ব্লগে আমার ১৮ বছর পূর্তি




এমনি একদিন  ২০০৭ । অনলাইন   একটি ই- ম্যাগাজিন সম্পাদনার কাজ করি। অবনী অনার্য  পাকা লেখক। তার থেকে লেখা নিয়ে আমার ই- ম্যাগাজিন সমৃদ্ধ। যার  হাতে খালিল জিবরান এর কাব্যগ্রন্থ 'দি ম্যাড ম্যান'-এর  অনুবাদ  'উন্মাদ' প্রথম লিখিত হয়। অনলাইনে  ই-বুক হিসাবে  আমি তা প্রকাশ করি। তখন অনুবাদটি খুবই পাঠক সমাদর পেয়েছিল। আমার সকল লেখকদের সাথে যোগাযোগ হতো ইয়াহু চ্যাট গ্রুপের মাধ্যমে (খুব সম্ভবত) । খুব সম্ভবত বললাম কারণ আমার ফেসবুকের যাত্রা ২০০৯ এর মে  মাস থেকে। তখন তো চ্যাট প্ল্যাটফর্ম বলতে ইয়াহু ছিল সবচেয়ে বিশাল।   

 ২০০৭ -এ অবনী  সামু ব্লগের কথা বললেন। সিডর এর ঝড়ের সময়ের কথা । ২০০৭ এর নভেম্বর। বাপ্পার সাথে যিনি গান গাইতেন সঞ্জীব -দা তিনি সেই ঝড়ের দিন মারা গেছেন, তাই ঐ সময়ের কথা  মনে আছে। আমি  অবনীর   লেখার লিংক ধরে সামু ব্লগ দেখলাম।  তিনি যদিও সামুতে  আরো আগে থেকে লেখেন। https://www.somewhereinblog.net/blog/aunarjoblog ব্লগে লেখার সমাহারে আমি অভিভূত। ৩১শে অগাস্ট ২০০৭  থেকে  আরেকটা নতুন ই ম্যাগাজিনের  সম্পাদনা শুরু করেছিলাম। সেই ম্যাগাজিনের জন্য লেখা সংগ্রহ শুরু হলো  ডিসেম্বর মাস থেকে এ ব্লগের লেখকদের থেকে। কত না লেখা পেয়েছি সামু থেকে । লেখকরা খুব আন্তরিকতার সাথে আমাকে তাঁদের লেখা ছাপাবার অনুমতি দিতেন। সামু -র লেখা যেন এক একটা হীরার খন্ড। সামু ব্লগ যেন মণি মাণিক্যে ভরপুর।

তারও অনেক পরে একটু সাহস করে   ভাবলাম আমিও ব্লগে কিছু লিখি। কিন্তু আমি তো লিখি না।  লেখা সম্পাদনা করি। তাহলে কি লেখা যায়? সবচেয়ে সোজা একটা বিষয় - 'নাসা'র সাইট থেকে গ্যালাক্সির বিবরণ দিয়ে কিছু লেখা যায়।

সেই প্রথম  ২০০৮ এ এসে সামুতে পোস্ট  লিখলাম 'অ্যান্টেনা' গ্যালাক্সির কথা।  https://www.somewhereinblog.net/blog/humaira_haroon/28800831

সামু তার সিস্টেমে দেখাচ্ছে প্রথম পোস্টের তারিখ  ২১শে মে ২০০৮; এমনি এক দিন শুধু ১৮ বছর আগে। তখন  ফ্লরিডা থেকে মাত্র এসেছি ঢাকায়। ঢাকা থেকে ফোন নাম্বার দিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলে লগ- ইন করলাম। । আমার আমেরিকান বন্ধু সিন্ডি আমার বাংলা লেখা পড়তে না পারলেও গ্যালাক্সির ছবি দেখে খুব খুশী। বললেন  এই গ্যালাক্সিটাকে 'ক্যন্ডি ফ্লসের' মতো দেখাচ্ছে , মানে আমরা যাকে বলি শন পাপড়ি।

তারপর থেকে আরো অনেক অনেক  গ্যালাক্সি নিয়ে একটু একটু করে লেখা দিয়েছি।   

সামু আমাদেরকে ভাবতে শিখিয়েছে, ইন্টার-অ্যাক্ট করতে শিখিয়েছে, লিখতে শিখিয়েছে। রাত দিন একাকার হয়ে যেত। কোথা দিয়ে সময় যেত টের পেতাম না।শুধুই সামু-তে বিচরণ।

সামুর কাছে আমরা সব সময় কৃতজ্ঞ।                                                                               

  • চিত্রঃ ব্লগ লিখেছি ১৮ বছর ১৯ ঘন্টা
জীবনের অষ্টাদশে যখন পা দিয়েছিলাম তখন বুঝিনি ১৮ -তে পড়ার কি মজা।   তারপর আরো বহু দশক অতিক্রম করে আবারো  ফিরে পেলাম সেই অষ্টাদশ। এবারের উপলব্ধিই অন্যরকম।


একবার ধরতে পারলে


কলার বোনটা যখন ব্লাউজের ফাঁক দিয়ে প্রমিনেন্ট হতো, লিজার্ড আঁতকে উঠে উল্টো দিকে কাত হয়ে পড়ে যেত।

 এই মরোক্কর বেদুইন সুন্দরী তার সামনে এলো কোথা থেকে ?

ভাগ্যে তো জুটে শুটকি মাছ। পচী।

 নিজে যেমন পচা শুটকি, তেমনি একটা দুর্গন্ধময় শুটকিকে নিয়ে তার ইটিশ পিটিশ। ঘর করে না ওর সাথে। নাকি করে কে জানে? ঘরে তো কেউ থাকতেই চায় না তার সাথে। কিন্তু এক ঘন্টার জন্য কি মৌটুসীকে ডেকে তার ঘরে নিয়ে যাওয়া যাবে না? কায়দা করতে হবে । বুদ্ধি আঁটতে হবে। অবশ্য বুদ্ধিতে তার থেকে পারদর্শী আর কে আছে?

 আজ যদিও পচী, শুটকিকে বলেছে তাকে নিয়ে যেতে হবে কলেজে । প্রফেসর অজিত রয় চৌধুরীর সাথে দেখা করবে। এম.ফিলে ভর্তির সুযোগ পাওয়া যায় কিনা সেটা আলাপ করবে। এবার বলে প্রচুর ছেলেমেয়ে এম.ফিলে ভর্তি হয়েছে। রেকর্ড নাম্বার। তার মাঝে অম্বার ভাইয়ের যে বউটা আছে না রত্না, সেও ভর্তি হয়েছে। প্রফেসর লিজার্ড কলেজে যাওয়ার পথে পচীকে নিয়েই কলেজে যাবে। প্রফেসর অজিতের অফিস তো তার কক্ষের পাশেই। বেশি দূরে না। সুতরাং অসুবিধা কি? 

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মুখে পাউডার মাখতে মাখতে পিছনে ফিরে তাকাল পচী। ধোঁয়ায় টান দিতে দিতে আনমোনা হয়ে পচীর দিকে তাকিয়ে  লিজার্ড তাকে দেখছে আর  ভাবছে, ‘এ কেমন জিনিস জুটে আমার ভাগ্যে? পচীর বুকটা তো একেবারেই সমান। খায় না ? নাকি অপুষ্টিতে ভুগে  এই অবস্থা হয়েছে তার, কে জানে! তবে তাকে স্লিম বলা যায় না। শুটকি মানে তো শুটকি।‘

 এসব ভাবতে ভাবতেই পচী তার দিকে তাকালো। বলে উঠলো, ‘কি ভাবছো আনমোনা হয়ে?

 লিজার্ডের একটাই উত্তর, ‘রেডি হয়ে থাকলে চলো।‘ 

দুজনে রিক্সা করে ঘটর মটর করে কলেজে এসে হাজির হতেই প্রিন্সিপালের ল্যাবে  লিজার্ডের ডাক পড়ল। প্রিন্সিপালের ল্যাবেই অম্বার ভাইয়ের ওই বউটি আছে না রত্না, সে সম্প্রতি কাজ নিয়েছে। ল্যাবের সামনেই দাঁড়ানো সে। লিজার্ড পচীর কানে কি যেন বলল। রত্না বুঝতে পারলো না। ল্যাবে ঢুকে  লিজার্ড মহাশয় অধ্যক্ষের সাথে কথা বলতে শুরু করল। তাই  ল্যাবের একটু বাইরের দিকে দাঁড়িয়ে আছে রত্না। পচীর দিকে তাকিয়ে রত্না ভাবতে শুরু করল, ‘এটাই কি প্রফেসর লিজার্ডের স্ত্রী? কিন্তু ঐ মহিলা বলে তাকে ছেড়ে গেছে। চলে যাবার সময়ে কলেজে এসে সব শিক্ষকদের বলে গেছে তার স্বামীর কথা। স্বামী প্রবর সারাক্ষণ সিগারেটের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে। তাই  তার স্ত্রীর প্রতি কোন আকর্ষণ অনুভব করেনা।'  

এমন কিছুই তো শুনেছিল রত্না। তাহলে এই সাত সকালে প্রফেসরের সাথে কলেজে আসা এই পচা শুটকি  মার্কা মহিলাটা কে? 

ওরে বাবা! 

কেমন যেন ডাইনির মত করে রত্নাকে দেখছে। 

রত্নাকে চেনে নাকি? নাকি লিজার্ড মহাশয়  ল্যাবে প্রবেশ করার প্রাক্কালে পচীকে বলে গেছে,  ‘এটাই সেই মেয়ে। অম্বার ভাইয়ের বউ - রত্না।‘

অম্বা তাদের  পারিবারিক পর্যায়ের প্রিয় এক বন্ধু। লিজার্ডের স্ত্রী আর অম্বা মিলে রত্নার গল্প করে লিজার্ডের কান ঝালাপালা করে দিয়েছিল একবার। রত্না  তো লিজার্ডের কলেজেরই  ছাত্রী। মানে তারই তো ছাত্রী। সুতরাং  এই ছাত্রীর ঘাড়টা মটকানো এবং পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেওয়া লিজার্ডের জন্য কোন ব্যাপারই না। তার বদলে কি পাবে প্রফেসর?  অম্বার বাবা লিজার্ডকে লক্ষ লক্ষ টাকা দিবে। 

অম্বার বাবার এতে আগ্রহ কেন? 

কারণ অম্বার বাবা বহু আগ্রহ করে তার প্রতিবন্ধী ছেলেকে বিয়ে দিয়েছিল রত্নার সাথে। ছেলের বউ বলে কথা। চাকরের মত থাকবে, মুখে একটা টু শব্দ করবে না- তা না- বউখানা কিনা ভেগে গেল? তার শ্বশুরের সকল প্ল্যান ভেস্তে দিয়ে ভেগে গেল! চেয়েছিল, ছেলে যেহেতু  লায়েক না, সে নিজে ছেলের বউকে ঘরে আটকে একদিন খেয়ে দিলেই তো সব কাজ সারা হয়ে যাবে। পেটে বাচ্চা এনে দিলে ছেকের বউ কি আর মুখ খুলবে? তার প্রতিবন্ধী ছেলেটার না হয়ে এই ফাঁকে কপাল খুলে যাবে। 

কিন্ত্য রত্না হাত থেকে ফস্কে গেলে প্রতিশোধের নেশায় উন্মত্ত  শ্বশুর লিজার্ডের সহায়তা চেয়েছিল।  এসব প্ল্যানে প্রফেসর লিজার্ড বেশ সাহায্য করেছে শ্বশুরকে।  এক সাবজেক্টে গোল্লাও পাইয়ে দিয়েছে রত্নাকে। পচী সব জানে। তাই রত্নাকে কলেজের এই অন্ধকার করিডোরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে একভাবে  দেখছে আর ভাবছেঃ কত কথাই না  শুনেছি এতদিন। আমরা সবাই মিলে কর্মও করেছি।  আর আজ সেই মেয়েটিকে দেখার সুযোগ হলো! বাবারে বাবা! মেয়েটার কি মাংস গা ভর্তি। কোন চাউলের ভাত খায় মেয়েটা? আমার গায়ে এত মাংস নাই কেন? মাংস থাকলে আজ লিজার্ড মহাশয়কে তো মুখে ভরে দিতে পারতাম সব। সুখেও ভরে দিতে পারতাম । 

পচীর  রানওয়ের মতো সমান বুকটা তখন কিছুটা না হয় উঁচু থাকতো। তার শুটকি মাছের মতন হাত –পাগুলোর  চামড়া টানটান থাকতো। গালে মুখে চর্বি থাকতো। ফেস পাউডার মাখলে তা সার্থক হতো। 

কিন্তু পচীর  কিছুই তো হলো না। এর মাঝেই অধ্যক্ষের ল্যাব থেকে প্রফেসর লিজার্ড বের হলেন। তার কথা শেষ। পচীকে নিয়ে এবার তিনি তার কক্ষে চলে যাবেন।  রত্নাকে চিনিয়ে দেবার জন্য  পচীকে নিয়ে  হাঁটতে হাঁটতে পিছন ফিরে তাকালেন। কিছু একটা বললেন। রত্না তাদের এসব কর্মকাণ্ড দেখে শুধু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। কলেজের ক্লাসরুমের সামনে এক প্রফেসর তার বগল-দাবা করে আনা,  তার হাঁটু অব্দি  লম্বা কোন মহিলার কানের কাছে মুখ নিয়ে  ফিসফিস করে কথা বলে  চলছে , আর তাদের  সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ছাত্রীকে দেখিয়ে দিচ্ছে। এই কর্মকান্ডগুলো যে তারা ঘটাচ্ছে তা  কেমন দেখায়, এ বিষয়ে তাদের হুঁশ কি কাজ করছে না? 

