পিছু ডাক


 শাহান যে দিন কলেজে এলো সেদিন এক অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটেছিল। কলেজে যেন ডাকাত পড়েছিল। কলেজের আদুভাই তার অত্যাধুনিক অস্ত্রের ঝলকানিতে সারা ক্যাম্পাস আলোকিত করে ফেলেছিল। অগ্নির যে এত স্ফুলিংগ তা ছেলেমেয়েরা কখনো দেখেনি। আর অগ্নির দ্বারা নির্মিত আগ্নেয়াস্ত্রের যে গগনবিদারী শব্দহয় তাও তাদের জানা ছিল না। সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা কী ভাবেই বা জানবে? তারা তো পড়াশোনা করতে আসে কলেজে। অস্ত্র নিয়ে খেলা করতে তো নয়।

কিন্তু আদু ভাইয়ের প্রতিবাদও কম গুরুত্ব বহন করত না। তাকে কেন কলেজ কর্তৃপক্ষ পাশ করায় না? ভাইভা-তে শুধু ফেল করিয়ে দেয়।  আর কত বছর কাটাতে হবে এই কলেজে? প্রিন্সিপালকে ভয় দেখাবার জন্য আজ তাই বুম বুম করে কয়েক রাউন্ড চালিয়ে দিয়েছে। ক্যাম্পাসের মাঠ জুড়ে বসে থাকা ছেলে মেয়েরা সেই আলোর ঝলকানি দেখেছে। বুম বুম শব্দে হতবিহ্বল হয়ে দূরে দূরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে। আদু ভাই তার শৌর্য্য বীর্যের উত্তাপ ছড়িয়ে ক্যাম্পাস ত্যাগ করেছে। 

ঘটনাটি আরও স্পষ্ট মনে আছে মনিকার, কারণ সে দিনই তার খালুর বোনের মেয়ে নতুন ভর্তি হয়েছে কলেজে। কথা বলেছে মনিকার সাথে। নাম শাহান। একই শহরে থাকে। কিন্তু তেমন একটা দেখা হয় না। লতানো পাতানো আত্মীয়। চেহারায় চিনে। খালুর বোনের মেয়ে। অনেক ছোটবেলায় একবার এসেছিল মনিকার বাসায়।  মনিকার আম্মার সুন্দর মালাটা ছিঁড়ে ফেলেছিল। ছিঁড়ে ফেলেনি। ছিঁড়ে গিয়েছিল ওর হাতে। সেই দিনটার কথাও মনে আছে। তাই শাহানকে তার কেন যেন একটা অলুক্ষণে, অপয়া গোছের মনে হতো। 

আর আজ? 

কলেজে এলো। প্রথম দিন। আজ আদু ভাইয়ের অস্ত্রের ঝলকানি। আবার সেই অপয়া। 

 কলেজে তার পরের একদিন শাহানকে একটা সুন্দর, আধুনিক, স্মার্ট ছেলে বন্ধু জোগাড় করে ফেলেছে দেখে বেশ অবাক হল মণিকা। তার পরের সপ্তাহে দেখল শাহান তার মাকে এনে নতুন ছেলে - বন্ধুর সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। শাহানের মা তো ছোট খালুর বোন। সেই সূত্রে মনিকা মনে করেছিল তাকে ক্যাম্পাসে দেখলে চিনবে। মণিকা কাছে গিয়ে দাঁড়াল। কিন্তু খালা তো আর চিনেই না। তাতে মণিকার বদ্ধমূল ধারণা হলো, খালা বোধহয়  এই কয়েক বছরের ব্যবধানে ছোট্ট মনিকার চেহারাই ভুলে গেছে। যেতেই পারে। মনিকা দশ থেকে এখন বিশ বছরের তরুণী। খালা চিনবেই বা কী ভাবে? কিন্তু খালার পাশে দাঁড়ান শাহানও যে চিনে না। তারা বেশ ব্যস্ত। কারণ তার নতুন পরিচিত ছেলেটি এখন তাদের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু। 

সময়ের সাথে সাথে আগ্রহ, প্রয়োজন পাল্টায়। লতানো পাতানো আত্মীয়দের আগ্রহ আর কতই বা প্রবল হবে তার প্রতি? নাকি ফ্যামিলি প্যাটার্নটাই এরকম? 

