প্রার্থনা - The Prayer

 ১.

‘এ কেমন ভাগ্য লিখিয়ে নিয়ে এলাম ‘ – ভাবছে ঝর্ণা মনে মনে। ঈশ্বরের কাছ থেকে আসবার সময়ে তার সকল ইচ্ছা, দায়িত্ব, কর্মযোগ জেনে বুঝে একটি আত্মা  এ দুনিয়াতে প্রবেশ করে। ঝর্ণা তেমন-ই শুনেছে । তাহলে তার চয়েস, তার সিলেকশান সব সে এমনই করলো কেন?

সেই ১৯৮৪ সালের কথা। বয়স আর কতই বা হবে, ১৪/১৫. শীলা আপার বিয়ের দিন। অনুষ্ঠানে ঝর্ণা তার হাতখানি দেখাল শীলা আপার ছোট বোন, তার প্রাণের বন্ধু কেয়াকে। কেয়া দেখে বললো, ‘দুটি রেখা, মানে বিয়ে ভাঙা?’ ঝর্ণা বললো, ‘দেখলে তো এবার? বলেছিলেম না হাতের রেখায় আমার  বিয়ে ভাঙা।‘ হাতের প্রধান রেখাগুলো সেই ১৪ বছর বয়স থেকেই হস্তরেখাবিদদের মত লেখা পড়ে করে ঝর্ণা  মোটামুটি চিনে। আর কিশোরী বয়সে প্রেম, বিয়ের রেখা তো সব্বার আগে মনযোগ কাড়ে। তাই না? 

এবং সে জানে তার ভাগ্য তেমন একটা প্রসন্ন হবে না। অর্থাৎ  বিবাহ নামক জিনিসটা তার জন্য সুখকর হবে না। তারপর কৈশোরের গন্ডী পেরিয়ে যখন যৌবনে পা রাখলো,সুদর্শনের সাথে তার দেখা হলো। সুদর্শনের চেহারায় সে কি বুদ্ধির ঝলক। হাঁটায় সে কি স্মার্টনেস। আর মুখে চঞ্চলতায় ভরা হাসি। প্রথম দেখায় অজান্তে বুকটা ধক্ করে উঠেছিল ঝর্ণার। 

বইয়ের পাতা থেকে মুখু তুলতেই দেখে সামনা সামনি সুদর্শনের সেই মুখখানা। 

প্রথম দেখা!

দেখতে কাস্পিয়ান সাগর পাড়ের টার্কমিনিস্তান, আজারবাইজান অঞ্চলের মানুষদের মতন। যারা পারস্যেও ছড়িয়ে পড়েছিল পরবর্তীতে। 

প্রথম দর্শনে শুধু সৌন্দর্য্য নয়, বুদ্ধি, ব্যক্তিত্ব সবকিছুর প্রেমে পড়ে গিয়েছিল ঝর্ণা। পুরো কলেজে এই ব্যক্তিটির রুচি, পোশাকের সিলেকশান একদম স্ট্যান্ডার্ড । মনে মনে কল্পনাও করে ফেলেছে ঝর্ণা তাকে নিয়ে – তার সংসার কেমন হবে। কলেজের টিচার্স কলোনীতে তাদের নতুন সংসার শুরু হবে । ঐ যে ঐ বিল্ডিংগুলো, সেখানে  থাকবে, যেগুলো  মাত্র নতুন তৈরী হয়েছে।  আর সুদর্শনেরও নতুন যোগদান এ কলেজে। ঝর্ণা এখন বিশে পা রেখেছে। হৃদয় মন আকুলতা বাসনায় বিভোর এক মনের মানুষের খোঁজে। আর ইশ্বর তাকে নিজ হাতে এনে দিয়েছে এই মানুষটিকে। বলছেন, ‘দেখ। প্রাণ ভরে দেখো। কিন্তু পাবার আশা করো না। ও তোমার ভাগ্যে নেই।‘  

কেন নেই?

ঝর্ণা হাতের তালুর দিকে তাকায়। বিয়ের রেখাটা ভেঙ্গে দ্বিখন্ডিত।

নাহ্ এ মানুষটিকে সে হারাতে চায় না। কখনো তার কাছেও যাবে না, মনের বাসনাগুলো প্রকাশও করবে না। বিয়ে নামক কিছু  করতে হয় বলে করবে। অন্য কাউকে। যদি সংসার তখন টিকেও যায়, সংসারের নিয়মে নাহয় জীবনটা তখন কাটিয়ে দেবে।

আহ্! কি বুক বাঁধা আশা!

ভাগ্যের কন্ট্রাক্টে যখন  সে লিখিয়ে এনেছে, এ পথ একা চলার পথ, তার কোন জোড়া নেই, সেখানে আবারও ঝর্ণা আশা করে তার সংসারটা টিকে যাবে?

কিন্তু সুখের স্পর্শ তো দূরের কথা , জ্বলন্ত উনুনে পুড়েছে ঝর্ণা। 

১৯৯৫ সাল। ২৪ বছর বয়সে জীবনের নতুন অধ্যায়ে পদার্পণ করেছে। সে সময়ে হাতের রেখাটা আবারো দেখলো ঝর্না। রেখাটা বেশ রুগ্ন, বেশ ক্ষীণ। সম্পর্ক টেকাবার লক্ষণ – এ রেখা বুঝায় না। কিন্তু অপ্রকৃতস্থ, মানসিক প্রতিবন্ধী সেজন্য ভাগ্যে এসে পড়বে?

