মহানীলে মহাখেলা


 নাসার হাবল স্পেস টেলিস্কোপ এখন আর তত্ত্বের মধ্যে বিচরণ নয় বরং পর্যবেক্ষণ করে প্রমাণ স্বরূপ উপস্থিত করেছে গ্লোবিউলার ক্লাস্টারের গঠন প্রক্রিয়া এবং বিশালাকার নক্ষত্রগুলো কিভাবে গুচ্ছাকারে আবদ্ধ হয়ে নক্ষত্রগুচ্ছ সৃষ্টি করে তারই উৎপত্তি রহস্য। এ প্রক্রিয়া সম্পাদনের জন্য আয়োজন হয় ছায়াপথে বিলিয়ার্ড বলের খেলা। ধরা যাক বিলিয়ার্ড বলগুলো হল নক্ষত্র। ক্লাস্টার তৈরির স্থান হল বিলিয়ার্ড টেবিল। হালকা বলগুলো দ্রুত গতি সম্পন্ন হয়ে ক্লাস্টার হতে সরে পড়ে কিনারার দিকে চলে আসে। ভারী নক্ষত্রগুলো ধীর গতি সম্পন্ন হওয়ায় ক্লাস্টারের কেন্দ্রে নিপতিত হয়। এই প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় mass segregation যা এতদিন তাত্ত্বিক ধারণার মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বহুদিনের তোলা ছবিগুলো দিয়ে হাবল টেলিস্কোপ এই ধারণার বাস্তব চিত্র আমাদের সামনে এখন উপস্থাপন করেছে।

গ্লোবিউলার ক্লাস্টার কয়েকশত হাজার নক্ষত্রের সমষ্টিতে তৈরী নক্ষত্রগুচ্ছ, যার কেন্দ্রে নক্ষত্রের ঘনবদ্ধতা আমাদের সূর্যের আশেপাশের নক্ষত্রগুলো হতে দশহাজার গুন বেশী । এখনতো সবচেয়ে নিকটতম তারাটি আমাদের গ্রহ থেকে ৪.৩ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। যদি আমাদের গ্রহটির অবস্থান গ্লোবিউলার ক্লাস্টারের কেন্দ্রে হতো তাহলে এই ৪.৩ আলোকবর্ষ দূরত্বের মাঝে মাত্র একটি নয় বরং দশ হাজার অতিরিক্ত নক্ষত্র আমাদের প্রতিবেশী তারকা হতো। আমাদের এ নীল আকাশ এখনকার থেকে আরো দশ হাজার গুণ নক্ষত্রের সমাবেশে তখন ঝলসে যেত।

সূত্রঃ নাসা, হাবল স্পেস টেলিস্কোপ

গ্যালাক্সি ও তার স্থাপত্য শৈলী

গ্যালাক্সি নির্মাণের মৌলিক উপাদান হিসেবে নক্ষত্রসমূহকে বিবেচনা করা হয়। গ্যালাক্সির বৈশিষ্ট্যগত ও আকার আকৃতিগত পরিবর্তনে নক্ষত্রগুলো তাদের প্ররম্ভিক অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে পূর্নতা প্রাপ্তি দ্বারা এই বিশেষ ভূমিকা পালনে সহায়তা করে। সময়ের সাথে সাথে নক্ষত্রসমূহের  ক্রমবিকাশ ছায়াপথের আভ্যন্তরীন রাসায়নিক বিক্রিয়া ও অন্যান্য  নিকটবর্তী বা প্রতিবেশী ছায়াপথের সাথে মিথস্ক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে।

