Sunday, July 19, 2026

শায়েরী

 



ফুল যখন ফুটলো

তখন সুবাস নেবার কেউ নেই।

**

(জীবনের) ছোট ছোট ইচ্ছেগুলো থেকে জীবন বঞ্চিত করেছে

কিন্তু তারপরও বঞ্চনা ঠাহর করতে পারি না। 

**

Monday, July 13, 2026

কথোপকথন - ২ কিন্নর

পূর্বকথাঃ

সাজু আর আমি ক্লাসরুমের সামনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে। গত কালের নৃত্যগীত  সন্ধ্যার আয়োজন নিয়ে কথা বলছিলাম।কথোপকথনের মূল বিষয়  নৃত্যগীতের আয়োজন নিয়ে নয়, বরং নৃত্য পরিবেশনকারী 'সুদর্শন পুরুষ' মালবিকা – কে নিয়ে। 

কথোপকথনঃ

-অসহ্য

-কি অসহ্য?

-ওর অঙ্গভঙ্গী।

-অঙ্গভঙ্গী বলছো কেন? এটা তো  নাচ।

- এটা কোন নাচ হলো? হাত পা ছুঁড়লেই নাচ হয়?

-আজকাল হয়। শুধু নাচই হয় না। উচ্চাংগ নৃত্যও হয়।মালবিকার সজাগোজ দেখ না? দরবারে নৃত্য পরিবেশনের সময়ে বাঈজীরা এমন পোশাকেই আসতো। 

-এখানে কোন দরবার হচ্ছে না কি?

- না তা হচ্ছে না। তবে নৃত্য পরিবেশনকারী মনে হয় তোমার মন ছুঁতে পারেনি। তোমার চোখে ওকে সুন্দরী  রমনী মনে হয়নি তাই না?

- রমনী? এই ছেলে কিভাবে রমনী হবে?

- আমার চোখে অবশ্য সে সুদর্শন পুরুষ।তাই আমার ভাল লেগেছে। তোমার ভাল লাগেনি কারণ তোমার দৃষ্টিতে সে 'সুদর্শনা' মানে সুদর্শন রমনী হতে পারে নি।

- একটা মানুষ একজনের চোখে পুরুষ আরেকজনের চোখে রমনী হবে কিভাবে?

- কিন্নর যারা, তার হো তাই-ই।নারী পুরুষ উভয় সত্তার বাস এক দেহে। যেমন মালবিকা।আমি তাকে পুরুষ রূপে দেখেছি তাতেই ভাল লেগে গেছে। তুমি তাকে নারী রূপে দেখতে পেলে বাদ বাকী কিছু খেয়ালেই আসতো না। তার অংগভঙ্গীকে কেরিকাচার মনে হতো না। নৃত্যে পরিবেশনকে ছন্দের তালে তালে শৈল্পিক উপস্থাপন  মনে হতো। আমার  কি মনে  হয় জানো? 

-কি মনে হয়?

-মালবিকা শতভাগ কিন্নর হয়ে উঠতে পারে নি। এখনো পুরুষালী ভাবটা অর্ধেকের বেশী রয়ে গেছে। সমান সমান নারী, পুরুষ হলে তোমার আর আমার কাছে সে 50/50 ব্যালেন্স হয়ে যেত।

- কিন্নররা তো প্রাচীন পুরাণ অনুসারে অর্ধেক মানুষ আর অর্ধেক দেবতা । তাই নয় কি? সেখানে তারা দেবতাদের জন্য সংগীত পরিবেশন করে। আমাদের ডাইমেনশানে এসে সেই মানুষেরও দুই ভাগ আছে - নারী ও পুরুষ। বেশ জটিল ক্রোমোজম-বিভাজন এবং এর সজ্জা। আর দেবতাদের  ক্রোমোজমের সজ্জা তো জানি-ই না। ঐটুকু তো একদম অজানা। 

-হ্যা, বেশ জটিল ক্রোমজোমের সজ্জা। আমি একজন চ্যনেলারের কাছ থেকে তথ্য পেয়েছি যে, 7D -র সত্তারা অর্ধেক মানুষ আর অর্ধেক অ্যাঞ্জেলিক। সুতরাং ভেবে দেখ, তাদের কি জটিল ক্রোমজোমের বিন্যাস! তাদের গুণাবলী আমাদের ধারণারও উর্ধ্বে। এখন কিন্নরদের কথা ভাব। যদি তারা  5D এরও উর্ধ্বের সৃষ্টি হয়, এবং সেখান হতে 3D তে এসেছে সুর, বাদ্য আর নৃত্যের ঝংকারে অনুরণন ঘটাতে, কিন্তু প্রাপ্ত সম্মান না পেয়ে, প্রাপ্ত অধিকারের অভাবে তারা ভিক্ষা করে , ভাঁড়গিরি করে জীবন যাপন করছে।  কি কঠিন দুঃসহ তাদের জীবন। এই ইঙ্কারনেশানে পথ চলা তাদের জন্য কতটাই না দুর্বিষহ। সবকিছুতে শুধু বাধা আর তুচ্ছ তাচ্ছিল্য। 

-নিশ্চয়ই । এরা আমাদের কাছে, না পুরুষ না নারী । কিন্তু গোড়ায় যেখানে এরা সৃষ্ট হয়েছে, সেখানে কিন্নরদের-ও  স্ত্রী জাত আছে। তাদের বলে ‘কিন্নরী’। পুরাণ মতে, কিন্নররা সাধারণত হিমালয়ের কল্পিত গন্ধর্বপুর বা কুবেরের আলকা নগরীতে বাস করত। তাদের বাসস্থান ছিল দেবতাদের স্বর্গীয় রাজ্যে, বিশেষত হিমালয় পর্বতমালায়—গন্ধমাদন, কৈলাস, এবং মেরু পর্বতের আশেপাশে। এখনো বসবাস করে ।কিন্তু সেই উচ্চ ডাইমেনশান তো আমরা দেখতে পাই না। তাই না?  পুরাণে বলা আছে, দেবতারা যখন আনন্দ করেন, তখন কিন্নররা তাদের জন্য গান ও নাচ পরিবেশন করেন। গন্ধর্ব ও কিন্নর উভয়েই স্বর্গীয় সংগীতজ্ঞ হিসেবে পরিচিত।

-ঠিকই ধরেছ। এদের ক্রোমোজম বিন্যাস, পুরাণ অনুসারে যদি ১০০+ হয় তাহলে বেশীর ভাগ বিন্যাসই তো আমাদের অজানা এবং misunderstood. খেয়াল করো, ব্রহ্মার সাত জন মনোজাত পুত্র ছিল।

-মনোজাত মানে? 

- জানি না, তবে আমার মনে হয় মনোজাত মানে manifested হওয়া, অভিব্যক্ত হওয়া। ব্রহ্মার সেই সাত মানসপুত্ররা হলো- ভৃগু, মরীচি, অত্রি, অঙ্গিরা, ক্রতু, পুলহ, পুলস্ত্য। মরীচি ও ক্রতুর কন্যা- অরুন্ধতীর মিলনে বিশ্ব সৃষ্টিতে বিভিনন্ন ধারায়  বংশের  উতপত্তি হয়। ভেবে নিলাম বংশ মানে প্রজাতি। এসব বংশের মাঝে রয়েছে দেবতা, অসুর, নাগ,অপ্সরা, প্রাণীকুল, ১০০+গন্ধর্ব/ কিন্নর, চিত্রসেন (যারা গায়ক জাতি)। এরা ক্রমান্বয়ে বিস্তৃতি লাভ করে সৃষ্টি জগতকে বৈচিত্র্যময় করে তোলে। অর্থাৎ বহু রকমের  DNA সৃষ্টি হয়ে গেল ।তার মাঝে কিন্নর একটি প্রজাতি হিসেবে সৃষ্টি হলো। এরা ‘আধা-মানব, আধা-দেবতা’-র DNA এর সংমিশ্রণ।  পৌরাণিক ধারণায়, কিন্নররা স্বর্গীয় সংগীতজ্ঞ । এদের শরীরে মানুষ ও পাখির বৈশিষ্ট্য থাকে। কিন্নররা স্বর্গীয় রক্ষক (খোজা।) এরা সঙ্গীত, নৃত্য,সুর, সভা গায়কদের সাথে সম্পর্কযুক্ত কাজে পারদর্শী।

আবার অন্য দিক দিয়ে ভেবে দেখ, আমাদের প্ল্যানেট যখন উচ্চ ডাইমেনশানের দিকে এগুবে তখন পৃথিবী উৎস বা সোর্সের কাছাকাছি চলে আসবে। মানুষরা আর 3D  তে আবদ্ধ থাকবে না। তাদের মস্তিষ্কের left hemisphere, right hemisphere একই সাথে কার্যশীল হবে। তখন মানুষের মাঝে দুই সত্তা মানে নারী সত্তা, পুরুষ সত্তার উপরিপাতন হবে।  একই দেহে  দুটি সত্তা প্রকাশিত হয়ে, একই সঙ্গে কার্যশীল হবে।  ক্রোমজোমের গঠন নির্ঘাৎ এক থাকবে না। 

-এক থাকবে না। তাহলে কি 5D তে সব মানুষেরা ভাবেসাবে  কিন্নরদের মত হবে?

- হ্যা। এবং খেয়াল কর, সেই স্বর্গলোকের কিন্নর -এর প্রতিভূ এই ডাইমেনশানের কিন্নর। যদি দেবতাদের (ধরে নিলাম কোন একপ্রকার ET – দের ) ক্রোমজোম ওদের মাঝে থেকে তাহলে তাদের জটিল এই ক্রোমজমের বিন্যাসে দেবতাদের মতন সেই গুণটাও নিশ্চয়ই আছে?

- কোন গুণটা? সেই অভিশাপ দেয়ার ব্যাপার?

-হ্যা । সেই গুণ - তারা যদি কষ্ট পেয়ে মন থেকে শাপ দেয় তাহলে তা ফলে যায়।

-কি সাংঘাতিক!

-এই ডাইমেনশানে  DNA লক্ (অকার্যকর) থাকলে এই গুণ সুপ্ত থাকতে পারে। কিন্তু ১০০+ গন্ধর্ব/কিন্নর এর সৃষ্টি দেখে মনে হয় কমপক্ষে ১০০ প্রকার ক্রমোজম সজ্জা তৈরী হয়ে আছে LGBQT স্পেকট্রামে, যা আমরা জানি না। তবে আমরা যত উচ্চ ডাইমেনশানে উন্নীত হবো, ততই উৎসের দিকে ফিরে যেতে যেতে বহু ধরণের ক্রোমজোমের সজ্জা আমাদের কাছে প্রতীয়মান হবে।মানে প্রকৃতিতে অবস্থিত বহুধরণের সৃষ্টি অবলোকন করতে পারবো। উপরের দিকে পৌঁছুতে পৌঁছুতে  ব্রহ্মার সাত মানসপুত্রের দেখা পাব। তাদের বংশের সকল ধারা দেখতে পাব। কিন্নরদের প্রকৃতি, বৈশিষ্ট্যসমূহ,গুণ, ক্ষমতা সম্বন্ধে জানতে পারবো। তারা আর আমাদের কাছে তাচ্ছিল্যের পাত্র হবে না ।এই 3-ডাইমেনশানে তাদের ভাঁড়ামি করে জীবিকা নির্বাহ করতে হবে না। তারা নিজেরাও জানবে তারা কোথা থেকে আগত। তারা জানবে যে তারা কক্ষপথ থেকে ছিটকে পড়া পথচ্যুত উল্কা পিন্ড নয়। তাদের এইরূপ অস্বাভাবিক দৈহিক গঠন নিয়ে পৃথিবীতে আসার কি কারণ তা জানতে পারলে কেউ –ই তাদেরকে তাদের প্রাপ্ত সম্মান ও অধিকার থেকে বঞ্চিত করবে না।তারা আর হাসি ঠাট্টার পাত্র  হবে না। তাদেরকে তামাশা করে, মানবেতর জীবন যাপন করে বাঁচতে হবে না।

.....।.।

১৩/০৭/২০২৬ 

Tuesday, July 7, 2026

ফোকলা জীবন

দিনটা শুরু হয়েছে খুব ক্লান্তি ভরে। রত্না আজ ঠিক করেছে জীবনের সব অতীত মন থেকে সরাতে না পারলেও এলবামের পাতায় যে ফটোগুলো রয়েছে সেগুলো সরিয়ে ফেলবে।স্মৃতিগুলো টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলে দেবে বাস্কেটে। কিন্তু এত এলবাম,এত ছবি,এত স্মৃতি – সরাতে তো অনেক ধৈর্য্য লাগবে। মন থেকে সরানো তো যাবে না কিন্তু ছিঁড়ে ফেলার কাজটা করার ধৈর্য্য পরীক্ষা এবার দিতে হবে। 

আর কত ধৈর্য্য পরীক্ষা দেবে সে? দুঃসহ অতীত বহনকরতে করতেই তো ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তারপর আবার এলবামের ছবি। আকদের এলবাম, হলুদের এলবাম, বিয়ের এলবাম, বৌভাতের। তারপর আবার ছোট ননদ অগমণ উপলক্ষে দ্বিতীয় বৌভাতের এলবাম।জীবনটা কি তাহলে এলবাম–ময়? 

