১
বিল্লু নয়। বিলি।
ওর নাম বিলি। ইংরেজী কায়দায় উইলিয়ামকে আদর করে বলে উইলি। আর তারই সংক্ষিপ্ত রূপ বিলি। বিলির সাথে পরিচয় অনার্সের দ্বিতীয় বর্ষে এসে।সামনা সামনি কখনো দেখা হয়নি তার আগে। যত গল্প তাকে নিয়ে তা তার ছোট বোনের কাছ থেকে শোনা। বিলি আর তার বোন পিঠাপিঠি। তাই তারা একে আরেকজনের বড়ই নিকট। ভীষণ কাছের। সারাক্ষণ ভাইয়ের গল্প শুনতে শুনতে বিলি, ক্রিস্টিরও বেশ আপন হয়ে গিয়েছিল। তার ছোটখাটো দুষ্টুমি, ভাল লাগা,না লাগা বা বোনের সাথে খুনসুটি কিছুই ক্রিস্টির অজানা ছিল না। আর সেই থেকে বিলি, ক্রিস্টির খুব চেনা হয়ে উঠলো।অজান্তে খুব নিজের হয়ে গেল। না দেখলেও অনেকটা কাছের হয়ে গেল।
বোনটি একদিন ক্লাশে অনুপস্থিত থাকাতে তার এই ভাইটিকে পাঠালো ক্রিস্টির কাছ থেকে একটি বই সংগ্রহ করার জন্য।ক্রিস্টি ক্লাশ শেষে সামনের লনে ঘোরাঘুরি করছিল। কখনো তো সে বিলিকে আগে দেখেনি, আর তখন তো ফেসবুক, মেসেঞ্জার ছিল না যে ছবি দেখে চিনে রাখবে,সেরকম বিলিও কখনো ক্রিস্টিকে দেখেনি, তাই চেনবার প্রশ্নই উঠেনা।সারা মাঠে ঘুরে ফিরে, খুঁজে ফিরে তাই ক্রিস্টিকে না পেয়ে ক্লাশের অন্য পরিচিত একজনকে জিজ্ঞাসা করলো ক্রিস্টির নাম ধরে, কোথায় সে।আর ক্রিস্টি দেখল সেই একজনা কাকে যেন, কোন অপরিচিত জনকে যেন আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে আর বলে দিচ্ছে ঐ যে ক্রিস্টি। বিলি এসে এবার ওর সামনে দাঁড়ালো। টুকটুকে লাল ফর্শা মুখ, আর হালকা গোলাপী ঠোঁটে মায়াময় অভিব্যক্তির একজন দাঁড়িয়ে আছে সামনে। কি যে সন্দর সেই মানুষটি।এত সুদর্শন!
এত সুদর্শন, মানুষ হয় কিভাবে?
