতায়,  দিকহীনতায় অবস্থান করে। 

আত্মার স্পন্দনঃ

এই অবস্থায় আত্মার গভীরতম কেন্দ্রের শক্তি প্রথমবারের মত যেন স্পন্দিত হয়। প্লেটোর দর্শনে এটি “awakening of the soul”—অপরূপ জগতে, স্মৃতির প্রথম প্রবেশ। প্লেটো বলেন, আত্মা সব জানে, শুধু স্মরণ করতে হয়। 

উপনিষদে এটি “প্রথম প্রজ্ঞার অঙ্কুর” অর্থাৎ প্রাণশক্তি জাগ্রত হওয়া। 

বুদ্ধের ভাষায়, এটি “স্মৃতি জাগরণ” অবস্থা।

প্রবৃত্তিনির্ভর জীবন যাপনের দিক দিয়ে প্রাথমিক  স্তরে মানুষ কিভাবে বাঁচে?

সে প্রবৃত্তির উপর নির্ভর করেই  বাঁচে। ভয়, ক্ষুধা, টিকে থাকার সংগ্রাম সবই  সহজাত প্রবৃত্তি। যুক্তিবোধ তখনও  অপরিণত। এই স্তরে জন্ম নেয় “ইচ্ছাশক্তি”। হিন্দু দর্শনে,  সৃষ্টি শুরু হয় ইচ্ছা থেকে। বৌদ্ধধর্মে এটি “চেতনা”— যা কামনা সৃষ্টি করে এবং কর্মফল তৈরি করে। খ্রিস্টান ধর্মে এটিকে “free will” বলে, যা মানুষের প্রথম স্বাধীন ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার স্তর। সূফিবাদে এটি “ইরাদা” অর্থাৎ আল্লাহর দিকে ফেরার ইচ্ছা, যদিও সে খুবই নাজুক এবং কেবল শুরুর পথে। 

দিকহীনতায় আর  অজ্ঞতার রাজত্ব যখন চারদিকে তখন এই স্তরে মানুষ হাতড়ে  হাতড়ে এগোয়, হোঁচট খায়, থেমে যায়, আবার শুরু করে। দিশা হারায়। মনে মনে ভাবে তার সামনে কোনো নিশ্চিত পথ নেই। তবুও এই সকল অভিজ্ঞতাই  পরবর্তী স্তরের পথপ্রদর্শক। এই অভিজ্ঞতাই চেতনাবিকাশের পরবর্তী ছয়টি স্তরের ভিত্তি।

এ থেকেই জন্ম নিবে যুক্তি, জ্ঞান, প্রজ্ঞা, আধ্যাত্মিকতা, সৃষ্টির বিস্তার এবং শেষ পর্যন্ত সৃষ্টির সঙ্গে একাত্মতা।

১১/১১/২০২৫

ক্রমশঃ

প্লেইডিয়ান স্টারসিড কারা?


 Pleiadian Starseed হলো সেই সকল সত্তা বা entity,  যারা প্লেইডিস (Pleiades)  নক্ষত্রমণ্ডলে থাকে এবং সেখান  থেকে এই পৃথিবীতে এসেছে। ওদের উদ্দেশ্য আমাদের  চেতনা ও ভালোবাসার শক্তি বৃদ্ধি করা, পৃথিবীকে আরো উচ্চস্তরে (higher dimension)-এ উন্নীত করা। তারা সাধারণ মানুষের মতো মানবাকৃতি রূপে আমাদের মধ্যে বিচরণ করে। চেহারার দিক দিয়ে নর্ডিক (Nordic) দের মতন  বৈশিষ্ট্য সস্পন্ন হয়। যেমনঃ উজ্জ্বল ত্বক, ধূসর বা সোনালি চুল, নীল বা সবুজ চোখ এবং অনেক লম্বা। 

তারা  ধীরে ধীরে আমাদের সঙ্গে আরোও যোগাযোগ স্থাপন করবে। ২০২৭ সালে আনুষ্ঠানিক ভাবে আমাদের সামনে আবির্ভূত হবে। 

বৈশিষ্ট্য ও মিশন ~

তারা  স্পিরিচুয়াল এবং টেকনোলজিক্যাল খুবই উন্নত ও আধুনিক। 

তাদের মিশন হলো মানুষের  চেতনাকে আরো উন্নত স্তরে বিকশিত করা। মানুষকে “উচ্চ চেতনায় মানবে” (higher dimensional conscious being) -এ উন্নীত করা।  এবং পৃথিবীর পরিবেশ, সমাজিক ব্যবস্থায় আরোও  ইতিবাচক পরিবর্তন আনা। তারা প্রচন্ড টেলিপ্যাথিক। তাই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ সাধারণত হয়  চ্যানেলিং বা টেলিপ্যাথির মাধ্যমে। 

জ্যোতির্বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে Pleiades (প্লেইডি)~

অবস্থানঃ Pleiades নক্ষত্রগুচ্ছটি Taurus (বৃষ ) নক্ষত্রমন্ডলে অবস্থিত। নীলাম্বরী কৃত্তিকা (Pleiades) গুচ্ছনক্ষত্র। আন্তর্জাতিকভাবে এর পরিচিতি Pleiades নামে। ঋগ্বেদের ঋষিরা চিনতেন অগ্নি (দিক) বলে আর সিদ্ধান্তজ্যোতিষ-এ এটি কৃত্তিকা নামে পরিচিত।

দূরত্বঃ পৃথিবী থেকে প্রায় ৪৪৪ আলোকবর্ষ দূরে।

রূপঃ এটি একটি Open Cluster Star System  — মানে  এমন একটি নক্ষত্রগুচ্ছ যেখানে অনেকগুলো নক্ষত্র একই অঞ্চলে জন্ম নেয় এবং একসাথে থাকে। তবে তারা খুব ঘনভাবে সাজানো থাকে না—অর্থাৎ গুচ্ছটি “উন্মুক্ত”। 

বয়সঃ প্রায় ১০ কোটি বছর পুরনো, অর্থাৎ তুলনামূলকভাবে তরুণ নক্ষত্রগুচ্ছ।

কৃত্তিকার দেবতা অগ্নি। 

ভগবান অগ্নি নিজেকে পুড়িয়ে খাবার, আলো, উত্তাপ সৃষ্টি করে অপরের সেবায় ব্যবহার হয়। কৃত্তিকা নক্ষত্র নেতিবাচকতাকে পুড়িয়ে দেয়, যা মিশ্রিত হয় তা শুদ্ধ করে, এবং যা এখনও পাকা হয়নি তা রান্না বা প্রস্তুত করে। এই নক্ষত্র যুদ্ধ, যুদ্ধ এবং বিবাদের নিয়ম করে।

