ঘাড় ঘুরানি

সময় তার চলার পথে জীবনকে এমনভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে ধরে বসে, যে অনাকাঙ্খিত  বিষয়গুলো জীবনের প্রাত্যহিক বিষয়ে রূপান্তরিত হয়। আগে যখন সাবদার মিয়া এদিক ওদিক মানুষদের  দেখতো, বেশ অবাক হতো। বয়স হলে সবার  কি যেন কি হয়! সে খেয়াল করে দেখতো, বয়স্করা মাঝে মাঝে গলার মধ্যে একটা বিশেষ ধরণের গলাবন্ধনী পেঁচিয়ে ঘুরে বেড়ায়। কাপড়ের ঠিক না, শক্ত প্লাস্টিক জাতীয় কি দিয়ে যেন তৈরি –ওই  গলাবন্ধনীটা। এমনভাবে ওটা সবাই গলায় প্যাঁচায়, যেন তাদের ঘাড় এইমাত্র কেউ মটকে দিয়েছে।  

সাবদার মিয়া এসব অসুখের মর্ম তেমন একটা বুঝতো না আগে। জোয়ান ছিল তো তখন, তাই। কিন্তু আজ জীবনের মধ্যে বয়সে এসে ঠিকই বুঝেছে ওই ঘাড় মটকানি ব্যারামটার কি যন্ত্রণা ! 

এখন জীবন যে তাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। সময়ের সাথে সাথে  সে এখন মধ্যবয়স্কদের কাতারে এসে দাঁড়িয়েছে। আর যেই না এই বয়সে সে পা রেখেছে, নিয়তির কি পরিহাস,  কেউ যেন ঘ্যাচাং করে একদিন তার ঘাড়টা মটকে দিয়েছে! 

ডাক্তার দেখে বললেন,‘ও কিছু না। একে স্পন্ডালাইটিস বলে। সেরে যাবে । কলার ব্যবহার করেন আর ব্যথা নাশক কিছু ওষুধ খান। সব ঠিক হয়ে যাবে।‘ 

সাবদার মিয়া ভাবে,‘এ কেমন ব্যাপার রে বাবা! ঘুম থেকে প্রতিদিনের মতো সকালে উঠে সারাদিন তো ভালোই কাটতো। এই সেদিনও তো ক্লাস নিয়ে ফেরার পথে ডিপার্টমেন্টের তুখোড় ছাত্রীটার সাথে পথে দেখা। আগে বেশ ভালো লাগতো তাকে। কিন্তু সেজন্য তার মেধা,আমাকে ছাড়িয়ে যাবে? চারিদিক তার প্রশংসায় ভন ভন করবে? এসব আর ভালো লাগে না। অসহ্য লাগে।‘ 

তাই ছাত্রীটি সামনা সামনি পড়তেই, তাকে দেখে নিজের অজান্তেই সাবদার মিয়া  নিজের ঘাড়টা মটকা মেরে ঘুরিয়ে ফেলল্। তারপর  কি জানি কি হলো। ঘচাং করে ঘুরানি দিতেই  ঘাড়ের বাঁ দিক থেকে  শুরু হলো যন্ত্রণা। মটকা মেরে পড়ে থাকলো কিছুক্ষণ।ব্যথা শুধু বাড়ে । কমে না।  ঘাড় –মটকানি ব্যারাম বলে কথা। ডাক্তারি ভাষায় যাকে বলে স্পন্ডালাইটিস। 

কিন্তু কি করবে সাবদার মিয়া? 

