Sunday, September 27, 2026

জীবন যেন স্রোতের মাঝে ভাসমান দ্বীপের মতো

 

১৯৮৪ সাল। স্কুলের অফিস রুমে গিয়েছি বেতন দেবার জন্য। লাইনে অপেক্ষা আমি আর আমার লাল ঝুটি বন্ধুটি। আমাদের খুঁজে খুঁজে ঐ ভীড়ের মাঝে পুষি এলো। আদর করে পুষি ডাকতাম ওকে। বেতন দিতে নয়।  ও হাঁটু গেড়ে বসে আমাদের দুজনাকে  অডিও ক্যাসেটের কভার পেইজের পেছনে ছাপানো একটি  লিরিক দেখালো, Islands in the Stream.

কিশোরী মনে দাগ কেটেছিল প্রথম এই ভালবাসার গানটি শুনে। 

এটি একটি বিখ্যাত ইংরেজি গান, যা ডলি পার্টন (Dolly Parton) এবং কেনি রজার্স (Kenny Rogers) দ্বৈতকণ্ঠে গেয়েছেন।  গানটি ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত হয় এবং এটি রচনা ও সুর দিয়েছিলেন বিখ্যাত সংগীতশিল্পী Bee Gees-এর সদস্যরা।

গানটিতে এক ধরনের মধুর ভালোবাসার গল্প বলা হয়েছে, যেখানে দুটি মানুষ নিজেদের ভালোবাসার জগতে একে অপরের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে—তারা যেন স্রোতের মাঝে ভাসতে থাকা দ্বীপের মতো, যাদের মাঝে আর কেউ নেই। গানটির কথায় আছে একান্ত ভালোবাসা, একে অপরের প্রতি বিশ্বাস ও নির্ভরতাবোধ, এবং একসঙ্গে নতুন পৃথিবীর খোঁজে এগিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত।

“Islands in the Stream” মুক্তির পরপরই বিশ্বজুড়ে দারুণ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল এবং এটি আজও ক্লাসিক লাভ সং 'classic love song' হিসেবে বিবেচিত হয়। গায়ক দু'জনার কন্ঠ ও অনবদ্য সুরের জন্য এই গানটি এখনো   মানুষের হৃদয়ে স্থান করে আছে। 

গানের কিছু পঙক্তির ভাবানুবাদ  করলে যেমন শোনায় —

দুই নদীর মাঝে দ্বীপের মতো
এটাই তো আমরা
মাঝখানে কেউ নেই
তবে ভুল কীভাবে হতে পারে আমাদের?
চলো, ভেসে যাই দূর অন্য জগতে
সকল নির্ভরতা নিয়ে, একে অপরের সাথে, 
এক প্রিয় থেকে আরেক প্রিয়ার কাছে।। 

আজ গানটি আবার শুনতে ইচ্ছে করছিল, আর তখন ভাবছিলাম কোথাও যদি চলে এতে পারতাম যেখানে সেই দ্বীপের দেখা মিলবে। পঙতিমালার ইউটিউব লিংক 


Saturday, September 19, 2026

জীবনের স্টেশনে


রেল স্টেশনে অপেক্ষা। ট্রেন আসছে। এখনো ঐ দূরে। কিন্তু তার আগমন  দেখলেই  আমার ভেতরে এত কন কন করে উঠে  কেন জানি না। কেন এই কষ্ট বারবার হয়? জানি না। বলেও বুঝাতে পারবো না। 

মনে হয় এ যেন  জন্ম জন্মান্তেরে সেই ছেড়ে আসা রেল স্টেশন, যেখানে আমি একা,  ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছি। আগেও কোন এক জন্মে এমন ভাবে অপেক্ষা  করতাম।

আজ জীবনের স্টেশন থেকে আমার চাচা বিদায় নিয়েছেন। 

এই মাত্র খবর পেলাম। (১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬, রাত ৮টা)

জীবনটা এমনই । রেলস্টেশনে এসে এক সময়ে আমরা সকলে জড়ো হই। সবার সাথে তখন দেখা হয় । তারপর যার যার সময় হলে  একে এক করে চলে যাই যার যার গন্তব্যে।

Monday, September 14, 2026

রাগ ইমনের তৃষ্ণা

Yanni তার piano তে অজান্তে ইমনের সুর তুলেছে কয়েক সেকেন্ডের জন্য ।আমার চোখে পানি এসে গিয়েছিল।  তখন মনে হয়েছে আমাদের রাগ এর স্টাইল গুলো ওদের ভাষায় (সুরের বাদ্যযন্ত্রে) উপস্থাপন করার কেউ নেই কেন। কারো মাথায় আসে না কেন। আমি তো কোন মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে নাই। সরোদ আর এস্রাজ আর সেতার নিয়ে থাকলে ওরা জানবে কিভাবে? ওরা মানে সমগ্র বিশ্ব। তাই এগুলোর সাথে পিয়ানো ,বেহালা প্রয়োজন। ইমন, আশাবরী, মেঘ সব সব কিছু আমি আনতে চেয়েছি ।কিন্তু  সুযোগ ছিল না। এখন AI আছে আর আছে তার পিছনে আমাদের দেশের  মিউজিক ইঞ্জিনিয়ার।
 Yanni -রএই উপস্থাপনায়  রাগ ইমন আসবে এই পরিবাশনায়। যদিও তার অজান্তে। অজান্তে এজন্য কারণ পরে সে অন্য সুরের রাজ্যে পাড়ি দেবে। 
১ঃ৩৩ এ 'সা' ধরলো। 
১ঃ৪৩ এ ইমনের রেশ -এ পড়লো।
১ঃ৪৫ এ কড়ি 'মা' , এবং  ইমনে প্রবেশ করলো। 
১ঃ৫৫ পর্যন্ত পাক্কা ইমন।
২.০১ এ শেষ। 
কিন্তু তখনি ভেবেছি আমি একবার যদি বলে আসতে পারতাম ওনাকে পুরোটাই পিয়ানো মূর্ছনায় ইমন করেন!  লিংক  https://www.youtube.com/watch?v=5CV_UEUv0Ck

এটা ১৯৯২ সালের কথা। 

[রাগ পরিচয়ঃ রাগ ইমন -এর অপর নাম ইমন কল্যাণ , যা কল্যাণ ঠাঁটের অন্তর্ভুক্ত। রাগ ইমনের সুরের কোমলতা অপূর্ব এক মাধুর্য এনে দেয়। রাগ ইমন সাধারণত সন্ধ্যাবেলা পরিবেশন করা হয়। সন্ধ্যার নরম আলোয় রাগ ইমন পরিবেশন শ্রোতাদের মনে এক অনন্য প্রশান্তি ও সৌন্দর্যের অনুভূতি ছড়িয়ে দেয়।
রাগ ইমন-এর আরোহঃ
নি রে গা মা পা ধা নি র্সা
(এখানে মা কড়ি )
অবরোহঃ
র্সা নি ধা পা, মা গা রে সা
(এখানেও মা কড়ি )

পকড়ঃ নি রে গা রে নি গা মা( কড়ি), পা মা গা মা (কড়ি) গা রে সা]