আজ যে গ্যালাক্সিসমূহ নিয়ে  আলোচনা করবো তারা হলোঃ

১। সোমব্রেরো গ্যালাক্সি

২। অ্যান্টেনা গ্যলাক্সি

৩। রিং  গ্যলাক্সি

৪। পোলার রিং গ্যালাক্সি

৫। কমেট গ্যালাক্সি

৬। সিগার (M82) গ্যলাক্সি

৭। M81 গ্যালাক্সি

৮। কার্ট হুইল গ্যালাক্সি

সোমব্রেরো গ্যালাক্সি



চিত্রঃ দৃশ্যমান আলোক তরঙ্গে উপস্থাপিত সোমব্রেরো গ্যালাক্সি

এই চিত্রে নাসার হাবল স্পেস টেলিস্কোপের খুরধার লেন্স তুলে এনেছে সবচেয়ে নয়নাভিরাম আকর্ষনীয় একটি ছায়াপথের আলোকচিত্র যার নাম সোমব্রেরো গ্যালাক্সি। নিউ জেনারেল ক্যাটালগে এর নিবন্ধিত নম্বর  ৪৫৯৪ এবং মেসিয়ার ক্যাটালগে এর নম্বর ১০৪, তাই এই ছায়াপথটির পরিচয়  NGC 4594 বা M104.
সোমব্রেরো একটি বিশেষ ধরণের মেক্সিকান টুপি, যার মধ্যভাগ উঁচু শীর্ষবিশিষ্ট এবং চারিধার এমন ভাবে বল্টানো থাকে, যা স্কন্ধদেশে চারপাশ জুড়ে ছায়াদান করে । গ্যালাক্সিটির আকৃতির সাথে সোমব্রেরো নামক মেক্সিকান টুপির সাদৃশ্য পাওয়া যায় বলেই এর এরূপ নামকরন। এই ছায়াপথটি অন্য সকল ছায়াপথ থেকে স্বতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। কারণ হলো এর কেন্দ্রস্থ অতি উজ্জ্বল দীপ্তিময় শ্বেতশুভ্র স্ফীতাকার অঞ্চলের উপস্থিতি, যার চারিদিক ঘিরে আছে সারিবদ্ধ ঘন ধূলিময় আবরণ। এ ধূলি আবরণ  ছায়াপথের সর্পিলাকার বাহু গঠণেও সম্পৃক্ত হতে পারে বলে মনে করা হয়। কারণ বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে এটি একটি সর্পিলাকার ছায়াপথ। 
পৃথিবী থেকে এই ছায়াপথের প্রান্ত সীমাকে কিছুটা হেলানো অবস্থায় দেখা যায়। একে খালি চোখে দেখা অসম্ভব।  টেলিস্কোপের সাহায্যে virgo ক্লাস্টারের দক্ষিণ প্রান্তে পৃথিবী হতে ২৮ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে এর অবস্থান লক্ষ্য করা যায়।
সোমব্রেরো ছায়াপথটি ৫০ হাজার আলোকবর্ষ অঞ্চল জুড়ে মহাকাশে বিস্তৃত। আমাদের আবাসস্থল  মিল্কিওয়ে যদিও এর দ্বিগুন অর্থাৎ ১ লক্ষ আলোকবর্ষ অঞ্চল জুড়ে মহাকাশে বিস্তৃত। গুরুভার সমৃদ্ধ এই জ্যোতিষ্কটি ৮০০ বিলিয়ন সূর্যের সমতুল্য। সোমব্রেরো গ্যালাক্সির অভ্যন্তরে প্রায় ২০০০ এর মত গ্লোবিউলার ক্লাস্টারের উপস্থিতি লক্ষণীয় যারা আমাদের ছায়াপথের মতই ১০-১৩ বিলিয়ন বছর প্রাচীন।
গ্লোবিউলার ক্লাস্টার বলতে আমরা বুঝি দলবদ্ধ কয়েকশত হাজার নক্ষত্রগুচ্ছ। জ্যোতিষ্কমন্ডলে এটি বৃত্তাকার ও প্রতিসম রূপে প্রতীয়মান হয়। যে কোন ছায়াপথের সূচনালগ্ন পর্যবেক্ষণ করা হয় গ্লোবিউলার ক্লাস্টারের গঠন প্রক্রিয়া দেখে। এ প্রক্রিয়া সম্পাদনের জন্য আয়োজন হয় ছায়াপথে বিলিয়ার্ড বলের খেলা। আমাদের ছায়াপথ ধরা যাক। বিলিয়ার্ড বলগুলো হল নক্ষত্র। ক্লাস্টার তৈরির স্থান হল বিলিয়ার্ড টেবিল। হালকা বলগুলো দ্রুত গতি সম্পন্ন হয়ে ক্লাস্টার হতে সরে পড়ে কিনারার দিকে চলে আসে। ভারী নক্ষত্রগুলো ধীর গতি সম্পন্ন হওয়ায় ক্লাস্টারের কেন্দ্রে নিপতিত হয়। এই প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় mass segregation.এর কারণে ক্লাস্টারের কেন্দ্রে নক্ষত্রের ঘনবদ্ধতা আমাদের সূর্যের আশেপাশের নক্ষত্রগুলো হতে দশহাজার গুন বেশী । এখনতো সবচেয়ে নিকটতম নক্ষত্রটি আমাদের সৌরজতগত থেকে ৪.৩ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। যদি আমাদের গ্রহটির অবস্থান গ্লোবিউলার ক্লাস্টারের কেন্দ্রে হতো তাহলে এই ৪.৩ আলোকবর্ষ দূরত্বের মাঝে মাত্র একটি নয় বরং দশ হাজার অতিরিক্ত নক্ষত্র আমাদের প্রতিবেশী তারকা হতো। আমাদের এ নীল আকাশ এখনকার থেকে আরো দশ হাজার গুণ নক্ষত্রের সমাবেশে তখন ঝলসে যেত।আর এভাবেই হয়তোবা সোমব্রেরো গ্যালাক্সির কেন্দ্রস্থ উজ্জ্বল চাকতি সদৃশ আভাময় স্থানটি তৈরি হয়েছে,  যা এক্স-রে নিঃসৃত  বৃহদাকার অঞ্চল জুড়ে পরিবেষ্টিত হয়ে আছে। এর কেন্দ্রস্থ গহবরে জ্যোতিষ্কমন্ডলীয় বস্তু নিপতিত হয়ে তৈরি করেছে কৃষ্ণ গহ্বর। কারণ আমরা জানি, অপেক্ষাকৃত ভারী নক্ষত্রগুলো বেশীমাত্রায় অস্থিতিশীল। আয়ুও তাই স্বল্প। তাই তাপ ও চাপে সদা ক্রিয়াশীল নক্ষত্রগুলোর শক্তি  নিঃসরণকালে তা কেন্দ্রে অভ্যন্তর ভাগে শোষিত হতে থাকে যতক্ষণ না তা সুস্থিত অবস্থায় পৌঁছুতে পারে। সকল পদার্থই তার নিজস্ব অবস্থানে স্থিতি চায়। নক্ষত্রগুলোও তাই। কিন্তু অতিভারী নক্ষত্র স্থিতির আশায় তার সকল ভর নিয়ে যখন তারই কেন্দ্রে নিপতিত হয়,শুরু হয় মহাকর্ষীয় বলের প্রবল বেগ। কাছে টেনে নিয়ে ফেলে অন্য সকল মহাজাগতীয় পদার্থ সমূহকে।

