পূর্বকথাঃ
মর্ত্যলোকের অতলে আছে পাতাল পুরী। তারও অনেকে গভীরে সর্পলোক। সেখানে নাগ নাগিনীদের বাস। সেই নাগলোক থেকে কোন এক অমাবস্যা রাতে সিদ্ধান্ত হয় কুটচালে পারদর্শী নাগলতাকে মর্ত্যে পাঠানো হবে মনুষ্যরূপে। মানুষ অধ্যুষিত বরাহ অঞ্চলের একটি ব্যবসায়ী পরিবারে সে জন্ম লাভ করবে।কলেজে ওঠার বয়স হলে পরবর্তীতে তপনলাল নামে একটি শাখামৃগকে কব্জায় আনবে। তার মাথায় কাঁঠাল ভেঙ্গে তাকে জেল হাজতেও পাঠাবে।নাগলতার কোষ্ঠিতে আরো লেখা আছে যে, স্বভাবে সে হবে দুর্ধষ ও দানবীয়। কলেজের সকলের কাছে তার স্বভাব ও চালচলন হবে স্মরণকালের মধ্যে ভয়ংকর এবং উচ্ছৃংখল।তার গুরুকুলের সংস্পর্শে এলে পাতাল লোক থেকে একটা বিশেষ সুইচ অন্ হয়ে যাবে।তার নাগলোকের DNA কাজ শুরু করবে। চিনে নেবে তার গুরুকুল শিরোমণিকে। DNA অ্যাক্টিভেশানের সময়ে তার চোখগুলো থেকে লালচে আলো বিচ্ছুরিত হবে। চোখ দুটো গোল গোল করে ঘুরতে থাকবে।পাছে সবার কাছে ধরা পড়ে যায়, তাই সেই লাল আলোর বিচ্ছুরণ ভ্যাম্পায়ারদের মত ভয়ংকর হবে না,তবে অনেকটা ওই ভ্যাম্পায়ার ধাঁচেরই হবে।এতগুণে গুণান্বিতা এই নাগকন্য,শুধু একজনের সাথে পেরে উঠবে না –আর সে হলো মর্ত্যলোকের মনুষ্য কন্যা –প্রিয়দর্শিনীর সাথে।
১
বরাহ অঞ্চলের মনুষ্যকুল বরাহ্ প্রকৃতির বলেই, তারা যেখানেই বসতি স্থাপন করুক না কেন,দেখা মাত্রই সবাই তাদের দুরদুর করে।সবার কাছ থেকে তাড়া খেয়ে তাই নিজেদেরকে এখন মিশিয়ে নিয়েছে কলেজ পাড়ার অলিতে গলিতে। কখনোই বলে না যে, তারা আদি বরাহ্বাসী। দু’তিন পুরুষ আগের সমসাময়িক প্রৌঢ়রা এখন জীবিত নেই বিধায় নাগলতার পরিবারকে কেউ সনাক্ত করতে পারেনি। কিন্তু তারপরও কেন জানি তাদের গোত্রের লোকদের সাথে কেউ আত্মীয়তা করতে চায় না । আত্মীয়তার কথা শুরু হলে অজান্তে সকলের মনে কেমন যেন খুঁতখুঁত করে ওঠে। তাই কয়েক দশক আগ থেকেই বরাহ্ গোত্রের সকলে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। মানে আরো বৃহত্তর জাতি গোষ্ঠীর সাথে নিজেদের মিলিয়ে মিশিয়ে একাকার হয়ে যাওয়াই এদের উদ্দেশ্য। তারা তাই-ই করছে। কিন্তু DNA কি ছাড় দেয়? সে তো সময় মানে না। কাল মানে না। ফুড়ুৎ করে বেরিয়ে আসে।
এদিকে স্কুল শেষ করে কলেজে উঠেছে কালনাগিন। তার প্রজেক্টের অংশ হিসাবে এবার শাখামৃগ তপন লাল-কে কব্জা করবে।সহপাঠী এই ছেলেটি তার বছর দেড়েকের ছোট।বেশ সম্মানিত পরিবারের ছেলে।একে ধরতে পারলে সমাজে নাগলতার একটা সম্মানজনক শ্বশুর বাড়ি জুটবে। মনুষ্য জাতির সহচর্যে তার সাপের মত কিলবিলে ভাবখানার একটু ব্যালেন্স হবে। তার উচ্ছৃঙ্খলপণায় সারা কলেজ অতিষ্ঠ আর তা সে নিজে খুব ভাল জানে।