আজ ২০২৬ সালে এসে ৩৪ বছর পর, পিয়ানো তে রাগ ইমন তুলবার সুযোগ পেয়েছি। আমার পিয়ানো বাদনে রাগ ইমনঃ  https://www.youtube.com/watch?v=XeyiPcZJwsc
সেদিন সেখানে একজন পিয়ানো বাদক ছিলেন। তিনি সুর শুনে জানতে চাইলেন কি সুর। সুরের রূপ কি? আরোহ ও অবরোহ, পকড় শুনালাম। তারপর  রাগ মেঘ  বাজিয়ে শুনিয়েছি। মেঘের স্টাইল কিভাবে বৃষ্টিকে ডেকে আনে তা বলেছি। তিনি সুর উপলব্ধি করতে পেরেছেন।  
পাশে লেক অন্টারিও। তার পাশে দাঁড়িয়ে পিয়ানোতে রাগ মেঘ- 'শ্যামা তন্বী আমি মেঘ বরণা'। লিংকঃ  https://www.youtube.com/watch?v=Uld_FOAYahI
সহজ সুর হিসাবে মালকোশ -ও দেখিয়ে দিয়েছি। মালকোশ -এর বন্দিস 'শোনো লো বাঁশীতে ডাকে আমার -ই ঘন শ্যামঃ https://www.youtube.com/watch?v=e1rOdQkSuZAপিয়ানোতে আমার বাদন, রাগ মালকোশ]
সুরের মাঝে মীর দিতে না পারলে রাগের স্টাইল অক্ষুণ্ণ থাকে না। সেগুলো যদিও পরের ধাপ।

১৪/০৯/২০২৬ 

বিকাল ৫টা

Tuesday, September 8, 2026

শেইপ শিফটার – বেজী


হেমন্তের সোনালী সকাল। 

২০০৯ এর সেপ্টেম্বর ।এই  সময়টায় প্রতিদিন সকালে হাঁটতে বের হয় সুমনা। সারা রাস্তা ধরে সোজা হেঁটে চলে যায় মন্ট্রিয়ালে শহরের শেষ প্রান্তে ।সেখানে একটা বাংলাদেশী কাপড়ের দোকান আছে। পাশে গ্রোসারি আছে। বাসা থেকে বের হলে দেড় কিলোমিটারের দূরত্ব হবে। 

আজ সাপ্তাহিক ছুটির দিন। দল বেঁধে পথচারীরা ঘুরতে বের হয়েছে। তাদের পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা পথ এগিয়ে এলো সুমনা একটা দলের সাথে। তার নিজের দেশেরই তিনজন মহিলা হাঁটছে একসাথে। একজন দেখতে হুবহু কলেজের ছেলে কণ্ঠের সেই জয়া নামের মেয়েটির মতন। আরেকজন শ্রীলঙ্কান চেহারার নাদিরা আন্টির মতন।  ব্যক্তিত্ব যেন  হুবুহু সেই আন্টির মত। চেহারাও একদম একরকম। মনে হচ্ছে নাদিরা আন্টির মত দুই পিস মানুষ ভগবান সৃষ্টি করেছিল। তার একজনের সাথে সুমনার আজ এখানে দেখা হয়ে গিয়েছে। আরেকজনের সাথে যেমন দেখা হয়েছিল তার বাল্যকালে। সেই সময়ের দেখা হওয়া আন্টিকে সুমনা তার মায়ের বান্ধবী হিসেবে দেখেছে।  আর আজ আরেক কপি সামনে এসে পড়েছে তার চলার পথের সঙ্গী হিসাবে। পথচারী হিসেবে। ক্ষণিকের সহচরীও  বলা যেতে পারে। তৃতীয় জন গড় বাঙালি মেয়েদের থেকে বেশ খানিকটা লম্বা। তিনজনের  মাঝে সে বেশ সুঠাম দেহের অধিকারী। হাঁটার মধ্যে একটা লিডারশিপ ভাব আছে। সুমনা তার সাথে তাল মিলিয়ে অত লম্বা লম্বা পদক্ষেপে চলতেই পারে না। তাই তিন মহিলার পিছে পড়ে যাচ্ছে বারবার। তবে বিদেশ-বিভূঁয়ে বাংলা কথা শুনলেই মনে হয় কর্ণ কুহরে  মধুর বাণী এসে পড়ল । তাই তার খুব ভাল লাগছে।সুমনা তাদের গল্প শুনতে শুনতে হাঁটছে।  নিজেদের কথায় মহিলারা ভীষণ মশগুল। তারা তিনজন বান্ধবীও হতে পারে।

কিন্তু হেঁটে হেঁটে তাদের গন্তব্য যে সুমনার মতই হবে, সেই শহরের শেষ মাথায় অবস্থিত ওই বাঙালি কাপড়ের দোকানের কাছে,  তা সুমনা বুঝতে পারেনি। তাদের গল্প শুনতে ওর ভীষণ ভালো লাগার আরেকটা কারণ, ঐ ছেলে গলার জয়ার কপিকে দেখে।  কলেজের এই দ্বিতীয় পিস  জয়াকে দেখে বারবার অবাক হচ্ছে। কন্ঠই শুধু নয়, এরও ব্যক্তিত্বে হুবুহু মিল পাচ্ছে জয়ার সাথে । অদ্ভুত লাগছে এই ভেবে যে, এই  তিন জনের মাঝে দুজনেই তার পূর্ব পরিচিতদের ডুপ্লিকেট কপি। 

এরকম মিল কেন আজ তার পাশে এসে পড়ল? 

জানে না এবং এ নিয়ে তখন সুমনা তেমন একটা মাথাও ঘামায় নাই।

২

পিশাচ বা ডাইনিরা সবার রূপ ধারণ করতে পারে বলে সে একবার শুনেছিল। কিন্তু তা বলে কোন মানুষকে পরিচিত কারো সাথে মিল আছে দেখে পিশাচের মাসতুতো ভাই মনে করা তো অন্যায় হবে।  এমন চিন্তা থেকে নিজেকে বিরত রেখেই সুমনা তাদের সাথেই পথ চলছিল।  বাংলায় গাল গপ্পো  ভাল লাগছে বিধায় একটু পিছিয়ে পিছিয়ে হাঁটা, আর গল্প শোনা। এভাবে যদিও সম্ভব না, কারণ দলনেতার ভারী লম্বা শরীর। তার পায়ের কদম বেশ বড়। 

হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ চোখের পলকের একটু ব্যবধানে সুমনার  মনে হল এদের দলনেতা যেন ৫ ফুট বেশি উচ্চতার একটা আস্ত লম্বা বেজী। 

একি দেখল সুমনা ? 

চোখের পলকের ব্যবধান মাত্র তো কয়েক মিলি সেকেন্ড । এক পলকে একটা অন্যরকম কিছু যেন তার চোখে পড়ে গেল? একটা বিশাল আকারের বেজী! এটা যেন ঐ মহিলার বদলে তা ভারী ভারী  পা ফেলে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে। 

নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছে না। সুঠাম দেহের এই মহিলার বদলে সুঠাম দেহের আস্ত একটা বেজী এলো কোথা থেকে? 

এই এন্টিটি, এই বস্তুটি  শেইপ শিফ্টার নাকি? একবার মানুষ  আরেকবার অন্য কিছু? 

নাকি ঠিক ওই সময় ওই স্থানে পোর্টাল ওপেন হয়ে ঝুপ্পুস করে মহিলার মাথার উপরে বেজী সদৃশ কোন কিছু নেমে এসেছিল ক্ষণিকের জন্য? কেনই বা আসবে?