এ কেমন কন্ট্রাক্ট? কেউ সখ করেও করবে না এ কন্ট্রাক্ট ইশ্বরের সাথে। নাকি আজ ইশ্বর তাকে task দিয়েছে এ জন্মে। এটা তার choice নয়। তার দায়িত্ব – এক পাগল ছেলের দায়িত্ব নেয়া তার স্ত্রী হিসাবে। 

এ কেমন হিসাব জীবনের? 

জীবনের এ কেমনতর খেলা?

এর মাঝে প্রাণের শংকা দেখা দিতেই ঝর্ণা তার স্বামীর ঘর ত্যাগে বাধ্য হলো। শাস্ত্র মতে মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত ব্যক্তির সাথে বিবাহ, বিবাহ নয়। তার কি বিয়ে নামের প্রহসন হয়েছিল তবে?  বিয়ে তো নয়। এখানে জীবন যেন রসিকতা করতে করতে প্রহসনের চরম পর্যায়ে ঠেলে দিয়েছিল ঝর্ণাকে। 

কিন্তু কেন?

ঝর্ণার মনে আবারোও প্রস্ন জাগে, ‘ এ কেমন ভাগ্য লিখিয়ে নিয়ে এলাম?’

২.

আজ তিন দশক অতিবাহিত হয়েছে। আবার আজ হাতের তালুতে চোখ রাখলো ঝর্ণা। জ্যোতিষী বলেছেন তার ভাগ্য লেখার ভিডিওতে –খুব স্পষ্ট দুটি সমান্তরাল রেখা যদি হৃদয় রেখা আর শিরো রেখার মাঝে অবস্থান করে এবং যথারীতি বিয়ের রেখাটি ভেঙ্গে, চুড়ে নুয়ে পড়ে নীচের দিকে প্রবাহিত হয়, তাহলে জাতিকার সংসার জীবনে ভাঙ্গন নিশ্চিত। কিন্তু এতদিন মনে হতো ঐ ছোট দুটি সমান্তরাল রেখা দুটি সন্তান রেখা নির্দেশ করছে। 

হায় রে ভাগ্য!

কোথায় সন্তান আর কোথায় সংসার! বিয়েই  তো স্থির  রাখতে পারছে না। 

এরপর ২০০১ সালের কথা। পরিচয় হল অসামান্য প্রতিভাবান একজন সুন্দর মনের মানুষের সাথে। স্বভাবে তিনি চারণ কবি। ঝর্ণার মনে হলো রেখা টেখা কোন বিষয়ই নয়! ভাগ্যের চাকা এবার বোধহয় ফিরবে। আর ভাগ্যই বা কি। ভাগ্য বলে কিছু আছে না কি? সব না পাওয়াগুলোকে পিছনে ফেলে এবার সম্মুখে পদচারণা শুরু করলো সে। কিন্তু কবি যে তার ,কবিতার উপাদান খুঁজে বেড়ায় তার প্রাক্তন প্রেমিকাদের মাঝে। কবির সময় কোথায় ঝর্ণাকে সময় দেবার?

৩.

ট্রেনে যেতে যেতে চোখ ভরে ওঠে জলে।  আশপাশের যাত্রীরা কি ভাববে? কিন্তু কষ্ট দমিয়ে রাখতে পারে না ঝর্ণা। আবারো প্রস্তুতি নিতে হবে তার – সকল আশা, আকাঙ্ক্ষা আর স্বপ্নগুলোকে জলাঞ্জলি দেবার জন্য। ভীষণ কষ্টকর এক decision , ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক এক আয়োজন ,বারবার করতে হয়েছে ঝর্ণাকে। 

কিন্তু কেন?

চারিদিকে তাকায় । সুখী মানুষ দেখতে পায় না কোথাও। তবুও সংসার চালিয়ে নিচ্ছে সকলে। আর প্রৌঢ়ত্বের দ্বারপ্রান্তে এসে ঝর্ণা শুধু প্রশ্ন করছে নিজেকে, ‘কোথায় সুখ? কেন এমন হলো? এ কেমন ভাগ্য নিয়ে এলাম?’

নাহ্।

আর কিছু চাইবে না ঝর্ণা এ জীবনের কাছে। কেউ যেন সেই বার কানে কানে বলেছিল, ‘তোমার কোন জোড়া নেই। তোমার পথচলা একার। ‘ সেই  প্রথম বিয়ের রাতে, আপ্রকৃতস্থ স্বামীর আচরণ দেখার দুই তিনদিন পরই ঝর্ণা এমন কথাটি শুনতে পেয়েছিল কানে কানে –কে যেন বলে দিয়েছিল তাকে, তার পথ নির্ধারিত। এই নিয়তিই সে নিয়ে এসেছে তার জীবনে। 

আর চারণ কবির সান্নিধ্যে এসে কি হলো? অনেক কিছু শিখেছে তার কাছ থেকে। কিন্তু সংসার মেলেনি। বিয়ের রাতে কবির মদিরার নেশায় বুঁদ হয়ে অর্ধচেতন হয়ে পড়ে থাকা  অবস্থা ঝর্ণাকে তার সেই রাতের কথাই মনে করিয়ে দিয়েছে ; যখন অপ্রকৃতস্থ, মানসিক প্রতিবন্ধী স্বামীটি  ঝর্ণার সাথে কোন কথা বলতো না। ঝিম মেরে পড়ে থাকতো। বিয়ের রাতে প্রথম যখন দেখেছিল তার অপ্রকৃতস্থ, স্বামীকে, ঝর্ণা ভেবেছিল তার স্বামী বোধহয় দার্শনিক। তাই ভাবুক মনে অন্য জগতে ঘুরে বেড়ায়। 

আসলেই কি তাই? 

