চরিত্র ১: ব্যাঙ্গমা
চরিত্র ২: ব্যাঙ্গমী
স্থানঃ কদম গাছের ডাল
দুটি পাখি কদম গাছের ডালে। দুজনেই রোগগ্রস্ত। প্রথমজন অপুষ্টিতে ভোগা, মানসিক অবসাদগ্রস্ত একজন প্রৌঢ় । দিনে দু’বার বুক ধড়ফড়ানির ঠ্যালায় শয্যাশায়ী থাকে। পাশে থাকে তার বেঙ্গমী। সেও প্রৌঢ়া।কিন্তু বেঙ্গমার থেকে বছর দশেকের ছোট। হাঁটতে চলতে পারে, তবে খুড়িয়ে। মোট ১০১টা রোগের মধ্যে ১০২ খানাই তার আছে। তবে কড়া মেজাজের ব্যাঙ্গমার সাথে থেকে থেকে তার মেজাজ অত একটা দেখাতে পারে না। রাগ যে ব্যাঙ্গমীর ওঠে না –তা না। কিন্তু কি এক বিশেষ দুর্বলতার কারণে, কেন ব্যাঙ্গমী তাকে সহ্য করে চলে, তা সে নিজেও জানে না।তবে আজ ব্যাঙ্গমার মন বড্ড খারাপ হয়েছে। ব্যাঙ্গমীকে ডেকে তাই বলে, ‘যদি আমার কথা না শোন, আজ থেকে শত বৎসর পরে আমি কিন্তু কথা বলা বন্ধ করে দেব। তোমায় দিয়ে তো কিছু হয় না, তুমি তো অসুস্থ।শুধু পারো পাছা উলটা করে শুয়ে থাকতে।’
ব্যাঙ্গমী ভাবে তার পাছা কোথা থেকে এলো? পাখিদের কি পাছা থাকে? পাখিদের তো পুচ্ছ যে স্থানে থাকে, তাকে পুচ্ছদেশ বলে; কিন্তু মানুষের মত পাছা তো নেই ওদের।
ব্যাঙ্গমা আবার শুরু করে, ‘মানসিক ও শারিরীক – দুভাবেই তুমি অসুস্থ। তোমাকে দিয়ে আর কিছু হবেও না।তোমার বয়স হয়ে গেছে। ৭ বছর পর আরো বয়স হবে। আর সময় কোথায় কিছু করার? তারপর বাপ মরবে, মা মরবে। তখন আবার দৌড়ে বাড়ি যাবা। আর কোন কাজ তো নেই এ ছাড়া।
ইমোশান দিয়ে তোমার পৃথিবী চলে।
তুমি মানসিক রোগী। তুমি পাগল।
অবাস্তব জগতে তোমার বাস। থাকো ঐ ভুত পেত্নী নিয়ে।’
বলাবাহুল্য ঐ কদম গাছে একটা ভুত আর একটা পেত্নীর বসবাস আছে।
ব্যাঙ্গমা বলতে থাকে, আর কোথায় যেন তোমরা যাও ফুওচকা খেতে? বসুন্ধরায়, তাই না? ওখানেই তো যাও।
ফুচকা খাও । ঘুরে বেড়াও।
বাপ মা’র জন্য তুমি কি কর? তোমার কোন ভূমিকা আছে তাদের জন্য?বাবাকে গোসল করাও , খাওয়াও? মায়ের কাছে যেয়ে বসো? হাত পা টিপে দাও? তেল মালিশ করে দাও? ’
ব্যাঙ্গমী তো পড়েছে এবার মহাবিপদে। কিভাবে বুঝাবে তার অসুস্থ মা আর যাই করুক , মাথায় তেল দেয় না। আজও তো তিনি বললেন তার কন্যাকে, ‘এই যে তুমি আছ আমার সামনে, এই- ই যথেষ্ট।’ কিন্তু এই ডায়ালগ ব্যাঙ্গমাকে বলার উপায় আছে নাকি ব্যাঙ্গমীর? গাছের ডালে বসে ব্যাঙ্গমী শুধু ব্যাঙ্গমার ধমকই শুনে যায় এর তরফা।আর ভাবে, এক ব্যারাইম্যার গাইল খাইয়া আরেক ব্যারাইম্যার ব্যারাম সারে না ক্যান? গাছের ডালের তল দিয়া কতজনা হেঁটে যায়। তারা তো হাঁসের মতন থপ্ থপ্ করে হাঁটে না। কানেও কম শোনে না। কানা রোগেও ভুগে না। গায়ে নাই তাদের অতিরিক্ত চর্বি। রক্তে নাই অতিরিক্ত চিনি। মনে নেই কোন আশান্তি, কোন যন্ত্রণা।সবার যে শুধু সফলতাই সফলতা। সবকিছুতেই জিত।আর ব্যাঙ্গমীর নিজের?
এ কি হাল?
দেখলে মনে হয় আটার বস্তা।
ব্যাঙ্গমা তো সকাল বিকাল চিনি মাপে। অধিক সচেতন।কিন্তু ব্যাঙ্গমীর শরীর যে ঝুরঝুরে। লিভারে দোষ। কিডনী তে দোষ।হৃদয় তো নাই-ই বহুবছর ধরে। তাই হার্টের খবর আর রাখে না।
রইলো বাকী কি/ আজকে পাওয়া অনন্য এক উপাধি।– ‘তুমি অসুস্থ। you are sick.
তুমি পাশে থাকলে আমি অসুস্থ বোধ করি। তোমার মা বাপও নিশ্চয়ই করে। তোমাকে দেখলে তো মনে হয় আমার মুখে কেউ বালিশ চাপা দিয়ে রেখেছে। এখানে এসে যে আমার পাশে বস, আমি বসতে দিই বলেই তো । না হলে ডালে ডালে উড়ে উড়ে এখানে এসে বসার সাহস পেতা?’
ব্যাঙ্গমী গালে হাত দিয়ে বসে থাকে আর ব্যাঙ্গমার প্রলাপ শোনে। তারপর তাকায় তার দিকে, আর ভাবে – এক ব্যারাইম্য গাইল পাড়ে তারই মতন আরেক ব্যারাইম্যাকে।
০২/০৬/২০২৬
....
[ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী বাংলা লোকসাহিত্য ও রূপকথার (যেমন—ঠাকুরমার ঝুলি) একটি অতিপরিচিত কাল্পনিক ও জ্ঞানী পক্ষীযুগল।
এদের মধ্যে পুরুষ পাখিটিকে 'ব্যাঙ্গমা' এবং স্ত্রী পাখিটিকে 'ব্যাঙ্গমী' বলা হয়।
এদের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:মানবসুলভ ভাষা: এরা মানুষের ভাষায় কথা বলতে পারে এবং মানুষকে বিভিন্ন ভবিষ্যৎবাণী ও সঠিক পথের সন্ধান দেয়।
প্রতীকী চরিত্র: রূপকথার গল্পে এদের প্রায়শই বুদ্ধিমান, দয়ালু এবং পথপ্রদর্শক হিসেবে দেখানো হয়। দক্ষিণরঞ্জন মিত্র মজুমদারের লেখা 'ঠাকুরমার ঝুলি'র বিভিন্ন গল্পে, বিশেষ করে 'লালকমল নীলকমল' গল্পে এদের দেখা মেলে।বাঙালির লোকসংস্কৃতিতে এই পাখি দুটি মূলত প্রজ্ঞা এবং শুভ শক্তির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।]

No comments:
Post a Comment