Tuesday, September 8, 2026

শেইপ শিফটার – বেজী


হেমন্তের সোনালী সকাল। 

২০০৯ এর সেপ্টেম্বর ।এই  সময়টায় প্রতিদিন সকালে হাঁটতে বের হয় সুমনা। সারা রাস্তা ধরে সোজা হেঁটে চলে যায় মন্ট্রিয়ালে শহরের শেষ প্রান্তে ।সেখানে একটা বাংলাদেশী কাপড়ের দোকান আছে। পাশে গ্রোসারি আছে। বাসা থেকে বের হলে দেড় কিলোমিটারের দূরত্ব হবে। 

আজ সাপ্তাহিক ছুটির দিন। দল বেঁধে পথচারীরা ঘুরতে বের হয়েছে। তাদের পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা পথ এগিয়ে এলো সুমনা একটা দলের সাথে। তার নিজের দেশেরই তিনজন মহিলা হাঁটছে একসাথে। একজন দেখতে হুবহু কলেজের ছেলে কণ্ঠের সেই জয়া নামের মেয়েটির মতন। আরেকজন শ্রীলঙ্কান চেহারার নাদিরা আন্টির মতন।  ব্যক্তিত্ব যেন  হুবুহু সেই আন্টির মত। চেহারাও একদম একরকম। মনে হচ্ছে নাদিরা আন্টির মত দুই পিস মানুষ ভগবান সৃষ্টি করেছিল। তার একজনের সাথে সুমনার আজ এখানে দেখা হয়ে গিয়েছে। আরেকজনের সাথে যেমন দেখা হয়েছিল তার বাল্যকালে। সেই সময়ের দেখা হওয়া আন্টিকে সুমনা তার মায়ের বান্ধবী হিসেবে দেখেছে।  আর আজ আরেক কপি সামনে এসে পড়েছে তার চলার পথের সঙ্গী হিসাবে। পথচারী হিসেবে। ক্ষণিকের সহচরীও  বলা যেতে পারে। তৃতীয় জন গড় বাঙালি মেয়েদের থেকে বেশ খানিকটা লম্বা। তিনজনের  মাঝে সে বেশ সুঠাম দেহের অধিকারী। হাঁটার মধ্যে একটা লিডারশিপ ভাব আছে। সুমনা তার সাথে তাল মিলিয়ে অত লম্বা লম্বা পদক্ষেপে চলতেই পারে না। তাই তিন মহিলার পিছে পড়ে যাচ্ছে বারবার। তবে বিদেশ-বিভূঁয়ে বাংলা কথা শুনলেই মনে হয় কর্ণ কুহরে  মধুর বাণী এসে পড়ল । তাই তার খুব ভাল লাগছে।সুমনা তাদের গল্প শুনতে শুনতে হাঁটছে।  নিজেদের কথায় মহিলারা ভীষণ মশগুল। তারা তিনজন বান্ধবীও হতে পারে।

কিন্তু হেঁটে হেঁটে তাদের গন্তব্য যে সুমনার মতই হবে, সেই শহরের শেষ মাথায় অবস্থিত ওই বাঙালি কাপড়ের দোকানের কাছে,  তা সুমনা বুঝতে পারেনি। তাদের গল্প শুনতে ওর ভীষণ ভালো লাগার আরেকটা কারণ, ঐ ছেলে গলার জয়ার কপিকে দেখে।  কলেজের এই দ্বিতীয় পিস  জয়াকে দেখে বারবার অবাক হচ্ছে। কন্ঠই শুধু নয়, এরও ব্যক্তিত্বে হুবুহু মিল পাচ্ছে জয়ার সাথে । অদ্ভুত লাগছে এই ভেবে যে, এই  তিন জনের মাঝে দুজনেই তার পূর্ব পরিচিতদের ডুপ্লিকেট কপি। 

এরকম মিল কেন আজ তার পাশে এসে পড়ল? 