দার্শনিকদের মতন মানসিক ভাবে অপ্রকৃতস্থ, পাগলরাও কি অন্য ভুবনে ঘুরে বেড়ায়?  দ্বিতীয়বারের বাসরেও একই ঘটনা। স্বামীটি  যেন এই পৃথিবীতে নেই। নেশায় চুর হয়ে অচেতন । 

 বারবার একই ঘটনা, একই যন্ত্রণা, ভাগ্যের চাকা ঘুরে ঘুরে  এই একই রূপ প্রদর্শন – ঝর্ণাকে ভাবিয়েছে অনেকবার। 

নাহ্। আর যন্ত্রণা, কষ্ট সে নেবে না। আর যন্ত্রণা, কষ্ট সে পাবেও না। এবার চরম পরমের পানে ছুটে যাবে সে।  total blissful state বলে একটা শব্দ আছে ধ্যান জগতের সর্বোচ্চ মননের স্তরে। ঝর্ণার হাতের তালুর দিকে আবার সে তাকায়। তার আয়ু রেখাটি ও দেখে। ২০৪৯ সাল –যখন তার exit এর সময় হবে এই রিয়্যালিটি থেকে। কিন্তু এর আগেই, এখন ঝর্ণা ধ্যানস্থ হবে। ইশ্বরের কাছে নিবেদিত হবে। আর বলবে, ‘আমাকে আমার টাস্ক যা দিয়েছ তুমি, তা আমি পালন করতে চেষ্টা করেছি যতটুকু পেরেছি। অপ্রকৃতস্থ, ছেলেকে সুস্থ করবার, মানসিক ভাবে প্রশান্তি দেবার চেষ্টা আমি করেছি। past trauma থেকে ক্ষত নিয়ে আসা কবি বরকে চেষ্টা করেছি  ট্রমা মুক্ত করার। কিন্তু আমি কি শুধু অন্যকেই heal করে যাব? আমাকে কে heal করবে? আমার তো পথ চলা একার। আমি তোমার মাঝে আমাকে নিবেদন করলাম। আমার আত্মার শান্তি আমি প্রার্থনা করি  তোমার কাছে। প্রভু, তুমি সকলের। তুমি আমারও। আমরা আসি source থেকে। তোমার কাছ থেকে। ভাগ্য লিখে  নিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট ছকে। তারপর তা পালন করার চেষ্টা করি। সফলতা মাপার মালিক তুমি। তুমি আমাকে সর্বোচ্চ blissful state  -এ পৌঁছানোর জন্য সাহায্য কর এটাই আমার প্রার্থনা তোমার কাছে। 

.................

২৩.১২.২০২৫

ঝড়ে বক মরে

বিয়ের পরপরই রত্নাকে কে যেন কানে কানে বলেছিল, ‘তোমার পথ চলা একার। তোমার কোন জোড়া নেই।’ কথাটা শুনে বেশ অবাক হয়েছিল। ক’দিন হলোতো বিয়ে হয়েছে। নতুন জীবন শুরু হয়েছে। এসব  ভাবনা কেন তার মনের মাঝে আসে? রত্না বুঝে উঠতে পারেনি তখন। 
আর  আজ?
প্রায় ত্রিশ বছর অতিক্রান্ত। ত্রিশ না হলেও ২৭ বছর তো হবেই।  রত্নার পথ চলা একার। সঙ্গীবিহীন। 
একটা প্রাইভেট স্কুলে চাকরী করে। নাইন টেনে অঙক, বিজ্ঞান পড়ায়। বেতন নামমাত্র। এসব চাকরীতে প্রভিডেন্ট ফান্ড, অবসর ভাতার - প্রশ্নই আসে না। প্রাইভেট স্কুল না? 
চাকরের মত মনে করে রত্নাকে, স্কুলের মালিক কাম পরিচালক। ধমক ধামক দিলে থাকবে না আবার ? আরো বেশী সমীহ করবে, আরো ভয় পাবে। মুখ বুজে কাজ করে যাবে কাজের বুয়ার মত। কিন্তু কি জানি কেন, রত্নার এসব ভাল লাগে নি। সে চাকরীটা ছেড়েই দিল। বনানীর রাস্তা দিয়ে যেতে ইস্ট ওয়েস্ট ব্যাংকে স্কুলের বেতন জমা হতো । এখন চাকরীও নেই, ব্যাংকের সাথে কোন লেনা দেনাও নেই। সচরাচর তাই এদিকে আর আসা হয় না রত্নার ।
 
