ফুল যখন ফুটলো
তখন সুবাস নেবার কেউ নেই।
**
জীবনের ছোট ছোট ইচ্ছেগুলো থেকে জীবন বঞ্চিত করেছে
কিন্তু
সাজু আর আমি ক্লাসরুমের সামনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে। গত কালের নৃত্যগীত সন্ধ্যার আয়োজন নিয়ে কথা বলছিলাম।কথোপকথনের মূল বিষয় নৃত্যগীতের আয়োজন নিয়ে নয়, বরং নৃত্য পরিবেশনকারী 'সুদর্শন পুরুষ' মালবিকা – কে নিয়ে।
কথোপকথনঃ
-অসহ্য
-কি অসহ্য?
-ওর অঙ্গভঙ্গী।
-অঙ্গভঙ্গী বলছো কেন? এটা তো নাচ।
- এটা কোন নাচ হলো? হাত পা ছুঁড়লেই নাচ হয়?
-আজকাল হয়। শুধু নাচই হয় না। উচ্চাংগ নৃত্যও হয়।মালবিকার সজাগোজ দেখ না? দরবারে নৃত্য পরিবেশনের সময়ে বাঈজীরা এমন পোশাকেই আসতো।
-এখানে কোন দরবার হচ্ছে না কি?
- না তা হচ্ছে না। তবে নৃত্য পরিবেশনকারী মনে হয় তোমার মন ছুঁতে পারেনি। তোমার চোখে ওকে সুন্দরী রমনী মনে হয়নি তাই না?
- রমনী? এই ছেলে কিভাবে রমনী হবে?
- আমার চোখে অবশ্য সে সুদর্শন পুরুষ।তাই আমার ভাল লেগেছে। তোমার ভাল লাগেনি কারণ তোমার দৃষ্টিতে সে 'সুদর্শনা' মানে সুদর্শন রমনী হতে পারে নি।
- একটা মানুষ একজনের চোখে পুরুষ আরেকজনের চোখে রমনী হবে কিভাবে?
- কিন্নর যারা, তার হো তাই-ই।নারী পুরুষ উভয় সত্তার বাস এক দেহে। যেমন মালবিকা।আমি তাকে পুরুষ রূপে দেখেছি তাতেই ভাল লেগে গেছে। তুমি তাকে নারী রূপে দেখতে পেলে বাদ বাকী কিছু খেয়ালেই আসতো না। তার অংগভঙ্গীকে কেরিকাচার মনে হতো না। নৃত্যে পরিবেশনকে ছন্দের তালে তালে শৈল্পিক উপস্থাপন মনে হতো। আমার কি মনে হয় জানো?
-কি মনে হয়?
-মালবিকা শতভাগ কিন্নর হয়ে উঠতে পারে নি। এখনো পুরুষালী ভাবটা অর্ধেকের বেশী রয়ে গেছে। সমান সমান নারী, পুরুষ হলে তোমার আর আমার কাছে সে 50/50 ব্যালেন্স হয়ে যেত।
- কিন্নররা তো প্রাচীন পুরাণ অনুসারে অর্ধেক মানুষ আর অর্ধেক দেবতা । তাই নয় কি? সেখানে তারা দেবতাদের জন্য সংগীত পরিবেশন করে। আমাদের ডাইমেনশানে এসে সেই মানুষেরও দুই ভাগ আছে - নারী ও পুরুষ। বেশ জটিল ক্রোমোজম-বিভাজন এবং এর সজ্জা। আর দেবতাদের ক্রোমোজমের সজ্জা তো জানি-ই না। ঐটুকু তো একদম অজানা।
-হ্যা, বেশ জটিল ক্রোমজোমের সজ্জা। আমি একজন চ্যনেলারের কাছ থেকে তথ্য পেয়েছি যে, 7D -র সত্তারা অর্ধেক মানুষ আর অর্ধেক অ্যাঞ্জেলিক। সুতরাং ভেবে দেখ, তাদের কি জটিল ক্রোমজোমের বিন্যাস! তাদের গুণাবলী আমাদের ধারণারও উর্ধ্বে। এখন কিন্নরদের কথা ভাব। যদি তারা 5D এরও উর্ধ্বের সৃষ্টি হয়, এবং সেখান হতে 3D তে এসেছে সুর, বাদ্য আর নৃত্যের ঝংকারে অনুরণন ঘটাতে, কিন্তু প্রাপ্ত সম্মান না পেয়ে, প্রাপ্ত অধিকারের অভাবে তারা ভিক্ষা করে , ভাঁড়গিরি করে জীবন যাপন করছে। কি কঠিন দুঃসহ তাদের জীবন। এই ইঙ্কারনেশানে পথ চলা তাদের জন্য কতটাই না দুর্বিষহ। সবকিছুতে শুধু বাধা আর তুচ্ছ তাচ্ছিল্য।
-নিশ্চয়ই । এরা আমাদের কাছে, না পুরুষ না নারী । কিন্তু গোড়ায় যেখানে এরা সৃষ্ট হয়েছে, সেখানে কিন্নরদের-ও স্ত্রী জাত আছে। তাদের বলে ‘কিন্নরী’। পুরাণ মতে, কিন্নররা সাধারণত হিমালয়ের কল্পিত গন্ধর্বপুর বা কুবেরের আলকা নগরীতে বাস করত। তাদের বাসস্থান ছিল দেবতাদের স্বর্গীয় রাজ্যে, বিশেষত হিমালয় পর্বতমালায়—গন্ধমাদন, কৈলাস, এবং মেরু পর্বতের আশেপাশে। এখনো বসবাস করে ।কিন্তু সেই উচ্চ ডাইমেনশান তো আমরা দেখতে পাই না। তাই না? পুরাণে বলা আছে, দেবতারা যখন আনন্দ করেন, তখন কিন্নররা তাদের জন্য গান ও নাচ পরিবেশন করেন। গন্ধর্ব ও কিন্নর উভয়েই স্বর্গীয় সংগীতজ্ঞ হিসেবে পরিচিত।
-ঠিকই ধরেছ। এদের ক্রোমোজম বিন্যাস, পুরাণ অনুসারে যদি ১০০+ হয় তাহলে বেশীর ভাগ বিন্যাসই তো আমাদের অজানা এবং misunderstood. খেয়াল করো, ব্রহ্মার সাত জন মনোজাত পুত্র ছিল।
-মনোজাত মানে?
- জানি না, তবে আমার মনে হয় মনোজাত মানে manifested হওয়া, অভিব্যক্ত হওয়া। ব্রহ্মার সেই সাত মানসপুত্ররা হলো- ভৃগু, মরীচি, অত্রি, অঙ্গিরা, ক্রতু, পুলহ, পুলস্ত্য। মরীচি ও ক্রতুর কন্যা- অরুন্ধতীর মিলনে বিশ্ব সৃষ্টিতে বিভিনন্ন ধারায় বংশের উতপত্তি হয়। ভেবে নিলাম বংশ মানে প্রজাতি। এসব বংশের মাঝে রয়েছে দেবতা, অসুর, নাগ,অপ্সরা, প্রাণীকুল, ১০০+গন্ধর্ব/ কিন্নর, চিত্রসেন (যারা গায়ক জাতি)। এরা ক্রমান্বয়ে বিস্তৃতি লাভ করে সৃষ্টি জগতকে বৈচিত্র্যময় করে তোলে। অর্থাৎ বহু রকমের DNA সৃষ্টি হয়ে গেল ।তার মাঝে কিন্নর একটি প্রজাতি হিসেবে সৃষ্টি হলো। এরা ‘আধা-মানব, আধা-দেবতা’-র DNA এর সংমিশ্রণ। পৌরাণিক ধারণায়, কিন্নররা স্বর্গীয় সংগীতজ্ঞ । এদের শরীরে মানুষ ও পাখির বৈশিষ্ট্য থাকে। কিন্নররা স্বর্গীয় রক্ষক (খোজা।) এরা সঙ্গীত, নৃত্য,সুর, সভা গায়কদের সাথে সম্পর্কযুক্ত কাজে পারদর্শী।
আবার অন্য দিক দিয়ে ভেবে দেখ, আমাদের প্ল্যানেট যখন উচ্চ ডাইমেনশানের দিকে এগুবে তখন পৃথিবী উৎস বা সোর্সের কাছাকাছি চলে আসবে। মানুষরা আর 3D তে আবদ্ধ থাকবে না। তাদের মস্তিষ্কের left hemisphere, right hemisphere একই সাথে কার্যশীল হবে। তখন মানুষের মাঝে দুই সত্তা মানে নারী সত্তা, পুরুষ সত্তার উপরিপাতন হবে। একই দেহে দুটি সত্তা প্রকাশিত হয়ে, একই সঙ্গে কার্যশীল হবে। ক্রোমজোমের গঠন নির্ঘাৎ এক থাকবে না।
-এক থাকবে না। তাহলে কি 5D তে সব মানুষেরা ভাবেসাবে কিন্নরদের মত হবে?
- হ্যা। এবং খেয়াল কর, সেই স্বর্গলোকের কিন্নর -এর প্রতিভূ এই ডাইমেনশানের কিন্নর। যদি দেবতাদের (ধরে নিলাম কোন একপ্রকার ET – দের ) ক্রোমজোম ওদের মাঝে থেকে তাহলে তাদের জটিল এই ক্রোমজমের বিন্যাসে দেবতাদের মতন সেই গুণটাও নিশ্চয়ই আছে?
- কোন গুণটা? সেই অভিশাপ দেয়ার ব্যাপার?
-হ্যা । সেই গুণ - তারা যদি কষ্ট পেয়ে মন থেকে শাপ দেয় তাহলে তা ফলে যায়।
-কি সাংঘাতিক!
-এই ডাইমেনশানে DNA লক্ (অকার্যকর) থাকলে এই গুণ সুপ্ত থাকতে পারে। কিন্তু ১০০+ গন্ধর্ব/কিন্নর এর সৃষ্টি দেখে মনে হয় কমপক্ষে ১০০ প্রকার ক্রমোজম সজ্জা তৈরী হয়ে আছে LGBQT স্পেকট্রামে, যা আমরা জানি না। তবে আমরা যত উচ্চ ডাইমেনশানে উন্নীত হবো, ততই উৎসের দিকে ফিরে যেতে যেতে বহু ধরণের ক্রোমজোমের সজ্জা আমাদের কাছে প্রতীয়মান হবে।মানে প্রকৃতিতে অবস্থিত বহুধরণের সৃষ্টি অবলোকন করতে পারবো। উপরের দিকে পৌঁছুতে পৌঁছুতে ব্রহ্মার সাত মানসপুত্রের দেখা পাব। তাদের বংশের সকল ধারা দেখতে পাব। কিন্নরদের প্রকৃতি, বৈশিষ্ট্যসমূহ,গুণ, ক্ষমতা সম্বন্ধে জানতে পারবো। তারা আর আমাদের কাছে তাচ্ছিল্যের পাত্র হবে না ।এই 3-ডাইমেনশানে তাদের ভাঁড়ামি করে জীবিকা নির্বাহ করতে হবে না। তারা নিজেরাও জানবে তারা কোথা থেকে আগত। তারা জানবে যে তারা কক্ষপথ থেকে ছিটকে পড়া পথচ্যুত উল্কা পিন্ড নয়। তাদের এইরূপ অস্বাভাবিক দৈহিক গঠন নিয়ে পৃথিবীতে আসার কি কারণ তা জানতে পারলে কেউ –ই তাদেরকে তাদের প্রাপ্ত সম্মান ও অধিকার থেকে বঞ্চিত করবে না।তারা আর হাসি ঠাট্টার পাত্র হবে না। তাদেরকে তামাশা করে, মানবেতর জীবন যাপন করে বাঁচতে হবে না।
.....।.।
১৩/০৭/২০২৬
০৩/০৭/২০২৬
কি কণ্ঠ!