এতগুলো প্রশ্ন মনের মাঝে ঘুরপাক খেতে খেতে দোকানের সামনে এসে তিনজন দাঁড়ালো। সুমনা তাদের পিছনে। তারপরও সবাইকে ফেলে সুমনা প্রবেশ করলো দোকানের ভেতর সবার আগে । ঈদ কালেকশনগুলো দেখতে দেখতে খেয়াল করল বেজীটা বাদে বাকি দুজন দোকানের ভেতর ঢুকেছে। কাপড় নাড়াচাড়া করছে। সুমনার এক নজরে সব কালেকশন দেখা শেষ। এবার বের হবার পালা।  ভারী কাঁচ ঠেলে  যেই না সে দোকানের  বাইরে পা রেখেছে,  কেউ যেন আকাশ বাতাস একাকার করে ভম ভম কন্ঠে বলা শুরু করলো,'এই তোমরা কোথায়? কি করছ ওখানে ? '

এত উদ্ভট স্বরে কে শব্দ করে উঠলো? 

সুমনা ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকালো। দেখল, সুমনা যতক্ষণ দোকানের ভেতরে ছিল ওই বেজীটা দোকানের বাইরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। দোকানে সে প্রবেশ করেনি। সুমনা বের হতেই তাকে দেখে তার কন্ঠ সচল হয়ে উঠেছে যেন। সে ভড়ভড় করে শব্দ করে দোকানে ঢুকবার আয়োজন শুরু করছে এবার। সচল হবার সুইচ অন্ হয়ে গেছে। এগিয়ে আসছে দোকানের দিকে। গলা দিয়ে অদ্ভুত  শব্দ করে  তারস্বরে জানান দিচ্ছে তাকে যে এবার সে আগাতে পারে  দোকানের ভেতরে থাকা বাকি দুজনের দিকে। 

কিন্তু কে আটকে রেখেছিল তাকে? 

আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে হঠাৎ ঠাঁয় দাঁড়ানো থেকে সচল   না হলে  সুমনা তার এহেন আচরণে এতটা অবাক হতো না। এতটা মনযোগও দিত না। বেজীটা যেন সুমনা বের হবার অপেক্ষায় ছিল। দোকানে প্রবেশ করার সময় গলায় কথার ভঙ্গীমায় এও জানান দিচ্ছে, যে 'তুমি যখন দোকানের ভিতর ছিলে আমি তখন ভিতরে ঢুকিনি।'

কিন্তু কেন? 

সুমনা কি করেছে তার?

বেজীটা লম্বা হয়ে শিড়দাঁড়ারর ওপর ভর করে  টান টান শরীর  ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল দোকানের দিকে চেয়ে। বাইরে তার এই অপেক্ষা। সুমনা ভেতরে থাকলে সে ভেতরে যাবে না। কেন সুমনাকে তার প্রতিপক্ষ মনে হয়েছে? সুমনার সাথে ফ্রিকোয়েন্সি মিলেনি বলে? কেন মিলেনি? ও কি এই পৃথিবীর আট দশটা মানুষের মত সত্যিকারের মানুষ না। নাকি প্রেতলোকের ডাইনী?  

৩

বেজীটাকি সত্যি চোখের ভুল ছিল? নাকি  সত্যি মানুষরূপে ঘুরে বেড়াতে এসেছিল মাটির ওপর কিছুক্ষণের জন্য?  তার বাকি দুই সংগী তো কাকতালীয় ভাবে সুমনার পূর্ব পরিচিতদের কপি। তাহলে অতীতের সেই দুজনাও কি এদের গোত্রের? হাব ভাবে তো সেই দু’জনও সুবিধার ছিলনা কোনদিন। 

আজ, দৃপ্ত পদভরে যে হেঁটে এতটা পথ সুমনার সাথে  আসতে পারে তার এমন কি হলো? তার  দোকানে প্রবেশ  করতে কেন এত সংকোচ শুরু হলো? 

সুমনা যতক্ষণ দোকানের ভেতরে ছিল বেজীটি সেখানে প্রবেশ করেনি। ঠিক যখনই সুমনা বেরিয়ে আসলো সে খলবল করা শুরু করলো। বলতে লাগলো , ‘কি এত দেখে মেয়েগুলো? কি করছে ওখানে?'  দোকানের ভারী কাঁচের দরজা টেনে দোকানে ঢুকছে আর বলেই চলছে  একই কথা।  

বেজীর এহেন কান্ড দেখতে দোকানে প্রবেশ করতে চেয়েছিল সুমনা। কিন্তু এক অজানা আশঙ্কায় দোকানে আর প্রবেশ করেনি। কেমন যেন  অস্বস্তি ভর করে বসেছিল। 

ডাইনীরা সবকিছুর রূপ ধারণ করতে পারে। তিনজনের এই দলে দুজন সুমনার পূর্ব পরিচিতদের রূপে এসেছে। তারা সবাই হয়তো বা পিশাচ লোক থেকে আগত মানুষরূপি পথচারী জাতীয় কিছু।  বাকি দুই সঙ্গীর সাথে পথ ধরে ধরে হেঁটে চলছে মানুষ রূপে। আর ঠিক তখনই সেই পথে এসে পড়েছে  সুমনা। চোখের কোন এক পলকে সুমনার কাছে  এড়াতে পারেনি তার আসল রূপ। সে জানে সুমনা তাকে দেখে ফেলেছে।  তার  চেহারা প্রকাশ হয়ে যাওয়ায় সে দোকানের ভেতর প্রবেশ করেনি। আর সুমনার সামনে আসে নি।

এবার যেভাবেই হোক পালাতে হবে।

কিন্তু কিভাবে পালাবে এর সামনে থেকে?

হয়তোবা কিছুক্ষণ মানুষরূপে হেঁটে  যাবে ওই রাস্তা ধরে। তারপর কোন এক সময়ে বাতাসে মিলিয়ে যাবে লোক চক্ষুর আড়ালে।

 ০৭/০৯/২০২৬


Monday, September 7, 2026

পোর্টালঃ সাইকেল চালক

গ্রীষ্ম শেষ হয়ে এসেছে। হেমন্তের শুরু। ফুলের আবরণে চারিদিকের গাছগুলো শোভিত।

২০০৯  এর সেপ্টেম্বরের শুরুর দিক।

এই সময় আলো ঝলমলে সকালে ঝিরঝিরে ঠান্ডা বাতাসের আবেশে বাড়ির বাইরে থাকতে খুব ভালো লাগে সুমনার। কিন্তু আজ কাজ আছে। দুই রাস্তা পরেই মান্ট্রিয়ল জেনারেল হাসপাতাল। ওখানে যেতে হবে ডাক্তার দেখাতে। কাঁধে রয়েছে ডাক্তারকে দেখানোর জন্য কাগজপত্রের ভারী ব্যাগ। বাসা থেকে দু’কদম গেলেই  মোড়। মোড় দিয়ে হেঁটে গেলে বড় একটা রাস্তা। ভেতরের দিকে রাস্তা বলে তেমন গাড়ি ঘোড়া নেই।। তবুও বাসা থেকে বেরিয়ে সাবধানে ডান বাম দেখে সুমনা রাস্তা পার হল।