কিন্তু সেদিন অন্য একটি কাজে রত্না হেঁটে যাচ্ছিল ঐ রাস্তা দিয়ে। শুকনো দিন। এত বড় রাস্তা আর শেষ হয় না। পথ যেন খুব দীর্ঘ মনে হচ্ছে।  হঠাৎ খুব বাতাস বইতে শুরু করলো । কি অদ্ভুত ! বাতাসের তোড় প্রচন্ড হচ্ছে । যেন টর্নেডোর মতন। ক্ষেপে গেছে প্রকৃতি। কারোর ওপর ক্ষেপে গিয়ে সে আচমকা উন্মত্ত হয়ে উঠেছে। রাস্তার পাতাগুলো ,ধূলাবালি,  ময়লাগুলো ঘূর্ণি খাচ্ছে।  রত্না  আকাশের দিকে তাকালো । দেখলো মেঘ জমেছে। কিন্তু বৃষ্টি হবার মতন নয়।  দিনতো খুব শুকনা ছিল।  আচমকাই যেন কিছু একটা ঘটে যাচ্ছে।
কে ঘটাচ্ছে? 
কেন?
রত্না বুঝবার আগেই প্রচন্ড বাতাসের সাথে শুরু হলো  ঝম ঝম বৃষ্টি। এ রাস্তার শেষ প্রান্তে যাবার কোন সুযোগ নেই। বৃষ্টি আর ঝড়ো হাওয়ায় টেকাই যাচ্ছেনা। হাঁটাও দায়। যেন উড়িয়ে নিয়ে যাবে । আশ্রয় নিতেই হবে কোথাও। পাশে সেই  ইস্ট ওয়েস্ট ব্যাংকের পোর্টিকো তে রাস্তার সবাই জড়ো হয়েছে। বিকেল চারটা বেজে গেছে। তাই ব্যাংকের সামনের দরোজা বন্ধ। কেউ ঢুকতে পারছে না ভিতরে। সবাই গাদাগাদি করে ওই অতটুকু জায়গার মাঝে ঠাঁই নিয়েছে। রত্নাও এসে তাদের সাথে সামিল হলো। তার ভাগ্য যেন তাকে ঠেলে এখানে পাঠালো।  
রত্না বুঝে উঠতে পারছে না ব্যাপারটা। একটু খটকাও লাগছে প্রকৃতির আকস্মিকতা দেখে। সে ভাবলো, জীবনের যেন নিশচয়তা নেই। শুকনো মেঘলা দিন হঠাৎ -ই বদলে বাদললা দিনে টার্ন নিল।
এমন কেন হলো? 
তার জন্য তো বিশেষ করে হয়নি। রাস্তার পথচারীরা সবাই এই দুর্যোগে আক্রান্ত। 

সামনে তাকিয়ে দেখলো একটা সাদা গাড়ি ঢুকছে ব্যাংকের চত্বরে। পার্কিং -এ না থেমে বিল্ডিং এর দিকে এগিয়ে আসছে গাড়িটা। প্রচন্ড বৃষ্টি তো। হয়তো কাউকে নামিয়ে দেবে বলে পোর্টিকোর দিকে এগিয়ে আসছে। কিন্তু এখানে তো অনেক লোক গাদাগাদি করে দাঁড়ানো। গাড়িটা কোথায় দাঁড়াবে? 
আবার থামার তো লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। বেশ অবাক হচ্ছে ড্রাইভারের চালনা দেখে। এতটুকু জায়গায় গাড়ীটা যেন মানুষের ওপর তুলে দেবে এমন ভাব। সত্যই যেন তাই হলো। গাড়িটা এসে রত্নার গায়ের উপর পড়তে পড়তে পায়ের কাছে  কোনমতে থামলো। চাকাগুলো রত্নার আংগুলগুলো থেতলে দেয় বলে। অল্পের জন্য বাঁচোয়া।
সে দেখলো  খ্যাট -খ্যটা মেজাজের একটা লোক গাড়ি থেকে নামতে নামতে  ড্রাইভারকে বলতে লাগলো ‘আগাও, আগাও। আরো আগাও। গাড়িটা তুলে দাও, তুলে দাও মানুষের ওপর।’
গাড়ীটা রত্নার পায়ের ওপর তোলার কারণেই খ্যাট খ্যাটা লোকটা যেন রত্নাকে উদ্দেশ্য করে ড্রাইভারকে বকা দিয়ে উঠেছিল। মানে সরাসরি নয় কিন্তু রত্নাকে জানান দিচ্ছিল যে তারা খুব দুঃখিত ড্রাইভারের এমন আচরণের জন্য। আরেকটু আগালেই তো অ্যাক্সিডেন্ট ঘটে যেত। ভীড়ের মাঝে রত্না আর কতটুকুই বা সরতে  পারতো?
পারতো না। আর জায়গা ছিল না। 
লোকটা নেমে চলে গেল ব্যাংকের পিছনের গেইটে। মানে সে জানে এখন ব্যাংকের সামনের দরজা বন্ধ। লোকটা ৫০ বছর বয়স্ক হবে। শুকনা,  লম্বা, কাঁচা পাকা চুল। খুব বুদ্ধি সম্পন্ন গার্জিয়ান সুলভ ভাব ভংগীমা। মানে গাড়ির মালিক বুঝা যাচ্ছে। ড্রাইভারের পাশে সিটে বসা ছিল। 
লোকটা নেমে যেতেই গাড়িটা পিছনে বাঁক নিল। এবার সে পার্কিং এ যাবে। জানালা দিয়ে একটা ছেলে বয়স ২২/২৩ হবে, ঘাড়টা ঘুরিয়ে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে আর চারপাশ বুঝার চেষ্টা করছে। যেন ৫/৬ বছরের  শিশুর মতন। রত্না আরেকটু ভাল ভাবে খেয়াল করে দেখলো  ছেলেটি আর কেউ নয়। এই সেই তার ভোলাভালা স্বামীপ্রবর -  আবিদুর। সেই ২৭ বছর আগের সংসার যাত্রা শুরু করেছিল যার হাত ধরে। সেই আবিদুর, এই গাড়িতে বসে আছে। আরো ইয়ং লুকিং হয়েছে। ৩০ বছর পর মনে হচ্ছে  বয়স তার আরো কমে ২০/২২ বছরে ঠেকেছে । তখনই তো ছিল ত্রিশ। এখন ৫৭ হবার কথা তা হলে। কিন্তু  এতো বয়সে আরোও শিশু সুলভ নির্মল সাধাসিধে ভাব এসেছে চেহারায়।
খ্যাট -খ্যাটা মেজাজের লোকটা মনে হয় আবিদুরকে দেখা শোনা করে। 
ঘটনাগুলো যে রত্নার জন্যই এত দ্রুত ঘটছে এমন ভাবার তো কারণ নেই। 
কিন্ত গাড়িতে আবিদুর কেন উপবিষ্ট?
এ সকল দৃশ্য কেন রত্নার সামনে ঘটে চলছে? - আচমকা ঝড়ের সূত্রপাত। তারপর ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও এই স্থানে এসে আশ্রয় নেয়া। একা নয় । সকল পথচারীদের সাথে – সেই ব্যাংকের বারান্দায় যেখানে সাদা গাড়ি এসে থামবে। গাড়ি থেকে কেউ কথা বলবে রত্নার সাথে গায়ে গাড়ি উঠানোর ব্যাপারে। রত্না আরো মনোযোগী হয়ে দেখবে গাড়িতে কে আছে? জানালার কাঁচ খোলা বলে দেখাটা স্পষ্ট হবে। সেই গাড়ি যে কিনা আবিদুরকে নিয়ে এসেছে এখানে।