জানে না এবং এ নিয়ে তখন সুমনা তেমন একটা মাথাও ঘামায় নাই।

২

পিশাচ বা ডাইনিরা সবার রূপ ধারণ করতে পারে বলে সে একবার শুনেছিল। কিন্তু তা বলে কোন মানুষকে পরিচিত কারো সাথে মিল আছে দেখে পিশাচের মাসতুতো ভাই মনে করা তো অন্যায় হবে।  এমন চিন্তা থেকে নিজেকে বিরত রেখেই সুমনা তাদের সাথেই পথ চলছিল।  বাংলায় গাল গপ্পো  ভাল লাগছে বিধায় একটু পিছিয়ে পিছিয়ে হাঁটা, আর গল্প শোনা। এভাবে যদিও সম্ভব না, কারণ দলনেতার ভারী লম্বা শরীর। তার পায়ের কদম বেশ বড়। 

হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ চোখের পলকের একটু ব্যবধানে সুমনার  মনে হল এদের দলনেতা যেন ৫ ফুট বেশি উচ্চতার একটা আস্ত লম্বা বেজী। 

একি দেখল সুমনা ? 

চোখের পলকের ব্যবধান মাত্র তো কয়েক মিলি সেকেন্ড । এক পলকে একটা অন্যরকম কিছু যেন তার চোখে পড়ে গেল? একটা বিশাল আকারের বেজী! এটা যেন ঐ মহিলার বদলে তা ভারী ভারী  পা ফেলে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে। 

নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছে না। সুঠাম দেহের এই মহিলার বদলে সুঠাম দেহের আস্ত একটা বেজী এলো কোথা থেকে? 

এই এন্টিটি, এই বস্তুটি  শেইপ শিফ্টার নাকি? একবার মানুষ  আরেকবার অন্য কিছু? 

নাকি ঠিক ওই সময় ওই স্থানে পোর্টাল ওপেন হয়ে ঝুপ্পুস করে মহিলার মাথার উপরে বেজী সদৃশ কোন কিছু নেমে এসেছিল ক্ষণিকের জন্য? কেনই বা আসবে?

এতগুলো প্রশ্ন মনের মাঝে ঘুরপাক খেতে খেতে দোকানের সামনে এসে তিনজন দাঁড়ালো। সুমনা তাদের পিছনে। তারপরও সবাইকে ফেলে সুমনা প্রবেশ করলো দোকানের ভেতর সবার আগে । ঈদ কালেকশনগুলো দেখতে দেখতে খেয়াল করল বেজীটা বাদে বাকি দুজন দোকানের ভেতর ঢুকেছে। কাপড় নাড়াচাড়া করছে। সুমনার এক নজরে সব কালেকশন দেখা শেষ। এবার বের হবার পালা।  ভারী কাঁচ ঠেলে  যেই না সে দোকানের  বাইরে পা রেখেছে,  কেউ যেন আকাশ বাতাস একাকার করে ভম ভম কন্ঠে বলা শুরু করলো,'এই তোমরা কোথায়? কি করছ ওখানে ? '

এত উদ্ভট স্বরে কে শব্দ করে উঠলো? 

সুমনা ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকালো। দেখল, সুমনা যতক্ষণ দোকানের ভেতরে ছিল ওই বেজীটা দোকানের বাইরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। দোকানে সে প্রবেশ করেনি। সুমনা বের হতেই তাকে দেখে তার কন্ঠ সচল হয়ে উঠেছে যেন। সে ভড়ভড় করে শব্দ করে দোকানে ঢুকবার আয়োজন শুরু করছে এবার। সচল হবার সুইচ অন্ হয়ে গেছে। এগিয়ে আসছে দোকানের দিকে। গলা দিয়ে অদ্ভুত  শব্দ করে  তারস্বরে জানান দিচ্ছে তাকে যে এবার সে আগাতে পারে  দোকানের ভেতরে থাকা বাকি দুজনের দিকে। 

কিন্তু কে আটকে রেখেছিল তাকে? 

আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে হঠাৎ ঠাঁয় দাঁড়ানো থেকে সচল   না হলে  সুমনা তার এহেন আচরণে এতটা অবাক হতো না। এতটা মনযোগও দিত না। বেজীটা যেন সুমনা বের হবার অপেক্ষায় ছিল। দোকানে প্রবেশ করার সময় গলায় কথার ভঙ্গীমায় এও জানান দিচ্ছে, যে 'তুমি যখন দোকানের ভিতর ছিলে আমি তখন ভিতরে ঢুকিনি।'

কিন্তু কেন? 

সুমনা কি করেছে তার?

বেজীটা লম্বা হয়ে শিড়দাঁড়ারর ওপর ভর করে  টান টান শরীর  ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল দোকানের দিকে চেয়ে। বাইরে তার এই অপেক্ষা। সুমনা ভেতরে থাকলে সে ভেতরে যাবে না। কেন সুমনাকে তার প্রতিপক্ষ মনে হয়েছে? সুমনার সাথে ফ্রিকোয়েন্সি মিলেনি বলে? কেন মিলেনি? ও কি এই পৃথিবীর আট দশটা মানুষের মত সত্যিকারের মানুষ না। নাকি প্রেতলোকের ডাইনী?  