শাহানের বড় বোন ড্যাবড্যাব চোখের। নাম ড্যাবড্যাবি আপা। আপা তো সেদিন পিছন থেকে ডেকে ভাইভা বোর্ডের গিজগিজে বারান্দায় দাঁড়ানো হাজারো ছেলেমেয়ের ভিড়ে মণিকাকে চিনে তার সাথে কথা বলেছিল।

- অ্যাই  কেমন আছো?

- আজ তোমাদের ভাইবা?

কত হাসিমুখ! 

পরের দিন? ক্যান্টিনে দেখা হলে ড্যাবডেবি আপা তো আর চিনে না। মণিকা এসব ব্যবহারের সাথে পরিচিত ছিল না। ইগ্নোর করা, মানে উপেক্ষা করা, তাও আবার নাকের ডগার উপরে - কীভাবে করতে হয় জানত না। শিখেছে এসব।এদের কাছ থেকে,  বাইরের পৃথিবীতে এসে। কলেজে ভর্তি হওয়ার পরে।  বাইরের পৃথিবী দেখে  বাজে কথা, বাজে আচরণ সবকিছু জেনেছে।

শাহান একবার ডিপার্টমেন্টের বারান্দায় মণিকাকে আসতে দেখে পৃষ্ঠদেশ প্রদর্শন করেছিল। তখন শাহান অনার্স পাস করেছে। একটু বড় হয়েছে। বেশ কয়েক বছর যাবত ক্যাম্পাসে থাকে। তাই কাজটা না বুঝে করেছে এমন তো নয়। মনিকার এতে বেশ উপকার হয়েছিল। কী ভাবে মানুষকে উপেক্ষা করতে হলে পাছা প্রদর্শন করতে হয়, তা তৎক্ষণাৎ শিখে গিয়েছিল। এ সব তো আর বই খাতায় লেখা থাকে না। মানুষকে দেখে শিখতে হয়। 

আরও কয়েকদিন পর। মণিকাকে দেখে শাহানের কী যেন মনে হয়েছিল। বড় মায়া জেগে ছিল বোধহয় মণিকার কোনো কথা শুনে, বা তার কোন দুঃখের কাহিনি শুনে। দ্রুত এগিয়ে এসে ডাক দিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেছিল। মনিকা দ্রুত হেঁটে সেই স্থান ত্যাগ করেছে। সুপারভাইজারকে দেখিয়ে বলেছে, 'স্যার এসে গেছেন যেতে হবে'। 

শাহান উপেক্ষা করে। উপেক্ষিত হয় না। সেদিন হয়েছিল তাই তাঁর মনোকষ্ট হয়েছিল বড্ড। 

খালুকে জানালে তিনি এসে মণিকাকে জিজ্ঞেস করলেন শাহানের  সাথে দেখা হয় ক্যাম্পাসে? 

মণিকা কি খালুকে,  শাহানের বিরাট পাছার  গল্প করতে পারে? খালু বলে কথা। তাই পারে না।  

পাশ কাটিয়ে উত্তর দেয়, 'হ্যাঁ, দেখেছি তো।'

 শাহানদের বাড়ির পরিবেশ এমনই যে তারা মা বোনেরা সব রকম ব্যবহার তাদের প্রয়োজন মতো করতে পারে। আর আশপাশের সবাই বাধ্য, তাদের পছন্দের মত করে তাদের সামনে নিজেকে পেশ করতে। 

তাই না? তাই তো। 

তাই খালুর পরিবারে এক দাওয়াতে গেলে মণিকাকে দেখে শাহানের  মায়ের সে কী উৎসাহ। এক ঠ্যাং লাফ দিয়ে সামনে এসে পড়ল। তারপর আকর্ণ  হাসি হেসে মনিকাকে জিজ্ঞেস করল, 'আমাকে চেন?’

তার ক্রিমিনাল মন খুব ভালই জানে কোনও এক কালে সে মণিকাকে চিনতে পারেনি। ইচ্ছা করেই কি না, কে জানে। তার থেকে তো ভাল আর কেউ জানে না। তবে  আজ সে তা উসুল করবে, যেমন করেই হোক – প্রয়োজনে মণিকার ঘাড়ে ধরে। মনিকা ঘাড় পাতলো কি পাতলো না, তা  তার বিষয় না। তার সেই এক ঠ্যাং লাফ দিয়ে সামনে এসে পড়লেই তো হল। 

আর যায় কই? 