ভেবে পাচ্ছে না। নিজের উপর রাগও হচ্ছে। আমেরিকা থেকে পি.এইচ.ডি. করে আসার আগেও তো ডিপার্টমেন্টে তার বাদে কারোর নাম মুখে মুখে ফিরতো না। সবাই বলতো,

-ক্লাসে সর্বোচ্চ নম্বর কে পেয়েছে? সাবদার  মিয়া। 

-ছোট্টবেলা থেকে কঠিন কঠিন বইগুলো কে পড়ে ফেলেছে?  সাবদার  মিয়া। 

-কলেজের প্রফেসর ওনার বইয়ের মুখবন্ধে কোন ছাত্রের নাম উল্লেখ করেছে?  সাবদার  মিয়ার নাম।

এত গুণের সাবদার  আমেরিকা যেয়ে সেখানেও ফাটিয়ে ফেলল খুব কম সময়ে। পনেরটা  গবেষণা পত্র লিখে ফেলে তখন দেশে হই-চই ফেলে দিয়েছিল । ডিপার্টমেন্টে ফেরত আসলে, তাকে লাল গালিচা সম্বর্ধনা দিয়ে ডিপার্টমেন্ট বরণ করে নিল। উচ্চ  র‍্যাংকে ভূষিত করার বরণমালা দিয়ে কাজে যোগদানের নিয়োগপত্র দিল। ছাত্ররা হুমড়ি খেয়ে পড়ল, তার সাথে গবেষণার কাজ করবে বলে।  কিন্তু সাবদার মিয়া অকৃতজ্ঞ না। তার গুরুর কথা সে সবসময় স্মরণ করে। পদে পদে তার পদধুলি নেয়। সকালে এসে গুরু –প্রণাম করে দিন শুরু করে। কারণ গুরুর কৃপায় তো তার এই উত্থান। এতো উন্নতি। তার গুরু আবার যেনতেন লোক না। কলেজে আইনস্টাইন হিসেবে খ্যাত। গুরুর এই শিষ্য তাহলে হবে আইনস্টাইন নাম্বার – টু।  ছোটবেলার সেই দেখা ফিল্মের নামটার মতো। কি জানি একটা নাম ছিল না? দিপু নাম্বার –টু । 

সাবদার মিয়া এখন নামের আগে টাইটেল জুড়েছে। ড. সাবদার মিয়া। ডিপার্টমেন্টের দ্বিতীয় আইনস্টাইন। ছাত্ররা এসে জিজ্ঞেস করে, ‘ স্যার এবার কি রিসার্চ স্টুডেন্ট নেবেন?’ 

সাবদার গর্ব ভরে উত্তর দেয়, ‘ আমার গুরুর কাছে যাও। তিনি যা বলবেন তাই। অনুমতি দিলে আমি নেব।‘ 

এ কথাটি রুমার কানে এসে একদিন পড়লো। রুমার কেন জানি একটু খটকা লাগলো। ডিপার্টমেন্টের প্রধানকে একবার কথায় কথায় বলেও  ফেলল, সাবদারের  স্টুডেন্ট সিলেকশনের বিষয়টা। যেই না বলা, আর যায় কই। বিভাগীয় প্রধান শুধু দাপ্তরিক কাজে ব্যস্ত থাকেন তা তো নয়। কলেজে এসেই একে ধরা, ওকে  ধরা, এসব কাজেও ব্যস্ত থাকতে হয় তাকে। কত ব্যস্ততা তার।  কিন্তু তারপরও  সময় করে রুমার  কথাটা বেশ মনে রেখেছেন।  তিনি সাবদার মিয়াকে পাওয়া মাত্রই ধরে বসলেন।  তার স্টুডেন্ট নেয়া -নেয়ি কেমন চলছে সে সবের বৃত্তান্ত  জানতে চাইলেন। 

গর্বে তো সাবদার সবসময় আটখানা।  পনেরটা  গবেষণা পত্র প্রকাশ করে ফেলেছে পাঁচ বছরে। তাও তাত্ত্বিক বিষয়ে। এমনতর দর্শন চিন্তা  তো সোজা বিষয় নয়। সাবদার নিজেই বলে, তার এত নাম ডাক ছিল আমেরিকায়, যে কতজন যে  তার  লেখা গবেষণা পত্রে তাদের নাম  জুড়ে দিয়েছে  তার ইয়ত্তা নাই। সেসব ছাত্রদের সংখ্যা এতই বেশি, এত অগণিত যা সাধারণের কল্পনার বাইরে । তিনি নিজেই অনেককে চেনে না। কিন্তু তারা তার লেখার সাথে যুক্ত।

কেন?