কি অসাধারণ উপস্থাপনা।
প্রফেসারের লেকচার ডেলিভারিং, ব্যক্তিত্ব, রুচি সব এক করে ভাবলে তৃণা কেন, কলেজের সবাই ওনার ভক্ত।কথা বলার সময় প্রফেসরের সুরেলা কন্ঠটা যখন একটু ভেঙ্গে আসে তখন তার কন্ঠের ঝংকারে সমস্ত ক্লাশরুম যেন অনুরণিত হয়ে ওঠে। ইনি-ই কলেজের নামকরা শিক্ষক প্রফেসর ডি. মুখার্জি। ওনার ক্লাশের প্রথম দিকে তৃণা ভাবতেও পারেনি তার ভাগ্যটা তার জন্য, এত সুন্দর একটা উপহার প্রস্তুত করে রেখেছে। আর তা হলো প্রফেসর মুখার্জির লেকচার শোনার সৌভাগ্য। শুধু লেকচার ক্লাশই নয়, প্র্যাকটিকাল ল্যবেও তার উপস্থিতি সারা ল্যাবকে ভীষণ প্রানবন্ত করে তুলতো। করিডোর দিয়ে হেঁটে প্রফেসর মুখার্জি যখন হেঁটে আসতেন, মুখে তার মৃদু হাসি, অভিবাদন গ্রহণের সময় বিনয়ের সাথে তার সম্ভাষণ সকলকে স্তম্ভিত করে দিত। তার স্টাইল সেন্স অনন্য । একরঙা শার্টের মাঝ বরাবর সেই রঙের সুতার কাজ করা এমব্রয়ডারি কি যে ভাল দেখাত। এ ধরণের কাজ সচরাচর দেখা যেত না। কিন্ত ওনার নিজস্ব এই স্টাইল তো কারোর সাথে সদৃশ হবার জো নেই।নিঃসন্দেহে এই আর্ট-সেন্স তারই সৃষ্ট। কলেজের অন্য সকলের মতো ওনাকে পুরোনো স্যান্ডেল পায়ে রিকশা থেকে নেমে চপড় চপড় করে কলেজের সিঁড়িতে পা দিতে দেখেনি কেউ। সবসময় চকচকে জুতো।
ফিট ফাট।
টপ্ স্মার্ট।
ছাত্ররা আরো অনেক খবর জানত। তিনি যে সম্ভ্রান্ত পরিবার থেকে আগত, সে সব কথাও বলে ফিরতো সকলের মুখে মুখে।এসব শুনে তৃণা ভাবতো সেজন্যই স্যারের ব্যক্তিত্ব এত কালচারড্, এত পশ্।ওনার উপস্থাপনায় স্মার্টনেসের ছোঁয়া নির্ঘাৎ এ কারণেই। এতেই একসময়ে তিনি হয়ে উঠলেন তৃণার আদর্শ।সে ভাবতো তার প্রিয় এই শিক্ষকের সাথে পাঁচ মিনিট কথা বললেও পাঁচটা আদব শেখা যায়। তার জ্ঞানের পরিধি, পড়া বোঝানোর দক্ষতা তৃণাকে সামনে অপার বিস্ময় ভরা এক জগতের দ্বার অন্মোচন করতো।
২
সেদিন ভীষণ বৃষ্টি। তৃণা আর তার বান্ধবী ল্যাবের কাজ ফেলে রেখে বৃষ্টি দেখায় ব্যস্ত।সেই ব্রিটিশ আমলের তৈরি বিশাল কক্ষ নিয়ে কলেজটির ভবন তৈরী। ল্যাবের তিনটি কক্ষে পেরিয়ে শেষেরটায় শিক্ষকদের বসার স্থল।চারিদিকে ঘোরানো বারান্দা। তৃণাদের কক্ষটি থেকে বারান্দায় যাবার সংযোগস্থলে রয়েছে একটি দরজা। দরজার দু’পাশে দাঁড়িয়ে উদাস হয়ে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি পড়া দেখতে দেখতে তৃণাকে তার বান্ধবীটি তার জীবনের সব না পাওয়ার কথা সেদিন বলে যাচ্ছিল। এসময় প্রফেসর মুখার্জি সবার টেবিলে এক্সপেরিমেন্ট দেখে তৃণাদের কক্ষে ঢুকতেই দেখে কাজ ফেলে তাদের উদাস নয়নে বৃষ্টি দেখার প্রকল্প। প্রফেসরকে দেখে তারা তো তটস্থ। কিন্তু তাদের অবাক করে দিয়ে প্রফেসর নিজেই বলে ফেললেন, ‘ওহ্, ঠিক আছে।’
অর্থাৎ ‘যেমন ভাবে বৃষ্টি দেখছ, দেখ। আমি তোমাদের বিরক্ত করব না। জানতেও চাইব না এক্সপেরিমেন্টের রিডিং কি কি নিয়েছ।’
তৃণাদের মনোজগত যেন তাদের থেকে তিনিই ভাল বুঝে ফেলেছেন। এই বয়সে মেয়েরা ভাবনার কোন জগতে থাকে, তা যেন তার খুব ভাল ভাবে জানা । এত্ত স্মার্ট একজন মানুষ এই ভদ্রলোক, যাকে নিয়ে একটা কটু কথা বলতে পারবে না কেউ।কারো সাথে অযথা দুর্ব্যবহার করা, ক্ষমতার অপব্যবহার করে ছাত্রদের হয়রানি করা, যখন তখন ক্রোধান্বিত হওয়া তার স্বভাবের বাইরে।
কিন্তু নিরঅহংকার এই মানুষটিকে জীবনের তাগিদে কিছু অতিরিক্ত আয়ের কথা চিন্তা করতে হয়।আর সে থেকেই ওনার ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে যোগদান করতে হয়েছে তখন। ওখানে সরকারী স্কেলের চেয়েও বেতন ভাল। যদিও কলেজের সহকর্মীরা তার এই অতিরিক্ত কাজটা নিয়ে কিঞ্চিৎ ঠাট্টা করে।বিশেষ করে কাঠি বেগমের সারসের মত গলাটা একটু বেশী শোনা যায়। কিন্তু তাতে কি! স্কুলের সীল থাকলে টুকটাক টিউশনি করার সুযোগও মেলে।যদিও তা প্রফেসর করেন কি না কেউ জানে না।তার সীমিত আয় দিয়ে যতটুকু চলা যায় এর থেকে আরেকটু বেশী তো প্রয়োজন হয় জীবনের তাগিদে। কেউ তো এসে ওনাকে খাইয়ে পড়িয়ে দেবে না। অন্তত তার সহকর্মী প্রফেসর কাঠি বেগম তো নয়ই। তারপরও কাঠি বেগমের সাথে তিনি খুব সাবলীল। আসলে কার সাথেই বা না? তার তরল জলীয় স্বভাবের জন্যই তো আজ সব জায়গায় ছড়িয়ে আছে তার এতো শুভাকাংখী ।
মানুষ অনেক কিছু বললেও আবার থেমেও যায়। তার একটাই কথা কিছুটা ভাল থাকতে পারলেই তো হলো।
কিছুটা। জীবনে এর চেয়ে বেশী আর কি লাগে?
প্রফেসর মুখার্জি আর কিছু ভাবেনও না। কিন্তু তার তুখোড়, বুদ্ধিদীপ্ত ব্যক্তিত্ব এবার নজর কেড়েছে বড় বাবুদের। তারা আসেন ওনার কাছে পরামর্শ নিতে। পরামর্শদাতার আরেকটি নাম আছে –অ্যাডভাইসার, মানে কনসাল্টেন্ট। এই কাজে তিনি সিদ্ধ হস্ত। তাই সবার নজর তার দিকেই। তিনি ইদানিং আমন্ত্রণ পান রাজনীতির অংগনের পালা পার্বণে। পরামর্শদাতা থেকে ক্ষেত্র বিশেষে মন্ত্রণাদাতা হিসেবেও যথেষ্ট পরিচিতি পেতে শুরু করেছেন। সেখানে যে অনেক টাকার খেলা। তাহলে আর বাড়তি টাকার জন্য স্কুলে কাজ করে কে? নেতা আর পাতি নেতাদের ধর্ণা দিতে গিয়ে তাদের ঘরে বসে থাকতেই তো অনেক সময় চলে যায়।মন্ত্রণা সফল হলে মাস শেষে উপঢৌকন আসে বাড়িতে। বড়বাবুরা লাইন ধরিয়ে দেয়। অমুকের সাথে তমুকের সাথে দেখা করার সুযোগ মেলে। ফলে প্রফেসর ডি. কিংকর্তব্যবিমূঢ়। এতো তো আশা করেন নি। রাজনীতির মহলে, তিনি এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠেন বছর দুয়েকের মধ্যে। সংসারের অভাব অনটন তখন কমে এসেছে। এক বাঘা মন্ত্রীপুত্র তার বাবার শুন্যস্থান কোন তরিকায় দখল করবে তার বুদ্ধি বাতলে দিয়ে প্রফেসর ডি. আবারো সবার নজর কাড়েন। বহমান স্রোতের বেপরোয়া গতি যেমন বাধা মানে না, তার চাণক্য নীতিও তেমন বল্গাহীন হয়ে পড়ে এক সময়ে। টালবাহানা করে কলেজের প্রশাসনের মাঝে বিভক্তি সৃষ্টি হলে কলেজে আন্দোলন শুরু হয়। কপাল এমন মন্দ , ঐ বিপক্ষদলের ছেলেরা বড্ড বেয়াড়া।মেয়েদেরকে দেয়ালে ঠেসে ধরে পরিধেয় বস্ত্র খুলে ফেলে তাদের খুবলাতে শুরু করে।এসব থামাতে ছাত্রী হস্টেলে পুলিশ পাঠানোর প্রয়োজন হয়ে পড়ে। মেয়েরা ছাত্রদের দ্বারা বীভৎসতার শিকার হলে প্রফেসর মুখার্জি নিরব দর্শক হয়ে অপেক্ষা করেন কখন ক্যামেরার সামনে চোখের পানি ফেলতে হবে।
ফেলেনও।
এদিকে ছাত্রীদেরকে রক্ষা করার বদলে তাদেরই ধরে শিকের ভেতর পুরে এমন একটা প্যাদানি দিল কলেজ কর্তৃপক্ষ যে কেউ আর মুখ খুলতে সাহস পেল না। অথচ ছাত্রীদের নাকাল অবস্থায় ফেলে দিয়ে অসম্মান করাটুকু বাদ দিয়ে গন্ডগোল থামানোর সকল বাহাদুরী তার জিম্মায় নিয়ে ফেলেন তৎক্ষণাত। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সকল বাহাবা নিয়ে অধ্যক্ষের চেয়ারাটা বাগিয়ে নিতে তার আর কোন অসুবিধাই থাকলো না।চেয়ারখানা পাওয়া যেন তার সারা জীবনের স্বপ্ন পূরণ। কারণ সে একবারই শুধু চেয়েছিল, মরার আগে অধ্যক্ষের পদটা দখল করা।আর এ সুযোগ কেমন করে যেন গড়িয়ে গড়িয়ে তার হাতের নাগালে চলে এলো। এখন আর যায় কই। এখন আর যায় কই। প্রফেসর মুখার্জির মনটা ময়ূরের মত পাখনা মেলে ধেই ধেই করে নেচে উঠলো। এখন মন্ত্রণাদাতা হিসাবে কাজ করার জন্য দেশ বিদেশ থেকে দাওয়াত আসে প্রায়ই । কিন্তু ওসব নিমন্ত্রণ পরিহার করেছেন তিনি। কলেজের অধ্যক্ষ পদের মর্যাদা তার উন্নতির সোপান। তাই এই পদ ছেড়ে তিনি কোথাও যাবেন না।
৩