কিন্তু কি করবে? ভদ্র হতে ভাল লাগে না যে। ভেতর থেকেই যেন একটা কিলবিলে ভাব বেরিয়ে আসতে চায়।তবে ক্লাসের ফার্স্ট গার্লটার মত অত প্রকট না। ওই মেয়ে তো বিশল বড় বড় দুটো আঁচিল নিয়ে ফোঁসফোঁস করে সারা ক্যাম্পাস জুড়ে দৌড়ে বেড়ায় আর সকলকে তার মুঠিতে রাখে।নাগলতার এসবের বালাই নেই। সে ফার্স্ট গার্লকে থোরাই কেয়ার করে।সে তপনকে নিয়ে ব্যস্ত।
এ ছাড়াও ক্লাশে আরেকটা গ্রুপ আছে,বোকাসোকা মেয়েদের গ্রুপ। এই দলের মেয়েগুলো হাবাগোবা হলেও কেন জানি তাদেরকে কব্জায় আনতে পারছে না নাগলতা। বিশেষ করে ওই মেয়েটিকে, যার নাম প্রিয়দর্শিনী।
নাগলতার উগ্রপণাটা তপন লালকে বেশ আকর্ষণ করে।বন্য বন্য, পোষ না মানা এক আদিম মাদকতা আছে মেয়েটির মাঝে। সদ্য ১৮ হওয়া তপন লাল এই মাদকতার গভীরে হারিয়ে যায়। বুঁদ হয়ে থাকে। প্রথম যেন এক উন্মাদিনীর সহচর্য তাকে শুধু পাগল করে তোলে। তপনের বাবা পেশায় একজন শিক্ষক। পাশের আরেকটি কলেজের স্বনামধন্য অধ্যক্ষ। কিপটা বলে ওনার অতিরিক্ত একটা সুনাম আছে। ইদানিং শেষ বয়সের জমানো টাকা দিয়ে দামী একটা গাড়িও কিনেছে।অভিজাত এলাকায় বাড়িও করেছে।গ্রামে ভাই ব্যারাদরের জমি দখল করে জোতদার খ্যাতিও লাভ করেছে।তারই একমাত্র পুত্র তপন,তার বংশের বাতি। পড়েছে এক কালনাগিনীর পাল্লায়। পড়বে না কেন? এখনো তো তার ছেলে বড় হলো না। একদম সেই স্কুল পড়ুয়া সরলতাই রয়ে গেছে।ওর ভোলাভালা চেহারাটার পাশে বেশী বয়স্কা নাগলতার, চালাক ভাবটাই প্রকট হয়।
গত সপ্তাহে জংগলে নিয়ে নাগলতা তার ছেলেকে কুন্ডলী পাকিয়ে জোর করে চেপে ধরেছিল। তপন লালের তো দম বন্ধ হবার দশা। নাগলতা আশ্বস্ত করে বলেছিল, ‘কিছুই হবে না।’ গালে যে দু’একটা দাগ পড়েছে অতটুকুই। এই প্রথম তাদের প্রেমের নিদর্শন সবাই দেখবে কলেজে।
এ আর এমন কি? কলেজে তারা ছাড়া আর কোন ছেলে মেয়ের এমন দাগ আছে? তাই দাগ দেখাতে নাগলতা বিশেষ করে সেদিন সামনের বেঞ্চে বসেছে। স্যার যেন ক্লাসে ঢুকেই তার মুখের দাগগুলো দেখতে পায়।ছাত্র ও শিক্ষক মহলে তারপর গসিপ্ শুরু হবে।ধীরে ধীরে তার পেট উঁচু হলে তপনকে চাপ দেবে বিয়ের জন্য। ইতিমধ্যে তার বাবা এসে তপনকে শাসিয়ে গেছে এই বলে যে,‘আমার মেয়েকে যদি বিয়ে না কর, তাহলে তোমার একদিন কি আমার একদিন।’
তপন জানালো এ কথা তার বাবাকে।শুনে বাবা ছেলেকে নিয়ে হতাশ!মাত্র না এখন সেকেন্ড ইয়ার? এখন এসব কথা কেন? নাগলতার পেট আরেকটু বড় হলে ক্লাশের গ্রুপ ছবিতে সামনে বসে নিজেকে সেদিন সে মেলে ধরলো।ধরবেই বা না কেন? কলেজে আর কি কোন মেয়ের এমন বিশাল পেট আছে? তপনের সন্তান।অর্ধেক মানুষ,অর্ধেক সাপ।লক্ষী সোনাটি ছোটবেলা থেকেই তার মায়ের মত অলরাউন্ডার,কনফিডেন্ট। টবের ফুল ছিঁড়তে গেলে মা বলেছে, ‘ফুল ছিঁড়তে হয় না,ওটা টবেই থাকে।গাছেই তার সৌন্দর্য্য।’ আসলে সৌন্দর্য্যবোধ খুব ভাল ছিল নাগলতার। যেন তেন ভাবে নয়,একদম ন্যাচারাল মেইক-আপের ছোঁয়ায় নিজেকে ফুটিয়ে তুলতো অসাধারণ ভাবে।যেদিন ছোঁয়া লাগাতো না সেদিন প্রিয়দর্শিনীর কাছে একটু খটকা লাগতো।মনে হতো মিল –ফ্যক্টরি থেকে কাজ করে এসেছে এই শ্রমিক মেয়েটি। মেইক-আপের জোরেই সে বছরে ৩৬৫ দিনের মধ্যে ৩৬৪ দিন –একজন মডেল। নিখুঁত তার কারুকার্য।যেদিন মেইক-আপের ছোঁয়া লাগে না সেদিনই শুধু অমন দেখায়। ক্লাশেও তাকে পড়াশোনায় বেশী সময় দিতে হতো না। কিন্তু বিজ্ঞান স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়তে গিয়ে, নতুন করে প্রিয়দর্শিনীর খবর পেয়ে যায় একদিন। কলেজের আদর্শ ছাত্রী প্রিয়দর্শিনী। শুনেই শুরু হয় এবার জোরেশোরে তার খোঁজ।
কোন মেয়েটি?
নিজের ল্যাবে মেয়েটি না থাকায়, বেশ কসরৎ করে একদিন দেখা পায় তার। বাবা রে বাবা। আদর্শ পরিবারের আদর্শ সন্তান যেন।সামনে দাঁড়ানো যায় না,প্রিয়দর্শিনীর। ক্লাশেও, সহপাঠীদের মাঝে মেয়েটির গ্রুপ আলাদা। অন্য সাপগুলোর সাথে সে মেশে না। পাত্তাও দেয় না।তার সাথে আর দু’ তিনটে আছে। এদের সাথেই তার উঠ্ বস। তাকে দেখে নাগলতার বারবার মনে আসছিল একটি কথা – এমন মেয়ে তো,এই মনুষ্য সমাজে তার আগে চোখে পড়েনি! একদিন না হয় চেষ্টা করবে একটু কাছাকাছি হতে। কিন্তু শাখামৃগের মত প্রেমিক যার আছে, তার কি আর মেয়ে বন্ধুর দরকার হয়? এসব আবোল তাবোল বলতে বলতে তপনের কোলে মাথা রেখে সারাটা বিকেল কাটিয়ে দিল নাগলতা কলেজের বারান্দায়।কোলে মাথা রাখার কপোত কপোতির প্রেম লীলা কলেজের ইতিহাসে ছিল না। ওরাই এই নাটকের শুরু এবং ওরাই শেষ। কলেজের বারান্দায় প্রেম লীলা সম্পাদনের এত স্পর্ধা কি আর কোন জোড়ার হবে?
ফণাটা হিস্ হিস্ শব্দ করে বেরিয়ে আসতে চায়। খুব কষ্টে চেপে রাখে লতা।পাছে তপনলাল বেঁকে বসে! আর যদি তাকে ভাল না বাসে! গত পরশু নাগলতার বাবা এসে তপনলালকে আল্টিমেটাম দিয়ে গেছে। হয় তার কন্যাকে বিয়ে করতে হবে, না হয় তিনি নিজেই যাবেন তপনের বাবার কাছে, কলেজ জুড়ে তাদের বেহায়াপনার কথা জানাতে।
এসব শর্তে কি কেউ রাজী হবে এই কুটনিকে বিয়ে করতে? তাই খুব টেনশানে আছে নাগলতা কিছুদিন ধরে। পেটখানা তার বাড়তির দিকে।শেষমেশ তপন কুমার রাজী হয়। নাগলতার খপ্পর বলে কথা।আর তার কিছুদিন পরেই তপন লালের ‘বাবা’ হবার সংবাদ পাওয়া যায়। এতদিনে সে অনেক পাকা হয়েছে। মেয়েদেরকে দেখা মাত্রই বুকের মাপ বলে দিতে পারে। ক্লাসে এসেই গল্প শুরু করে মেয়েদের শরীরে ছিদ্রের সংখ্যা নিয়ে। কান ঘুরে ঘুরে সে কথা মেয়েদের কাছে এসে পৌঁছায়। তার একটা ডায়ালগে ক্যাম্পাস কম্পিত হয়ে ওঠে,’মেয়েদের শরীরে এত ছিদ্র থাকতে তারা নাকে ফুটা করে কেন?’