শুরু তো হয়েছিল সবকিছু খুব সুন্দর করে।আর বিয়ের দিনটা ছিল বেশ অদ্ভুত ধরণের। সেদিনের আগের সপ্তাহে রত্নার বড় আপা এসেছেন বিদেশ থেকে। বহুদিন পরে।তিনিই তাকে শাড়ি পরাবেন। 

বিয়ের সন্ধ্যা আসবার অনেক আগেই পার্লারে পৌঁছাল রত্না।বিউটিশিয়ান আর তার আরেক খদ্দেরের মিলিত দুর্ব্যবহার দিয়ে সেদিন বিয়ের আয়োজন শুরু।সে রত্নাকে  সাজানোর কাজে হাতই দিতে চায় না। ওদিকে অনুষ্ঠানের সময় হয়ে এসেছে।বিউটিশিয়ান মহিলাটা খুব ব্যস্ততা দেখিয়ে অতঃপর যখন কাজে হাত দিল তখনই পাশে বসা এক ইঁদুরমুখো খদ্দেরনি চেঁচামেচি শুরু করে দিল। সে বোধহয় রেগুলার কাস্টমার।তাই বেশ দাপুটে।কোন এক সচিবের ছেলের বউ।তার প্রিয়োরিটি বেশী।আর রেগুলার কাস্টমার বলেই পার্লারের বেটিদের কাছে তার খাতি বেশি।রেগুলারদের তো হাতে রাখতেই হবে।তাদের ব্যবসা দিয়েই না পার্লার চলে।খ্যাপ মারার জন্য তো তারাই আসে প্রতি রাতে। সাজগোজ করে কাস্টমার ধরে আর পয়সা আনে পার্লারের জন্য। 

রত্নার জীবনে এই প্রথম পার্লারে আসা।রেগুলার তো দূরের কথা সারা জীবনেও পার্লার–মুখী সে নয়। আজ  বৌয়ের সাজের জন্যই তার প্রথম আসা।জীবনে প্রথমবার। বিয়ের সন্ধ্যা তো জীবনে একবারই আসে।পার্লারের বিউটিশান মেয়ে –লোকটির  তাচ্ছিল্য দিয়ে শুরু হলো সেই অনাকাংখিত অধ্যায়,বিয়ের সাজ –সন্ধ্যা । 

বাজে অভিজ্ঞতা ও একরাশ বিরক্তি নিয়ে রত্না সেখান হতে বাড়ি ফিরে দেখে তার বড় আপা হাজির।শাড়ি পরিয়ে দিলেন খুব যত্ন সহকারে।সবাই বিয়ের অনুষ্ঠানে যাত্রা শুরু করলো।স্টেজে উঠার আগে বৌয়ের জন্য সাজানো আসনে বসলে, রত্নাকে তার ঘিরে থাকা বান্ধবীদের মাঝে একজন বলে উঠলো,‘রত্না,দেখতো,তোমার পরনের শাড়িটা উল্টা নাকি?’

রত্না বেশ অবাক হয়ে বললো,‘হতেই পারে না।বড় আপা পরিয়েছেন।উলটা হলে তার তো চোখে পড়তো।’

বড় আপা এলেন।উলটা শাড়ি দেখে চমকে উঠলেন।বললেন,‘আমিই তো পরিয়েছি শাড়ি।আমার চোখে একবারও পড়লো না কেন?’

কোন এক অজানা আশঙ্কায় রত্নার মনটা যেন কেমন করে উঠলো।বড় আপা তাকে ড্রেসিং রুমে নিয়ে তার পরিয়ে দেয়া উল্টা শাড়ি দেখে আবারো হতভম্ব হয়ে গেলেন।বললেন,‘কি আশ্চর্য!এমন হয় কিভাবে?’ তারপর শাড়ি ঠিক করে আবার পরিয়ে দিলেন।অনুষ্ঠানের সমাপ্তি পর্বে রুসমত্ আরম্ভ হলো।ওড়নার আঁচলের নীচে বসে বর আর কনের আয়নায় মুখ দেখা।এসময়ে  বলা নেই কওয়া নেই কোথা থেকে বরের বাবা এসে পাশে বসে পড়লো। 

সে এ সময়ে কেন এখানে? কেনএখন এখানে হাজির হয়েছে? 

রুসমতের সময় শ্বশুর থাকে নাকি? 

যেন কোথাও থেকে বাজ পাখির মত উড়ে এসেছে তার পুত্রকে গার্ড দিতে।

কিন্তু কেন? গার্ড দিতে হবে কেন? 

পুত্র কি কথা বলতে পারে না? বোবা? 

নাকি বেসামাল?

রত্নার খুব বিশ্রী লাগছে ব্যাপারটা।বিশেষ করে রুসমতের এই সময়ে।শ্বশুরের কি কোন কান্ডজ্ঞান নেই? নাকি অন্য কোন উদ্দেশ্য আছে তার? সে কি ভাবছে –এই রুসমত্,তার ছেলের নয়,তার নিজেরই হচ্ছে? উৎসাহের ভীষণ ঠ্যালায় বোধবুদ্ধি হারিয়েই কি ছেলের পাশে এসে বসে পড়েছে? পারলে ওড়নার নীচে সিঁধিয়ে পড়ে।

লোকটি ধপাস্ করে এসে বসলো তো বসলো।এসময়ে লাজুক বরের সামনে আয়না ধরে রত্নার বান্ধবীরা জিজ্ঞাসা করলো,‘কি দেখছেন আয়নায়?’

তৎক্ষণাৎ বরের বাবা তার কানে কানে কিছু বলে দিল আর ছেলেটি তার কথা শুনে সাথে সাথে উত্তর দিল, ‘A sweet face of Ratna.’

বরের ইংরেজীতে উত্তর দেয়াটা স্বাভাবিক। কারণ অনেক বছর যাবৎ সে বিদেশে থাকে।কিন্তু তার উত্তর তার বাবা কেন শিখিয়ে দিচ্ছে? বাবাটাই কি বিয়ে করতে এসেছে,ছেলেকে সামনে রেখে? কি বিশ্রী,বাজে এক অনুভূতি হচ্ছে রত্নার,এই রুসমতে্র আসরে। 

২

কনে সম্প্রদানের পরে শুরু হলো রত্নার শ্বশুর বাড়ি যাত্রা।রত্না আধুনিক কালের পালকিতে চেপে বসলো।মানে গাড়িতে উঠলো।বসলো জানালার পাশে। মাঝে তার বর আর তার পাশে বরের মা।সামনের ড্রাইভারের  পাশের সিটে সেই শ্বশুর মহাশয়।রত্নার তিনগুণ বয়স তার। ৭২ বছরের এই লোকটির মধ্যবয়সে তার একমাত্র পুত্রের জন্ম।পুত্র  তার ৩০ বছরের, এক অতি সাধাসিধে একটি ছেলে।বাবাটার মত সেয়ানা না। তার ৭২ বছরের বাবার হাব ভাব দেখলে মনে হবে ২৫ বছরের জোওয়ানী চলছে।রত্নাদের তেমন একটা পছন্দ ছিল না এই ছেলেকে। কিন্তু ঘটকের অসম্ভব জোরাজুরিতে রত্নার বিয়েটা এখানেই ঠিক হয়ে গেল। ঘটকী সোসাইটি গার্ল। অনেক মানুষের সাথে তার চেনা জানা।বরের সেয়ানা বাবার কাছ থেকে  সেয়ানা ঘটকী অগ্রিম নিয়েছে প্রচুর। বিয়ে না হলে সব টাকা ফেরৎ দিতে হবে তো।সেই ভয়ে,ঘটকী বেশ জোর দিয়েই রিত্নাদের বলল,‘৪২ বছরের চেনাজানা এই পরিবার। নিতান্তই সহজ সরল।বিয়ে দাও এদের সাথে।’ 

পরে রত্না জেনেছিল ঘটকের সরাসরি কোন চেনা জানা নেই এই পরিবারের সাথে।যে মহিলাকে সে চেনে, তার চেনার চেনা ছেলেদের এই পরিবার।তবে সংখ্যাটা ঠিক আছে। ৪২ বছর।চেনার চেনা মহিলাটি সম্পর্কে ছেলের বাবার ধর্ম বোন। 

সেরেছে এবার।

যেহেতু অনিচ্ছায়,অপছন্দে অপরিচিত লোকদের সাথে এই বিয়ে,তাই সবকিছু এখন রত্নার আবিষ্কারের পালা। 

রত্নার পালকি অতঃপর শ্বশুর বাড়িতে পদার্পণ করলো।তাদের বাড়ি হতে গাড়িতে দশ মিনিটও না। আলোক সজ্জায় ঝলমল করছে পুরো বাড়ি। গাড়ি থেকে নেমে প্রথম পদক্ষেপ মাটিতে রাখতেই রত্না অনুভব করলো তার শাড়ির সব কুঁচি কোন এক অলৌকিক শক্তির জোরে কেউ যেন হ্যাঁচকা টানে খুলে ফেলেছে এই পথটুকুতে।গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াতেই সব কুঁচি তার হাতের মুঠোয় এসে পড়লো। কিন্তু কিভাবে এমন সম্ভব? সে তো হেঁটেই গাড়ি পর্যন্ত এসে গাড়িতে উঠে বসেছে।তখন তো কুঁচি ঠিকঠাক ছিল।তারপর তো মিনিট দশেক গাড়িতেই বসে থাকা।বসে থাকা অবস্থায় কুঁচি কিভাবে ভাঁজ গলিয়ে বেরিয়ে আসবে? এমনকি কেউ যদি কুঁচি ধরে টান দেয়, তা হলে তো রত্না সে টান বুঝবে।গাড়ির ভেতর সে তো ঠাঁয় বসেই ছিল।কোন অলৌকিক অশরীরী যদি এ কাজ করেও থাকে, তবুও রত্না টের পেল না?

