ল্যাম্পের আলো নিভু নিভু। তারই নীচে দাঁড়িয়ে কিচেন টেবিলে একমনে কাজ করে যাচ্ছে লিলিয়ানা।সন্ধ্যার দিকটায় তাদের বাড়ির চারপাশ একদম নির্জন হয়ে যায়। শহরের এই অংশতে লোকবসতি এমনিতেই কম।কিন্তু কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পর রাস্তাটা যেন আরো নিস্তেজ হয়ে যায়। তবে তার বাড়ির মালিক কাজ সেরে ফেরেন আরো দেরীতে। মাঝে মাঝে এমনও হয় যে, মালিকের সাথে তার দেখাও হয় না। রাতের রান্না সেরে টেবিলে তা পরিবেশন করে লিলিয়ানা ঘুমোতে চলে যায় রাত অনেক হলে।মালিক বাড়ি এসে খাবারটুকু নিজের মত খেয়ে ঘুমোতে চলে যান দোতলায়। এ বাড়িতে মালিক ছাড়া আর কেউ নেই।প্রায় দেড়শ থেকে দুশো বছরের প্রাচীন এ শহরে বাড়িগুলোও খুব পুরোনো।বাড়ির মালিকেরা সবাই পূর্বপুরুষ থেকে এসকল সম্পত্তির উত্তরাধিকারী।এ বাড়িটাও তেমনি। লিলিয়ানা এখানে কাজ নিয়েছে মাস ছ’য়েক হলো।ষাটোর্ধ মি. রবার্ট তার মালিক। সূউজারল্যান্ডের পাহাড়ী অঞ্চলের পাশ দিয়ে বয়ে চলা ছোট নদীটির তীরে এই শহর।
হাইস্কুল শেষ
করে কাজের উদ্দেশে বের হয়েছে লিলিয়ানা। এতো ভাল
একটা পরিবেশে কাজ পেয়ে যাবে তা সে ভাবতেই পারেনি। সবচেয়ে সহজ কাজ। সকালের নাস্তা
আর রাতের খাবার তৈরী করা।ঘরদোর পরিষ্কার করা। এ বাড়ির দ্বিতীয় তলায় থাকেন মি. রবার্ট।নীচের
তলায় কিচেনের পাশে ডাইনিং এর উলটা দিকে লিলিয়ানার থাকার ব্যবস্থা।কিচেনটা তার ভীষণ
ভাল লাগে। আসলে পুরো বাড়িটাই তার ভাল লাগে। ভীষণ cozy.
গ্রীষ্মের আগমনে
চারিদিক আলো ঝলমলে হয়ে যায়। শীত আসার আগে দিয়ে তেমন থাকে না। কিন্তু লিলিয়ান এসেই বেশ মানিয়ে নিয়েছে। আর তার
নিজের গ্রামও তো এ শহর থেকে বেশী একটা দূরে নয়।
বাড়িতে বৃদ্ধা
নানী আছেন শুধু। বাবা, মা –কে হারিয়েছে সেই ছোটবেলায়।আজ তা আবছা মনে পড়ে।স্পষ্ট নয়
তার স্মৃতির পাতায়। স্কুল ফাইনাল দিয়েই চলে এসেছিল শহরে। কাজও জুটে গেল।মি. রবার্টের
বাড়িতে গৃহ দেখাশোনার দায়িয়্ব। ভদ্রলোক একাই থাকেন।লিলিয়ান প্রথম থেকেই খেয়াল করেছে
বাড়িটা খুব শান্তিময় এক আবহ তৈরী করে রাখে।
শুধু সন্ধ্যাটা
একটু অন্যরকম। শুধু সন্ধ্যায় খাবার প্রস্তুতের সময় যখন কিচেন টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে
কাটাকাটির কাজ করে ভীষণ মনযোগ দিয়ে, তখনই চোখের কোণায় দেখতে পায় এক সৌম্য, সুন্দর মানুষের
ছায়া।প্রায় ছ’ফুট লম্বা, কালো চুল আর কালো চোখের গভীর চাহনি। ফিরে তাকাতেই ছায়াটা কোথায়
যেন হারিয়ে যায়। আর যদি একবারও ফিরে না তাকায়, তাহলে মানুষের সেই অবয়বটি তাকিয়ে থাকে
তার দিকে স্থির দৃষ্টিতে। লিলিয়ান না তাকালেও বুঝতে পারে ছায়ামূর্তিটি দেখছে তাকে নিবিড়
ভাবে।
কে ইনি?