২
এদিকে সর্পলোকের গুরু শিরোমণি, প্রাক্তন অধ্যক্ষ বহুদিন বাইরে থেকে ধান্দাবাজি করে,পয়সাপাতি কামিয়ে আবার কলেজে ফেরৎ এসেছেন।আরব দেশ থেকে গ্র্যান্ট সংগ্রহ করে একটা কলেজ স্থাপন করেছেন। দেশ ও দশের উন্নতি করে এখন বেশ নাম কামিয়েছেন। তার আগমণ উপলক্ষে বহুদিন পর এবার কলেজে,তার লেকচার নেবার ক্ষণ ধার্য্য করা হয়েছে। অধীর অগ্রহে ছাত্র ছাত্রীরা অপেক্ষমান গুরুকুল শিরোমণির লেকচার শোনার জন্য সেই বিশাল বড় লেকচার থিয়েটারে।
ক্লাশে নাগলতা আর প্রিয়দর্শিনী পাশাপাশি বসেও না, কথাও বলেনা। মাঝে মধ্যে একজন আরেক জনকে দেখেই খালাস। তারপরও নাগবালা প্রিয়দর্শনীর অনেক খবরই রাখে। এমনকি বাড়ির ভেতর সে কয়বার হাঁচি দেয় সেই খবরও রাখে। ইদানিং নাগলতা খেয়াল করেছে ক্লাসে প্রিয়দর্শনী একটু ইন্টারেক্টিভ বেশি । বিশেষ করে সর্পলোকের গুরু প্রফেসরের ক্লাশে। মেয়েটি কি পড়াশোনা করে করে খুব বেশি জেনে ফেলেছে, ভাবতে ভাবতে শিক্ষক মহাশয়ের লেকচার শুরু হয়ে যায় সেদিন। তিনি এক ঘন্টার জায়গায় দেড় ঘন্টা কাটিয়ে ফেললে, অন্য শিক্ষক ক্লাশ নিতে এসে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকেন। সময় শেষ হয়ে গেলেও তার লেকচার দেয়া আর শেষ হয়না। তিনি চোখ মুদে এক নাগাড়ে শুধু বলেই চলেন।
ক্লাশ সময়য় মতো ছাড়ছে না কেন জিজ্ঞাসা করলে বলেন, ‘আমি তন্ময় হয়ে যাই বিষয়বস্তু বর্ণনা দিতে গিয়ে।কি ভাবে ভাববো যে আমার সময় শেষ?’ এভাবে কতবার যে পরের পিরিয়ডের শিক্ষকদের বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে বাইরে দাঁড়া করিয়ে রেখেছেন গুরুকুল শিরোমণি, তার সীমা নাই।এতে তিনি সূক্ষ্ম একটা বিজয়ের আনন্দ পেতেন যা, বলার মতন না। পরের ক্লাশের পুরো সময়ের বেশী অর্ধেকটাও মাঝে মাঝে খেয়ে ফেলতেন। ভাবখানা এমন যে তিনি বিষয়বস্তুর মাঝে হারিয়ে যেয়ে অতলে ডুবে যাচ্ছেন। কিন্তু আজ সেমিনার কক্ষে তার লেকচার। এখানে গতানুগতিক ক্লাসগুলো হয়না। আজ কারো সময় মেরে দিলেও জায়গা মেরে দিতে পারবেন না। কিন্তু একঘন্টা শেষে ক্লান্ত হয়ে আর দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে তিনি বেছে নিলেন পিছনের ছাত্রদের আসনটি। এক্কেবারে নাগবালার পাশে।ছাত্রদের বললেন, বোর্ডে লিখতে। কিন্তু ক্লাসে সবার নজর স্যারের দিকে। বসেছেন নাগ কন্যার পাশে।random সিলেকশান নাকি নাগলোক থেকে দুজনের অ্যান্টেনার মিল হওয়ায় স্থান নির্বাচনে এই বিশেষ আয়োজন –তা কেউ জানে না।