আবার প্রশ্ন এলো মনে, বিষয়গুলো কি রত্নার জন্যই ঘটেছে? 
কিন্তু কেন? 
আজ ২৭ বছর পর কার ইচ্ছা হলো আবিদুরের হাল হকিকত রত্নাকে  দেখাবার? 
আবারো সেই প্রশ্ন - কেন? 
রত্নার তো সেই সব দিন অনেক আগেই গত। রত্না কোন রকমে প্রতারক ঐ পরিবার থেকে প্রাণটা নিয়ে ফেরত চলে আসার পর আবিদুর তো এই মুখী হয়নি। আবিদুর কে তার বাবা  যা বুঝিয়েছে সে তাই বুঝেছে। মানসিক প্রতিবন্ধী আবিদুরের স্মৃতি তো তার মাথায় বেশিক্ষণ স্থায়ী হওয়ার কথা না। সে অবস্থায় তারা থাকেও না। তাদের মস্তিষ্কের গঠণ আলাদা। 

তার বাবা যদি তাকে বলে ‘সব ভুলে যাও’, সে ঠিকঠিক ভুলে যাবে। রত্নার জায়গায় আবিদুরের বাবা পরবর্তীতে তার জন্য হীরা, মুক্তা, পান্নার থেকেও ভাল ভাল বৌ এনে দেবে। আবিদুর তাতেই খুশী হবে।   
তাহলে এত বছর পর রত্নার সামনে প্রকৃতি কেন এই ঝড়ের সূচনা করলো? 
বড্ড রসিক অথবা বলবো, বড্ড বেরসিক এই প্রকৃতি। রত্নার সাথে সে বিদ্রূপ করতে ছাড়েনি।  রত্নার  ঘাড়ে মানসিক ভারসাম্যহীন, প্রতিবন্ধী একজনকে চাপিয়ে দিয়ে, প্রকৃতি সেই নির্মম প্রহসন কেন করেছিল  রত্না তা আজও জানে না। 
আর আজকে?  
ভীড়ের মাঝে রত্নার ঘাড়েই এসে পড়লো গাড়িটা! আর জায়গা ছিল না? সময়টাও কি সুন্দর মিলে গেছে। 
ঝড়ে বক মরে,ফকিরের কেরামতি বাড়ে। পক্ষান্তরে কাকে দেখাবার জন্য এ ঝড় বৃষ্টির কেরামতি? 
ঝড় এলো। 
ঝড়ে বকও মরলো আর ফকির কেরামতি করে রত্নাকে ‘আবিদুর দর্শন’ করিয়ে দিল। 
রত্না না চাইলেও প্রকৃতির উপর তো তার হাত নাই।
..............
২৮/১১/২০২৫ 
 

অন্যান্য গল্পঃ বাবা ছেলের এক রা
বিয়ে বাড়ির তত্ত্ব
লিজার্ড প্রফেসর ২of ২
শ্বশুর যার খালু  
অম্বা যখন ননাস
কাঠির কোপ