অবাক হয়ে চেয়ে রইলো ক্রিস্টি।সে পরিচয় দিয়েই বললো, আজ তার বড্ড তাড়া। তার ক্লাশের সময় হয়ে এসেছে। এক্ষুণি চলে যাবে বইটা নিয়ে। গল্প করার তেমন সুযোগ নেই আজ । কিন্তু সাক্ষাতের এই সূচনার মাধ্যমেই তাদের প্রথম পরিচয়ের পর্বটি সম্পন্ন হলো। তখন কি ক্রিস্টি জানতো এই মানুষটি একদিন তার চলার পথের সঙ্গী হবে। পরবর্তীতে যেদিন এই স্বজন ক্রিস্টিরর সুজনে পরিণত হলো, সেদিনও বিলি প্রথম সাক্ষাতের তাড়াহুড়ো পর্বটি স্মরণ করেছিল। মনে রেখেছিল তার সেদিনের তাড়াহুড়ো করে চলে যাবার কথা।যখন সে চলে গেল তখন ক্রিস্টির খুব একটা অবাক লাগেনি, আসলে ক্রিস্টির খুব ভাল লেগেছিল। আর অচেনা বিলি কেনই বা সময় ক্ষেপণ করে তার সাথে গল্প শুরু করে দেবে? কোন্ প্রসংগেই বা কথা বলবে? গল্প করার মতো কোন বিষয়বস্তুই তো তাদের কাছে ‘কমন’ ছিল না।ছিল শুধুমাত্র সেই মুহূর্তে ক্রিস্ট্রির বন্ধুর বইটি তার কাছে হস্তান্তর করা।
সেদিনের পর প্রায়ই ক্রিস্টি তার বন্ধুর কাছে তার ভাইয়ের কথা জানতে চাইতো। মাঝে কেটে গেল আরো দু’বৎসর। ১৯৯৫ সাল। অনার্স তখন শেষ করে এম.এ. ফাইনাল ইয়ার শুরু হয়েছে। ক্রিস্টি তার বন্ধুটির বাসায় ফোন করে টুকটাক গল্প প্রায়ই করে।
একদিন বিলি তার বোনের কাছ থেকে ফোন কেড়ে নিয়ে ক্রিস্টির সাথে হঠাৎ করেই গল্প শুরু করলো।আর সেটাই ছিল তাদের প্রথম গল্প করার দিন।
কারণ?
কারণ তখন তারা দু’জনাই দু’জনার পরিচিত। ঐ যে দু’বছর আগে ডিপার্টমেন্টের সামনের মাঠে দু’জনার দেখা হয়েছিল।
ফোনে কথা বলার সেদিনের সময়টা ছিল সন্ধ্যাবেলা। কথা শুরু হলেও শেষ যেন হতে চায় না।এমন ভাব যেন এই দুই বছরের কথা এক সন্ধ্যায় জেনে নিতে মন চাইছে। তখন ক্রিস্টির বন্ধুটি আর আশপাশে উপস্থিত নেই। ভাইকে ফোন দিয়ে সে উধাও।
পর্দা থেকে মূল চরিত্র উধাও হলে পার্শ্বচরিত্রের উপস্থিতি যখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে, এক্ষেত্রে হয়ে উঠলো একদম তার উল্টো।ক্রিস্টির বান্ধবীটি যে কিনা ছিল ক্রিস্টি আর বিলির বন্ধুত্বের যোগসূত্র সে -ই অবশেষে সূত্র ছিন্ন করে দিব্যই উধাও!।মাঝখান থেকে পড়ে রইলো তারা দুজন একপাশে।সেই একপাশে পড়ে থাকা থেকেই শুরু হলো তাদের পথ চলা –পাশাপাশি । অত অজস্র অজস্র কথা আর অজস্র ভাবনাগুলো তারা জানাতো একে অপরকে। প্রতি সন্ধ্যায় অফিস শেষে বিলি ফোন করতো। আর তার ফোন কল আসার অপেক্ষায় ক্রিস্টির সারাদিন কেটে যেত।বিলির, আর কারোর সঙ্গে কথা বলার সময় না হলেও ক্রিস্টির সাথে কথা বলতেই হতো, আর তখনই তার মুখটা টকটকে লাল হয়ে যেত। বন্ধুরা তার রক্তিম আভার চ্ছ্বটা দেখেই বুঝতো বিলির ফোনের অপর প্রান্তে নিশ্চিত ক্রিস্টি।
কথার মালা গেঁথে গেঁথে ওর ধ্যানে জ্ঞানে সারাক্ষণ শুরু হলো ক্রিস্টিরই আরাধনা। ক্রিস্টিরও অবস্থা একই রকম। তাই একদিন ভাবনায় এলো আর ফোনে কথা নয়, এবার দেখা করবে তার বাইরে কোথাও। দু’বাড়ির মাঝামাঝি কোন এক রেস্টুরেন্টে। সেভাবেই দেখা করার কথা বললো ক্রিস্টি তাকে। সুদর্শন, সৌম্য, সুপুরুষ বন্ধুটি সেদিন এলো দেখা করতে। ক্রিস্টি একটু আগেই পৌঁছেছিল। তার আসার পথের দিকে চেয়েছিল। আগ্রহ ভরে তাকিয়ে ছিল আর ভাবছিল ঐ প্রবেশ পথের দরোজা দিয়ে যখন বিলি প্রথম পদার্পণ করবে তখন তাকে দেখে তার কেমন লাগবে, তাকে কেমনই দেখতে লাগবে?