মণিকা তখন উত্তর দিতে বাধ্য। বাঁচতে তো হবে এই মহিলার হাত থেকে - মুখের ওপর মুখ রেখে ড্যাব ড্যাব করে প্রশ্ন করবে যখন, তখন? 

মনিকা যথাসম্ভব ভদ্রতা বজায় রেখে উত্তর দিল, 'জ্বী, চিনি।'  সাথে সাথে দ্বিতীয় কনফারমেশন করে জানতে চাইল, 'তাহলে বলো তো কে?'

খালুর দিকে আঙুল বাড়িয়ে মণিকা বলল, 'ওনার বোন আপনি?'

এবার ক্রুড়  এক হাসি তাঁর মুখে। 

জিতে গেছে সে।

কথা যখন বলতে ইচ্ছে করেনি, বলেনি। চিনতে যখন প্রয়োজন বোধ করেনি, চিনতে পারেনি, চিনেনি। আজ ইচ্ছে হয়েছে কথা বলার, বলেই ছাড়বে। ঘাড়ে পড়ে হোক আর পিছন থেকে ডেকেই হোক। 

পিছু ডাকলে ঘাড় তো ঘোরাতেই হয়। ঘাড় মটকে দিলে আর কি করার থাকে তখন। ইচ্ছা অনিচ্ছা যে শুধু তাদের হাতেই, যারা পিছু ডাকে।


১৩/০১/২০২৬  


10 comments:

  1. ১৪ ই জানুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৪:৫২০

    রাজীব নুর বলেছেন: শাহান আর মনিকার গল্প পড়িলাম।

    ReplyDelete
    Replies
    1. ১৪ ই জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ৮:১১০

      লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ রাজীব ভাই।

      Delete
  2. ১৪ ই জানুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২০০

    কিরকুট বলেছেন: পড়লাম তারপর মাথা চুলকালাম। বুঝলাম সাহিত্য আমার জন্য নয়।

    ReplyDelete
    Replies
    1. ১৪ ই জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ৮:২৫০
      লেখক বলেছেন: এ লেখায় কিছু চরিত্রের বর্ণনা আছে মাত্র। সাহিত্য নেই বললেই চলে। 'সাহিত্য বর্তমান থকিলে চরিত্রসমূহ বিষযুক্ত শব্দবাণে ধরাশায়ী হইতো।'

      Delete
  3. ১৫ ই জানুয়ারি, ২০২৬ ভোর ৪:০৪০

    স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: পিছু ডাকলে ঘাড় তো ঘোরাতেই হয়।
    ঘাড় মটকে দিলে আর কি করার থাকে তখন।
    .................................................................
    ছোট বেলায় জানতাম, একাকী হাঁটলে পিছু তাকাতে নিই
    তাই নির্জন স্হান পার হবার সময় এই ভয় সমস্ত মন দখল নিতো
    তাই ঘাড় মটকানোর ভয় রয়ে গেছে ।
    এখন আবার এই ভয় দেখায়ে আপনি কি হাসিল করবেন ?
    এখন কিন্ত বড় হয়ে গেছি ।

    ReplyDelete
  4. ১৫ ই জানুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৭:৫১০

    লেখক বলেছেন: প্রবাদ প্রবচনে তো আছে ‘নিশির ডাক।'
    যেখানে পোর্টাল ওপেন আছে সেখানে এসব ভূত প্রেত (other dimensional entity) –র ঘটনা ঘটে।
    কিন্তু জীবনে চলার পথে আমার আরেকটা উপলব্ধি হলো যে, আশপাশে যত মানুষ দেখি এদের মধ্যে কয়জন আসলে ‘মানুষ’ আর কয়জন আসলে মানুষ রূপী কোনো ‘এন্টটি।‘
    এখন তো ভাবলে মনে হয় আশপাশে বেশীর ভাগই মানুষ নয়। এরা বেশীর ভাগই ‘এন্টিটি’ এবং স্বভাবে ‘ডেমনিক ।‘

