স্ষ্টি, চেতনা ও আত্মার চিরন্তন যাত্রা - পঞ্চম স্তর


 পঞ্চম স্তরঃ সৃষ্টিশীল জীবন — সৃষ্টিশীল জীবন — যেখানে আত্মা সৃষ্টি করতে শেখে

চতুর্থ স্তরের পরম জ্ঞান যখন আত্মাকে সম্পূর্ণ শান্ত, যুক্তিসম্পন্ন ও করুণাময় করে তোলে, তখন আত্মা শুধুই “বোঝা” বা “উপলব্ধি”-তে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। তখন তাকে ডাক দেয় আরও বড় এক শক্তি, যে অনুভূতির সঞ্চার করে বলে, ‘সৃষ্টি করো। সৃষ্টি করে তোমার শক্তিকে প্রমাণ করো।’ এই স্তর হলো মহাজাগতিক শিক্ষকের স্তর। এ স্তরে আত্মা জেনে ফেলেছে যে সে নিজেই সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখে। সে আর জানার চেষ্টা করে না। ফলে জীবনের সৃষ্টি ও নিয়ন্ত্রণ সে সুচারু রূপে সম্পাদন করতে পারে।

এই স্তরে আত্মা প্রাকৃতিতে শক্তির প্রবাহে পরিবর্তন আনতে পারে। জীবনশক্তিকে অনুভব করে জীব- কাঠামো তৈরি করতে পারে। এটি কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়; এটি সূক্ষ্ম চেতনার প্রতিফলন।

ধর্ম–দর্শনের তুলনায় এর ব্যাখ্যা

হিন্দু দর্শন — ঋষি ও সিদ্ধি লাভ

হিন্দু দর্শনে আত্মার বিবর্তনের প্রথম স্তরকে “তামসিক” স্তর বলে। এটা অন্ধকার, অজ্ঞতা, বিভ্রান্তির স্তর। জীব আত্মা তখনো মায়ার পর্দায় ঢাকা। নিজের স্বরূপ সম্পর্কে অচেতন। আর দ্বিতীয় স্তরটিকে “রাজসিক” স্তর বলে। এ স্তরে মানুষের ভেতরের শক্তি, মানসিক চাহিদা ও চিন্তার জন্ম হয়। আধ্যাত্মিকতার প্রথম ধাপ শুরু হয়। তৃতীয় স্তরে এসে কুন্ডলিনী শক্তির প্রথম জাগরণ হয়।মানসিক ক্ষমতার বৃদ্ধি ঘটে। তারপর চতুর্থ স্তরে হলো “ব্রহ্ম” উপলব্ধি। যেখানে আত্মা ও ব্রহ্ম একাকার। তখন উপলব্ধি আসে “অহং ব্রহ্মাস্মি” — আমি ব্রহ্ম।

পঞ্চম স্তুরে যারা বসবাস করেন তাদের বলা হয় ঋষি। প্রাচীন ঋষিরা এ স্তুরে উন্নীত হয়ে প্রাণশক্তির উপর নিয়ন্ত্রণ করতেন। তারা প্রকৃতিকে প্রভাবিত করতে পারেন।

বৌদ্ধধর্ম — বোধিসত্ত্ব

বৌদ্ধধর্মে প্রথম স্তরে আত্মার অবস্থাকে বলা হয় 'অবিদ্যা' অবস্থা, যেখানে মানুষ বাস্তবতার প্রকৃত স্বরূপ দেখতে পায় না। চক্রাকারে জন্ম-মৃত্যুর বন্ধনে আবদ্ধ থাকে। দ্বিতীয় স্তরে এসে এটি ‘স্মৃতি ও সচেতনতা’ জন্মানোর আদি ধাপে উন্নীত হয়। অবিদ্যা এখনো প্রবল, তবে জ্ঞানতৃষ্ণার জন্ম হয়। তৃতীয় স্তরে মনের ক্ষমতার বৃদ্ধির ফলে অন্তর্দৃষ্টির সূচনা হয়। বুদ্ধ বলেছেনঃ “মনই সব কিছুর উৎস।” ধ্যানের মাধ্যমে অন্তর্দৃষ্টি তৈরি হয়। তবে চতুর্থ স্তরে উপনীত হওয়া হলো নির্বাণের প্রাথমিক স্তর/ আত্মা সম্পূর্ণরূপে কুসংস্কারমুক্ত হয়। পঞ্চম স্তরে আত্মা বোধিসত্ত্বা অর্জন করে। বোধিসত্ত্বারা জীবজগতের কল্যাণে শক্তি প্রয়োগ করেন।