তৃণাদের থার্ড ইয়ার শেষ।চতুর্থ বর্ষের ক্লাশ সবে মাত্র শুরু হয়েছে। কালেজের আদর্শ ছাত্রী হিসাবে সে ততদিনে বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছে। আর সেটাই কাঠি বেগমের গা জ্বালার কারণ। মেয়েটি তার পদলেহন করে না কেন? একবার সুযোগ পেলে কাঠি বেগম এমন একটা আছাড় মারত যেন ছাত্রীটি একদম সিধা হয়ে যায়। সেদিন ক্যন্সারে আক্রান্ত শাওনের লাশ এলো কলেজে। তৃণারা সবাই শেষ বিদায় জানাবার জন্য শাওনকে ঘিরে দাঁড়িয়ে। তৃণাকে বহুদিন পর দেখে কাঠি বেগমের কেন জানি বেচাইন অবস্থা।সবাই চলে গেলে খালি বারান্দায় একা একা দাঁড়িয়ে হাতের ফোনটা নিয়ে তার সে কি নাড়াচাড়া।সে কাকে যেন হন্যে হয়ে একটা মেসেজ দিয়ে চায়। কি বলতে চায়? বেচাইন হয়ে গেছে কেন তৃণাকে দেখে? তার ধাত, মানে যাকে বলে খাসিয়াত সেটা তৃণাকে সহ্য করতে পারে না।কারণ তৃণা কাঠি বেগমের ঘরানার না। কাঠির অন্য চ্যালাগুলো তো দিব্যিই আছে তার আশপাশে। সর্বক্ষণ।
বিশাল বড় বড় আঁচিল ওয়ালা ঐ আরেকটি ছাত্রী তো নিজে এবং তার মা শুদ্ধ দুজনে একসাথে এই প্রফেসারনিকে লেহন করার ওপর রাখে। শুধু তৃণাকে দিয়ে এ কাজটা করাতে পারে না। এটাকে পায়ের কাছে এনে নত করাতে পারলেই পুরো জগৎটা তার হাতের মুঠায় এসে যেত। কিন্তু কিভাবে তা সম্ভব? একটা বুদ্ধি তার মাথায় এসেছে।আসলে এই ছাত্রীটি এমন এক ব্যক্তিত্ব যাকে না ভাল বলে পারা যায় না।কাঠি বেগম নিজেও তা জানে। তাই যাদের খুব ভাল ধারণা আছে এই মেয়েটির ওপর, তাদের কানে বিষ ঢালবে তৃণাকে নিয়ে। একেবারে আচ্ছা মতন। আর অধ্যক্ষ ডি. মুখার্জি তো সেই লিস্টে এক নম্বরে আছে।তাই সেদিন শাওনকে শেষ বার দেখিয়ে নিয়ে যাবার পরপরেই অধক্ষ্যের ঘরে প্রবেশ করলো কাঠিবেগম। নিবেদিত হলো কলেজের খবরাখবর পরিবেশন করতে। এভাবে সকালে একবার , দুপুরে একবার। দু’বেলা করে যায় অধ্যক্ষের রুমে, প্রশাসনিক দপ্তরে। অতিরিক্ত আন্তরিকতা দেখাতে কাপড়ও খুলে ফেলে। কিন্তু আল্লাহ্র দেয়া কাঠি শরীরে কি দেখানোর আছে? কিছুই নেই । তবে প্রচলিত আছে কাঠি ফিগারদের কামড় বেশী থাকে। অফিসের লোকেরাই সেটা ভাল বুঝে। প্রফেসর মুখার্জির চার্মিং পারসোনালিটি (মানে আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব) থাকা সত্ত্বেও নারী ঘটিত কোন স্ক্যান্ডেল নেই। কাঠি বেগম তার শরীর দেখিয়ে এখানে খুব একটা সুবিধা করতে পারবে না।কিন্তু তাতে কি? খোদার দেয়া সারসের মত একটা গলা তো আছে।সেই গলা দিয়ে টেনে টেনে ইংরেজিতে কানপরা দেয়াই উওম হবে।প্রয়োজন হলে চিৎকার করে এই মেয়েটিকে নিয়ে সারা কলেজে একটা ছোটখাটো ভাষণও দিয়ে দেবে।
আজ তেমনই।
আধ ঘন্টার একটা ছোটখাটো বক্তৃতা দিয়ে ফেললো ঐ টার্গেটেড ছাত্রীটিকে নিয়ে।এটা তার না-মুনাফেকেরই একটা অংশ। তৃণার মারদাঙ্গা শ্বশুরের কাছ থেকে প্রচুর টাকা খেয়েছে কাঠি বেগম।শর্ত –তৃণার বদনাম ছড়াতে হবে কলেজে। সোশিওপ্যাথ ঐ শ্বশুরের সাথে কাঠি বেগমের অ্যান্টেনা বেশ মিলে।সেইদিনের সেই ভাষণে তৃণার বাপ-দাদা সহ চোদ্দ গুষ্টির মান সম্মান ধূলায় যেন লুন্ঠিত হয় সেই ব্যবস্থা করে ফেলল। সবাই তার ভাষণ না খেলেও প্রফেসর ডি. মুখার্জি কেন জানি তার সবটুকুই খেয়ে ফেলল।তৃণা টেরও পেল না, তাকে নিয়ে অধক্ষ্যের কক্ষে নতুন বয়ান চলছে।কিন্তু তার পরপরই শুরু হলো তৃণার নতুন অভিজ্ঞতা। তার এই প্রিয় শিক্ষককে অভিবাদন জানালে তা তিনি আর গ্রহন করেন না।তৃণা তার প্রিয় শিক্ষকের এহেন ব্যবহারে বেশ হতবাক! সেই কত ছোট থেকেই না দেখছে প্রফেসর মুখার্জি কে। রাজনীতি করে অধ্যক্ষের প্রেস্টিজ পজিসান বেড়ে গেলেও কলেজ চত্বরে তার বিন্দুমাত্র অহংকার কেউ দেখে নি। এখনো এত টাকা পয়সার মালিক হলেও ঘটর ঘটর করে সেই রিক্সায় চড়েই তো কলেজে আসেন। চাকচিক্যে, অভিজাতপণায় তার কোন ঊনিশ বিশ হয়নি। যেমন ছিলেন, তেমনই আছেন। তাহলে প্রফেসর হঠাৎ মুখ ঘুরিয়ে নিলেন কেন? তৃণা কোন কারণ তৃণা খুঁজে পায় না।কোন বেয়াদবী তো সে করেনি। তাহলে কেন ওনার এই পরিবর্তন?
এসব ভাবতে ভাবতেই তৃণার শেষ বর্ষ সমাপ্ত হয়ে গেল।এবার কলেজের পাশের ইনস্টিটিউটে যাবে গবেষণার কাজ করতে। সারা জীবনের ইচ্ছা তার, এইখানে গবেষণার কাজ করার। প্রফেসর মুখার্জির ল্যাবে অনেকে কাজ করে। কিন্তু রাজনীতিতে যুক্ত হওয়াতে প্রফেসর আর ল্যাবে এসে কাজ দেখাতে পারেন না। সহপাঠী এবং পরবর্তীকালে সহর্মীদের কাছে শুনেছে, প্রফেসর ডি. ইদানিং ল্যাবের চাবি ছাত্রকে হস্তান্তর করেই দায়িত্ব সারেন।ল্যাবমুখো হননা। শিক্ষকতার পেশা রূপ নিয়েছে রাঘব বোয়ালদের সাথে মিটিং আর কলেজের কর্মীদের সাথে দরবার করার কাজে। সেজন্য তৃণা অন্য ল্যাবেই কাজ জোগাড় করে নেয়।ইন্সটিটিউটের ঠাঁট তো কলেজ থেকে বহুগুণে বেশী । তাই প্রফেসরকে মাসে একবার হলেও ঢুঁ মারতে হয় ওনার ল্যাবে।আফটার অল্ তার উপস্থিতি যে সর্বত্র আছে তা তো কর্তৃপক্ষকে দেখাতে হবে। মন্ত্রণালয় থেকে গ্র্যান্ট নিতে হবে না? সেটাও তো একটা ইনকাম। ল্যাব চললো কি চললো না, তা জরুরী নয়।গবেষণা দিয়ে তো দেশ উদ্ধার হবে না।আরো অনেক গুরুত্বপুর্ণ কাজ যে এখন আছে।
এদিকে কাজ শেষে তৃণা সেদিন বাড়ি ফিরছিল।কলেজের মতো এখানে এইসব প্রতিষ্ঠানে ছাত্র –ছাত্রীদের তেমন ভিড় নেই।সেদিন খালি বারান্দা ধরে হেঁটে আসতেই তৃণা দেখল তার প্রিয় শিক্ষকের পদচারণা। খুশীতে যেমন মনটা ভরে উঠলো, তেমনি শংকাও তৈরি হলো। ওনাকে অভবাদন জানাতে গেলে না আবার দুর্ব্যবহার করে বসেন।কিন্তু অভিবাদন না জানিয়ে অধ্যক্ষের পাশ কাটিয়ে চলে যাবার মতন ছাত্রী তো সে নয়।এখন কি করবে? তৃণাকে তার মুখের সামনে উহ্য করবার ঘটনা তো তিনি বেশ কয়েক বছর ধরে ঘটিয়েই চলছেন।কলেজের হাজার হাজার ছাত্র ছাত্রীদের মাঝে সে একজন। নির্দিষ্ট কেউ তো নয়। কিন্তু কিছু শিক্ষক মহাশয়দের ঘাড় ঘুরানো দেখে মনে হয় তৃণা যেন তাদের ঘরের ভাগিনা, ভাতিজা লাগে। যে কিনা ঘরে তাদেরকে তটস্থ করে তুলে এখন এসেছে কলেজ প্রাংগনের বারান্দায়। এই আমজনতার মাঝে আসলে তৃণা কি অমার্জনীয় অপরাধটি করেছে তা সে জানে না। তাহলে কি করবে এখন? মুখোমুখি যেহেতু পড়েই গেছে, অভিবাদন দিয়ে প্রফেসরের দুর্ব্যবহার দেখার আরেকটা এপিসোড না হয় দেখবে! কিন্তু কেন জানি অন্যদিনের মতন ভীড়ের মধ্যে পাশ কেটে চলে যাবার হেতু না পেয়ে ঐ খালি বারান্দায় তৃণার অভিবাদন গ্রহণ করতে তিনি বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু বিরক্তিসূচক একটা দীর্ঘশ্বাসও ফেলেছিলেন। তৃণার ওপর নয়। তার নিজের ওপর। নিয়তি কখন যে কি করে বসে! কেন যে এমন অবস্থায় ফেলেছে নিয়তি তাকে। অন্যসময় তৃণাকে দেখলেই উহ্য করে যেখানে কিনা সোজা প্রস্থান গ্রহণ করতে পারত, সেখানে কি না বাধ্য হয়েছে মুখোমুখি পড়ে এই ছাত্রীর অভবাদনের উত্তর দিতে? কাঠি বেগমের কথায় এই ছাত্রীটিকে কতই না তাচ্ছিল্য করে আসছিল। আর আজ কিনা ঘাড়ের উপর পড়ায় বাধ্য হয়েছে ভাল ব্যবহার করে ফেলতে?
ভাল ব্যবহার করা মানে তো হেরে যাওয়া। দাম্ভিকতা দেখানোই না সত্যিকারের ঠাঁট–বাট।উপরন্তু দীর্ঘ দিনের পথচলার সঙ্গী কাঠি বেগমের কানপড়ার কি হবে?
ভেস্তে যাবে?
কি যে এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। জীবনের অর্ধশতক পরিভ্রমণ করে অবসরের পরও এগিয়ে চলছেন সাফল্যের সাথে। তার সূক্ষ্ম বুদ্ধিই এনে দিয়েছে এই মান, এই সম্মান আর আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য। ভাল ব্যবহার করতে তো পয়সা লাগে না। কিন্তু তাকত্ লাগে। তা নেই যে তা না। কানপড়াতে টিউনড্ বলেই হয়তো বা এই সিদ্ধান্তহীনতা। না হলে তো তার স্মার্টনেসের কোন কমতি কখনই ছিল না। এই কাঠি বেগমই কি না কি বলেছিল যেন সেদিন?এসব ভাবতে ভাবতে প্রফেসর মুখার্জি সামনের দিকে এগুতে থাকেন।যাই হোক। বেশী কিছু তো না। কেউ অভিবাদন দিতেই পারে। একটু মাথা নোয়ানো আর কি!