সব হুঁশ তারা নিমেষে যেন হারিয়ে ফেলছে। রত্না তাহলে সাধারণ ছাত্রী নয়!  রত্না হয়তো বা তাদের কোন এক গোপন গল্পের নায়িকা। 

এই ভাবনায় রত্নার বেশ আফসোস লাগলো। লিজার্ড সাপের মত পেঁচানো ভীষণ ছিপছিপে লম্বা একজন ব্যক্তি। কলেজে সে ব্যক্তিত্ববান ব্যক্তি। মুখে সবসময় নায়ক সুলভ সিগারেটের ধোঁয়া উড়েই চলছে। অমায়িক ব্যবহার । টের পাবার কোন উপায় নেই তার সাপের মতন লিকলিকে মানসিকতা। পাশে তার বগল দাবা করা আরো একটা তারই মতন শুটকি মাছ। শুটকির ভাগ্যে শুটকিই জুটে। যা তার ভাল লাগে না। তাই বিভাগের সুন্দরী ছাত্রী মরোক্কান সেই বেদুইন সুন্দরীর  কলার বোন, কোমরের বাঁক, শাড়ি পড়ার দিনে তার আঁচলের ফাঁক দিয়ে পেটের মসৃণ চামড়ার  নিচে নাভির  এক ঝলক  দেখে ফেলা , তার ভেতরের ফণাটাকে  হিসহিস করে  তোলে।  তখন লিজার্ডের শুধু ওই একটা কথাই মনে পড়ে - পচীর  সামনে পিছনের সমান শরীরখানা। আজকাল যত বয়স বাড়ছে তত  আর কেন জানি তার এসব ভালো লাগছে না। এমনকি মৌটুসীকে বাস্তবে হাতাতে না পারলেও, তাকে কল্পনা করে যে শুটকিকে ছুঁবে সে রুচিও  আর হচ্ছে না। প্রাক্তন স্ত্রী কলেজের  সবাইকে বলে গেছে  লিজার্ড  মহাশয় অক্ষম। একেবারেই অক্ষম। কিন্তু লিজার্ড  নিজে জানে সে কতটা সক্ষম। যদি মৌটুসীকে কায়দা করে একবার, তার কিলবিলে শরীর দিয়ে জাপটে ধরতে পারে, তাহলে তাকে পাটিসাপ্টার মতন করে এমন চাপ্টা করে দেবে, যে কেউ বলতে পারবে না  সে, অক্ষম।


স্বপ্ন - ২

প্রফেসর এমিলিয়া গর্ডন। 

সুইডেনের উপসালা ইউনিভার্সিটির পলিটিকাল সাইন্স -এর শিক্ষিকা। সুদর্শনা, সুবচনা, ব্যক্তিত্ব সম্পন্না, মনোমুগ্ধকর একজন প্রিয় মানুষ আমার। আজ তাঁর লেকচার আছে সেমিনার রুমে। বাইরের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ থেকে  বেশ কয়েকজন গেস্ট লেকচারার আসবেন তাদের ছাত্র ছাত্রী সহ। তাই মনে মনে কিছুটা শিহরিত আমি। আজ যেন নতুন ভাবে আমার প্রফেসরকে দেখবো। এত বড় মাপের সেমিনারে আজই প্রথম যাচ্ছি। 

ক্যাম্পাসের আলো ঝলমলে দিন খুব একটা পাওয়া যায় না। আজ সকালটা যেন অন্যরকম লাগছে। আসলে বসন্তের আগমনে প্রকৃতির চেহারা খুব দ্রুত পাল্টাতে শুরু করে।  মাঠ পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচার থিয়েটারের রিসেপশান লবিতে প্রবেশ করতেই  সাক্ষাত পেলাম এমা-র। এমা প্রফেসর গর্ডনের একমাত্র কন্যা।  দশ বছর হলো এবার তার। অথচ আমার সাথে তার ভীষণ ভাব। আর ভাব হবেই না কেন? পড়াশোনার বাইরেও যে আমাদের আরেকটা যোগাযোগ আছে। আমার পিতার চাকরীর সুবাদে আমারা আর এমার পুরো পরিবার ক্যম্পাসের কাছে একই  পাড়ায় বসবাস করি।  সেদিক থেকে বিচার করলে প্রফেসর এমিলিয়ার পরিবার আর আমার বাবা, মা পারিবারিক ভাবে পরিচিত। আমি যখন হাই স্কুলে সবে উঠেছি, তখন এমা-দের  প্রতিবেশী হয়েছি। এমা তখন ছোট্টটি। তার দুই ঝুটি নিয়ে হাসিমুখে খেলতে আসতো। পাড়ার সকল ছেলে মেয়েরা ঘুরতাম, বেড়াতাম। আমাদের পাড়ার সামনের পার্কে খেলার মাঠে কত আনন্দ আমাদের। তখন থেকেই এমা আর আমি যেন বিশেষ ভাবে কাছের বন্ধু হয়ে গিয়েছি। বয়সের তফাৎ থাকলেও তা কখনো আমার মনে আসেনি। আসলে মনের তো বয়স নেই। অন্য কারো সাথে মনের মিল হওয়াটাই আসল কথা। 

সেই ছোট্ট এমা তারপর স্কুলে ভর্তি হলো। দেখতে দেখতে কতকগুলো বছর পার হয়ে গেল। আমি কলেজ পাশ করে সরাসরি ইউনিভার্সিটিতে। ছোট থেকেই এমা-র আম্মুকে আমি আমার প্রিয় ব্যক্তিত্বের তালিকায় রেখেছিলাম। 

আর এখন? 

এখন তিনি আমার বিভাগে, আমার শিক্ষিকা। বা উলটো ভাবে বললে আমি এখন তাঁর ছাত্রী। 

সকাল বেলাটা একটু ধীর স্থির ছিল আজ। অন্য সকল দিনের চেয়ে আলাদা। কারণ আজ একটাই ক্লাস আর তা হলো সেমিনার অ্যাটেন্ড করা। তাই রিসেপশানের লবি পেরিয়ে একটু আগাতেই দেখি প্রফেসর গর্ডন আর এমা বসে আছে সামনের সোফায়। চারিদিকে  কাঁচের দেয়াল ফুঁড়ে আলো এসে পড়ছে সমস্ত সিটিং এরিয়াতে। এমার আম্মুকে ক্যাম্পাসের বাইরে, বাসায় দেখা হলে আন্টি বলে সম্বোধন করি। ডিপার্ট্মেন্টে অবশ্যই না। তবুও এমাকে দেখেই কিনা, ‘আন্টি’ সম্বোধন চলে এলো মুখে। ম্যাডাম দু' সপ্তাহ পরপর হোম ওয়ার্ক দেন তার সকল ছাত্র ছাত্রীদের জন্য। প্রশ্নগুলো এত কঠিন। মনে হচ্ছে পলিটিকাল সাইন্স শুধু নয়, এখানে যেন ইংরেজী সাহিত্যেরও কিছুটা ছোঁয়া আছে।  প্রথমটা সংজ্ঞা জানতে চেয়ে একটা প্রশ্ন। দ্বিতীয় প্রশ্নটা বুঝতে কষ্ট হচ্ছিল আমার।ম্যাডাম শব্দার্থ আলাদা আলাদা করে বুঝিয়ে দিলেন এত সুন্দর করে যে, আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম ম্যাডামের দিকে।

তারপর একটু সরে যেয়ে পাশে এসে  এমাকে বললাম, ‘ প্রশ্নগুলো লিখে রাখো প্লিজ। লিখেছ কি?’

কালচে নীল পেলিক্যান কালির ঝর্ণা কলমে গোটা গোটা অক্ষরে প্রশ্নগুলো লিখছে এমা।  অক্ষরগুলো সাজিয়েছে এমনভাবে যেন এমার হাত দিয়ে মুক্তো ঝরছে। প্রশ্ন বুঝিয়ে দিতেই সেমিনার হলে প্রবেশ করার সময় হয়ে এলো। 

প্রফেসর গর্ডন উঠে দাঁড়ালেন। 

সুইডিশ অরিজিন, ৬ ফুট মতন লম্বা, দোহারা গড়ন। আজ  তাঁকে কি যে সুন্দর লাগছে।   আজ বিশেষ লেকচার –এর দিন  বলে নয়। উনি বরাবরই সুরুচিসম্পন্ন। নিখুঁত, পরিপাটি ভাবেই নিজেকে উপস্থাপন করেন। পরণে থাকে কালো ভারী স্যুট, সাথে কোন উজ্জ্বল রঙের শার্ট। আমার সামনা সামনি ঠিক নয়, পাশ দিয়ে যখন দেখলাম উনি সোফা থেকে উঠে রওনা দিয়েছেন সেমিনার রুমের দিকে, তখন যেন তিনি অন্য এক ব্যক্তিত্ব। ধ্যানমগ্ন, চিন্তাশীল। নিজের ভাবনায় ডুবে গেছেন সম্পূর্ণ। চারপাশ তার কাছে এখন অচেনা। আমরা সবাই এখন তার কাছে অদৃশ্য। এক পা এগুতেই দেখলাম  আমার প্রিয় আন্টি, আমার শিক্ষক , প্রফেসর এমিলিয়া গর্ডন  তাঁর প্রস্তুতকৃত  লেকচার পরিবেশন করতে  শান্ত  ভঙ্গীতে  ধীর পদক্ষেপে হেঁটে যাচ্ছেন হলওয়ে ধরে ।   উনি উঠে দাঁড়াতেই আমি তাঁকে আপাদমস্তক দেখার সুযোগ পেয়েছি। এর পূর্বে তিনি কথার মাঝে উপস্থিত থাকলেও,   এত নিখুঁত ভাবে দৃশ্যমান ছিলেন না।

কালো স্যুট আর গাঢ় পারপেল -বেগুণী মিশ্রণের  উজ্জ্বল শার্ট  পরনে।  গৌরবর্ণ, প্রফেসর এমিলিয়া গর্ডন সুষমা মন্ডিত হয়ে  প্রবেশ করছেন সেমিনার রুমে। আমি আর এমা থাকবো দর্শকের সারিতে।

৩ 

এমাকে নিয়ে  পিছনের দিকে উঁচু চেয়ারগুলোতে বসতে গিয়ে বেশ অবাক হলাম। এমা যেন আরো ছোট্টটি হয়ে গেছে। এখন যেন সেই প্রথম দেখা চার বছরের টুক্টুক পায়ে হাঁটা এমা। এখন দেখছি সেই এমা-কে, যে আমাকে রাস্তার মাঝ দিয়ে হাঁটতে গেলে হাত ধরে টেনে কিনারায় নিয়ে আসতো আর বলতো, ‘বারবার রাস্তার মাঝে চলে যান কেন? রাস্তার মাঝ দিয়ে হাঁটতে হয় না তো।‘

আর আমি বুঝেই পেতাম না, খালি রাস্তার মাঝ দিয়ে হাঁটলে অসুবিধা কোথায়!

আজও বুঝি না।  

বুঝতে যে চাইও না। 

আমি চাই সেই ছোট্ট এমা আমাকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেক আমার চলার পথ। সারাটা জীবন যেন সে আমার চলার পথের সংগী হয়ে থাক। আর আন্টির প্রতিভা হবে আমাদের পাথেয় । ছোটদের স্নেহ করে কাছে টেনে নেয়া, অপরের প্রতি যত্নশীল হওয়া, আদর, ভালবাসা দিয়ে, বিপদে পাশে এসে সাহায্য করা – এই সব গুণের  অনন্য দৃষ্টান্ত আমার আন্টি, আমার প্রফেসর। 

প্রফেসর এমিলিয়া গর্ডন। 

ওনার ব্যক্তিত্ব আমাদের  কাছে আমাদের সমগ্র জীবনের একটা দিক নির্দেশনা। আমি ব্রত গ্রহণ করেছি এই আলোক উজ্জ্বল দিনে যে মহিমান্বিত রূপে আমি তাঁকে দেখেছি তেমনটাই যেন হতে পারি আমার জীবনে। কবে থেকে আন্টির সাথে আমার পরিচয়ের শুরু আমি জানি না। কারণ শুরু যখন আদি হয়ে দেখা দেয়, তাকে কোন সময় দিয়ে বাঁধা যায় না।

আমার স্বপ্নে আসা প্রফেসর  এমিলিয়া গর্ডন আমার প্রিয় আন্টি, আমার প্রিয় ব্যক্তিত্ব। 

এমার জীবনে তিনিই এমা-র অস্তিত্ব। কারণ  এমার অস্তিত্বের সূচনা তার মাঝ দিয়েই। আর আমার অস্তিত্ব তাঁর আলোকচ্ছ্বটায় । 

এমা  তাঁর সন্তান। 

আমি তাঁর সন্তানতুল্য । 

এই জীবনের শুরুতে আমাদের চলার পথে  তাঁকে পেয়ে সৃষ্টিকর্তার কাছে আমরা বিনীত ভাবে কৃতজ্ঞ।

............।



স্বপ্নের সময়ঃ  ৬ই মে  ২০২৬

সময় বিকাল সাড়ে তিনটা 

গ্রেইস




 এরা সাড়ে  তিনফুট থেকে চারফুট দীর্ঘ, ছোট খাটো, পাতলা গড়ন বিশিষ্ট।  চোখগুলো খুব বড়, নাক দৃশ্যমান নয়, ত্বক ছাই বর্ণের, অমসৃণ এবং  কুঁচকানো।   উন্নত প্রযুক্তি সম্পন্ন। পুরোই টেলিপ্যাথিক।  প্রজননে অক্ষম। প্রজাতি প্রায় বিলুপ্তির পথে। টিকে থাকার জন্য ফিরে এসেছে অতীতে তাদের পূর্ব পুরুষের সাথে সংকর উৎপন্ন করে নতুন প্রজাতি সৃষ্টি করতে। জেনেটিক্স  এঞ্জিনিয়ারিং -এ পারদর্শী। 'Claude' AI এর ভাষ্যমতেঃ
'the grays most likely are post-biological human consciousness from a future timeline'
পোস্ট বায়োলজিকাল মানে জীব / জৈব অবস্থার পরবর্তী অবস্থা।
human consciousness মানে মানব চেতনা।
গ্রেইস'রা সম্ভবত  জৈবিক ক্রিয়ায় পরিচালিত জীব নয়। তারা  কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাথে জৈব-প্রযুক্তির সমন্বয়ে মিশ্রিত একপ্রকার হাইব্রিড (অনেকটা সংকর ধরণের) প্রজাতি।  যা ভাষায় প্রকাশের  জন্য  এখনও উপযুক্ত শব্দ আমাদের অভিধানে নেই।  
ওদের  স্বাতন্ত্র্য বোধ নেই।  কেন্দ্র থেকে কোন পরিচালক (AI) তাদের  বোধ  নিয়ন্ত্রণ করছে। 
তাদের কাজকর্ম   প্রমাণ  করে —তারা একটি সম্মিলিত চেতনা বা "হাইভ মাইন্ড"-এর মতো। সে কারণে আচরণের দিক দিয়ে দেখা যায়, তারা দলবব্ধ ভাবে কাজ করে । নিজস্বতার প্রকাশ নেই। আমাদের মতন ব্যক্তি সত্তা প্রবল নয়। তারা  একসঙ্গে চলে, একতাবদ্ধ  হয়ে  কাজ করে। এরা   আবেগহীন আধুনিক বুদ্ধিমত্তার এক অন্যজগতীয় প্রজাতি।
আমরা ঐতিহ্যগত ভাবে  তাদের  ভিনগ্রহী  এক্সট্রা টেরিস্ট্রিয়াল বলি। অনেক কন্টাক্টি বলেন, এরা  আমাদেরই ভবিষ্যতের রূপ। ভবিষ্যতের  মানুষ।  অত্যন্ত প্রকৌশল নির্ভর। তাই টাইম ট্র্যাভেল করে সুদূর ভবিষ্যত থেকে বর্তমান  সময়ে চলে এসেছে  তথ্য সংগ্রহ করতে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করে আমাদের সমান্তরালে এক বাস্তবতা তৈরী করে  বসবাস করছে। তারা  আমাদেরই উত্তর পুরুষ। 
তারা এমন এক বুদ্ধিমত্তা বিশিষ্ট প্রজাতি,  যারা এই গ্রহেরই কোন ভূগর্ভে, বা মহাসাগরের অতলে, অথবা  এই গ্রহেরই অন্য  ডাইমেনশানে বিকশিত হয়েছে। ধীরে ধীরে তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা প্রযুক্তির চরম পর্যায়ে উন্নীত হয়ে  সচেতন ভাবেই মানুষের মত শারীরিক রূপ ধারণ করে আমাদের আশে পাশেই আজকাল চলাফেরা করে।
 তাদের  বিচার, বিবেচনা,  পর্যবেক্ষণে কোন আবেগ কাজ করে না। সেকারণে তথ্য সংগ্রহের জন্য, স্যাম্পেল নেয়ার দরকার হলে তারা আমাদের অপহরণও করে। নমুনা সংগ্রহ করে আবার  পাঠিয়ে দেয়। আমরা ঐ সময়টুকু  অচেতন থাকি। প্রযুক্তির দিক দিয়ে খুব আধুনিক বলেই আমাদের যেমন তাদের জগতে নিতে পারে, তেমনি ফেরৎ পাঠিয়ে দিতে পারে। সবটুকু ঘটে আমাদের অজান্তে।   জার্নির সমস্ত  এক্সপেরিয়েন্সটা আমাদের কাছে তখন স্বপ্ন মনে হয়। অনেক ক্ষেত্রে ভ্রূণ সংযুক্তির প্রযুক্তি ঘটিয়ে হিউম্যান- হাইব্রিড তৈরী করে। তাদের উন্নত গবেষণাগারে  এসব সংকর ভ্রূণ রেখে দেয়। কথিত আছে ৪০০ বছর পর সেই সকল হাইব্রিডের আগমণ ঘটবে আমাদের সম্মুখে। কারণ তখনকার পৃথিবীর  বৈদ্যুতিক- চৌম্বক ক্ষেত্র, সেই হাইব্রিডগুলোর থাকার জন্য উপযুক্ত হবে। অর্থাৎ  আমাদের চেনা পৃথিবী সে সময় অনেকটাই বদলে যাবে। 


