বাড়ির পথ


 ১

টরোন্টো শহরের উঁচু উঁচু ত্রিশ, পয়ঁত্রিশ তলা বিল্ডিংগুলোকে এক সারিতে পাশাপাশি দাঁড় করালে যতটুকু জায়গা লাগে ততটুকু বিস্তৃত জায়গা জুড়ে এই কমিউনিটি, যেখানে আমি থাকি। কিন্তু কোন শহর তা বুঝতে পারছিনা। স্বপ্ন তো সবসময়সবকিছু স্পষ্ট হয়না। তবে ইউরোপের কোন শহর হবে। বিল্ডিং -এর সামনে ফুলের বাগান। বাগানের পাশ দিয়ে হেঁটে এসে বেশ কিছুদূর এগিয়ে পিছনে ফিরে তাকালে সুদৃশ্য ধূসর সাদা বর্ণের সেই বিল্ডিংটি দেখা যায়। টরোন্টো শহরের অন্তত চার পাঁচটা বিল্ডিং সারিবদ্ধ করে সাজালে যেরকম বিশাল জায়গা নেবে, তার সমান জায়গা নিয়ে একটা বিশাল হাউজিং এস্টেট  গড়ে উঠেছে। এখানেই আমি থাকি। কিন্তু তারপরও আমি চিনতে পারছি না, এ কোন শহর। বিল্ডিং থেকে বের হয়ে বেশ কিছুদূর এগিয়ে দেখলাম সামনে গোলাকার ফুলের বাগান। বড় বড় ক্যাকটাস আর হরেক রকমের ফুলে সজ্জিত বাগানটি পাথর দিয়ে ঘেরাও করে বাঁধাই করা।  


আরো সামনে এগুলাম । হেঁটে হেঁটে এগিয়ে দেখি সামনে আর পথ নেই। পথ যেন শেষ! অর্থাৎ বুঝতে পারছি, এ পাড়ায় আমি নতুন এসেছি, তাই পথ ঘাট  বেশি একটা চিনি না।  আরেকটু  সামনের দিকে যেয়ে দেখতে চেষ্টা করলাম কিসের কাজ হচ্ছে। সামনে পথ কেন বন্ধ? দেখি, পথের শেষে কনস্ট্রাকশনের কাজ চলছে। কাঁচা মাটিতে ভরা সামনের জমিটুকু। কাঁচা মাটির অংশ সোজা চলে গেছে অনেকদূর। পাশে একটা ট্রাক্টর আছে।তার চাকার গভীর দাগ মাটিতে গেঁথে আছে। আর পাশে  বিশাল ফসলের ক্ষেত। যতদূর চোখ যায় দিগন্ত জুড়ে শুধু ফসলে ভরা বিস্তৃত মাঠ। আমাদের দেশের ধানের চাষ হচ্ছে না।  তাই নিশ্চিত এ জায়গা অন্য কোথাও।  ফসলের মাঠ ভর্তি বড় বড় পাতার গাছ। ভুট্টা ক্ষেত হতে পারে। ফসল ফলানোর কাজ করার জন্যই  ওই ট্রাক্টর এখানে রাখা হয়েছে ঐ ক্ষেতেরই পাশ দিয। আমার রাস্তার শেষ বরাবর সামনের অংশ কাঁচা মাটির অঞ্চল জুড়ে  চলছে রাস্তা বানানোর কাজ। সেখানে কাদা মাটিতে একাকার। কাদা ভরা জায়গার ওপর বেশ কয়েকটা ট্রাক ভর্তি করে কন্সট্রাকশানের সরঞ্জাম রাখা  হয়েছে। নরম মাটিতে ভরা জায়গাটির  ওই পাড়ে, বেশ দূরে রেল লাইনের ট্র্যাক দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ এই জায়গায়, বিশাল ফসলের ক্ষেতের পাশ দিয়ে রেলপথ ছিল বহু, বহু বছর আগে। এই অংশে নতুন রাস্তাটুকু তৈরি হয়ে আমার কমিউনিটির সাথে যুক্ত হবে। 


ফসলের ক্ষেতের দিকে আবারো তাকালাম। সূর্য অস্ত যাচ্ছে প্রায়। পড়ন্ত সূর্যের নরম আলো এসে পড়েছে ফসলের মাঠ জুড়ে।  সোনালী- লাল কাদামাটি ভরা রাস্তাটা অপূর্ব দেখাচ্ছে। একটু ভালো করে খেয়াল করতেই  দেখি আমার ছোটবেলার বন্ধু সুমনা দাঁড়িয়ে আছে ঠিক আমার সামনে। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি ওর দিকে।

ও এলো কথা থেকে? 