কারণ  সেই ছাত্রদের   শুধু একটাই খায়েশ  ছিল যে, সাবদার মিয়ার সাথে তাদের  কাজের  নিদর্শন যেন থাকে। অর্থাৎ সাবদার বুঝাতে চাইতো তার মতন প্রতিভাবান মানুষ  পাওয়া, যে কোন ছাত্রের সারা জীবনের স্বপ্ন, সারা জীবনের সাধনা ছিল। 

কিন্তু কলেজে জয়েন করার পর যেই না একজন ছাত্রীর নাম সবার মুখে মুখে শুনতে শুরু করেছে, সেই থেকেই সাবদার মিয়ার ভীষণ মনোকষ্ট শুরু হয়েছে। তার বিভাগের গবেষণা ছাত্রী। তার জন্মের আগে, মধ্যে এবং পরেও এই কলেজে যদি কারো নাম থাকে সেটা সাবদার মিয়া  ছাড়া আর কারো নাম হতে পারেনা।  ভালো ছাত্রের তালিকায় তো থাকতেই পারে না। তাহলে এ এলো কোথা থেকে আজ? রুমা না ঝুমা নামের এই  ছাত্রী উদয় হয়েছে কিভাবে?  সাবদার বুদ্ধি আঁটলো। ধরতে হবে তো  তাকে। বেশ কায়দা করে একদিন বাজিয়ে দেখবে।

সে  সিধা চলে যাবে রুমার ল্যাবে। গল্প করতে করতে জিজ্ঞেস করবে, কোন সালে ম্যাট্রিকুলেশন। এতে সঠিক বয়সটাও বের করে ফেলবে। আর তার যে মুগ্ধ  করা তুখোড় ব্যক্তিত্ব তা তো এই ছাত্রী  এক কথাতেই তাকে গুরু মানতে বাধ্য হবে; অন্যরা  যেমন মানে। 

‘তাহলে চেষ্টা করে দেখিই না কেন?’ 

যেই ভাবা সেই কাজ। পরদিন সাবদার মিয়া রুমার ল্যাবের বিশাল রুমটার মাঝে তার একটা ল্যাপটপ এনে রাখলো। কি জানি কি কাজ করবে এই লোক, সেই ধান্দা দেখার জন্য রুমা  এগিয়ে গেল তার কাছে।  জানতে তো হবে, দিপু নাম্বার –টু  এর এখানে আসার উদ্দেশ্যটা  কি। 

বুঝলো, তার ধান্দা একটাই। এই ল্যাবটাকে সাবদার তার জন্য ব্যবহার করবে। পুরোটা নয়, আংশিক। রুমের ওইপ্রান্তে একটা বুকশেলফ আছে যেখানে, সে ওই পাশটাতে তার বইপত্র সাজাবে। কিছু বই সাথে করে নিয়েও এসেছে আজকে। দর্শন তত্ত্বের একটা বই, রুমা দেখেই ধার চেয়ে বসলো। ড. সাবদার  সাথে সাথে ধার দিয়ে দিল। আর  জামানত হিসেবে চাইল রুমার যোগাযোগের নম্বর। সরাসরি নয়। একটু আঁকা  বাঁকা করে, একটু ঘুরিয়ে। 

-তোমার  নাম্বারটা যেন কি? 