এলোও সেই মুহূর্ত এক সময়ে বাস্তব হয়ে।
বিলি এলো।
খুব দ্রুত পদক্ষেপে প্রবেশ করলো ডাইনিং হলে। ক্রিস্টিকে খুঁজে পেতে সময় লাগলো না তার। তাকে তার চোখে পরে গেল একটুতেই।কারোন হয়তো বা ক্রিস্টি বসেছিল দরোজা বরাবর। বা অন্য কিছু।
কি সুন্দর হাসি।
গোলাপী ঠোঁটে, গোলাপী মুখে দুষ্টু দুষ্ট হাসি।
এরপর শুরু হলো তাদের গল্প করার পর্ব।
আজ যেন তারা দুজন, জীবনের সব কথা বলে ফেলবে।বলেও ছিল সব কথা।দু’জনের যত কথা ছিল সবই।মাঝে ওয়েটারকে ডেকে ক্রিস্টি অর্ডার দিল চিকেন পাকোড়া। ঐ সময়টা উইলিয়াম খুব নিবিড় ভাবে দেখছিল ক্রিস্টিকে, বেশ অনেকক্ষণ।
অপেক্ষার পালা শেষ হলে টেবিলে এলো চিকেন পাকোড়া। গরম গরম পাকোড়াতে একটা করে কামড় আর একটু একটু করে কথা।ক্রিস্টি মনে বাজছে একখানা সুর, ‘আমরা আমাদের মনের কথা আজ বলব দু’জন দু’জনাকে।।’ ক্রিস্টির কথার মাঝে মাঝে তার কথা আবার ক্রিস্টির কথা’
কিভাবে ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে গেল টের পেল না ওরা।সন্ধ্যা শেষে রাত তখন ঘনিয়ে এসেছে। যাবার প্রস্তুতি। গল্পের সমাপ্তি টানা এবং বিল পরিশোধের জন্য ওয়েটারকে ডাকা।শেষ বেলায় ওয়েটার এসে বিলটা সামনে রাখলো। বিলি তাকিয়ে রইলো বিলের দিকে। একটু আয়েশী হেলানের ভঙ্গীতে। ক্রিস্টি বিলের বইটা এগিয়ে নিল তার দিকে।
তখন উইলি বলল, ‘আমি দিই?’
ক্রিস্টি বললো, ‘নাহ্ আমি।’
ক্রিস্টি বিল পরিশোধ করলো।সে টের পেল, বিলি যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল মনে মনে।
তারপর?
তারপর দু’জনে রওনা দিল হল-ওয়ের দিকে।পাশাপাশি হেঁটে টানা বারান্দা পার হয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়ালো।
অনেক কথার পর এবার বিদায় নেবার পালা।
তারপর যে যার বাড়ীর পথে। ক্রিস্টি আগেই শুনেছিলো বিলি বড্ড হিসেবী।
২
অনেক দিনের চেনা না হলেও বেশ কিছুদিন হলো ক্রিস্টির পরিচয় হয়েছে লাল্টুর সাথে।গাল দুটোতে লালচে আভায় ভরা শিশুর সরলতা নিয়ে লাল্টু চলছে সবসময়।একদিন ক্রিস্টি দেখা করতে সম্মত হলো তার সাথে একটি নামকরা রেস্টুরেন্তে। স্বল্পভাষী, ভদ্র, নম্র, অমায়িক এই ছেলেটির আতিথেয়তা কেমন হবে ভেবে ভেবে ক্রিস্টি অস্থির সারাদিন।বিকেল হলে এলো সেই দেখা করার মুহূর্তটি। দু’জন প্রায় একই সময়ে হাজির হল তাদের সেই কাংখিত জায়গাটিতে। এ টেবিল নয়, সে টেবিল নয় করে দু’জন পছন্দ করলো বসবার মতন একটু স্থান, একটু ভেতরের দিকে, লোকজনের আনাগোণা যেখানে একটু কম। অত্যন্ত অমায়িক আর অদ্ভুত রকমের শান্ত এই ছেলেটিকে খুব মায়া ভরা কন্ঠে ক্রিস্টি জিজ্ঞাসা করলো, ‘কেমন আছো?’