এখানে কেন?

এখান থেকে কোথায় যাবে ও? এখানে যে রাস্তা শেষ। 

এই দুই রাস্তার মাঝে কেন দাঁড়িয়ে একাকী? যেহেতু কাঁচা রাস্তা শুরু হয়েছে , তার তো সামনে যাবার কোন উপায় নেই। 

হঠাৎ  মনে পড়লো আমি তো তাকে একটু আগেই দেখেছি আমার  বিল্ডিং -এর কাঁচে ঘেরা রিসেপশানে । ওর কি যেন একটা কাজ ছিল । কারো সাথে কথা বলছিল। আমি দেখেছিলাম ওকে ওখান থেকে বের হতে । 

সুমনা আমার সাথেই এতক্ষণ ধরে  হেঁটে হেঁটে এ পর্যন্ত এসেছে। আমি তো আশপাশ দেখতে ব্যস্ত। আমি এতদূর পর্যন্ত হেঁটে এসেছি যেমন, সেও এখানে এসেছে তেমন।  কিন্তু বুঝে উঠতে পারছি না, ও এখান থেকে কোথায় যাবে? 

ভাবনাটা বার বার আসছে। সামনে তো রাস্তা নেই । রাস্তার কাজ চলছে। কোন ভাবেই এটা হেঁটে যাবার  রাস্তা নয়। আর এই কাদা পেরিয়ে কোন বড় রাস্তা নেই বা কোন জনবসতিও নেই ওদিকে । খালি গাছে ঘেরা জংগল। 

তাহলে সুমনা যাবে কোথায়?

ভাবতে ভাবতেই শুনলাম সুমনার আব্বার কন্ঠ। আঙ্কেল এসেছেন ওকে নিতে। ফসলের মাঠ পেরিয়ে দিগন্ত ঘেঁষে ওই যে দূরের গ্রাম, সেখান হতে  আংকেল  এসেছেন এতদূর  হেঁটে, সুমনাকে নিতে। অর্থাৎ স্বপ্নের মাঝে এবার  আমি বুঝলাম, ঐ গ্রামে ওনারা থাকেন।

 

সন্ধ্যা হয়ে আসছে।এখন বাড়ি ফেরার সময়। এত দূর হেঁটে এসে  জমির নীচু স্থানে দাঁড়িয়েছেন আংকেল। মুখে হাসি। সুমনাকে বললেন, ‘তুমি যাবে না?’ 

আমি নিশ্চিন্ত হলাম এবার। 

নিশ্চিন্ত হলাম এই ভেবে যে, এই নির্জন রাস্তার মোড়ে সুমনাকে একা রেখে যেতে হচ্ছে না।  আমার যাবার  পথ তো এখানেই শেষ।  আমাকে ফেরৎ যেতে হবে পেছনে ফেলে আসা রাস্তা ধরে ঐ অ্যাপার্টমেন্টে, যেখানে আমি থাকি।  তাই সে আংকেলের সাথে চলে যাবার বেলায় আমি বললাম, ‘এরপর তুমি যেদিন এই জায়গায় আসবে, আসলেই আমাকে খবর দেবে। আমি ঠিক এখানে এসে তোমার সাথে দেখা করবো।‘  