সামনের ফুটপাতে পা রাখতেই পাশের ঝোপের আড়ালে ঝপাং একটা শব্দ। সুমনা চমকে তাকালো পাশের ঝোপে ঘেরা ফুটপাতের দিকে। কোথা থেকে যেন একজন সাইকেল চালক তার সাইকেল নিয়ে ঝোপের পাশে, ফুটপাতের খালি জায়গাটায় উদয় হয়েছে। এমন কড়া ব্রেক কষতে হয়েছে তাকে যে, ব্রেকের ধাক্কা না সামলাতে পেরে সাইকেল চালক নিজেই হতচকিত হয়ে পড়েছে। ব্রেকটা সে সুমনাকে দেখেই দিয়েছে। অর্থাৎ সময় মতো ব্রেক না কষলে সুমনা  নির্ঘাত তার চাকার নিচে পড়তো ।

কিন্তু কিভাবে এই লোকটির উদয় হলো এখানে?  রাস্তা পার হবার সময় সুমনা কাউকে তো সাইকেল চালিয়ে আসতে দেখে নি। হতে পারে ঝোপগুলো খুব বড়, তাই চোখে পড়েনি । এই ব্যাখ্যার মধ্যে সান্ত্বনা খুঁজে পাওয়া যায় বটে, তবে সাইকেল চালকের অবস্থা দেখে মনে হল সে যেন সুমনার থেকে  ইঞ্চি খানেক দূরে  এসে নিজেকে  কোন একভাবে থামাতে সক্ষম হয়েছে। এ একটা অসম্ভব ব্যাপার ছিল। তার জানার মধ্যেই ছিলনা এখানে কোন পথচারী আছে।  কিন্তু সামনে কে আছে তা সে দেখবে না?

দেখে নি কেন?

কারণ একটা হতে পারে আর তা হলো সামনে থেকে তো আসেনি। ও যে কোথাও থেকে ঝুপ্ করে পড়েছে । পড়ার পর দেখেছে নাকের ডগায় দাঁড়িয়ে আছে এক  আগুন্তক।

তাহলে কি ব্যাপারটা এমন হয়েছে যে, যখন সে আসবার উদ্যোগ নিয়েছে আর যখন সে  এসে পড়েছে – এই দুই সময় সূচির ফারাকে সুমনার অতর্কিত আগমন ঘটে গেছে  যা, তার জানা ছিল না। একমাত্র  আকাশ থেকে না পড়লে এটা না জানার কথা নয়।

আর এত বড় একটা সাইকেল আশপাশে  না দেখেই সুমনা ফুটপাতের ওই জায়গায় পা রাখবে? রাখতেই পারে।  আনমনে থাকলে কত কি হতে পারে! তাই হয়তো হয়েছে  -এই  ব্যাখ্যা নিজেকে দিয়েও সে  হিসাব মিলাতে পারে নি। কারণ এর পরের ঘটনা আরো চমকপ্রদক। আর তা হলো, সাইকেল চালকের এহেন কারবার দেখে, উল্টো দিক থেকে আসা এক মহিলা পথচারী তখন তার দিকে এমন তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে হাসলো যেন, এই দুইজন পথচারী একে অপরকে আগে থেকেই খুব ভালো চেনে।  লোকটির দৃষ্টি অনুসরণ করে সুমনা মহিলার দিকে তাকাল।  দুজনেই শ্বেত বর্ণের ফ্রেঞ্চ। নারীটির ভাবখানা এমন যেন, সে সাইকেল আরোহীকে বলতে চাইছে, ‘ এবার বুঝেছ তো সাইকেল চালাবার মজা?’

দুজনের যোগাযোগের ভাব দেখে সুমনার বুঝতে বাকী রইলো না  এই দুই ব্যক্তি  এই রিয়্যালিটির কেউ নয়। এদের একজন আজ পৃথিবী ভ্রমণকালে  রাস্তার এক পথচারীর সাথে ধাক্কা থেকে  কোন ভাবে  নিজেকে বাঁচিয়েছে। ঘটনা সামলে নেবার পর  হতবিহবল হয়ে পড়েছে।  ক্ষণিকের জন্য হলেও সেই অভিব্যক্তির চাক্ষুষ সাক্ষী হয়েছে তারই আরেক সংগী।  পৃথিবীর প্রতিটি স্থানে, প্রতিটা মুহূর্তে দৃশ্যমান হোক বা না হোক, ET রা হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে পার্থিব চেহারা নিয়ে মনুষ্য রূপে রক্ত মাংসের শরীরে  অথবা মাঝে মাঝে নন ফিজিক্যাল রূপে। এরাই তারা।

কখন কোন পোর্টাল বেয়ে  ঝুপ করে ফুটপাতের  মধ্যে তার আসার ক্ষণে  সুমনার  আগমণ ঘটবে, এমন  কি সে জানত?

নাহ্‌।

কারণ এই অংশটুকু  যে  প্রকৃতি ঠিক করে রেখেছে। তার পোর্টাল উন্মুক্তের ক্ষণে তার  হিসাবের পাশ কেটে  সুমনা  রাস্তা থেকে ফুটপাতে উঠবে।  অদ্ভুত ভাবে  পরস্পরের উপস্থিতির উপরিপাতন ঘটবে। মানে সঙ্গঘর্ষ হবে।  সুমনার এক্কেবারে মাথার উপরে হয়তোবা এই সাইকেল চালকটি তার সাইকেল নিয়ে পড়বে , না হয় তার  পাশ ঘেঁষে ধাক্কা লাগাবে।

কিন্তু না, সে সামলে নিয়েছে। সামলাতে যদিও তার ভীষণ কষ্ট হয়েছে। সুমনা নিজেই তা দেখেছে। তার দুর্দান্ত গতিশীল অবস্থা থেকে  সামলে নিয়ে হঠাৎ থামিয়ে ফেলার ঘটনাটা চালকের মুখে আতংক ও  আর্তনাদ সৃষ্টি করেছে। সুমনার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে শিস্‌ দেবার সুরে শব্দ করে উঠেছে। এই শব্দই সুমনা শুনেছে। অসম্ভব গতির পর ব্রেক কষার কোন শব্দ সে শুনেনি।

এখনো তার মনে পড়ে –আচমকা কি যেন উদয় হলো ঝোপের পাশে।  সামনা সামনি পথচারীকে অতর্কিতে  দেখার  পর সাইকেল চালকের  ক্ষীণ আর্তনাদ। চালকটি অবাক হয়ে ভেবেছিল  ঝপ্  করে পৃথিবীর ম্যাট্রিক্স –এ প্রবেশের সময় কিভাবে  সুমনার এত কাছ দিয়ে তার পোর্টাল উন্মুক্ত হয়ে পড়লো? কিভাবে বিশাল সংঘর্ষ  হতে গিয়েও হলো না। কিভাবে সে দক্ষতার সাথে অনিবার্য সংঘর্ষ সামলে নিল!