ঋগ্বেদে অগ্নি

পুরো ঋগ্বেদ জুড়েই ছড়িয়ে রয়েছে অগ্নি নামধারী কৃত্তিকার প্রতি অজস্র প্রার্থনা। পৃথিবী থেকে খালি চোখে অগ্নিকুণ্ডলীর মত দেখায় তাই ঋষিদের মননে এ অগ্নি বহু নামে অভিহিত।

অগ্নির বিভিন্ন নাম

জাতবেদা (জীবনশক্তি বিদিত/জ্ঞাত), হুতাশন (যজ্ঞাহুতি ভক্ষক), বহ্নি (যজ্ঞের হবি বাহক), তনুনপাৎ (জীবদেহের উত্তাপরূপী অগ্নি), নরাশংস (মানব প্রশংসিত), দাবানল (বনের আগুন), শম্পাৎ (বিদ্যুতাগ্নি), বারবানল বা বড়বা (সমুদ্র-বারিতে প্রজ্বলিত অগ্নি), শমী (বনস্পতির দহন), জমদগ্নি (ক্রোধাগ্নি), চিত্রভানু (সূর্যরশ্মি)।

অগ্নিদেব - আগুনের দেবতা

অগ্নি হলো একটি সংস্কৃত শব্দ যার অর্থ হলো আগুন । তিনি দশদিকপাল দেবতার অন্যতম অগ্নিকোণস্থ দেবতা।

অগ্নি আগুনের দেবতা এবং যজ্ঞের গ্রহীতা। অগ্নিকে দেবতাদের বার্তাবহ মনে করা হয়। তাই হিন্দুরা বিশ্বাস করেন, যজ্ঞকালে অগ্নির উদ্দেশ্যে আহুতি প্রদান করলে সেই আহুতি দেবতাদের কাছে পৌঁছে যায়।

অগ্নি চিরতরুণ, কারণ আগুন প্রতিদিন নতুন করে জ্বালানো হয় এবং তিনি অমর। তার দুই বা তিনটি মুখ। তার চার হাত। তার অস্ত্রের নাম আগ্নেয়াস্ত্র।

পৌরাণিক বর্ণনা

মার্কণ্ডেয় পুরাণে বলা হয়েছে: "হে পাবক, তোমার দ্বারাই সব কিছু সৃষ্ট হয়, তোমার দ্বারাই বর্ধিত হয়, তোমাতেই সকলের উদ্ভব, অন্তকালে তোমাতেই লীন হয়"।

অগ্নি শুধুমাত্র আগুনের দেবতা নন। তিনি পবিত্রতা, শুদ্ধিকরণ –এর দেবতা। অগ্নি  যজ্ঞের মাধ্যমে দেবতা ও মানুষের মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী হিসেবে বৈদিক ধর্মে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করেন।

আধ্যাত্মিক  দৃষ্টিতে ~

প্লেইডিয়ান - দের সভ্যতা  একটি উচ্চ ডাইমেনশানের  সভ্যতা।  তারা  শান্তি প্রিয় ও আধ্যাত্মিক  ভাবে এগুনো এক জাতি। যারা (ধারণা করা হয়) 5D (fifth dimension)এ  বসবাস করে। আমরা যেমন third dimension (3D)-এ বসবাস করি; এ মহাবিশ্বের সবচেয়ে lowest dimension - এ। তারা সবসময়ই পৃথিবীর মানুষের সঙ্গে টেলিপ্যাথিক শক্তির মাধ্যমে যোগাযোগ রাখেন। যারা আধ্যাত্ম সাধনা করেন তারা তাদের উপস্থিতি অনুভব করেন তাদের সাথে কথা বলেন।

“Starseed” এর ধারণা অনুসারে, কিছু আত্মা  Pleiades থেকে এসেছে এই পৃথিবীতে মানুষরূপে — যাদের  Pleiadian Starseeds বলা হয়।  তাদের মাঝে অনেকেই বলেন,  এই পৃথিবী তাদের "আসল বাড়ি" মনে হয় না । তারা যেন “ভিন্ন জায়গা থেকে এসেছে, অন্য কোন নক্ষত্র থেকে”। তারা  একাকিত্ব বা গভীর হোম-সিকনেসে ভুগে। (এখানে “home” মানে তাদের মূল তারকামণ্ডল যেখান থেকে তাদের সত্তার উৎপত্তি)।

তাদের মাঝে উচ্চ সংবেদনশীলতা অনুভূত হয়। যেমনঃ 

• আলো, শব্দ বা বিশৃঙ্খল পরিবেশে তাদের অস্বস্তি হয়।

• তারা সহজে ক্লান্ত হয়ে পড়েন যখন আশেপাশে নেতিবাচক শক্তি থাকে। তারা নিজের চারপাশে শান্ত ও সুষম পরিবেশ রাখতে ভালোবাসেন।

তাদের মাঝে সৃজনশীল ও শিল্পপ্রবণতা দেখা যায়। 

• তারা সঙ্গীত, আঁকা, লেখালেখি, নৃত্য বা যে কোনো সৃজনশীলতার মাধ্যমে আবেগ প্রকাশ করেন।

• তারা শিল্পের মাধ্যমে শিল্পী সত্তাকে প্রস্ফুটিত করে মানুষের হৃদয়ে তাদের শৈল্পিক  স্পর্শ আনতে চান।

তাদের পৃথিবীর প্রতি গভীর ভালোবাসা থাকে।

• পরিবেশ সংরক্ষণ, টেকসই জীবনযাপন, প্রাণীর অধিকার এবং প্রকৃতির সঙ্গে সাদৃশ্য বজায় রাখার বিষয়গুলো তাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

• তাঁরা প্রায়ই “Healers of Earth” হিসেবে বিবেচিত।

তারা উচ্চতর অন্তর্দৃষ্টি (Intuition) -র  অধিকারী হয়।

• অনেকেই বলেন, তাদের অন্তরজ্ঞান এবং ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় ‘sixth sense’ খুবই প্রখর হয়।

• তারা ভবিষ্যৎ অনুমান, স্বপ্নে  পাওয়া বার্তা , মানুষের  Aura অনুভব করার মতো শক্তির অধিকারী হয়।