প্রিয়দর্শিনী তো স্যারকে লতার পাশে দেখা মাত্রই চমকে উঠলো । নাগ কন্যার চোখ দুটো কেমন যেন ফুটবলের মতন গোল গোল হয়ে ঘুরছে।ডাটা প্রেসেসিং হছে। খুশিতে মনে হয় সে শিহরিত। কারণ আজ তার পাশে বিশ্ববরেণ্য চিন্তাবিদ, সর্পলোকের গুরুকুল –প্রফেসর শিরোমণির উপবেশন। লতা যেন আহ্লাদে আরেক কাঠি লম্বা হয়ে গেছে। আগে ছিল লাঠি। এখন হয়েছে কঞ্চি। বাঁশের মতনই তো। ক্যাম্পাসে যখন সে হেলে দুলে হাঁটে, বিদঘুটে একটা হাসির ঝিলিক চলতে থাকে তার মনে মনে। চোখেমুখে তা স্পষ্টই ধরা পড়ে। আর এখন কি যে আনন্দ লাগছে লাগছে তার। এ যেন তাদের পাতাললোকের বিশেষ উপহার – গুরুকুল প্রফেসর শিরোমণিকে পাশে পাওয়া। প্রিয়দর্শিনীর দিকে তাকিয়ে মুখে ক্রুর হাসি নিয়ে তার চোখদুটো ঘুরতেই থাকে।
৩
বহুদিন পর অধ্যক্ষ চাইলেন কলেজে কালচারাল অনুষ্ঠান হোক।এতে ছাত্রদের সুপ্ত প্রতিভার উন্মোচন হবে। প্রিয়দর্শিনী উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে পারদর্শী।রিহার্সেলে তার গায়কী দেখে সঙ্গীত বিশারদ শিক্ষকগণ বেজায় খুশী। এ কথা ছড়িয়ে পড়লে নাগলতা দৌড় দিল রিহার্সেল রুমের দিকে। প্রিয়দর্শিনীকে হাত পায়ে ধরে লতার সে কি অনুরোধ । তাকে তার কন্ঠ আবার শুনাতে হবে। শোনাতেই হবে। কারণ সে যে স্বয়ং আবদার করেছে। যেনতেন ব্যাপার তো না এটা । কিছু একটা শুনেই তো সে এসেছে রিহার্সেল রুমে। এবার প্রিয়দর্শিনীর কন্ঠ সে শুনতে চায়। দেখতে চায় কেমনতর তার উপস্থাপন। তারপর সে নিজে বিচার করবে কেমন হয়েছে প্রিয়দর্শিনীর গান। লতা তার দাপুটে উদ্ধত স্বভাবে নিজে এতই অন্ধ যে, ভেবে নিয়েছিল, প্রিয়দর্শিনী যেন বসে আছে তার আদেশ মানার জন্য। বলা মাত্রই সব কাজ ফেলে গলা হাঁকানো শুরু করে দেবে। কিন্তু নাগলতা তাকে দিয়ে তার আদেশ মান্য করাতে পারে নাই।মূল অনুষ্ঠান পর্যন্তই তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল প্রিয়দর্শিনীর কন্ঠ শোনার জন্য। প্রোগ্রামে প্রিয়দর্শিনীর সহশিল্পীরা তাকে ডোবানোর জন্য কতই না বেসুরো টান দেবার চেষ্টা করেছিল সেদিন। কিন্তু সব বাধা অতিক্রম করে প্রিয়দর্শিনীর উপস্থাপনা, গায়কী, কলেজের সকলের মনে দাগ ফেলেছিল গভীর ভাবে। হয়তোবা সেই স্কল শ্রোতারাও সঙ্গীত বোদ্ধা ছিল, তাই তাদের প্রাণখোলা প্রশংসা আর ভবিষ্যত বাণী প্রিয়দর্শিনীকে অবাক করেছিল। অধ্যক্ষ স্বয়ং বলেছিলেন, ‘তুমি যদি আরেকটু সাধনা কর, তাহলে উপমহাদেশের বরেণ্য শিল্পীদের মতন হতে পারবে।’
তার কন্ঠের এতো সুনাম ছড়িয়েছিল যে নাগলতা তখন ভেবেই বসলো প্রিয়দর্শিনীর কাছে তার যেতেই হবে। এত দূরে দূরে থেকে তার কেমন যেন খিদিবিদি লাগছে। সারা দুনিয়া ভেজে খেয়ে এসে এখন কিনা কোনখানকার কোন মেয়ে প্রিয়দর্শিনী -সে তার ছোবলের বাইরে থাকবে?