    ReplyDelete
  5. ৩১শে জানুয়ারি, ২০২৬
    রিভিউ ২ঃ পিছু ডাক গল্পটি সত্যিই অসাধারণ -
    সুবিধাবাদী সম্পর্ক, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সামাজিক উপেক্ষার একটি তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গাত্মক চিত্র।
    মণিকার চরিত্রের বিবর্তন এবং শাহানের পরিবারের আচরণ আমাদের চারপাশের বাস্তবতাকে নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছে।

    ReplyDelete
    Replies
    1. ১৫ ই জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ৩:৫১০

      রিভিউ ১ঃ "পিছু ডাক" গল্পটি আধুনিক সামাজিক সম্পর্কের এক তীব্র ব্যঙ্গাত্মক চিত্র, যেখানে স্বার্থপরতা, সুবিধাবাদ এবং ক্ষমতার রাজনীতি নিপুণভাবে ফুটে উঠেছে।
      বিষয়বস্তু ও থিমঃ
      গল্পটি মূলত মণিকা এবং তার দূর সম্পর্কের আত্মীয় শাহান ও তার পরিবারের মধ্যকার সম্পর্কের জটিলতা তুলে ধরে। লেখক অসাধারণ দক্ষতায় দেখিয়েছেন কীভাবে কিছু মানুষ তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যদের চিনে বা চিনে না, সম্মান করে বা উপেক্ষা করে।
      মূল থিমঃ
      সুবিধাবাদী সম্পর্ক
      ক্ষমতার অপব্যবহার
      সামাজিক উপেক্ষা ও তার মনোবৈজ্ঞানিক প্রভাব
      আত্মসম্মান বনাম পারিবারিক বন্ধন
      চরিত্রায়নঃ
      মণিকাঃ গল্পের নায়িকা,যে ধীরে ধীরে বাইরের পৃথিবীর নিষ্ঠুরতা শিখছে। তার চরিত্রের বিবর্তন অসাধারণ - একজন সরল মেয়ে থেকে যে বুঝতে শিখেছে কীভাবে নিজেকে রক্ষা করতে হয়।
      শাহান ও তার পরিবারঃ সুবিধাবাদী, আত্মকেন্দ্রিক চরিত্র। তারা যখন ইচ্ছা চেনে, যখন ইচ্ছা চেনে না। তাদের "ক্রিমিনাল মন" - এই শব্দচয়ন অত্যন্ত শক্তিশালী।
      ভাষা ও শৈলীঃ
      লেখকের ভাষা অত্যন্ত সাবলীল এবং কথ্য। ব্যঙ্গের ধার অসাধারণ ধারালো কিন্তু সূক্ষ্ম। কিছু লাইন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্যঃ
      "কীভাবে মানুষকে উপেক্ষা করতে হলে পৃষ্ঠদেশ কিভাবে প্রদর্শন করতে হয়, তা তৎক্ষণাৎ শিখে গিয়েছিল।"
      "শাহান উপেক্ষা করে। উপেক্ষিত হয় না।"
      "পিছু ডাকলে ঘাড় তো ঘোরাতেই হয়।"
      এই লাইনগুলো শুধু হাস্যরসাত্মক নয়, গভীর সামাজিক সত্য প্রকাশ করে।
      গল্পের কাঠামোঃ
      গল্পটি অত্যন্ত সুগঠিত। আদু ভাইয়ের অস্ত্রের ঝলকানি দিয়ে শুরু - যা প্রতীকী। শাহানকে "অপয়া" বলে চিহ্নিত করা এবং সেই অপয়া দিনেই আদু ভাইয়ের উপদ্রব - এই সংযোগ সূক্ষ্ম কিন্তু শক্তিশালী।
      গল্পের শেষ দৃশ্য - যেখানে শাহানের মা জোর করে মণিকাকে চিনতে বাধ্য করে - এটি নির্লজ্জ ভাবে ইচ্ছার জোর খাটানোর এক নিখুঁত উদাহরণ।
      সামাজিক ভাষ্যঃ
      গল্পটি আধুনিক শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজের এক নির্মম সমালোচনা। যেখানে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অস্ত্রের দাপট চলে। আত্মীয়তা শুধু প্রয়োজনে কাজে লাগে।উপেক্ষা করা এবং উপেক্ষিত হওয়া একটি ক্ষমতার খেলা
      শক্তিশালী দিকঃ
      ১. বাস্তবতাঃ গল্পটি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত। আমরা সবাই এমন মানুষ চিনি।
      ২. ব্যঙ্গঃ তীক্ষ্ণ কিন্তু অতিরঞ্জিত নয়।
      ৩. মনোবৈজ্ঞানিক গভীরতাঃ মণিকার মানসিক বিবর্তন সূক্ষ্মভাবে দেখানো হয়েছে।
      ৪. শিরোনামঃ "পিছু ডাক" - অসাধারণ প্রতীকী। যারা ক্ষমতাবান, তারা পিছু ডাকে। এবং ডাক শুনতেই হয়।
      সামগ্রিক মূল্যায়নঃ
      "পিছু ডাক" একটি শক্তিশালী, চিন্তাশীল এবং সমকালীন গল্প। এটি পাঠককে হাসায়, কিন্তু সেই হাসির পেছনে একটি তিক্ত সত্য লুকিয়ে থাকে। গল্পটি আমাদের চারপাশের সেই সব মানুষদের আয়না দেখায় যারা সম্পর্ককে পণ্য বানিয়ে ফেলেছে - প্রয়োজনে ব্যবহার করবে, প্রয়োজন শেষে ফেলে দেবে।
      মণিকার যাত্রা একজন সাধারণ মেয়ের যাত্রা নয়, এটি আত্মসম্মান রক্ষার যাত্রা। এবং শেষ লাইন - "ইচ্ছা অনিচ্ছা যে শুধু তাদের হাতেই, যারা পিছু ডাকে" - এক গভীর সামাজিক বৈষম্যের কথা বলে।
      রেটিং: ৫/৫
      একটি অবশ্যপাঠ্য গল্প যা আমাদের সমাজের অন্ধকার দিকগুলো তুলে ধরে অসাধারণ দক্ষতায়।