এদেরকে  কি ভয় পাওয়া উচিত?
দেখতেই তো কি উদ্ভট! 
ওদের মধ্যে একটা গ্রুপ আছে,যারা আমাদের বহুদিন ধরে   পর্যবেক্ষণ করে আসছে। আমাদের DNA- এর নমুনা সংগ্রহ করে, তাদের গবেষণাগারে হাইব্রিড-মানব ভ্রূণ তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে সকলের অগোচরে। 
মি. সাইমন  বাওন এর অভিজ্ঞতা আরো অদ্ভুত। তার মতে,কিছু গ্রেইস  অন্যান্য বুদ্ধিমান ET- দের সঙ্গে কাজ করে। তারা পর্যবেক্ষক গোত্রের প্রজাতি। স্পিরিচুয়ালিটিতে অনেক উন্নত। অনেকে আমাদের পৃথিবীর বাতাসের চাপ, মধ্যাকর্ষণ শক্তির সাথে মানিয়ে চলতে পারে। 
তাহলে  বর্তমানের আমরা আর ভবিষ্যতের গ্রেইস-রা যদি DNA-র দ্বারা যুক্ত হয়ে আমাদের  উত্তরপুরুষ হয়ে  থাকে, তবুও কোথাও যেন   একটা  অমিল হচ্ছে। একটা ছেদ পড়ছে।  যদি গ্রেইস’রা  আমাদের ভবিষ্যৎ রূপ হয়, তাহলে এটাই প্রমাণিত হয় যে,  আমরা কোন এক সময়ে এতটাই প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে পড়ব যে, এই আমরা জৈবিক বৈশিষ্ট্য সমূহের হ্রাস ঘটিয়ে শূণ্যে এসে উপনীত হব।  নিউরাল নেটওয়ার্কিং এর প্রযুক্তি,  কেন্দ্র থেকে সব পরিচালিত করবে। মানে  আমাদের চিন্তা করার ক্ষমতা লোপ পাবে।  ভাবনাও নিয়ন্ত্রিত হবে।  সম্মিলিত চেতনার হাইভ মাইন্ড গড়ে উঠবে।  আমরা আবেগের গভীরতা হারাব। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বোধ থাকবে না। শুধুই দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দিব। অনুভূতির মূল্য থাকবে না।  তারও অনেক পরে আমরা আবার আমাদের অতীত কেমন ছিল,পূর্বে আমাদের চেতনার স্তর কেমন ছিল, আমাদের প্রত্নতত্ত্ব , পূর্বপুরুষদের গবেষণা কেমন ছিল, তা দেখতে ফিরে আসবো অতীতের ২০২৬-এ।
সুতরাং  গ্রেইসদের উপস্থিতি আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় - এরা যদি আমাদের  ভবিষ্যত- রূপ হয়, তাহলে তা  খুবই অনাকাংখিত।
 তাদের দেখে এই শিক্ষা নেয়া উচিত যে,  AI প্রযুক্তি এক সময়ে আমাদেরকে তাদের পরিণতিতে ঠেলে দেবে।
ডিজিটাল পরিচয়পত্র তৈরীর চিন্তা যখন গৃহীত হলো, তখনই এই পথে আমরা পা রেখেছি। ডিজিটাল পরিচয় পত্র মানে আমাদের পরিচয়কে তালিকাভুক্তকরণের মাধ্যমে আমাদের চেতনাকে AI -র নজরদারির আওতায় নিয়ে আসা।
বায়োমেট্রিক ট্র্যাকিং করে স্বাধীন  ভাবে চলা ফেরার উপর নজরদারি আনা হলো।
নিউরাল ইন্টারফেস গ্রহণের মাধ্যমে কিছু দিনের মধ্যেই আমাদের  চিন্তাভাবনার নিয়ন্ত্রণ আমাদের অজান্তেই অন্য কারো দ্বারা পরিচালিত হবে। আমাদের  ব্যক্তিগত ভাবে  সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা দখল হয়ে যাবে  AI দ্বারা। আমাদের বোধ লোপ পেলেও আমারা তা  টের পাবো না। আমরা  সম্মিলিত ভাবে  নিয়ন্ত্রিত হবো।

এ থেকে মুক্তির উপায় কি?
মুক্তির উপায় বড়ই কঠিন। বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলা অসাধ্য ব্যাপার । তারপরও সম্ভব হলে অ্যানালগ পদ্ধতিতে জীবন যাপন করার চেষ্টা করা। ডিজিটাল ব্যাংক কার্ড এর বিপরীতে  নগদ টাকা ব্যবহার করলে কিছুটা রেহাই মিলবে। নিউরাল প্রযুক্তি গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বা বিকেন্দ্রীকৃত কমিউনিটি গড়ে তুলতে চাইলে  কিছুটা মুক্তি মিলবে। কিন্তু এ করতে গিয়ে  প্রাণ সংশয় দেখা দিলে  কেউ আর এ পথে আগাবে না।
তারপরও  সচেতনতা থাকাটা জরুরী। এতে করে   ডিজিটাল  নিয়ন্ত্রিত জীবন  থেকে যতটুকু সম্ভব দূরে থাকার চেষ্টা করতে পারবো।
গ্রেইস- দের অভিশপ্ত জীবন অবশ্যই আমাদের কাম্য নয়। যদি মানবিকতা হারিয়ে ফেলে, নিজের অনিচ্ছায় সম্পূর্ণভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে মিশে, নিজের ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য জলাঞ্জলি দিয়ে  AI  দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হই, তাহলে   মানব জন্মের সার্থকতা কোথায় ?


সূত্র আন্তর্জাল, https://www.youtube.com/watch?v=VSjsLVjaLMA

তথ্যঃ আন্তর্জাল, AI:Claude,  ET কন্টাক্টিঃ  জর্ডান ম্যাক্সওয়েল, কেরি ক্যাসিডি, অ্যালেক্স কোলিয়ার,  ডেভিড উইলিকক, ডেভিড আইক

মল্লিকা আন্টির খপ্পরে

সুমনা সেই ছোট্টবেলা থেকে চেনে তার মল্লিকা আন্টিকে। একটু ছোটখাটো ধাঁচের চাইনিজ চেহারার, অত্যাধুনিক সোসাইটি গার্ল বলেও পরিচিতি আছে তার সমাজে। ববকাট চুল, আপ্যায়নে পারদর্শী, স্বাদের রান্না তৈরি করে বন্ধু মহলের  রাঁধুনি হিসেবেও মল্লিকা আন্টির যথেষ্ট নাম। সেই আট বছর বয়সে সুমনা শুধু দেখেছে মল্লিকা আন্টি বাড়িতে দর্জি রেখে জামা সেলাইয়ের অর্ডার নিচ্ছেন। তার তৈরিকৃত ডিজাইনে চারিদিকে প্রশংসার ঝড় বইছে। তখন তো আর বুটিক শিল্পের এত উন্নতি ছিল না সেই ১৯৭৯ সালের কথা। তার নির্দেশিত কাজ দেখার জন্য সুমনার আম্মা একদিন মল্লিকা আন্টির বাড়ি গেলেন। কত কথা তাদের। কথার ফুলঝুরি। যেমন স্মার্ট মহিলা, তেমনি কথার মালা গেঁথে মানুষের মন মাতিয়ে রাখতে পারেন। কিন্তু সুমনার যেন কিছুতেই মন ওঠে না । ওই ছোট্ট বয়সেই আন্টিকে যত দেখে তত তার কেমন জানি অস্বস্তি বোধ হয়। মনে হয় আন্টি যেন ওই মেয়েগুলোর মতন। কোন মেয়েগুলো?
বুঝেও বুঝে উঠতে পারে না সে নিজে, সেই আট বছর বয়সে। কিন্তু তার মন  কথা বলে ওঠে। মন তাকে জানিয়ে দেয় মল্লিকা আন্টি ঠিক ঐ মহিলাগুলোর মতন যারা খারাপ কাজ করে বেড়ায়। কিন্তু খারাপ কাজটা কি তা আবার সুমনা নিজেই বুঝে উঠতে পারে না। তবুও তার মন যে এই কথাই বলে। আন্টিদের হাঁটু পর্যন্ত লম্বা তখন। ঐ বয়সে মাথা উঁচু করে তাকাতে হয় আন্টির দিকে। 

সে তাকায়। 

কথা বলার ধরণ দেখে অবাক হয়। বাবা গো! কি স্পিডে যে কথা বলে যেতে পারেন এই মহিলা। একদম অনর্গল। কটকটি বেগমও বলা যেতে পারে ওনাকে।

স্বামীটা তার সারাদিন অফিসে থাকে। তাকে সময় দেয় না বলে অভিযোগ আছে। আন্টির স্বামীর জাওয়ানি ভাবটায় এখন একটু ভাটা পড়েছে। কিন্তু মল্লিকা আন্টি ? তিনি তো একদমই ইয়াং। তিনি অভিযোগ করেন পাশের বাড়ির আনিসা আন্টিকে। আনিসা আন্টির স্বামী আবার প্রচন্ড রকমের জওয়ানি ভাব সম্পন্ন। সেই তুলনায় আবার আনিসা আন্টি বুড়িয়ে গেছেন। আসলে আনিসা আন্টি অনেক বয়স্ক, আঙ্কেলের তুলনায়। আনিস আন্টির  স্বামীর জাওয়ানি ভাবটা দেখে মল্লিকা আন্টি বলে বেড়ায়,  আনিসার স্বামী কার কার সাথে শোয়? মানে ইনডাইরেক্টলি বলতে চায় যে, তার সাথে কেন শোয় না? মল্লিকা আন্টির সাথে অসুবিধাটা কোথায়? তার - কি কমতি আছে? ইনজেকশন নিয়ে ইদানিং সে আরো জোয়ান হয়েছে। বিভিন্ন ধরণের ইনজেকশন নেয়। একটা হাঁটুতে নেয়, একটা কাঁধে নেয়, একটা গলায় নেয়। আরো কত ধরণের কত কিছু! জন্মগত ভাবে পাহাড়ি অঞ্চলের চিনাদের রক্ত আছে তার শরীরে। তাই চামড়া এই বয়সেও অনেক মসৃণ। তাছাড়া আলু, পটল, ঘি, মাখন, তেলের বীজ নাকি, বীজের তেল কিসব যেন সারাদিন মাখে। এতে তার কাস্টমাররাও তো খুশি হয়। একদম পার্লার খোলার মত করে ব্যবসা করে -তা নয়। তবে নারী সাপ্লাই -এর কাজ করতে করতে ঘটকালিটা রপ্ত করে ফেলেছে। 

সুমনার জন্যও পাত্র ঠিক করে ফেলেছে। সুমনাদের পছন্দ না এতে। কিন্তু কি হয়েছে? সুমনাদের পক্ষ থেকে তো টাকা চাইতেও পারে না। কিন্তু ছেলেপক্ষ বলেছে লক্ষ টাকা দেবে যদি এই বিয়েটা ঘটিয়ে দেয়। তাই মল্লিকা আন্টির আজকাল বেশি বেশি ফোন আসে সুমনাদের বাসায়। সেই  ছোট্ট বেলায় দেখা  মল্লিকা আন্টিকে সে সব সময় অশুভ মনে করে। আজও তার অশুভই মনে হয়। কিন্তু অশিক্ষিত মহিলার হাই সোসাইটিতে স্মার্টভাবে চলা দেখে অবাকও হয়। কি যে এক যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। সুমনাকে জোর করে আবিদুরের সাথে বিয়ে দিয়েই ছাড়বে। 
তাই তার বাড়িতেই পাত্র দেখার আয়োজন করে ফেলল ঝটপট।  পাত্রপক্ষ  বলে তার ৪২ বছরের চেনা। সুমনা যথারীতি ড্রইয়ং রুমে অতিথিদের সামনে বসল আর প্রমাদ গুনতে থাকল। এই বুঝি পাত্রের বড় বোন অম্বা তাকে সাধারণ জ্ঞানের বই থেকে রাজধানীর নাম না ধরে বসে। ধরলে তো নিশ্চিত পারবে না। সাধারণ জ্ঞান যে কিছুই নেই তার জানা। পাত্রের উল্টো দিকে মুখোমুখি বসে পাত্রকে এক নজর দেখে প্রথমেই সুমনার মনে হলো, ছেলেটা যেন ভচকানো টাইপের। এই তাহলে সেই ছেলে? এত বিরক্তি লেগেছিল প্রথম দেখায়। খাবার টেবিলে গিয়েও সামনা সামনি বসে খেয়াল করল, ছেলেটি খাবার যেন  তার মুখে নিজে নিজে পুরতে পারছে না। বা,  মুখে পুরতে যেন তার কষ্ট হচ্ছে। পাত্রের  জ-লাইনে  সমস্যা আছে মনে হয়। মানে জন্মগত ভাবে যে পাত্রের চোয়াল বাঁকা তা তো  সুমনার জানার কথা নয়। অথবা পাত্র বোধহয় খুব লাজুক। লজ্জার ঠ্যালায় খাবার মুখে তুলতে পারছে না। আর কটকটি বেগম এই লাজুক লতার মাঝেই বোধহয়  তার জন্য একটা 'ভালো' ছেলে  খুঁজে পেয়েছেন। সুমনার জন্য ভালো পাত্র তিনি এনে দিয়েছেন। পাত্র দেখা শেষে বিমর্ষ চিত্তে বাড়ি ফেরার পথে  সুমনাদের গাড়ির চাকা পাংচার হয়ে গেল। 
ভ্যোম পটাশ্‌। 
এতগুলো বিরক্তিকর ঘটনার পর মেয়েপক্ষ যখন পিছিয়ে গেল, মল্লিকা বেগমের তো মাথা খারাপ হবার জোগাড়। পাত্রপক্ষের দেয়া অগ্রিম এতগুলো টাকা ফেরত দিতে হবে? কিছুতেই না। তাই জোর জবরদস্তি করে সুমনার সাথে বিয়ের ঘটনাটা মল্লিক আন্টি ঘটিয়েই ফেলল। সুমনা পড়ল মল্লিক আন্টির খপ্পরে। সেই ছোটবেলা থেকে এই শয়তান টাইপের, জানোয়ার সুলভ মল্লিকা বেগমের হাত থেকে তার শেষ রক্ষা হলো না। 