রুমা তার ফোন নাম্বারটা দিতেই ড. সাবদার বেশ অবাক হয়ে বলল, ‘বাহ তোমার ফোন নাম্বারটা তো খুব মজার। সব সংখ্যা জোড়া জোড়া। 5588112 ‘ 

রুমা সাথে সাথে  বলল, ‘স্যার খেয়াল করেছেন, সব জোড় জোড় সংখ্যার শেষে, ২ সংখ্যাটাও  একটা জোড় সংখ্যা।  তিনি খুব মজা পেলেন । এর মাঝে রুমার  ম্যাট্রিক পাসের বছরটা জেনে নিয়েছেন। বছর পাঁচেকের সিনিয়র তিনি। তাই রুমা  যখন ভর্তি হবে হবে, তখন কলেজে তার পড়ার দিন শেষ। পাশ করে সারা। তাহলে তিনি রুমার নাম জানবে কিভাবে?  কিন্তু রুমা যখন  ভর্তি হলো, কলেজে ঢুকে প্রথম দিন থেকে  দিপু নাম্বার –টু  এর বিরল প্রতিভার কথা শুনতে শুনতে হয়রান হয়ে গিয়েছিল। 

একবার ছুটিতে এই বিরল প্রতিভা দেশে এসেছিল। দেশে এসেই  তার গুরু, যিনি কিনা কলেজ তথা দেশের আইন্সটাইন বলে খ্যাত, তার সাথে দেখা করতে কলেজে এসেছিল । সে সময় সাবদার ভাইকে দেখার সুযোগ হয়েছিল কলেজের সকল ছাত্র ছাত্রীদের।  ব্যাঙের মত লাফ দিয়ে  হাঁটছিল সাবদার ভাই। প্রতিভার চ্ছ্বটায় স্বাভাবিকভাবে পা ফেলতে পারছিল না বোধহয়। সবসময় লাফ ঝাঁপ দিয়ে এখান থেকে সেখানে আর সেখান থেকে এখানে যায়। সেই উদ্যমতা আজও আছে তার ভেতরে।  শুধু সমস্যা একটাই । খ্যাতির শীর্ষে আজ কেন সকলের মুখে মুখে তার নাম নেই? রুমার নাম কেন মুখে মুখে? 

কলেজে জয়েন করেই এটা সে লক্ষ্য করেছে।

 কিন্তু কেন?  

কারণ সে যে ছাত্র নয়। আর এইটুকু যে তার মন বুঝতে চায় না।এখন তো বুঝতে হবে সবদিন একরকম যায় না। 

ছাত্র যায়। ছাত্র আসে। তার মাঝে কেউ তুখোড় হয়। কেউ তুখোড়  থাকে। কেউ আবার  তুখোড়  ছিল বলে সময়ের গহ্বরে কোন একসময়ে বিলীন  হয়ে যায়। সেই দূরের অতীতে হারিয়ে যায়। কিন্তু সবদার মিয়া যে আজীবন তার নামখানা অমলিন করে রাখতে চেয়েছিল।সে পারেনি।নিজেই পারেনি। বিশেষ করে রুমার  পরীক্ষার খাতা যখন তার হাতে এসে পড়লো তখন সে  খেয়াল করে দেখলো, খাতার  কোথাও সে কলম ছোঁয়াতে পারছে না। 

‘কি সাংঘাতিক রে বাবা! 

এই ছাত্রী কোন দুনিয়া থেকে এসেছে? 

এলিয়েন না তো? আর হলেই বা কি ? আমি তো আমি। আমার থেকে ভালো কেউ নেই – কেউ হবে না, কেউ হতে পারে না।‘ 

এসব ভাবতে ভাবতে ল্যাবের দিকে হাঁটা দেয় সাবদার মিয়া। হেঁটে যেতে যেতে আবারো ভাবে, 

‘রুমা  বইটা ফেরত দিয়ে দিয়েছে তো? হ্যা ফেরত দিয়ে দিয়েছে।  তাহলে আর কি? তার ল্যাবে আমার আস্তানাটা আমি গড়ে নেব। পুরো ল্যাবটা আমি দখল করে নেব। ত্রি সীমানায় তাকে আসতে দেব না। মুখও দেখতে চাই না ওর।'

এসব ভাবতে ভাবতে যখন ল্যাবের দিকে আগাচ্ছে আচমকা সেই ছাত্রীটা ভুতের মতো এসে তার সামনে পড়লো। 