এ যেন আরেকটা অশনি সংকেত।বার বার বাধা আসছে।কেউ যেন বলছে না আগাতে। সামনে অপেক্ষমান মৃত্যুকূপ।কিন্তু আকদ্ তো হয়েছে সেই সেপ্টেম্বরের ২৫ তারিখে। আজ  ৩রা নভেম্বরে কনে উঠানোর দিন।রুসমতে্র দিন।বাড়ির সিঁড়িতে বঁধু বরণের জন্য মানুষজন বাড়ির সামনে প্রস্তুত। অথচ বঁধু এক পাও ফেলতে পারছে না খোলা কুঁচির ভারে।বাড়ির মহিলারা জানতেও চাইলো না তার কি অসুবিধা,সে কেন শাড়ি হাতড়াচ্ছে? অত ভারী শাড়ির পাঁচখানা কুঁচি যেন পাঁচ মণ ওজন।বাড়ির মহিলাদের মাঝে ছিল ছেলের মা,মামী,দুই বোন আর আধ্ পাগলা খালাতো বোন। মহিলারা কি উজবুক নাকি? কেউ তো এগিয়ে আসছে না জানতে, ‘রত্না তোমার কি অসুবিধা?’  

অবশেষে অনেক কসরৎ করে সে তার শাড়ি ঠিক করলো।কোন রকমে কুঁচি গুঁজে পেটের কাছে তা আগলে আগলে এগুলো।বরের সে সময়ে কোন হুঁশ কাজ করছিল বলে রত্নার মনে হলো না।বৌয়ের কি হয়েছে জানতে তার কোন আগ্রহ দেখা গেল না। 


রত্না সামনে এগুলো। বঁধু বরণশেষে বাসর ঘরে প্রবেশের পর অবাক হবার পালা যেন আবারো অপেক্ষা করছিল ওর জন্য।বাসর ঘর সাজানোর নামে ছাদের দেয়ালে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত পেরেক ঠুকে দড়ি দিয়ে জাল বানানো হয়েছে।দড়িতে পেঁচানো হয়েছে রজনীগন্ধা ফুলের মালা।রত্নার শ্বশুর ব্যাটা নিজের হাতে তাদের বাসর সাজিয়েছেন। তাগড়া শ্বশুর সব কাজ পারেন।রজনীগন্ধা বোধহয় তারই পছন্দ।তাই রজনীগন্ধার দড়িতে সারা ছাদ ঢাকা। দারুণ আইডিয়া বটে! তার এই কান্ড দেখে বহুদিন পর্যন্ত রত্না রজনীগন্ধা দেখলে আঁতকে উঠতো।

বরের তুতো বোন আর বাড়িতে থাকা মেজ বোন রত্নাকে বাসর ঘরে এনে বসালো।বিছানার নরম গদিতে বসতে গিয়ে রত্নার নিজের হাতের চাপে তাকে দেয়া দ্বিগুণ বড় সাইজের কাঁচের চুড়িগুলো সব চুর চুর করে ভেঙে গেল।বোন দুটোও বেশ অবাক হলো।ভাঙ্গা চুড়ি হাতে তুলে বললো,‘এ কি? চুড়ির টুকরা? কোথা থেকে এলো? ওহ্ চাপ লেগে ভেঙ্গে গেছে বোধহয়!’

রত্না কোথায় যেন শুনেছিল,চুড়ি ভাঙ্গা অশুভ লক্ষণ।বিয়ে ভাঙ্গার সমান। বিবাহের সমাপ্তি ঘটা অর্থাৎ যে বিবাহে সম্পর্ক টিকে না অথবা বিবাহিত রমণীর জীবন থেকে স্বামীর প্রস্থান ঘটে থাকে। 

আর আজ ? 

বাসর রাতেই হাতের চুড়ি ভেঙে যাবে? 

শ্বশুর পরে খুব গর্ব করে বলেছিল,‘তোমার বিয়ের সব বাজার আমার করা।শুধু চুড়িগুলো ওদের দিয়েছি কিনতে। কিন্তু কাপড় চোপড় আমার পছন্দে কেনা। ব্রা –ও আমি কিনেছি।ওদেরকে দিলে কি সব জাবরা জুবরা কিনে আনবে।মেজ মেয়েকে বলেছি চুড়ি কিনতে।’ শ্বশুরের, তার জন্য ব্রা –কিনার কিচ্ছা শুনে রত্না অবাক হলো।আবার তার হাসিও পেল এই ভেবে চুড়িগুলো আসলেই সাইজের চেয়ে দ্বিগুণ বড় ছিল। তাই হাতের চাপে সে রাতে ভেঙে গিয়েছিল।ওরা ঠিকমতো কিনতে পারেনি। ঐ একটা আইটেম–ই এই সেয়ানা লোকটার তত্ত্বাবধানে কেনা হয়নি তাহলে।

বাসর ঘরে রত্নাকে রেখে ঘর থেকে তার বোনেরা প্রস্থান গ্রহণের সময় সারসের মত গলা উঁচু করে তুতো বোনটি বললো,দেখ,she is naturally so beautiful. She does not need any make up!  

তুতো বোন ইংরেজী বলে দেখি!সেও নাকি বিদেশ থেকে পড়াশুনা করা।এ বাড়ির সবার ইংরেজী চালচলনে বুঝাই যাচ্ছে মহা হাই-ফাই এই পরিবারটি!রত্না যেহেতু বাংলা মিডিয়াম,একটু উঁচু চোখে দেখবে এদেরকে।ঘর থেকে বেরোবার সময় তুতো বোনটি তার বানরমুখো মুখটা রত্নার ঘোমটা ঢাকা মুখের কাছে এনে তার হাতে ছোট্ট একটা পারফিউমের শিশি গুঁজে দিয়ে বললো,‘আমার ভাইটিকে তোমার হাতে দিলাম।’

ওরে বাবা। 

তুতো আবার ভাই হয়ে গেছে এখন। 

এ বাড়িতে রত্না আসবার আগে সেই কি তার ভাইয়ের দেখভাল করতো? 

করতেই পারে।কে জানে? 

অনেকক্ষণ পেরিয়ে গেছে।কিন্তু বরখানাকে তো কোথাও দেখা যাচ্ছে না। ছেলেটি গেল কোথায়? রত্না চারিদিকে তাকালো।নাহ্ কোত্থাও নেই ছেলেটি।এই খালি দোতলায় এখন সে একা। হঠাৎ আবিষ্কার করলো,বাসর ঘরের দরজার বাইরে শ্বশুর দাঁড়ানো।ঠাঁয় তাকিয়ে আছে রত্নার দিকে। দেখছে তাকে।যেন বহু সাধ করে আনা বউখানা তার ছেলের জন্য নয়,তার পছন্দের এই বউ তারই জন্য।

এই দোতলাটা তাদের দেয়া হয়েছে।একটা ঘর শুধু তাদের জন্য সাজানো হয়েছে।পাশের ঘরগুলো খাঁ খাঁ করছে।একদম খালি বাসা।তুতো বোনটি এই বাড়ির উপর তলায় এ বাড়ির মেঝ মেয়ের সাথে আজ রাতে থাকবে।মেঝ মেয়ের জামাই এ বাড়িতে ঘর জামাই।এ বাড়িতেই থাকে।তুতো বোনটি স্বামী পরিত্যক্তা।সে খালিই তো ছিল ছেলেটির জন্য।কিন্তু তাও তাদের মিলন হলো না কেন? পরিবারে বিবাহ যোগ্যা কন্যা অনেক। বিয়ের কথা কেউ পেড়েছিল। কিন্তু তুতোরা বিয়ে করলে ছেলেমেয়ে কানা খোড়া হবে,তাই তুতোদের সাথে বিয়ে শাদী দেবে না – একথা বলে দিয়েছিল ছেলেটির ধুরন্ধর বাবা।এভাবেই পরিবারের মধ্যে বিয়ে এড়িয়ে গেছে।পাছে ছেলের লাল্টুপনা ধরা পড়ে পরিবারের কাছে –সেই ভয়ও তো আছে।সাধের তুতো বোনটি তার ভাইটিকে আজ  অন্য মেয়ের সাথে বাসর করতে দেখে সারা রাত কন কন করে কাটাবে,একাকী। আর ভাইটি মজা করে বাসর করবে আরেক মেয়ের সাথে।নিজের মানুষকে অন্যের হতে দেখা –এর মতো বড় কোরবানী আর কি হতে পারে? 

তাই কত আহ্লাদের আব্দার তার,‘আমার ভাইটিকে তোমার হাতে দিলাম।’ 

অথচ রত্নার জন্য কি বিশ্রী অনুভূতি। 

সারারাত মেয়েটি বুঝি ছট্ফট্ করেছে।রত্নার মনে প্রশ্ন এলো,এই তুতো বোনের সাথে তার বরের কি কাহিনী আছে? কে জানে কি আছে? তাহলে কি চালানো যাবে এই জীবন?

যাহ্! বাসর রাতে এ কি সব চিন্তা?

অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর বরের আগমন ঘটলো ঘরে। তার পরনের চুরিদারের মাঝে তার ঠ্যাং দুটো যেন বেশ বাঁকা ভাবে দৃশ্যমান।হবেই বা না কেন। চুরিদার যে। মনে পড়ে গেল রত্নার, সে খেয়াল করেছে এখনকার চল্ থেকে বেশ ঢোলা ট্রাউজার পরে ছেলেটি।।হয়তো বা এতে বাঁকা ঠ্যং ঢেকে রাখা যায় সহজে।তারপর আরো কত কি যে চোখে পড়েছে দিনে দিনে।

পাগল পাগল এই ছেলেকে নিয়ে রত্নার শ্বশুর বাড়ির জীবন রত্নার জন্য এক পর্যায়ে অতিষ্ঠ হয়ে গিয়েছে তখন।সেই উল্টো শাড়ি –ই কি বলে দিয়েছিল তাহলে,যে রত্নার সবকিছু উল্টো হবে? কিন্তু ততদিনে তো বহু দেরী হয়ে গেছে।এখন জীবনের এই পর্যায়ে এসে রত্না ভাবে বারবার,কেমন জানি হয়ে গেল সবকিছু।

৩

রত্নার শাশুড়ি শারীরিক ভাবে প্রতিবন্ধী। মানসিকও কিছুটা। শাশুড়ির জন্ম দেয়া এই ছেলেটি মানসিক ভাবে প্রতিবন্ধী।রত্নার স্বামী সে।জন্ম থেকে তার পা দুটো উল্টো ছিল। 

জ্বীন নয় তো? 

নিজের জামা কাপড় নোংরা করে ফেলতো নিজের অজান্তে।দশটা প্রশ্ন করলে একটা উত্তর দিত খুব নরম স্বরে।

বিনয়ী নাকি লাজুক? 

নাকি সেও প্রতিবন্ধী?

এই বংশে তার মা ছাড়া তার নানীও এমন ছিল।তাহলে কি বংশগত ভাবে প্রতিবন্ধী? ষাঁড়ের মতন চিৎকার করে সারা পাড়া কাঁপিয়ে ছেলের মা যখন চেঁচামেচি করতো আর ধপ্,ধপ্ করে পা ফেলে মাটি কাঁপিয়ে কাঁপিয়ে হাঁটতো,রত্না তখন ভয়ে কাঠ হয়ে যেত। তারপর মাস ছয়েক যেতে না যেতেই শ্বশুরের বিষ খাওয়ানোর ষড়যন্ত্রে অসুস্থ হয়ে রত্না যখন কোনরকমে প্রাণটা নিয়ে ঐ বাড়ি থেকে কেটে পড়তে পেরেছিল,তখন হাতির মতন শাশুড়ির সে কি মায়া কান্না। সকলের সাথে বিলাপ করে রত্নার জন্য মায়াকান্না দেখিয়ে একাকার।


৪

কনে আসার পর শ্বশুরের প্রথম শর্ত ছিল মেয়ে তার বাপের বাড়ি যেতে পারবে না। তারপরের শর্ত মেয়ে তার বাপের সাথে যোগাযোগ রাখতে পারবে না। 

দ্বিতীয় শর্ত ছেলের বাবার নয়।তাদের আত্মীয়রা দিয়েছে।তাদের আত্মীয়রা রত্নার বাপের সাথে যোগাযোগ –এসব পছন্দ করে না।

বাহ! 