তাদের সম্পর্ক ও জীবনধারা উচ্চমানের হয়। যেমনঃ

• তারা সম্পর্কগুলোতে গভীর ভালোবাসা ও সংযোগ চান। তবে প্রায়ই আঘাত পান কারণ সবাই তাদের মতো গভীরভাবে  আত্মাকে অনুভব করে না।

• প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এমন স্থানে সময় কাটাতে তারা ভালোবাসেন।  বন জংগল, নদী, পাহাড়, ঝর্ণা  তাদের মানসিক ভারসাম্য পুনরুদ্ধারে সহায়তা  করে।

পৌরাণিক মতে (Greek Mythology)

“Pleiades” নামটি এসেছে গ্রিক পুরাণ থেকে।

তারা ছিলেন টাইটান Atlas ও Oceanid Pleione-এর সাত কন্যা:


Maia

Electra

Taygete

Alcyone

Celaeno

Sterope

Merope

এই সাত কন্যাকে দেবতারা আকাশে তারারূপে স্থান দেন, যাতে তারা নিরাপদ থাকে। এই প্রতিটি নক্ষত্রই এক একটি সত্তা। কোন মাটির গোলক নয়, আগুনের পিন্ড রূপে প্রতীয়মান হলেও সম্পূর্ণ জাগ্রত সত্তা।  বোধহীন ও প্রানহীন বস্তু নয় ।


প্রফেসর চিবানী চন্দর


তখন সেকেন্ড ইয়ার ফাইনাল এক্সাম হয়ে গেছে। ল্যাব প্রাক্টিক্যাল এক্সামও হয়ে গেছে। এখন ল্যাবের ভাইভা এক্সাম শুরু হয়েছে। একে একে করে শীলাদেরকে ডাকছে। শীলারা ভাইভা-র টেবিলে যাচ্ছে। বসছে। টেবিলে ছাত্রের মুখোমুখি আছেন ইন্টারনাল। পাশে এক্সটার্নাল। এবার শীলার পালা। সেকেন্ড ইয়ারে যিনি শীলাদের ল্যাবের টিচার ছিলেন সেই ভদ্রলোক শীলার রোল ডাকলেন। শীলা গেল। ইন্টারনালের সামনে বসল। পাশে শীলাদের এক্সটারনাল ছিলেন। উনি হয়তোবা পাশের ডিপার্টমেন্ট থেকে এসেছিলেন। শীলা তো আর ওনাকে চিনে না। সবাই যা বললো, তা হলো, এক্সটার্নাল শীলাদের পাশের ডিপার্টমেন্টের।শুনে তার মনে হলো, তাও ভালো যে পাশের ডিপার্ট্মেন্টের, অনেক দূর থেকে আসা কেউ তো নয়। 

তারপর প্রশ্ন পর্ব শুরু হলো। ইন্টার্নাল শীলাকে প্রশ্ন করা শুরু করলেন এবং প্রশ্নের উত্তর যখন শীলা দিতে পারছিল না, ইন্টারনাল খুব কটাক্ষ শুরু করলেন। ফোঁসফোঁস করে উঠলেন। চিবিয়ে চিবিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলতে লাগলেন, 'এটা জানো না, তো কি জান?' তখন অপর প্রফেসার যিনি কিনা এক্সটার্নাল, মানে বাইরে থেকে আসা, তিনি শীলাকে সাপোর্ট দিয়ে বললেন যে, 'না, ও যেটা বলেছে সেটা তো এভাবে করে বলেছে.. ঠিকই আছে..। 

ঘটনাটা যা হলো তা এরকম যে, শীলার এক্সটার্নাল শীলাকে সাপোর্ট দিচ্ছে আর ইন্টার্নাল তার নিজের ছাত্রীকে ভাগিয়ে দিতে চাইছে। তেড়ে মেরে আক্রমণ করতে আসছে। শীলা বিষয়টাকে বেশ অবাক হয়ে উপভোগ করছিল। প্রশ্ন উত্তর দিতে পারছিল না, কারণ সেভাবে করে বিষয়বস্তু শীলা তখনো শিখেনি বা শিখবার মতো জ্ঞানী হতে পারেনি। ইন্টার্নাল চিবিয়ে চিবিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বারে বারে বলছেন এক্সটার্নালের সামনে, 'এটা জানো না , তাহলে কি জানো? আক্রমণাত্মক ভঙ্গীতে, দাঁতে দাঁত লাগিয়ে চোয়ালের প্রতিটা চিবানিতে, যেভাবে কথাগুলো ওনার মুখ দিয়ে বের হচ্ছিল তাতে স্পষ্ট ভাবেই তার ক্রোধ, ঘৃণা ব্যাঙ্গাত্মক ভাবে শীলার উপর চাবুকের মত শপাং শপাং করে পড়ছিল। স্বভাবে লোকটি একটু সাইকোপ্যাথ। ভালো কিছু ভাবতে পারেনা। চিবিয়ে চিবিয়ে মুখ থেকে কথা বের করে। আর তাতে সে খুব আরাম পায়। 

সে সময় শীলাদের একটা ম্যাডাম ছিলেন, 'ব্যারিস্টার কাম সাইন্টিস্ট' বলা হতো তাকে। শীলা চিনত না তখন। পরে জেনেছে যে, ব্যারিস্টার হবার সখ ছিল সেই ম্যাডামের। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তিনি আজ সায়েন্টিস্ট হয়ে গেছেন!

যে প্রসংগে সেই ম্যাডামের কথার অবতারণা তা বেশ অদ্ভুত। সেই ম্যাডাম  হঠাৎ-ই যেন কোথা হতে চিলের মতো এসে হাজির হলেন ভাইভা বোর্ডে।  তারপর হন্তদন্ত হয়ে চেয়ারটা টেনে শীলার পাশে ধপাশ করে বসে পড়লেন। 

যেন কি জানি কি হচ্ছে এখানে! 

তার কিছু একটা মিস্ হয়ে যাচ্ছে! এখনই দেখতে হবে। তাই এত হন্তদন্ত।

কি মিস্ হয়ে যাচ্ছে? 

কি সেটা? 

আর শীলার এক্সামের সময়েই কেন? 

এখানে তার কি?

কি দেখতে চায়? 

শীলা কি আইন্সটাইনের লেভেলের ভাইভা দিচ্ছে? 