৪
কিছুদিনের মাঝে উচ্চ পর্যায়ের সভায় তার নাম অনুমোদিত হতে যাচ্ছে।আজীবন সম্মমনা পাবার ছাড়পত্র মিলেছে । প্রফেসর অফ ইমিরেটাস! আজীবনের জন্য এই সম্মান। এই দুনিয়াতে বাকী জীবন জন্য সম্মান তার জন্য বরাদ্দ হয়ে গেছে। এ ধরা থেকে প্রস্থানের পর কি হবে কে জানে? কিন্তু এ দুনিয়াতে সব কিছু ভোগ করা তো হয়ে যাবে। এ ভাগ্য ক’জনের জোটে? যেমন করে যে চাইবে তেমন করে চলবে।
মন্ত্রণা, কুমন্ত্রণা, ভালোচাল, কুটচাল সবপন্থা প্রয়োগে তার কোন বেগ পেতে হয় না। পানির মতো গড়িয়ে গড়িয়ে যখন যে পাত্রের আকার ধারণ করা দরকার তাই-ই তোঁ করেছেন। ইংরেজীতে একে বলে shape shifter. এরা ইচ্ছাকৃত ভাবে বা জাদুমন্ত্রের সাহায্যে নিজের রূপ পরিবর্তন করতে পারে। কিন্তু এই গুণটি যে তার এত ভাল ছিল, তা তিনি নিজেও জানতেন না, যদি না তার বড়- কর্তারা তার চিকন বুদ্ধিকে সময় মতো কাজে না লাগাতো।আজ পর্দার আড়ালে থেকে পরামর্শ দাতা হিসাবে আজ তার নব জীবন লাভ হয়েছে।তার সহকর্মীরা অনেকেই জুবু থুবু হয়ে এখন ঘরবন্দী।কিন্তু প্রফেসর মুখার্জি নব উদ্যমে যাত্রা শুরু করেছেন।অবসর গ্রহণের পরে কিছুদিন প্রাইভেট কলেজে শিক্ষকতা করেছেন।কিন্তু তা কি আর এই সম্মমনার ধারে কাছে যায়? এবার ফিরে এসেছেন তার ফেলে যাওয়া কলেজে।তিনি যে এখন অমরত্ব লাভ করেছেন।দেশ এবং দশ তাকে নিয়ে গর্বিত – শুধু তার দীর্ঘদিনের সহকর্মী আর ছাত্ররা ছাড়া। তারা এবার হতভম্ব!
....
২৭/০৬/২০২৬
-এই ছেলে এত ফর্শা ক্যান? আমরা না কালা? কালা জাত না আমাদের ?
-কালা আর বাইট্যা।
-তাহলে এইটা এত লম্বা ক্যান। লম্বা আর ফর্শা।
-মনে হয় হাইব্রিড।
-কিসের সাথে হাইব্রিড?
-ক্যাঙ্গারুর সাথে অথবা লম্বা ধরণের বানরের সাথে।
-ফাল পাড়তে পারে?
-নিশ্চয়ই পারে। পরিস্থিতিতে পড়লে দেখবা লাফও দিতে পারবে।
পূর্বকথা-
রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল দুই বান্ধবী। হঠাৎ তাদের চোখে পড়লো আলখাল্লা পরা লম্বা, ফর্শা একটা ছ্বেলে। তারপর তাদের এই কথোপকথন।
-তার মানে লাফ দিতে পারে, আবারও ফালও দিতে পারে।দেখতেও সুন্দর। সবদিক দিয়ে এত গুণ।দেশের উন্নতি, দশের উন্নতি।
-না, তা না।
-তাহলে?
-জাতের উন্নতি।কারণ হাইব্রিড করে পুরো জাতকে উন্নত করে ফেলা যায়। এখন দেখ না বলছে সব রোগা বালাই সেরে যাবে। আলঝাইমার্স আর থাকবে না। কোন এক দেশে বলে ক্যান্সারের টিকাও আবিষ্কার হয়েছে। মানুষ নিরোগ হবে। একদিন অমরও হবে।
- অমর হলে কেমন লাগবে?
-হাঁসফাঁশ লাগবে। ছটফট লাগবে। বোরিং লাগবে। কিছু ভাল লাগবে না। শতাব্দীর পর শতাব্দী চলে যাবে এভাবে- শুধু বেঁচে থাকা। জীবনকে বয়ে নিয়ে চলতে তখন আর ভাল লাগবে না। মানুষ নিজে থেকেই চাইবে জীবনে মৃত্যু ফিরে আসুক।
- কিন্তু মৃত্যুর তো অবসান হয়ে যাবে। আর কিভাবে তা ফিরে আসবে?
- ফিরে আসবে না। তখন আত্মহত্যার পথ বেছে নেবে।মৃত্যু নেই বলে আত্মহননই হবে একমাত্র আকাংখিত বিষয়। জীবনে যা চাওয়ার ছিল সব পেয়ে গিয়েছে, কোন কিছুর জন্য আর তৃষ্ণা নেই।এমনকি মনের মানুষও ইচ্ছে করলে সামনে এসে হাজির হয়।অনেকদিনের বিচ্ছেদ বলে কিছু নেই। টেলিপ্যাথিকালি সংযোগ স্থাপিত হয়। তাহলে আর কি বাকী থাকে?অভাব নেই। খাবার দাবারের কমতি নেই। দুর্ভিক্ষ, মহামারী, বন্য, খরা, বৃষ্টিহীনতা নাই। তখন বই পড়ে জানবে অনেক অনেক বছর আগে এই সব প্রাকৃতিক বিপর্যয় ছিল। তখন পৃথিবী 3D এনার্জি ফিল্ডে অবস্থান করতো। 5D থেকে বিচ্যুত হয়ে একটা গ্রহ সৃষ্ট হয়েছিল, যার নাম হলো পৃথিবী। মহাকাশ থেকে তাকে খুব সুন্দর দেখায় । সবুজ নীলে আঁকা যেন একটা চিত্রকর্ম। কিন্তু পৃথিবীর বাসিন্দারা ছিল খুব দুঃখী।ভয়ংকর সাফারিংস –এর মধ্য দিয়ে তারা যাচ্ছিল। প্রকৃতির বিরূপতা, শারিরীক রোগ ব্যাধি, আর্থ সামাজিক অবক্ষয়, অর্থনৈতিক দৈন্যতা –কি না ছিল?
আর এখন? সেসব থেকে পৃথিবীর মুক্তি মিলেছে। মানুষের অবাধ স্বাচ্ছন্দ্য এসেছে।কালো, খর্বাকৃতির মানুষ আর জন্ম নেয় না।সবাই সুদর্শন। আবার একই সাথে বানরের মত লাফ ঝাঁপ করার ক্ষমতাও আয়ত্তে এনেছে। মানে অ্যাথল্যাটিক ভাবসাব।
-কিভাবে এনেছে?
-DNA কে উন্নত করে।
-কিন্তু বানরের মতন লাফ ঝাঁপ?
-ঐ যে ডারউইন বলেছিলেন, মানুষ বিবর্তিত হয়েছে বানর থেকে। সেই বাণী মনের মাঝে এমন গাঁথাই না গেঁথেছে যে, সেই আধুনিক সময়েও বানর প্রীতি ছাড়তে পারবে না। তখন মানুষ অনেক দূর পর্যন্ত লাফ ঝাঁপ দিতে পারবে। এক ডাল থেকে আরেক ডালেও চড়তে পারবে। কিন্ত প্রয়োজন হবে না। কারণ জঙ্গলগুলো মাপ মতন তৈরী করা থাকবে।পশু পাখিগুলোও গুণে গুণে বসানো হবে। ঠিক যেন চারিদিকটা ছবির মতন হবে। শারীরিক শক্তি অনেক থাকলেও মানুষকে আর মুট বইতে হবে না। হাড়ভাঙা খাটুনি করে অকালে শয্যাশায়ী হতে হবে না।তখন শুধু সুখই সুখ।
২২/০৬/২০২৬
ল্যাম্পের আলো নিভু নিভু। তারই নীচে দাঁড়িয়ে কিচেন টেবিলে একমনে কাজ করে যাচ্ছে লিলিয়ানা।সন্ধ্যার দিকটায় তাদের বাড়ির চারপাশ একদম নির্জন হয়ে যায়। শহরের এই অংশতে লোকবসতি এমনিতেই কম।কিন্তু কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পর রাস্তাটা যেন আরো নিস্তেজ হয়ে যায়। তবে তার বাড়ির মালিক কাজ সেরে ফেরেন আরো দেরীতে। মাঝে মাঝে এমনও হয় যে, মালিকের সাথে তার দেখাও হয় না। রাতের রান্না সেরে টেবিলে তা পরিবেশন করে লিলিয়ানা ঘুমোতে চলে যায় রাত অনেক হলে।মালিক বাড়ি এসে খাবারটুকু নিজের মত খেয়ে ঘুমোতে চলে যান দোতলায়। এ বাড়িতে মালিক ছাড়া আর কেউ নেই।প্রায় দেড়শ থেকে দুশো বছরের প্রাচীন এ শহরে বাড়িগুলোও খুব পুরোনো।বাড়ির মালিকেরা সবাই পূর্বপুরুষ থেকে এসকল সম্পত্তির উত্তরাধিকারী।এ বাড়িটাও তেমনি। লিলিয়ানা এখানে কাজ নিয়েছে মাস ছ’য়েক হলো।ষাটোর্ধ মি. রবার্ট তার মালিক। সূউজারল্যান্ডের পাহাড়ী অঞ্চলের পাশ দিয়ে বয়ে চলা ছোট নদীটির তীরে এই শহর।
হাইস্কুল শেষ
করে কাজের উদ্দেশে বের হয়েছে লিলিয়ানা। এতো ভাল
একটা পরিবেশে কাজ পেয়ে যাবে তা সে ভাবতেই পারেনি। সবচেয়ে সহজ কাজ। সকালের নাস্তা
আর রাতের খাবার তৈরী করা।ঘরদোর পরিষ্কার করা। এ বাড়ির দ্বিতীয় তলায় থাকেন মি. রবার্ট।নীচের
তলায় কিচেনের পাশে ডাইনিং এর উলটা দিকে লিলিয়ানার থাকার ব্যবস্থা।কিচেনটা তার ভীষণ
ভাল লাগে। আসলে পুরো বাড়িটাই তার ভাল লাগে। ভীষণ cozy.
গ্রীষ্মের আগমনে
চারিদিক আলো ঝলমলে হয়ে যায়। শীত আসার আগে দিয়ে তেমন থাকে না। কিন্তু লিলিয়ান এসেই বেশ মানিয়ে নিয়েছে। আর তার
নিজের গ্রামও তো এ শহর থেকে বেশী একটা দূরে নয়।
বাড়িতে বৃদ্ধা
নানী আছেন শুধু। বাবা, মা –কে হারিয়েছে সেই ছোটবেলায়।আজ তা আবছা মনে পড়ে।স্পষ্ট নয়
তার স্মৃতির পাতায়। স্কুল ফাইনাল দিয়েই চলে এসেছিল শহরে। কাজও জুটে গেল।মি. রবার্টের
বাড়িতে গৃহ দেখাশোনার দায়িয়্ব। ভদ্রলোক একাই থাকেন।লিলিয়ান প্রথম থেকেই খেয়াল করেছে
বাড়িটা খুব শান্তিময় এক আবহ তৈরী করে রাখে।
শুধু সন্ধ্যাটা
একটু অন্যরকম। শুধু সন্ধ্যায় খাবার প্রস্তুতের সময় যখন কিচেন টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে
কাটাকাটির কাজ করে ভীষণ মনযোগ দিয়ে, তখনই চোখের কোণায় দেখতে পায় এক সৌম্য, সুন্দর মানুষের
ছায়া।প্রায় ছ’ফুট লম্বা, কালো চুল আর কালো চোখের গভীর চাহনি। ফিরে তাকাতেই ছায়াটা কোথায়
যেন হারিয়ে যায়। আর যদি একবারও ফিরে না তাকায়, তাহলে মানুষের সেই অবয়বটি তাকিয়ে থাকে
তার দিকে স্থির দৃষ্টিতে। লিলিয়ান না তাকালেও বুঝতে পারে ছায়ামূর্তিটি দেখছে তাকে নিবিড়
ভাবে।
কে ইনি?
এ বাড়িতে মালিক ছাড়া আর কেউ থাকে না। তাহলে কে আসে প্রতি সন্ধ্যায় ঘড়িতে ঠিক সাতটা বাজলে?