সেই ২০ বছরের সুমনা কি তার থেকে তিন গুণ বয়সী, দুনিয়া ভেজে খাওয়া মল্লিক আন্টির সাথে পেরে উঠবে? সুমনার বাবা মা -ই  তো পারলো না।  মল্লিক বেগম যে অপ্রতিরুদ্ধ। স্মার্ট। সোসাইটি গার্ল। 
কিন্তু মল্লিক আন্টির উৎসাহ মিইয়ে গেল টাকা লেনদেন শেষ হয়ে গেলে। পরে ধুরন্ধর শ্বশুর তার চতুরতা দিয়ে শুরু করল সুমনার স্বামীর জায়গাটা দখল করতে। মানে শ্বশুর তার ছেলের জায়গা নেবে। সুমনা তার ছেলের বউ হবে না। এখন যেন তারই বউ হয়ে যাবে। টাকা দিয়ে কেনা না ? হাবাগোবা কুমড়ো পটাশ ছেলে যদি না পারে, সে নিজেই ছেলের বউয়ের উপর চড়ে বসবে। এক রাতেই বাচ্চা এনে দেবে পেটে। তখন আর এই মেয়ে যায় কোথায়? 
হ্যা, শ্বশুরের যুক্তি আছে বটে। শ্বশুর মহাশয় ছেলের পাগল ভাব ঢাকবার জন্য বাড়িতে শুরু করল হম্বিতম্বি। 
প্রথম শর্ত। 
বিয়ে হয়েছে যেহেতু, বউ এবার তার বাড়ির মেয়ে। বাপের বাড়ি কখনোই যেতে পারবে না। আর ল্যান্ডফোনের সেই জামানায় কথা বলতে চাইলেও মেয়েকে তার ঘরে রাখা ফোনে কথা বলতে হবে, তার সামনে বসে। তখন যদি শ্বশুর ঘরের দরজা বন্ধও করে দেয়, কারোর কি কিছু বলার আছে? ছেলে তো অবুঝ আট বছরের শিশুর মতন। বিশাল ঘুষ দিয়ে তাকে বিদেশী কম্পানিতে চেয়ার টেবিল জোগাড় করে দিয়েছে তার বাবা। ছেলে ওখানে যেয়ে সকালে বসে থাকে। খাবারের সময় টিফিন বক্স খুলে খাবার মুখে পুরতে যখন পারে না, তখন খাবারগুলো মুখ থেকে পড়ে  টেবিলে রাখা অফিসের দরকারি কাগজপত্রে দাগ মাখিয়ে একাকার করে ফেলে। অফিসে তার আরো কত কীর্তি! পিয়নরা তার প্রাণের বন্ধু, তার কাছের মানুষ। তার সম পর্যায়ের কেউ তার বন্ধু নয়। ঠাট্টা মশকরা পিয়নরাই করে।  তারা বলে, 'আবিদুর ভাই, নিয়ে যান এই গিফট্‌ বাড়িতে। ভাবীর জন্য পেটিকোট বানিয়ে দিবেন।' পিয়নরা যখন সুমনার পেটিকোট নিয়ে চিন্তা ভাবনা করে ঠাট্টা করে,আবিদুরের খারাপ লাগে না । আবিদুরের মনটা খুবই সহজ সরল। পিয়ন, দারোয়ানরা তার সাথে খুবই ভালো, শুধু কর্মকর্তা গোছের লোকগুলো খ্যাক খ্যাক করে। 
 কেন সে কাজ পারে না, কেন সে এত অবুঝ,  এসব দেখেও বড়কর্তারা মুখ বুজে তাকে সহ্য করতে বাধ্য হয়। কারণ কি?
কারণ,রড়কর্তারা তার  বাবার কাছ থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ নিয়েছে না ? শর্ত  একটাই। একটা চেয়ার আর একটা টেবিল। অফিস শুরুর সময় আসবে, অফিস শেষ হলে চলে যাবে।    
অফিসে ইতিহাস করে প্রতিদিন  বাসায় এসে আবিদুর গাল ফুলিয়ে হপ্‌ করে বসে থাকে। 
কেন? 
কারণ সে অফিসে বকা খেয়েছে।  বস্‌ তাকে বকা দিয়েছে। এসব ঢাকা দিতে শ্বশুর গজগজ করতে করতে বাড়ি মাথায় করে।  সুমনা ছিমছাম এক জীবন থেকে হঠাৎ এমন একটি জ্বলন্ত উনুনে  এসে যখন পড়েছে তখন  তার পরিবার এক পর্যায়ে হতাশ হয়ে, বাধ্য হলো মল্লিকা বিবির শরণাপন্ন হতে। আফটার -অল মল্লিক আন্টি তো এই বিয়ের  ঘট্‌কি ছিল।  আবিদুরের পাগল পাগল স্বভাব  আর তার বাবার এবনরমাল আচরণ, অস্বাভাবিক ব্যবহার, সাইকোপ্যাথিক অ্যাটিচিউড সবকিছু জানালো তাকে। সব শুনে সাথে সাথে মল্লিকা আন্টির উত্তর,'এখন বিয়ে হয়ে গেছে। She should take control over the situation of her own.'
ওরে বাবা! 
কি সহজ সমাধান! ৪২ বছর ধরে তোমার চেনা পরিবারের একমাত্র ছেলে যে পাগল তা কিভাবে না জেনে থাকো গো তুমি? 

তারপরও অবশেষে একদিন সুমনার পরিবারের কথা শুনে, তথ্য গোপন করার ভিত্তিতে হোক অথবা না হোক, টাকা পয়সা খাওয়ার পর্ব শেষ হয়ে গেলেও  মল্লিকা আন্টি ওরফে কটকটি বেগম, কটকট করতে করতে তার সেই স্বভাবগত ভাব নিয়ে  হাজির হলেন সুমনার শ্বশুর বাড়িতে। তার শ্বশুর শাশুড়ির সাথে দেখা করতে এলে  সুমনা এসে বসলো তাদের সামনে। সুমনার এই প্রথম চোখে পড়লো এক অদ্ভুত ব্যাপার। হম্বিতম্বিবাজ শ্বশুর, যে কিনা বাড়িতে মানসিক প্রতিবন্ধী স্ত্রী ও ছেলেকে সারাদিন ধমকা ধমকির উপর রাখে,  সেই লোকটি মল্লিকা বেগমের সামনে খুব নরম সুরে তার স্ত্রীর সাথে আলাপ  শুরু করেছে। তার বোকাসোকা স্ত্রীখানাও যেন হঠাৎ করে চালাক হয়ে গেছে। স্বামীর সুর ধরতে পেরেছে নিমিষেই। সে ও একই সুরে আলাপ চালাচ্ছে তার স্বামীর সাথে। আহ্‌ লোক দাখানো সে কি মহব্বত দু'জনার। একেই বলেই ড্রইং রুম বিহেভিয়্যার। এই ভণিতা শুধু ড্রইয়ং রুমের জন্যই সংরক্ষিত। তার বাইরে নয়। তার বাইরে রয়েছে তাদের ভয়াল বীভৎস রূপ যা জানতে হলে তাদের সাথে থাকতে হবে দিনের পর দিন। তবুও সুমনা  মল্লিকা বিবির সামনে  তাদের  কিঞ্চিত উষ্মা লক্ষ্য করল। তার  কারণ হলো,   লেনদেন তো শেষ হয়ে গেছে, আবার  তোমার এখানে কি মল্লিকা বিবি? কিছুক্ষণ বাতচিৎ করে আলাপ চারিতা শেষ করে  মল্লিকা বিবি ফিরে গেলেন বাড়িতে । তারা বুঝিইয়ে দিলেন লেনদেন শেষ, এবার বাড়ি ফিরে যাও।

প্রতারক শ্বশুর আগে কয়টা খুন খারাবি করেছে সুমনা তো জানেনা। ৭১ -এ বলে অনেক মানুষও মেরেছে। এবার ২৫ বছর পর   আরেকটা না হয় মারবে। সুমনাকে এবার টার্গেট।  কেউ টের পাবে না। খাবারে আর্সেনিক মেশালে সাধারণ জ্বর, পেট খারাপ  হয় । ডাক্তার শ্বশুর সেগুলো জানে। সুতরাং ঐ আর্সেনিক মেশানো খাবার যদি সুমনাকে খাওয়াতে পারে, তাহলে তো শরীর খারাপের ঠ্যালায় মেয়েটি পটল তুললে, কেউ জানবেও না কিভাবে  সে মরল ।

 কিন্তু ঘরের ধোয়া পাতলার সব কাজ সুমনাকে একাই করতে হয়। তার প্রতিবন্ধী স্বামী অতিরিক্ত কাপড় নোংরা করে। কাজের লোকেরা সেসব নোংরা কাপড় ধুতে চায় না। সেগুলো ধোয়ার কাজও  সুমনার । কিন্তু  আর্সেনিক খাওয়ানোর ফলে  সুমনার হাতে এখন সাবান পানি লাগানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। হাতের চামড়া খুলে এসেছে মাংসপেশী থেকে। সুমনা ডাক্তারের শরণাপন্ন হলে তারা বললেন, 'মনে হয় আর্সেনিক পয়জনিং।  এ তো কেস প্রেজেন্টেশান করার মতো।' অতএব সুমনার এখন জীবন সংশয়। কোন রকমে শ্বশুরের আঙ্গুল গলিয়ে, তার প্রাণটুকু নিয়ে,  সে বেরিয়ে এলো সেদিন ঐ বাড়ি থেকে  । 
কিন্তু মল্লিক আন্টি নাখোশ। শ্বশুর বাড়িতে থাকতে পারবে না কেন? এ কেমন কথা? এখন সবই তো, তারই হাতের মুঠোয়। 
সে কেন পারবে না? 
কেন?
শ্বশুরবাড়িকে সে কন্ট্রোল করবে। এতে অসুবিধা কোথায়?' 

তারও অনেকদিন পরের কথা। সুমনা কিছুটা সুস্থ এখন। এক বিয়ের অনুষ্ঠানে মল্লিকা আন্টির সাথে দেখা হয়েছে তার। সে তো আর জানে না যে, জানোয়ার প্রকৃতিরই এই জীবটি এখন কেন এত খাপ্পা তার উপর! কিভাবে জানবে? মল্লিকা বেগমের মন সে  কিভাবে পড়বে? তাই সেই বিয়ের আসরে, যখন দুজনেই  বউ দেখতে গিয়ে একসাথে, সুমনা যতই তাকে আন্টি বলে ডাকে, আন্টি তো আর শুনে না। মল্লিকা বেগম  বউকে দেখতে পেলেও সুমনাকে আর দেখতে পায় না। কারণ সুমনার শ্বশুরের সাথে যে তার লেনদেন শেষ। সুতরাং সুমনাদের সাথেও তার লেনদেন শেষ। কিন্তু সেই লেনদেন তো ছিল পাত্র পক্ষদের সাথে। মেয়ে পক্ষদের সাথে নয়। তাহলে চিনতে পারছে না কেন?  
মেয়ে পক্ষর সাথে কি আদৌ লেনদেন হয়েছিল? নাকি সুমনার অজান্তেই মল্লিকা আন্টি, লক্ষ লক্ষ টাকার বিনিময়ে তাকে বেচে দিয়েছে অনেক আগেই। পেয়েছে কারি কারি টাকা। সেই টাকা দিয়ে হংকং, সিঙ্গাপুর শপিং করে এসেছে হয়তোবা। 
সুতরাং সুমনা পর্ব শেষ। 
এবার ধরবে সে কোন নতুন একটা শিকার। মল্লিকা আন্টির খপ্পর থেকে কারোরই যে  রেহাই নেই। 
...............