৪
ক্লাশে অন্য সহপাঠীদের মাঝে ইয়া বড় আঁচিল ওয়ালা আরেকটা যে সাপ আছে, সে পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র পেয়ে ফার্স্ট হয়ে যায়। সবাই যদিও ভাবে শত হলেও মেয়েদের মাঝে ট্যালেন্ট আছে, প্রথম স্ট্যান্ড করা ছাত্রী সে। খুব মেধাবী।ফার্স্ট হবেই না কেন। কিন্তু কেউ জানে না পরীক্ষার ঠিক আগের দিন সন্ধ্যায় কে তাকে প্রশ্নপত্র সাপ্লাই দেয়।প্রমোশন বাগিয়ে নিয়ে হালের প্রফেসর হওয়া এক মহিলা আছে –কাঠি বেগম।এই মহিলাই আঁচিল ওয়ালীকে ক্লাশে প্রথম বানাবার নাটের গুরু। নাগলতা এই দুটোকে তেমন পাত্তা দেয় না।কিন্তু প্রিয়দর্শিনী এটা খেয়াল করে বেশ অবাক হয়।কারণ পাতাল লোকের সবাই এককাট্টা হয়ে চলাফেরা করে আর ষড়যন্ত্র বাঁধিয়ে বেড়ায়। কিন্তু নাগলতা ঐ আঁচিল ওয়ালার সাথে একেবারেই ঘষাঘষি করে না আর প্রফেসার কাঠি বেগমকেও তৈল মর্দন করে না। বদ দুটো বেশী রকমের কুলাঙ্গার বলেই কি না,কে জানে? নাগলতাই এসব ভাল উপলব্ধি করতে পারবে। তবে প্রিয়দর্শিনী শুনেছে পাতাল লোকেও ব্রাহ্মণ, শূদ্রদের মত শ্রেণি বিভাজন আছে। তুলনা করলে নাগলতার তেজ এই দুটোর থেকে একটু বেশীই ঠেকে। আর মনুষ্য তো কোন ছাই!
কিন্তু গোল বাঁধলো এবার অন্য জায়গায়।একই স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়তে গিয়ে প্রিয়দর্শিনীর বাড়ির ভেতরের সব খবরাখবর এবার তার হাতে এসে গেল।তাদের মতো প্রাইভেট শিক্ষকের টাকা মেরে খাওয়ার অভ্যাস নেই প্রিয়দর্শিনীর। বেয়াদবী তো দুরের কথা। শাখামৃগ আর নাগলতার অভিভাবকদের যেমন একটু টাউটগিরি করার স্বভাব আছে, এদের পরিবারের তা-ও নেই।সময় মতো প্রাইভেটের ফি পরিশোধ করে প্রিয়দর্শিনীর। তার তা না করায় প্রাইভেট থেকে তাদের বের করে দেওয়া হয়েছে। অথচ নাগলতা আর শাখামৃগর অভিভাবকরা সমাজে অতি সম্মানিত, অতি উচ্চপদস্থ।কেউ জানে না তাদের টাউট স্বভাবের কথা।
অন্য দিকে প্রিয়দর্শিনী?
কোন দুনিয়ার মানুষ রে বাবা। মনুষ্য প্রজাতির কোনো শ্রেণীর মধ্যে পড়ে না এরা। মনুষ্যলোক থেকে অনেক অনেক উর্ধ্বে এদের বাস।
নাহ্ আর পারা যাচ্ছে না। ধৈর্য্যে কুলাচ্ছে না। প্রিয়দর্শিনীর পাত্তা নাগলতাকে যেমন করেই হোক পেতে হবে। তাই বুদ্ধি এঁটে নাগলতা একদিন ক্লাশ শেষে তার কাছে গেল। কেন জানি খুব শিহরণ লাগছে। পারবে তো পটাতে?
প্রিয়দর্শিনীর কাছে যেয়ে মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে বললো, ‘আমি একটু বইয়ের দোকানে যাব। একা যেতে চাইছি না।তুমি কি যাবে আমার সাথে?’