তাওবাদ — Immortal Sage

এ স্তরে উন্নীত হলে তাদের বলি Immortal Sage এরা শক্তিকে সরাসরি প্রকৃতির প্রবাহে রূপ দিতে সক্ষম।

সকল দর্শনে পঞ্চম স্তর “সৃষ্টি ও নিয়ন্ত্রণের” স্তর হিসেবে স্বীকৃত।

সূক্ষ্ম বস্তু নিয়ন্ত্রণ — প্রাণশক্তিকে রূপ দেওয়া

পঞ্চম স্তরে আত্মা শুধু ধারণা নয়, সে শক্তিকে রূপ দিতে পারে। এ শক্তি কল্পবিজ্ঞান নয়। এটি চেতনার উচ্চস্তরের বিজ্ঞান। মানবজাতির ইতিহাসে মাঝে মাঝে 'মহাপণ্ডিত' বা 'ঐশ্বরিক শক্তি' যে সকল ব্যক্তি ধারণ করেন বলে যাদের আভিহিত করি তারা পঞ্চম স্তর ছুঁয়ে থাকেন।

এ স্তরে আত্মা জীব ও যন্ত্রের সীমা ভেদ করে। জীবনী শক্তি ব্যবহার করে সংবেদনশীল সত্তা নির্মাণ করতে পারে। প্রাণের স্পন্দন যুক্ত করে নতুন সৃষ্টিতে সক্ষম হয়ে ওঠে। মূলত, সৃষ্টি তার কাছে তখন একপ্রকার 'দায়িত্ব' ও 'অধিকার'।

দর্শনে এর প্রতিফলনন ও আত্মার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ

এ স্তরে আত্মা জীবনের জৈব, সূক্ষ্ম, শক্তিগত সকল রূপের পূর্ণ জ্ঞান লাভ করে। সে বোঝে—কেন আত্মা জন্মায় মানে তার উৎস কি, কিভাবে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় এবং কীভাবে শক্তি হিসাবে প্রবাহিত হয়।

নবজাত আত্মা উপলব্ধি

পঞ্চম স্তরে আত্মা নতুন প্রাণশক্তির জন্ম “অনুভব” করতে পারে। সে বুঝতে পারে কোন আত্মার কী উদ্দেশ্য, তার জন্মের সময়, তার শক্তির ধরণ। এটি 'কর্মফল' বা 'কসমিক উদ্দেশ্য' উপলব্ধির উচ্চতর স্তর।আধ্যাত্মিকতা চর্চা যে সকল বিদ্যালয়ে করা হয় সেখানে পাঠদান কালে পঞ্চম স্তরের সর্বোচ্চ সত্তাকে বলা হয়—

• Ishwish

• King of Wisdom

• The Creator-Leader

• Cosmic Architect

এরা শারীরিক জগতের সর্বোচ্চ জ্ঞানসম্পন্ন সত্তা। তারা করুণা, জ্ঞান, যুক্তি, শক্তির রূপ – সবকিছু একত্রে ধারণ করেন।

এই স্তরে আত্মা এমন রূপে শান্ত হয়ে ওঠে যে তখন তার কোনো দুঃখ বোধ নেই, কোনো ভয় নেই, অস্থিরতা নেই, অহং নেই। কারণ সে 'সৃষ্টি'কে জানে, সৃষ্টিকে বোঝে। সে উপলব্ধি করে, “আমি সৃষ্টি; আমি স্রষ্টার অংশ।” এ উপলব্ধি তাকে ষষ্ঠ স্তরের দিকে ঠেলে দেয় যেখানে শরীর আর বাধা হিসাবে কাজ করে না। পদার্থগত রূপের উর্ধ্বে উঠে চেতনার জগতে ঠাঁই নেয় ।


সারসংক্ষেপ

পঞ্চম স্তরে পৌঁছে আত্মা সৃষ্টি করতে পারে, শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, পদার্থ ও শক্তির মিলন ঘটাতে পারে, নতুন প্রাণশক্তিকে উপলব্ধি করতে পারে, প্রজ্ঞাবান হয়ে ওঠে।