২

তারা তো সবসময়  হেমন্ত এলে, এ গ্রহের হেমন্তের ঝলমলে দিন উপভোগ করতে আসে।  রাস্তায় হেঁটে বেড়ায়, সাইকেল চালায়, জীবন কেমন তা জানার জন্য  মনুষ্যরূপ ধারণ করে। অন্য কোন সময় অন্য কোন রূপও তারা ধারণ করে ঘুরে বেড়ায়। কত ভাবেই না  এ গ্রহের জীবন যাপনের স্বাদ গ্রহণ করে। সুমনার দেশে থাকলে হয়তোবা পথের ধারে দাঁড়িয়ে ঝালমুড়ি, ফুচকা খাওয়ার স্বাদও গ্রহণ করত।

রাস্তার পথচারীদের মাঝে কয়জন এই বাস্তবতার আর কয়জন অন্য বাস্তবতা থেকে আগত তা  কি আমরা সত্যিই জানি? তারা যখন ইচ্ছে  তখন  পোর্টাল থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নেমে গিয়ে  যদি দুর্ঘটনাও ঘটায়, তাও আমাদের অজানাই থেকে যায়।

০৭ই সেপ্টেম্বর,২০২৬

Sunday, September 6, 2026

শেইপ শিফটার –দাঁড় কাক

শীত প্রায় চলেই এসেছে। 

অক্টোবর মাস, ২০০৯.

মন্ট্রিয়ল শহরে বেশ ঠান্ডা। ঝিরঝিরে ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা বেশ ভাল লাগে সুমনার। কিছুক্ষণ পরপর একটা করে ঠান্ডা ঝাপটা কোথা থেকে এসে যেন সারাটা শরীর আদর করে বুলিয়ে দেয়। দেশে তো হিমালয়ের ঠান্ডা বাতাস আছে। মন্ট্রিয়লের উত্তরে মেরু অঞ্চলের তুষার আবৃত পাহাড় আছে। প্রতিদিন সূর্য ঝলমল সকালে সুমনা বের হয়ে পড়ে তার কাজের উদ্দেশে। একটা একটা অলিগলি পার হতেই চোখে পড়ে মোড়ে মোড়ে একটা করে চার্চ। ঢাকাকে যদি মসজিদের শহর বলা যায়, মন্ট্রিয়লকে বলা যেতে পারে চার্চের শহর। 

আজ দিনটা যেন কেমন এক অদ্ভুত রকমের সুন্দর। বড় রাস্তার একদিকে গাছ দিয়ে ঢাকা। তার ছায়ার নিচ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে  একটু পর পর কারুকাজ খঁচিত প্রাচীন ইমারতের গীর্জাগুলো চোখে পড়ছে। রাস্তার ঐ পাড়ে নটরডাম স্কুল। দেখলেই সুমনা ভাবে, ‘একদিন আমি এ স্কুলে শিক্ষকতা করবো।’ কিন্তু তা কি সম্ভব? মাতৃভাষা ফ্রেঞ্চ না হলে তো স্কুলে শিক্ষকতা সম্ভব না। সুমনা ইউনিভার্সিটি অফ্  মন্ট্রিয়লে ছয় মাসের জন্য ভাষা শিক্ষার কোর্সে ভর্তি হবার সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু জানুয়ারির কঠিন শীতের বরফ পেরিয়ে সেই পাহাড়ের চূড়ায় ক্লাস করবার ভয়ে ভাষাটা আর শিখাই হয় নাই। যদিও ওই ছয় মাসের জ্ঞান নিয়ে স্কুলে তো শিক্ষকতা সম্ভব না,   তবে দোকানে কাজ করার জন্য, গ্রাহকের সাথে বাতচিৎ করার জন্য এধরণের কোর্সগুলো উপকারী। যেহেতু তা হয়নি তাই সুমনা ফ্রেঞ্চদের ভাষা বুঝেও না, বলতেও পারে না। কিন্তু ফ্রেঞ্চদের আদব কায়দা আর দৈহিক সৌন্দর্য্যর মুগ্ধতা নিয়ে ঘুরে বেড়ায় সারাক্ষণ।  মনে মনে ভাবে, ‘মন্ট্রিয়ল শহর, আমার শহর। আমি এই শহরের –ই  মেয়ে।’

এমন ভাললাগার চিন্তায় মগ্ন হতে না হতেই মাথা তুলে তাকালো পাশের কারুকাজ শোভিত গীর্জার দিকে। হুইল চেয়ারে চলাচল করা উপসনাকারীদের জন্য গীর্জার সামনে শক্ত স্টিলের রেলিং বসানো হয়েছে। এখন সকাল সাড়ে দশটা। চার্চের প্রার্থণার সময় শুরু হয়নি। গীর্জার সামনে পাকা করা উঠানে কিছু মানুষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর স্টিলের রেলিং –এ বসে আছে কৃষ্ণবর্ণের একটা মেয়ে। কালোস্যুটের ফরমাল পোশাকে মনে হচ্ছে মেয়েটি চার্চের কোন কাজের সাথে আজ যুক্ত। বয়স ২০/২২ বছর হবে। কাঁধ পর্যন্ত কালো চুল। কোকড়া নয়।  চোখ পড়তেই লক্ষ্য করলো মেয়েটি ঠাঁয় তাকিয়ে আছে তার দিকে। পলক ফেলে আবার তাকাতেই সুমনা দেখল ওখানে যেন একটা বিশাল দাঁড় কাক বসে আছে। মেয়েটি একদম উধাও।  এক ঝলকের তফাতে মেয়েটি উধাও? 

কোথাও নেই? এ কিভাবে সম্ভব? 

চোখের ভুল নয় তো। একটা দাঁড়কাক কেন দেখতে পাচ্ছে ওই জায়গায়?

মেয়েটি কেন তার দিকেই ঠাঁয় তাকিয়ে ছিল এত পথচারীর ভিড়ে?

সারাদিনের কাজ শেষে একটু শংকা নিয়েই সুমনা সেদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে এলো। কিছুতেই ভুলতে পারছে না মেয়েরূপী দাঁড়কাকটির কথা। মেয়ের জায়গায় এক ঝলকের জন্য একটা দাঁড়কাক দেখতে পাওয়া কেমন যেন এক এলোমেলো ব্যাপার।

২ 

সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত গড়াতেই শুরু হলো সুমনার গলা থেকে এক অদ্ভুত ঘড় ঘড় কাশির শব্দ।  এই শব্দ এতো কিম্ভুতকিমাকার যে, একবার একটু কাশলেই আশপাশের বাসার সবার কানে পৌঁছে যাচ্ছে এই শব্দ। তার বিল্ডিং –এর একতলা থেকে জানালা দিয়ে শব্দ পৌঁছে যাচ্ছে দোতলা, তিনতলা ছাড়িয়ে সেই চারতলায় । গলার স্বর পালটে কি এমন শব্দ শুরু  হলো ? তাও তো না? কোথা হতে আসছে এ শব্দ? সুমনার গলা চিরে আসা এই শব্দ তো সুমনার নয়। মনে হচ্ছে যেন কোন একটা যন্ত্র বসানো হয়েছে তার গলার ভেতরে।

ওর খুব ভয় লাগছে। খুব অসহায় লাগছে। আজ সকালে কাক রূপী মেয়েটার কথা মনে পড়ছে। পিশাচ যখন মানুষ রূপে আসে তার উপস্থিতি ধরে ফেলার মত অভিজ্ঞতা যে তখনো সুমনার হয়নি।

৩

ছয় বছর পরের কথা। 

২০১৫.