দানব এই মেয়েটিকে সামনে দেখে প্রিয়দর্শিনীর তো থরহরি কম্প।। এই দস্যু কিনা এসেছে তার কথা বলতে? তার দাপটে না সবাই আতংকগ্রস্ত। আর এখন কি মধুর আব্দার! ‘না’ বলবে কিভাবে? ঘাড়ে তো সবার একটাই মাথা।কিন্তু প্রিয়দর্শিনী বুঝে উঠতে পারছে না যে, নাগলতা তার সান্নিধ্য লাভ করার সময়টুকুতে তাকে স্ক্যান করে ফেলবে। তারপর সব তথ্য পাঠিয়ে দেবে তাদের পাতাল পুরীর ডাটা সেন্টারে! দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণে ইতোমধ্যেই তো খবর পেয়ে গেছে প্রিয়দর্শিনীর মেইক –আপের প্রয়োজন হয় না। এত সাধাসিধে হয়েও মেয়েটি এত নজরকাড়া, এতই সপ্রতিভ ।সবাইকে হার মানায়। মেধা, গুণ, সৌন্দর্য্য, আদব কায়দা সব দিক দিয়েই সে যে কলেজের আদর্শ।তার ব্যক্তিত্ব এবং সৌন্দর্য্যের দিপ্তী বিচ্ছুরিত হয়ে আলোকিত করে রাখে ক্লাশের ভেতরে এবং বাইরে।প্রিয়দর্শিনী এলেই যেন প্রজাপতি পাখা মেলে চারিদিক থেকে ঘিরে ধরে তাকে।বিভাগে প্রাণের সঞ্চার ঘটে। ক্লাশরুম ঘিরে বারান্দার আশপাশের চত্বর মানুষের মিলন মেলায় পরিণত হয়। ক্ষণিকের মাঝেই সামনের ফুলে ঘেরা বাগানটা ছোটখাটো একটা স্বর্গীয় উদ্যানে রূপান্তরিত হয় । কিন্তু সেই বাগানে যে শখামৃগ আর লতা সুন্দরীর ঠাঁই মেলে না। এসব ভাবতে ভাবতে সেদিন বই পত্র কিনে পাশাপাশি হেঁটে হেঁটে প্রিয়দর্শিনীকে নিয়ে ক্যাম্পাসে ফেরৎ আসলো নাগলতা ।আর তাকে আপনা আপনিই বলে ফেললো তার ভাবনাটুকু।
-জানো প্রিয়দর্শিনী, তুমি কিন্তু খুব স্বাধীনচেতা।
-মানে?
-মানে তুমি কাউকে ধার ধারো না। নিজের মতন থাকো। একদম ড্যাম কেয়ার।
মন্তব্যটা শুনে প্রিয়দর্শিনীর কি যে অবস্থা। ভয়ে সে এমনিই তটস্থ। চাপে পড়ে এই দস্যুর সাথে বের হতে হয়েছে। তারপর কিনা তাকে নিয়ে তার মোহনীয় যাচাই বাছাই। নাহ্, একে বেশী নাড়াচাড়া ঠিক হবে না ।তথাস্তু তথাস্তু বলে, ভালোয় ভালোয় ক্যাম্পাসে ফেরৎ আসতে পারলেই হলো।সামান্য একটা বই কেনার জন্য দোকানে যেতে এই দানব মেয়েটির সঙ্গী লাগে নাকি? কেন তাকে সঙ্গী করেছে আজ। স্ক্যান করার উছিলায়? নিশ্চয়ই অনেকদিনের পরিকল্পনা, প্রিয়দর্শিনীকে আলাদা করে খুব কাছ থেকে দেখার। পথের মাঝে যে দু’তিনটে বখাটে মাস্তানের হাতে তাকে তুলে দেয়নি এই তো বেশী। নষ্ট, ভ্রষ্ট, উচ্ছৃঙ্খলদের দলবল তো অমনই হয়।
ক্যাম্পাসে আসতেই প্রিয়দর্শিনীকে স্ক্যান করা হয়ে গেছে। তথ্য চলে গেছে পাতাল লোকে।ঠিক সেখানে, যেখান থেকে দুই দশক আগে পাঠানো হয়েছিল মনুষ্যরূপী এই দানবকে। যাকে তাকে ছোবল মারার মতো তাকত্ সে রাখে।
৫
কলেজের শেষের দিন প্রিয়দর্শিনীর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে হাসি ঠাট্টা করে তাকে অবজ্ঞা করেছিল নাগলতা তার তস্কর স্বভাবটি দিয়ে। হাসি ঠাট্টা করে তাকে নিয়ে রসালো গল্প করে বেড়িয়েছে সবার সাথে।এ ঘটনা কলেজের অধ্যক্ষকে জানালে তিনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘কে ব্যঙ্গ করছে তোমাকে নিয়ে?’