পদার্থের অপর রূপই শক্তি। তাপ বা আলো যে অবস্থাই সেটি থাকুক না কেন,এই শক্তি শোষিত হয়ে পড়ে পতিত নক্ষত্রের কেন্দ্রে তার অসীম শক্তিধর মহাকর্ষীয় বলের প্রভাবে। সৃষ্টি হয় ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণ বিবর, যেখান হতে আলোর প্রতিফলনও ব্যাহত হয়। আর অতিভারী ঘন এ বস্তু নিমেষে হয়ে পড়ে ঘন কৃষ্ণকায়। আমাদের চোখে অদৃশ্য কিন্তু সে তো অস্তিত্বহীন নয়। বিজ্ঞানীরা হিসাব করে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, সোমব্রেরো গ্যালাক্সির কৃষ্ণ বিবর এক বিলিয়ন সৌর ভরের সমান।
সময় তখন ১৯১২ সাল। মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী VM Slipher  লক্ষ্য করলেন অস্বাভাবিক দ্রুতবেগে ছুটে যাওয়া একটি জ্যোতিষ্ক, যে কিনা প্রতি সেকেন্ডে ৭০০ মাইল দূরে সরে যাচ্ছে। তার মতে এটি কোন অতি প্রাচীন  ছায়াপথ না হয়ে পারেই না, যা আবারো প্রমাণ করে দিচ্ছে আমাদের মহাবিশ্ব সদা সম্প্রসারণশীল। তিনিই প্রথম এই ছায়াপথটির ঘূর্ণন পরিমাপ করতে সক্ষম হন।
তারও অনেক পরে ২০০৩ সালে হাবল হেরিটেজের সদস্যরা আরো উন্নত প্রযুক্তি সমৃদ্ধ স্পেস টেলিস্কোপের ক্যামেরার সাহায্যে গৃহীত আলোকচিত্রটি অবশেষে আমাদের উপহার দিতে সক্ষম হয়েছেন। ইনফ্রা-রেড আলোক তরঙ্গের সাহায্যে অস্পষ্টায় আড়াল করা ধূলিকণা ভেদ করে করে নক্ষত্র সৃজনের অঞ্চলগুলো নীচের ছবিতে সমব্রেরো ছায়াপথটি আরো স্পষ্ট হয়ে উঠে এসেছে। 


চিত্রঃ ইনফ্রা-রেড আলোক তরঙ্গে উপস্থাপিত সোমব্রেরো গ্যালাক্সি

অ্যান্টেনা গ্যালাক্সি

চিত্রঃ অ্যান্টেনা গ্যালাক্সি

নিউ জেনারেল ক্যাটালগ (NGC) অনুযায়ী এই ছায়াপথটির নম্বর NGC 4038-4039. নাম অ্যান্টেনা গ্যলাক্সি। নাসার হাব্‌ল স্পেস টেলিস্কোপ হতে গৃহীত এই ছবিতে দেখা যাচ্ছে  দুটি সর্পিলাকার ছায়াপথ বা স্পাইরাল গ্যলাক্সির একত্রীকরণ প্রক্রিয়া। যা শুরু হয় আজ হয়ে কয়েকশত মিলিয়ন বছর আগে। ছায়াপথ দুটির সংর্ষের শুরুর দিকে তৈরী হচ্ছিল অগণিত নক্ষত্ররাজি। তারই ফলশ্রুতিতে হাবল্‌ স্পেস টেলিস্কোপ সবচেয়ে নিকটবর্তী যে ছবিটি আমাদের উপহার দিয়েছে তাই-ই NGC4038-4039 বা অ্যান্টেনা গ্যলাক্সি। অ্যান্টেনার মতন দীর্ঘ লম্বাটে আকার বলেই এই ছায়াপথের এইরূপ নামকরণ।
গ্যলাক্সি দুটি একত্রিত হওয়ার সময়ে তাদের অভ্যন্তরস্থ গুচ্ছ গুচ্ছ নক্ষত্ররাজি তৈরী করেছিল নক্ষত্রগুচ্ছ বা স্টার ক্লাস্টার। এই প্রাপ্ত ছবিটির ডান এবং বাঁ দিকে দুটি কমলা রঙের গোলাকার পিন্ড হল মূল ছায়াপথ দুটির কেন্দ্র বা core. ছবিতে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে মেটে রঙের কসমিক ডাস্ট এবং ফিলামেন্ট দ্বারা মূল ছায়াপথ দুটির অপেক্ষাকৃত বর্ষীয়ান তারকাগুলো ছেয়ে আছে। তাই মেটে আর কমলা রঙ কাছাকাছি হয়ে মিশে আছে। 
ছবিটিতে হাল্‌কা নীলাভ অংশে রয়েছে সদ্য তৈরী হওয়া নবীন তারকারাজি। হাইড্রোজেন গ্যাসপিন্ড দিয়ে আবৃত এই অঞ্চলটি যেন উত্তাপ বিকিরণে গোলাপী রঙের আভায় উজ্জ্বল হয়ে আছে। এই ছবিটি থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সহজেই নক্ষত্র ও নক্ষত্রগুচ্ছ কে আলাদা করতে পারবেন। Age dating পদ্ধতির মাধ্যমে তারা দেখেছেন সদ্য তৈরি হওয়া নক্ষত্রগুচ্ছের দশ শতাংশ শুধুমাত্র টিকে থাকবে প্রথম দশ মিলিয়ন বছরের কিছু অধিক সময় আর বাকীরা গুচ্ছবদ্ধ না থেকে বিচরণ করবে এই বিশাল ছায়াপথের মঝে। বিশালাকায় নক্ষত্রগুলো সুসংঘবদ্ধ হয়ে গঠন করবে গ্লোবিউলার ক্লাস্টার। এটি নক্ষত্ররাজির এমন একটি ক্লাস্টার, যা কিনা দশ হাজার থেকে এক মিলিয়ন নক্ষত্রের সমন্বয়ে ১০-২০০ আলোকবর্ষ ব্যাস সমৃদ্ধ স্থান জুড়ে ছায়াপথে অবস্থান করে আছে।
অ্যান্টেনা গ্যলাক্সির এই ছবিতে মূল ছায়াপথ দুটির স্ব স্ব কেন্দ্রস্থল অর্থাত নিউক্লিয়াস থেকে অ্যান্টেনা সদৃশ লম্বা দীর্ঘায়িত অংশটুকু অনেকদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। গ্রাউন্ড বেইসড টেলিস্কোপ দিয়েও ছায়াপথের এই অ্যান্টেনা সদৃশ অংশবিশেষ ভাল মতন পর্যবেক্ষণ করা যায়। ২০০ থেকে ৩০০ মিলিয়ন বছর আগে যখন এ দুটো গ্যালাক্সি পরস্পরের মুখোমুখি হয়েছিল তখন সমুদ্রের জোয়ারের মতন মহাকাশেও জোয়ারের সৃষ্টি হয়েছিল যাকে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় বলে টাইডাল ওয়েভ। সমুদ্রের বিন্দু বিন্দু জলের সমাহার যেমন জোয়ার সৃষ্টি করে অতটা তেমন নয় বরং দুটি গ্যালাক্সির অসংখ্য বিন্দু বন্দু নক্ষত্র তাদের একত্রীকরনের সময় সৃষ্টি করেছিল টাইডাল ওয়েভ, যা পরবর্তীতে অ্যান্টেনা গ্যালাক্সির টাইডাল টেইল (tidal tail) তৈরিতে সাহায্য করে।
আমাদের ছায়াপথ অর্থাৎ আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি যখন আমাদের প্রতিবেশী গ্যালাক্সি অ্যান্ড্রমিডার সাথে কয়েক বিলিয়ন বর্ষ পর মিশে এক হয়ে যাবে তখন কিভাবে এদুটি ছায়াপথের নক্ষত্রে নক্ষত্রে ইন্টাঅ্যাকশান বা  মিথস্ক্রিয়ায় টাইডাল টেইল তৈরি হবে তার ধারণা বিজ্ঞানীরা এ আলোকচিত্র থেকে পাবেন।