দেশের একটা কলেজে শিক্ষকতার কাজ নিয়েছে সুমনা। বিষয় গণিত এবং বিজ্ঞান।দেড় ঘন্টার  লেকচার ক্লাশে  খেয়াল করেছে একটি ছাত্রী ঘড়ি ঠিক ধরে এক ঘন্টা পর ক্লাশে প্রবেশ করে। পরনে পার্টির পোশাক। সাজগোজে পুরো ভারী  মেইক –আপ। তিনি আর কেউ না, ব্যাংকার বাবা মায়ের একমাত্র আদুরে কন্যা।  আব্দারের শেষ নেই। তার আবদার মেটাতে বাবা মায়ের চেষ্টার শেষ নেই। কিন্তু পড়াশুনায় তার মন নেই। শুধুই সবকিছুতে তার জিদ। সুমনা এসব তথ্য পেয়েছে প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে। এবার রেজাল্ট খারাপ হলে প্রধান শিক্ষক ডেকে পাঠালেন তার মাতা পিতাকে। তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, ছাত্রীর একাধারে সব বিষয়ে খারাপ নম্বর কেন। তাদের কন্যা বাসায় করে টা কি? বাড়ির কাজ? ঘরের কাজ? নাকি রান্নার কাজ?

বাবা মায়ের উত্তর, কিছুই করে  না। তার শুধু রাগ আর রাগ। 

সুমনা দেরী করে ক্লাশে আসা ছাত্রীটিকে আজ নিয়ে সামনে বসিয়েছে। পুরো দেড় ঘন্টার ক্লাশে ছাত্রীটি একবারও চোখের পলক ফেলেনি। ঠাঁয় তাকিয়ে ছিল তার টিচারের দিকে। যেন তার মধ্য দিয়ে কোন এক সত্তা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে এই টিচার নাম্নী বস্তুটিকে। আগে কি তারা এমন কোন বস্তু দেখে নি?  চারপাশে সবাই এখন তার কাছে ‘অবজেক্ট – লক্ষ্যবস্তু। কে এই সত্তা যে এই নিরীহ ছাত্রীটির দেহে বাসা বেঁধেছে? খুঁজে খুঁজে নির্ঝঞ্ঝাট একটি সুখী পরিবারের এই নরম মনের মেয়েটিকে বেছে নেয়া হয়েছে। পিশাচ লোক থেকে তারপর কাউকে পাঠানো হয়েছে এর দেহে। ভূ-লোকে এসে তারা পর্যবেক্ষণের কাজ নেমেছে। তাদের আচরণ আর মেজাজের খপ্পরে পড়ে আচরণগত বৈষম্যের শিকার হবে এই আধারটি। ভয়ংকর শব্দে চারিদিক প্রকম্পিত করে তুলবে মাঝে মাঝে। 

৪

ক্লাশে একদিন সময় মত এসেছিল ছাত্রীটি।  কিন্তু ক্লাশে ঢুকবার প্রাক্কালে শুরু হল তার অতিপ্রাকৃত ভয়ংকরে সেই কাশি। যেমন সুমনাকে ধরেছিল সেই মন্ট্রিয়লে দাঁড়কাকটি। ছাত্রীটির স্বরে ভেসে আসা এই শব্দ চিনতে ভুল হয়নি সুমনার। দাঁড় কাক না হলেও পিশাচ লোকের কোন কিছুর নজর তো পড়েছেই। চলার পথে কখন কোন সময়ে ঝুপ্ করে পোর্টাল বেয়ে পিশাচরা নেমে  এসে কার গলাটা চেপে ধরবে কে জানে।

আজ ছাত্রীটির অসুস্থতা সুমনা নিজ চোখে দেখেছে। নিজের ওপর দিয়ে না গেলে বুঝতো না পিশাচদের ভয়ংকর আক্রমণ কেমন হতে পারে। অপরের দুরবস্থা উপলব্ধি করতে পারতো না। সুমনা এখন জানে - যদি মুক্তি না মেলে এই পিশাচের হাত থেকে, তাহলে জীবনের সমাপ্তি অনিবার্য। কিন্তু কিভাবে বুঝবে কোন স্থানে কখন এ রকমের অক্রমণ হতে পারে ? 

০৭/০৯/২০২৬

Tuesday, September 1, 2026

বম রাজার পুত্র

পূর্বকথা

কোন এক মধু পূর্ণিমার দিনে বম রাজার ঘরে তার প্রথম পুত্র সন্তানের আবির্ভাব ঘটে। বহু আকাংখিত পুত্রটির নামকরণ করা হয় পূর্ণ। পূর্ণিমার দিনে জন্ম বিধায় পূর্ণিমা থেকে পূর্ণ। ভাল নাম পূর্ণ বম।  একমাত্র সন্তান বলে তার  আবদার পূরণের কোন কমতি ছিল না। আদরে আহ্লাদের পূর্ণ বড় হতে থাকলো। পারলে আকাশ ফুঁড়ে স্বর্গও এনে দেবেন রাজা বাহাদুর তার পুত্রের হাতে। কিশোর বয়সে পদার্পণের সাথে সাথে গানের প্রতি তার ঝোঁক বাড়তে থাকলো। সাথে যুক্ত হলো তাকে দেয়া ইশ্বর প্রদত্ত ভরাট কন্ঠস্বর।  এর মাঝেই সংগীতে তার দিন দিন দক্ষতা বেড়েই চলছে। যৌবনে পদার্পণ করার সাথে সাথেই গোত্রের রীতি অনুসারে পূর্ণের বিবাহ সম্পন্ন হলো। 

আধুনিক শিক্ষা দীক্ষায় দীক্ষিত হয়ে সেই প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছেলেটি দেশের নামকরা ব্যান্ডগ্রুপে নিজেকে সসম্মানে যুক্ত করতে সক্ষম হলো। এক পর্যায়ে সে গ্রুপে কন্ঠ দিতে শুরু করলো। আর এটাই ছিল তার জীবনের ঘুরে দাঁড়াবার প্রথম মোড় বা যাকে বলে টার্নিং পয়েন্ট। তার সংগীত ক্যারিয়ারের শিখর চূড়ায় আরোহনের সিঁড়ি তার ব্যান্ড গ্রুপ। সুরেলা  ভরাট কন্ঠ আর হৃদয় ছোঁয়ানো সুরের কাজ এক নিমেষে সকল শ্রোতাদের মন জয় করে নিল। শুরু হলো সেলিব্রিটি জীবনে ভক্তদের আগমন। ভক্তদের ভালবাসায় একাকার এই ছোট্ট জীবনে এরপর মধুকরীদেরও অনুপ্রবেশ ঘটলো। আর তখন দেখা হলো শ্রাবনীর সাথে। 

শ্রাবণীর কামনায় ভরা দৃষ্টিতে পূর্ণ যেন হারিয়ে গেল কোন একসময়ে। 

শ্রাবণী তাকে এক সময়ে তার রাজ্য ত্যাগে বাধ্য করল। গান বাজনা উচ্ছন্নে গেল। স্ত্রী পুত্র পরিবারের মায়া মন থেকে উধাও হয়ে গেল। শ্রাবণীর মোহে অন্ধ হয়ে পূর্ণ তার পরিবার, গোত্র, সমাজ অস্বীকার করে গৃহত্যাগ করলো। রাতের এক অন্ধকারে বিজাতীয় মেয়ে শ্রাবন্তীকে নিয়ে পূর্ণ বম দেশান্তরী হলো।

১

শ্রাবণীর সংস্পর্শে পূর্ণ অনুভব করলো প্রেম কাকে বলে। নতুন করে চিনলো নিজেকে। অপার আনন্দে গা ভাসালো। একই সাথে পিছনে ফেলে আসা ঘর সংসার, পরিবার যে নিমেষে ধ্বংস হয়ে গেছে সে খেয়াল থেকে সম্পূর্ণ রূপে বিচ্যুত হয়ে নতুন জীবনকে আলিঙ্গন করলো। 

এভাবেই সব কিছুই ভালো কাটছিল তাদের।  শ্রাবণীর বাঁকা গালের হাসি, কামাতুর চাহনীতে পূর্ণ হারিয়ে গেছে নাকি শেষ হয়ে গেছে, সে নিজেই জানে না। কিন্তু জানে যে তার আর কিছুই চাইবার নেই। সে এখন পরিপূর্ণ। তাই কোন এক মধু পূর্ণিমার দিনে শ্রাবণীকে বিয়ে করবার সিদ্ধান্ত নিল। 

বিজাতীয় হয়েছে তো কি হয়েছে?