দস্যু মেয়েটির নাম শুনে অস্ফুট স্বরে চিৎকার করে অধ্যক্ষ বলে উঠেছিলেন, ‘নাগলতা?’ মানে অধ্যক্ষ নিজেও জানতেন নাগলতার চরিত্র। যদিও কখনো ছেলেমেয়েদের সামনে প্রকাশ করেন নি। কিন্তু সেদিন তার আর্তনাদ তার ভেতর থেকে এক আতংকের নাম উচ্চারণ করেছিল। নাগলতা কোন ভাল মানুষের প্রতিভূ যে নয় তা কলেজের ছেলেমেয়েদের কাছে শুধু নয় অধ্যক্ষের কাছেও বেশ স্পষ্ট ছিল।অথচ প্রিয়দর্শিনীকে নিয়ে তামাশা করবার পর লতার ব্যক্তিগত জীবনও লন্ডভন্ড হতে বেশী সময় লাগেনি।
তপন লালকে বিদেশে নিয়ে এক পর্যায়ে নারী নির্যাতনের মামলায় জেলে ঢুকিয়েছিল নাগলতা।কি প্রাপ্তি হয়েছে তার এই কর্মটি সাধন করে, তা পাতাল লোকের জন্তু জানোয়ারেরাই জানে। তপনের ঘরে জন্ম নেয়া তার পুত্রটি তাকে শেষমেশ ত্যাগ করেছিল।দেশে ফেরৎ এসে সাধু সেজে পরবর্তীতে এক সাধাসিধে বিজ্ঞানীকে ধরে বসে। লতার উপস্থাপনা, কথা বলার স্টাইল, ব্যক্তিত্বে সেই বিজ্ঞানী মনে মনে ভাবলেন, তার জীবনে নতুন অধ্যায়ের যে সূচনা হয়েছে, তা বুঝি তার আজন্ম তপস্যারই ফল।
কিন্ত এত সুখ তার জীবনে সইবে তো?
হঠাৎ সুখ এলোই বা কিভাবে? ভাগ্যিস তার বউখানা তাকে সময় মতো ফেলে রেখে চলে গিয়েছিল। চোখে মুখে তার পরিতৃপ্তির সে কি বহিঃপ্রকাশ! একটাই আনন্দ – দানব কন্যা এসেছে তার জীবনে। তিনি যে তার মোহের জালে আটকা পড়েছেন। এটা নিজে না জানলেও আর সবাই তা জানে। কিন্তু তপনলাল ততদিনে সব খুইয়ে আজ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে উদ্ভ্রান্ত। তপন লালের পরিণতি এমনি হবার ছিল।
কিন্তু কলেজের সেই শেষ দিন? প্রিয়দর্শিনীকে নিয়ে হাসি ঠাট্টা করবার পর নাগলতা আর তার সামনে দাঁড়াবার সাহস পায়নি। কলেজের এক দরোজা দিয়ে প্রিয়দর্শিনীকে ঢুকতে দেখলেই আরেক দরোজা দিয়ে সে বেরিয়ে যেত। যদিও প্রিয়দর্শিনী সকলের সামনে তাকে অপদস্ত করার জন্য কখনো অভিযুক্ত করেনি।কিন্তু সেদিনের কুকর্মের পরে এই দানবীর মাঝে কোন একপ্রকার সংকোচবোধ কি কাজ করেছে? নিশ্চয়ই করেছে না হলে প্রিয়দর্শিনীকে সে আর দর্শন দেয় না কেন? পালিয়ে পালিয়ে বেড়ায়।এ দরোজা থেকে ঐ দরোজায়। সর্পলোকের বাসিন্দাদের কি আত্মসম্মান বোধ থাকে?
থাকে না।
কিন্তু প্রিয়দর্শিনীকে নিয়ে তার নিজের কথাটি হয়তোবা মনে মনে ঘুরপাক খেত। আপন মনে বলে উঠতো, ‘প্রিয়দর্শিনী, বড্ড ড্যাম কেয়ার।’
০৩/০৭/২০২৬
অন্যান্য গল্পঃ
আঁচিল
স্টিকি ওরফে কাঠি বেগম