সুমনা মাথা নাড়লো। কোন কথা বললো না। 

চারদিকে তাকালাম আবার। সত্যিই জায়গাটা খুব নির্জন।  দুটো পথ চলে গেছে দুই দিকে। একটা সামনের দিকে কাদা মাটিতে ভরা কাঁচা পথ।  যেখানে পথ শেষ।  যাবার কোনো উপায় নেই।  আরেকটা আমার পিছনে ফিরে আসা পাকা রাস্তা। এবার আমি  বাড়ির দিকে রওনা দিলাম। এখন চারিদিকে আলো কমে এসেছে। হেঁটে হেঁটে গোলাকার ফুলের বাগানের পাশে এসে কোন দিকে যাব ভাবলাম।  গোল চত্বরের বাঁ পাশে তাকিয়ে দেখি উঁচু পাহাড়ে ঘেরা অন্ধকার জঙ্গল আর  ডান দিকে দিয়ে ঘুরে গেলে আমার বাড়ির পথ, যেখানে আমি থাকি।


অথচ ছোটবেলায় সুমনারা আর আমরা তো একই বিল্ডিং -এ থাকতাম।  চারতলা উচু বিল্ডিং তখন কি বিশাল মনে হতো। পাড়ার ভেতর দিয়ে বিল্ডিং –এর সামনে হাঁটার রাস্তার ছিল। পাশে ছোট ছোট সবুজ মাঠ।  মাঠের পাশে আঁকা বাঁকা হাঁটার পথে  সুমনার হাতের ভেতর হাত পুরে গল্প করতে করতে চলে যেতাম অজান্তে রাস্তার মাঝ বরাবর।  আর, ও আমার  হাত টেনে আমাকে রাস্তার পাশে  টেনে নিয়ে আসতো। বলতো, ‘আপনি রাস্তার মাঝে চলে যাচ্ছেন কেন, রাস্তার পাশে আসেন।‘ 

ও আমাকে আপনি করে বলতো।  আমি বছর পাঁচেকের বড় ওর থেকে। ওর বয়স  চার । ও  স্কুলে ভর্তি হয়নি । সামনের বছর স্কুলে যাবে । কিন্তু কখনো মনে হয়নি আমরা খুব ছোট্ট ।  এখন তো ভাবলে অবাক লাগে, চার দশক আগে আমরা তো ছোট্ট শিশু ছিলাম।  

কিন্তু তখন কেন এমন মনে হয়নি?  কারণটা এখন বুঝি। আত্মার তো কোন বয়স নেই। তাই  আমার ভেতরের  আত্মা যখন সুমনা কে আরেকটা আত্মা হিসেবে দেখেছে , সে বয়স বিচার করেনি। আমরা  ,  শিশু না  বৃদ্ধ – এসব চিন্তা তাই মাথায় আসেনি।  পাঁচ দশক পর পিছনের সেই স্মৃতি মনে করে এখন ভাবি আমাদের জীবনের চলার পথ যে তখন মাত্র শুরু হচ্ছে তা কি আমরা জানতাম?  আমার চলার পথে  আমি এত ছোটবেলা থেকে ওর সংস্পর্শে পেয়েছি?

 

আমাদের চারতলা বিল্ডিং -এর প্রথম তলার প্রথম বাসাটা ছিল ওদের। ওদের বারান্দার সামনের পাকা চত্বরে একা দোক্কা খেলতাম। এই বিল্ডিং থেকে ওই বিল্ডিং এর পোর্টিকোর অংশকে ‘ডাঙ্গা’ বানিয়ে ‘কুমির তোর জলে নেমেছি’ খেলতে খেলতে   তৃষ্ণার্ত হয়ে গেলে সুমনাদের বাসায় বেল বাজাতাম পানি খাবো বলে।বেল বাজালে বাবুল দরজা খুলে দিত।  পাড়ার সকল বাচ্চারা মিলে  যেতাম ওদের বাসায় পানি খেতে।

আবার খেলা শুরু হতো। কত খেলা না খেলেছি।  বরফ -পানি, ছি বুড়ি, ওপেন-টি বাইস্কোপ আরো কত কি।আমাদের দলের  সবার বয়স তখন চার। আমার একটু বেশী । ক্লাস ফোরে-এ পড়ি।  আমি সবার বড়। আমাকে কি যে ভালবাসতো সকলে। ঈদের দিনে দল বেঁধে বের হয়ে এর বাড়ি , ওর বাড়ি ঘোরাঘুরি করতাম সারা পাড়া জুড়ে। কত যে আনন্দ!  আমরা পাড়ার বাচ্চারা সকলে যেন আত্মার আত্মীয়। আজ ভাবি  কিভাবে সম্ভব হয়েছিল একে অপরের সাথে একই জায়গায় জড়ো হয়ে  খেলার সাথী হওয়া?  সোজা উত্তর। বাবাদের চাকুরী সূত্রে এক জায়গায় হওয়া বাবদ। আবার সময়ের প্রবাহে একেক জন  ছিটকে দূরে চলে গিয়েছি।   