তার বাঁ হাতটা থুতনির কাছে নিয়ে খুব নরম গলায় বললো, ‘ভাল।’
কি মধুর মত নরম কন্ঠ। ভাল মানে ভীষণ ভাল লাগার মত ভাল।
তা এবার কি অর্ডার দেয়া যায় মেন্যু খুলে তারই চেষ্টা। লাল্টুর পছন্দ স্যান্ডউইচ। সুতরাং দু’জনের জন্য দুটো স্যান্ডউইচ। টুকটাক কথা আর তার পছন্দের ইন্সট্রুমেন্টাল মিউজিকের কথা শুনতে শুনতে খাবার এসে হাজির হল।
ইন্সট্রুমেন্টাল মিউজিক কেন? যেন কোনো গায়কের নাম না বলতে হয়! একটা বলতে গিয়ে অন্যটা আবার গুলিয়ে ফেলবে এই ভয়ে হয়তো বা লাল্টুর এই পছন্দ। কে জানে!
ভীষণ নরম ভাবে কথা বলে লাল্টু। একটু লাজুকতাও আছে। তার নরম ভাবসাবে মন ভরে যায়। মনে হয় এমন একটা বন্ধু জোটা আজকালকার বেয়াদবদের ভিড়ে এক প্রকার সৌভাগ্য বটে। আজককাল যে ভাল মানুষের বড় অভাব।তাই লাল্টুর সাক্ষাৎ পাওয়ায় নিজেকে বেশ সুখি সুখী মনে হচ্ছিল ক্রিস্টির। আর সেদিনের সাক্ষাতে তার সাথে কথা বলতে গিয়ে থেমে থেমে তার কোমলতা দেখতে দেখতে, সময়ের হিসাব তো হারিয়েই ফেলেছিল ক্রিস্টিন। টেবিলে খাবার এসে না পৌঁছালে সময়ের আরও হিসাব থাকতো না।
এর মধ্যাই পিছনের টেবিলে এসে বসলো কাকাতুয়া ঝুটির এক আধুনিকা রমণী। যেন জেনেই এসেছে যে লাল্টু আজ এখানে থাকবে। বাবা রে বাবা,কি চিলের মতন চোখ লাল্টুর দিকে! মনে হচ্ছে চোখ দিয়েই লাল্টুকে নজরদারি করছে। তাকে ফলো করে করে এতদূর।
আধুনিকা হলুদ কাকাতুয়া কোন খাবার অর্ডার দিল না। অথচ স্যান্ডউইচ তৈরীতে এই রেস্টুরেন্ট খুব নামকরা। এই দোকানটা শহরের এক কোণায় হলেও তাদের পারদর্শীর্তার নাম মুখে মুখে। আর স্যান্ডউইচের ভেতরের মেয়নেজের পরত তখন তাদের দু’জনের মুখে মুখে। মেয়নেজের মাখামাখিতে কথা বলায় স্বল্প বিরতি, অতঃপর খাবার শেষের প্রস্তুতি। এর মাঝেই যেন কোথা হতে টুক করে বিলটা রেখে চলে গেল ওয়েটার। ক্রিস্টি বিলের বইটা এগিয়ে নিল।ব্যাগ খুলে টাকা বের করে বিল-বইয়ের ভাঁজে রাখতে গিয়ে ক্রিস্টি লক্ষ্য করলো লাল্টু তার চেয়ারে বসে বেশ ইতস্তত করছে। একবার ডান দিকে বেঁকে আবার বাঁ দিকে মুচড়ে তার মেজ বোনকে কি যেন বলার চেষ্টা করছে। পরে তার বোন এসে যোগ দিয়েছিল তাদের টেবিলে।তার ইতিস্ততা দেখে ক্রিস্টি ভাবলো পুরুষটারই যে বিল পরিশোধ করা ভদ্রতার আওতায় পড়ে তা জানে বোধহয় লাল্টু। তাই তার এই ইতস্ততা। না পারছে কইতে না পারছে সইতে।কিন্তু তার এত্ত মুচড়ানি দেখে ক্রিস্টি ভাবলো এই বুঝি লাল্টু বলে বসবে, ‘বিলটা আমি দেব।’
কিন্তু না!
