সৃষ্টি, চেতনা আত্মার চিরন্তন যাত্রা -দ্বিতীয় স্তর

যুক্তিনির্ভর জীবন — বোধের প্রথম অঙ্কুরোদ্গম


প্রথম স্তরের অন্ধকার যখন ধীরে ধীরে সরে যায়,  আত্মার সামনে তখন উন্মোচিত হয় “বোধের আলো”। যেমন ভোরের প্রথম সূর্যের  আলোক রশ্মি  ধীরে ধীরে রাতের অতল অন্ধকার ভেঙে দেয়, তেমনি এ স্তরে আলো এখনো পূর্ণ নয়, কিন্তু উপস্থিত। অজ্ঞতার কুয়াশা এখনো ঘন, কিন্তু তার ভেতরেই জন্ম নেয় চিন্তার প্রথম তরঙ্গ, প্রথম অনুভূতি।এ স্তরে আত্মা উপলব্ধি করতে শেখে—
“আমি কেবল আছি তা নই ; আমি উপলব্ধি করতে  চাই।” এই বোঝার উপলব্ধি মানুষকে প্রাণীর স্তর থেকে পৃথক করে দেয়।
দ্বিতীয় স্তরে শুরু হচ্ছে আত্মার বিবর্তনের প্রথম সক্রিয়তা। এ সময় আত্মা প্রথম বুঝতে পারে যে সে স্রেফ যান্ত্রিকভাবে বাঁচে না; সে জানতে চায়, উপলব্ধি করতে চায়।
চিন্তার চারা একটু একটু করে বেড়ে ওঠে। এ চিন্তা জটিল নয়, গভীর নয়, পরিপূর্ণ নয় কিন্তু বিকাশমান। এখানেই চেতনার “অপরিণত যুক্তি” প্রথম জন্ম নেয়। মানুষ দেখা থেকে শেখে, অভিজ্ঞতা থেকে বিচার করে, পরিবেশ থেকে সিদ্ধান্ত নেয়। যদিও সিদ্ধান্তগুলো প্রায়ই ভুল হয়, তবুও এই ভুলই তাকে শেখায়।
হিন্দু দর্শনে  আত্মার বিবর্তনের প্রথম স্তরকে “তামসিক”  স্তর বলে। এটা  অন্ধকার, অজ্ঞতা, বিভ্রান্তির স্তর। জীব আত্মা তখনো মায়ার পর্দায় ঢাকা।নিজের স্বরূপ সম্পর্কে অচেতন। আর দ্বিতীয়  স্তরটিকে  “রাজসিক”  স্তর বলে। এ স্তরে মানুষের  ভেতরের  শক্তি, মানসিক  চাহিদা ও চিন্তার জন্ম হয়। আধ্যাতিকতার প্রথম ধাপ শুরু হয়। 
বৌদ্ধধর্মে প্রথম স্তরে আত্মার অবস্থাকে  বলা হয় “অবিদ্যা” অবস্থা —যেখানে মানুষ বাস্তবতার প্রকৃত স্বরূপ দেখতে পায় না। চক্রাকারে জন্ম-মৃত্যুর বন্ধনে আবদ্ধ থাকে। দ্বিতীয় স্তরে এসে এটি ‘স্মৃতি ও সচেতনতা’ জন্মানোর আদি  ধাপে উন্নীত হয়। অবিদ্যা এখনো প্রবল, তবে জ্ঞানতৃষ্ণার জন্ম হয়।
খ্রিস্টধর্মে আত্মার প্রথম স্তরকে “spiritual infancy” বা আত্মার শৈশব অবস্থা বলে। এখানে মানুষ পাপ বা ভুলের অন্ধকারে আবদ্ধ থাকে। সত্যের আলো তখনো তার কাছে পৌঁছেনি। দ্বিতীয় স্তর হলো  spiritual awakening–এর প্রথম পর্যায়। মানুষ বুঝতে পারে যে তার থেকেও উচ্চ কোন শক্তি বিদ্যমান।
সুফি দর্শনে চেতনার প্রথম স্তরকে নাফসে আম্মারা বলা হয় । এটা আত্মার অনিয়ন্ত্রিত ও অপরিপক্ক  অবস্থা। সেখানে প্রবৃত্তি দ্বারা সে নিয়ন্ত্রিত। দ্বিতীয় স্তরকে বলে নফসে লাওয়ামা।  এখানে আত্মা ভুল - সঠিকের বিচার করতে শুরু করে।
তাওবাদ (Taoism বা Daoism) হলো চীনের এক প্রাচীন দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক মতবাদ, যার মূল ভিত্তি হলো প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জীবনযাপন করা।  তাওবাদে  প্রথম স্তরটি  এমন একটি অবস্থা  যেখানে আত্মা “অচেতন দাও” ।  যেখানে মানুষ প্রকৃতির স্রোত বুঝতে পারে না। দ্বিতীয় স্তর হলো  “দাও-এর প্রথম অনুভব”— তাও সবকিছু  বুঝতে না পারলেও সে তার অস্তিত্ব অনুভব করতে পারে।