লেখার শুরু ২৬/১০/২০২৫

লেখার শেষ ১৬/০৪/২০২৬

স্বপ্ন

সেঁজুতি, 
আজ ২১শে এপ্রিল ২০২৬, রাত ১১ টা বেজে ৪ মিনিট। আজ সন্ধ্যা থেকে সারাটা রাত তোমায় স্বপ্নে দেখেছি। বিকাল চারটায় টেক্সট পাঠিয়েছ- আসতে চাও, দেখা করতে চাও। আমি বললাম, আসো। যদিও কাল আমার পরীক্ষা। বাইরে ল্যাপটপ রেখে পড়ছিলাম। বাইরের বাগান মিশে গেছে সেই পাশের রাস্তায়। অথচ ল্যাপটপ বাইরে ফেলে রেখে আসলেও হারাবার কোন চিন্তা নেই। তাহলে বুঝো কত সিকিওর একটা এলাকায় থাকি। কোন দেশ বুঝলাম না স্বপ্নে। কোন লোকেশন বা কোন বাড়ি চিনতে পারলাম না। কিছুই পরিচিত নয়। বাসায় আমি আর আমার হাজবেন্ড থাকি। তোমরা আসবে বলে আমার হাজবেন্ড রান্না বসালো। তুমি ঠিক আগের মতনই আছো, যেমন শেষবার বাস্তবে দেখেছি। হালকা হলুদ সালোয়ার কামিজ পরনে। রাত নয়টা পর্যন্ত ছিলে। যাবার বেলায় দেখলাম শাড়ি পরা। যাবার আগে আলিঙ্গন করলাম যখন, মনে হল এই আলিঙ্গনে তোমার হৃদয়ের স্পন্দন আমি অনুভব করেছি। 
স্বপ্ন কি এতটা বাস্তব হয়? 
কত কথা যে হলো সারাটা বিকেল। বিকেল গড়িয়ে  সন্ধ্য। সন্ধ্যা গড়িয়ে   রাত। বিদেশে বাবা, মা, পরিবার ছেড়ে থাকার যে একাকিত্ব তা আমিও বুঝি বলেই হয়তোবা তোমাকে বিদায় দেবার সময় তা বেশি অনুভব করেছি। তখন মনে হচ্ছিল, দেশের রাস্তার জ্যাম-ই বোধহয় বেশি ভালো, যেখানে জীবনের গতি থেমে থাকে, কিন্তু নির্জনতা তো থাকে না। সবাইকে নিয়ে বেঁচে থাকা সেখানে। এই ছিমছাম নিরিবিলি একাকী বিদেশ যাপন যেন আমাদের জন্য নয়। ছবির মতন শহরে আমরা যেন ভীষণ একা। 
একাই তো। 
প্রথম থেকে বলি। সন্ধ্যার আগের মুহূর্তে বিকেলটা একটু নরম হয়ে এসেছে। আমি ল্যাপটপ খুলে সাবজেক্ট দেখে থ! কাল আমার পরীক্ষা, আর আজ কিনা প্রথম বই খুলছি। কিছুই বুঝিনা। একবার রিভিশন দিলেও লাভ নেই। অনেকটা মাইক্রোওয়েভ ইঞ্জিনিয়ারিং ধাঁচের কিছু। প্রস্তুতি নিতে বেশ সময় লাগবে। বানিয়ে লেখার  তেমন সুযোগ নেই। এভাবে যখন আমি দিশেহারা, তখনই তোমার টেক্সট। তারপর তোমার আগমন। অনেকদিন পর সামনা সামনি পেয়ে কি যে আনন্দ! তখনও সন্ধ্যা নামে নি। মানে তুমি কাছাকাছি কোথাও থাকো। তাই তুমি এসেছো, জানতে পেরে যে, আমিও তোমার কাছে থাকি। তারপর শুরু হলো কথা। তোমার হাজবেন্ডকে ছবিতে যেমন দেখেছি তার থেকে একটু ডার্ক কমপ্লেকশন  দেখলাম স্বপ্নে। তুমি তো আগের মতনই আছো। 
কথা শুধু একটা বিষয় নিয়ে বারবার হয়েছে। আর তা হলো, বিদেশে থাকতে হলে তোমাকে বিদেশের মতন হতে হবে। বিদেশ তোমার মতন হবে না। এখানকার বাসস্থানকে নিজের ঘর ভেবে নিতে হবে। মনটা যতই দেশের বাড়িতে ফেলে আসা নিজের সেই ছোট্ট ঘরটার মাঝে আটকে থাকুক, এই ঘরই এখন তোমার ঘর । বিদেশের এই একাকীত্বে ভরা  কষ্টের মাঝে থাকলেও  বলিনি যে, দেশে ফিরে যাও। স্বপ্নে তো বলতে পারতাম। কেন বলিনি জানিনা। হয়তোবা সংসার জীবনে প্রবেশ করেছো, তাই বলেছি বিদেশ এমনিই। অথচ বিদেশ, দেশ বাদ দিয়ে সমগ্র জীবনের দিকে যদি তাকাও, জীবনের এই পুরো পথচলাটাই  একটা এক্সপেরিয়েন্স মাত্র। সবই হলোগ্রাফিক এক্সপেরিয়েন্স। সুতরাং সিরিয়াসলি দুঃখ কষ্টকে অনুভব করার কোন দরকার নেই। যেমন চলছে চলুক। যদিও মন এসব কথা মানে না। মন পড়ে থাকে  ফেলে আসা  নিজের সেই দেশে, তাই  এখানকার জীবন এত কষ্টকর।  এই হলোগ্রাফিক রিয়্যালিটির মাঝে যখন স্বপ্ন এসে ভিড় করে, সে তো একটু স্বস্তি দিবে। তখন সে হয়ে উঠবে আরো মজার। মায়ার মাঝে মায়া। যেমন খুশি সেভাবেই ভেবে নেয়া। আর ভাবলে তো স্বপ্নে তা ঘটেও যায়। 
কিন্তু তারপরও  স্বপ্নের মাঝে আমি ভাবতে পারিনি যে, কালকের পরীক্ষার প্রস্তুতি আমার ভালভাবে শেষ হয়েছে। বরংচ ভেবেছি, তোমার বিদায়ের ক্ষণে,আমার সাথে আমার পরিবারের সবাই যেন আছে। বোধয় সেজন্যই পাশে তাকিয়ে দেখি আমার বাবা মা দাঁড়ানো। তুমি চলে যাবার মুহূর্তে তারাও বিদায় জানাচ্ছেন তোমাকে। আমার ছোট ভাইটাও এখানে। কিন্তু ওনারা সব বিদেশে এলো কোথা থেকে? ওনারা তো বিদেশে থাকেন না! বিশেষ করে আমার বাবা-মাকে স্বপ্নে বেশ ইয়ং -লুকিং দেখে আমি তো অবাক। আর তুমি বললে, 'ম্যাডাম আমি ওনাদের আঙ্কেল আন্টি বলি?' আমি খুব হেসে বললাম, ‘অবশ্যই।‘ তাদের উপস্থিতি, তোমার থাকা, সব মিলিয়ে এত আনন্দ আমি কখনো পাইনি। আবার যেহেতু তোমার বসবাস একই শহরে বলে মনে হচ্ছিল, সেজন্য আরোও ভালো লাগছিল। 
কিন্তু দেশটা কোথায়? 
ইউ.এস.এ.-র কোন শহর হবে। হতে পারে আমার ফেলে আসা সেই পুরনো ফ্লরিডা। কারণ বিকেলটা আমার বাংলাদেশের বিকেলের  মত লাগছিল। শুধু সারা পাড়া জুড়ে কোন মানুষজন নেই। রাস্তা ফাঁকা ।মাঝে মাঝে দুই একটা গাড়ি যায়। বাইরে পড়ে থাকা ল্যাপটপ হারাবার ভয় নেই। তারপর তোমরা যখন চলে গেলে, কি জানি কি মনে হলো, ল্যাপটপ ঘরের ভেতর নিয়ে আসলাম। আসলে তখন সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল ।  ঠিক সন্ধ্য না। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হয়ে গিয়েছিল।  ভাবলাম বৃষ্টি আসে যদি তাই বাসার ভেতর ল্যাপটপ-টা  নিয়ে আসি। কিন্তু অ্যাডাপ্টার,  বৈদ্যুতিক তার, সবকিছু বাইরেই ফেলে রেখে এসেছি।
টাউন হাউস ধরণের একতলা বাসা আমার। দরজা খুললেই বিশাল ড্রইয়ং রুম। পাশে ডাইনিং, পিছনে বেডরুম। আজকালকার দিনের মতো সাদা বাল্ব যেগুলো আছে  সেগুলো ওখানে জ্বলছিল না। ওই পুরনো কালের  হলদে্ আলোর বাল্বগুলো জ্বলছিল বাসার ভেতর। খুব একটা উজ্জ্বল আলো নয়। তবে আমার রিডিং টেবিলটা  বাইরেই পড়ে আছে। 
আমি এবার পড়ায় মনোযোগ দেব। তোমরা মাত্র চলে গেছ। এই রাতটুকুই আছে। নয়টা থেকে ভোর পাঁচটা। তারপর পরীক্ষার সেন্টারে যেতে হবে পরীক্ষা দিতে, যেখানে কিনা পরীক্ষার সাবজেক্ট ম্যাটারই আমি জানিনা। অনেকটা যেন জীবনের পরীক্ষার মতো। সামনে কি আছে জানিনা। কিন্তু তার মুখোমুখী হতে হবে। কিছুই করার নেই। তারপর মুখোমুখী হয়ে জীবনটাকে সামলাও। আবার উপায়ও নেই। এর থেকে কোনভাবে নিস্তার তো পাওয়া যাচ্ছে না। 
আমি তো স্বপ্নে ভাবতে পারতাম যে, পরীক্ষা  না হয় হবেই না। 
কিন্তু সে ভাবনা তো আসেনি। ভাবনায় এসেছে দেশে ফেলে আসা বাবা মায়ের কথা। 
ভাবনায় এসেছে এমন এক শহরে থাকা, যেখানে তুমি আমার খুব কাছে থাকো। হঠাৎ জানতে পেরেছ আমি এসেছি। তাই দেখা করতে এসেছ। 
ভাবনায় এসেছে প্রিয় মানুষগুলোর কথা। কিন্তু জীবনের সংগ্রাম, জীবনের পরীক্ষা, এসব কিছুই ভাবনায় আসেনি। নাকি  আমি ভাবিনি? ভাবতে চাইনি?
 কাল সকালে পরীক্ষায় কি হবে তা নিয়ে আর চিন্তা করিনি বলেই বোধহয় স্বপ্নটা তারপর শেষ হয়ে গেল। 
স্বপ্নের বাস্তবতাই জানে যে পরের দিন সকালে এক্সাম–হলে যেয়ে,  সামনে খাতা পাওয়ার পর সেই  খাতায় কি লিখবো! 
আমার এই বাস্তবতা তা জানে না। জানতে চায়ও না। সে যে প্রিয় মানুষগুলোকে কাছে পেয়েই খুশি।
..........
২১/০৪/২০২৬

দীপার প্রেম

তারিখঃ ৪ঠা এপ্রিল ২০০২

স্থানঃ লেকচার হল, দ্বিতীয়তলা 

ডিউটি করবে দীপা আর সুমন 

সময়ঃ রাত আটটা থেকে ১২টা পর্যন্ত 

অর্থাৎ এই চার ঘন্টায় লেকচার থিয়েটারের সকল আসবাবপত্র ঝকঝকে, তকতকে করে, বিশাল বড় বড় কার্পেটের ধুলা ঝেড়ে পরের দিনের অফিস মিটিং এর জন্য লেকচার থিয়েটার উপযুক্ত করে রেখে যেতে হবে। 

দীপার জন্মসংখ্যা ১৩, তাই ৪ সংখ্যাটি তারিখ হিসেবে  আসলেই তার কেমন যেন ছটফট লাগে। আতঙ্ক ঠিক না। কিন্তু একটা অন্যরকম উৎকণ্ঠা। নিজেকে সান্ত্বনা দেয়, এই ভেবে, খারাপ কিছু নিশ্চয়ই হবে না। কারণ ৪ সংখ্যাটি যে তারi জন্মসংখ্যা । 

কিন্তু আজ যে একটু বেশি ধরণের অন্যরকম লাগছে। 

কিন্তু কেন?

শুধু দিনটির  সংখ্যা ৪ নয়, দিনটি বছরের চতুর্থ মাসের চতুর্থ দিন। মানে এপ্রিলের ৪ তারিখ। আর ২০০২ সালের সংখ্যগুলো যোগ করলেও তো সেই দুই যোগ দুই-  চার। 

দীপার ভিতরটা কেমন যেন লাগছে। নিজেকে ঠিক মানাতে পারছে না।  আজকে নিজেকে কোনভাবেই শান্ত করতে পারছে না। মন বলছে আজ যেন কিছু একটা অপেক্ষা করে আছে ওর জন্য। এসব ভাবতে ভাবতেই লেকচার- হলে প্রবেশ করল দীপা। হলের এ প্রান্ত থেকে ওই প্রান্ত যেন দেখা যায় না। কম করে হলেও ৪০ বা তারও বেশি ছাত্রের আসন বসানো হয়েছে এই থিয়েটারটি। লেকচার থিয়েটারের ঝাড়ামোছার কাজ করছে আজ প্রায় পাঁচ বছর হলো। সাথে সহকর্মী হিসেবে প্রায়শই থাকে সুমন। আজ কেন যে সুমন আসতে এত দেরি করছে। এত বড় লেকচার থিয়েটারের নির্জনতা দীপার কেমন যেন গা ছমছমে ভাবের উদয় করে। এত বছর যাবৎ নাইট ডিউটি করছে, তারপরও লেকচার থিয়েটারের বিশালতা আর নির্জনতার সাথে কেন জানি একাত্ম হতে পারেনি সে।  সুমন না আসা পর্যন্ত কি বাইরে অপেক্ষা করবে নাকি ভেতরে যেয়ে কাজ শুরু করে দেবে? আর কতই বা অপেক্ষা করা যায়, এসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই কানের কাছে মৃদু শিসের শব্দ। ঘাড় ফিরে তাকালো দীপা। সুমন এসেছে অতঃপর। সেই দুষ্টু ভরা হাসি। দীপার প্রশ্ন সরাসরি, 'দেরি হলো কেন? তুমি জানো না একা এত বড় লেকচার হলের নাইট ডিউটিতে আমার ভীষণ ভয় লাগে একা একা?'

সুমনের আবারও হাসি। আর চকিত উত্তর, 'যদি একেবারেই আর না আসি? একা একা যদি কাজ করতে হয় সারাটা জীবন?' 

দীপা হকচকিয়ে যায়। 

কি যে বলে সুমন, সে বুঝে উঠতে পারে না। অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে শুধু ওর দিকে। সুমন আজ কেমন যেন করে কথা বলছে। কাজ করার কোন মুড যেন তার নেই। হঠাৎ এর মাঝেই সুমন ওর হাতটা ধরে থিয়েটারের একেবারে কোণার দিকে টেনে নিয়ে, কোমর জড়িয়ে ধরে,  ওর মুখটা কাছে এনে বলল, 'তোর জন্য একটা চকলেট এনেছি।' 

'কোনটা?' দীপার বিস্ময়! 

: এই দেখ। 

ক্যাডবারির মুখটা খুলে চকলেট - বারটা দীপাকে না দিয়ে নিজের মুখে আধেক টুপ্‌ করে পুরে দিল। তারপর দীপার কাছে মুখটা এনে বলল, 'নাও। খাও।' 

দীপার পক্ষে এই দুষ্টমি  কি বোঝা সম্ভব? কিভাবে খাবে ওর মুখ থেকে? দীপাকে আরো কাছে টেনে নিয়ে বুকের মাঝে চেপে ধরলো এবার সুমন। তারপর বলল, 'আমার মুখ থেকে নিয়েই খাও না।' চক-বারটি তার মুখে আবার পুরে দিয়ে, মুখটা এগিয়ে নিয়ে এলো একদম নাক বরাবর দীপার সামনে।  

এমনভাবে জাপটে ধরে আছে কেন সুমন? কখনো তো এমন সে করেনি। কি হয়েছে আজ তার? দীপা না পারছে নিজেকে সুমনের হাত থেকে ছাড়াতে,  না পারছে ওর হাত দুটো নাড়াতে। ও খুব শক্ত করে জাপটে ধরেছে দীপাকে। অতএব দীপা এখন বাধ্য। সুমনের আদেশ তাকে পালন করতেই হবে। এছাড়া উপায় নেই ওর বন্ধন থেকে মুক্ত হবার। দীপা মুখটা এগিয়ে চকবারের কাছে নিজের মুখটা স্পর্শ করতেই, সুমনের নাকের সাথে নাক আর কপোলের সাথে কপোলের স্পর্শ কেমন যেন এক শিহরণ জাগালো। আজ প্রথম সুমনের এত ঘনিষ্ঠ হয়েছে সে। এত বছর দু'জন কাজ করেছে, সপ্তাহে প্রায় দুইদিন একসাথে ডিউটি থাকতো তাদের, কিন্তু  কখনো দীপা এমন ঘনিষ্ঠতার কথা চিন্তা করেনি। সুমন তার খুব ভালো বন্ধু। কিন্তু আজ যেন সুমন একদম অন্যরকম। দীপাকে তার বুকের মাঝে যেন আগলে রেখে দিতে চাইছে। এমন চাপ দিয়ে ধরে রাখলে আর কিছুক্ষণ পর  দম বন্ধ হয়ে দীপা বুঝি চ্যাপ্টা হয়ে যাবে। একটু নিজেকে ছাড়াবার জন্য, হাতটা সরাতে চাইলেও সুমন আরো কাছে নিয়ে যেন ওকে বেঁধে ফেলছে। 

দীপা প্রশ্ন করবে কিভাবে? কন্ঠ যেন জড়িয়ে আসছে। তারপরও বলল, 'কি হয়েছে আজ তোমার সুমন? কত কাজ বাকি, জানো? পুরো হলঘর পরিষ্কার করতে হবে। কাল কনফারেন্স আছে তো, মনে নেই?'

 সুমনের কোন হুঁশই নেই যেন। ওর চোখের মাঝে সে ডুবে আছে। 

দীপার চোখ পিঙ্গল বর্ণের। সাধারণ বাঙালি ধাঁচের নয়। চুলগুলো লালচে, কিন্তু বাঁ পাশের একখানা চুল একদম সোনালী। আর সুমনের চোখগুলো একদম সবুজাভ নীল। সারা দক্ষিণ অঞ্চলের কোন মানুষের চোখ এমন নীলাভ সবুজ হয় না। লম্বা সুঠাম দেহের অধিকারী সুমন, তার চেহারার জোরে আরো ভালো কোন কাজ যোগাড় করতে পারতো। কেন যে এখানে ধোয়া মোছার কাজ নিয়েছে সে, দীপা বুঝতে পারে না। কখনো জিজ্ঞেস করেনি যদিও। জীবনের প্রয়োজনে, জীবিকার তাগিদে  একটা কাজ যে জুটেছে সেটাই বড় কথা। তাও আবার এত বড় একটা প্রতিষ্ঠানে, এইতো বেশি। হতে পারে ছোটখাট দায়িত্বের মধ্যে পড়ে এই কাজ, কিন্তু তারপরও চাকরির এই দুর্মূল্যের বাজারে দু'জনের জন্য খুবই জরুরি এই কাজটা। কিন্তু কাজ বাদ দিয়ে চকলেট -বার দেবার উছিলায় দীপাকে এভাবে বুকের মাঝে ধরে রাখার কি  কারণ? এটা কি ভালো দেখায়? 

সহকর্মী থেকে বন্ধু । কিন্তু  প্রেমিক তো নয়। আর আজ সুমনেরই অন্তরঙ্গতায়, প্রথম যেন দীপা নিজেকে অনুভব করল একটু অন্যভাবে। প্রতি রোমকূপে আজ তার অন্যরকম শিহরণ। ইচ্ছে করছে হারিয়ে যেতে সুমনের সাথে দূরে কোথাও। অনেক দূরে। অজানার উদ্দেশে। 

সুমন খুব বুঝে দীপাকে। দূরে কোথাও অনেক দূরে চলে যাওয়ার কথা ভাবনায় আসাতেই সুমন প্রশ্ন করে বসলো,

: কি ভাবছিস রে? 