একদিন মিস্ত্রী এসেছে কাজ করতে।রত্না ডেকেছে।মিস্ত্রীকে ভাগিয়ে দিয়ে শ্বশুর মহাশয় তার রাড়ির কোনার সেই নির্জন কক্ষে রত্নাকে ডেকে নিয়ে তাকে বুঝানোর প্রকল্প শুরু করল। বললো,‘তোমাদের বাড়ি থেকে ডেকে আনা কোন লোক এখানে আসবে না।আমার লোক আসবে।আর তুমি এই বাড়িকে নিজের বাড়ি বলে ভাবতে শেখ।একটু পরপর তোমার বাপের সাথে কথা বলবে না।তার পাঠানো লোক এখানে আসবে না।’ রত্নার মনে আছে, লোকটা মুখের সামনে একটা বই ধরে যখন এই ভাষণ দিচ্ছিল,তখন তার মনোভাব,কথা বলার ভঙ্গিমা যেন সাঁড়াশির মতন পাক খেয়ে খেয়ে তার মুখ থেকে বেরুচ্ছিল।অত অল্প বয়সে সেদিন রত্নার এ ধরণের ঔদ্ধত্য ভরা কথা শুনে খুব খারাপ লেগেছিল।নিজেকে সামলাতে না পেরে কান্নার তোড়ে ছিটকে ফেলেছিল বিছানায়। অনেকক্ষণ কেঁদেছিল শ্বশুর লোকটার রূঢ় আচরণে। 

সে কি তেজ তার। 

কি ভাষণ। 

কি স্পর্ধা। 

কি ঔদ্ধত্য।

তার পরপরই শ্বশুরের কড়া আইন আবারো মনে করিয়ে দেয়া হলো।আইন জারি হলো,বাপের বাড়ি যাওয়া একদম বন্ধ।

কেন?

কারণ হিসাবে আবারো ছেলেকে দিয়ে বলে পাঠানো হলো তাদের আত্মীয়রা পছন্দ এসব করে না। অথচ তাদের আত্মীয়দের তো বৌভাতের দিন বৌকে সাহায্য করা বা গুছিয়ে দেবার জন্য বাড়ির চৌহদ্দিতে দেখা যায়নি।এখন তারা বউ আর তার বাপের বাড়ি নিয়ে এতো কনসার্ন্ড? এতো উদ্বিগ্ন?

কেন? তারা যার যার বাড়িতে বসে আদেশ দিচ্ছে,রত্নাকে কিভাবে চলতে হবে।তারা নিয়ন্ত্রণ করছে সে তার বাবার সাথে কথা বলতে পারবে কি পারবে না।

গরু নাকি পাঁঠা এই লোকগুলো? 

কেন তাদের মন বড়ই উচাটন? তাদের বৌ বাপের বাড়ি যেয়ে কি না কি ফাঁস করে বসে সেটাই কি কারণ? 

তাদের অলরাউন্ডার ছেলেকে নিয়ে শ্বশুরের এত  ভয় কেন?

প্রতিবন্ধী বলে? 

নিশ্চয়ই সে ঠিক ঠিক জানে তার ছেলে প্রতিবন্ধী, যাকে সে প্রতারণা করে গছিয়েছে।। 

নাহলে সে বার বার তার ছেলেকে কেন জিজ্ঞাসা করে,‘তুমি তোমার বউয়ের সাথে রাতে কি কর? বল আমাকে।আমি কিন্তু তোমার ফ্রেন্ড।আমি ফ্রেন্ড না?’

সরল মনের ছেলেটি এসে তার বাবার সাথে বলা সকল কথা রত্নাকে জানাতো।বলতো,‘আমার বাবা আমার বন্ধু।যেমন তোমার মা তোমার বন্ধু।জানো,বাবা না জানতে চেয়েছে,আমাদের কবে বাচ্চা হবে?’ 

আরেকদিন এসে ছেলেটি রত্নাকে বললো,‘তোমার কি মাসিক বন্ধ হয়েছে?’

রত্না বললো,‘মাসিক কি?’

সরল সহজ মনে ছেলেটি উত্তর দিতে গিয়ে আমতা আমতা করে আটকে গেল।উশখুশ করে বলে ফেলল,‘কাল বলব।’

তারপর কাল এলো। 

ছেলেটি বলল রত্নাকে,‘‘বাবা আমাকে বলেছে,‘তোমার সব কাজিনদেরকে তাদের স্বামীরা প্রেগনেন্ট বানিয়ে ফেলল,আর তুমি তোমার বউকে বানাতে পারলে না?’’ 

তারপর আবার আব্দারের সুরে রত্নাকে সে জিজ্ঞেস করে,‘আচ্ছা,বল না,আমাদের কবে বাচ্চা হবে?’’ 

রত্নাকে এর আগেই শ্বশুর বলে দিয়েছেন তাদের হানিমুনটা তিনি–ই করিয়ে দেবেন।হানিমুনে কোন এক নির্জন দ্বীপে ঘুরতে যাবে তারা তিনজন।ছেলে থাকবে সাথে কিন্তু সে নিজেও যাবে তাদের সাথে ঘুরতে। বাবা,ছেলে আর বউ।তার যুক্তি,‘ছেলে আমার সহজ সরল।সে তোমাকে দেখেশুনে রাখতে পারবে না।আমিই তোমাদের হানিমুনে নিয়ে যাবো।’ মানে যে করেই হোক সে ও থাকবে ওদের সাথে।

কি সুন্দর যুক্তি। 

তা ছাড়া ছেলে আসলেই তো অত শত বুঝে সুঝে না।ডাকাত আক্রমণ করলে সেটা তো ভয়েরই ব্যাপার।তাই তিনি নিজেই সে –ই কাজটা করে দেবে।এই সুযোগে হানিমুনে যেয়ে একটা বাচ্চা পেটে আনিয়ে দিতে পারলে তো কথাই নেই। মেয়ে মানুষ এসব কথা বলে নাকি? একদম চেপে যাবে। উলটা মেয়ে তখন তার হাতের মুঠোয় হবে।তার কথায় তখন সব হবে।

বিকৃত রুচির শ্বশুর,গবেট প্রকৃতির ছেলে আর উদ্ধত বেকুব শাশুড়ির গগণ বিদারী চিৎকার চেঁচামিচি,ধমক গালি গালাজের তোড় আর রত্নাকে এক নাগাড়ে দোষারোপ করে যাওয়া দেখে,সে একদিন মুখ খুলতে বাধ্য হয়েছিল।

‘তোমার বাপ,তোমার বাপ’ করে শ্বশুর মহাশয় একদিন দুপুরে রত্নার ওপর হামলে পড়েছে যখন, রত্না সেদিন আগাতে দেয়নি তাকে।থামিয়ে দিয়ে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জবাবে বলেছিল,‘বাপ না। বলেন আব্বা।আব্বা।’ 

শ্বশুর মহাশয় থতমত খেয়ে বেসামাল। একটু সময় নিল ধাতস্থ হতে। নিজেকে সামলে নিয়ে বললো, তোমার আব্বা…। 

রত্না থামিয়ে দিয়ে বললো,‘আর একটা কথা হবে না।’


তৎখনাত রত্নার শাশুড়ি তেড়ে মেরে রত্নার দিকে এগিয়ে এসে বললো,‘সারাদিন কি কাজটা কর? নীচের তলায় দরজা বন্ধ করে তো বসে থাক।’ 

রত্নার উত্তর,‘ঘর পরিষ্কারের কাজ কে করে? কাপড় কে ধোয়? কাজ করতে করতে হাড় মাংস খুলে পড়ছে,তারপর কত বড় সাহস এভাবে কথা বলার?এতো সাহস হয় কিভাবে এসব বলার?’ 

- আস্তে কথা বল।

- আস্তে আবার কি? সুরেলা গলায়। গান গাইবো এখন?

তাড়া দিয়ে রত্নাকে নিচে নামিয়ে এনেছে দুজন। নিয়ে যাবে ধরে, রত্নার বাবার কাছে। নালিশ দেবে  তাদের কাছে নিয়ে গিয়ে।এতে রত্না একদম সোজা হয়ে যাবে।  

পিশাচ কাকে বলে তা তো রত্নার অনভিজ্ঞ জীবন কখনো মোকাবেলা করে নাই। দুনিয়াদারী না দেখা,সেই ২৪ বছরের ঐ মেয়েটি তার শ্বশুর বাড়িতে একদম একা হয়েও তার তিনগুন বয়সে বড় সেই ৭২ বছরের শ্বশুরের সামনে সাহস ভরে নিজে যে দাঁড়াতে পেরেছিল এই তো যথেষ্ট।    

কিন্তু শ্বশুর একটা হেস্তনেস্ত করেই ছাড়বে।

নীচে নেমে বাসার সামনে দাঁড়িয়ে আকাশ পাতাল একাকার করে চিৎকার করে করে শ্বশুর বললো, ‘এখনি চলো।চল আমার সাথে। তোমাদের বাসায় চল।’ অতঃপর রত্নাকে ঘাড়ে ধরে নালিশ দেবার জন্য নিয়ে এলো রত্নার বাবার কাছে।রত্নার বাবার সাথে তাদের মেয়ের প্রতি শ্বশুর বাড়ির ঔদ্ধত্য আর ধৃষ্টতা সেদিনই এই সম্পর্কের ইতি টেনে দিয়েছিল। ঐ বাড়ির জন্তুগুলোর ঝগড়ার পর একটা টিউনিং হয় দুজনেরই। শ্বশুর তারপর কিছুদিন চুপচাপ থাকে।শাশুড়িও বেশ ঠান্ডা থাকে। 

সেদিন নালিশ নিয়ে শালিশ করে শ্বশুর ফেরৎ গেলে, রত্না সেই রাতে ফেরৎ এসেছিল তার ভোলাভালা স্বামীটির সাথে। ছেলেকে তার বাবা বুঝিয়েছিল,‘আজ সকালে একটা misunderstanding  হয়ে গেছে।’ ভুল বোঝাবুঝি।

নম্র,ভদ্র,সরল সোজা ছেলে আর কি বলবে তার বাবার কথার ওপর। শুধু বললো,‘ঠিক আছে।ঠিক আছে।আমি আর শুনতে চাই না।’

কিন্তু শ্বশুরের চাল আর কুটবুদ্ধি থেমে থাকে না। হাত তার নিশপিশ করছে। জিহবা হিস্ হিস্ করছে।১৯৭১ –এ এত মানুষ মেরেছে এই লোকটি, আর এই পুঁচকে মেয়েটাকে এমনি এমনি ছেড়ে দেবে? 

কক্ষনো না। বুদ্ধি এঁটে ফেলেছে এবার। কাজের ছেলের সাথে বুদ্ধি এঁটেছে।সেদিন রাতে তৈরী হলো রত্নার জন্য স্পেশাল রান্না।কেউ খেল না।শুধু রত্নার জন্যই সে রান্না।আর তারপরের দিন থেকেই শুরু হলো রত্নার তীব্র অ্যালার্জি।সারা শরীরে ছোট ছোট লালচে দানা উঠেছে।ধীরে ধীরে কিছু দিনের মধ্যেই রত্নার হাতের তালুর চামড়া আলাদা হয়ে পড়ল। এই অবস্থা ছড়িয়ে পড়লো আপাদমস্তক। চুলের গোড়া থেকে পায়ের তালু পর্যন্ত লালচে দানা।এখন তো সে কাপড় কাচতে পারে না। ঘরের কাজ করতে পারে না।হাত দিয়ে খেতে পারে না।চামচও ধরতে পারতে না।অসুস্থ হয়ে ফিরে এলো তার বাবার বাড়ি।‘বাপের বাড়ি।’ 

ফিরে এলো নাকি ভাগ্য যথাস্থানে ফেরৎ পাঠালো ঠিক তার জন্মদিনের দিনে,কে জানে!রত্নার বাবার বন্ধু একজন চিকিৎসক।তিনি হাতের তালু দেখে বললেন,‘মনে হচ্ছে আর্সেনিক পয়েজনিং।কেস– স্টাডি করার মতন।’

শুনে রত্নার বাবা রত্নাকে বললেন,‘আর ঐ বাড়িতে নয়।’ হয়তোবা তিনি টের পেয়েছিলেন যে এবার গেলে তারা রত্নাকে শেষ করে দেবে চিরকালের মত।


৫

সব কিছু আজ  ছবির মতন মনে পড়ছে।আবছা আবছা।সেই এক দশক আগের কথা। 

রত্না এখনো বেঁচে আছে।স্মৃতিগুলো ঝাপসা কিন্তু ছবিগুলো স্পষ্ট।

আজ  রত্না ছবিগুলো দেখে দেখে একটা একটা করে কেটে ফেলছে।কাঁচি দিয়ে কচ কচ করে কাগজ কাটা,নাকি জীবনের একটা অংশকে কেটে ফেলা? 