দু’ ঘন্টা টানা কাজ
করে লিলিয়ান। ৭টা
থেকে ৯টা। রাতের খাবার প্রস্তুত করে সকালের নাস্তাও রেডি রাখা। এই দুইটি ঘন্টা লিলিয়ানের
কাজে মনে হয় মিনিট দশেক। এমন কোনদিন নেই যেদিন সন্ধ্যায় সে সেই সৌম্য দর্শনের মানুষটিকে
না দেখে কিচেনের কাজ শেষ করে। তিনি খুব নিশ্চুপ। যেমন কিচেনের হল-ওয়ের আলো আঁধারিতে
ধীরে ধীরে প্রতীয়মান হয় তেমনি আবার ৯টা বাজবার সাথে সাথে কোথায় যেন মিলিয়ে যায়। লিলিয়ান
ভেবেছে মালিককে বলবে ও এইকথা। আবার এও ভেবেছে যে মালিককে এই ছায়ামূর্তির কথা বললে উনি
ভাববেনই বা কি? ভদ্রলোক নিজেই তো থাকেন একা। কাজে ব্যস্ত থাকায় পাড়া প্রতিবেশীদের সাথেও
তেমন মেলামেশা নেই তার। বাড়িতে কোন অতিথি, আত্মীয় স্বজনেরও আনাগোনা নেই।আর কেউ যদি
না থাকে এই বাসায় তাহলে কার আগমন ঘটে প্রতি সন্ধ্যায়? বাসার নীচের বেইসমেন্টে কখনো
যাওয়া হয়নি তার। কিন্তু সে নিশ্চিত এ বাড়িতে তার মালিক ছাড়া আর কোন দ্বিতীয় ব্যক্তির
উপস্থিতি নেই।
২
আজও সারাটা দিন
বেশ মেঘাচ্ছন্ন ছিল। এখন বসন্তের শেষ প্রায়।শীত আসি আসি করছে। আজকেও সন্ধ্যা ৭টায় কিচেনে
যাবে। কাজ শুরু করবে প্রতিটি দিনের মতন একই রুটিনে। মালিক যদিই বা আগে এসে পড়েন তাহলে
লিলিয়ান জানতে চাইবে অন্য কারো কথা। তার পরিবার পরিজন কে কোথায় আছে, তাদের কথা। মালিক
মি. রবার্ট খুব অমায়িক এবং মৃদুভাষীও।সহসা কোন বিষয়ের বিশদ বর্ণনা তার কাছ হতে পাওয়া
যেতে নাও পারে। তারপরও লিলিয়াবের শেষ চেষ্টা। এসব ভাবতে ভাবতেই দরজা খোলার শব্দ এলো।
মালিক এসে পড়েছেন কাজ থেকে। লিলিয়ানকে দেখে হাস্য বদনে অভিবাদন জানালেন। জানতে চাইলেন
কেমন আছে ও।
লিলিয়ান আলো ছায়া
মূর্তির কথাটি বলতে গিয়ে আবারো থেমে গেল। বলল শুধু, ‘ভাল আছি। নানী থাকেন গ্রামের বাড়িতে একলা। সামনের সপ্তাহ শেষে ছুটির দিনে
তার সাথে দেখা করতে যেতে চাই।’
মি. রবার্ট কোন
বাধাই দিলেন না। বললেন, ‘অবশ্যই যাবে। আমিই তোমায় পৌঁছে দিয়ে আসবো। বেশী দূরে তো নয়।’
তাই, যেই বলা সেই কাজ । ছুটি শুরু হতেই লিলিয়ান তার ব্যাগ গুছিয়ে তৈরী। দুপুরের খাবার
সেরে তারা বেরিয়ে পড়লো। ছোট নদীর পাশে ঘেঁষে এই শহর। আর তা পেরিয়ে খামারীদের মাঠ। তার
ওপারে তাদের ছোট গ্রাম। টুকটাক কথা বলতে বলতেই পৌঁছে গেল লিলিয়ান তার ঘরের দোর গোড়ায়।মি.
রবার্ট তাকে নামিয়ে দিয়ে আর বসলেন না।
লিলিয়ান তার নানী
মাকে দেখেই খুশীতে আত্মহারা। ছয়টি মাস দু’জনের দেখা সাক্ষাৎ নেই। যদিও ফোনের প্রচলন
হয়েছে কেবল। তারপরও প্রিয় মানুষটিকে একবার তো ছুঁয়ে দেখতে ইছে করে।আশপাশের সবার কথা
জানতে জানতে সামনের বাসার রবার্টের প্রসংগ এলো।
লিলিয়ানের একটা
ভালো লাগা যেন সে।
‘কেমন আছে ও?’
নানীকে জিজ্ঞাসা করতেই নানী চুপ হয়ে গেলেন। হাসিমাখা মুখটা ভার হয়ে গেল।লিলিয়ান আরো
কাছে এসে তার পাশ ঘেঁষে বসলো। আবারো জিজ্ঞেসা করলো, ‘কেমন আছে ও?’ সেই না ফায়ার ডিপার্টমেন্টে
যোগদান করেছিল সে, লিলিয়ান কাজ নেবারও কয়েক মাস আগে। খুব মনে পড়ে তার কথা। এখনও তো
ট্রেইনিং চলছে ওদের। বেশী একটা ছুটিছাটা পায় না বোধহয়।
গড়গড় করে কথাগুলো
বলে ফেলে আবার প্রশ্ন করলো লিলিয়ান, ‘এর মাঝে ক্রিসমাসে কি বাড়ি আসেনি সে?’ এক নাগাড়ে
কথা বলে যেতে থাকলেও নানী মা কিছু বলছেন না।নানীর নিশ্চুপ ভাব আর সইতে না পেরে তার
হাতটা ধরে লিলিয়ান একটু জোরেই চাপ দিয়ে বলল,
‘বলো না নানী, কেমন আছে রবার্ট? জান, আমি যার বাড়িতে কাজ করি তার নামও রবার্ট।সেখানে
আমি প্রতিদিন আমাদের সামনের হল-ওয়েতে রবার্টের মতন একজনের ছায়া দেখতে পাই। সন্ধ্যায়
তাকে দেখা যাবেই যাবে। আমার কিচেনের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকবে। ঠাঁয় তাকিয়ে থাকবে আমার দিকে।
যেন কতদিন না দেখার তৃষ্ণা। আমি খুব বেশী ভাবি ওকে নিয়ে, তাই না?’
নানী এবার তাকাল
লিলিয়ানের দিকে।ডাগর দুটো চোখ ওর সাধারণ ইউরোপীয়ানদের থেকে আলাদা। খুব মায়ায় ভরা। রবার্টও
সাধারণ সুইসদের মতো নয় দেখতে। যেন তার্কমিনিস্তানের মানুষদের যেমন ঘন কালো চুল আর গভীর
কালো চোখ হয় ঠিক তেমন। আশপাশের নীল চোখদের থেকে একদম ভিন্ন। লম্বা, শান্ত, সৌম্য একটা
ছেলে রবার্ট। এ গ্রামের সে যেন সকলের আদর্শ।
দীর্ঘশ্বাস এলো
নানীর বুক ভরা চাপা কষ্ট থেকে।
কিন্তু কেন এই
কষ্ট?
লিলিয়ান বুঝে
উঠতে পারলো না। নানীমা বললেন, ‘হয়তোবা রবার্টের সাথে তোমার কাজের জায়গার মালিকের নামের
মিল পেয়েছে বলেই রবার্ট খুঁজে খুঁজে সে বাড়িতে গিয়েছে। তোমাকে সেখানেই সে পেয়েছে।’
-‘মানে? আমায়
খুঁজে পেতে সে প্রতি সন্ধ্যায় আসে আমার কাজের জায়গায়?‘
নানী আর কিছু
বলতে পারছেন না। শুধু এতটুকুই বললেন, ‘হ্যা, সে আসে। নিশ্চয়ই আসে। তার মন তো পড়ে আছ
তোমার কাছে। তোমায় দেখতে ইচ্ছা করবে না?’
লিলিয়ান হেসে
ফেলে বলে উঠে, ’সেজন্য প্রতিদিন! উনি দেখা দেবেন, আবার হাওয়ায় মিলিয়ে যাবেন?’ এবার
নানী তাকে জড়িয়ে ধরে বলে উঠেন, ‘না্ রে লিলি। অমনটা ও না।রবার্ট যে ট্রেইনিং নিতে
গিয়ে মারা গেছে, তুই চলে যাবার পরপরই, মাস ছ’য়েক হলো। তাই এখন তো অফিসের ছুটি নেবার
কোন বাধা নেই তোকে দেখতে যেতে। ঠিক ঠিক খুঁজে নিয়েছে তার নামের বাসা। সেখানেই তো তুই
থাকিস।আর সেখানেই যে তার যাওয়া আসা।’
…
০৩/০৬/২০২৬
৩রা জুন, ২০২৬
বাড়ির পিছনে আমি ইট বাঁধানোর কাজ করছি, নর্থ আমেরিকায় যেমন হয়, বাড়ির টুকটাক সবকাজ নিজেরাই করে ।
দেখি চকচকে জুতো। তাকালাম একটু উপরে, দেখি কেউ একজন দন্ডায়মান।
তারপর আরেকটু উপরে। তাকিয়ে দেখি সুদর্শন এক সুপুরুষ। সেই হাসি মাখা মুখ, সেই বুদ্ধির ঝিলিক। বললাম, দাঁড়ান পথ করে দিচ্ছি। এদিক দিয়ে না যেয়ে এই পাপোশেটার ওপর দিয়ে যান। এমন ভাবে বললাম যেন খুব কথা বলে আলাপ করে অভ্যস্ত। আসলে মনপ্রাণ দিয়ে চাইছি স্বাভাবিক থাকতে। কখনোই তো কথা বলিনি। শুধু যে দু'চোখ ভরে দেখেছি।
কিন্তু উনি তো সরছেনই না। আবারো বললাম, জায়গা টা নরম ,মাটি শক্ত হয়নি। আর মনে মনে বললাম, শক্ত নয়, খুব নরম, আপনাকে দেয়া আমার মনটার মতোই।
যদি বুঝতেন।
শুনছেন- ই না। ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছেন।
কি যে করি।
একটু পর বললেন, তোমাকে কিছু কথা বলতে চাই।
এই শুরু হলো বুকে ব্যথা। আমার গলা গেল ভেঙে। বললাম, কথা বলবেন? তাহলে বাসার সামনের দিকে চলেন। সম্পূর্ণ ভাঙ্গা গলায়, হাত পা কাঁপছে আমার থর থর করে। আমি ভাবতে পারছি না এ কি সত্যিই ঘটছে।
সত্যিই।
আমি তো কল্পনায় তাকে ভেবে ভেবে আপন মনে কাজ করে যাচ্ছিলাম।
কিন্তু এ কিভাবে সম্ভব? উনি যে সত্যিই এসেছেন। বুকটা আমার কান্নায় ভেঙ্গে যাচ্ছে। খুব ব্যথা হচ্ছে। চোখে পানি এসে যাচ্ছে। আমি এসব কোন কিছুই চাই না যে উনি জানুক।
বাড়ির পাশ দিয়ে যেতে যেতে বললাম,’এদিকে তারকাঁটা আছে সাবধানে যেতে হবে।’
‘ব্যথা পাবেন’ বলেও বলিনি। সামনে এসে পূবের রোদ্র ঝলমল কাঠের বারান্দায় দাঁড়ালাম। ইচ্ছে হলো ভেতরে বসতে। তাই ঠেলে দরজা খুলে ভেতরে আসতে বললাম। আসলে কিছু বলিনি। দরজা খুলে ওনাকে নিয়ে আসলাম। ঘরের মেঝেতে আর চারিদিকে আমার যেমন থাকে - বইয়ের স্তুপ,অগোছালো। পাশে বাদ্য যন্ত্রের সমাহার- আমার প্রিয় ইয়ামাহা কি-বোর্ড। তার পাশে ডেস্কটপ, তার পাশে কিচেন। কি ভাবছে এসব দেখে কে জানে।
জিজ্ঞেস করলেন,‘বাসায় কে কে থাকে?’