তার কোন লক্ষণই পরবর্তী মুহূর্তগুলোতে প্রকাশিত হলো না। বরাবরের মত তার বাঁ হাত টেবিলে ঠ্যাস দিয়ে রেখে থুতনির অংশটুকু সেই হাতের ওপর রেখে গোবেচারার মতন তাকিয়ে রইলো বিল বইয়ের যাত্রাপথে।
ওয়েটার এসে বিলটি নিয়ে যাবার পরপরই তারা দুজন উঠে দাঁড়ালো। অবাক হয়ে ক্রিস্টি দেখল ঠিক পেছনের টেবিলের সেই কাকাতুয়া ঝুটির হলুদ পাখিটিও সকল দন্ত বিকশিত করে বিস্ফারিত নেত্রে ক্রিস্টির বদনখানি খুব একটা গভীর ভাবে না হলেও, বেশ ধারালো ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তার সামনে আসলেই কোন খাবার দাবারের আয়জন নেই। এমনিই এসেছিল? আবার তাদের প্রস্থানপূর্বক বিল দেয়া পর্যন্ত সকল সময়টুকু তাদেরকয়েই দেখছিল।
কেন?
স্পাই নাকি?
কার স্পাই?
লাল্টুর স্পাই?
লাল্টু কি, বন্ড 007?
যথারীতি কথা শেষে লাল্টু আর ক্রিস্টি রেস্টুরেন্টের বাইরে চলে এলো। হলুদ পাখি অনতিদুরে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলো। লাল্টু অত্যন্ত অমায়িক স্বরে, মুগ্ধ করার মতো কোমল কন্ঠে, তার সরলতা দেখিয়ে বিদায় নিল।
হলুদ কাকাতুয়া তবুও দাঁড়িয়েই রইলো।
কে, জানে কেন সে ওখানে ছিল। দেখবার জন্য, যে ‘বিলটা কে দেয়!’