তাকে ল্যাবের সামনে দেখা মাত্রই ঘ্যাচাং করে ঘাড়টা ঘুরিয়ে নিল ড.সাবদার  মিয়া।  

এই কান্ডটা দেখে রুমার বেশ অবাক লাগল। ঝটাং করে লোকটার ঘাড় ঘুরানোর কারণটা কি?  এই সেদিনও তো রুমার পিছন দিয়ে হেঁটে গেলে হালকা শিস দিয়ে সুর তুলতেন তিনি, মনোযোগ পাবার জন্য। রুমা তার শিক্ষকের সাথে কাজ করছে  ঝুঁকে কম্পিউটারের সামনে। এমন সময় হালকা সুর তুলে শিস দিয়ে তার মনোযোগ কিভাবে বিচ্ছিন্ন করা যায় সেই পাঁয়তারাও তো করতেন। রুমা ভাবতো, তিনি বোধহয় আমেরিকা থেকে এই কালচার আমদানি করে এনেছেন। বিদেশ থেকে এসেছে বলেই বোধহয় একটু ওপেন –মাইন্ডেড।  হাসি খুশি মনের।  তাছাড়া  এদেশে তো  গ্রিট করবার আদত নেই, কালচার নেই, কিন্তু তাকে দেখলেই  তিনি যেহেতু গ্রিট করেন, এই আদব কায়দাও তাহলে  আমেরিকার  আমদানি। 

এতো আন্তরিকতা দেখানো মানুষটার তাহলে আজ হঠাৎ কি হলো? এরকম ঘ্যাচাং করে  ঘাড় ঘুরিয়ে, চোয়ালটা শক্ত করে ফেলল কেন? তারপর   পাশ দিয়ে হেঁটে গেল, না চেনার ভান করে। 

কেন?   

তার ঘাড় টার্ন নেবার দৃশ্যটা দেখে রুমা ভয়ই পেয়ে গিয়েছিল। অমনভাবে ঘাড় ঘুরালে, ঘাড় মটকে যাবে তো! আর ঘাড় মটকালে, ঘাড় মটকানি ব্যারাম  কি তিনি রুখতে পারবেন? 

কে জানে,  আজকের পর থেকে ঘাড় ঘুরানির ব্যথায় সাবদার মিয়াকে কাতরাতে হয় কিনা।



........

২১/০২/২০২৬

চিত্রনাট্যঃ রোদ্দুর মাখি


চরিত্রঃ

রমা (২৫ বছর)

সৌমেন (৪০ বছর)

দিপ্তী (বালিকা ৫ বছর) 

আবৃত্তিকার (কন্ঠ শুধু)

প্রথম দৃশ্য

অলস দুপুর । চারিধিক নিস্তব্ধ । কড়া রোদ বাইরে। টানা বারান্দা। সময় দুপুর ২টা বা ৩ টা। বারান্দার কোণে একটা হেলান দেয়া বেতের চেয়ার। আরেকটি ছোট আকারের ডাবল্ সোফা। সোফার পাশে ছোট টেবিল। পত্রিকা রাখা ওতে। একটা সেন্টার টেবিল। ফুলদানিতে ফুল সাজানো। হাতের এমব্রয়ড্রিবা ক্রুশের কাজের ম্যাট রাখা ফুলদানীর নিচে।

দ্বিতীয় দৃশ্য

একটি ঘর থেকে দেখা যাচ্ছে রমা বসে আছে বারান্দায়। সেলাই করছে। কি সেলাই করছে না। কিন্তু বেশ মনযোগের সাথে সেলাই করছে। ঘরটি একটি স্টাডি রুম। বইয়ের শেলফ্ গোটা তিনেক। বই ভরা। পড়ার টেবিলে কম্পিউটার মনিটর আছে । ঘরের দেয়ালে রবি ঠাকুরের মাঝারি আকারের পোর্ট্রেট ।

পোশাক

তাঁতের ইস্ত্রি করা শাড়ী পড়া, হাল্কা এক রঙের। মাঝারি পার । রমা মাঝারি উচ্চতার মেয়ে, লম্বা নয়। শাড়ীর পাড়ে ডিজাইন আছে। শাড়ী পার্ট করে পরা নয়, একটু অগোছালো করে পরা।