পাশে দোতলার বেডরুমের সিঁড়িটা দেখেই বোধহয় জানতে চাইলেন।
বললাম, ‘কেউ না, আমি একাই। উইকেন্ডে ভাইয়ের ছেলেটা আসে, সে উপরে থাকে। আর দুটো বেডরুম সাজিয়ে রেখে দিয়েছি আমার ভাই আর আব্বু আম্মুদের আসার জন্য। কবে আসবে তারা, কে জানে। আমি নীচেই থাকি।’
এ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। কি তীব্র চাহনি। তাও আবার এত কাছ থেকে। কল্পনা না বাস্তব আমি বুঝতে পারছি না, আমার ঘোর শুরু হয়েছে। আমি মাথা নীচু রেখে সামনের জিনিসপত্র গুলো গুছিয়ে ওনাকে বসবার জন্য একটা চেয়ার দেবার চেষ্টা করছি। একটাই চেয়ার। আর কিছু নেই কেন? সাজানো ড্রইংরুম তো সকলের থাকে। আমার নেই কেন? আজ প্রথম মনে হলো, আমার ঘরটা যদি একটু গোছানো থাকতো। আজই প্রথম অনুভব করলাম এভাবে। এতদিন তো কখনো মনে আসেনি। জীবনের সব আয়োজন কি তাহলে অপরের জন্যই? নিজের জন্য না।
বেশ তো চলে যাচ্ছিল এমন সেট আপ –এ, কিন্তু আজ মনে হচ্ছে আমার ড্রইংরুমটা আরেকটু সাজানো থাকলে ভাল হতো। কি যে ভাবছেন উনি মনে মনে কে জানে?
বইপত্রগুলো শেলফ উপচে সোফা, এমনকি কার্পেটের জায়গাও দখল করে নিয়েছে। এক চিলতে জায়গা নেই।
ড্রইংরুমে কোথায় বসাবো ওনাকে?
জিজ্ঞেস করলেন, এখন তাহলে নেই ও বাসায়। আমি বললাম, না । ও হস্টেলে থেকে পড়ে। বাসায় আসে উইক- এন্ডেই।
এটুকু বলতেই গলা ভারী হয়ে এলো আমার। আমি যেন আর কোন কথাই বলার মত অবস্থায় নেই। চেয়ারে মনে হয় বসবেন না, যেহেতু একটা মাত্র চেয়ার।
বললাম, চা দিই?
বললেন, না কোন কিছুই লাগবে না।
যা ভেবেছিলাম।
আবারো প্রশ্ন, তোমার হাজবেন্ড কোথায় থাকেন?
আমার খুব কষ্ট হচ্ছে কথা বলতে। পারছি না স্বর তৈরী করতে। অনেক কষ্ট করে অনেক কান্না আটকে, যেন হাজার বছরের সব জমা হওয়া আবেগকে মাটি চাপা দিয়ে কথাগুলো বলে ফেললাম।
-উনি অস্টিনে থাকে।
- উনি আসেন না? কি করেন?
আমার যে এবার বুক ভাঙ্গা কান্না। এত প্রশ্ন কি কেউ করে? কি হবে আমার কথা জেনে?
বললাম, আমিই যাই ওখানে। আমার এখানে কাজ জুটেছে তাই এখানে থাকা। লম্বা ছুটি পেলেই চলে যাই ওখানে।ওনার নিজের কম্পানির কাজ । নিজের অফিস, তাই সপ্তাহে প্রতিদিনই কাজ।
তারপরের প্রশ্ন, ‘তোমার ওয়েব প্ল্যাটফর্মে কোন সাইট নাই?’
বেশ শক্তি নিয়ে আমি বললাম,‘ আছে তো। ফেসবুক আছে। তাতে আমার ২৯টা গ্রুপ। আমার নিজের শুধুমাত্র। আর কেউ নেই ওখানে।
বুকে প্রচন্ড ব্যথা হচ্ছে এবার আমার।
বললেন, ‘দেখাও তো।’
বাহ্। কত আগ্রহ।
পাশের টেবিলে ডেস্কটপের সামনে দাঁড়ালাম। সেই আগের মতই সাদা শার্ট , কালো ট্রাউজার আর চকচকে কালো জুতা। মাথাটা একটু নীচু করে চলা। কিন্তু আজ তার ছিটে ফোটাও নেই। সেই লাজুক ভাবটিও নেই। কোথা থেকে এত কনফিডেন্স চলে এলো ওনার? নাকি এ তার আরেকটা রূপ?
জানি না আমি। কিন্তু সত্যিই খুব রহস্যময় আজ সবকিছু। প্রথম কথা বলছি। কিভাবে বলছি, আমি জানি না। আমার ভেঙ্গে যাওয়া স্বর উনি কি টের পেয়েছেন?
কোথা দিয়ে সময় চলে গেল জানি না। শুধু মনে আছে উনি বললেন, ‘আমি যাব এবার।’
আমি বললাম, ‘গাড়ি কোথায় পার্ক করেছেন? বাসার সামনে নাকি পেছনের রাস্তার দিকে?’
বললেন,‘আমি তো গাড়িতে আসিনি।’
-মানে?
-আমি হেঁটেই এসেছি।
-কিভাবে ?
-আমি তো তোমার খুব কাছে থাকি।
আবার আমার অবাক হবার পালা। আমি বললাম,‘ কোথায় ? কোথায় থাকেন।’
–ওই যে... তোমার বাসার পিছনের দিকের যে রাস্তাটা দেখছ, তারই ঐ পাড়ে।
তাই কি উনি আমাকে দেখেছেন? তা না হলে কিভাবে জানলেন যে আমি আছি এইখানে, এই একই শহরে?
আমি বললাম, ‘তাহলে আসেন বাসার ভেতর দিয়ে। আপনাকে পিছনের বারান্দায় নিয়ে যাই । ওদিক দিয়েই যেতে হবে।’ কিচ্ছু বললেন না। শুধুই দেখছেন আমাকে। আমার দুচোখের জল আমি আর সামলাতে পারলাম না।
উনি দু’হাত দিয়ে আমার মাথার দু’পাশে আলতো করে ছুঁয়ে মৃদু একটু চাপ দিয়ে আরো কাছে এগিয়ে এলেন। আমাকে তার দিকে টেনে নিতে চাইছেন যেন।। আমি মুখ নীচু করে নীরবে চোখের জল সামলানোর চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম। পারছিলাম না। তার আলিংগনরত বাহুর মাঝে নিজেকে দেখে মুখটা তুলতেই দেখি সাদা শার্টের ওপর সাদা বোতাম। মুখটা আরেকটু উপরে তুলতে দেখি তার গলা,তারপর তার চিবুক। কিন্তু সাহস হয়নি তার চোখের দিকে তাকাবার। তার আগেই আমার মাথাটা যেন হেলে পড়ল ওনার বুকের মাঝে।
আমার সেদিনের সম্মতি তাকে কি ভাবিয়েছে আমি জানি না।
আজ এতদিন পরও আমি মনে করতে পারিনা তারপর কখন তিনি বাড়ি ফিরেছিলেন।
=> মন্ত্র
বিদ্যা
=> তন্ত্র
বিদ্যা
=> যন্ত্র
বিদ্যা
অনেকে কোন কিছু পেলে তাবিজ বা মন্ত্র বলে। কিন্তু কোনটা
আসলে কি তা জানে না।
মন্ত্র বিদ্যা: কোন প্রকার যাদু করতে
করতে হলে যদি নির্দিষ্ট নিয়মে সেই কাজের ধারা অনুযায়ী বিশেষ বাক্য জপ করা হয় তাহলে
সেটাকে মন্ত্র বলে। মন্ত্র বিদ্যা বেশিরভাগ সাধকরা প্রয়োগ করে থাকেন। আর এদের
মধ্যে আগৌরী (অঘোরী) সাধকরা বেশি শক্তিশালী।।।।
যন্ত্র বিদ্যা : আমরা অনেক সময় তাবিজের
মত কিছু জিনিস পাই যেগুলো তে কোন পশু বা মানুষ বা অন্য কিছুর চিত্র অংকন করা থাকে।
আর সেগুলো হল যন্ত্র। নির্দিষ্ট নিয়মে কোন শয়তানের চিত্র অংকন করেই তাকে হাজির
করার নাম যন্ত্র বিদ্যা। এতে কোন সাধনা বা মন্ত্র জপ লাগেনা।।। উপরের চিত্র ২ টি
হচ্ছে যন্ত্র বিদ্যা।।।
তন্ত্রবিদ্যা :যে কালো যাদুতে কোন
মন্ত্র উচ্চারণ লাগেনা,
কোন যন্ত্র করতে হয়না, শুধুমাত্র কিছু
নির্দিষ্ট জিনিস ব্যবহার করে যাদু শক্তি লাভ বা প্রয়োগ করা হয় সেগুলোকে তন্ত্র
বিদ্যা বলে। এখন অনেক অবাক হবেন যে এরকম যাদু আব্র কিভাবে করা যায়??? উদাহরণ
হিসিবে বলছি,,,,
খঞ্জন বা খঞ্জরীট পাখির নাম কি কেউ শুনেছেন?? এই পাখি
ধরে এনে খাঁচায় বন্দি করে রাখলে নির্দিষ্ট বয়সে তার মাথায় চুটি গজায়। কিছুদিন পর
সেই পাখি অদৃশ্য হয়ে যায় খাঁচার মধ্যে, কয়েকদিন পর আবার যখন
দৃশ্যমান হবে তখন তার চুটির পালক পড়ে যাবে, আর সেই পালক ত্রিশুল
দ্বারা মুকুট বানিয়ে মাথায় পড়লে অদৃশ্য হওয়ার শক্তি লাভ করা যায়। কিন্তু এসব অনেক
দুঃসাধ্য ব্যপার। তবে আশা করি বুঝতে পারছেন এখন, কারণ এই কাজে কোন
যন্ত্র আকা লাগে নি,
কোন মন্ত্র উচ্চারণ ও লাগেনা, আর এটাই তন্ত্র
বিদ্যা।।।
এবার আরেকটি বিষয়ে আসছি। স্বপ্ন তত্ত্ব নিয়ে একটি প্রশ্ন করেছিলেন সেই
বিষয়টা নিয়ে বলছি।।
আমি উনাকে বলেছিলাম যে স্বপ্নের ব্যাখা অবশ্যই থাকে। তবে
সেটা ভাল না খারাপ সেটা সময় ও তারিখের উপর কিছু নির্ভর করে। স্বপ্ন- শাস্ত্র মতে
মাসের তারিখ গুলোকে কয়েক ভাগে ভাগ করা হয়েছে অনেকটা জ্যোতিষবিদ্যার নিয়ম অনুসারে।।
সেটা আমি তুলে ধরছি।।।
স্বপ্নফল শুন্য কিংম্বা মিথ্যাঃ
3,4,14,18,20,23,28 ও
29 তারিখ
স্বপ্নফল সত্য
হইবেঃ
6,7,8,10,15,16,19,20,27 ও
30 তারিখ
ভালো-মন্দ
উভয় ফল হতে পারেঃ
13,21,22 ও 24 তারিখ
ফল অনেক
দেরিতে প্রকাশ
পাবেঃ
1,2,5,12 ও 17 তারিখে
সাধারনত দিবা ভাগের স্বপ্ন সে দিনের মধ্যে প্রকাশ পায়, ভোরের স্বপ্ন 1 থেকে 3 দিনের মধ্যে সফল হয় আবার অর্ধ রাতের স্বপ্ন 3 দিন থেকে 1 বছর কোন কোন ক্ষেত্রে 7 বছরও লেগে যেতে পারে সফল হতে।আর এইজন্যেই আমি বলেছিলাম যে স্বপ্নের ব্যাখা কিছুটা সময় আর তারিখের উপর নির্ভর হয়ে থাকে।''
এককথায় ~
চরিত্র ২: ব্যাঙ্গমী
স্থানঃ কদম গাছের ডাল
দুটি পাখি কদম গাছের ডালে। দুজনেই রোগগ্রস্ত। প্রথমজন অপুষ্টিতে ভোগা, মানসিক অবসাদগ্রস্ত একজন প্রৌঢ় । দিনে দু’বার বুক ধড়ফড়ানির ঠ্যালায় শয্যাশায়ী থাকে। পাশে থাকে তার বেঙ্গমী। সেও প্রৌঢ়া।কিন্তু বেঙ্গমার থেকে বছর দশেকের ছোট। হাঁটতে চলতে পারে, তবে খুড়িয়ে। মোট ১০১টা রোগের মধ্যে ১০২ খানাই তার আছে। তবে কড়া মেজাজের ব্যাঙ্গমার সাথে থেকে থেকে তার মেজাজ অত একটা দেখাতে পারে না। রাগ যে ব্যাঙ্গমীর ওঠে না –তা না। কিন্তু কি এক বিশেষ দুর্বলতার কারণে, কেন ব্যাঙ্গমী তাকে সহ্য করে চলে, তা সে নিজেও জানে না।তবে আজ ব্যাঙ্গমার মন বড্ড খারাপ হয়েছে। ব্যাঙ্গমীকে ডেকে তাই বলে, ‘যদি আমার কথা না শোন, আজ থেকে শত বৎসর পরে আমি কিন্তু কথা বলা বন্ধ করে দেব। তোমায় দিয়ে তো কিছু হয় না, তুমি তো অসুস্থ।শুধু পারো পাছা উলটা করে শুয়ে থাকতে।’
ব্যাঙ্গমী ভাবে তার পাছা কোথা থেকে এলো? পাখিদের কি পাছা থাকে? পাখিদের তো পুচ্ছ যে স্থানে থাকে, তাকে পুচ্ছদেশ বলে; কিন্তু মানুষের মত পাছা তো নেই ওদের।
ব্যাঙ্গমা আবার শুরু করে, ‘মানসিক ও শারিরীক – দুভাবেই তুমি অসুস্থ। তোমাকে দিয়ে আর কিছু হবেও না।তোমার বয়স হয়ে গেছে। ৭ বছর পর আরো বয়স হবে। আর সময় কোথায় কিছু করার? তারপর বাপ মরবে, মা মরবে। তখন আবার দৌড়ে বাড়ি যাবা। আর কোন কাজ তো নেই এ ছাড়া।
ইমোশান দিয়ে তোমার পৃথিবী চলে।
তুমি মানসিক রোগী। তুমি পাগল।
অবাস্তব জগতে তোমার বাস। থাকো ঐ ভুত পেত্নী নিয়ে।’
বলাবাহুল্য ঐ কদম গাছে একটা ভুত আর একটা পেত্নীর বসবাস আছে।
ব্যাঙ্গমা বলতে থাকে, আর কোথায় যেন তোমরা যাও ফুচকা খেতে? বসুন্ধরায়, তাই না? ওখানেই তো যাও।
ফুচকা খাও । ঘুরে বেড়াও।
বাপ মা’র জন্য তুমি কি কর? তোমার কোন ভূমিকা আছে তাদের জন্য?বাবাকে গোসল করাও , খাওয়াও? মায়ের কাছে যেয়ে বসো? হাত পা টিপে দাও? তেল মালিশ করে দাও? ’
ব্যাঙ্গমী তো পড়েছে এবার মহাবিপদে। কিভাবে বুঝাবে তার অসুস্থ মা আর যাই করুক , মাথায় তেল দেয় না। আজও তো তিনি বললেন তার কন্যাকে, ‘এই যে তুমি আছ আমার সামনে, এই- ই যথেষ্ট।’ কিন্তু এই ডায়ালগ ব্যাঙ্গমাকে বলার উপায় আছে নাকি ব্যাঙ্গমীর? গাছের ডালে বসে ব্যাঙ্গমী শুধু ব্যাঙ্গমার ধমকই শুনে যায় এর তরফা।আর ভাবে, এক ব্যারাইম্যার গাইল খাইয়া আরেক ব্যারাইম্যার ব্যারাম সারে না ক্যান? গাছের ডালের তল দিয়া কতজনা হেঁটে যায়। তারা তো হাঁসের মতন থপ্ থপ্ করে হাঁটে না। কানেও কম শোনে না। কানা রোগেও ভুগে না। গায়ে নাই তাদের অতিরিক্ত চর্বি। রক্তে নাই অতিরিক্ত চিনি। মনে নেই কোন আশান্তি, কোন যন্ত্রণা।সবার যে শুধু সফলতাই সফলতা। সবকিছুতেই জিত।আর ব্যাঙ্গমীর নিজের?