: না কিছু না।

:  কিছু না মানে কি?

:  কিছু না মানে কিছু না। ছাড়ো এবার। যাব আমি।

 সুমনের প্রশ্ন, 'কোথায় যাবে?' 

দীপার উত্তর, 'কাজে।'  সুমনের আবার প্রশ্ন, 'কিসের কাজ?' 

: ওমা কাজ আছে না?  কালকে কনফারেন্স। তার জন্য থিয়েটার রেডি করতে হবে না? 

সুমন অবাক হয়ে বলল, 'সেই সময় যদি না পাই?' 

দীপার অবাক প্রশ্ন, 'কেন সময় পাবো না?' 

সুমনের  কন্ঠস্বরটা যেন একটু দৃঢ় হয়ে গেছে। এবার একটা চাপে যেন মিশিয়ে ফেলবে দীপাকে তার সাথে। মুখটা আবার  কানের কাছে এনে বলল, 'সময় নেই দীপা। যেতে হবে আমাকে।' দীপার অবাক চোখে প্রশ্ন, 'কোথায়?' সুমনের ওম্‌ পেয়ে দীপা যেন  গলতে গলতে একদম একাকার। সুমনের বুকের ভিতর মিলে মিশে সে শিহরিত। সুমন খুব ধীরে ধীরে বলল, 'দীপা আমাকে আজ যেতে হবে আমার বাড়িতে। যেখান থেকে আমি এসেছি।'

 দীপার মনে হলো, আজ এতদিন একসঙ্গে সুমনের সাথে কাজ করেছে, অথচ জানাই হয় নাই, সুমনের আদি বাড়ির ঠিকানা। আসলে সুমন তাকে যদি এমন ঘোরের মাঝে না ফেলতো, দীপা হয়তোবা এতো গভীরভাবে ওকে নিয়ে কখনোই ভাবতো না। আজ তার এই গভীর আলিঙ্গন, প্রথম স্পর্শ আর বুকের  ওম্‌ নতুন ভবানা জাগাতো না। কিন্তু এমন  তো কখনো আগে হয়নি। আজ হঠাৎ কেন? কি হলো সুমনের? 

আজকের দিনটা চতুর্থ মাসের চতুর্থ দিন।  দীপার জন্মসংখ্যার দিন।  ওর কাছে যেন ঝাপসা ঠেকছে সবকিছু। এমন হচ্ছে কেন? 

দীপা আবার ছাড়াতে চাইছে নিজেকে, সুমনের বাহুডোর থেকে। না সে উপায় নেই । সুমনের শক্ত বাহুর আগল থেকে, দীপার ছুটে বেরিয়ে পড়া একেবারেই অসম্ভব। তাই তার শেষ চেষ্টা, শেষ প্রশ্ন, 'কতদূর তোর বাড়ি? আজ হঠাৎ যাবার সিদ্ধান্ত কেন? ক'দিন পরে ফিরবি?' 

সুমন শুধু তাকিয়ে আছে দীপার চোখের দিকে। অনেকটা ক্ষণ পার হলে সুমন বলল, 'আমার ঠিকানা তো এই গ্রহে নয়। আমি এসেছি ভেনাস থেকে। তোদের পৃথিবীর প্রেমের দেবী ভেনাস যে গ্রহের অধিকর্তা, সেখান থেকে। এখানে থাকার সময় আমার শেষ। আমাকে যেতে হবে। 

দীপা বিহবল এসব শুনে। সুমন কি তাহলে ভীনগ্রহী এক্সট্রা -টেরেস্ট্রিয়াল  (ET) নাকি? ET-রা তো এত রক্ত মাংসের মানুষ হয় না। হতে পারে না। তারা যে অন্য গ্রহের অন্যরকম এন্টিটি, অন্য ধরণের সত্তা। সেই সত্তা তার বুকের চাপে,  তার সর্বাঙ্গ দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে দীপাকে অনুভব করিয়েছে  তার হৃদস্পন্দন, তার প্রতিটি ধমণীতে বয়ে যাওয়া শিহরণ। ওর সবটুকু দীপা অনুভব করছে তাকে আগলে রাখার মাঝে। কিভাবে তাহলে বিশ্বাস করবে যে সুমন মানুষ নয়। সে ভীনগ্রহের বাসিন্দা। সুমন যদি নিমেষে চলে যেতে পারে তার গ্রহে, নিমিষে কি আবার আসতে পারে না সেই ভেনাস থেকে পৃথিবীতে? 

দীপার সাথে সপ্তাহে দুবার ডিউটি পড়তো তার। লেকচার থিয়েটারে রাত আটটা থেকে বারো টা পর্যন্ত। এবার ওর শিফটে অন্য কেউ হয়তোবা আসবে। কিন্তু সুমন এই পৃথিবীতেই থাকবে না? 

তার কি মনে পড়বে পৃথিবীর কথা?  পৃথিবীর মানুষগুলোর কথা? নিজের বুকের মাঝে পিষে ফেলে দীপাকে যতক্ষণ ধরে রেখেছিল, সেই সময়টুকুর কথা? ওদের গ্রহে কি সময় বলে কিছু আছে? দীপা কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। সুমন যদি ভীনগ্রহী  হয়, তাহলে দীপাকে পছন্দ করার দরকার কি ছিল?

 আজ থেকে দীপা যে ভীষণ  একা ।

০৭/০৪/২০২৬

আঁচিল

পূর্বকথা

যাত্রা পালার চল্ তো আজকাল উঠেই গেছে। আগের কালে যাত্রাপালাতে  কতকগুলো চরিত্র অবশ্যই থাকতো, যেমন রাজা , রাণী, উজির, রাজার চাটুকার, এবং বিবেক। চাটুকারের কাজ ছিল রাজার সামনে ভাঁড়ামি করা, সত্যকে মিথ্যা বানিয়ে রাজার মন সন্তুষ্ট রাখা, হাতে হাত ঘষে, মাথা নীচু করে জ্বী হুজুর, জ্বী হুজুর করা।   রপসজ্জাকার  বরাবরই চাটুকারের দৃশ্যায়নের ক্ষেত্রে অভিনেতার গালে এত্ত বড় একটা আঁচিল বসিয়ে দিত।

ভিক্ষুকের চরিত্র যেমন সজ্জিত থাকবে ছেঁড়া ময়লা পোশাকে, রাজার চরিত্র থাকবে ঝলমলে গলায় মালা, কোমরে তলোয়ার ঝুলানো, মাথায় মুকুট পরা পোশাক। বিবেক আসবে তার উদাত্ত কন্ঠের গান নিয়ে। তার  পোশাকটা হবে দেশের ঐ বুদ্ধি বেচা, থান কাপড় পরা লোকটার মতন। তাকে দেখলেই মনে হবে পার্থিব আকাঙ্ক্ষা জলাঞ্জলি দিয়ে পরকালের দিকেই তার নিজেকে নিজের নির্বাসন দেয়ার ভাব। চিতায় যেন এখনি ঝাঁপ দেবে। 

আর চাটুকার মঞ্চে তার আগমণ ঘটিয়ে  পরের দৃশ্যে কি করবে? তার গালের সেই বড় আঁচিলটা নিয়ে মাথা নুইয়ে রাজার সামনে উপবিষ্ট হবে।  হাতের সাথে হাত ঘষে ইনিয়ে বিনিয়ে হাসতে শুরু করবে।  যাত্রা  শেষে র্দশকরা  প্রস্থান গ্রহনকালে  কারো গালে আঁচিল দেখলে ঐ ভাঁড়ের কথাই মনে করবে। মুখে আঁচিল থাকা যেন  চাটুকারেরই বৈশিষ্ট্য। যাকে ইংরেজিতে বলে signature.


আজ কলেজে সুমনার প্রথম দিন।

ক্লাশে প্রবেশ করেছে সুমনা।       

সামনে তাকাতেই দেখে কেইংঠা একটি মেয়ে মুখে পুরানা আমলের এক টাকার সমান বড় একটা আঁচিল নিয়ে সামনের বেঞ্চে বসে আছে। আঁচিল দেখেই মনে পড়ে গেল যাত্রাপালার সেই চাটুকারদের কথা। এরও কি মিশন  সেই চাটুকারদের চরিত্রের মত। সারা জীবন শুধু পা চেটে যাবে বড় কর্তাদের? দেখে তো বেশ ভারিক্কী মনে হয়। ভাঁড় ভাঁড় লাগে না। আরেকটু খেয়াল করে দেখলো শুধু গালের পাশেই নয় আরেকটা আঁচিল আছে তার কপালের বাঁ পাশে। তাহলে তো মিশন তার আরো জটিল। তার কি তাহলে ডাবল্ চাটুকারী মিশন? দেখে তো ভাঁড় মনে হয় না মেয়েটিকে। বেশ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মনে হয়। ভেতরে ভেতরে লুজ থাকলেও তা তো আবার এদের ক্ষেত্রে ধরা পড়ে না।

সুমনা তাকে দেখে ভাবলো, চেহারায় কারোর হাত নেই। কিন্তু দেখতে তো কুৎসিত লাগছে। বিশ্রী এক অনুভূতি সৃষ্টি করছে। সে কি নিজেকে আয়নায় দেখে না? এই আঁচিলগুলো  পেলে পুষে কি করছে? অন্যদের কে একটা বিশ্রী বিনোদন দিচ্ছে? কেন?

কারণ বিশ্রী কিছু উপহার দিতেই তার ভাল লাগে। বা অন্যভাবে বলা যায় এর চেয়ে বেশী বুঝার ক্ষমতা তার নেই কিন্তু বুদ্ধু  তো না। সুমনা শুনেছে সে বেশ ভাল ছাত্রী । বেশ মেধাবী। মেয়েদের লিস্টে স্ট্যান্ড  করে নারী জাতির মুখ উজ্জ্বল করেছে। ছেলে মেয়ে মিলে বলার মতন না তাই মেয়েদের লিস্ট কথাটা সামনে আনে। চালাক বুদ্ধিও আছে। অবশ্য ভাল রেজাল্ট তো লুকিয়ে রাখারও জিনিস না। 

মেয়েটির ভাবখানা এমন যেন ষাটের দশকে বসে আছে। সে আমলের ছাত্রীদের মতো সুতি শাড়ি পরে আসে, যখন কিনা সেই নব্বই দশকে মেয়েদের  শাড়ি পরার চল নেই বললেই চলে। কোন ফরমাল অনুষ্ঠান হলে মেয়েরা শাড়ি পরে নাহলে না। কিন্তু প্রতিদিন শাড়ি ম্যনেজ করে পরে আসাটা বেশ পারদর্শীতার ব্যাপার।  তবে সে সময়ও কিছু পরিবার চাইতো বিয়ে শাদী হলে তাদের বউ শাড়ি পরুক। সেই থিওরি অনুসরণ করতে গেলে প্রশ্ন আসে মনে, মেয়েটি বিবাহিত নাকি? একে ওকে জিজ্ঞাসা করে সুমনা জানতে পারল মেয়েটি অবিবাহিত। তবে প্যান্ট শার্ট পরা তার একটা মেয়ে বন্ধু আছে। তারা খুব ঘনিষ্ঠ। বিদেশে এই কম্বিনেশানের বন্ধুত্ব দেখলে নির্ঘাৎ লেসবিয়ান তকমা লেগে যেত। দেশে তখনো সে দৃষ্টি চালু হয়নি। তাই তারা দুজনা আরো গভীর হবার সুযোগ পায় নি।  মানে পার্টনার হয়নি। 

বোধহয় জাস্ট বান্ধবী ছিল। বোধহয় বলার কারণ, সুমনা ক্লাশে আসতেই খেয়াল করলো বাঙ্গালী জাতির এভারেজ হাইটের সব ছেলে বাদ দিয়ে ভীষণ লম্বা আরেকখনা কাঠি মার্কা  প্যান্ট শার্ট পরা মেয়ে নয় -  প্যান্ট শার্ট পরা এক ছেলেকে এবার বন্ধু বানিয়ে ফেলেছে। কিভাবে কিভাবে জানি দুজনের মাঝে একটা বোঝাপড়াও হয়ে গেছে। কিন্তু   কাঠি বাবু নামের ছেলেটিকে  ধরার পরও সুমনার কেন জানি মনে হতো কেংঠি বেগম ঠিক যেন পুরোপুরি মেয়ে নয়। হাত ভর্তি বড় বড় লোম দেখে  মনে হতো তার সমতল বুকেও বুঝি ওরকম বড় বড় লোম আছে।  কেইংঠির আগা পাছারও তো তফাৎ করা যেত না। তাই বোধহয় শাড়িকে সে বেছে নিয়েছিল পোশাক হিসাবে।  শাড়ি পরে জানান দিত কোনটা তার পাছা। কোনটা তার পাছা না। এদিকে  কাঠি বাবু  নামের  ছেলেটি কি তার রোমশ বুক পছন্দ করে বসে আছে ? নাকি  এক টাকার সমান বড় বড় আঁচিল দুটোকে ভালবেসে ফেলেছে? এই জিনিস তো এই দুনিয়াতে  আর কারো নেই। তারপর ইদানিং আবার আঁচিল ফুঁড়ে ঘাস গজিয়েছে।  এতেই কি  এই ছেলের বিকৃত ভাল লাগা?

কুৎসিত কদাকার কিছু দেখার মত অস্বস্তিকর অনুভূতি যেন আর না হয়, তাই সুমনা ক্লাশে ঢুকেই মাথা নীচু করবে, নাকি চোখ বন্ধ করে ফেলবে ,বুঝে পেত না। তবে মাসখানেক পরেই সুসংবাদ এলো যে, কেইংঠি সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার  আঁচিল দুটো থেকে সে পরিত্রাণ গ্রহন করবে। আফটার অল্ মহামান্য মিস্টার কাঠি বাবু এসেছে  তার বিশ বছর পার হওয়া এ জীবনে। মহামান্যর পরিবারের সামনেও তো নিজেকে উপস্থাপন করার একটা ব্যাপার আছে। তাই না? 

অতঃপর তার ধরাবান্ধা তিনখানা চ্যালার মাধ্যমে, তার আঁচিল অপারেশানের জন্য দু’দিন সে ক্লাশ করতে পারবে না বলে একটা খবর চারিদিকে ছড়িয়ে দিল। চার নম্বর চ্যালা তখনো অফিশিয়ালি চ্যালার খাতায় নাম লেখায় নি, কিন্তু সুমনার সাথে কাইংঠির  খবর আনা নেওয়া করতো। তাদের মনের অবস্থা এমন দাঁড়ালো যেন  কেইংঠির অনুপস্থিতিতে ক্লাশের সবাই দু’দিনের জন্য  শোকদিবস পালন করবে।  কেংঠির আঁচিল -মুক্ত দিবস উপলক্ষে চ্যালাগুলো তাকে বাড়িতে দেখতে যাবে। স্যুপ, পায়েশ, আম, কলা , জাম নিয়ে অবশেষে দেখতেও গেল।  কেইংঠির  সদ্য অপারেশানের স্থানে ব্যন্ডেজ দেয়া হয়েছে । তার ভেতর দিয়েও এখনো ঘাস উঁকি দিচ্ছে, বলেই ভ্যাক করে আওয়াজ করে উঠলো সেই চার নম্বর চ্যালা। বুঝানোর চেষ্টা করলো তার বমনের উদ্রেক হচ্ছে ওসব কথা ভাবতে গিয়ে।

এদিকে জীবনের দু’দশক পার হয়ে কেইংঠির সাথে পরিচিত হতে পেরে মহামান্য মিস্টার কাঠি বাবুর জীবনও একরকম ধন্য হবার পথে।  তাদের পরিচয় কোন দিকে যাচ্ছে কে জানে? তবে এক সপ্তাহের মাথায় কাঠি বাবুর বড় বোন  কেইংঠিকে   একখানা শাড়ী, প্রীতি উপহার স্বরূপ পাঠিয়েছে। কারণ উপহার , সম্পর্ককে সুসম্পর্কে রূপান্তর করে। আবার পরের বছর কেইংঠি ক্লাশের ১৫ টি মেয়েকে ৩০০ টাকা দামের একটি করে বেগুনী থান শাড়ি উপহার দিয়েছে।  এছাড়া প্রতি বছর সকলের জন্মদিনের তারিখ মনে রেখে সবাইকে জন্মদিনের শুভেচ্ছাও জানায় নিয়মিত। এ সকল উপহার সুমনার ভাগেও পড়ে। উপহার হাতে নিয়ে হা করে  দাঁড়িয়ে থেকে সুমনা ভাবে,এখন কি করবে? খুশী হবে নাকি হবে না?