রিং গ্যালাক্সি

চিত্রঃ রিং গ্যালাক্সি

২০০১ সালের ১২ ই জুলাই হাবল্ স্পেস টেলিস্কোপ এই চিত্রটি আমাদের উপহার দিয়েছেন, যা কিনা একটি রিং গ্যালাক্সির ছবি। ছবিটি একটু ধাঁধাঁ লাগায় প্রথমে। মনে হয় যেন দুটি গ্যালাক্সি সমকেন্দ্র বরাবর আগে পিছে করে অবস্থিত। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। ছবিটি আসলে একটি ছায়াপথেরই, যার কেন্দ্রে রয়েছে অধিক বয়সের লালচে নক্ষত্র আর আর তাকে ঘিরে সৃষ্ট বলয়ে অবস্থান করছে অপেক্ষাকৃত নবীন নীলাভ নক্ষত্রসমূহ। এদের মধ্যবর্তী অংশটুকু নিরেট কালো যার নাম Hoag’s object. এর বিস্তৃতি প্রায় একলক্ষ আলোকবর্ষ জুড়ে যা সার্পেন নক্ষত্রমন্ডল হতে ৬০০ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। এ নক্ষত্রমন্ডলীর সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র আলফা-সার্পেন আকৃতিতে আমাদের সূর্যের চেয়ে দশগুণ বড় এবং আমাদের হতে ৬৭ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত।

ঘড়ির কাঁটাকে দুপুর একটার ঘরে রাখলে চিত্রটিতে নিউক্লিয়াস ও বহির্বলয়ের মাঝে প্রতীয়মান হয় আরেকটি ছোট রিং গ্যলাক্সি। কিন্তু কিভাবে উতপত্তি হলো এই বিস্মকর গ্যলাক্সিটির? বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন অতীতে কখনো দুটি গ্যলাক্সি কাছাকাছি এসে পড়ায় সংঘর্ষ সৃষ্টিতে পরস্পরের নক্ষত্র সমূহ অঙ্গীভূত হয়ে নতুন সজ্জায় বিন্যস্ত হয়েছে। এ সজ্জায় অপেক্ষাকৃত ভারী নক্ষত্রগুলো কেন্দ্রে নিজেদের ঠাঁই করে নিয়েছে আর নবীনরা বলয়াকারে কেন্দ্রকে প্রদক্ষিণ করে চলছে। বলয়টির ব্যাস এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার আলোকবর্ষ।

পোলার রিং গ্যালাক্সি

চিত্রঃ পোলার রিং গ্যালাক্সি

এই চিত্রটি আরোও বিস্ময়কর। এই ছায়াপথটির নাম NGC4650A বা পোলার রিং গ্যলাক্সি। এখানে দেখা যাচ্ছে কেন্দ্রের তল আর বলয়টির তল পরস্পর সমান্তরালে নয় বরং একে অপরের সাথে লম্বভাবে অবস্থিত। বলয় ও কেন্দ্রের মাঝখানে নিকষ কালো অঞ্চলটি পরিপূর্ণ ররেছে ঘন কৃষ্ণ বস্ত বা ডার্ক ম্যাটারে। বিশালাকায় এই বলয়টি গুরুভারে সমৃদ্ধ ঘন নক্ষত্ররাজি ও ধূলিকণা এবং গ্যাসের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে।