সাজ

চুল খোঁপা করা। খোঁপায় ফুলের মালা জড়ানো থাকতে পারে। ছোখে কাজল নয়, মাস্কারা থাকবে।


তৃতীয় দৃশ্য

সৌমেন এসে রমার কাছে দাঁড়ালো। রমাকে দেখছে। এবার রমাকে বিস্তারিত ভাবে দেখানো আর ধ্বনিত কন্ঠে আবৃত্তি ।

কন্ঠ (আবৃত্তি )

'হয়তো জামায় বোতাম লাগাচ্ছিলে
দুপুর বেল বসে নিজের ঘরে
ফাঁকা বাড়ী নির্জনতায় ভরা
শব্দ শুধু বাথরুমে ফোঁটা ঝরে'

তৃতীয় দৃশ্য (চলবে)

রমাকে বিস্তারিত দেখানো। নিচ থেকে শুরু। শাড়ীর কুঁচিগুলো একের পর এক সাজানো পায়ের কাছে। ধীরে ধীরে ক্যামেরা উঠবে উপরে। কোলের কাছে এসে ক্যামেরা থামবে। কোলে একটা শার্ট, সাদা রঙের। শার্টে বোতাম লাগাচ্ছে রমা।

সৌমেনের কন্ঠ শুধু : রমা

চমকে উঠলো রমা। তাকালো মুখ তুলে, তার সামনে দাঁড়ানো ব্যাক্তিটির দিকে। দর্শক, রমার চমকে এবং অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকার expression দেখল।

সৌমেনের কন্ঠ শুধু ঃ কি করছো রমা?

দৃশ্য - ৪

দর্শক এবার সৌমেনকে দেখবে সামনা সামনি।

রমার পাশ দিয়ে সাইড টেবিলের সামনে সৌমেন রমার দিক করে দাঁড়ানো। আপাদমস্তক সৌমেনকে দেখানো হবে প্রথমে । চল্লিশ বছরের মাঝারি স্বাস্থ্য, লম্বা, চোখে পুরু চশমা। গম্ভীর কিন্তু স্নেহময় কন্ঠের অধিকারী। রমার দিকে তার দৃষ্টিতে আবেগ। হঠাৎ এসে রমাকে চমকে দিয়ে বেশ মজা পাচ্ছে। হাত দুটো পিছনে, একটু ঝুঁকে দাঁড়ানো।

কন্ঠ রমাঃ কই, কিছু না তো।

কন্ঠ সৌমেনঃ কিছু না। (বিরতি)  সত্যি ?

রমাঃ হ্যা (অবাক হবার সুরে)

সৌমেনঃ কিভাবে?

হঠাৎ করে হেসে ফেলল রমা। দৃশ্যটি খুব উপভোগ্য হতে হবে দর্শকদের কাছে। এখানে দর্শকদের ভালো লেগে যাবে রমাকে। এখন রমা আর সেলাই করছে না। শার্টটা কোলের উপর ফেলা।

কন্ঠ রমাঃ নাহ্ ! মানে কি আর করবো। একটু সেলাই (বিরিতি) তোমার শার্টটা । (বিরিতি)  বোতামটা লাগাচ্ছিলাম।

কন্ঠ সৌমেনঃ আর?

রমাঃআর কিছু না।

সৌমেনঃকিছু ভাবছিলে না?

আবার রমার হাসির ঝলক।

রমাঃ(চিন্তিত স্বরে ) ম্... জানি না (মাথা অবনত, লাজুক বিনম্র )

সৌমেনঃ আমি জানি

রমা অবাক হয়ে মাথা তুলে তাকালো সৌমেনের দিকে।

রমাঃ(কন্ঠে বিস্ম য়) কি?

সৌমেনঃ যা ভাবছিলে তাই জানি।

রমাঃ কি বলতো?