পূর্ণতা প্রাপ্তি – Manifestation


ইচ্ছার পূর্ণতা প্রাপ্তি।

scenario টা এমন যেখানে দেয়াল জুড়ে বিশাল জানালা। interior চমৎকার। সিটগুলো মুখোমুখি। খুব ক্ষীন ভাবে ট্রেনের ঝিকঝিক শুনা যায়। দেশের মত প্রকট না। কারণ সাউন্ড প্রুফ করা হয়তো বা কামরাগুলো। প্রতিবার যখনই এই এক জেলা শহর থেকে অন্য জেলা শহরে ভ্রমণ  ট্রেনে ভ্রমণ করি মনে মনে ভাবি সামনে তুমি বসে আছো। 

কিন্তু এই ভাবনা যে  বাস্তবে পূর্ণতা প্রাপ্তি পাবে তা কি জানতাম?

সেদিন আসছি রাত ৯টার আন্ডারগ্রাউন্ড ট্রেনে। টরোন্টো শহরের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। তার পাশ ঘেঁষে বয়ে চলেছে অন্টারিও লেক। সেখানে আমার বাড়ি।ট্রেনে  পৌঁছাতে লাগবে ১ ঘন্টা। এইসব ট্রেনের কামরা সাউন্ড প্রুফ না। জানালাগুলোও তেমন বড় না। চাকার সাথে রেল ট্র্যাকের সংঘর্ষে  প্রচণ্ড শব্দ তৈরী হয় যা, কানের ভেতর ভোঁ ভোঁ করে উঠছে প্রায়ই। এ শব্দ  সুস্থ মানুষকে বধির করে দেবার জন্য যথেষ্ট।   

শীতের রাত না হলেও শীত আসন্ন । টরোন্টো শহর যেখানে রাত ৮টায় ঘুমিয়ে পড়ে সেখানে রাত ৯টায় আমার ট্রেন জার্নিটা বেশ রাতে হচ্ছে বলা চলে। এখন সেপ্টেম্বর মাস। শরতের বাতাসের ঝাপটা আর ঝলমলে দিন এবং ঝকঝকে রাতের পরিষ্কার আকাশ মনকে সবসময় ফুরফুরে রাখে। 

ট্রেনের কামরায় প্রবেশ করেই দেখলাম চেয়ারগুলো L – shaped. একদিকে বসলে অন্যজনকে L এর কোণাকুনি বরাবর দেখা যায়। সিটে বসেই সামনে তাকিয়ে দেখি আমার সেই বন্ধুটি। জুয়েল। যাকে আমি কল্পনা করি আমার সাথে সবসময়, যখনি ট্রেন জার্নি করি। শুধুমাত্র ট্রেন যাত্রায়। অন্য সময় এত মিস করি না ওকে। কিন্ত এখন যে জুয়েল আমার সামনে বসা!

কিভাবে সম্ভব?

এখানে তো সে থাকে না।

আজ সেপ্টেম্বরের ১৮ তারিখ। ২০২৫

তার আসবার কথা না টরোন্টোতে। আসলে আমি তো জানতাম। 

তাহলে ও যদি নাই –ই  হয়, তাহলে এ কে?

একদম সেই চেহারা। ফার্স্ট ইয়ারে যেমন দেখেছিলাম। বর্তমানে যে তার খুব একটা পরিবর্তন হয়েছে তা নয়। কিন্তু সেই ১৯৯১ সাকলেরই তো চেহারায় ১৮/১৯ এর ছাপ ছিল। এই  ছেলেটিরও তাই।

বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম। 

দেখলাম। 

সে তার গান শোনায় নিমগ্ন। ইচ্ছে করলো, যে বলি, ‘আপনার একটি ছবি তুলতে পারি? আপনাকে আমার একজন বন্ধুর সাথে খুব মিল পাচ্ছি।’ 

তারপর মনে হলো, না থাক। 

এক ঘন্টার পথ। দীর্ঘ পথ পরিভ্রমণ যেন একসাথে আজ জুয়েলের সাথে।

কিভাবে সম্ভব? 

এ যে জুয়েলের সেই ছোটবেলা যে আমার সামনে বসা । 

পাক্কা একটি ঘন্টা ধরে ট্রেনে বসে আমি তার সাথে। আমাকে চেনে না সে। চিনলে তো তাকাতো। কিন্তু আমি যে চিনি। আজ  আমার সামনেই  সেই বন্ধুটি আমার। যাকে মনে মনে চাইতাম আমার সাথে ট্রেন যাত্রার সঙ্গী হোক। দূর পথের ভ্রমন হলেই কেন জানি তাকে মনে পড়ে। 

আজ আমার চাওয়ার, আমার ইচ্ছার Manifestation হলো। প্রকৃতি যেন আমার প্রাণের বন্ধুটিকে এনে হাজির করেছে আমার সামনে।  আমার মনের ইচ্ছা আজ পূর্ণতায় প্রাপ্ত হলো। 