গ্যালাক্সিপুঞ্জ
কমেট গ্যালাক্সি


 চিত্রঃ অ্যাবেল-২৬৬৭ গ্যালাক্সিপুঞ্জে উপরের বাঁ দিকে থেকে ধেয়ে আসা নীলাভ স্পাইরাল  কমেট গ্যালাক্সি
চিত্রটি হাব্‌ল স্পেস টেলিস্কোপ থেকে সংগৃহীত গ্যালাক্সিপুঞ্জ abell 2667 এর। এই গ্যালাক্সিপুঞ্জটি স্কালপ্টার নক্ষত্রমন্ডলী বরাবর ২.৭৩ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। ছবিটির উপরের বাঁ দিকে দেখা যাচ্ছে অস্বাভাবিক আকারের ধূমকেতু সদৃশ নীলাভ স্পাইরাল একটি ছায়াপথ , যে কিনা আমাদের থেকে ৩.২ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। এটি ঘন্টায় ৩.৫ মিলিয়ন কি.মি. বেগে ধাবিত হচ্ছে অ্যাবেল-২৬৬৭ গ্যালাক্সিপুঞ্জের ভর ও তার অভ্যন্তরস্থ কৃষ্ণবস্তুর আকর্ষণে। যখনই প্রবেশ করেছে অ্যাবেল গ্যালাক্সিপুঞ্জের বিশাল ক্ষেত্রে তখন এর অভ্যন্তরস্থ গ্যাস  ছিন্ন বিছিন্ন হয়ে পড়েছে অ্যাবেলের মহাকর্ষ বলের জোয়ারে। তার সমস্ত চার্জযুক্ত কণাকে এই বিশাল গ্যালাক্সিপুঞ্জ টেনে সরিয়ে নিয়ে ধূমকেতুর পুচ্ছসদৃশ গ্যাসীয় মন্ডল তৈরি করেছে। নিবিষ্ট পর্যবেক্ষণে বিজ্ঞানীদের কাছে তাই-ই ধরা পড়েছে মার্চ ০২,২০০৭ এ। তাই বিজ্ঞানীরা ধূমকেতু সদৃশ স্পাইরাল গ্যালাক্সিটির নামকরণ করেছেন কমেট গ্যালাক্সি।
বিজ্ঞানীরা এমন মনে করেন যে মোটামুটি এক বিলিয়ন বছরের সময়কালে এই কমেট গ্যালাক্সির মিলিয়ন নক্ষত্রসমূহ ছিন্ন বিছিন্ন হয়ে গ্যালাক্সিটিকে আর গ্যাস সমৃদ্ধ থাকতে দিবে না। তখন রক্তিম বর্ণের অপেক্ষাকৃত বর্ষীয়ান নক্ষত্রগুলোই শুধু এতে অবস্থান করবে। এ সমগ্র প্রক্রিয়ার ২০০ মিলিয়ন বছর এখন মাত্র অতিবাহিত হয়েছে।
অ্যাবেল গ্যালাক্সিপুঞ্জের উত্তপ্ত গ্যাস ১০-১০০ মিলিয়ন ডিগ্রি তাপমাত্রা সম্পন্ন এবং আয়ন বা চার্জ যুক্ত কণায় গঠিত। এর প্রচন্ড মহাকর্ষীয় বল আলোর গতিপথকেও প্রভাবিত করেছে। ফলে আরো দূরবর্তী গ্যালাক্সি থেকে আসা আলো সরাসরি নয় বরং কিছুটা তীর্যক ভাবে ধাবিত হচ্ছে। আর সেই কারণেই সেই সকল গ্যালাক্সির আকৃতির প্রতিচ্ছবি সঠিকভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে না। যেমনটি হচ্ছে এ চিত্রের কেন্দ্র হতে ডান দিকে বাঁকানো বিশাল গ্যালাক্সির ক্ষেত্রে।
নীল,সবুজ, ইনফ্রারেডে বর্ণের ফিল্টার ব্যবহার করে হাব্‌ল এই চিত্রটি ওয়াইড ফিল্ড প্ল্যানেটারি ক্যামেরা-২ থেকে ধারণ করেছিল অক্টোবর ২০০১ সালে। টেলিস্কোপে ধারণকৃত ছবিগুলো একত্র করে বিজ্ঞানীরা এখন ধারণা পেয়েছেন কিভাবে গ্যাসসমৃদ্ধ গ্যালাক্সিগুলো ধীরে ধীরে গ্যাসে অপর্যাপ্ত হয়ে পড়ে। চিলিতে অবস্থিত ইউরোপীয়ান সাউদার্ন মানকেন্দ্রের টেলিস্কোপ,নাসার স্পিটজার স্পেস টেলিস্কোপ, চন্দ্র এক্স রে মানকেন্দ্র এবং হাওয়াই এর টুইন Keck টেলিস্কোপের যৌথ অবদান এ গবেষণায় অনস্বীকার্য। অগণিত গৃহহারা নক্ষত্র কিভাবে গ্যালাক্সিপুঞ্জের আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তারই ধারণা আজ আমরা পাচ্ছি এ সকল প্রাপ্ত চিত্র থেকে।
সংঘর্ষময় গ্যালাক্সিপুঞ্জের আরেকটি ঘটনা এবার বলবো। তখন ২০০৯ এর এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়। পৃথিবীবাসীরা এমন একটি মহাজাগতিক ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেছে প্রথমবারের মতন,যা ঘটেছে এ গ্রহ থেকে ৫.৪ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে চার চারটি গ্যালাক্সী পুঞ্জের মাঝে। গ্যালাক্সী ক্লাস্টারের এই সংঘর্ষ তৈরী করেছে আরো জটিল ক্লাস্টারের। এরই ত্রিমাত্রিক চলচিত্র তৈরী করেছেন বিজ্ঞানীরা কম্পিউটার অনুকরণ এর মাধ্যমে এবং এর নামকরণ করেছেন MACS j0717.



চিত্রঃ MACS j0717
প্রাপ্ত ছবিটিতে নীলাভ অঞ্চল উত্তপ্ত গ্যাসীয় অঞ্চল নির্দেশ করছে আর লালচে বেগুনী অঞ্চল নির্দেশ করছে অপেক্ষাকৃত কম উষ্ণ বা শীতল গ্যাসীয় পদার্থের সমারোহ। চিত্রে দেখা যাচ্ছে একাধিক গ্যালাক্সী ক্লাস্টারের বারবার সংঘর্ষের দরুণ তৈরীকৃত ১৩ মিলিয়ন আলোকবর্ষ অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত গ্যাসীয় ধূলিকণা ও কৃষ্ণবস্তুর সমাহার। গ্যালাক্সীপুঞ্জের সংঘর্ষের দরুণ আমাদের সীমারেখা হতে অভিলম্ব বরাবর ছিটকে পড়েছে গ্যালাক্সী ক্লাস্টারগুলো। উত্তপ্ত গ্যাসীয় পদার্থ চেষ্টা করে যাচ্ছে ধীরে ধীরে শীতল হতে এবং অবস্থানে সমতাবিধান আনয়নে আর সেই চিন্তাকে কাজে লাগিয়ে টেলিস্কোপের প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা মহাকালের অতি আশ্চর্য্যকর এবং সর্ব বৃহত আকারের নভোমন্ডলীয় এই মহাজগতিক ঘটনা প্রবাহের সচিত্র প্রতিবেদনই ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করেছেন আমাদের সামনে।