৩

বেজীটাকি সত্যি চোখের ভুল ছিল? নাকি  সত্যি মানুষরূপে ঘুরে বেড়াতে এসেছিল মাটির ওপর কিছুক্ষণের জন্য?  তার বাকি দুই সংগী তো কাকতালীয় ভাবে সুমনার পূর্ব পরিচিতদের কপি। তাহলে অতীতের সেই দুজনাও কি এদের গোত্রের? হাব ভাবে তো সেই দু’জনও সুবিধার ছিলনা কোনদিন। 

আজ, দৃপ্ত পদভরে যে হেঁটে এতটা পথ সুমনার সাথে  আসতে পারে তার এমন কি হলো? তার  দোকানে প্রবেশ  করতে কেন এত সংকোচ শুরু হলো? 

সুমনা যতক্ষণ দোকানের ভেতরে ছিল বেজীটি সেখানে প্রবেশ করেনি। ঠিক যখনই সুমনা বেরিয়ে আসলো সে খলবল করা শুরু করলো। বলতে লাগলো , ‘কি এত দেখে মেয়েগুলো? কি করছে ওখানে?'  দোকানের ভারী কাঁচের দরজা টেনে দোকানে ঢুকছে আর বলেই চলছে  একই কথা।  

বেজীর এহেন কান্ড দেখতে দোকানে প্রবেশ করতে চেয়েছিল সুমনা। কিন্তু এক অজানা আশঙ্কায় দোকানে আর প্রবেশ করেনি। কেমন যেন  অস্বস্তি ভর করে বসেছিল। 

ডাইনীরা সবকিছুর রূপ ধারণ করতে পারে। তিনজনের এই দলে দুজন সুমনার পূর্ব পরিচিতদের রূপে এসেছে। তারা সবাই হয়তো বা পিশাচ লোক থেকে আগত মানুষরূপি পথচারী জাতীয় কিছু।  বাকি দুই সঙ্গীর সাথে পথ ধরে ধরে হেঁটে চলছে মানুষ রূপে। আর ঠিক তখনই সেই পথে এসে পড়েছে  সুমনা। চোখের কোন এক পলকে সুমনার কাছে  এড়াতে পারেনি তার আসল রূপ। সে জানে সুমনা তাকে দেখে ফেলেছে।  তার  চেহারা প্রকাশ হয়ে যাওয়ায় সে দোকানের ভেতর প্রবেশ করেনি। আর সুমনার সামনে আসে নি।

এবার যেভাবেই হোক পালাতে হবে।

কিন্তু কিভাবে পালাবে এর সামনে থেকে?

হয়তোবা কিছুক্ষণ মানুষরূপে হেঁটে  যাবে ওই রাস্তা ধরে। তারপর কোন এক সময়ে বাতাসে মিলিয়ে যাবে লোক চক্ষুর আড়ালে।

 ০৭/০৯/২০২৬


2 comments:

  1. ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৫:৪৮০
    ড. এম এ আলীঃ আপনার গল্পের কাহিনী সুত্র ধরেই এই শেইপ সিফটারের সম্ভাব্য কিছু কর্মগাথা হলো বলা ।
    আপনার গল্প সুন্দর হয়েছে ।

    ReplyDelete
    Replies
    1. গল্প নয় ।
      বাস্তব অভিজ্ঞতা।
      তাই হ্যান্ডেল করা কঠিন হয়ে গিয়েছিল।
      তবে বেজীর শারীরিক গঠন আর ক্ষিপ্রতা আসলেই চমকে দেবার মতন সৃষ্টি।
      জেনেটিক এঞ্জিনিয়্যারিং - এর অনবদ্য শিল্পকর্মের মতো মনে হলেও, প্রকৃতির এক নিখুঁত নকশা।

      Delete

জীবন যেন স্রোতের মাঝে ভাসমান দ্বীপের মতো

  ১৯৮৪ সাল। স্কুলের অফিস রুমে গিয়েছি বেতন দেবার জন্য। লাইনে অপেক্ষা আমি আর আমার লাল ঝুটি বন্ধুটি। আমাদের খুঁজে খুঁজে ঐ ভীড়ের মাঝে পুষি এলো। ...