তার এত আগ্রহ কিসের? শীলার ভাইভা এক্সামটা কেমন হচ্ছে, এটা  জানার খুব ইচ্ছা  হচ্ছে তার ? কিন্তু কেন? 

শীলা তাকাল ওনার  দিকে। আবারো মনে প্রশ্ন এলো। সে শীলাকে চিনে কিভাবে?

শীলা তো তার লেকচার ক্লাশ কখনো পায় নি।  তাকে ভাল চিনেও না। স্বভাবে বদ, নাকি ভদ্র - তাও জানে না। চেহারার দিকে কোনদিন তাকায়ও নাই, যে তাকে অ্যানালাইসিস করবে। এতদিন যাবৎ এই মহিলার সংস্পর্শে শীলার কোনভাবেই আসা হয়নি। অথচ তার হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে শীলাকে  খুব ভালভাবে  চিনেন উনি।

ওরে বাবা! 

তখন মোবাইল ফোনের যুগ ছিল না। সে যে কোথাও থেকে টেক্সট ম্যাসেজ পেয়ে চলে এসেছে তা-ও না। তাহলে এই মহিলা কোথা হতে উড়ে এলো আর কেন চেয়ার টেনে বসে পড়লো শীলার ঘাড় ঘেঁষে? 

তার এখনই বা আসতে  হলো কেন? 

পরীক্ষা চলাকালীন ল্যাবের কোনা-কানিতেও সে অবস্থান করছিল না। শীলার চোখে পড়েনি। কিছু টিচার আছেন, যারা প্রয়োজন না থাকলেও অন্যের ল্যাবে এসে বসে থাকেন, গল্প করে সময় কাটান। কিন্তু এমন অবস্থা সেদিন ছিল না। সেদিন সাধারণ ল্যাব ক্লাশ চলছিল না। সেদিন ইয়ার ফাইনালের ল্যাব -ভাইভা এক্সাম হচ্ছিল।

আবারো ভাবল শীলা তার দিকে তাকিয়ে, কোথা হতে উড়ে এলো এই মহিলা? 

ভূত না তো! 

আবার ধ্যার ধ্যার করে চেয়ার টেনে বসেও পড়লো। নাকি ইন্টার্নালের সাথে আত্মার যোগাযোগ আছে। দুই বিকৃত, বিকারগ্রস্ত যখন একত্র হয়, তারা মিলেমিশে প্রতিপক্ষকে একটু বেশী জোর দিয়ে বাঁশ দিতে পারে । ইনিও কি এসেছেন বাঁশ কার্যক্রমে অংশগ্রহন করতে?  কেন প্রতিপক্ষ ভাবছে শীলাকে।  কেনই বা শীলা তাদের প্রতিপক্ষ হতে যাব? তারা শীলার গুরুজন, কত বয়স্ক, অন্তত শীলার থেকে দ্বিগুণ বয়সের তো হবেই। শীলা ভাবলো পেট ভরা হিংসা এই বয়সেও থাকে নাকি ছোটদের প্রতি?

আজ এত দিন পরও এসব প্রশ্ন জাগে মনে। 

শীলা ক্লাশে কোনদিন ফার্স্ট তো হয়ই নাই, বা ফার্স্ট যারা হয় তাদের মতো, টিচারদের পিছন পিছন ঘুর ঘুর করে টিচারদের ধামা ধরে নাই। শিক্ষক, শিক্ষিকারা কে কিরকম বদ স্বভাবের তা চিন্তায়ও আনে নাই। কিন্তু তাদের নীচু মানসিকতা আর বিশ্রী কর্মকান্ড দিয়েই তারা এগুলো ভাবাতে শিখিয়েছে শীলাদের। 

সালাম দিলে যে উত্তর দিতে হয় না, তুচ্ছজ্ঞান করতে হয় এও কিন্তু তাদের কাছ থেকেই তার শেখা। তাদের দেখে শিখেছে। আগে জানত না শীলা।

ম্যাডাম বসলো যখন শীলার আর এক্সটার্নালের মাঝে শীলা লক্ষ্য করলো তাকে। শীলার ভাইভা-র উত্তরগুলো টেবিলে ঝুঁকে গালে হাত রেখে, খুব মনোযোগ দিয়ে শোনার চেষ্টা করছেন মহিলা। চোয়াল চিবানি ইন্টার্নালের ধমক আর বাজে মন্তব্য শুনে মাথা নাড়িয়ে স্যারকে সায়ও দিচ্ছেন। তার হাবভাব  দেখে মনে হলো, সে পুরো সাবজেক্টটা যেন  শিখার জন্য আর বুঝে নেবার জন্য চেষ্টা করছে।   কিন্তু ওখানে তো লেকচার ক্লাশ হচ্ছে না বা শীলা কোন বিষয় উপস্থাপন করছে না। সেদিন প্র্যাকটিকাল  পরীক্ষার বিষয় ছিল ইলেকট্রনিক্স আর অপটিক্স। শীলাকে ইলেকট্রনিক্সের ওপরই প্রশ্ন করা হয়েছে বেশী তবে অপটিক্স -ও কম যায়নি ।

ইন্টারনাল তো চিবাতে চিবাতে তার কুতসিৎ অভিব্যক্তি দিয়ে শীলাকে শেষে আরেকবার ধমক দিল। মনে হয় তার সব ঘৃণার বোঝা ঝেড়ে ফেলে চোয়াল চিবিয়ে একটু হালকা হলো। সাথে সাথে একটা বিকৃত ধরণের তৃপ্তি অনুভব করলো। 

শীলার ভাইভা শেষ হয়ে গেল। শীলা  ল্যাবের বাইরে এসে দাঁড়াল। ভাবল, ইন্টার্নাল যেরকম ধমক দিয়েছে, হয়তোবা এই ভাইভাতে সে পাশ করবো না। ফেল নিশ্চিত। আর তা হলে গোটা ইয়ার -ফাইনাল ফেল হয়ে যাবে। 

যেহেতু সেকেন্ড ইয়ার ল্যাব অনেক উন্মুক্ত স্থান জুড়ে নির্মিত আর ওই সাইডে বিশাল বড় উন্মুক্ত বারান্দা, শীলা সেখানে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল। গালি হজম নয়, শিক্ষকদের ভাব হজম করতে।

দাঁড়িয়ে থেকে ভাইভা টেবিলের সামনের আসনগুলোতে, যেখানে বয়স্ক বয়স্ক শীলাদের গুরুজনেরা উপবিষ্ট ছিলেন, সেইদিকে তাকিয়ে তাদের দেখছিল আর ভাবছিলঃ

-এমন কেন এরা? 