সিগার গ্যালাক্সি /স্টারবার্স্ট গ্যালাক্সি



চিত্রঃ সিগার গ্যালাক্সি /স্টারবার্স্ট গ্যালাক্সি

সময় ১৭৭৪ সালের ৩১শে ডিসেম্বর। জার্মান জ্যোতির্বিজ্ঞানী জোহান বোড সন্ধান পেলেন বিবর্ণ ফ্যাকাশে দীর্ঘকায় এক ছায়াপথের। এ যেন নেবুলার প্রলেপ বুলানো। নাম M82. অন্যান্য ছায়াপথের তুলনায় এখানে নক্ষত্র তৈরীর হার বর্তমানে কয়েকশত গুণ বেশী। এবং আরো দশ মিলিয়ন বছর ধরে এ প্রক্রিয়া চলতে থাকবে বলে তারা ধারণা করেন। যেহেতু এখানে সব সময়ে জন্ম নিচ্ছে নতুন নতুন নক্ষত্র,তাই এই ছায়াপথের অপর নাম স্টারবার্স্ট গ্যলাক্সি। ইতিমধ্যে হাবল্ স্পেস টেলিস্কোপ এই ছায়াপথে তৈরী হওয়া ১০০ টি গ্লোবিউলার ক্লাস্টারের সন্ধান দিয়েছে যারা বয়সের দিক দিয়ে একেবারেই নবীন। নক্ষত্র উতপাদনের অবিরাম কারখানা বলে খ্যাত এই ছায়াপথটি মহাশূন্যে সবচেয়ে উজ্জ্বলতম জ্যোতিষ্ক। ইনফ্রা-রেড আলোক তরঙ্গও এই ছায়াপথটিকে সবচেয়ে উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক বলে সন্ধান করেছে। তাই M82 গবেষণার জন্য দৃষ্টি আকর্ষণেও সক্ষম হয়েছে সবচেয়ে বেশী।
আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির পর এই ছায়াপথটি নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষাও হয়েছে সর্বাধিক। ছায়াপথটি আমাদের থেকে ১২ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়েও একটু স্বতন্ত্র। সিগার বা চুরুট আকারের বলে এর অপর নাম সিগার গ্যালাক্সি। অনিয়তাকার এ ছায়াপথে সর্পিলাকার বাহু প্রায় অনুপস্থিত। ২০০৫ সালে ইনফ্রারেড চিত্র হতে মাত্র দুটো সর্পিলাকার বাহু সদৃশ গঠন প্রতীয়মান হয়েছে, যা ছায়াপথের মূল চাকতি হতে অধিক নীলাভ। জোরালো রেডিও তরঙ্গের উতস হিসেবে এই ছায়াপথটি যেমন অনন্য তেমনি পোলারাইজড রশ্মি নির্গমনের দিক দিয়েও তুলনাহীন। তাই নিঃসন্দেহে শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্র এখানে বিদ্যমান। ছবিতে আরো দেখা যাচ্ছে কয়েক মিলিয়ন ডিগ্রী উষ্ণ গ্যাসীয় পুঞ্জ আর প্রজ্জ্বলিত শিখার উতসরণ, যা কিনা কেন্দ্র হতে অব্যাহতভাবে নিঃসৃত হচ্ছে অক্ষের অভিলম্ব বরাবর। 

M81 গ্যালাক্সির স্থাপত্য শৈলী 
চিত্রঃ বাঁয়ে স্পাইরাল M81 আর ডাইনে M82 সিগার গ্যালাক্সি

নক্ষত্রগুলো যেমন গুচ্ছাকারে বা দলবদ্ধ ভাবে থাকে তেমনি ছায়াপথগুলোও। আমাদের মিল্কিওয়ে সহ ৩০ টির মত সদস্য ছায়াপথ নিয়ে লোকাল গ্রুপ গঠিত যেখানে কিনা রয়েছে অ্যান্ড্রোমিডা, লার্জ ম্যাগিলানিক ক্লাউড,  স্মল ম্যাগিলানিক ক্লাউড সহ আরো অনেকগুলো গ্যালাক্সি।লোকাল গ্রুপ হতে ১২ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরেই আবিষ্কৃত হয়েছে M81 গ্রুপ যাতে সিগার গ্যালাক্সি M82 ও অন্তর্ভুক্ত।
M81 একটি সর্পিলাকার ছায়াপথ। এর সর্পিল বাহুগুলোতে তৈরী হচ্ছে অসংখ্য নক্ষত্র। বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন দশ মিলিয়ন বছর আগে M81 ও M82 পরস্পরের মুখোমুখি হয়েছিল। তখন অত্যাধিক ভর বিশিষ্ট M81 এর মহাকর্ষীয় তরঙ্গ M82 এর গঠণকে এতটাই প্রভাবিত করে যে ফলস্বরূপ M82 আজ আমাদের চোখে অনিয়তাকার (সিগার সদৃশ)। যদিও তাদের মধ্যকার দূরত্ব এখন ১৫০,০০০ আলোকবর্ষ,তবুও M81 ও M82 বহুল সমাদৃত জোড়া হিসেবেই খ্যাত।
উত্তর গোলার্ধের ঊর্ষা মেজর (যার অপর নাম গ্রেট বিয়ার বা বিগ ডিপার) নক্ষত্রমন্ডলীর দৃষ্টি সীমানা বরাবর একটি সরলরেখা টানলে M81 কে দেখা যাবে সে রেখা থেকে কোণাকুণি ভাবে হেলে থাকা একটি উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক রূপে।
চিত্রঃ  M81 গ্যালাক্সি