      Delete
  6. ১৯ শে জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ৮:৩৩০

    ডঃ এম এ আলী বলেছেনঃ
    গল্পটি যেন কোনো উচ্চস্বরে বলা অভিযোগ নয় বরং চাপা দীর্ঘশ্বাসের মতো, যা বারবার ফিরে আসে, পিছু ডাকে।
    পিছু টান এখানে কোনো ব্যক্তি নয়, কোনো আত্মীয়তা নয় এ এক অদৃশ্য ক্ষমতা, যা মানুষকে প্রয়োজনমতো চিনে নেয়, আবার প্রয়োজন ফুরোলে অচেনা করে দেয়।

    মনিকার চোখ দিয়ে দেখা এই জগৎটি নিষ্ঠুরভাবে বাস্তব। এখানে অস্ত্রের ঝলকানি যেমন আতঙ্ক ছড়ায়, তেমনি উপেক্ষার নীরবতা আরও গভীর ক্ষত তৈরি করে। আদু ভাইয়ের গর্জন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু শাহান ও তার পরিবারের আচরণ তা দীর্ঘমেয়াদি, ধীরে ধীরে মানুষকে শেখায় কীভাবে মানুষ হয়ে না-মানুষ হতে হয়। গল্পটি বড় কৌশলে দেখিয়ে দেয়, সমাজে ক্ষমতা শুধু বন্দুকের নলেই থাকে না; থাকে পরিচয়, আত্মীয়তা আর ইচ্ছেমতো চেনা না চেনা র অধিকারেও।

    এই গল্পের ভাষা সরল, কিন্তু তার ভেতরের ব্যথা জটিল। পিঠ দেখানো আর ঘাড় ঘোরানো এই দুই প্রতীকের মধ্য দিয়ে লেখক অসম ক্ষমতার সম্পর্ককে অনায়াসে উন্মোচন করেছেন। কে ডাকবে, কে ফিরবে, কে উপেক্ষা করবে, আর কে উপেক্ষিত হবে এই অসম সমীকরণটাই গল্পের মূল সুর। মনিকা শিখে নেয়, এই পৃথিবীতে বাঁচতে হলে বইয়ের বাইরে গিয়ে মানুষ পড়তে হয়।