সব ধর্ম ও দর্শনে দ্বিতীয় স্তর “জাগরণের সূচনা”— তবে সম্পূর্ণ জ্ঞান অধিকারের স্তর নয়।  বরং এই স্তরে আংশিক জ্ঞানের আলো,  আত্মাকে বিকশিত করতে সহায়  হয়। তখন প্রশ্ন আসে মনে ।  মানুষ প্রথমবার “কারণ” ও “ফলাফল” সম্পর্কে চিন্তা করতে শুরু করে। প্রথমস্তরে  বজ্রধ্বনি ছিল ভয়, এখন তা রহস্য। আগে তার নদী দেখে মনে হতো শুধু পানি। এখন সে জানতে চায় কেন নদী বয়ে যায়। এই প্রশ্নের জন্মই তাকে জ্ঞানের দিকে পা বাড়াতে সাহায্য করে। এই পর্যায়ে মানুষ ভুল-সঠিকের মাঝখানে থাকে। তবে পূর্বের অজ্ঞানতার  আঁধার ভেদ করে “আলো” আর “সত্য”-র  স্পর্শ শুরু হয় । 
মানুষ বুঝতে পারে, ‘আমার থেকেও বড় কোন শক্তি বিদ্যমান।’ সে চারিদিকে তাকায়। সে অবলোকন করে প্রভাত হলে সূর্য ওঠে, সন্ধ্যা হলে সূর্য অস্ত যায়। প্রকৃতিতে ঝড় হলে  বাতাস বয়ে যায়, বৃষ্টি নামে, বজ্র পড়ে, দিন ও রাতের বদল হয়। এ সব পরিবর্তন  মনোজগতকে প্রভাবিত করে। তার ভেতর জন্ম নেয় কোন এক অপরিচিত মহাশক্তির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। এই অবস্থায় মানুষের মনে গড়ে ওঠে দেবতার অস্তিত্ব, শক্তিকে আরাধনা, প্রকৃতির পূজা, উপাসনা।
এ স্তরে ~  
হিন্দুধর্ম অনুসারেঃ  সূর্য, বৃষ্টি, বায়ু, অগ্নি — এদের দেবতা রূপ দেওয়ার চিন্তার সূত্রপাত ঘটে।
গ্রিক ধর্ম অনুসারেঃ জিউস, অ্যাপোলোর মতো প্রকৃতি নিয়ন্ত্রক  দেবতার অস্তিত্বকে অহবান করা হয়।
শিন্তো ধর্ম অনুসারেঃ পর্বত নদী, বজ্র — প্রকৃতির সবকিছুর মাঝে আত্মা আছে বিশ্বাস করা হয়।
আফ্রিকান উপজাতির ধর্ম অনুসারে বজ্র-দেবতা, বৃষ্টি-দেবতার অস্তিত্ব প্রকৃতিতে বিরাজমান বলে উপলব্ধি করা।
এই স্তরে মানুষ বিশেষ কিছু না জানলেও উচ্চতর কোন এক শক্তিকে উপলব্ধি করে। যথার্থ  জ্ঞান না থাকায় মানুষ সূর্যকে দেবতা বলে, বৃষ্টিকে পূজা করে, পাহাড়কে রক্ষাকর্তা ভাবে, নদীকে মাতৃরূপ দেয়। এস্তরে এ সকল অনুভূতির সৃষ্টি হয় চেতনার বিবর্তনে। ফলে এই স্তর কল্পনাশক্তিকে সমৃদ্ধ করে তোলে। অনেক ক্ষেত্রে সাহিত্য জন্মায়, মিথ জন্মায়। যদিও যুক্তিবাদী বিশ্লেষণ তখনো প্রাথমিক স্তরে থাকে।
অতিপ্রাকৃত শক্তি ও কুসংস্কার  অজ্ঞতা এবং ভয় থেকে সৃষ্টি হয়। ফলে এই পর্যায়ে মানুষ ভয়কে বিশ্বাসে রূপ দেয়। দানব, পিশাচ,অশুভ আত্মা, ভূত, দেবতাদের অভিশাপ – এসব  ধারণা জন্ম নেয়  অজ্ঞানতা ও ভয় থেকে। এই স্তরে ধর্মের মৌলিক রূপ জন্ম নেয়, কিন্তু তার মধ্যে যুক্তি কম থাকে, কল্পনা বেশি। সে কারণে দ্বিতীয় স্তরে  বাস্তবতার প্রাথমিক স্বীকৃতি মেলে  জ্ঞানের  অনুভবে। জ্ঞানের মাধ্যমে নয়।  মানুষ প্রথমবার উপলব্ধি করে পৃথিবীর  বাস্তবতা, মৃত্যুর সত্যতা, জীবনের সীমাবদ্ধতা ও কর্মফল। সে  অনুভব করে —বিশ্বের একটি নিয়ম রয়েছে। এই স্তরই  আধ্যাত্মিকতার প্রথম ধাপ। 
উপলব্ধির প্রথম উন্মেষ  আত্মার উত্তরণের দ্বার উন্মোচিত করে। সময়, অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান তাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। সে শিখতে চায়, পড়তে চায়, ভাবতে চায়। প্রশ্ন করে, বিশ্লেষণ করতে শুরু করে। যখন এই “জ্ঞান তৃষ্ণা” যথেষ্ট শক্তিশালী হয় তখনই আত্মা প্রবেশ করে তৃতীয় স্তরে।  বুদ্ধিবৃত্তিক স্তরে। 
ক্রমশঃ

No comments:

Post a Comment

এখনি সময়

    তোমাকে যেতে হবে।  এখনই। চমকে তাকালো ঊর্জা সামনের দিকে। গভীর মনোযোগ দিয়ে কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল। গুরু গম্ভীর এ আদেশ যেন ...