এর নীলাভ সবুজ অংশটুকু নবীন নক্ষত্রের উতপাদন কারখানা হিসেবে নির্দিষ্ট করে। প্রায় ৬০০ মিলিয়ন বছর আগে থেকে শুরু হয়েছে এখানে নক্ষত্র উতপাদনের প্রক্রিয়া। ছায়াপথটির কেন্দ্রের ফেঁপে উঠা অংশটিতে রয়েছে প্রবীণ নক্ষত্রগুলো। আমাদের ছায়াপথের সাথে তুলনা করলে M81 এর কৃষ্ণগহ্বর মিল্কিওয়ের কৃষ্ণগহ্বরের তুলনায় ১৫ গুন বেশি ভর সম্পন্ন। অর্থাৎ প্রায় ৭০ মিলিয়ন সৌর ভরের সমান। ফলের এই বিস্ফোট অংশের আকারও মিল্কিওয়ের কেন্দ্রের ফাঁপানো বিস্ফোট অংশের থেকে বড়। খালি চোখে M81 গ্যালাক্সিটির আকৃতি পূর্ণচন্দ্রের মতো। খুব উজ্জল বলেই M81 সবসময় সবার কাছে নজড়কাড়া ও দৃষ্টিনন্দন।
কার্ট হুইল গ্যালাক্সি


চিত্রঃ কার্ট হুইল গ্যালাক্সি
দক্ষিণ গোলার্ধের আকাশে স্কাল্পটার নক্ষত্রমন্ডলী বরাবর ৫০০ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে অপেক্ষাকৃত জটিল গঠণ সম্পন্ন যে গ্যালাক্সিটি সনাক্ত হয়েছে তার নাম কার্ট হুইল গ্যালাক্সি। ঘোড়ার গাড়ির হুইল বা চাকার গঠণের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বলে এইরূপ নামকরণ। সর্পিলাকার বা উপবৃত্তাকার নয় বরংচ এর মাঝামাঝি একটি আকৃতিতে এ গ্যালাক্সিটিকে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। এরূপ গ্যালাক্সিগুলো আকৃতিগত যে বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করে তার সাথে লেন্সের গঠণের মিল থাকার দরুণ এদের লেন্টকুলার গ্যালাক্সিও বলে। কার্ট হুইল এর অন্যতম উদাহরণ। পূর্বে যে রিং গ্যালাক্সির কথা বললাম সেটিও এ শ্রেণীতে পড়ে।
এই ছায়পথের নিউক্লিয়াস অতি উজ্জ্বল। এটি যেন সরু পাতলা ফিতার সাহায্যে নবীন নীলাভ নক্ষত্র সম্বলিত বহির্বৃত্তাকার বলয়ের সাথে যুক্ত। এরূপ বাহ্যিক সজ্জার কারণ কি হতে পারে তা অনুসন্ধান করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, ২০০ মিলিয়ন বছর পূর্বে এটি একটি সর্পিলাকার ছায়াপথই ছিল। কিন্তু কোন প্রতিবেশী ছায়াপথ এর পাশ দিয়ে অতিক্রম কালে অনুভূত আকর্ষণ বলের তীব্রতায় এর সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষে নিপতিত হয়। এতে অত্যাধিক কম্পনে সৃষ্ট চাপ ও তাপ আন্তর্নক্ষত্রীয় গ্যাসীয় উপাদানসমূহকে ছড়িয়ে নিয়ে সৃষ্টি করে অগণিত নক্ষত্ররাজি। তারা তখন নিজেদের ভারে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল জুড়ে। আর অপেক্ষাকৃত নীলাভ নবীন নক্ষত্র সেই কেন্দ্রকে ঘিরে বৃহৎ অঞ্চল জুড়ে তৈরি করে বাইরের বলয়।
মহাশূন্যে ১ লক্ষ ৫০ হাজার আলোকবর্ষ অঞ্চল জুড়ে এ ছায়াপথটি ব্যাপৃত। সাম্প্রতিক এক্স-রে চিত্র বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা আরো লক্ষ্য করেছেন এই বাইরের বলয়টির আশেপাশে অবস্থান করছে একাধিক ব্ল্যাক হোল। কালের আবর্তে ধীরে ধীরে রাসায়নিক মিথস্ক্রিয়ায় ছায়াপথটি আবারো আকৃতি পরিবর্তন করে হয়তো বা তার পূর্ববর্তী সর্পিলাকার গঠণে ফিরে আসবে কয়েকশত মিলিয়ন বছরের মধ্যেই। আর এরই মধ্যে মানব সভ্যতা উন্নতির এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাবে যে টেলিস্কোপ দিয়ে ওই দূরের এসকল ছায়াপথ দেখার প্রয়োজন শেষ হবে। কারণ সে সময়টুকুতে তারা সে ছায়াপথে বার কয়েক ভ্রমণ সম্পাদন করে নেবে অনায়াসে।