২০.০৯.২০২৫


বেঁচে থাকার শুরু


জানালার পাশে বসে ভাবছিল কিভাবে ভালবাসাহীন জীবন কাটিয়ে দিল সুবর্ণা। সেই কিশোরী বয়স থেকেই কানায় কানায় ভরে উঠেছিল সৌন্দর্য। কাটাকাটা চেহারায় চিবুকের ধার, বাদামী চোখ, বাদামী লাল চুলের বাঁধনহারা এলোমেলো ভাব, অপ্রতিরোধ্য কামনায় ভরা একটা ইনোসেন্ট মন, যে কিনা অবুঝ, চঞ্চলা, মোহনীয় সৌন্দর্য্য স্কুলে থাকতে ইঙ্গিত দিতে শুরু করে তার শরীরে। কলেজে এসে সে বাঁধ ভেঙ্গে আছড়ে পড়ে। জীবনটা খুব সুন্দর ভাবে সাবলীল ভাবে কেটে যাবে এমনই তো চেয়েছিল সুবর্ণা। এমন সময়ে নায়ক চেহারারতি স্মার্ট, ধনাঢ্য পরিবারের পুত্রটি যখন এগিয়ে এলো, প্রস্তাব নিয়ে তখন আর ঠেকায় কে?

বাবা মায়ের ইচ্ছায় জীবনের অন্য একটি অধ্যায় বরণ করে নিতে হলো, বোধশক্তি হবার আগেই, জীবনকে উপলব্ধি করার আগেই। বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণাহীন একটা কিশোরী বরণ করে নিল দ্বিগুন বয়সী প্রবাসী এক অচেনা মানুষকে জীবন সঙ্গী হিসাবে। 

চলার পথে হাত ধরে থাকবে যে সবসময়, এরকম প্রতিশ্রুতিই হয়েছে। প্রতিশ্রুতি ছেলেটি দেয়নি। কন্ট্রাক্ট মানে বিয়ের শর্তে তো, তাই –ই বোঝায়। 

সুবর্ণা অতসত বুঝে না। বিয়ে কি। বিয়ের শর্ত কি। 

বিয়ে হয়েছে, লোকটির সাথে থাকতে হবে, সংসার করতে হবে এমনি তো জীবন। এমনই  হয়তো বা। নাকি তা না। তাও সে জানে না।

সে জানে না জীবন কাকে বলে। 

অতিরিক্ত সুরক্ষিত জীবন যাপনে  অভ্যস্ত সুবর্ণা এ-ও জানে না ভাল লাগা , বোঝাপড়া কি জিনিস। 

স্বামী নামক একটা জিনিস ঘরে প্রবেশ করলো, অধিকার স্থাপন করলো, সন্তান জন্ম হলো, এই –ই বোধহয় জীবন। বোঝাপড়া, সুখ, ভালবাসা কখনো আর দেখা দিলো না। বরংচ নেমে এলো স্বামী নামক সেই লোকটির মেজাজ, খটমটে ব্যবহার আর মারপিটের রিহার্সেল। বড় সন্তানটি তখন একটু বড়ই বলা চলে। কন্যা তো বাবার বুকের ধন হবার কথা। কিন্তু এই বাবা যে অন্যরকম। কন্যার উপর চড়াও, স্ত্রীর উপরে চড়াও আর বাইরে গিয়ে হাসিমুখে সামাজিকতা দেখানো – সর্ব বিষয়ে অভিনয়ে পারদর্শী লোকটা একদিন ঋণের ভারে জর্জরিত হয়ে হঠাৎ কোথায় জানি উধাও হয়ে গেল। 

সুবর্ণা বুঝে পায় না, আরো ৮/১০ টা সংসার কি এভাবেই চলে?

আসলে সংসার কি জিনিস ? এত দিনেও তো বুঝলো না। 

সংসার মানে কি আশান্তি?  

ঘর যে সুখের নীড় –এমন একটা কথা কোথাও শুনেছিল। আর এখন  সে এসবের  অর্থ কিছুই বোধগম্য করতে পারে না। ভালবাসার স্পর্শ তো সে জীবনে পায়নি। ভালো ব্যবহারটুকুও না। স্বামীর সাথে থেকে দীর্ঘ ২০ বছরে শুধু জেনেছে, তার কোন কিছু পাবার অধিকার নেই। কারণ তার গুন নেই। সে যে কুৎসিত, সে যে বোকা, সে যে অপদার্থ। নিজের প্রতি কনফিডেন্স হারিয়ে, তাই আজ সে নিঃস্ব। 

কলেজের বন্ধুরা সেই আগের মতোই তাকে ভালবাসে। রাজীব যেন শূণ্যতা পূরণ করে দিয়েছে সবটুকু। স্বামীটি উধাও হবার পর থেকেই রাজীব তার পাশে পাশে সারাক্ষণ। মধ্যবয়সে জীবনের এ পর্যায়ে এসে সুবর্ণা আজ বুঝতে পেরেছে ভালোলাগা কি জিনিস, বোঝাপড়া কাকে বলে, মনের মানুষকে মন দেয়াতে কেমন লাগে। রাজীব ওকে শিখিয়েছে। 

বিশ বছর পর যোগাযোগ, কিন্তু তার অপূর্ণতা পূরণে রাজীবের বিশ সেকেন্ড সময় লাগে নি। । আজ সুবর্ণা বুঝতে পেরেছে কি অর্থহীন, ভালবাসাহীন সময়টুকু সে পার করেছে এতদিন।  ভালোই যাকে বাসেনি, তার সাথে হলো সংসার। দুটি ফুটফুটে সন্তান। 

এ কেমন জীবন? 