৩
ক্রিস্টির পরম প্রিয় বন্ধুর নাম গুট্টু। গোল মুখায়বের ছোটখাটো গোলগাল এই বন্ধুটি অত্যন্ত সুকন্ঠের অধিকারী। ভরাট কন্ঠে তার ডাক, বা তার আকুতি বা তার কথাগুলো ক্রিস্টিকে সবসময়ই মোহাচ্ছন্ন করে রাখে। কিন্তু এভাবে অনলাইনে বা রেকর্ডেড কন্ঠ শুনে আর কতদিন? মন চায় গুট্টুকে দেখতে। তার সাথে মুখোমুখই কথা বলতে। তার পৌরুষদীপ্ত কন্ঠ শুনতে, তার সাথে কোথাও ঘুরতে যেতে। একদিন সত্যি সত্যি তাদের ইচ্ছে যেন বাস্তবে রূপ নিল।গুট্টু এলো সাত সমুদ্র তের নদী পার হয়ে ক্রিস্টির কাছে,তার সাথে দেখা করতে। বাসার কাছাকাছি একটি রেস্টুরেন্টে দেখা করার জন্য প্রস্তুত হল তারা। দুজনেরই মনের ভেতর যেমন আনন্দ তেমন-ই টেনশান। প্রথম দেখা হতে যাচ্ছে সামনা সামনি। রাস্তাঘাটের যে অবস্থা , অবশেষে ঠিক সময়েই পৌঁছে গেল সে গুট্টুর গন্তব্যস্থলে। রিসেপশান থেকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে তাকে অতিথি আগমণের কথা।তারপর নিচতলার লাউঞ্জে বসে অপেক্ষা। আর মনে মনে ক্রিস্টির ভাবনা,‘ আজ তার অতিথি শুধু আমিই, একজনা।’
বেশ কিছুক্ষণ সময় কেটে গেল।গুট্টু অনেক পথ পাড়ি দিয়ে এই দুর্গম রাস্তা পার হয়ে তার কাছে এসেছে। ক্রিস্টি সে অর্থে নিজেকে বেশ ভাগ্যবান মনে করছিল।ভাবছিল তার মতো সামান্য জনের জন্য কারোর এতটা কষ্ট স্বীকার।ভাঙা পথ এবড়ো থেবড়ো ও দুর্গম হবার কারণে আধ ঘন্টার রাস্তা সাত ঘন্টা ধরে ভ্রমন। তিনি খুব ক্লান্ত। কিন্তু কাল সকাল পর্যন্ত যে অপেক্ষা করতে ইচ্ছে করছে না। আজ তার আগমন জানা মাত্রই ক্রিস্টি তাই ছুটে এসেছে এই সন্ধ্যায় তার সাথে দেখা করতে।
বেশ কিছুক্ষণ অতিবাহিত হবার পর উপর তলা থেকে নীচে নেমে এলেন তার আরাধ্য। লাউঞ্জে তার পদার্পণ ঘটলো। গুট্টু আসলেন, সামনে দাঁড়ালেন। ক্রিস্টি উঠে দাঁড়িয়ে হাত মিলালো।উনি বললো,হ্যালো। ক্রিস্টিও বললো, হ্যালো। শুরু হলো গল্প। খেয়াল করে দেখলও,তিনি আসন গ্রহণ করলেন ক্রিস্টির ঠিক মুখোমুখি। যদিও এটা ইন্টারভিঊ বোর্ড না।
অনেকক্ষণ গল্প হলো।
সন্ধ্যা শেষে তখন বেশ রাত। তাই সকল কথা শেষ না করেই তার ক্লান্তির মাত্রা ছাপিয়ে বার বার মুখে হাত দিয়ে হাই তোলা দেখে ক্রিস্টি বলল, ‘আমাকে এবার যেতে হবে,অনেক রাত।’
ঘড়ি দেখে উনি বললেন,‘ওহ্,তাই তো।’ তারপর আবারো হাই তুললেন ক্রিস্টি উঠে দাঁড়াল। কি যেন ভেবে ক্রিস্টিকে বললেন, ‘কিছু খাবে?’
