
জীবনে চলার পথে এত অব্দি এসে রত্নার মনে পড়ে সেই মানুষগুলোর কথা যারা ছোট ছোটবেলায় তাকে কষ্ট দিয়ে বিকৃত আনন্দ অনুভব করত। শুধু যে তাকে, তা নয় সবাইকে কষ্ট দিতে এই লোকগুলো খুব মজা পেত। তাদের মধ্যে প্রফেসর কাঠি বেগম একজন। লম্বাটে চিকন চাইনিজদের মতন বোচা বোচা চেহারার মহিলা প্রফেসর ছিলেন তিনি। শাড়িটা উঁচু করে পড়তো নাকি বাজারের সকল শাড়ি তার উচ্চতা অনুসারে মাপ মতন পাওয়া যেত না - কে জানে?
কম দাম সুতী শাড়িগুলো তো ধুলে আবার খেপে যায়। অনেক বেশি খাপে। বেশি দামি শাড়ি পাবে কোথায়? শিক্ষকতা পেশায় হাত সবসময় টাইট। তাই একটা শাড়িই পড়তে দেখেছে রত্না তাকে। খাটো হাঁটুর উপরে উঠা পেটিকোট পরা সেই শাড়িটা কাঠি বেগম এর শরীরে সারা বছর। তিনি হন্তদন্ত হয়ে চলে। মানে দেখায় যে সে খুব ব্যস্ত। আর সকলের খোঁজ-খবর রাখে। আগের দিকে এই বিষয়টা রত্নার ভালই লাগতো। বাহ্ ম্যাডামটা কত কেয়ারিং। শেষের দিকে এসে যখন রত্না ঠ্যালার নাম বাবাজ্বী বুঝতে পরেছে তখন তো আর কথাই নেই। কলেজের শেষের দিকে রত্নার বিয়ের পরপরের কথা। কাঠি বেগম ইদানীং রত্নার খোঁজ একটু বেশিই রেখে ফেলছে। সেদিন যখন তার খোঁজ শুরু করলো, সারা কলেজ জীবনে রত্না শুধু সেই একদিনই অসুস্থতার দরুণ কলেজে যায়নি। তাই তার মুখোমুখি হতে যেয়েও সেই সুযোগ কাঠি বেগম পায়নি। আর পাইনি বলেই কাঠির ল্যাবে যখন রত্নার ল্যাব পার্টনার স্বপ্না প্রবেশ করল, তাকে দেখেই কাঠি বেগম তাকে ধরে তার উপরে ঝাড়লো সমস্ত ক্ষোভ। স্বপ্না বাড়ি এসে রত্নাকে জানিয়েছে,যে, 'প্রফেসর কাঠি বেগম, কলেজের এর ছাত্র,ছাত্রী, শিক্ষক বয়- বেয়ারা ডেকে তোমার বাবা-মাকে নিয়ে কি যে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেছে আর অশ্রাব্য কথার বাণ নিক্ষেপ করেছে, তা তুমি স্বপ্নেও চিন্তা করতে পারবা না।' সে বলেছিল রত্নাকে, প্রফেসরের রণমূর্তি বিক্ষুব্ধ আচরণ, রাগ আর তার চোদ্দ গুষ্টির উপর বিরক্তি প্রকাশের সমস্ত বিবরণ। সকলের সামনে রত্নার অজানা অচেনা বাবাকে কটাক্ষ করে কাঠি বেগম তারস্বরে চিৎকার করছিল। অনায়াশে না জেনেই বলেছিল যে রত্নার বাবা দরিদ্র, হতদরিদ্র, খেতে পায় না। রত্নার শ্বশুর তাদের সংসারে সাহায্য করে। মানে তার বাবার সংসারে সাহায্য করে। ঢাকার ওই অভিজাত এলাকায় বাড়ি তো রত্নার বাবা, তার বেইয়া -এর কাছ থেকে টাকা নিয়েই তৈরি করেছে। এ কথা রত্না বেশ অবাক হয়েছে শুনে। শ্বশুর বাড়ি যাবার তিন বছর আগেই রত্নাদের বাড়ি তার বাবা বানানো শেষ করেছে। বাড়ির সকল