-এভাবে আচরণ করে কেন? 

কিছুই সে বুঝে উঠতে পারছিল না। 

কেন তার সাথে এরা দুর্ব্যবহার করল, শীলা বারবার প্রশ্ন করছিলা নিজেকে। বারবার। যেহেতু বিষয়বস্তু শীলা ঠিকমত উত্তর দিতে পারেনি সেজন্য  কাউকে এত অবমাননা করতে হয় নাকি? চরম দুর্ব্যবহার করলে কি কেউ বিষয়বস্তু জেনে ফেলতে পারে? নাকি, না জানলে তার দিকে এভাবে তেড়ে আসতে হয়? 

কত ইনোসেন্ট প্রশ্ন! 

কত সরল চিন্তা!

ছোট ছিল বলেই তো? 

শীলা বুঝে নাই  যে সে সাপের ঝাঁপিতে পড়েছিল। মাত্র উদ্ধার পেয়েছে। আসলে বস্তির কালচার এর আগ পর্যন্ত সে দেখিনি কোথাও। ডিপার্টমেন্টেও ও  না, বাইরেও না । অত কম বয়সের কারণে  শীলা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না তার শিক্ষকদের  ব্যবহারের মাথামন্ডু।  তাদের ব্যবহারে শীলা  যত না আহত হয়েছে, তার থেকেও বেশি অবাক হয়েছে ! এবং এখন পর্যন্ত ভাবলে শীলা অবাক হয়। 

কয়েকবছর পর শীলাদের সেই ইন্টার্নাল, প্রফেসর চিবানীচন্দর -এর লেকচার ক্লাশ পেল। তখন সিনিয়র হয়েছে তারা। অনার্স শেষ।

খেয়াল করে দেখল, লেকচার দেবার সময়েও তিনি চিবিয়ে চিবিয়ে শব্দগুলোকে দাঁতে দাঁত দিয়ে পিষে পিষে কথা বলতে পছন্দ করেন। সূক্ষ্ম একটা বিকৃত ভাব তার চোখেমুখে প্রকাশ পায় প্রতিটা চিবানিতে। আর তাতেই যেন তার অদ্ভুত এক পরিতৃপ্তি মিলে। হয়তোবা এটা তার পারিপার্শ্বিক সিচুয়েশনকে কন্ট্রোলে নেওয়ার টেকনিক। সে ভাল বোধ করে এতে। 

আরো পরের দিকে যখন আরোও সিনিয়ার হল, রিসার্চ ছাত্র ছাত্রীদের কমনওয়েলথ স্কলারশিপের জন্য ইন্টারভিউ-এর ডাক আসলো। সেই সিলেকশানে কমনওয়েলথ্ স্কলারশিপ দিবে ছেলেমেয়েদেরকে। শীলা যেয়ে দেখে, সেই সিলেকশান বোর্ডে চোয়াল চিবানী কিভাবে যেন ঢুকে বসে আছে। জানে না তাকে কেন রাখা হয়েছিল। এ এক বিস্ময়! কারণ তিনি অনার্স পাশ করেন নি কখনো। তিনি ডিগ্রী পাস কোর্স থেকে পাশ করে এসেছে। তিনি কিভাবে পিএইচডি - র জন্য স্কলার নির্বাচন করবে সে এক বিস্ময় বটে! 

তিনি নিজে কি করে ফুল প্রফেসর হয়েছেন তা শীলা জানে না। কিন্তু খুব শক্তিধর না হলে তো আর সব জায়গায় পিছলে-পুছলে ঢুকে পড়া যায় না। নির্ঘাৎ খুব শক্তি ছিল তার। সাপ যখন ফণা তোলে, তার মেরুদন্ডে শক্তি না থাকলে, সে কি মাথা উঁচু করে ফোঁস ফোঁস করতে পারে?

তার ফোঁসফোঁসের রেডিয়াস অনেক বেশী বলেই হয়তোবা তার কন্টাক্ট -ও বেশী। আর জানাশোনা বেশি বলে হয়তো বা সকল প্রতিষ্ঠান তার সাথেই যোগাযোগ করে। তিনি সব কর্মকান্ডে সর্বদা উপস্থিত থাকেন।  এ জাতীয় লোক, যাদের সামাজিক লিংক বেশী তারা 'সর্বত্রই বিরাজমান' থাকে মানে অ্যাক্টিভ থাকে। তিনিও তাদের একজন। 

স্কলারশিপের জন্য ইন্টারভিউ দিতে গেলে চোয়াল-চিবানী শীলাকে  জিজ্ঞেস করলেন, 'এখন কি করছো?' 

শীলা বললঃ এখন রিসার্চ করছি। নেক্সট পিএইচডি- প্রোগ্রামে ভর্তির সুযোগের অপেক্ষায়। রিসার্চটুকু শেষ হলে সে ইংল্যান্ডে পিএইচডি-র জন্য অ্যাপ্লাই করতে চায় । এই স্কলারশিপ শীলার জন্য খুবই সাহায্যকারী হবে।' 

কমনওয়েলথ স্কলারশিপের ফান্ডিং ভীষণ ভালো। সেটা চোয়াল চন্দরের ডিপার্টমেন্টের কেউ পেতেই পারে। 

কিন্ত শীলা কেন, তাইতো? 

তাই, তিনি চিবিয়ে চিবিয়ে শীলাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমার কি পাবলিকেশন আছে?' 

শীলা বলল, 'পাবলিকেশন করবো।' ফার্স্ট ইয়ারের থিওরিটুকু শেষ করেছে। থিওরি শেষ করে রিসার্চের কাজ মাত্র শুরু হয়েছে। 

শুনেই ফোঁস করে উঠলো চোয়াল চন্দর। চোখগুলো ঠিকরে ক্রোধ, ঘৃণা ছিটকাতে থাকলো। সাইকোপ্যাথ হলে যা হয়! কারো ভাল কিছু হোক, কারো উপকার হয়ে যাক তাকে দিয়ে এসব বিষয়ে তারা সহ্য করতে পারে না।

বললো,'পাবলিকেশন যদি না থাকে, তাহলে যাও।' 

গলার চাপা ফ্যাসফ্যাসে স্বরটা আরো চড়া করে মেজাজী ভাব দেখিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বললো, 'এখন যাও। যাও এখন। পাবলিকেশন করে এসো।' 

ওরে বাবা ! 