ক্রিস্টি ভাবলো, এতক্ষণ পরে ? এখন খাবারের অর্ডার দিলে রাতের আয়জনে কত না সময় লাগবে? তারপর ভাঙা রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফিরাতে আরো সময় নেবে।
তিনি যদি আপ্যায়ন করতেই চাইতেন তাহলে আসতে আসতেই খাবারের অর্ডার দিতে পারতেন। এতক্ষণে খেয়ে দেয়ে চলে আসতে কোন অসুবিধাই হতো না। কিন্তু ঐ ক্লান্ত, ঘুম ভাঙা চোখে কি অতসব খেয়াল থাকে? কোমরে না কতই ঝাঁকুনি লেগেছে এই সাত ঘন্টায়।আর গল্পই যে শেষ হতে চাইছিল না। কিসের অতিথি আপ্যায়ন। তাই ক্রিস্টি বললো,‘নাহ্ এখন কিছু খেতে চাইছি না। বাসায় যেতে হবে।অনেক রাত হয়ে যাচ্ছে।’
কিন্তু গুট্টু যে এবার নাছোড়বান্দা। কিছু তো আপ্যায়ন করেই ছাড়বে এবার। ডিনার টাইম পার হয়ে গেছে। তাই ক্রিস্টি প্রমাদ গুনলো।আর সে দেরী করতে চায় না।পোলাও, কোর্মা পরে না হয় অন্য কোন বারে। এবারে আর নয়। প্রস্থানের সময় যে এখন।রাতের খাবারের সময় নয় এখন। গুট্টু বললো, ‘আমার একটু কফি হলে ভাল হতো।’
ক্রিস্টি ভাবলো, তাই তো! বেচারা ক্লান্তিতে এতো হাই তুলছে। ক্রিস্টি বলো, ‘প্লিজ।’
গুট্টু ক্রিস্টিকে সাথে সাথে বললেন,‘তুমি খাবে না?’
ক্রিস্টি খালি পেটে রাতের খাবার না খেয়ে শুধু কফি পান করে পিত ফেলাতে চাইছিল না। তাই বললো, ‘এখন না।’সাথে সাথে উনি বললেন, ‘তাহলে থাক।’
ক্রিস্টি ভাবলো, ওরে বাবা। সে খাব না বলে উনিও চাইছেন না। কিন্তু তা কি করে হয়।ভদ্রলোক যে ভীষণ রকমের ক্লান্ত। তার সাথে এই সন্ধ্যায়, তাকে ঘুম থেকে তুলে এনে দেখা করাই যে ক্রিস্টির ভুল হয়ে গেছে। ক্রিস্টি ভাবেনি যে, এত ক্লান্তি নিয়েও তিনি তার কথা রাখছেন। এসেছে ক্রিস্টি তার কাছে। এই হোটেল থেকে কতটুকুই বা দূর তার বাসা। আর আজ কেন জানি আসার পথে রাস্তাও খালি ছিল। কিন্তু যাবার পথে কি হবে কে জানে! তাই অনিশ্চয়তার কথা ভেবেই ক্রিস্টির উঠে পড়া। কিন্তু ভদ্রলোকের কষ্ট তাকে ব্যথিত করে তুললো। বাধ্য হয়েই তখন সে বললো, ‘ঠিক আছে।কফি আনতে বলুন।’ এই খালি পেটে! যাই হোক। সাথে সাথে তিনি ওয়েটার ডাকলেন। ‘দু কাপ কফি।’
ওয়েটার সাথে প্রশ্ন করলো, ‘দুধ সহ, নাকি দুধ ছাড়া?’
ক্রিস্টি ভাবলো, এর পরের প্রশ্ন কি হবে, ‘চিনি সহ নাকি ছিনি ছাড়া?’
হলোও তাই। ওয়েটারকে সকল প্রশ্নের উত্তর দিয়ে আরারও ক্রিস্টি বসলো।
কফি এলো। কানায় কানায় ভরা কাপ।কাপটি হাতে ধরতে গিয়েই টলমলে কফি খানিকটা পড়ে গেল ক্রিস্টির কোলে। গুট্টু তা খেয়াল করেছে। তারপরও কফি তো এসেছে। এই আকাংখিত সাক্ষাতের পর গুট্টু আজ ক্রিস্টির জন্য কফি অর্ডার করেছে। তবে অর্ডার তিনি করে থাকলেও ক্রিস্টি প্রস্তুত সর্বদাই, বিল দেবার জন্য। অতঃপর কফি পান শেষ। এবার বিলটা দেবে কে?