ক্যাসিয়াপিয়া A নক্ষত্রাবশেষ


 আমাদের মিল্কিওয়ে ছায়াপথে ১১ হাজার আলোকবর্ষ দূরের ক্যাসিয়াপিয়া নক্ষত্রমন্ডলে ঘটে যাওয়া অতিকায় নব নক্ষত্রের বিস্ফোরণ জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সর্বপ্রথম পর্যবেক্ষণ করেন আজ হতে তিনশত বছর আগে। দশ আলোকবর্ষ বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এই নক্ষত্রাবশেষের নাম ক্যাসিয়াপিয়া A বা Cas A. পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘে জমাট হয়ে থাকা এই খন্ডাংশগুলো আকারে আমাদের সৌরজগতের থেকেও বহুগুণ বড় হবে। সূর্যের চেয়ে ১৫ হতে ২৫ গুণ ভরের সেই নক্ষত্রটি দগ্ধ হয়েছে সূর্যের চেয়েও ১০০০ গুণ ক্ষিপ্র বেগে। এপর্যন্ত সুপারনোভা বিস্ফোরণের প্রাপ্ত তথ্যের মাঝে নক্ষত্রাবশেষ Cas A -র সৃষ্টিই নবীনতম। তীব্র রেডিও তরঙ্গ বিকিরণের মাধ্যমে তার অবস্থান সে জানিয়ে যাচ্ছে বারবার। CasA –র ছুটে চলার গতি ঘন্টায় দশ মিলিয়ন মাইল। তাপমাত্রা ৫০ মিলিয়ন ফারেনহাইট।চিত্রটিতে বিচিত্র বর্ণ বিভিন্ন মৌলের উপস্থিতি নির্দেশ করছে । যেমন লালচে আভা যুক্ত স্থানে রয়েছে সালফার, গাঢ় নীলাভ অঞ্চলে রয়েছে অক্সিজেন মৌল। আর সাদা গোলাপী ও কমলা আভা নির্দেশ করে সালফার ও অক্সিজেনের মিশ্রণ। স্পিটজার টেলস্কোপ থেকে প্রাপ্ত প্রতিধ্বনিত তরঙ্গ বহন করছে বিস্ফোরণ সংঘটিত হবার পূর্বের তথ্য যা থেকে বিজ্ঞানীরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে বৃহৎ ভর বিশিষ্ট রক্তিম সুপারজায়ান্ট নক্ষত্রটি তার আভ্যন্তরীন চাপে কোন একসময়ে ভয়ানক বিস্ফোরণের সম্মুখীন হয়ে উচ্চমাত্রায় তাপ ও আলো বিকিরণ করে নিস্প্রভ হয়ে পড়ে মহাকাশের গর্ভে। এখন তার আলো এতটাই ক্ষীণ ও নিস্প্রভ যা কিনা খালি চোখেও আর দেখা যায় না। 

তথ্যসূত্রঃ নাসা

আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান বৎসর

 

২০০৯ সালকে ঘোষণা করা হয়েছে আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান বৎসর হিসেবে। এ উপলক্ষ্যে জ্যোতির্বিজ্ঞানী গ্যালিলিও ও তার দূরবীণের ছবি, পাশাপাশি খোদিত করে বের করা হয়েছে ২৫ ইউরোর একটি মুদ্রা। মুদ্রাটির ব্যাকগ্রাউন্ডে রয়েছে গ্যালিলিওর প্রথম চন্দ্রাপৃষ্ঠের চিত্রাঙ্কন। বর্ডারে রয়েছে বেশ কয়েক প্রকার টেলিস্কোপের খোদিত চিত্র। যেমন, স্যার আইজ্যাক নিউটনের দূরবীণ, আধুনিক টেলিস্কোপ, রেডিও টেলিস্কোপ ও স্পেস টেলিস্কোপের ছবি। গ্যালিলিও তার টেলিস্কোপ দিয়ে নভোমন্ডল দর্শনের বছরটি ছিল আজ হতে চারশত বছর আগে ১৬০৯ সাল। তাই ২০০৯ সালটির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো গ্যালিলিও টেলস্কোপ উদ্ভাবনের ৪০০ তম বর্ষ।

গ্যালিলিও জন্মেছিলেন ১৫৬৪ খ্রিস্টাব্দের ১৫ ই ফেব্রুয়ারি ইতালীর পিসা নগরীতে। তাই ১৪ ই ফেব্রুয়ারি ২০০৯, ইউনিভার্সিটি অব নেবারাস্কার জাতীয় যাদুঘরের মুলার প্ল্যানেটোরিয়ামে গ্যালিলিওর জন্মদিন স্মরণে রেখে উন্মোচন করা হয় ৬ ফুট বাই ৩ ফুট আকৃতির একটি মুরাল যেটি কিনা ছিল মেসিয়ার ১০১ এর বর্ণাঢ্য মুরাল।

মেসিয়ার ১০১ একটি সর্পিলাকার ছায়াপথ যা ২২ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূর দিয়ে ঊর্ধা মেজর (যার অপর নাম গ্রেট বিয়ার বা বিগ ডিপার বা সেভেন স্টার বা সপ্তর্ষি মন্ডল) নক্ষত্রমন্ডলে ভেসে বেড়াচ্ছে মহাকাশের গহবরে। নক্ষত্রের ঘূর্ণিবলয়ে সমৃদ্ধ এই গ্যালাক্সীটি শিখাহীন উজ্জ্বল গ্যাসের চক্রাকার ঘূর্ণনের কারণে পিনহুইল গ্যালাক্সী নামেও সুখ্যাত। এর বিশালতা এক লক্ষ ৯০ হাজার আলোকবর্ষ। ৩৩ বিলিয়ন সংখ্যক নক্ষত্র সে ধারণ করে আছে তার মাঝে।

স্পিটজার টেলিস্কোপের ইনফ্রা-রেড চিত্র থেকে বিজ্ঞানীরা ধারণা পেয়েছেন ছায়াপথটির ধূলিকণা সমৃদ্ধ উচ্চ তাপীয় অবস্থা। তেমনি চন্দ্র এক্স রে মানমন্দির থেকে প্রাপ্ত এক্স রে এবং হাবল টেলিস্কোপের প্রাপ্ত হলুদাভ বর্ণের চিত্র একত্র করে এই পিনহুইল গ্যালাক্সীটি চিত্রে প্রতীয়মান হয়ে উঠেছে সব বর্ণে সব রঙে।

তথ্যঃ ইন্টারনেট

এখনি সময়

    তোমাকে যেতে হবে।  এখনই। চমকে তাকালো ঊর্জা সামনের দিকে। গভীর মনোযোগ দিয়ে কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল। গুরু গম্ভীর এ আদেশ যেন ...