এ বাড়িতে মালিক ছাড়া আর কেউ থাকে না। তাহলে কে আসে প্রতি সন্ধ্যায় ঘড়িতে ঠিক সাতটা বাজলে?
দু’ ঘন্টা টানা কাজ
করে লিলিয়ান। ৭টা
থেকে ৯টা। রাতের খাবার প্রস্তুত করে সকালের নাস্তাও রেডি রাখা। এই দুইটি ঘন্টা লিলিয়ানের
কাজে মনে হয় মিনিট দশেক। এমন কোনদিন নেই যেদিন সন্ধ্যায় সে সেই সৌম্য দর্শনের মানুষটিকে
না দেখে কিচেনের কাজ শেষ করে। তিনি খুব নিশ্চুপ। যেমন কিচেনের হল-ওয়ের আলো আঁধারিতে
ধীরে ধীরে প্রতীয়মান হয় তেমনি আবার ৯টা বাজবার সাথে সাথে কোথায় যেন মিলিয়ে যায়। লিলিয়ান
ভেবেছে মালিককে বলবে ও এইকথা। আবার এও ভেবেছে যে মালিককে এই ছায়ামূর্তির কথা বললে উনি
ভাববেনই বা কি? ভদ্রলোক নিজেই তো থাকেন একা। কাজে ব্যস্ত থাকায় পাড়া প্রতিবেশীদের সাথেও
তেমন মেলামেশা নেই তার। বাড়িতে কোন অতিথি, আত্মীয় স্বজনেরও আনাগোনা নেই।আর কেউ যদি
না থাকে এই বাসায় তাহলে কার আগমন ঘটে প্রতি সন্ধ্যায়? বাসার নীচের বেইসমেন্টে কখনো
যাওয়া হয়নি তার। কিন্তু সে নিশ্চিত এ বাড়িতে তার মালিক ছাড়া আর কোন দ্বিতীয় ব্যক্তির
উপস্থিতি নেই।
২
আজও সারাটা দিন
বেশ মেঘাচ্ছন্ন ছিল। এখন বসন্তের শেষ প্রায়।শীত আসি আসি করছে। আজকেও সন্ধ্যা ৭টায় কিচেনে
যাবে। কাজ শুরু করবে প্রতিটি দিনের মতন একই রুটিনে। মালিক যদিই বা আগে এসে পড়েন তাহলে
লিলিয়ান জানতে চাইবে অন্য কারো কথা। তার পরিবার পরিজন কে কোথায় আছে, তাদের কথা। মালিক
মি. রবার্ট খুব অমায়িক এবং মৃদুভাষীও।সহসা কোন বিষয়ের বিশদ বর্ণনা তার কাছ হতে পাওয়া
যেতে নাও পারে। তারপরও লিলিয়াবের শেষ চেষ্টা। এসব ভাবতে ভাবতেই দরজা খোলার শব্দ এলো।
মালিক এসে পড়েছেন কাজ থেকে। লিলিয়ানকে দেখে হাস্য বদনে অভিবাদন জানালেন। জানতে চাইলেন
কেমন আছে ও।
লিলিয়ান আলো ছায়া
মূর্তির কথাটি বলতে গিয়ে আবারো থেমে গেল। বলল শুধু, ‘ভাল আছি। নানী থাকেন গ্রামের বাড়িতে একলা। সামনের সপ্তাহ শেষে ছুটির দিনে
তার সাথে দেখা করতে যেতে চাই।’
মি. রবার্ট কোন
বাধাই দিলেন না। বললেন, ‘অবশ্যই যাবে। আমিই তোমায় পৌঁছে দিয়ে আসবো। বেশী দূরে তো নয়।’
তাই, যেই বলা সেই কাজ । ছুটি শুরু হতেই লিলিয়ান তার ব্যাগ গুছিয়ে তৈরী। দুপুরের খাবার
সেরে তারা বেরিয়ে পড়লো। ছোট নদীর পাশে ঘেঁষে এই শহর। আর তা পেরিয়ে খামারীদের মাঠ। তার
ওপারে তাদের ছোট গ্রাম। টুকটাক কথা বলতে বলতেই পৌঁছে গেল লিলিয়ান তার ঘরের দোর গোড়ায়।মি.
রবার্ট তাকে নামিয়ে দিয়ে আর বসলেন না।
লিলিয়ান তার নানী
মাকে দেখেই খুশীতে আত্মহারা। ছয়টি মাস দু’জনের দেখা সাক্ষাৎ নেই। যদিও ফোনের প্রচলন
হয়েছে কেবল। তারপরও প্রিয় মানুষটিকে একবার তো ছুঁয়ে দেখতে ইছে করে।আশপাশের সবার কথা
জানতে জানতে সামনের বাসার রবার্টের প্রসংগ এলো।
লিলিয়ানের একটা
ভালো লাগা যেন সে।
‘কেমন আছে ও?’