এ কি হাল?
দেখলে মনে হয় আটার বস্তা।
ব্যাঙ্গমা তো সকাল বিকাল চিনি মাপে। অধিক সচেতন।কিন্তু ব্যাঙ্গমীর শরীর যে ঝুরঝুরে। লিভারে দোষ। কিডনী তে দোষ।হৃদয় তো নাই-ই বহুবছর ধরে। তাই হার্টের খবর আর রাখে না।
রইলো বাকী কি/ আজকে পাওয়া অনন্য এক উপাধি।– ‘তুমি অসুস্থ। you are sick.
তুমি পাশে থাকলে আমি অসুস্থ বোধ করি। তোমার মা বাপও নিশ্চয়ই করে। তোমাকে দেখলে তো মনে হয় আমার মুখে কেউ বালিশ চাপা দিয়ে রেখেছে। এখানে এসে যে আমার পাশে বস, আমি বসতে দিই বলেই তো । না হলে ডালে ডালে উড়ে উড়ে এখানে এসে বসার সাহস পেতা?’
ব্যাঙ্গমী গালে হাত দিয়ে বসে থাকে আর ব্যাঙ্গমার প্রলাপ শোনে। তারপর তাকায় তার দিকে, আর ভাবে – এক ব্যারাইম্য গাইল পাড়ে তারই মতন আরেক ব্যারাইম্যাকে।
০২/০৬/২০২৬
....
[ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী বাংলা লোকসাহিত্য ও রূপকথার (যেমন—ঠাকুরমার ঝুলি) একটি অতিপরিচিত কাল্পনিক ও জ্ঞানী পক্ষীযুগল।
এদের মধ্যে পুরুষ পাখিটিকে 'ব্যাঙ্গমা' এবং স্ত্রী পাখিটিকে 'ব্যাঙ্গমী' বলা হয়।
এদের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:মানবসুলভ ভাষা: এরা মানুষের ভাষায় কথা বলতে পারে এবং মানুষকে বিভিন্ন ভবিষ্যৎবাণী ও সঠিক পথের সন্ধান দেয়।
প্রতীকী চরিত্র: রূপকথার গল্পে এদের প্রায়শই বুদ্ধিমান, দয়ালু এবং পথপ্রদর্শক হিসেবে দেখানো হয়। দক্ষিণরঞ্জন মিত্র মজুমদারের লেখা 'ঠাকুরমার ঝুলি'র বিভিন্ন গল্পে, বিশেষ করে 'লালকমল নীলকমল' গল্পে এদের দেখা মেলে।বাঙালির লোকসংস্কৃতিতে এই পাখি দুটি মূলত প্রজ্ঞা এবং শুভ শক্তির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।]
১ বছর বয়সী কন্যাকে সন্ধা, ২ বছর বয়সী কন্যাকে স্বরসতী, ৩ বছর বয়সী কন্যাকে কালিকা, ৫ বছর বয়সী কন্যাকে সুভগা, ৬ বছর বয়সী কন্যাকে উমা, ৭ বছর বয়সী কন্যাকে মালিনী, ৮ বছর বয়সী কন্যাকে কুব্জিকা, ৯ বছর বয়সী কন্যাকে অপরাজিতা, ১০ বছর বয়সী কন্যাকে কালসন্ধর্ভা, ১১ বছর বয়সী কন্যাকে রম্নদ্রাণী, ১২ বছর বয়সী কন্যাকে ভৈরবী, ১৩ বছর বয়সী কন্যাকে মহালড়্গী, ১৪ বছর বয়সী কন্যাকে পীঠনায়িকা, ১৫ বছর বয়সী কন্যাকে ড়্গেত্রজ্ঞা এবং ১৬ বছর বয়সী কন্যাকে অম্বিকা বলা হয়। হিন্দুশাস্ত্রে বলা হয়ে থাকে যে, এসব নাম জগম্মাতার স্বরূপের এক একটি গুণ প্রকাশ করে।
হিন্দুশাস্ত্র বাৎস্যায়ন অনুসারে বিয়েকে ৮ প্রকারে ভাগ করা হয়। এগুলো হল
১. ব্রাহ্ম, ২. প্রজাপত্য, ৩. আর্য্য, ৪. দৈব, ৫. অসুর বা আসুরিক, ৬. গন্ধর্ব, ৭. পিশাচ বা পৈশাচিক এবং ৮. রাক্ষস বিয়ে।
কারো কারো মতে বিয়ের এ ভাগগুলির পিছনে একইসাথে শাস্ত্র ও লোকাচার এ দুটোই ভূমিকা রেখেছে। কয়েকটি বিয়ে আছে যা সম্পুর্ণ লোকাচার ভিত্তিক। লোকাচার ভিত্তিক এ বিয়েগুলিতে কোন প্রকার মন্ত্রোচ্চারণ বা যাগযজ্ঞের প্রয়োজন হতো না। শাস্ত্র অনুমোদিত বিয়ের মূল অনুষ্ঠানগুলিতে মন্ত্রপাঠ, যজ্ঞ এবং বিধি অনুযায়ি কন্যা সম্প্রদান করা হতো।
৮ প্রকার বিয়ের মধ্যে প্রথম চার প্রকারের বিয়ে অর্থাৎ ব্রাহ্ম, প্রজাপত্য, আর্য্য ও দৈব বিয়েগুলি মূলত একই রকম, শুধুমাত্র পদ্ধতি এবং মন্ত্রের বিভিন্নতার জন্য নামগুলি ভিন্ন ভিন্ন। এ বিয়েগুলিতে পাত্র-পাত্রীর ভূমিকা কম, পিতা-মাতা বা গার্জিয়ানরাই এ বিয়ের আয়োজন করে থাকেন।
শেষোক্ত চার প্রকার বিয়ে অর্থাৎ অসুর বা আসুরিক বিয়ে, গন্ধর্ব বিয়ে, পিশাচ বা পৈশাচিক বিয়ে এবং রক্ষস বিয়েতে পাত্র-পাত্রীর ভূমিকাই মূখ্য।
গান্ধর্ব বিয়েতে অন্য নারীকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচিত নারীকে আকর্ষণ করার বিষয়টিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। যে নারীকে কাজে লাগানো হয়, তাকে বলা হয় ‘ঘটকী’। শব্দটি ঘটকের স্ত্রী লিঙ্গ। যেখানে পাত্রী কোন কারণে পাত্রকে পছন্দ করে না সেক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য। ঘটকীর প্রধান কাজ হয় পাত্রের অবস্থা ও অবস্থান সম্পর্কে পাত্রীকে নানানভাবে প্রলুব্ধ করে তার মন পাত্রের অনুকুলে নিয়ে আসা। পাত্রীর পিতা-মাতা বা গার্জিয়ান যদি অন্য কোন পাত্রকে পছন্দ করে তবে সেই পাত্র সম্পর্কে নানারকম কুৎসা রটিয়ে পাত্রীর মনকে বিষিয়ে তুলে পাত্রের দিকে নিয়ে আসা। পাত্রীকে কনভিন্স করে পুরোপুরি পাত্রের দিকে অনার পরে তাদের দু’জনের অভিসারের ব্যবস্থা করা এবং প্রণয় ঘনিষ্ঠকরণের মাধ্যমে বিবাহ করানো। একজন ব্রাহ্মণকে ডেকে অগ্নিস্বাক্ষী রেখে হোম করে গোপনে বিয়ে করিয়ে মিলন ঘটানো এবং পরবর্তীতে তা সমাজে প্রকাশ করাই এ বিয়ের বৈশিষ্ট। কাজটিকে সহজতর করার জন্য ঘটকীর বয়স এবং পাত্রীর বয়স কাছাকাছি রাখার কথা বলা হয়েছে। ঘটকী যদি পাত্রীর কাছাকাছি কেউ হয় তাহলে তাকেই এ দায়িত্ব দেওয়া উত্তম।
পৈশাচিক বিয়ে বাৎস্যায়নের যুগে প্রচলিত ছিল, এখন নেই। তরুণী যেখানে পাত্রকে পছন্দ করেনা এবং তাকে রাজি করানোর জন্য ঘটকী নিয়োগ করে গন্ধর্ব বিয়েও সম্ভব নয় সেখানে পৈশাচিক বিয়ে করা হতো। পাত্র, পাত্রীকে ফুসলিয়ে যুতসই কোন স্থানে নিয়ে তাকে মাদকদ্রব্য খাইয়ে অধজ্ঞানহীন ও উত্তেজিত করে তার সাথে যৌনমিলন করে, পরবর্তীতে পুরোহিত ডেকে সেই নারীকে বিয়ে করা। এটা হলো নারীর সর্বস্ব ছিনিয়ে নিয়ে তাকে অনোন্যপায় করে বিয়ে করতে বাধ্য করা। এজন্যই এটাকে বলা হয় পৈশাচিক বিয়ে। ধর্ষণকে সঙ্গায়িত করার পরে রাষ্ট্রীয় আইন ধর্ষিতার স্বার্থ সংরক্ষণ করায় এটি বন্ধ হয়ে গেছে।
রাক্ষস বিয়ে হলো জোর করে বিয়ে। কোন সুন্দরী বিয়েতে রাজি না হলে লোকজন নিয়ে জোর করে তাকে তুলে এনে পুরোহিত ডেকে হোম করে বিয়ে করা। পুরাকালে ক্ষত্রিয় রাজারা এভাবে জোর করে পাত্রী ধরে এনে বিয়ে করতেন। এখন আর এ বিয়ের প্রচলন নেই। রাষ্ট্রীয় আইন জোর করে তুলে আনাকে স্বীকৃতি না দেয়ায় এটি বন্ধ হয়ে গেছে।
আসুরিক বিয়েতে পাত্রীর কোন আত্মীয়কে অর্থকড়ির বিনিময়ে হাত করে তার সাহায্যে পাত্রীকে ভুলিয়ে বিয়ে করা। বর্তমান সমাজেও এ ধরণের বিয়ে প্রচলিত আছে। তবে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা প্রথম চার প্রকার বিয়ের মতো হয় বলে এটিকে আর আলাদাভাবে চোখে পড়ে না।
.................................................................