প্রেমের কোন জাতপাত আছে না কি?

কিন্তু বিয়ে করলে প্রেমিকা যে আর প্রেমিকা থাকে না তা কি পূর্ণ জানে? 

কিভাবে জানবে? প্রেমে তো এর আগে সে পড়ে নি। সমাজের জন্য  কর্তব্য মনে করে স্ত্রী গ্রহন করেছিল পূর্বে। কিন্তু সেই মিলনে তো প্রেম ছিল না। এবার প্রেম এসেছে জীবনে। প্রেমিকা কে আরো স্থায়ী বন্ধনে আবদ্ধ করবার জন্য তাকে স্ত্রী-র মর্যাদা দেবে। শ্রাবণী প্রেমিকা থেকে স্ত্রী হয়ে সংসার নামক যাঁতাকলের যাঁতায় এবার দায়িত্বের বেড়াজালে  আটকাবে। পিতা, পিতামহদের রাজকীয়  ঠাঁট বাটের মাঝে পূর্ণ-র তেমন কোন দায়িত্ব ছিল না। কিন্তু এই বিদেশে তার চলবে কি ভাবে? যথাসাধ্য চেষ্টা করছে। এতে প্রেমে থিতু আসেনি। যদিও প্রেমিকা এখন তার স্ত্রী। সংসারের চাহিদা অনুসারে   স্ত্রীরও সন্তান লাভের আকাঙ্খা কম নয়। কিন্তু কোন এক অজানা কারণে  তাদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন হচ্ছে না। বহু চেষ্টা করেও সন্তানের মুখ দেখা হলো না। দিন দিন শ্রাবণীর হতাশা বেড়ে চললো। 

শুরু হলো টুকটাক মনোমালিন্য। ছোটখাটো ভাল না লাগা। কথা কাটাকাটি। এক পর্যায়ে অনিচ্ছা আর ভীষণ রকমের বিরক্তবোধ। তাদের আর ইচ্ছেও করে না পরস্পরের মুখ দেখতে। তাহলে সব কিছু তুচ্ছ করে ফেলে আসা কোন এক কালের কোন এক প্রেম কোথায় গেল? রাজবংশের উত্তরাধিকার অস্বীকার করা, সংগীত থেকে বিরত রাখা –এ সবকিছু তো শ্রাবণীর জন্যই। তাহলে পূর্ণ কি পেল জীবনে –এই  প্রশ্ন আসে কেন বারবার তার মনে? পূর্ণ-র সব কিছু কি অপূর্ণতায় পর্যবাসিত হয়ে গেল?

শ্রাবণীর শরীরের বাঁকগুলো আর জায়গা মতো থাকছে না। কামনা উদ্রেককারী ভাব ভংগীমাগুলো নিমেষেই হারিয়ে যেতে শুরু করেছে।  সবাই বলে মানসিক আবসাদ থেকে এরকম হয়ে গেছে। সাপের আঁকা বাঁকা বাঁকগুলো নষ্ট হয়ে  শরীরটা একটা বেঢপ বেজীর আকার  ধারণ করেছে। 

এতদিন পার করে পূর্ণ কি তাহলে সব হারালো? না আছে শ্রাবণীর সেই মন, না আছে তার কামাতুর শরীরটা। কোথায় যাবে পূর্ণ? কি করবে সে? এই দশমণের বস্তার ভার আর যে সইতে পারছে না সে।  তবুও যে, সে সব কিছু সহ্য করে চলছে। কারণ ও এখন  বেঢপ আকারের হলেও সে –ই  তো তারই মনের নায়িকা। কিন্তু  সংবেদনশীলতা কি আছে? 

পূর্ণ বমের পাগল হবার দশা।  
মনে পড়ে, প্রথম দিকে তার ভক্ত থাকাকালীন শ্রাবণী মডেলিং করতো। টুকটাক দু’একটা নাটকেও কাজ করেছে। শ্রাবণী যখন পর্দায় আসতো দর্শকরা তার কামনায় ভরা চোখের চাহনী আর বাঁকা হাসির জন্য হন্যে হয়ে অপেক্ষা করতো। অভিনয়  প্রতিভা আছে, কি নাই তা নিয়ে তাদের মাথা ব্যথা ছিল না। সবাই বলতো শ্রাবনীর বাঁকা গালের হাসি অনন্য । এ হাসি  আর কারো নেই। সে যেন সাক্ষাত অপ্সরা। দেশের সব মডেলদের ছাড়িয়ে তার হাসিটুকু যে মদিরা সৃষ্টি করতে পারে তা আর কারো মাঝে নেই। 
পূর্ণ –ও  তখন ক্যারিয়ারের শীর্ষে। আর এই শীর্ষে থাকা দুই তারকার মিলনের নির্দেশ যেন কোন এক মহাজাগতিক নির্দেশে, স্বর্গ থেকেই আদিষ্ট হলো।  তাই হয়তো বা তাদের দুজনের সম্মিলিত পথচলা শুরু হয়েছিল। শুরু হয়েছিল দু’জনের অদৃষ্টের সম্মিলিত  অধ্যায়।   