১৯৮০- এর পরে তিন দশক দীর্ঘ  সময়।এই সমটুকু পার করে ফেসবুক – এর কল্যাণে  আমাদের পাড়ার সকলের একটি ফেসবুক গ্রুপ তৈরি হলো।  যেখানে  ভার্চুয়ালি আবার সংযুক্ত হলাম। 


কিন্তু জীবনে একে অপরের সাথে সাক্ষাত বা সংযোগের যে আরেকটা হিসাব থাকে। জীবনের হিসাব। জীবনের বাঁকে মোড় নেবার সময়  দুটি অজানা পথের সংযোগস্থলে দেখা হবার হিসাব। জীবন যে একটা পথ। জীবন – চলার পথে কখনো  কখনো আমাদের এক জায়গায় নির্দিষ্ট করে রাখে, আবার  কোন এক  সময়ে, দূরেও সরিয়ে দেয়, পথ চলার  প্রয়োজনে।  চলতে চলতে অলিগলি পেরিয়ে দেখা হয়ে গেলে পুরোনো স্মৃতি বেদনার জন্ম দেয় আবার স্মৃতি মধুরও হয়।

 

সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছিল তখন।  

তাহলে সুমনা কি একা থাকবে এই নির্জন মোড়ে? স্বপ্নে তৈরি হয়েছিল সেই উৎকন্ঠা। শুধু  মনে মনে একটা কথাই ভাবছিলাম যে, সামনে তো পথ নেই আর। এবার  আমি এও বুঝতে পারলাম আমি এসেছি এখানে, শুধুমাত্র ওকে বিদায় দিতে। সুমনার বাড়ির রাস্তা দিগন্ত ঘেঁষা ঐ গ্রামে, ফসলী জমির আল ধরে। এটা কোন্‌ গ্রাম আমি চিনতে পারছি না। কিন্তু ইউরোপের কোন এক জায়গা হবে এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত।

সন্ধ্যা যেন বাড়ি ফেরার সময়। 

ফসলি জমি পেরিয়ে চলে যাবে ও, ওই দূর গ্রামে। অনেক খানি পথ। যেতে যেতে অন্ধকার হয়ে যাবে। শুধু ভাবছিলাম, আমার ছোটবেলার  বন্ধুকে ফেলে রেখে যাব? 

আমি সুমনাকে কোন ভাবেই ওই নির্জন রাস্তার মোড়ে একাকী রেখে আসতে চাইছিলাম না । আংকেল না এলে আমি ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকতাম তার মাঠ পেরোনো পর্যন্ত। ওর বাড়ি না ফেরা অব্দি।  


সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে বাড়ি ফেরার সময় হয়। তেমনি জীবনের চলার পথেও সন্ধ্যা  নেমে এলে, চলার পথের সংগীদের পথ আলাদা হয়ে যায়। বাড়ি ফেরার জন্য  যার যে পথ, তাকে তা বেছে নিতে হয়।  

সকলের গন্তব্য তো এক হয় না। 

একটা পথ হেঁটে যেতে যেতে, কাঁচা সড়কের পাশে এসে থেমে যায়। তখন  পিছনে ফিরে এসে অন্য পথ ধরতে হয়। আরেকটা পথ গ্রামের ফসলী জমি পেরিয়ে দিগন্তের সীমানায় স্থিত দূর গ্রামের সাথে মিশে যায়। জমির আইল ধরে ধরে হেঁটে যেতে হয় ইয়র্কশ্যায়ারের ঐ দূর গ্রামে।  

.........

২৬/০১/২৬

No comments:

Post a Comment

এখনি সময়

    তোমাকে যেতে হবে।  এখনই। চমকে তাকালো ঊর্জা সামনের দিকে। গভীর মনোযোগ দিয়ে কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল। গুরু গম্ভীর এ আদেশ যেন ...