চার প্রকার বিয়ে প্রচলিত ছিল মহাভারতীয় যুগে - ব্রাহ্ম, গান্ধর্ব, অসুর, রাক্ষস। এর মধ্যে একমাত্র ব্রাহ্ম বিয়েতেই মন্ত্রোচ্চারণ এবং যজ্ঞের আয়োজন হতো। বৈদিক যুগের পর এর সঙ্গে যোগ হয় আরো ৪ প্রকার বিয়ে। এগুলো হল ক) দৈব খ) আর্য গ) প্রজাপাত্য ঘ) পৈশাচ। পৈশাচ ছাড়া অন্য বিয়েগুলো ছিল যজ্ঞ ও মন্ত্র নির্ভর।
এ ৮ রকম বিয়ের মধ্যে বেশিরভাগ পন্ডিতরা ব্রাহ্ম,দৈব, আর্য ও প্রজাপাত্য বিয়েকে উন্নত ও আধ্যত্মিক বিয়ে নামে অভিহিত করেছেন।
শাস্ত্রজ্ঞান সম্পন্ন পাত্রের কাছে যজ্ঞ ও মন্ত্রোচ্চারণসহ কন্যাদানের নাম ব্রাহ্মবিবাহ।
যজ্ঞাদিসহ অলঙ্কারাদি দিয়ে সাজিয়ে কন্যাদান দৈববিবাহ।
বরের কাছ থেকে এক বা একাধিক গোমিথুন নিয়ে কন্যাদান আর্যবিবাহ।
উভয়ে মিলিত হয়ে ধর্মাচারণ কর- এ উপদেশ দিয়ে অর্চনা সহকারে কন্যাদান প্রজাপাত্য বিবাহ।
অর্থের বিনিময়ে মেয়ে কিনে তাকে বিয়ে করার নাম ছিল অসুর বিবাহ।
গান্ধর্ব বিবাহ মূলত প্রেমের বিয়ে। পিতামাতার অজ্ঞাতে দুজন প্রাপ্তবয়স্কের সম্মতিক্রমে এ বিয়ে অনুষ্ঠিত হত। মহাভারতে অর্জুন চিত্রাঙ্গদার এ বিয়ে হয়।
সমাজ মনোবিজ্ঞানী ওয়েস্টমার্ক রাক্ষস বিয়েকে ম্যারেজ বাই ক্যাপচার এবং অসুর বিবাহকে ম্যারেজ বাই পারচেজ নামে অভিহিত করেছেন। এদুটি বিবাহ ধর্ম মতে নিকৃষ্ট ও শাস্তি যোগ্য।
একুশ শতকের প্রারম্ভকাল পর্যন্ত হিন্দু সমাজ বিশেষত বাঙালি সমাজে প্রজাপাত্য বিয়েই প্রচলিত।
.........................
হিন্দু ধর্মাবলম্বিদের বিয়েতে প্রধানত দু’টি আচারগত বিষয় পরিলক্ষিত হয় যথা, বৈদিক ও লৌকিক। লৌকিক প্রথাগুলি লোকাচার সম্পর্কীয় এবং অঞ্চলভেদে ভিন্ন ভিন্ন হয়। বৈদিক প্রথাগুলি বিধিবদ্ধ শাস্ত্রীয় প্রথা এবং বিয়ের মূল অঙ্গ। তবে এই রীতিগুলিও অঞ্চল, বর্ণ বা উপবর্ণভেদে ভিন্ন হতে পারে।
হিন্দু বিয়ে বেশ কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়।
প্রথম ধাপের নাম ‘পটিপত্র’। এটি ‘লগ্নপত্র’ বা ‘মঙ্গলাচরণ’নামেও পরিচিত। বিয়ের দিন-তারিখ, দেনা-পাওনার হিসাব চুড়ান্ত করার জন্য যে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, তাকেই বলে পটিপত্র।
দ্বিতীয় ধাপের নাম ‘পানখিল’। এটি দুই ধাপে সম্পন্ন হয়, একটি বরের বাড়িতে অন্যটি কনের বাড়িতে। মঙ্গলাচরণ অনুষ্ঠানে বাড়ির মেয়েরা ও প্রতিবেশীরা মিলে বিয়ের গান গাওয়া হয়।
তৃতীয় ধাপের নাম ‘দধিমঙ্গল’। এদিন বর ও কনে উপবাস থাকে। সম্পুর্ণ উপবাস নয়, এ সময়ে পানি ও মিষ্টি খাবার বিধান আছে।
চতুর্থ ধাপের নাম ‘গায়ে হলুদ’। এটি সাধারণত বিয়ের দিনই সম্পন্ন হয়। প্রথমে বরের গায়ে হলুদ মাখানো হয়, পরে সেই হলুদ কনের গায়ে দেবার জন্য কনের বাড়িতে পাঠানো হয়।
পঞ্চম ধাপের নাম ‘শঙ্খ কঙ্কণ’। এ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কনেকে শাঁখা পরানো হয়। এই পাঁচটি ধাপ আচার সম্পর্কীত, বিয়ের মূল অনুষ্ঠান নয়। বিকেলের দিকে ষষ্ঠ ধাপ থেকে শুরম্ন হয় মূল অনুষ্ঠান।
ষষ্ঠ ধাপের নাম ‘বর বরণ’। কনের মা বা নিকট আত্মীয়া একটি থালায় প্রদীপ, ধান, দূর্বা ও অন্যান্য সামগ্রী নিয়ে বরকে বরণ করেন।
সপ্তম ধাপের নাম ‘সাতপাক’। বিয়ের মন্ডপে প্রথমে বরকে আনা হয় এবং পরে পিড়িতে বসিয়ে কনেকে এনে তাঁকে বরের চারপাশে সাতপাক ঘোরানো হয়। এ সময়ে কনে পানপাতা দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে রাখে।
অষ্টম ধাপের নাম ‘শুভ দৃষ্টি’। বিয়ের মন্ডপে বর ও কনে একে অপরের দিকে দৃষ্টি বিনিময় করে।
নবম ধাপের নাম ‘মালা বদল’। এ সময়ে বর ও কনে মালা বদল করে।
দশম ধাপের নাম ‘সম্প্রদান’। কনের বাবা বা গার্জিয়ান, বরের কাছে বেদমন্ত্রে কন্যা সম্প্রদান করেন।
একাদশতম ধাপের নাম ‘অঞ্জলী’। কনে ও বর একসঙ্গে আগুনে খই ছুড়ে দেয়। প্রচলিত বাংলায় একে বলে ‘খই পোড়া’।
দ্বাদশ ধাপের নাম ‘সিঁদুর দান’। এখানে বর বধুর মাথায় সিঁদুর দিয়ে দেয়।
ত্রয়োদশ ধাপের নাম ‘অগ্নিসাক্ষী। এসময়ে বরের ধুতির পিছনে বধুর শাড়ির আচল বেঁধে দেওয়া হয় এবং বরের পিছনে পিছনে বধু অগ্নিকে কেন্দ্র করে সাতবার ঘোরে। এটি হিন্দু বিয়ের শেষ রীতি।
বাংলাদেশে এখনও হিন্দু সম্প্রদায়ের বিয়ে পারিবারিক নিয়মে হয়, কোন রেজিষ্ট্রেশন হয়না। হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে বিয়ে কোন চুক্তি বিশেষ নয়, এটি একটি পবিত্র বন্ধন ও ধর্মীয় নির্দেশ। দশটি অবশ্য পালনীয় ধর্মীয় কর্তব্যের মধ্যে বিয়ে একটি। এখানে বিবাহ বিচ্ছেদ ও পুনর্বিবাহ স্বীকৃত নয়। ভারতে ১৯৫৫ সালে হিন্দু বিয়ে রেজিষ্ট্রেশন আইন চালু হয়েছে এবং বিয়ে রেজিষ্ট্রেশনকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বাংলাদেশে এখনও এমন কোন নিয়ম চালু হয়নি। ফলে এ দেশে হিন্দু মেয়েদের বৈবাহিক অধিকার এখনও আইন দ্বারা স্বীকৃত নয়।
...............................................
হিন্দু মতে বিয়েতে আমরা দেখতে পাই, আগুনের কুন্ডলীর চারপাশে বর-বউকে ঘুরতে। একে সাত পাকে বাঁধা পড়া বলা হয়। বলা হয়, এর মাধ্যমে অগ্নিদেবতাকে বিয়েতে সাক্ষী হিসেবে রাখা হয়। শুধু আগুনের চারপাশে ঘোরাই নয়, এই সময়ে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতিও দিতে হয় একে অপরকে।
প্রথম প্রতিশ্রুতি- প্রথমে বর তাঁর বউ এবং তাঁর ভাবী সন্তানদের যত্ন নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। বিনিময়ে কনেও প্রতিশ্রুতি দেন যে তিনি তাঁর স্বামী এবং তাঁর পরিবারের যত্ন নেবেন।
দ্বিতীয় প্রতিশ্রুতি- এবার বর প্রতিশ্রুতি দেন যে তিনি তাঁর স্ত্রীকে সবরকম পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করবেন। বিনিময়ে কনেও প্রতিশ্রুতি দেন যে তিনি স্বামীর সবরকম যন্ত্রণায় পাশে থাকবেন।
তৃতীয় প্রতিশ্রতি- এবার বর প্রতিশ্রুতি দেন যে তিনি তাঁর পরিবারের জন্য রোজগার করবেন এবং তাঁদের দেখভাল করবেন। একই প্রতিশ্রুতি এবার কনেও করেন।
চতুর্থ প্রতিশ্রুতি- স্ত্রীর কাছে তাঁর পরিবারের সমস্ত দায়িত্ব তুলে দেওয়া এবং একইসঙ্গে স্ত্রীর সমস্ত মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন বর। স্ত্রী তাঁর সমস্ত দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করার প্রতিশ্রুতু দেন।
পঞ্চম প্রতিশ্রুতি- যে কোনও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে স্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করার প্রতিশ্রুতি দেন বর। স্বামীকে সমর্থন করার প্রতিশ্রুতি দেন স্ত্রী।
ষষ্ঠ প্রতিশ্রুতি- স্ত্রীর প্রতি সত্য থাকার প্রতিশ্রুতি দেন স্বামী। স্ত্রীও স্বামীর প্রতি সত্য থাকার প্রতিশ্রুতি দেন।
সপ্তম প্রতিশ্রুতি- শুধু স্বামী হিসেবেই নয়, বন্ধু হিসেবেও সারাজীবন স্ত্রীর সঙ্গে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন বর। বিনিময়ে স্ত্রীও স্বামীর সঙ্গে জাবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত থাকার প্রতিশ্রুতি দেন।
সংগৃহীত
ফুল যখন ফুটলো তখন সুবাস নেবার কেউ নেই। ** জীবনের ছোট ছোট ইচ্ছেগুলো থেকে জীবন বঞ্চিত করেছে কিন্তু