কাজ শেষ করে ভাড়াও দিয়ে দিয়েছে সেই ২০০২ সালে। তখন তো রত্নার বিয়েই হয় নাই। তাহলে এই বেয়াই মহাশয় আসলো কোথা থেকে? রত্না এটাই বুঝে ফেলেছিল তখন, যে প্রফেসর কাঠি বেগমের এসব কর্মকাণ্ড তার শ্বশুরেরই চাল। যদি সবার সামনে রত্নাকে আর রত্নার স্বনামধান্য শ্রদ্ধেয় বাবাকে এবং রত্নার ১৪ গুষ্টিকে উদ্ধার করতে পারে, তাহলে আচ্ছা মতন একটা শিক্ষা সেই শ্বশুর লোকটা রত্নাকে দিতে পারবে। একদম চিরজীবনের জন্য রত্না ও তার পরিবারকে অপমানিত করে, স্বর্ণাক্ষরে খঁচিত করে রাখার মত একটা ঘটনা সেই লোকটা কলেজ ক্যাম্পাসে প্রতিষ্ঠিত করবে। সবাই জানতে পারবে রত্নারা কতই না খারাপ। বড্ড খারাপ। তারপর জেনে ফেলে সকলে ছি ছি করবে। কিন্তু কাকে ছি ছি করবে? সকলে রত্না নামে ছাত্রীটিকে ছি ছি করবে, নাকি ছাত্রীর শিক্ষিকা হয়ে যে কিনা নেমেছে এরকম কাজে, সেই প্রফেসরনীকে?
স্বর সপ্তমে চড়িয়ে মাঠের পাশের বারান্দায় দাঁড়িয়ে, সকলের সামনে রত্নার গুষ্টি নিয়ে যখন বক্তৃতা শুরু করেছিল, তখন কাঠি বেগমের একদমই হুঁশ ছিল না। জায়গাটি ছিল কলেজের বায়োলজি ল্যাব। ল্যাবে কি কাজ হয় কাঠি বেগম খুব একটা ভালো জানে না কিন্তু একবার হলেও হাজিরা দিয়ে নিজেকে জাহির করতে প্রতিদিন সে কলেজের ল্যাবে আসে। সেদিনও প্রফেসর মহাশয়া ল্যাবের অভ্যন্তরে। আর রত্নার বন্ধু স্বপ্না এসেছে বায়োলজির নোট নিতে সেই ল্যাবে। স্বপ্নাকে দেখেই চট করে ডাক দিল প্রফেসর কাঠি বেগম। বায়োলজি বিভাগের অত্যন্ত বিদ্যাধর পন্ডিত এক প্রফেসর সেই ল্যাবে সেইদিন উপস্থিত ছিলেন। কাঠি বেগম তার পাশে বসেই নিজেকে জাহির করার কাজে ব্যস্ত ছিল। আর আচানক রত্নার বান্ধবীকে সেখানে উপস্থিত দেখি বুঝে নিয়েছে যে সারাদিন রত্নাকে তন্নতন্ন করে যেহেতু খুঁজে পায় নাই, সুতরাং এটাই একটা সুযোগ তাকে ধরার। সে এই বান্ধবীকে ধরে ফেলবে এবং তার যত ঝাল আছে সবটুকু সে ঐ মেয়েটির উপরেই ঝেড়ে দেবে। কাল তো ফাইনাল পরীক্ষার শেষ। এরপর যদি রত্নার ব্যাচের কাউকে পাওয়া না যায় তাহলে আক্রমণটা করবে কারো উপর? আর রত্নার কানে তো পৌঁছানোও যাবে না তার বিরক্তি এবং ঘৃণার বিস্ফোরণ যা সে দেখাচ্ছে। কলেজের স্বনামধন্য প্রফেসর এস - আর ল্যাবে ছাত্রদেরকে কাজ দেখাচ্ছিলেন। তাকে তোয়াক্কা না করেই বলা নেই কওইয়া নেই, কাঠি বেগম রত্নার বান্ধবীর উপর চড়াও হলেন।কি কারণ বান্ধবীটি কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না? কেন এ আক্রমণ? সে রত্নার সাথে মেশে বলে? আর জানলইবা কিভাবে যে সে-ই রত্নার পরিচিত?