২
আজ দু’দশক হয়ে গেছে শ্রাবণীকে ছেড়ে চলে এসেছে পূর্ণ তার পুরোনো সংসারে। শ্রাবণী নতুন করে জীবন শুরু করেছে। সংসারে মনোযোগ দিয়েছে। সে তার নতুন জীবনে দু’সন্তানের জননী। পূর্ণ তাকে পূর্ণতা দিয়ে তার মাতৃত্বের সাধ মিটাতে পারে নি। পূর্ণ –র  নিজের ঘরে তো সন্তান ছিল। বাচ্চাটি এখন বেশ বড়। বাবার সাথে তার দূরত্ব তৈরী হয়েছে। তারপরও তো তারই সন্তান। কিন্তু শ্রাবণীর সাথে সংসারটা কোন ভাবেই হলো না। তারা যতই চেষ্টা করে মন থেকে তাদের এই ব্যর্থ সম্পর্কের সময়টুকু মুছে ফেলতে, পারেনা। 
পূর্ণ ঘরে ফিরে নতুন করে চেষ্টা করেছে জীবনকে গুছিয়ে নিতে। নর্থ আমেরিকার যতগুলো বড় বড় শহর আছে সব জায়গায় তাদের কনসার্ট করবার ট্যুর শুরু হয়েছে।  চির চেনা সেই দুই দশক আগে হারিয়ে যাওয়া তার দরদী গলার সুর –মূর্ছনা এবার পৌঁছাবে প্রবাসীদের কাছে। 
আজ থেকে টানা তিন মাস নর্থ আমেরিকায় ট্যুর শুরু।  এয়ারপোর্টের ভেতর ভক্তরা যখনি পাচ্ছে তাকে  ঘিরে ধরছে। যাত্রীরা তাকে দেখে মহাখুশী। কেউ কেউ প্লেনের ভেতরে ঘিরে ধরে সেলফি তুলছে।পোশাক আশাকে তার কোন চাকচিক্য নেই। মলিন, রঙচটা ঢোলা একটা ট্রাউজার পরনে। গোল গলার রঙচটা, মলিন একটা মেরুন টি –শার্ট। পায়ে একটা ঢিলা ফিতার পুরানা স্যান্ডেল। প্রৌঢ় অবস্থায় চুলহীন মাথা ঢেকেছে পরচুলা দিয়ে। একদম বুঝা যায় না, কারণ ওদের জাতির চুল সব সময় নাইলনের মতন সুন্দর।  লাল, বাদামী রঙের লম্বা চুলের পরচুলা। বেশ মানিয়েছে। প্লেনের ভেতর সিটে  বসতে বসতে শুরু হল তার দলবলের হৈ চৈ। কত প্রাণোচ্ছ্বল দলের সকল সদস্য। সেলিব্রেটি বলে স্টুয়ার্ডরা,  এয়ার হোস্টেসরা আন্তরিকতার সাথে আপ্যায়নে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। ফার্স্ট ক্লাশ থেকে স্যুপ, কাটা লেবুর সালাদ, শরবত এনে দিচ্ছে। পূর্ণ দলের সবার সাথে তা ভাগ করে খাচ্ছে আর গল্পে মত্ত হয়ে আছে। দলের বড় ভাই সে। সবাইকে আগলে রাখাই তার কাজ। একবার বেশ উঁচু স্বরে বলে ফেললো একজন এয়ার হোস্টেসকে, ‘ ভাতের সাথে কি কাঁচা মরিচ পাওয়া যাবে?’  আমরা সবাই জানি দেশের খাবার বিদেশে যে স্বপ্নের মতন। আরো কত কথা তার। পুরোনো অভিজ্ঞতার সাথে মিলিয়ে দেখলো এবার যাত্রার সময়। তার জীবনে  আজকের ফ্লাইট সবচেয়ে দীর্ঘ হতে যাচ্ছে। তাও তারা সবাই খুশী। কারণ একটাই। বহু দিনের প্রতীক্ষিত ঢাকা – নর্থ  আমেরিকা সরাসরি ফ্লাইট অবশেষে চালু হয়েছে।

কি ফুরফুরে, লিডারশিপে পূর্ণ  তার ব্যক্তিত্ব! সবদিক দিয়ে একজন তারকা সে। কিন্তু চোখে মুখে তারপরও ধরা পড়ে ক্ষয়ে যাওয়া হৃদয়ের বিরামহীন রক্ত ক্ষরণ। শ্রাবণীর ঝড় জীবনকে ওলোট পালোট করে না দিলে জীবন তো তার গতিতে চলেই যাচ্ছিল। সেবার কলেজ  শেষ করতে করতে ঢাকায় এসেছিল গান গাইতে। দেখা হয়েছিল এক সাক্ষাত স্বর্গ থেকে নেমে আসা পরীর সাথে। এক দেখায় বলে বসেছিল, ‘আমায় বিয়ে করবে?’ সেই সময় আজকের মতন তার মনে তো কোন ক্ষরণ ছিল না। নিখাঁদ একটা মন শুধু স্বপ্ন দিয়ে ভরা ছিল। 
আর আজ? সবকিছু ভেঙ্গে চুরে চুরমার।
জীবন কি শুধু কষ্টই দেয়? ষাট বছর তো কিছুই না। অথচ যাত্রীদের সাথে বসে হাসতে হাসতে পূর্ণ বলছিল, ‘আরো যেন বিশ বছর বেশী বাঁচতে পারি।’

৩
এই প্রথম টানা ২১ ঘন্টা জার্নি করে শ্রাবণীর শহরে এসে পূর্ণ যখন নামলো তার  ভেতরটা কন্ কন্ করে উঠল। ভেতরে যতই পুড়ুক, দলের ছেলেদের সবসময় সে একটা কথা বলে –আনন্দ  আর হৈ চৈ করাই জীবন। 
যার ভরাট কন্ঠ শুনে শ্রাবণী পাগল হয়েছিল, সেই শ্রাবণী আজ ভীষণ ঠান্ডা। পূর্ণ-র সাথে সময়গুলো মনের মাঝে এলে সে অনুভূতিহীন হয়ে পড়ে। অথচ  তখন তার মোহের জাল ফেলে দলছাড়া করেছিল, সমাজ ছাড়া করেছিল বম রাজার পুত্র পূর্ণ বম-কে। শ্রাবণীর যাঁতাকলে সেই তখন থেকেই পূর্ণ ভাঙতে শুরু করেছে। অল্প সময়ে মুখে বলি রেখার আঁচড় ভেসে উঠেছে। আঁচড়গুলোকে কোন মেইক –আপ ঢাকতে পারেনি। তার ভক্তকুল এখনো জানে না, তাদের প্রিয় গায়কের মুখের ঐ আঁচড়গুলো শ্রাবণীর আঙ্গুলের বিষাক্ত স্পর্শে হয়েছিল নাকি অসময়ের বয়সের ভারে হয়েছিল। পূর্ণকে দেখলে সবার মনে এখনো এই একটা প্রশ্নই  জাগে।  

৪
এখন পূর্ণ কেমন আছে?
শ্রাবণীর অভাবে পূর্ণ  ভীষণ ভাবে নিঃস্ব। সবসময় এলোমেলো, পাগল পাগল একটা ভাব তার। তার অনুজ্জ্বল ক্ষয়িষ্ণু ত্বকের আবরণে ঢেকে যাওয়া রিক্ত শুষ্ক মুখটা দেখলে শুধু একটি কথাই মনে আসে আর তা হলো তার হৃদয় জুড়ে ছেয়ে থাকা  একটা নাম – শ্রাবণী।  নামটি তার মাঝে এতো স্পষ্ট  ভাবে  গেঁথে আছে যেন, তাকে দেখামাত্র সকলের মনে শ্রাবণী নামটি অনুচ্চারিত ভাবে উচ্চারিত হয়।  অদৃষ্ট দিয়ে আদিষ্ট এই নামটির মানুষ তার সত্তায় একাকার হয়ে আছে। এখন পূর্ণ –র একটা অংশ সে। এই নামটি এখন পূর্ণ –র একান্ত। এই নামটি পূর্ণ –র সকল অপূর্ণতা। 

সন্ধ্য ৮;১৫

০১/০৯/২০২৬

জীবন যেন স্রোতের মাঝে ভাসমান দ্বীপের মতো

  ১৯৮৪ সাল। স্কুলের অফিস রুমে গিয়েছি বেতন দেবার জন্য। লাইনে অপেক্ষা আমি আর আমার লাল ঝুটি বন্ধুটি। আমাদের খুঁজে খুঁজে ঐ ভীড়ের মাঝে পুষি এলো। ...