জীবন চিত্রগুলো এলবাম থেকে সরিয়ে ফেলার এই কাজ যেন জীবনের কিছু সময়কে জীবন থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা।কাজটা কি খুব সহজ? স্মৃতি তো মনের ভেতর থেকে যায়।

সারা সন্ধ্যা জুড়ে কাঁচি চালিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।শত শত ছবি।লক্ষ লক্ষ টুকরো।টুকরোগুলো তুলে পাশের ঝুড়িতে ফেলতে গিয়ে একটা টুকরো ছিটকে ঝুড়ির বাইরে পড়ে গেল।রত্না হাতে তুলে নিল টুকরোটি ফেলে দেবার জন্য।এতো ছোট করে কাগজ কেটেও যেন কিভাবে এ ছবিতে কারোর মুখটা বাদ পড়ে গেছে কাঁচির ফাঁক গলে। খেয়াল করে দেখল মুখটা একদম অক্ষত।শাশুড়ির মুখ।মনে হয় সে যেন রত্নারর হাতে ধরা কাঁচির ঘচাং–এ কাটা পড়তে চায় না। 

রত্নার প্রতি তার উদ্ধত,রূঢ় আচরণ এখন কি শাশুড়ির মনে পড়ে? রত্না জানে না।

তাকে কিঞ্চিৎ নসিহত করবার জন্য একবার তিনি তার বড় মেয়েকে পাঠিয়েছিলেন।কথার ছলে যদি ননাস খানা একটু টাইট দিতে পারে রত্নাকে।কিন্তু টাইট দিতে এসে রত্নার কাছ থেকে একগাদা কথা শুনেই তার মোটা মাথা এক্কেবারে ওলোট পালোট হয়ে গেল।রত্না তার ননাসটিকে তার মায়ের প্রতি তার বাবার বিশ্রী ব্যবহারের উদাহরণ টেনে বলেছিল,‘‘আপনার মা তো একজন ভদ্রলোকের কন্যা।জীবনের এই পর্যায়ে তার ৬৪ বছর বয়সে তাকে আপনার বাবা যে অকথ্য ভাষায় গালমন্দ করে সেটা কি ভাল দেখায়? আপনার প্রবাসী মামাকে শুনিয়ে শুনিয়ে তার সামনে আপনার মা কে যখন বলে,‘গন্ডমূর্খ, অশিক্ষিত,বোকা মেয়েলোক,না বুঝে রবীন্দ্রনাথ,না বুঝে নজরুল।করলা দিয়ে ডাল পাকায়।মাটি কাঁপিয়ে থপ্ থপ্ করে হাঁটে,’– এসব  কথা আপনার নিরুত্তাপ হাবাগোবা মামাটা গিলে হজম করে ফেলে ঠিকই,কিন্তু তার সামনে বলা কি মানায়? আপনার মামা প্রতিবাদ করে না কারণ সে জানে তার বোনের এখানেই থাকতে হবে। তার বোনের যাবার কোন জায়গা নেই। আপনার মায়ের যাবার কোন জায়গা নেই।’’

ননাস সব শুনে ভেবে সারা।টাইট আর দেবে কি? উল্টো নিজের মায়ের অসম্মানের কথা জেনে চুপ হয়ে যায়। তার মায়ের কাছে ফিরে গিয়ে রত্নার সব কথা বয়ান করে।সেদিন রত্নার শাশুড়ি জেনেছিল তার অধিকার নিয়ে তার কোন সন্তানেরা একবারও কথা বলেনি,কিন্তু পরের বাড়ির সেই মেয়েটি বলেছে।এই সংসারে প্রতিনিয়ত তাকে লাঞ্ছিত করা যে একটা অন্যায়,তার সম্মান,তার পিতা মাতার সম্মান যে এই সংসারে নেই সেই কথা এই মেয়েটি বলে ফেলেছে। বারবার ভাবে রত্নার সেই কথাগুলো।গভীর ভাবে তার মনে দাগ কাটে রত্নার কথাগুলো –‘আপনাদের মা তো কোন এক পরিবার থেকে এসেছে।তিনি কোন এক পরিবারের সন্তান।তার বাবা মা আছে।তার সাথে এই বয়সে এ কেমন ব্যবহার?’


মহিলা তার স্বামীর ঘরে তিনটি কন্যা ছাড়াও বহু কষ্টে সৃষ্টে একটি প্রতিবন্ধী পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়েছে।সেসময় লোকের মুখে এ –ও  প্রচলিত ছিল যে,মহিলার স্বামী,যখন পুত্রসন্তান লাভের আশায় তার স্ত্রীর ওপর চড়ে বসেছিল,সেই রাতে মট্মট্ করে তার স্ত্রীর ঠ্যাং দুটো ভেঙ্গে গিয়েছিল।সে যাত্রায় নিশানা ব্যর্থ হওয়াতে যে মৃত সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়েছিল তা পুত্র না কন্যা তা তারা বুঝতে পারেনি।রত্নার প্রতিবন্ধী স্বামী প্রবরেরই কথা। খুব আফসোস করে ছেলেটি একদিন রত্নাকে এও বলছিল যে,সে জানে না তার আরেকটি ভাই ছিল নাকি আরো একটি বোন ছিল।কিন্তু তার একটা ভাই বা বোন ভূমিষ্ঠ তো হয়েছিল।বাঁচেনি কিন্তু সেই অজানা সহোদরের জন্য আফসোস সব সময় কাজ করতো ছেলেটির। 

রত্নার শ্বশুর মহাশয় পুত্র সন্তানের জন্য চেষ্টা করেও সফল হচ্ছিল না কেন? তাদের চার সন্তানের আগেও কোন পুত্র সন্তান বাঁচে নি। স্ত্রীর হাড়গোড় মটমটিয়ে ভেঙে একের পর এক চেষ্টা চালিয়ে গেছে লোকটি।কিন্তু পুত্র সন্তান এলেই সন্তান বাঁচে না।অনেক বয়সে তারা থিতু হয়েছে তাদের এই প্রতিবন্ধী পুত্রটিকে পেয়ে।জন্মের সময় উল্টো পা নিয়ে জন্মেছিল এই পুত্রটি।প্রতিবন্ধী হলেও এই দফায় সন্তানটি বেঁচে গেছে।মানসিক ও শারীরিক প্রতিবন্ধী সন্তানটি মৃগী রোগের স্বীকার।রাতে ভুত দেখে চিৎকার করে রত্নাকে গলা টিপে মারতে উদ্যত হয় কোন এক মানসিক অসুস্থতার কারনে। স্নায়ুগত ত্রুটি তো আছেই। 

তা তে কি? জীবিত পুত্র সন্তান লাভ করেছে তারা।এই তো যথেষ্ট। একে ঘিরে বাবা মায়ের হাজারো বানানো কথার ফুলঝুরি।রত্নাদের কাছে ভয়ংকর মিথ্যার আড়ালে ছেলেকে নিঁখুত ভাবে উপস্থাপন করাটাই তো স্বাভাবিক।এই বিয়ের মাধ্যমে একটা সেবিকা পেয়েছে তারা, যার নাম রত্না।পিশাচরূপী এই মানুষগুলো রত্নাকে এবার চিবিয়ে খাবার প্রত্যাশী। এই অভ্যাস রপ্ত করেছিল স্বাধীনতার সময় থেকে। ছেলেটির বাবা তখন হাজারো মানুষ মেরে তাদের রক্তে হোলি উৎসব খেলতো। সুযোগ বুঝে জীবিতদের চিবিয়ে খেত।মানুষ মারার নেশা তো তার আর যায়নি।রয়ে গেছে ভেতরে ভেতরে।মানুষ দেখলেই একটা বিভৎস ইচ্ছা জাগে।ভেতর থেকে একটা টান ওঠে। 

লোকটির স্ত্রী তার দাম্পত্য সময় অতিবাহিত করাকালীন সন্তান উৎপাদনের এজেন্ডায় ছয়বারের মাঝে চারবার সফল হয়েছে। জিনগত ত্রুটি কমবেশী সব জীবিত সন্তানদের মাঝেই আছে।তাদের পরবর্তী প্রজন্মেও তা প্রবাহিত হয়েছে। 

তা তে কি। জন্ম দিয়ে যাবে।খুঁত ঢাকতে মিথ্যে তো আরোও তো বানানো যাবে। 

ছেলে পাগল হয়ে জন্মেছে তো কি হয়েছে? এটা কোন অসুখ নাকি? বেছে বেছে রত্নার মত এমন কত মেয়ে আনবে,যে তাদের প্রতিবন্ধী পুত্রের দেখভাল করবে। সব দায়িত্ব নিতে পারবে।বিয়ের পরের সপ্তাহে তাই রত্নার শ্বশুর হাসি মুখে বলেছিল,‘এবার তোমাকে বাচ্চা পালতে হবে।’ 

বহু বাছাইয়ের পর রত্নাকে পছন্দ করতে এক মিনিটও সময় লাগেনি তাদের।বাসর ঘরের সামনে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থেকে শ্বশুর মশাইরত্নার দিকে চেয়ে ভেবেছিল,বৌ ছেলের জন্য আনলেও, সেও চেখে দেখবে সুযোগ বুঝে গিলে খাবে।তারপর সুবিধা মতন ধরে একদিন পেট বানিয়ে দিতে পারলে একেবারেই মুখ খুলতে পারবে না। বংশের ঔরস সেই-ই এনে দেবে এ যাত্রায়।ছেলেকে দিয়ে তো কিছুই হবে না। 

আফসোস।

৭২ বছরে তার জাওয়ানি তো একটুও কমে নি।সে নিজেই সব কাজ সেরে দেবে।

৬

এখন রত্নার স্মৃতির আস্তরণে অনেক ধূলো জমেছে।কিন্তু টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলা কাগজগুলোর মাঝে যখন রত্না দেখল,তার শাশুড়ির অক্ষত মুখটা,সে ভাবলো এই মহিলা যখন টুকরো কাগজের মাঝে নিজেকে অক্ষত রাখতে পেরেছে,সে বোধহয় জানাতে চাইছে, সে নিজেও তার স্বামীর এক বিকৃত শিকার।রত্নার সাথে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করেও তার ফোকলা জীবন নিয়ে সে রত্নার কাছে ধরা পড়ে গেছে।নগ্ন ভাবে উন্মোচিত হয়েছে।দোর্দন্ড প্রতাপে,ক্রোধে ফেটে পড়তে গিয়ে নিজের অসহায়ত্বে লজ্জিত বোধ করেছে। রত্নাকে নিয়ে এই মহিলা যতই বানোয়াট অভিযোগ তুলুক না কেন,সে নিজে জানে রত্নার কাছে তার মুখ দেখাবার কোন পথ খোলা নেই।তাই টুকরো করা, কাটা ছবিগুলোর ফাঁক দিয়ে তার মুখটা দেখাবার আপ্রাণ চেষ্টা।জানাবার চেষ্টা –ফোকলা জীবনই তার সম্বল।     