ওই যে সকলের খোঁজখবর রাখে কাঠি বেগম। তাছাড়া আগের দিন রত্না অফিসের কাগজ জমা দিয়ে দাঁড়িয়েছিল যখন কলেজ প্রধানের অফিসের সামনে, সে লক্ষ্য করে দেখছিল যে উল্টা দিকের বিল্ডিং থেকে প্রফেসর কাঠি বেগম তার স্বামীকে আর তার গবেট পুত্রকে কি যেন বলে বলে রত্নাকে দেখাচ্ছে। বার বার রত্নার দিকেই তারা তিনজন তাকাচ্ছে। রত্নার এরকমটাই ভাবা তখন স্বাভাবিক ছিল। কারণ রত্নার আশেপাশে আর কোন ছাত্র-ছাত্রী উপস্থিত ছিল না। সুতরাং তারা যে গুরগুর করে রত্নাকে নিয়েই কথা বলছে।কাঠির স্বামীটি বেশ শক্ত মুখ করে, শক্ত চোয়াল বানিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঠি বেগমের বিড়বিড়ানি শুনে যাচ্ছে আর রত্নাকে পর্যবেক্ষণ করছে। একটু খটকা লেগেছে তখন রত্নার। লোকটি এমন করে ওর দিকে তাকিয়ে কি দেখছে? অথচ তখনো রত্না বুঝতে পারেনি যে তাদের উপর একটা 'দায়িত্ব' দেয়া হয়েছে। মানে কাঠি বেগম এবং তার স্বামীর উপরে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে যেন রত্নাকে তারা দেখে নেয়। তাই কাঠি বেগমের মিশন শুরু করবার পূর্ব প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে। সে এখন মাঠে নামবে। পূর্ব প্রস্তুতি হিসাবে তার স্বামী আর তার পুত্রকে চেনাচ্ছে কোনজন তার প্রতিদ্বন্দ্বী।
২
কাঠি বেগমের স্বামীর বড় বোন রত্নার মায়ের স্কুল জীবনের ফ্রেন্ড। সেদিক দিয়ে কাঠি বেগমের স্বামী যে রত্নার মাকে একেবারেই চেনে না, তা কিন্তু নয়। বড় বোনের স্কুল জীবনের সাথী সেই মহিলাটির মেয়েই। সেই রত্নার বিয়ে হয়েছ কুমড়ো পটাশ আবিদুরের সাথে। সেই আবিদুরের বাড়ীও তাদের আত্মীয়। কারণ কাঠি বেগমের উড়চুঙ্গা মার্কা ভাইটারো বিয়ে হয়েছে আবিদুরের বোনের সাথে। সেই সূত্র কাঠি বেগমের নিকট আত্মীয় তারা সবাই । সুতরাং আবিদুরের পক্ষ এবং রত্নার পক্ষ দুই পক্ষ থেকেই তাদের বিয়ের দাওয়াত পেয়ে এই কাঠি বেগমের এই স্বামী লোকটি কয়েকবারই নিমন্ত্রণে গিয়েছে রত্নাদের দিকের অনুষ্ঠানে। কিন্তু আজ প্রফেসর কাঠি বেগমের কানপড়ায় রত্নাকে যেন তার স্বামী আরো ভালোভাবে নিরীক্ষণ করবার চেষ্টা করছে। যেহেতু কাঠি বেগমের রত্নার শ্বশুর বাড়ির সাথে লতানো পাতানো আত্মীয়তা আছে তা তো হেলাফেলার ব্যাপার নয়। কারণ ওই শ্বশুর লোকটা তো সমাজের ভিআইপি গোছের একজন। তাই কাঠি বেগমের স্বামী দ্বিগুন নিরীক্ষণ শক্তি বাড়িয়ে দিয়ে দোতলার সেই বারান্দা থেকে রত্নাকে দেখে চোয়ালটা বেশ শক্ত করে ফেললো। তার জীবনসাথীর কথায় সে উঠে আর বসে। তার সকল কুপরামর্শে উৎসাহ দান করে। একটু হাবা টাইপ বলেই বোধহয় কাঠি বেগম তাকে চালায়। তবে কাঠি বেগম কা -কে চালায় না? পুরো কলেজই তো তার নিয়ন্ত্রণে। সে চলে। আজ সে ও তার স্বামী তাদের যৌথভাবে এই মিশন সম্পন্ন করতে প্রস্তুতি গ্রহন করছে। স্টিকি ওরফে কাঠিকে উৎসাহ দানকারী তার সেই স্বামী প্রবরটি অতঃপর নির্দেশ দিল 'নেমে পড়ো। এবার মাঠে নেমে পড়ো।'
এরই মাঝে স্বপ্না এসে দাঁড়িয়েছে রত্নার পাশে।খুবই আন্তরিক ভাবে আলাপ শুরু করেছে।
কে এই মেয়েটি?