আর বোঝাপড়া, মন দেয়া নেয়া হলো যার সাথে তার আগমন তো এই হলো মাত্র। তার যে আর সময় নেই। সুবর্ণার এখন অজস্র সময় কিন্তু রাজীবের যে ভীষণ ব্যস্ততা। রাজীবের সময়  আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা  । রাজীবের জীবন  তার কমিট্মেন্ট দিয়ে ভরা তার পরিবারের প্রতি। তার স্ত্রী, তার কন্যা, তার  বোন সকলকে নিয়ে তার দায়িত্ব। পরিবার তার অগ্রাধিকার। মনে যাই থাকুক, ক্ষুধা, তৃষ্ণা সব অগ্রাহ্য করে দায়িত্ব সে পূরণ করবে। কারণ পরিবার  তার priority.

সুবর্ণাকে ভালো লাগতো কলেজে থাকতে। সুন্দরী মেয়েটি সুন্দর মেয়েও ছিল। যার মন এত সুন্দর তার কাছে গেলেই রাজীবের মনে হতো সাক্ষাত স্বর্গের অপ্সরা। এস্টাব্লিশড্ পাত্র দেখে সুবর্ণাকে বিয়ে দিল যখন, তখন  সেটা তো  মেনে নিতেই হবে।  কারণ তার তো এস্টাব্লিশড্ হতে অনেক অনেক দেরী।

এই দেরীও একদিন যে শেষ হয়ে জীবনের চলার পথে দুজন আবার মুখোমুখি দাঁড়াবে, রাজীব বা সুবর্ণা  তা কখনোই ভাবেনি। সোস্যাল মিডিয়ার যুগে দূরত্ব তো একটা ক্লিক মাত্র। সুবর্ণা তো তাই এত কাছে চলে এসেছে। তার স্বপ্নেরে অপ্সরা। সুবর্ণাকে ছুঁয়ে প্রাণ ফেরৎ এনেছে সে। সুবর্ণা বেঁচে উঠেছে।সুবর্ণ আলোয় সে আরো প্রাণময় হয়েছে।

 কলেজের উচ্ছ্বলতা নেই, সময়ের সাথে সাথে ধীরতা এসে গেছে অনেকটা। কিন্তু মনের তো একটু ও পরিবর্তন হয়নি। সেই পুরোনো কলেজের সহপাঠী আজো তেমনি রয়ে গেছে। মাঝ দিয়ে অতিক্রান্ত হয়েছে ২০টি বছর।

সুবর্ণাকে হাত দিয়ে স্পর্শ করতে পারেনি রাজীব। কিন্তু মনের পরশে তাকে জাগিয়ে তুলেছে। তাই আজ সুবর্ণা ভাবে ভালোবাসাহীন জীবন কি রকম একটা জীবন? যাকে ভালীবাসা সম্ভব হয়নি তাকে নিয়ে জীবনটা কাটিয়ে দিলাম। 

কিভাবে?

এতগুলো বছর এরকম মায়াহীন এক সংসারে। একটা দিনও প্রেম, আদর, স্নেহের পরশ তো জুটেনি। সংসারে আয় উন্নতি হয়নি। সন্তানরা হয়েছে ভুক্তভোগী। মা নিজেই তার ঘরে অরক্ষিত, বাবার দানবীয় আচরণে  সন্তানরা ভীত সন্ত্রস্ত । আশান্তিতে ভরা এ ঘর নরকের মতো। সেখানে কোথায় সুখ, কোথায় শান্তি।ভালোবাসা তো অলীক কল্পনা।

জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে সুবর্ণা । দূরের মেঠোপথ পেরিয়ে ট্রেন ছুটে চলছে তার গন্তব্যে। জীবনের পড়ন্ত বেলায় একাকী পথ ভ্রমন । শহর পেরিয়ে চলে যাবে অনেক দূরে লোকালয়হীন কোন প্রান্তরে। বেলা শেষে দেখবে গোধূলী, পরের দিনের সূর্যোদয়। ভালবাসবে  আপনাকে। 

আজ সে বুঝেছে নিজেকে নিজেরই ভালবাসতে হয়। প্রেম বলে কিছু থাকলেও তা আগে নিজের সাথে নিজের। তারপর হবে  প্রেমিকের আগমন সেই কল্পলোক থেকে। আজ সে বুঝেছে জীবন তার নতুন অধ্যায় নিয়ে তার সামনে এসে  দাঁড়িয়েছে। এবার তার বেঁচে থাকা অনেক্টুকু স্বপ্নলোকের রাজকন্যার মতন। অনেকখানি সুখ আর ভালোবাসার স্পর্শে। এই স্পর্শটুকু সে নিজেই গড়বে, নিজেই প্রস্তুত করে নিজেকে অর্পণ করবে। 

এখন থেকে তার বেঁচে থাকার শুরু। মৃত্যুর সমাপ্তি।    

.........।।

৩/১২/২০২৫

ব্লগে আমার ১৮ বছর পূর্তি

এমনি একদিন  ২০০৭ । অনলাইন   একটি ই- ম্যাগাজিন সম্পাদনার কাজ করি। অবনী অনার্য  পাকা লেখক। তার থেকে লেখা নিয়ে আমার ই- ম্যাগাজিন সমৃদ্ধ। যার  হ...