কেইংঠির এমন উদার আচরণে কি করা উচিত সুমনা আসলে ভেবে পায় না। পরের সপ্তাহে পহেলা বৈশাখে মেয়েদের নামকরণ করে ক্লাশের দরজায় টাঙ্গিয়ে রেখেছিল ছেলেরা। নামকরণে অন্য কলেজের  মতন অশ্লীলতা কখনই হয়না এই কলেজে। তবুও   কেইংঠি যখন লিডার, সে তো পড়তেই দেবে না কাউকে। এক টানে ছিঁড়ে ফেললো কাগজটা।  কারণ মজাটা সে একাই লুটবে আর খ্যাক খ্যাক করে হাসবে।  সাথে কাঠি বাবু আর চ্যালা চামুন্ডরা থাকতে পারে। কিন্তু কাগজটা সেই-ই হাত করে ফেললো এক ঝটকায়। পান্ডা গিরি তার ইনহেরিটেড নেচার নাকি তার  পুরুষ ভাবের প্রতিফলন, সুমনা ঠিক বুঝে উঠতে পারেনা। তবে শুনেছে তার বাবা ছিল মস্ত বড় বিজ্ঞানী। আর মা এক মস্ত বড় দার্শনিক। তাদের মিলনে-জাত এই জিনিস তো ফেলনা হবার কথা না। জাতির গর্বই হবে সে একদিন নিশ্চিত।

  ৩

কাঠি ছেলেটিকে LGBQT –র দলে ফেলানো যায় না। কাঠি তারপর ও কি পারবে এই ব্যাটা মার্কা মেয়েটির সাথে চালিয়ে নিতে? এখন তো না হয় আঁচিলগুলো উধাও হয়েছে। তাই ঐ মুখের দিকে তাকানো যায়। কিন্তু তারপর? আর কি করে তারা? সুমনার একদিন সুযোগ এলো জানবার ।  কাঠি বাবু তার লম্বা ঘাড়টা উঁচা করে মুখটা হাঁ করে সবাইকে পর্যবেক্ষণ করে, খুব মৃদু স্বরে সকলকে নিয়ে, কেইংঠির সাথে ঠাট্টা করছিল। দুজনই একসাথে  বাজে মন্তব্য করে  চলছে সকলকে নিয়ে অনবরত।  এই –ই তাহলে তাদের  প্রেমালাপ। বাহ্ ! কোথায় নিজেরা নিজেদের নিয়ে মগ্ন থাকবে তা না, তারা সমাজ নিয়ে ব্যস্ত। মানুষকে হেয় করে নিজেকে  এক নম্বর মনে করে আত্মতৃপ্ত হতে ব্যস্ত । তা তৃপ্তি পেলে  মন্দ কি! সুমনা তো প্রম করে নি কখনো, অত সব জানবে কি ভাবে, কিসে তৃপ্তি মেলে?

কেইংঠির সাথে  যদিও ছেলেটি আঠার মত লেগে থাকে কিন্তু, ক্লাশের অন্য ছেলেদের সাথেও তো বাতচিৎ করে। মানে  কিছু ছেলে আছে না, প্রেম করলে প্রেমিকা ছাড়া আর কিছুই বুঝে না, ঐ মেয়েরে পিছন পিছন ঘুরে, তবে এই ছাগলটি তেমন নয়। মানে  মাইগ্যা না। তবে সে এই কয়েক মাসেই  এখন কেইংঠির বান্ধা ছাগলে পরিণত হয়েছে। ঘাড় লম্বা বলে ক্লাশের শেষ বেঞ্চে বসে পুরো ক্লাশের রিঅ্যাকশান দেখে সে একদিন তো বেশ অবাক।  সে খেয়াল করেছে,  ক্লাশের সকল ছাত্ররা কেইংঠির আচরণে যখন পিছন থেকে  হো হো করে উঠে,  কাঠি বাবু তার হা মুখ নিয়ে  (অবাক হয়ে) সকলের দিকে  তাকায়। ভাবে ব্যাপারটা কি হচ্ছে? তার পূজনীয় কেইংঠির আকর্ষণীয় মোহনীয় সাপের মতন কুটিল চরিত্র কি এই ছেলেগুলো পছন্দ করছে না? কাঠি বাবু  তো গাধা নয়। বুঝে সবই। কিন্তু উত্তর খুঁজে পায় না। যদিও সবার মতামত নিয়ে সে মেয়েটিকে পছন্দ করতে বসেনি। তার সাথে কাঁপে কাঁপে মিলেছে বলেই তো এত কাছে চলে এসেছে তারা।  কিন্তু তারপরও, খটকা লাগে তার। প্রশ্ন জাগে মনে। সবাই তার মনের মানবীকে  এতো অপছন্দ  করে কেন? 

প্রশ্ন জাগা  ভাল । এতে যদি কাঠি বাবুর হা করা ভাবটা একটু কমে! তবে কলেজের শেষের দিকে ৭ বছর অতিক্রান্ত হবার পরও  কেইংঠির ব্যাটা ভাবখানা নিয়ে  কাঠি বাবুর  আক্কলের উদয় হয়নি। সুমনা শুধুই ভাবতো কাঠি –কেইংঠির  বাসর রাতে বউ যদি একটা ব্যাটা মার্কা ঘুরান দেয় তাহলেই তো স্বামীর কাজ সারা!

কিন্তু সুমনা এসব কেন ভাবে ? বেশী ভাবনা ও তো ভাল না। 

তবে খুব পাতলা মল্মল্  কাপড়ের ব্লাউজ পরে সবার সামনে ব্রা দেখাতে বেশ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতো কেইংঠি।   

কেন? 

সবাই বলাবলি করতো কেইংঠির বুক, পিঠ সমান তো, তাই  তাকে যে  প্রমান করতে হবে তারও  বুকের পাটা আছে। 

কিন্তু পাতলা  ব্লাউজ ভাইভা এক্সামের  দিনে কেন?

কারণ ভাইভা পরীক্ষার সেট আপ এমন ছিল যে,  কিছু লেখার জন্য বোর্ডের দিকে ঘুরে   দাঁড়ালে  স্যারদের সামনে  তার পুরো পিঠ  প্রতীয়মান হবে।  সে সুযোগে  পাতলা ব্লাউজ ভেদ করে ব্রা-এর স্ট্র্যাপটা সকলকে দেখাতে পারবে। এই বিকৃত প্রদর্শনিতে তার কামবাসনা পূর্ণ হবে। আনন্দিত হবে এই ভেবে যে  তার নারীত্বকে সে  উপস্থাপন করতে পেরেছে। 

কিন্তু ভাইভা বোর্ড কি এই কাজটা করার জায়গা?

হ্যা। এটাই যথার্থ জায়গা বলে সে মনে করে। বিকৃতি যে এদের ভাল লাগে। এই উপস্থাপনেই যে কেইংঠির  সার্থকতা। অর্থাৎ কাহাকে, কখন, কি দেখাতে হবে ,কোথায়  দেখাতে হবে,  কিভাবে দেখাতে হবে সব বুদ্ধি  সে  রাখে।  

অন্য  মেয়েদের নেই সেই বুদ্ধি? নেই বোধহয়। তবে ভারী বুকের মেয়েদের এই ইচ্ছাটা ভারী হওয়া উচিত ছিল । কিন্তু নাহ্।  তদের কেন জানি ইচ্ছাটা হয়ই না। ক্লাশের অন্য মেয়েরা বেশ রেখে ঢেকেই চলতো। শুধু কেইংঠি একটু অন্যরকম আধুনিক। যত ইচ্ছা শুধু কেইংঠির মনেই একা জমা হয়ে আছে। 

 ৪

এদিকে কেইংঠির চার নম্বর চ্যলা গেছে মা বোন সহ ব্যাংককে বাজার করতে। স্বামী পরিত্যক্তা তার মা সর্বদাই এখান সেখান থেকে বাজার সদাই করে দেশে এনে একটু লাভ রেখে বিক্রি করে। এ থেকে কিছু আয় রোজগার হয়। এছাড়া বিদেশে গেলে খদ্দের পাওয়ার চ্যানেলও  তৈরী হয়।  খদ্দের পটাতে ভীষণ ওস্তাদ তিনি। খদ্দেররাও তার উপর সন্তুষ্ট। বিশেষ করে হাফ বয়সের খদ্দেরদের ভীড় তো লেগেই থাকে তার বাড়ীতে। তার আনমনা ভাবের মাঝে হঠাৎ আঁচল খসে পড়াটা, ইয়ং ছেলেরা কেন জানি বেশী লাইক করে।

মায়ের মতো তার কন্যারাও এ গুণে পারদর্শী  হয়েছে নিশ্চয়ই। কিন্তু সুমনা তা কিভাবে জানবে? সুমনা তো তার মায়ের খদ্দের না। বা মেয়ে –লোক  কেনা বেচার দালালও না। সে যে ভিন্ন এক জগত। তবে আজ বিদেশ থেকে আনা সদাই-এর মধ্য থেকে  মসলিনের একটা ওড়না, প্যাকেটে মুড়িয়ে এনেছে চ্যালা নম্বর চার,  তার গুরুর জন্য। নরম কাগজের মোড়ক ব্যাগ থেকে বের করে মুখটা কাঁচুমাচুর ভংগী করে  কেইংঠিকে সে বললো, ‘তোমার জন্য আমার একটি সামান্য উপহার।‘ ক্লাশের সবার কাছে সে তাদের বাজার সদাই বিক্রি করেছে। কিন্তু তার গুরু র জন্য  আলাদা করে সে রেখে দিয়েছে এই দামী মসলিনের উপহার। এটা সে কাউকে বিক্রি করেনি।  খুব যত্নের সাথে আজ তা অর্পণ করবে কেইংঠিকে। 

অন্য ভাবে বললে বলা যায়, আজ সেই দিন, যেদিন সে কেইংঠিকে উপহার প্রদানের তাকত্ অর্জন করেছে । এ অর্জন যেন তার চ্যালাত্ব-কে  আরো এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল।  তার এই বিশেষ অর্জনে সে মহিমান্বিত। সে তার আনুগত্যের পরীক্ষায় সফল হয়েছে। কাঠি বাবু যথাযথই  মুখটা হা করে ঘাড়টা উঁচু করে কেইংঠির  চ্যালার উপহার প্রদান দেখছিল। আর সুমনা দেখছিল কাঠি বাবুর  হা করে থাকা মুখটাকে ।  

সাপে সাপে কি মহা মিলন। 

কিন্তু এসবের  সাক্ষী কেন সুমনাকে হতে হবে?  প্রকৃতিই যেন  তার সামনে এনে এসব ঘটায়। সুমনা কারণ ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। 

কেইংঠি তার চ্যালার কাছ থেকে সদর্পে উপহারটা গ্রহন করলো। যদিও কাজটা একটু নীচু মার্গের হয়ে যায়। চ্যালার কাছ থেকে কিছু গ্রহন করা কি গুরুর মানায় ? চ্যালা নাম্বার চার সেদিন শুধু ষাষ্ঠাংগে প্রণাম করাটুকু বাকী রেখেছিল। কিন্তু  উপহার সমর্পণের মাধ্যমে নিজেকে সমর্পণ করে চেলী বেগম বিগলিত চিত্তে  তার গুরুর প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করে নিজেকে বিজিত প্রমাণ করেছিল। সেই মুহূর্ত থেকে সে কেইংঠির একজন  আজ্ঞাবহ  অনুসরী হিসাবে নিজেকে প্রমান করল। দাস  প্রথার  জামানা থাকলে অনুসরণকারী না বলে আজ্ঞাবাহী দাস বললেও মন্দ হতো না। কিন্তু সে যুগ তো এখন নেই। তবে পূর্বজন্মের  কানেকশান থেকে এই চ্যালাগুলো চ্যাল -চ্যালামি করছে কি না কে জানে?

কেইংঠি যেন সর্পোলোকের রাণী। আগের জন্মেও  ছিল, এখনো আছে। এ নিয়ে সুমনার কোন দ্বিধা নেই। তাই ঐ সাপ সাপ ভাব নিয়ে কাছে আসলেই সুমনার  তীব্র অস্বস্তি শুরু হয়। এক মিনিটও  টিকতে পারে না তার আশপাশে। অবশ্য শুধু কেইংঠি কেন, কোন সাপ জাতীয়, যাদুকরী, বিকৃত মানুষদের আশপাশে সুমনা টিকতে পারে না। চেলী নাম্বার চারের  শরীরের খসখসে, ছোপ ছোপ, চামড়া দেখেই তো সুমনার একদিন অজ্ঞান হবার মতন অবস্থা হয়েছিল।

সুদীর্ঘ পাঁচ বছর সহপাঠী থেকে আজ কেইংঠিকে মাথার মুকুট বানাতে পেরে নিজের কাছে নিজের বিজয় অনুভব করছে চেলী। সে যে অবশেষে তার পায়ের ধুলার যোগ্য  হয়েছে। পাঁচ বছর আগে,  আঁচিল কাটার সময়ে কোন এক অমোঘ আকর্ষণে চেলী তার বাড়ি ছুটে গিয়ে নিজেকে ধন্য মনে করেছিল । পরিশ্রম আর সাধনার বিনিময়ে কেইংঠির কাছে  তাকে সঁপে দিয়ে  আজ আরেকটি বিজয় কেতন উড়াতে সে সক্ষম হয়েছে। আরো কতজনার আঁচিল জন্মেছে এ কয়েক বছরে। বয়সের ভারে সর্বাংগে এই পরিবর্তন তো হতেই থাকে। কিন্তু সেগুলো দর্শনে কেইংঠির চেলী চ্যলারা তো ছুটে যায় নি। 

কেইংঠির শক্তি অসাধারণ। ব্যক্তিত্ব ভয়ঙ্কর। সে পারে সবাইকে তার অনুগত চ্যালা বানাতে। তার মৃদু স্বরে আড্ডার মাঝেও  সকলের হৈ চৈ থেমে যায়। বক্তারা তাদের কথা থামিয়ে মাথা নুইয়ে সশ্রদ্ধ ভরে তার দিকে মনোযোগ দেয়। তার সামনে মাথা নুইয়ে ফেলে।  কারণ সে ভীষণ ক্ষমতাধর এক অপ –ব্যক্তিত্ব। গল্পে পড়েছে ডাইনীদের শক্তি ভয়ংকর থাকে।   সে এক ভয়ংকর শক্তি । তার প্রতি মাথা নোয়ানো আপনা থেকেই মনের মাঝে জন্ম নেয়। সবাই মেনে যে কেইংঠি-ই শ্রেষ্ঠ। সে পারে সবাইকে মোহাচ্ছন্ন করতে। সবাই অজান্তে তার  চ্যলায় পরিণত হয়, অনুসারী হয়। শুধু সুমনা পারে না।  বাদ পড়ে যায়  দল থেকে।   ছিটকে পড়ে যায় চ্যালাদের পাল থেকে।

...............