এভাবে যখন তিনি মাথা ঝাঁকিয়ে, চোখ গরম করে, মুখের কথাগুলোকে একটা একটা করে চিবিয়ে চিবিয়ে বের করে বললেন, 'যাও এখান থেকে', তখন শীলা আরেক দফা অবাক হল । 

তার যে রাগান্বিত রূপটা শীলা সেকেন্ড ইয়ারে দেখেছিল সেই ল্যাবে, শীলা যেন সেই সময়ে ফিরে গেল। মনে হলো যে, সত্যি মানুষের পরিবর্তন হয় না। বিকৃতি থাকলে স্থান, কাল নির্বিশেষে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটবে। বিকৃত রুচির মানুষটি সব জায়গায়, সব সময় তা দেখাতে থাকবে। 

মনে পড়লো শেষের দিকে মাস্টার্সের সময় শীলাদের একটা সাবজেক্ট -এ লেকচার দেবার দায়িত্ব তাকে দেয়া হয়েছিল। ক্লাস এর সময় শেষ হলে সময়টাকে লেকচার দিয়ে এমনভাবে দীর্ঘায়িত করত, যেন ঠিক পরের ক্লাসটা শীলারা সময়মত ধরতে না পারে।

এতে তার কেমন যেন বিকৃত এক আনন্দ যে হতো যা, চোখে মুখে তখন প্রকাশ পেত। সে সময়টাতে তার ভাবখানা এরকম হতো যে কিছু একটা সে জয় করেছে। ছাত্রদের এবার চুবাতে পেরেছে। সাথে সেই কোর্স টিচারকেও চিপতে পেরেছে। কারণ দেরী করে ছাড়ার ফলে অর্ধেক ছাত্রই তার ক্লাস পাবে না। বেশি পড়াচ্ছে, বেশি বুঝাচ্ছে এরকম ভাব দেখিয়ে ছাত্রদের পরের ক্লাসে যেতে না দিয়ে ক্ষতি করতে পারলেই তার সফলতা। 

তাই শীলাদের অসুবিধা তাকে জানালেও সে প্রতিবার ক্লাসটা দেরি করে শেষ করত। তার কিলবিলে স্বভাবটা বার বার ফণা মেলতো। চেষ্টা করতো এভাবেই সব জায়গায় ইতিহাস স্থাপন করতে। পরবর্তীতে যখন ফাইনাল পরীক্ষার কোশ্চেন সেট করল, কোশ্চেনের মধ্যে প্রথম সারির কিছু প্রশ্ন যেগুলো খুবই কমন, আসবেই, সেগুলো সেট A-তে যায়। তারপরে নেক্সট ইম্পর্টেন্ট কোয়েশ্চেনগুলো সেট B-তে যায়। তিনি সব বাদ দিয়ে শীলাদের পরীক্ষাপত্র সাজালেন সেট -C এর কোয়েশ্চেন দিয়ে। প্রিপারেশন নেবার সময় তো ছাত্ররা মোস্ট ইম্পর্টেন্ট বা ইম্পর্টেন্ট এরকম কোশ্চেন বাদ রেখে আন-ইম্পর্টেন্ট কোশ্চেনের প্রিপারেশন নেয় না। সময় কোথায় ? 

পরীক্ষা বলে কথা। পড়েই তো সব শেষ হয় না!

রিভিশান ও দেবার সময় পাওয়া যায় না ।

সেবার সেট -C মার্কা প্রশ্ন পত্রের কারণে পরীক্ষায় শীলাদের সকলের পরীক্ষায় খারাপ নাম্বার উঠেছিল।  সবসময় আগে থেকে কিছু কিছু ছাত্র তাদের চ্যানেল দিয়ে কিছু পরিচিত টিচারদের বদৌলতে প্রশ্ন পেয়ে যায়। তাদের কথা বাদ দিলে, শীলাদের সকলের রেজাল্ট তখন খারাপ হলো।  শীলারা কেউই খুব ভালো একটা নাম্বার পাইনি। তখন  ডিপার্টমেন্ট থেকে তাকে তলব করা হলো। তাকে জবাবদিহি করতে হয়েছিল –তার বিষয়ে ছাত্রদের এরকম বেহাল দশা কেন? সেখানে ফোঁসফোঁসানি দেখিয়েছে কি না শীলা জানে না। এরকম লোকেরা তো আবার খুব চতুর ও ধূর্ত হয়। ওখানে তারা প্রয়োজনে মাফ চেয়ে পা ধরতেও দ্বিধা করে না। এরা যে shape shifter reptilian.

ওনার সবসময় এরকম একটা বাঁকা চিন্তা, বাঁকা মনোভাব এবং বাঁকা কাজ করবার প্রবৃত্তি ছিল বলেই, সে একবার শীলার খুব কাছের এক বন্ধুকে শীলার বিষয় নিয়ে কিছু বলেছিল। শীলার সেই বন্ধু সরাসরি শীলাকে খুলে বলেনি কি বিষয়ে চিবানী চন্দর শীলাকে নিয়ে কথা তুলেছিল। কিন্তু শীলার ওই বন্ধুটি শীলাকে এটুকু জানিয়েছিল যে, 'সে  স্যারকে শাট্ (shut) করে দিয়েছি। এবং স্পষ্ট করে বলে দিয়েছে, শীলাকে নিয়ে কোন কথা হবে না।' 

এই শাট্ (shut) শব্দটিই উচ্চারণ করেছে শীলার বন্ধুটি। সে শীলাকে বুঝাতে চেয়েছে যে, শীলাকে নিয়ে প্রসঙ্গ উঠানো মাত্রই ওই চোয়াল চন্দরকে সে থামিয়ে দিয়েছিল। তাকে চুপ করিয়ে দিয়েছিল সেদিন, যেন আর একটি কথাও লোকটি শীলাকে নিয়ে বেশি না বলে।