…

০৮/০৭/২০২৬

Thursday, July 2, 2026

ড্যাম কেয়ার

পূর্বকথাঃ 
মর্ত্যলোকের অতলে আছে পাতাল পুরী। তারও অনেকে গভীরে সর্পলোক। সেখানে নাগ নাগিনীদের বাস। সেই নাগলোক থেকে কোন এক অমাবস্যা রাতে সিদ্ধান্ত হয় কুটচালে পারদর্শী নাগলতাকে মর্ত্যে পাঠানো হবে মনুষ্যরূপে। মানুষ অধ্যুষিত বরাহ অঞ্চলের একটি ব্যবসায়ী পরিবারে সে জন্ম লাভ করবে।কলেজে ওঠার বয়স হলে পরবর্তীতে তপনলাল নামে একটি শাখামৃগকে কব্জায় আনবে। তার মাথায় কাঁঠাল ভেঙ্গে তাকে জেল হাজতেও পাঠাবে।নাগলতার কোষ্ঠিতে আরো লেখা আছে যে, স্বভাবে সে হবে দুর্ধষ ও দানবীয়। কলেজের সকলের কাছে তার স্বভাব ও চালচলন হবে স্মরণকালের মধ্যে ভয়ংকর এবং উচ্ছৃংখল।তার গুরুকুলের সংস্পর্শে এলে পাতাল লোক থেকে একটা বিশেষ সুইচ অন্ হয়ে যাবে।তার নাগলোকের DNA কাজ শুরু করবে। চিনে নেবে তার গুরুকুল শিরোমণিকে। DNA অ্যাক্টিভেশানের সময়ে তার চোখগুলো থেকে লালচে আলো বিচ্ছুরিত হবে। চোখ দুটো গোল গোল করে ঘুরতে থাকবে।পাছে সবার কাছে ধরা পড়ে যায়, তাই সেই লাল আলোর বিচ্ছুরণ ভ্যাম্পায়ারদের মত ভয়ংকর হবে না,তবে অনেকটা ওই ভ্যাম্পায়ার ধাঁচেরই হবে।এতগুণে গুণান্বিতা এই নাগকন্য,শুধু একজনের সাথে পেরে উঠবে না –আর  সে হলো মর্ত্যলোকের মনুষ্য কন্যা –প্রিয়দর্শিনীর সাথে। 
১ 
বরাহ অঞ্চলের মনুষ্যকুল বরাহ্‌ প্রকৃতির বলেই, তারা যেখানেই বসতি স্থাপন করুক না কেন,দেখা মাত্রই সবাই তাদের দুরদুর করে।সবার কাছ থেকে তাড়া খেয়ে তাই নিজেদেরকে এখন মিশিয়ে নিয়েছে কলেজ পাড়ার অলিতে গলিতে। কখনোই বলে না যে, তারা আদি বরাহ্‌বাসী। দু’তিন পুরুষ আগের সমসাময়িক প্রৌঢ়রা এখন জীবিত নেই বিধায় নাগলতার পরিবারকে কেউ সনাক্ত করতে পারেনি। কিন্তু তারপরও কেন জানি তাদের গোত্রের লোকদের সাথে  কেউ আত্মীয়তা করতে চায় না । আত্মীয়তার কথা শুরু হলে অজান্তে সকলের মনে কেমন যেন খুঁতখুঁত করে ওঠে। তাই কয়েক দশক আগ থেকেই  বরাহ্‌ গোত্রের সকলে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। মানে আরো বৃহত্তর জাতি গোষ্ঠীর সাথে  নিজেদের মিলিয়ে  মিশিয়ে একাকার হয়ে যাওয়াই এদের  উদ্দেশ্য। তারা তাই-ই করছে। কিন্তু DNA কি ছাড় দেয়? সে তো সময় মানে না। কাল মানে না। ফুড়ুৎ করে বেরিয়ে আসে।
এদিকে স্কুল শেষ করে কলেজে উঠেছে কালনাগিন। তার প্রজেক্টের অংশ হিসাবে এবার শাখামৃগ তপন লাল-কে কব্জা করবে।সহপাঠী এই ছেলেটি তার বছর দেড়েকের ছোট।বেশ সম্মানিত পরিবারের ছেলে।একে ধরতে পারলে সমাজে নাগলতার একটা সম্মানজনক শ্বশুর বাড়ি জুটবে। মনুষ্য জাতির সহচর্যে তার সাপের মত কিলবিলে ভাবখানার একটু ব্যালেন্স হবে। তার উচ্ছৃঙ্খলপণায় সারা কলেজ অতিষ্ঠ আর তা সে নিজে খুব ভাল জানে।
কিন্তু কি করবে? ভদ্র হতে ভাল লাগে না যে। ভেতর থেকেই যেন একটা কিলবিলে ভাব বেরিয়ে আসতে চায়।তবে ক্লাসের ফার্স্ট গার্লটার মত অত  প্রকট না। ওই মেয়ে তো বিশল বড় বড় দুটো আঁচিল নিয়ে ফোঁসফোঁস করে সারা ক্যাম্পাস জুড়ে দৌড়ে বেড়ায় আর সকলকে তার মুঠিতে রাখে।নাগলতার এসবের বালাই নেই। সে ফার্স্ট গার্লকে থোরাই কেয়ার করে।সে তপনকে নিয়ে ব্যস্ত। 
এ ছাড়াও ক্লাশে আরেকটা গ্রুপ আছে,বোকাসোকা মেয়েদের গ্রুপ। এই দলের মেয়েগুলো হাবাগোবা হলেও কেন জানি তাদেরকে কব্জায় আনতে পারছে না নাগলতা। বিশেষ করে ওই মেয়েটিকে, যার নাম প্রিয়দর্শিনী।  
নাগলতার উগ্রপণাটা তপন লালকে বেশ আকর্ষণ করে।বন্য বন্য, পোষ না মানা এক  আদিম মাদকতা আছে মেয়েটির মাঝে। সদ্য ১৮ হওয়া তপন লাল এই মাদকতার গভীরে হারিয়ে যায়। বুঁদ হয়ে থাকে। প্রথম যেন এক উন্মাদিনীর সহচর্য তাকে শুধু পাগল করে তোলে। তপনের বাবা পেশায় একজন শিক্ষক। পাশের আরেকটি কলেজের স্বনামধন্য অধ্যক্ষ। কিপটা বলে ওনার অতিরিক্ত একটা সুনাম আছে। ইদানিং শেষ বয়সের জমানো টাকা দিয়ে দামী একটা গাড়িও কিনেছে।অভিজাত এলাকায় বাড়িও করেছে।গ্রামে ভাই ব্যারাদরের জমি দখল করে জোতদার খ্যাতিও লাভ করেছে।তারই একমাত্র পুত্র তপন,তার বংশের বাতি। পড়েছে এক কালনাগিনীর পাল্লায়। পড়বে না কেন? এখনো তো তার ছেলে বড় হলো না। একদম সেই স্কুল পড়ুয়া সরলতাই রয়ে গেছে।ওর ভোলাভালা চেহারাটার পাশে বেশী বয়স্কা নাগলতার, চালাক ভাবটাই প্রকট হয়।
গত সপ্তাহে জংগলে নিয়ে নাগলতা তার ছেলেকে কুন্ডলী পাকিয়ে জোর করে চেপে ধরেছিল। তপন লালের তো দম বন্ধ হবার দশা। নাগলতা আশ্বস্ত করে বলেছিল, ‘কিছুই হবে না।’ গালে যে দু’একটা দাগ পড়েছে অতটুকুই। এই  প্রথম তাদের প্রেমের নিদর্শন সবাই দেখবে কলেজে।
এ আর  এমন কি? কলেজে তারা ছাড়া আর কোন ছেলে মেয়ের এমন দাগ আছে? তাই দাগ দেখাতে নাগলতা বিশেষ করে সেদিন সামনের বেঞ্চে বসেছে। স্যার যেন ক্লাসে ঢুকেই তার মুখের দাগগুলো দেখতে পায়।ছাত্র ও শিক্ষক মহলে তারপর গসিপ্ শুরু হবে।ধীরে ধীরে তার পেট উঁচু হলে তপনকে চাপ দেবে বিয়ের জন্য। ইতিমধ্যে তার বাবা এসে তপনকে শাসিয়ে গেছে এই বলে যে,‘আমার মেয়েকে যদি বিয়ে না কর, তাহলে তোমার একদিন কি আমার একদিন।’ 
তপন জানালো এ কথা তার বাবাকে।শুনে বাবা ছেলেকে নিয়ে হতাশ!মাত্র না এখন সেকেন্ড ইয়ার? এখন এসব কথা কেন? নাগলতার পেট আরেকটু বড় হলে ক্লাশের গ্রুপ ছবিতে সামনে বসে নিজেকে সেদিন সে মেলে ধরলো।ধরবেই বা না কেন? কলেজে আর কি কোন মেয়ের এমন বিশাল পেট আছে? তপনের সন্তান।অর্ধেক মানুষ,অর্ধেক সাপ।লক্ষী সোনাটি ছোটবেলা থেকেই তার মায়ের মত অলরাউন্ডার,কনফিডেন্ট। টবের ফুল ছিঁড়তে গেলে মা বলেছে, ‘ফুল ছিঁড়তে হয় না,ওটা টবেই থাকে।গাছেই তার সৌন্দর্য্য।’ আসলে সৌন্দর্য্যবোধ খুব ভাল ছিল নাগলতার। যেন তেন ভাবে নয়,একদম ন্যাচারাল মেইক-আপের ছোঁয়ায় নিজেকে ফুটিয়ে তুলতো অসাধারণ ভাবে।যেদিন ছোঁয়া লাগাতো না সেদিন প্রিয়দর্শিনীর কাছে একটু খটকা লাগতো।মনে হতো মিল –ফ্যক্টরি থেকে কাজ করে এসেছে এই শ্রমিক মেয়েটি। মেইক-আপের জোরেই সে  বছরে ৩৬৫ দিনের মধ্যে ৩৬৪ দিন –একজন  মডেল। নিখুঁত তার কারুকার্য।যেদিন মেইক-আপের ছোঁয়া লাগে না সেদিনই শুধু অমন দেখায়। ক্লাশেও তাকে পড়াশোনায় বেশী সময় দিতে হতো না। কিন্তু বিজ্ঞান স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়তে গিয়ে, নতুন করে প্রিয়দর্শিনীর খবর পেয়ে যায় একদিন। কলেজের আদর্শ ছাত্রী প্রিয়দর্শিনী। শুনেই শুরু হয় এবার জোরেশোরে তার খোঁজ।  
কোন মেয়েটি?
নিজের ল্যাবে মেয়েটি না থাকায়, বেশ কসরৎ করে একদিন দেখা পায় তার। বাবা রে বাবা। আদর্শ পরিবারের আদর্শ সন্তান যেন।সামনে দাঁড়ানো যায় না,প্রিয়দর্শিনীর। ক্লাশেও, সহপাঠীদের মাঝে মেয়েটির গ্রুপ আলাদা। অন্য সাপগুলোর সাথে সে মেশে না। পাত্তাও দেয় না।তার সাথে আর দু’ তিনটে আছে। এদের সাথেই তার উঠ্ বস। তাকে দেখে নাগলতার বারবার মনে আসছিল একটি কথা – এমন মেয়ে তো,এই মনুষ্য সমাজে তার আগে চোখে পড়েনি! একদিন না হয় চেষ্টা করবে একটু কাছাকাছি হতে। কিন্তু শাখামৃগের মত প্রেমিক যার আছে, তার কি আর মেয়ে বন্ধুর দরকার হয়? এসব আবোল তাবোল বলতে বলতে তপনের কোলে মাথা রেখে সারাটা বিকেল কাটিয়ে দিল নাগলতা কলেজের বারান্দায়।কোলে মাথা রাখার কপোত কপোতির প্রেম লীলা কলেজের ইতিহাসে ছিল না। ওরাই এই নাটকের শুরু এবং ওরাই শেষ। কলেজের বারান্দায় প্রেম লীলা সম্পাদনের এত স্পর্ধা কি আর কোন জোড়ার হবে? 