এক কাপ কফি শুধু। নাহ্ এক কাপ নয় , দু কাপ। সাথে এক গ্লাস পানি ফ্রি।
ওয়েটার এসে কাছে দাঁড়ালো। গুট্টু তাকালো ওয়েটারের দিকে। ক্রিস্টিও। গুট্টু বললো, হাতের ইশারা দিয়ে লিখে রাখার ভঙ্গীমায়, ‘বিলটা লিখে রাখো।’
এই প্রথম যেন ক্রিস্টি অনুভব করলো আজ সে ‘ডেট’ করছে কারো সাথে। তার প্রেমাস্পদের সাথে। অতি আকাংখিত, মনের মাঝে সযত্নে লালিত সেই কল্পনার রাজপুত্রের সাথে । যার সাক্ষাৎ বা বলা চলে দর্শন লাভের উদ্দেশে এসব কিছুর আয়জন। আজ তার স্বপন পূরণ হয়েছে। দূর দেশে সেই বন্ধুর এতো বন্ধুর পথ অতিক্রম করে তার কাছে আসা। তার আগমণে সে ধন্য। ক্রিস্টি আনন্দিত আশ্চার্যন্বিত এই ভেবে দীর্ঘক্ষণ গল্পে সময় অতিবাহিত হলেও প্রস্থানের কথা চিন্তার প্রাক্কালে এক কাপ কফি পানের আহ্বান? – এতটুকুও তো জোটে না তার কপালে। আজ তা জুটেছে।
ক্রিস্টির প্রতি কফি আপ্য্যয়নের মডেস্টি ক্রিস্টিকে মুগ্ধ করেছে।এ যে তার আশার অতীত। তার যে কিছুই আশা করতে নেই। কারণ কিছুই তো তার জন্য না।
কিন্তু এবার আছে তার জন্য – এক কাপ কফি।
কফি পান শেষে এবার ক্রিস্টির বাড়ি ফেরার পালা। আর বাধা দিল না গুট্টু। কিভাবে দেবে। খুব যে ক্লান্ত সে। তার তো এখন গভীর ঘুমে তলিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে বেশী। সে যে শুধু কথা দিয়েছিল দেখা করবে তাই- ই জোর করে নীচে নেমে এসে দেখা করা।
না হলে…?
না হলে অতল ঘুমে হারিয়ে যেত। ভীষণ যে কষ্ট হচ্ছে তার । ক্লান্তিতে এখন তার দেহ মন আচ্ছন্ন।
বাড়ি ফিরতে ফিরতে ক্রিস্টি ভাবছিল লাল্টু, বিল্লুর সাথে প্রথম দেখার সেই মহেন্দ্রক্ষণের দৃশ্যগুলো।স্মৃতি হাতড়ে এখনো সেই দিন, সেইদিনে বলা কথা, তাদের আতিথেয়তা , আন্তরিকতা, পরিশেষে ক্রিস্টির বিল শোধের দায়িত্ববোধ থেকে তা যথাযথ ভাবে পালন করে বিদায় পর্ব সমাপ্ত করা এবং সে দিনের মত বাড়ি ফেরা, সব, সব কিছু মনে পড়ছিল।
আজও সে বাড়ি ফিরছে। আজকে গুট্টুই এগিয়ে এসেছে দায়িত্ব সহকারে বিল পরিশোধ করতে। দু’কাপ কফি আর এক গ্লাস ফ্রি পানি। এতটুকুর ব্যবস্থা করতে পেরেছে সে ক্রিস্টির জন্য। অতঃপর? অতঃপর বিল।
বিলটা কে দেয়?
এবার গুট্টুই দিয়েছে। বিলটা পরিশোধ করে প্রমাণ করতে পেরেছে একজন নারীকে আপ্যায়ন শেষে বিল প্রদানে পুরুষও ভূমিকা রাখতে পারে।
… ………….
২৯/১০/২০১৯