............।।

শ্বশুর যার খালু


শ্রাবণী তো তার খালু বলতে অজ্ঞান। গোলগোল চোখে কালো মতন মোটা সোটা, ছোটখাটো একটু পার্ভার্ট টাইপের বিকৃত মানসিকতার ওই লোকটি শ্রাবণীর খালু । ছোট থেকেই এই কুৎসিত লোকটির সান্নিধ্য তাকে ভীষণ আনন্দ দেয়। দেবেই না কেন? পাঁচখালার সবচেয়ে বড় খালা আর খালু যে তার সব থেকে প্রিয় । দ্বিতীয় প্রিয়তে আছে তার বাবা, মা। শ্রাবণীর বাবা অত্যন্ত সুদর্শন ব্যক্তিত্বের অধিকারী অমায়িক ভদ্রলোক। এককালে নয়, এখন ৭০ -এর কাছে এসেও তিনি যথেষ্ট ফিট এবং স্মার্ট । শ্রাবণীর খালু একেবারেই উল্টো। দুই ভদ্রলোকের নামও আবার কাকতালীয় ভাবে এক। শ্রাবণীর মা সুন্দরী, রূপসী তাই ভালো দেখতে লোকটিকে পেয়েছে আর শ্রাবণীর খালা একটু উদ্ভট চেহারার বলেই হয়তোবা খারাপ দেখতে লোকটিকে পেয়েছে। 

জীবন সুন্দরভাবে কাটাতে পেরেছে শ্রাবণীর মা তার সুন্দর স্বামীর সাথে। শাশুড়ির ঝান্ডা মাথার উপর বরাবরই ছিল। কিন্তু নিয়তি এমন হলে কিছু তো করার নেই। শ্রাবণীর তো প্রিয় দাদী তিনি। ফ্রেঞ্চ চেহারার শত বৎসরের বর্ষীয়ান এক মহিলা তিনি। অসম্ভব সুন্দরী।  সেদিক থেকেই কি না কে জানে, শ্রাবণীকেও বাঙালি না বলে ফ্রেঞ্চ বললে যেন বেশি ঠিক হবে। মুখের বানরমুখো চোয়ালটুকু ছাড়া আর বাকি সবকিছুই শ্রাবণীর অসম্ভব সুন্দর। ফিগার থেকে শুরু করে গায়ের রং, স্মার্টনেস। সাথে বুদ্ধি, মনের শিশু সুলভ সরলতা তো আছেই।

তার মায়ের বড় বোনের যেহেতু বিবাহ হয়েছে কুৎসিত চেহারার খালুটার সাথে, বাড়িতে সেই লোকটার  ধমকে সকলকে সে সবসময় তটস্থ করে  রাখে। দাবড়ানি দিতে দিতে সেই খালু যখন  পুরো বাড়ির সকলের মধ্যে এক ভীতির সঞ্চার করে ফেলে, তখন শ্রাবণীই শুধু পারে তার সাথে ঠাট্টা মশকরায় মেতে উঠতে। শ্রাবণীর ভীষণ সাহস বলতে হবে। 

এ বাড়িতে রত্না এসেছে বিয়ে হয়ে। শ্রাবণীর সরলতা দেখে রত্না খুব মুগ্ধ হয়েছিল। এত সুন্দর, সহজ সরল মনের মেয়েটি কেন যে এমন পাগলাটে সেটা সে বুঝতে পারতো না। মেয়েটির বয়স ৩০ এর কোঠায় তখন। রত্নার থেকে অন্তত বয়স ছয়েকের বড় হবে। বাবা-মায়ের সাথে থাকে। আদরে আহ্লাদে আটখানা হয়ে যায় খালুর কাছে এলে। কি অদ্ভুত  এক টিউনিং তার, এই খালা খালুর সাথে। হয়তোবা আত্মারও যোগাযোগ আছে এবং সেটা খুব পোক্ত। কিন্তু তার পাগলাটে আচরণের কারণ  রত্না এখনো উদ্ধার করতে পারেনি। বিদেশেও গিয়েছিল উচ্চ শিক্ষা অর্জনে। তাই বিদেশের আদব কায়দায়ও শ্রাবণী পারদর্শী। কি গুণ নাই তার!  

সেই বিয়ের প্রথম রাতেই শ্রাবণী রত্নার কাছে এসে তাকে প্রশংসা করে বলছিল, ‘কি ন্যাচারালি সুন্দর তুমি!’ 

হাতে একটা গিফট গুঁজে দিয়ে শ্রাবণী রত্নাকে বলেছিল, ‘তোমার হাতে আমার খুব প্রিয় একটা জিনিস আজ দিলাম।' হাতে ছিল বিদেশী পারফিউম। 

শ্রাবণীকে দেখে কি জানি কেন রত্নার শুধু মনে হয়েছিল তার নামের সাথে মিল রেখে শ্রাবণ ধারার জলে এই মেয়েটির জীবন কেটে যাবে না তো? 

এমন নাম কেন ওর? 

আসলে তার জীবন জুড়ে যে রয়েছে শ্রাবণের ধারা, চোখের জলের বন্যা -এসব কিছুই তখনো রত্না জানতো না। কিন্তু ওর নামটা শুনে রত্না আঁতকে উঠেছিল! কেন এমন মনে হয়েছিল রত্না জানে না। স্বামী সংসার সন্তান নিয়ে যখন জীবনের এই সময়টাতে মেয়েরা ব্যস্ত থাকে তখন শ্রাবণীর কোন কাজ ছিল না কোন দায়িত্ব ছিল না। শুধু বাসা থেকে স্কুলে যাওয়া, সেই স্কুলের নার্সারির বাচ্চাদেরকে পড়ানো, তারপর বাড়ি  ফেরা। আর বড় জোর খালাখালুর বাড়িতে বেড়াতে আসা । এখানে এসে  খালার সাথে আড্ডায় বসা আর খালুর সাথে ঠাট্টা মশকরায় মশগুল হওয়া।

ওই যে বললাম না কুৎসিত বেটে কালো লোকটার কথা। সে কিন্তু রত্নার শ্বশুর মশায়। লোকটিকে রত্নার কেমন জানি বিকৃত রুচির মনে হতো। কিন্তু শ্রাবণীর সেসব ভাবনা মনের মাঝে মোটেই নেই। ঘরের মেয়ে কেনই বা এভাবে  বাইরের মানুষের মত করে তার খালুকে নিয়ে ভাববে? রত্না তো এসেছে অন্য বাড়ি থেকে। এখানে সে আগুন্তক। 

একদিন শ্রাবণীর খালু মানে রত্নার ওই বিকৃত রুচির  শ্বশুরটি যখন শ্রাবণীকে খাবার টেবিলের সামনে, যেখানে সকলেই জড়ো হয়ে বসে আছে সেখানে,  ঠাট্টা করতে করতে বলল, ‘বিয়ে করিস না কেন? তোর বন্ধুরা তো বিয়ে করে সবাই মজা করছে।' 