ফণাটা হিস্ হিস্ শব্দ করে বেরিয়ে আসতে চায়। খুব কষ্টে চেপে রাখে লতা।পাছে তপনলাল বেঁকে বসে! আর যদি তাকে ভাল না বাসে! গত পরশু নাগলতার বাবা এসে তপনলালকে আল্টিমেটাম দিয়ে গেছে। হয় তার কন্যাকে বিয়ে করতে হবে, না হয় তিনি নিজেই যাবেন তপনের বাবার কাছে, কলেজ জুড়ে তাদের বেহায়াপনার কথা জানাতে। 
এসব শর্তে কি কেউ রাজী হবে এই কুটনিকে বিয়ে করতে? তাই খুব টেনশানে আছে নাগলতা কিছুদিন ধরে। পেটখানা তার বাড়তির দিকে।শেষমেশ তপন কুমার রাজী হয়। নাগলতার খপ্পর বলে কথা।আর তার কিছুদিন পরেই তপন লালের ‘বাবা’ হবার সংবাদ পাওয়া যায়। এতদিনে সে অনেক পাকা হয়েছে। মেয়েদেরকে দেখা মাত্রই বুকের মাপ বলে দিতে পারে। ক্লাসে এসেই গল্প শুরু করে মেয়েদের শরীরে ছিদ্রের সংখ্যা নিয়ে। কান ঘুরে ঘুরে সে কথা মেয়েদের কাছে এসে পৌঁছায়। তার একটা ডায়ালগে ক্যাম্পাস কম্পিত হয়ে ওঠে,’মেয়েদের শরীরে এত ছিদ্র থাকতে তারা নাকে ফুটা করে কেন?’ 
২
এদিকে সর্পলোকের গুরু শিরোমণি, প্রাক্তন অধ্যক্ষ বহুদিন বাইরে থেকে ধান্দাবাজি করে,পয়সাপাতি কামিয়ে আবার কলেজে ফেরৎ এসেছেন।আরব দেশ থেকে গ্র্যান্ট সংগ্রহ করে একটা কলেজ স্থাপন করেছেন। দেশ ও দশের উন্নতি করে এখন বেশ নাম কামিয়েছেন। তার আগমণ উপলক্ষে বহুদিন পর এবার কলেজে,তার লেকচার নেবার ক্ষণ ধার্য্য করা হয়েছে। অধীর অগ্রহে ছাত্র ছাত্রীরা অপেক্ষমান গুরুকুল শিরোমণির লেকচার শোনার জন্য সেই বিশাল বড় লেকচার থিয়েটারে। 
ক্লাশে নাগলতা আর প্রিয়দর্শিনী পাশাপাশি বসেও না, কথাও বলেনা। মাঝে মধ্যে একজন আরেক জনকে দেখেই  খালাস। তারপরও নাগবালা প্রিয়দর্শনীর অনেক খবরই রাখে। এমনকি বাড়ির ভেতর সে কয়বার হাঁচি দেয় সেই খবরও রাখে। ইদানিং নাগলতা খেয়াল করেছে ক্লাসে প্রিয়দর্শনী একটু ইন্টারেক্টিভ বেশি । বিশেষ করে সর্পলোকের গুরু প্রফেসরের ক্লাশে। মেয়েটি কি পড়াশোনা করে করে খুব বেশি জেনে ফেলেছে, ভাবতে ভাবতে শিক্ষক মহাশয়ের লেকচার শুরু হয়ে যায় সেদিন। তিনি এক ঘন্টার জায়গায় দেড় ঘন্টা কাটিয়ে ফেললে, অন্য শিক্ষক ক্লাশ নিতে এসে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকেন। সময় শেষ হয়ে গেলেও তার লেকচার দেয়া আর শেষ হয়না।  তিনি চোখ মুদে এক নাগাড়ে শুধু বলেই চলেন। 
ক্লাশ সময়য় মতো ছাড়ছে না কেন জিজ্ঞাসা করলে বলেন, ‘আমি তন্ময় হয়ে যাই বিষয়বস্তু বর্ণনা দিতে গিয়ে।কি ভাবে ভাববো যে আমার সময় শেষ?’ এভাবে কতবার যে পরের পিরিয়ডের শিক্ষকদের বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে বাইরে দাঁড়া করিয়ে রেখেছেন গুরুকুল শিরোমণি, তার সীমা নাই।এতে তিনি সূক্ষ্ম একটা বিজয়ের  আনন্দ পেতেন যা, বলার মতন না। পরের ক্লাশের পুরো সময়ের বেশী অর্ধেকটাও মাঝে মাঝে খেয়ে ফেলতেন। ভাবখানা এমন যে তিনি বিষয়বস্তুর মাঝে হারিয়ে যেয়ে অতলে ডুবে যাচ্ছেন। কিন্তু আজ সেমিনার কক্ষে তার লেকচার। এখানে গতানুগতিক ক্লাসগুলো হয়না। আজ কারো সময় মেরে দিলেও জায়গা মেরে দিতে পারবেন না। কিন্তু একঘন্টা শেষে ক্লান্ত হয়ে আর দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে তিনি  বেছে নিলেন পিছনের ছাত্রদের আসনটি। এক্কেবারে নাগবালার পাশে।ছাত্রদের বললেন, বোর্ডে লিখতে। কিন্তু ক্লাসে সবার নজর স্যারের দিকে। বসেছেন  নাগ কন্যার পাশে।random সিলেকশান নাকি নাগলোক থেকে দুজনের অ্যান্টেনার মিল হওয়ায় স্থান নির্বাচনে এই বিশেষ আয়োজন –তা কেউ জানে না। 
প্রিয়দর্শিনী তো স্যারকে লতার পাশে দেখা মাত্রই  চমকে উঠলো । নাগ কন্যার চোখ দুটো কেমন যেন ফুটবলের মতন গোল গোল হয়ে ঘুরছে।ডাটা প্রেসেসিং হছে। খুশিতে মনে হয় সে শিহরিত। কারণ আজ তার পাশে বিশ্ববরেণ্য চিন্তাবিদ, সর্পলোকের গুরুকুল –প্রফেসর শিরোমণির উপবেশন। লতা যেন আহ্লাদে আরেক কাঠি  লম্বা হয়ে গেছে। আগে ছিল লাঠি। এখন হয়েছে কঞ্চি। বাঁশের  মতনই তো। ক্যাম্পাসে  যখন সে হেলে দুলে  হাঁটে, বিদঘুটে একটা হাসির ঝিলিক চলতে থাকে তার মনে মনে। চোখেমুখে তা স্পষ্টই ধরা পড়ে। আর এখন কি যে আনন্দ লাগছে লাগছে তার। এ যেন তাদের পাতাললোকের বিশেষ উপহার – গুরুকুল প্রফেসর শিরোমণিকে পাশে পাওয়া। প্রিয়দর্শিনীর দিকে তাকিয়ে মুখে ক্রুর হাসি নিয়ে তার চোখদুটো ঘুরতেই থাকে।
৩
বহুদিন পর অধ্যক্ষ চাইলেন কলেজে কালচারাল অনুষ্ঠান হোক।এতে ছাত্রদের সুপ্ত প্রতিভার উন্মোচন হবে। প্রিয়দর্শিনী উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে পারদর্শী।রিহার্সেলে তার গায়কী দেখে সঙ্গীত বিশারদ শিক্ষকগণ বেজায় খুশী। এ কথা ছড়িয়ে পড়লে নাগলতা দৌড় দিল রিহার্সেল রুমের দিকে। প্রিয়দর্শিনীকে হাত পায়ে ধরে লতার সে কি অনুরোধ । তাকে তার কন্ঠ আবার শুনাতে হবে। শোনাতেই হবে। কারণ সে যে স্বয়ং আবদার করেছে। যেনতেন ব্যাপার তো না এটা । কিছু একটা শুনেই তো সে এসেছে রিহার্সেল রুমে। এবার প্রিয়দর্শিনীর কন্ঠ সে শুনতে চায়। দেখতে চায় কেমনতর তার উপস্থাপন। তারপর সে নিজে বিচার করবে কেমন হয়েছে প্রিয়দর্শিনীর গান। লতা তার দাপুটে উদ্ধত স্বভাবে নিজে এতই অন্ধ যে, ভেবে নিয়েছিল, প্রিয়দর্শিনী যেন বসে আছে তার আদেশ মানার জন্য। বলা মাত্রই সব কাজ ফেলে গলা হাঁকানো শুরু করে দেবে। কিন্তু নাগলতা তাকে দিয়ে তার আদেশ মান্য করাতে পারে নাই।মূল অনুষ্ঠান পর্যন্তই তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল প্রিয়দর্শিনীর কন্ঠ শোনার জন্য। প্রোগ্রামে প্রিয়দর্শিনীর সহশিল্পীরা তাকে ডোবানোর জন্য কতই না বেসুরো টান দেবার চেষ্টা করেছিল সেদিন। কিন্তু সব বাধা অতিক্রম করে প্রিয়দর্শিনীর উপস্থাপনা, গায়কী, কলেজের সকলের মনে দাগ ফেলেছিল গভীর ভাবে। হয়তোবা সেই স্কল শ্রোতারাও সঙ্গীত বোদ্ধা ছিল, তাই তাদের প্রাণখোলা প্রশংসা আর ভবিষ্যত বাণী প্রিয়দর্শিনীকে অবাক করেছিল। অধ্যক্ষ স্বয়ং বলেছিলেন, ‘তুমি যদি আরেকটু সাধনা কর, তাহলে উপমহাদেশের বরেণ্য শিল্পীদের মতন হতে পারবে।’ 
তার কন্ঠের এতো সুনাম ছড়িয়েছিল যে নাগলতা তখন ভেবেই বসলো প্রিয়দর্শিনীর কাছে তার যেতেই হবে। এত দূরে দূরে থেকে তার কেমন যেন খিদিবিদি লাগছে। সারা দুনিয়া ভেজে খেয়ে এসে এখন কিনা কোনখানকার কোন মেয়ে প্রিয়দর্শিনী -সে তার ছোবলের বাইরে থাকবে? 
৪
ক্লাশে অন্য সহপাঠীদের মাঝে ইয়া বড় আঁচিল ওয়ালা আরেকটা যে সাপ আছে, সে পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র পেয়ে ফার্স্ট হয়ে যায়। সবাই যদিও ভাবে শত হলেও মেয়েদের মাঝে ট্যালেন্ট আছে, প্রথম স্ট্যান্ড করা ছাত্রী সে। খুব মেধাবী।ফার্স্ট হবেই না কেন। কিন্তু কেউ জানে না পরীক্ষার ঠিক আগের দিন সন্ধ্যায় কে তাকে প্রশ্নপত্র সাপ্লাই দেয়।প্রমোশন বাগিয়ে নিয়ে হালের প্রফেসর হওয়া এক মহিলা আছে –কাঠি বেগম।এই মহিলাই আঁচিল ওয়ালীকে ক্লাশে প্রথম বানাবার নাটের গুরু। নাগলতা এই দুটোকে তেমন পাত্তা দেয় না।কিন্তু প্রিয়দর্শিনী এটা খেয়াল করে বেশ অবাক হয়।কারণ পাতাল লোকের সবাই  এককাট্টা হয়ে চলাফেরা করে আর ষড়যন্ত্র বাঁধিয়ে বেড়ায়। কিন্তু নাগলতা ঐ আঁচিল ওয়ালার সাথে একেবারেই ঘষাঘষি করে না আর প্রফেসার কাঠি বেগমকেও তৈল মর্দন করে না। বদ দুটো বেশী রকমের কুলাঙ্গার বলেই কি না,কে জানে? নাগলতাই এসব ভাল উপলব্ধি করতে পারবে। তবে প্রিয়দর্শিনী শুনেছে পাতাল লোকেও ব্রাহ্মণ, শূদ্রদের মত শ্রেণি বিভাজন আছে। তুলনা করলে নাগলতার তেজ এই দুটোর থেকে একটু বেশীই ঠেকে। আর মনুষ্য তো কোন ছাই!