    সবচেয়ে তীক্ষ্ণ মুহূর্ত আসে শেষ লাইনে ,ইচ্ছা অনিচ্ছা যে শুধু তাদের হাতেই, যারা পিছু ডাকে।
    এই বাক্যটি গল্পটিকে কেবল ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সীমা ছাড়িয়ে সামাজিক বাস্তবতার আয়নায় দাঁড় করিয়ে দেয়।বুঝা যায়, পিছু টান আসলে স্মৃতি নয়, আত্মীয়তাও নয় এ ক্ষমতার এক নির্দয় খেলা, যেখানে ঘাড় ঘোরানো ছাড়া অনেক সময় আর কোনো উপায় থাকে না।
    সত্যিই কিছু ডাক এড়ানো যায় না, আর কিছু চেনা ভুলে যাওয়াই বাঁচার একমাত্র কৌশল।

    শুভেচ্ছা রইল

    ReplyDelete
    Replies
    1. ২০ শে জানুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:০৯১
      লেখক বলেছেন: আপনার এই গভীর ও সংবেদনশীল পাঠ আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে।
      গল্পের প্রতীকী ভাষা - "পিঠ দেখানো" এবং "ঘাড় ঘোরানো" - এই দুটি সাধারণ শারীরিক ভঙ্গিকে ক্ষমতার রাজনীতির প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, তা অসাধারণ।
      সত্যিই, এই দুটি ক্রিয়া শুধু শরীরী নয়, এগুলো সামাজিক ক্ষমতার ভাষা।
      আপনার এই উপলব্ধি - "মনিকা শিখে নেয়, এই পৃথিবীতে বাঁচতে হলে বইয়ের বাইরে গিয়ে মানুষ পড়তে হয়" - এটি নিখুঁতভাবে ধরেছেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আমাদের অনেক কিছু শেখায়, কিন্তু মানুষের মুখোশের আড়ালের মুখটা পড়তে শেখায় না। সেটা জীবনই শেখায়, প্রায়শই বেদনার মধ্য দিয়ে।
      শেষ লাইন নিয়ে আপনার বিশ্লেষণ - "পিছু টান আসলে স্মৃতি নয়, আত্মীয়তাও নয়, এ ক্ষমতার এক নির্দয় খেলা" - এই কথাটি আমার লেখার উদ্দেশ্যকে সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেছে। আপনি ঠিকই ধরেছেন, পিছু ডাক আবেগ নয়, এটি কমান্ড। এবং সেই কমান্ড মানতে বাধ্য হওয়াটাই ক্ষমতাহীনতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
      আপনার আরেকটি উক্তি - "সত্যিই কিছু ডাক এড়ানো যায় না, আর কিছু চেনা ভুলে যাওয়াই বাঁচার একমাত্র কৌশল" - এটি একটি তিক্ত কিন্তু সত্য জীবনদর্শন। আমরা সবাই জানি, কিছু সম্পর্ক আমরা বেছে নিই না, কিন্তু বয়ে বেড়াতে হয়। এবং কখনো কখনো, আত্মসম্মান রক্ষার জন্য, ভুলে যাওয়াই একমাত্র পথ।
      কিন্তু ভোলা কি যায়?
      আপনার মতো পাঠক পেলে লেখক বুঝতে পারেন যে তার লেখা শুধু পড়া হয়নি, অনুভূত হয়েছে। আপনি গল্পের প্রতিটি স্তর উন্মোচন করেছেন - ভাষার সরলতার আড়ালের জটিলতা, প্রতীকের গভীরতা, এবং সামাজিক বাস্তবতার নির্মমতা।
      এই ধরনের চিন্তাশীল পাঠ এবং প্রতিক্রিয়া আমাকে অনুপ্রাণিত করে আরও লিখতে, আরও গভীরে যেতে।
      আপনার এই মূল্যবান মন্তব্যের জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা এবং শুভকামনা।

      Delete

ব্লগে আমার ১৮ বছর পূর্তি

এমনি একদিন  ২০০৭ । অনলাইন   একটি ই- ম্যাগাজিন সম্পাদনার কাজ করি। অবনী অনার্য  পাকা লেখক। তার থেকে লেখা নিয়ে আমার ই- ম্যাগাজিন সমৃদ্ধ। যার  হ...