সৌমেনঃ ভাবছিলে (বিরতি) আমি কখন ফিরব।

রমা সৌমেন দুজনেই হেসে ফেলল। (পাশ থেকে দেখান হবে দৃশ্যটি ) এক সাথে দুজনা দুজনের নাম ধরে ডেকে উঠলো। অবাকও হলো। তারপর দুজনে চুপ।

রমাঃকি বলছিলে, বল।

সৌমেনঃতুমি বল।

রমাঃসৌমেন তুমি বল।

শ্রোতা এবার প্রথম শুনবে সৌমেনের নামটি রমার কন্ঠে ।

সৌমেনঃ কিসের শব্দ ? টুপ টুপ

রমাঃ জল পড়ছে।

সৌমেন পাশে এসে বসলো রমাকে ঘেঁষে। হাত কোলের ওপর। রমার দিকে ঝুঁকে বলল,

সৌমেনঃ আর কোথাও জল পড়ছে না?

এ সবটুকু রমার দিক থেকে দেখান শেষ হলে সৌমেনের দিক থেকে রমাকে দেখানো হবে। রমা অবাক হয়ে সৌমেনের দিকে তাকাবে। রমার ক্ষণিক ক্ষণিক অবাক হয়ে যাওয়াটা দর্শকদের ভাল লাগাতে হবে।

রমাঃ নাহ্ তো। (বিরতি) আর কোথায় জল পড়বে?

সৌমেনঃ তোমার মনে। (কন্ঠে আবেগ)

রমা হেসে ফেলল, লজ্জা অবনত মুখ।

রমাঃ আমার মন?

সৌমেনঃ হ্যা তোমার মনে। আমি যে শুনতে পাচ্ছি। জল প্রপাতের শব্দ ।

রমার বিস্ময়ে সৌমেনের দিকে তাকিয়ে থাকা। যেন সৌমেন ঠিকই ধরে ফেলেছে। সৌমেনের মুখে হাসি।

দৃশ্য -৫

সময়টা সকাল ১১টা। রমা বসে আছে বারান্দায়। গালে হাত। চেয়ারের হাতলে ভর করে বসে আছে বেতের চেয়ারে। ভাবছে আনমনে। এটাও পাশ থেকে নেয়া।

পোশাক

হাল্কা এক রঙের তাঁতের শাড়ী। চুল খোলা।

কন্ঠ (বালিকা) ঃ মা

দৃশ্য -৬

রমা চোখ মেলে তাকালো পাঁচ বছরের মেয়েটির দিকে । রমার চোখ মেলে তাকানো দর্শক দেখবে। চোখের দৃষ্টি হতে হবে প্রশান্তিময় ও স্নেহভরা ।

সজ্জাঃ চোখের সজ্জা খুব সচেতন ভাবে করতে হবে। এবার কাজল থাকতে পারে, মাস্কারা অবশ্যই। 

দৃশ্য -৭

রমা যার দিকে তাকালো এবার তাকে দেখান হবে। পাঁচ বছরের মেয়ে, ফ্রক পড়া । দুই বেণী বা দুই ঝুটি। এক বেণী বা এক ঝুটি নয়।

কন্ঠ (দিপ্তী ):মা (গলায় উৎসাহের ছোঁয়া), একটা জিনিস দেখবে ?

রমাঃ কি রে দিপ্তী

আঙ্গুল তুলে ঘরের কম্পিউটারের মনিটর দেখাল।

দিপ্তীঃ আমার আঁকা ছবি।

রমাঃ কখন আঁকলি রে মা, এ ছবি।

দিপ্তীঃ আজ সকালে, একটা গাছ। দূরে ঝলমলে রোদ্দুর ।

রমাঃ তোর্ ঘরজুড়েই যে রোদ্দুর ।

দৃশ্য -৮

রমা উঠে প্রবেশ করবে ঘরে। ঘর থাকে দেখান হবে। পাশে দিপ্তী । রমা কম্পিউটারের সামনে এসে দাঁড়াবে। দর্শকরা এবার স্ক্রিনে তার আঁকা ছবিটা দেখবে।