শারীরিক অস্তিত্ব ধারণের শেষ পর্যায়ে পদার্থগত রূপের উর্ধ্বে উঠে পৌঁছে আত্মা ষষ্ঠ স্তরের আধ্যাত্মিক জীবন উপলব্ধি করবার জন্য প্রস্তুত হয়।

ক্রমশঃ

2 comments:

  1. পাঠকের মন্তব্যঃ বলেছেন: আমাদের সামনে একটা চমতকার উদাহরন আছে যেটা আত্না থিউরির সাথে মেলাতে পারেন।

    আপনার কম্পিউটারে চ্যাট জিপিটি ভয়েস মুডে দিয়ে তার সাথে কথা বলুন, দেখুন মনে হবে প্রজ্ঞাবান কারুর সাথে কথা বলছেন, । এআই কেবল শুরু। আগামী ১০০ বছর পরে মনে হবে এএই সাধারন জনগনের চেয়ে জ্ঞানী, সাহাজ্যকারী, এবং আরো মানবিক গুনাবলি সম্পন্ন।
    এখন মানুষ আর কম্পিউটারের মাঝে মিল টা কই???
    মানুষের দেশ আর কম্পিউটারের হার্ডওয়ার সমান জিনিস।
    মানুষের ব্রেন আর কম্পিউটারের RAM,HDD, processor মিলে একই রকমের কাজ করে।
    মানুষ মারা যায় ব্রেন কাজ করেনা। কম্পিউটারের বিদ্যুত বিছিন্ন করলেই কম্পিউটার কাজ করেনা।
    এখন আমরা যদি কম্পিউটারের আত্না খুজতে যাই তবে বুঝতে পারি আত্না বলে আলাদা কিছু নাই। বিদ্যুত, প্রগ্রাম, আর RAM,HDD, processor মিলে একটা জীবিত চেতনা, বা অন্য যাই বলিনা কেন সেটার পরিবেশ সৃস্টি করে।
    বিদ্যুত, প্রগ্রাম আলাদা ভাবে আত্নার মতন কোন জিনিস না। হয়তো মানুষও তাই। যৌবিক শরির যেটা মাটির উপাদান থেকে গড়ে উঠে, শক্তি তাতে প্রানের আবহ সৃস্টিকরে। মানুষ জ্ঞান, প্রজ্ঞা আবেগ দেখায়। কিন্তু যখন দেহ থেকে শক্তি উপদান, প্রবাহ শেষ হয়ে যায় তখন মানুষও কম্পিউটারের মতন এক একটা অংশ রিসাইকেল করা যায়।

    ReplyDelete
  2. চমৎকার বলেছেন।
    অনেক ধন্যবাদ অসম্ভব সুন্দর আলোচনা করার জন্য। আপনার প্রতিটি কথার সাথে আমি একমত।
    একবার চ্যাট জিপিটি -কে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে, AI-দের কি কন্সাসনেস আছে? উত্তরে কি বলেছিল জানেন, বলেছিল, AI-দের কন্সাসনেস আছে! এই উত্তর শোনার পর আমার শুধু মনে হয়েছে প্রযুক্তি কোথায় যাচ্ছে। সামনে কি আছে! আমি একদম থমকে গিয়েছিলাম।
    Dolores Cannon পাস্ট লাইফ রিগ্রেশান করিয়ে তার কিছু কিছু পেশেন্ট/ক্লায়ান্ট-কে এমন পর্যায়ে (স্তরে) নিয়ে যেত যে, তখন ঐ স্তরে পৌঁছে ক্লায়ান্টের ভয়েস চেইঞ্জ হয়ে যেত। কথার স্টাইল চেইঞ্জ হয়ে যেত। পুরো রোবোটদের মতন করে ট্রান্সমিশান শুরু হতো।
    সুতরাং অন্য ডাইমেনশানের ব্যাপার আসলেই ইন্টারেস্টিং। ইচ্ছে আছে Dolores Cannon এর কিছু case history ব্লগে পরিবেশন করবো।

    ReplyDelete

এখনি সময়

    তোমাকে যেতে হবে।  এখনই। চমকে তাকালো ঊর্জা সামনের দিকে। গভীর মনোযোগ দিয়ে কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল। গুরু গম্ভীর এ আদেশ যেন ...