শ্রাবণী কিছু একটা বলতে যাবার আগেই  খালু তার আঙ্গুলটা লম্বা করে শ্রাবণীর কোমরে একটা খোঁচা দিল। তারপর শরীরের দিকে তাকিয়ে শরীরকে ইঙ্গিত করে বলল, ‘এত কাঠি হলে চলবে?  খাবার দাবার খা। শরীরে একটু মাংস বানা।‘

উত্তরে শ্রাবণীর সে কি হাসি! বলল, ‘আপনি খান।‘ 

শ্রাবণীর গায়ে তার খালুর আঙ্গুল দিয়ে খোঁচাখুঁচি করার মত বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ দেখে রত্নার ভীষণ রকমের বিশ্রী লেগেছিল। কারণ সে তো এসব দেখে অভ্যস্ত না বা শ্রাবণীর মতো ওই লোকটির সাথে ছোটকাল থেকে থেকে বড়ও হয়নি। শ্রাবণীর নিশ্চয়ই বাল্যকাল খুব আনন্দে কেটেছে ওই লোকটির সাথে। আফটারঅল পরিবারের বড় খালু, মায়ের বড় বোনের স্বামী। 

কিন্তু আসলেই  শ্রাবণী কেন তার বান্ধবীদের মত বিয়ে করে মজা করছে না? রত্না পরে একদিন জানতে পারল, কোন সময়ে শ্রাবণীরও সংসার জীবন শুরু হয়েছিল ‘ব্যাট’ নামের একটি অভিজাত শ্রেণীর বয়ে যাওয়া, ধনির দুলালের সাথে। যেহেতু ইংরেজি মিডিয়ামে তারা পড়াশোনা করে আর  অত্যন্ত হাই-ফাই, ধনী শ্রেণীর লোক, তাই তাদের নামগুলো তো এরকমই হবে। ক্রিকেট খেলার ব্যাট অথবা আরো কত ধরনের ইংরেজি নামই না  আছে এ রকম। হাই -ফাই রা  জানে সেসব নামের কথা। কিন্তু সেই ‘ব্যাট’-ই শ্রাবণীর জীবনকে ব্যাটের বাড়ি দিয়ে বাঁশময় করে তুলেছিল। শ্রাবণী তখন আরো কম বয়সের মেয়ে। সংসারের কাজ তেমন পারে না, বুঝেও না। বিয়ের প্রথম রাতেই এক গাদা ক্রেডিট কার্ড উপহার দিয়েছিল সেই ধনীর দুলাল  স্বামীটি তাকে।  কত না স্বপ্ন, কত না আনন্দে ভরে  জীবনের শুরু করেছিল । এই ভাবনাই ভেবেছিল তখন শ্রাবণী যে, সারাটা জীবন তার সুখের হবে। অথচ সংসারে একটু ছোটখাট ভুল যদি ধরা পড়তো, এই যেমন টেবিলে একটু ময়লা পড়ে আছে বা একটু চিনি পড়ে আছে, সাথে সাথে ব্যাট তাকে ব্যাটের বাড়ি দেয়া শুরু করে দিত। শ্রাবণীর বাবা তার বেয়াইকে একবার বলেছিলেন, ‘আপনার ছেলে যে  আমার মেয়েকে মারে, এটা তো ভালো না।‘ 

শুনে বেয়াই বলেছিলেন, ‘আমিও তো মারি আমার স্ত্রীকে। এর মধ্যে অসুবিধা কোথায়?’

আজকাল তো বস্তির মেয়েরাও স্বামীর ব্যাটের বাড়ি খেতে চায় না। আর ধনীর দুলালী শ্রাবণী? তার তো প্রশ্নই উঠে না। ভেঙে গেল তার সাজানো সংসার। শুরু হলো শ্রাবণধারায় চোখের পানির স্রোত। অশ্রুর বন্যা। জীবনটা তার কান্নায় ভরে উঠল। 

বারবার ভেবে অবাক হয়, তার এত সুন্দর নাম শুনে রত্না  প্রথম দিনই কেন যে আঁতকে উঠেছিল? সে জানে না। 

শ্রাবণীর সাথে তো রত্নার পরিচয় ঘটতো না, এই খালা খালুর বাড়িতে শ্রাবণী বেড়াতে না এলে। অথবা রত্না তার খালুর সাথে প্রাণ খোলা হাসি, গল্প আর ঠাট্টা মশকরায় মশগুল হয়ে মেতে না উঠলে। কুৎসিত মনের, শ্বশুর সম্পর্কের এই লোকটি দ্বারা, সরল মনের এই মেয়েটিকে (মানে শ্রাবণীকে,) তার পেটের মধ্যে  টুকটাক খোঁচামার যে দৃশ্য, রত্না দেখেছে – তা থেকেও রত্না বঞ্চিত হতো। রত্না পরে আরোও জেনেছে, তার শ্বশুর বাড়িতে কাজের জন্য সবসময় কাজের ছেলে রাখা হয়। কাজের মেয়ে রাখা হয়না। তাতে শ্বশুর মশায়ের কি যেন অসুবিধা হয়। 

বাড়ির ভেতরেই যদি বিকৃত  চিন্তায় পারদর্শী এই লোকটি, শ্রাবণীর মতো অত্ত বড়  এক মেয়ের  পেটের মধ্যে আঙ্গুল ঢুকিয়ে দিতে পারে, ঠাট্টা করে খোঁচা মারতে পারে, সে নিশ্চয়ই অন্য মেয়ে পেলে তাদেরকে আরো অনেক কিছু করার বুদ্ধি  রাখে -তার ৭২ বছরের এই জীবনে।

.........

০১/১১/২০২৫ নভেম্বর ০১, ২০২৫

আরো গল্প -

বিয়ে বাড়ির তত্ত্ব 
বাবা ছেলের এক রা 
ঝরে বক মরে 
অম্বা যখন ননাস 
স্টিকির /কাঠির  কোপ
মল্লিকা আন্টির খপ্পরে

ব্লগে আমার ১৮ বছর পূর্তি

এমনি একদিন  ২০০৭ । অনলাইন   একটি ই- ম্যাগাজিন সম্পাদনার কাজ করি। অবনী অনার্য  পাকা লেখক। তার থেকে লেখা নিয়ে আমার ই- ম্যাগাজিন সমৃদ্ধ। যার  হ...