কিন্তু গোল বাঁধলো এবার অন্য জায়গায়।একই স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়তে গিয়ে প্রিয়দর্শিনীর বাড়ির ভেতরের সব খবরাখবর এবার তার হাতে এসে গেল।তাদের মতো প্রাইভেট শিক্ষকের টাকা মেরে খাওয়ার অভ্যাস নেই প্রিয়দর্শিনীর। বেয়াদবী তো দুরের কথা। শাখামৃগ আর নাগলতার অভিভাবকদের যেমন একটু টাউটগিরি করার স্বভাব আছে, এদের পরিবারের তা-ও নেই।সময় মতো প্রাইভেটের ফি পরিশোধ করে প্রিয়দর্শিনীর। তার তা না করায় প্রাইভেট থেকে তাদের বের করে দেওয়া হয়েছে। অথচ নাগলতা আর শাখামৃগর অভিভাবকরা সমাজে অতি সম্মানিত, অতি উচ্চপদস্থ।কেউ জানে না তাদের টাউট স্বভাবের কথা।
অন্য দিকে প্রিয়দর্শিনী? 
কোন দুনিয়ার মানুষ রে বাবা। মনুষ্য প্রজাতির কোনো শ্রেণীর মধ্যে পড়ে না এরা। মনুষ্যলোক থেকে অনেক অনেক উর্ধ্বে এদের বাস। 
নাহ্ আর পারা যাচ্ছে না। ধৈর্য্যে কুলাচ্ছে না। প্রিয়দর্শিনীর পাত্তা নাগলতাকে যেমন করেই হোক পেতে হবে। তাই বুদ্ধি এঁটে নাগলতা একদিন ক্লাশ শেষে তার কাছে গেল। কেন জানি খুব শিহরণ লাগছে। পারবে তো পটাতে? 
প্রিয়দর্শিনীর কাছে যেয়ে মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে বললো, ‘আমি একটু বইয়ের দোকানে যাব। একা যেতে চাইছি না।তুমি কি যাবে আমার সাথে?’ 
দানব এই মেয়েটিকে সামনে দেখে প্রিয়দর্শিনীর তো থরহরি কম্প।। এই দস্যু কিনা এসেছে তার কথা বলতে? তার দাপটে না সবাই আতংকগ্রস্ত। আর এখন কি মধুর আব্দার! ‘না’ বলবে কিভাবে? ঘাড়ে তো সবার একটাই মাথা।কিন্তু প্রিয়দর্শিনী বুঝে উঠতে পারছে না যে, নাগলতা তার সান্নিধ্য লাভ করার সময়টুকুতে তাকে স্ক্যান করে ফেলবে। তারপর সব তথ্য পাঠিয়ে দেবে তাদের পাতাল পুরীর ডাটা সেন্টারে! দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণে ইতোমধ্যেই তো খবর পেয়ে গেছে প্রিয়দর্শিনীর মেইক –আপের প্রয়োজন হয় না। এত সাধাসিধে হয়েও মেয়েটি এত নজরকাড়া, এতই সপ্রতিভ ।সবাইকে হার মানায়। মেধা, গুণ, সৌন্দর্য্য, আদব কায়দা সব দিক দিয়েই সে যে কলেজের আদর্শ।তার ব্যক্তিত্ব এবং সৌন্দর্য্যের দিপ্তী বিচ্ছুরিত হয়ে আলোকিত করে রাখে ক্লাশের ভেতরে এবং বাইরে।প্রিয়দর্শিনী এলেই যেন প্রজাপতি পাখা মেলে চারিদিক থেকে ঘিরে ধরে তাকে।বিভাগে প্রাণের সঞ্চার ঘটে। ক্লাশরুম ঘিরে বারান্দার আশপাশের  চত্বর মানুষের মিলন মেলায় পরিণত হয়। ক্ষণিকের মাঝেই সামনের ফুলে ঘেরা বাগানটা ছোটখাটো একটা স্বর্গীয় উদ্যানে রূপান্তরিত হয় । কিন্তু সেই বাগানে যে শখামৃগ আর লতা সুন্দরীর ঠাঁই মেলে না। এসব ভাবতে ভাবতে সেদিন বই পত্র কিনে পাশাপাশি হেঁটে হেঁটে প্রিয়দর্শিনীকে নিয়ে ক্যাম্পাসে ফেরৎ আসলো নাগলতা ।আর তাকে আপনা আপনিই বলে ফেললো তার ভাবনাটুকু।
-জানো প্রিয়দর্শিনী, তুমি কিন্তু খুব স্বাধীনচেতা।
-মানে?
-মানে তুমি কাউকে ধার ধারো না। নিজের মতন থাকো। একদম ড্যাম কেয়ার।
মন্তব্যটা শুনে প্রিয়দর্শিনীর কি যে অবস্থা। ভয়ে সে এমনিই তটস্থ। চাপে পড়ে এই দস্যুর সাথে বের হতে হয়েছে। তারপর কিনা তাকে নিয়ে তার মোহনীয় যাচাই বাছাই। নাহ্, একে বেশী নাড়াচাড়া ঠিক হবে না ।তথাস্তু তথাস্তু বলে, ভালোয় ভালোয় ক্যাম্পাসে ফেরৎ আসতে পারলেই হলো।সামান্য একটা বই কেনার জন্য দোকানে যেতে এই দানব মেয়েটির সঙ্গী লাগে নাকি? কেন তাকে সঙ্গী করেছে আজ। স্ক্যান করার উছিলায়? নিশ্চয়ই অনেকদিনের পরিকল্পনা, প্রিয়দর্শিনীকে আলাদা করে খুব কাছ থেকে দেখার। পথের মাঝে যে দু’তিনটে বখাটে মাস্তানের হাতে তাকে তুলে দেয়নি এই তো বেশী। নষ্ট, ভ্রষ্ট, উচ্ছৃঙ্খলদের দলবল তো অমনই হয়।
ক্যাম্পাসে আসতেই প্রিয়দর্শিনীকে স্ক্যান করা হয়ে গেছে। তথ্য চলে গেছে পাতাল লোকে।ঠিক সেখানে, যেখান থেকে দুই দশক আগে পাঠানো হয়েছিল মনুষ্যরূপী এই দানবকে। যাকে তাকে ছোবল মারার মতো তাকত্ সে রাখে। 
৫
কলেজের শেষের দিন প্রিয়দর্শিনীর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে হাসি ঠাট্টা করে তাকে অবজ্ঞা করেছিল নাগলতা তার তস্কর স্বভাবটি দিয়ে। হাসি ঠাট্টা করে তাকে নিয়ে রসালো গল্প করে বেড়িয়েছে সবার সাথে।এ ঘটনা কলেজের অধ্যক্ষকে জানালে তিনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘কে ব্যঙ্গ করছে তোমাকে নিয়ে?’ 
দস্যু মেয়েটির নাম শুনে অস্ফুট স্বরে চিৎকার করে অধ্যক্ষ বলে উঠেছিলেন, ‘নাগলতা?’ মানে অধ্যক্ষ নিজেও জানতেন নাগলতার চরিত্র। যদিও কখনো ছেলেমেয়েদের সামনে প্রকাশ করেন নি। কিন্তু সেদিন তার আর্তনাদ তার ভেতর থেকে এক আতংকের নাম উচ্চারণ করেছিল। নাগলতা কোন ভাল মানুষের প্রতিভূ যে নয় তা কলেজের ছেলেমেয়েদের কাছে শুধু নয় অধ্যক্ষের কাছেও বেশ স্পষ্ট ছিল।অথচ প্রিয়দর্শিনীকে নিয়ে তামাশা করবার পর লতার ব্যক্তিগত জীবনও লন্ডভন্ড হতে বেশী সময় লাগেনি। 
তপন লালকে বিদেশে নিয়ে এক পর্যায়ে নারী নির্যাতনের মামলায় জেলে ঢুকিয়েছিল নাগলতা।কি প্রাপ্তি হয়েছে তার এই কর্মটি সাধন করে, তা পাতাল লোকের জন্তু জানোয়ারেরাই জানে। তপনের ঘরে জন্ম নেয়া তার পুত্রটি তাকে শেষমেশ ত্যাগ করেছিল।দেশে ফেরৎ এসে সাধু সেজে পরবর্তীতে এক সাধাসিধে বিজ্ঞানীকে ধরে বসে। লতার উপস্থাপনা, কথা বলার স্টাইল, ব্যক্তিত্বে সেই বিজ্ঞানী মনে মনে ভাবলেন, তার জীবনে নতুন অধ্যায়ের যে সূচনা হয়েছে, তা বুঝি তার আজন্ম তপস্যারই ফল। 
কিন্ত এত সুখ তার জীবনে সইবে তো? 
হঠাৎ সুখ এলোই বা কিভাবে? ভাগ্যিস তার বউখানা তাকে সময় মতো ফেলে রেখে চলে গিয়েছিল। চোখে মুখে তার পরিতৃপ্তির সে কি বহিঃপ্রকাশ! একটাই আনন্দ – দানব কন্যা এসেছে তার জীবনে। তিনি যে তার মোহের জালে আটকা পড়েছেন। এটা নিজে না জানলেও আর সবাই তা জানে। কিন্তু তপনলাল ততদিনে সব খুইয়ে আজ  জীবনের শেষ প্রান্তে এসে উদ্ভ্রান্ত। তপন লালের পরিণতি এমনি হবার ছিল। 
কিন্তু কলেজের সেই শেষ দিন? প্রিয়দর্শিনীকে নিয়ে হাসি ঠাট্টা করবার পর নাগলতা আর তার সামনে দাঁড়াবার সাহস পায়নি। কলেজের এক দরোজা দিয়ে প্রিয়দর্শিনীকে ঢুকতে দেখলেই আরেক দরোজা দিয়ে সে বেরিয়ে যেত। যদিও প্রিয়দর্শিনী সকলের সামনে তাকে অপদস্ত করার জন্য কখনো অভিযুক্ত করেনি।কিন্তু সেদিনের কুকর্মের পরে এই দানবীর মাঝে কোন একপ্রকার সংকোচবোধ কি কাজ করেছে? নিশ্চয়ই করেছে না হলে প্রিয়দর্শিনীকে সে আর দর্শন দেয় না কেন? পালিয়ে পালিয়ে বেড়ায়।এ দরোজা থেকে ঐ দরোজায়। সর্পলোকের বাসিন্দাদের কি আত্মসম্মান বোধ থাকে? 
থাকে না। 
কিন্তু প্রিয়দর্শিনীকে নিয়ে তার নিজের কথাটি হয়তোবা মনে মনে ঘুরপাক খেত। আপন মনে বলে উঠতো, ‘প্রিয়দর্শিনী, বড্ড ড্যাম কেয়ার।’  

০৩/০৭/২০২৬

অন্যান্য গল্পঃ
আঁচিল
স্টিকি ওরফে কাঠি বেগম 


জীবন যেন স্রোতের মাঝে ভাসমান দ্বীপের মতো

  ১৯৮৪ সাল। স্কুলের অফিস রুমে গিয়েছি বেতন দেবার জন্য। লাইনে অপেক্ষা আমি আর আমার লাল ঝুটি বন্ধুটি। আমাদের খুঁজে খুঁজে ঐ ভীড়ের মাঝে পুষি এলো। ...