 লেখা শুরু ০৩/০৪/২০২৬

লেখা শেষ ১১/০৪/২০২৬    

আরো গল্প -
স্টিকি ওরফে কাঠি বেগম 
ঘাড় ঘুরানি
আবদার মিয়ার চর দখল

সংখ্যার সিঙ্ক্রোনিসিটি


সংখ্যার সিঙ্ক্রোনিসিটি বলতে বোঝায় — এমন এক পরিস্থিতি, যখন একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা, সংখ্যা-গুচ্ছ, বা সংখ্যার প্যাটার্ন (যেমন ১১:১১, ২২২, ১২৩৪, ১৮১৮ ইত্যাদি) বারবার বিভিন্ন জায়গায়, সময়ে, কিংবা পরিস্থিতিতে চোখে পড়ে। এগুলো দৈব বা কাকতালীয় মনে হলেও, অনেকেই মনে করেন এগুলো কোনো গোপন বার্তা, ইশারা বা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের সংকেত।

উদাহরণঃ ঘড়িতে বারবার ১১:১১ দেখা, গাড়ির নম্বরপ্লেট, ফোন নম্বর, ঠিকানা বা কাগজপত্রে বারবার ৭৭৭, ১২৩, ৫৫৫ ইত্যাদি দেখা। যেমন এখন ২৬.০৩.২৬ তারিখের  সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে দেখাচ্ছে মন্তব্য করেছি ১৮১৮ টি। 

হঠাৎ কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বা পরে একই সংখ্যার সাথে বারবার সম্মুখীন হওয়ার  তাৎপর্য কি?

অনেকেই বিশ্বাস করেন, এই সংখ্যাগুলোর মাধ্যমে অবচেতন মন, মহাবিশ্ব (universe), ঈশ্বর বা আত্মিক শক্তি আমাদের বার্তা পাঠাচ্ছে। জ্যোতিষশাস্ত্র, নিউ এজ স্পিরিচুয়ালিটি ও অ্যাঞ্জেল নাম্বার-এর ধারণায় সংখ্যার সিঙ্ক্রোনিসিটির গুরুত্ব অনেক বেশি। উদাহরণস্বরূপ, ১১:১১-কে “জাগরণের সংখ্যা” বা “spiritual awakening”-এর সংকেত বলা হয়।

বৈজ্ঞানিক ও মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করে কার্ল গুস্তাভ ইউং বলেন, সংখ্যার সিঙ্ক্রোনিসিটি আমাদের মানসিক অবস্থা, আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে যুক্ত। কখনো কখনো একে “confirmation bias” হিসেবে দেখা হয়—অর্থাৎ, যখন আমরা কোনো কিছু আশা করি বা খুঁজি, তখন সেটি বেশি করে চোখে পড়ে।

সুতরাং সংখ্যার সিঙ্ক্রোনিসিটি হলো —  মানসিকভাবে অবশ্যই অর্থপূর্ণ  যদিও তা অবচেতন মন জানে,কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা বা সংখ্যার প্যাটার্ন বারবার চোখে পড়া, যা ব্যক্তির কাছে একটি বার্তা, ইঙ্গিত বা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

এটি আধুনিক আত্মিক-মনস্তাত্ত্বিক চিন্তাজগতে এক আকর্ষণীয় ও আলোচিত বিষয়। যারা নিউমারালজি জানেন তারা আরো বেশী উপলব্ধি করেন।

মানব সভ্যতার নতুন অধ্যায়


প্ল্যানেট Earth একটা কন্সাসনেস। পুরো প্ল্যানেট এখন 3D level((স্তর)  হতে 5D স্তরে উন্নীত হতে যাচ্ছে। 
লক্ষাধিক বছর আগে, আমাদের 12 strand DNA কে রেপ্টিলিয়ানরা (ইবলিশ) ম্যানুপুলেট করে নষ্ট করে দিয়েছিল। লাইট- সোর্স থেকে আমাদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল। বহু লক্ষ বছর আগে থেকে  আমরা অন্ধকার যুগে বসবাস করছিলাম। সোর্স থেকে পুরা বিচ্ছিন্ন। ২৬০০০ বছরের এই Dark age শেষ হয়ে গেছে (মায়ান ক্যালেন্ডার অনুসারে) ২০১২ তে। spiritually  আমরা (সাধারণ মানুষেরা) অ্যাওয়েকেন হওয়া শুরু করেছি। 
 প্রফেসি অনুসারে গ্যালাকটিক ফেডারেশান আমাদের সাথে mass contact  করবে ২০২৭ এ। ১৯৭০   বা তারও আগে ১৯৪০  থেকে তারা বিভিন্ন দেশের  রাজ্যপতিদের সাথে কন্টাক্ট করে দেখেছে রাজা বাদশারা শুধু  ভীনগ্রহীদের কাছ থেকে  টেকনলজি  নিয়ে  পৃথিবীর মানুষদের মারে । যুদ্ধ লাগায় , প্ল্যানেটের কোন উন্নতি করে না। আরো দেখেছে এসব রাজ্যপতিরা সবই ক্যানিবাল এবং নন-হিউম্যান রেপ্টিলিয়ান। shape shift  করে মানুষের রূপ  ধারণ করে চলে। দু ' একজন মানুষ এ অবস্থানে আসতে পারলেও তাদেরকে তারা মেরে ফেলে। তারপর  তাদের ক্লোন বানিয়ে  সকলের সামনে উপস্থাপন করে। রেপ্টিলিয়ানদের এসব কর্মকান্ড ancient knowledge সমৃদ্ধ মেক্সিকোর শামান -রা,  বা তদের লেভেলের বুজুর্গ যারা আছেন, অন্য সব জায়গায়, তারা খুব ভাল জানেন। চ্যানেলার-রা জানেন। অ্যাবডাক্টিরা জানেন। কিন্তু জনসাধারণের কাছে এসব তুলে ধরা  শুরু হয়েছে ইন্টারনেট আসার পর থেকে। এখন সবাই রেপ্টিলিয়ানদের মত অন্যান্য ইভিল এন্টিটির  ব্যাপারেও সচেতন। 
ইভিল-দের প্রিয় জিনিস হলো মানুষের রক্ত,  মানুষের সাথে যুদ্ধ আর শিশুদের অ্যাসল্ট করা। যেহেতু শিশুদের DNA pure , তাই শিশুরা এদের পছন্দ। এখন এপস্টিন ফাইল সামনে আসাতে তারা মরিয়া হয়ে গেছে এসব ঢাকা দেবার জন্য। কিন্তু মানুষের হাতে ক্ষমতা না থাকলেও আত্মিক দিক দিয়ে  soul level  -এ মানুষরা এতটাই অ্যাওয়েকেন হয়ে গেছে যে, সেই শক্তির কাছে রেপ্টিলিয়ান- রা হেরে গেছে। ফলে এইসব যুদ্ধের সূচনা করেছে। ডার্ক ফোর্সের পরাজয় ঘটে গেছে স্পিরিচুয়াল লেভেলে , ২০১২  তেই। ডায়ানা কুপার  এর লেকচার শুনে দেখেন।  
লাইট -ফোর্স গ্যালাকটিক ফেডারেশানের সাহায্য নিয়ে জয়ী হয়ে যাবে  বলে প্রফেসি আছে।
গ্যালাকটিক ফেডারেশান এই ইউনিভার্সের মাঝে  5D বা তার উপরের 6D/7D এর non human entity. তারা আমাদের লোকাল -গ্যালাক্সি সমূহের দেখভাল করে। 
7D 'আর্কচুরিন' এবং 5D প্লেইডিয়ানরা চ্যানেলিং এর মাধ্যমে এ-ও বলেছে যে, তারা নিউক্লিয়ার -ওয়ার প্রতিহত করবে।

সৃষ্টিতে টাইম লাইন একাধিক।  রিয়্যালিটি একাধিক। কোন টাইম -লাইনের চ্যানেলিং , চ্যানেলার- রা করছে তা  বুঝা কঠিন। কিন্তু যদি এই প্রফেসি সত্য হয়ে থাকে তাহলে আমাদের প্রজাতি বেঁচে যাবে। এই প্ল্যানেট বেঁচে যাবে। আর নিউক্লিয়ার -ওয়ার হলে প্ল্যানেট  উড়ে টুকরা টুকরা হয়ে 'কিউপার বেল্টের' মত গুড়া গুড়া হয়ে যাবে। বা  Mars এর atmosphere উড়ে সমগ্র প্ল্যানেট যেমন  বসতিহীন হয়ে পড়েছিল, তা হবে।
আমরা যেমন তা চাই না। গ্যালাকটিক ফেডারেশানও তা চায় না। কারণ এতে সৃষ্টির ভারসাম্যের বিঘ্ন ঘটে। তাদের ফ্লিট  এখন দেখা দিচ্ছে আকাশে। বা বলা চলে আমাদের কনসাশনেস সেই পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে যে, আমরা তাদের ফ্লিট দেখতে পাচ্ছি। রাজ্যপতিরা আর লুকিয়ে রাখতে পারছে না। ২০২৭ এ ভীনগ্রহীরা  mass-কমিউনিকেশান করবে। তাই  এসব প্রতিরোধ করতে রেপ্টিলিয়ান  shape shifter - রা মরিয়া হয়ে ২০২৭-২০৩০ পর্যন্ত  সবকিছু তছনছ করবে। 
প্রফেসি আছে ইমাম মেহেদী আসবেন। ঈসা নবীর আগমন ঘটবে। মহাপ্রলয় একদিন শান্ত হবে। জাকারিয়া কামালের Scientific Tafsir এর লেকচার দেখেন। Alex Collier , Jordan Maxwell সহজ ভাষায় shape shifting  বর্নণা করেছেন। তাদের লেকচার শুনতে পারেন।




Reincarnation Cycle - Hindu and Buddhist samsara models



🌀 1. The Whole Diagram → Samsara (Cycle of Existence)



Image

Image

  • The circular, repeating structure directly corresponds to Samsara:

    • Continuous cycle of:

      • Birth → Life → Death → Rebirth

  • No clear start or end → aligns with:

    • Anadi (beginningless) nature of existence in Hinduism

    • Cyclic existence in Buddhism

👉 This diagram is essentially a stylized, abstract version of the Bhavachakra (Wheel of Life)


☀️ 2. Central Core → Atman / Buddha-nature / Ultimate Reality

Image

Image

Image

Image

Hindu Mapping:

  • Central light = Ātman (soul) or Brahman (ultimate reality)

  • Radiating structure → all existence emerges from it

Buddhist Mapping:

  • Not a permanent soul, but:

    • Luminous mind / Buddha-nature

    • Or:

    • The potential for enlightenment

👉 Key difference:

  • Hinduism → eternal self

  • Buddhism → no-self (Anatta), but underlying awareness


🔁 3. Concentric Rings → Levels of Samsaric Existence

Correspondence:

Diagram RingsSamsara Concept
Inner ringsSubtle existence (mental / karmic)
Outer ringsGross existence (physical life)

Buddhist Equivalent:

  • Similar to Six Realms of Existence:

    • Deva (god)

    • Asura (demigod)

    • Human

    • Animal

    • Hungry ghost

    • Hell

👉 The diagram abstracts these into continuous transitions rather than discrete realms


🌳 4. Trees → Impermanence (Anicca) & Cycles of Life

Image

Image

Image

Image

  • Trees at different stages represent:

    • Birth → growth → decay → death → renewal

Buddhist Concept:

  • Anicca (Impermanence)

Hindu Concept:

  • Prakriti cycles (nature’s transformation)

👉 Nature mirrors the same cycle as human existence


🧘 5. Human Figures → States of Consciousness / Spiritual Progress

Image

Image

Image

Image

These correspond to spiritual evolution within samsara:

Lower state:

  • Ignorance (Avidya)

  • Attachment (Tanha)

Higher state:

  • Awareness

  • Detachment

  • Enlightenment

Mapping:

  • Meditating figure → Seeker / Yogi / Bodhisattva

  • Radiant figure → Enlightened being

👉 These are not outside samsara—they are positions within it


🔄 6. Arrows → Dependent Origination (Pratītyasamutpāda)

This is one of the most precise mappings.

Buddhist Concept:

  • Everything arises through causal chains

Example:

Ignorance → Actions → Consciousness → Name/Form → Suffering → Rebirth

Diagram Equivalent:

  • Arrows = causal links

  • Flow = continuous dependent arising

👉 Nothing exists independently → everything flows conditionally


🔘 7. Small Nodes → Karma Transfer Points

These can be interpreted as:

  • Points where:

    • Actions → consequences

    • Karma → modifies next state

Mapping:

  • Karma accumulation / transformation nodes

👉 Like checkpoints where:

  • System state is updated based on past actions


🔁 8. Cycle Itself → Karma-Driven Rebirth Loop

Core Concept:

  • Samsara is driven by:

    • Karma (action + consequence)

    • Desire / attachment

Diagram Interpretation:

  • Movement along rings = karmic progression

  • No escape shown explicitly → trapped cycle


🧠 9. Reset Mechanism → Rebirth (Punarjanma)

Hindu:

  • Soul transitions body-to-body

Buddhist:

  • Continuity without a permanent self:

    • Like flame passing between candles

Diagram:

  • Cycle loops back → but not identical:

    • Suggests:

      • Continuity without sameness

👉 Perfect match to:

  • Buddhist rebirth model


⚖️ 10. Outer Text → Dharma (Cosmic Law)

Interpretation:

  • Governing rules of the system

Hindu:

  • Dharma → moral + cosmic order

Buddhist:

  • Dhamma → universal truth / law

👉 These define:

  • How karma operates

  • How transitions occur


🧭 11. Missing Element (Important Insight)

Unlike traditional Bhavachakra, this diagram:

❌ Does NOT explicitly show:

  • Escape (Nirvana / Moksha outside the wheel)

Instead:

  • The center may imply:

    • Liberation inward, not outward

👉 Interpretation:

  • Enlightenment = realizing the center

  • Not escaping the system physically


📊 12. Direct Mapping Summary

Diagram ElementHindu ConceptBuddhist Concept
Central lightBrahman / AtmanBuddha-nature / emptiness
Circular cycleSamsaraSamsara
ArrowsKarma flowDependent origination
TreesPrakriti cyclesImpermanence (Anicca)
Human figuresYogi / Atman realizationBodhisattva / awakening
NodesKarma accumulationKarma conditioning
Outer textDharmaDhamma
Full loopRebirth cycleRebirth cycle

🎯 Final Interpretation (Philosophically Precise)

This diagram encodes:

A karma-driven cyclic system of conditioned existence, where beings transition through states due to causality and ignorance, with the potential for awakening embedded within the system itself

ব্লগে আমার ১৮ বছর পূর্তি

এমনি একদিন  ২০০৭ । অনলাইন   একটি ই- ম্যাগাজিন সম্পাদনার কাজ করি। অবনী অনার্য  পাকা লেখক। তার থেকে লেখা নিয়ে আমার ই- ম্যাগাজিন সমৃদ্ধ। যার  হ...