দৃশ্য - ৯

রমা মাথা ঘুরিয়ে জনালার দিকে তাকাবে। জানালা ঠিকরে পড়ছে রোদের আলো, সমটা সকাল। রমা জানালার কাছে এসে দাঁড়াবে। পাশ থেকে রমাকে পুরো দেখিয়ে মুখটা দেখান হবে। রমা জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। আবৃত্তিকারের কন্ঠে ধ্বনিত হবে

কন্ঠ (আবৃত্তিকার)

'হয়তো হঠাৎ পাশের ঘরে উঁকি 
জেগে উঠলো হাসি তোমার ঠোঁটে 
গোটা ঘর জুড়ে রোদ্দুর ঝলমলে 
দূর থেকে ছোঁড়া উষ্ণতা ফুটে উঠে'

দৃশ্য - ১০

সৌমেন এসে রমার কাছ ঘেঁষে রমার পিছনে এসে দাঁড়াবে। দর্শ ক তা দেখবে। সৌমেনের হাত প্যান্টের পকেটে। 

দৃশ্য - ১১

রমার কানের কাছে মুখ নেবে সৌমেন, যা দর্শক দেখবে রমার সামনের কোণ থেকে। দর্শক দেখেবে সৌমেনের মুখ, রমার কানের কাছে।

সৌমেনঃ জানালাটা খুলে দিই।

দৃশ্য - ১২

রমা কাঁধ ফিরে সৌমেনকে দেখবে যা রমা সৌমেনের পাশ থেকে দেখান হবে।

সৌমেনঃ অরণ্য জুড়ে ফাগুনের আঁকা আঁকি (বিরতি)। মন কি বলছে জানো?

রমাঃ কি?

সৌমেনঃ সারা গায়ে আজ ঝলমলে রোদ মাখি

দৃশ্য - ১৩

রমা ঘুরে দাঁড়ালো সৌমেনের দিকে। মাথা অবনত।

দৃশ্য -১৪

দর্শক দেখবে সৌমেন তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রমার দিকে। প্রচন্ড আলোর ছটা দৃশ্যমান হবে। সৌমেন রমা আলোর ছটায় ধীরে ধীরে অদৃশ্য হতে থাকবে। আবৃত্তিকারের কন্ঠ ধ্বনিত হবে।

কন্ঠ (আবৃত্তিকারের )

'বাতাস কি আজ একটু শিরশিরে 
অরণ্য জুড়ে ফাগুনের আকাআকি 
মন কি বলছে জানালাটা খুলে দিয়ে
সারা গায়ে আজ (বিরিতি) ঝলমলে রোদ মাখি।'

মূল কবিতার শেষের লাইনটিতে প্রশ্নবোধক চিহ্ন আছে। ওভাবে নয় বরং প্রশান্তির ছোঁয়ায় শেষ লাইনটি উচ্চারিত হবে।

সমাপ্ত

............

মূল কবিতা

রোদ্দুর মাখি /রানা পাল

হয়ত জামায় বোতাম লাগাচ্ছিলে 
দুপুরবেলা বসে নিজের ঘরে 
ফাঁকা বাড়ি নির্জনতায় ভরা 
শব্দ শুধু বাথরুমে ফোঁটা ঝরে

দূর থেকে ছোঁড়া উষ্ণতা ফুটে ওঠে
হয়ত হঠাৎ পাশের ঘরে উঁকি 
জেগে উঠল হাসি তোমার ঠোঁটে 
গোটা ঘর জুড়ে রোদ্দুরে একাকার 

বাতাস কি আজ একটু শিরশিরে 
অরণ্য জুড়ে ফাগুনের আঁকাআঁকি 
মন কি বলছে, জানলাটা খুলে দিয়ে 
সারা গায়ে আজ ঝলমলে রোদ মাখি?
২০০৭

Reincarnation Cycle - Hindu and Buddhist samsara models

🌀 1. The Whole Diagram → Samsara (Cycle of Existence) The circular, repeating structure directly corresponds to Samsara : Continuous cycle ...