নানীকে জিজ্ঞাসা করতেই নানী চুপ হয়ে গেলেন। হাসিমাখা মুখটা ভার হয়ে গেল।লিলিয়ান আরো
কাছে এসে তার পাশ ঘেঁষে বসলো। আবারো জিজ্ঞেসা করলো, ‘কেমন আছে ও?’ সেই না ফায়ার ডিপার্টমেন্টে
যোগদান করেছিল সে, লিলিয়ান কাজ নেবারও কয়েক মাস আগে। খুব মনে পড়ে তার কথা। এখনও তো
ট্রেইনিং চলছে ওদের। বেশী একটা ছুটিছাটা পায় না বোধহয়।
গড়গড় করে কথাগুলো
বলে ফেলে আবার প্রশ্ন করলো লিলিয়ান, ‘এর মাঝে ক্রিসমাসে কি বাড়ি আসেনি সে?’ এক নাগাড়ে
কথা বলে যেতে থাকলেও নানী মা কিছু বলছেন না।নানীর নিশ্চুপ ভাব আর সইতে না পেরে তার
হাতটা ধরে লিলিয়ান একটু জোরেই চাপ দিয়ে বলল,
‘বলো না নানী, কেমন আছে রবার্ট? জান, আমি যার বাড়িতে কাজ করি তার নামও রবার্ট।সেখানে
আমি প্রতিদিন আমাদের সামনের হল-ওয়েতে রবার্টের মতন একজনের ছায়া দেখতে পাই। সন্ধ্যায়
তাকে দেখা যাবেই যাবে। আমার কিচেনের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকবে। ঠাঁয় তাকিয়ে থাকবে আমার দিকে।
যেন কতদিন না দেখার তৃষ্ণা। আমি খুব বেশী ভাবি ওকে নিয়ে, তাই না?’
নানী এবার তাকাল
লিলিয়ানের দিকে।ডাগর দুটো চোখ ওর সাধারণ ইউরোপীয়ানদের থেকে আলাদা। খুব মায়ায় ভরা। রবার্টও
সাধারণ সুইসদের মতো নয় দেখতে। যেন তার্কমিনিস্তানের মানুষদের যেমন ঘন কালো চুল আর গভীর
কালো চোখ হয় ঠিক তেমন। আশপাশের নীল চোখদের থেকে একদম ভিন্ন। লম্বা, শান্ত, সৌম্য একটা
ছেলে রবার্ট। এ গ্রামের সে যেন সকলের আদর্শ।
দীর্ঘশ্বাস এলো
নানীর বুক ভরা চাপা কষ্ট থেকে।
কিন্তু কেন এই
কষ্ট?
লিলিয়ান বুঝে
উঠতে পারলো না। নানীমা বললেন, ‘হয়তোবা রবার্টের সাথে তোমার কাজের জায়গার মালিকের নামের
মিল পেয়েছে বলেই রবার্ট খুঁজে খুঁজে সে বাড়িতে গিয়েছে। তোমাকে সেখানেই সে পেয়েছে।’
-‘মানে? আমায়
খুঁজে পেতে সে প্রতি সন্ধ্যায় আসে আমার কাজের জায়গায়?‘
নানী আর কিছু
বলতে পারছেন না। শুধু এতটুকুই বললেন, ‘হ্যা, সে আসে। নিশ্চয়ই আসে। তার মন তো পড়ে আছ
তোমার কাছে। তোমায় দেখতে ইচ্ছা করবে না?’
লিলিয়ান হেসে
ফেলে বলে উঠে, ’সেজন্য প্রতিদিন! উনি দেখা দেবেন, আবার হাওয়ায় মিলিয়ে যাবেন?’ এবার
নানী তাকে জড়িয়ে ধরে বলে উঠেন, ‘না্ রে লিলি। অমনটা ও না।রবার্ট যে ট্রেইনিং নিতে
গিয়ে মারা গেছে, তুই চলে যাবার পরপরই, মাস ছ’য়েক হলো। তাই এখন তো অফিসের ছুটি নেবার
কোন বাধা নেই তোকে দেখতে যেতে। ঠিক ঠিক খুঁজে নিয়েছে তার নামের বাসা। সেখানেই তো তুই
থাকিস।আর সেখানেই যে তার যাওয়া আসা।’
…
০৩/০৬/২০২৬
৩রা জুন, ২০২৬

No comments:
Post a Comment