স্বপ্নাকে কাঠি বেগম তার রাডারে ততক্ষণাৎ সেইভ ফেলেছে। কাঠি বেগম ও তার পরিবারের তার ওপর নিরীক্ষণ পর্যবেক্ষণের ভাবধারা দেখে স্বপ্নাকে রত্না ওখান থেকে সরিয়ে পাশের ওই টানা বারান্দায় নিয়ে যেতে যেতে বলল, 'চলো ওখানে দাঁড়িয়ে গল্প করি। গল্প করছিল দুজনা আপন মনে। কাঠি বেগম তক্ষুণি ওই উল্টো দিকের বিল্ডিং এর দোতলা থেকে নেমে এই বিল্ডিং -এ এসে অধ্যক্ষের ঘরের পাশ দিয়ে টানা বারান্দায় এসে খুঁজে খুঁজে পেয়েও গেল,রত্নাকে। আহা রে রত্নাকে পেতে কতদূর ফলো করতে হয়েছে তাকে। পাশে ওই স্বপ্না মেয়েটি তাহলে রত্নার বন্ধু। আরেকটু ভালো করে সে তাকে দেখার জন্য পিছনে তাকিয়ে দাঁড়ালো। যেন দাঁড়ানোটাকে স্বাভাবিক মনে হয়, তাই রত্নাকে প্রশ্ন করার ছলে জিজ্ঞেস করল,'পরীক্ষা তো শেষ। ফাইনাল পরীক্ষা শেষ। শ্বশুর বাড়ি যাচ্ছ কবে?' রত্নার শ্বশুর থেকে এসেছে এই নির্দেশ। শ্বশুর বলে দিয়েছে , যেমন করে হোক ধরতে হবে রত্নাকে। কারণ তার ক্যারিশ্ম্যাটিক ভাব সাব দেখেও ছেলের বউ যখন কন্ট্রোলে মধ্যে আসছে না, এবার কলেজে একটা কিছু করতেই হবে। রত্নাকে ধাঁতানোর জন্য তার এই আর লতানো পাতানো আত্মীয়খানা তো আছেই। তাদের কাজ করে দেবার জন্য সে তো সর্বদাই প্রস্তুত। তাই কাঠি বেগমের রত্নাকে তার কলেজে অনেকক্ষণ ধরে পরিবার শুদ্ধা পর্যবেক্ষণ করে আবার ফিরে এসে শ্বশুর বাড়ী সঙ্গক্রান্ত প্রশ্ন করাতে রত্নার কেমন জানি একটু খটকা লাগলো। তারপরেও কাঠি বেগমের যে অনেক ভাবনা রত্নার জন্য। প্রশ্ন শুনে কাঠি বেগমের দিকে তাকিয়ে তৎক্ষণৎ রত্না উত্তর দিল, 'শিগগিরি। পরীক্ষা যেহেতু শেষ। শিগিরি যাব। কাল বা পরশু।' আর ভাবল মনে মনে, জীবন নিয়ে কোন রকমে পালিয়ে বেঁচে যে সে ফিরেছে সেই শ্বশুরের আখড়া থেকে, সেই মৃত্যু পুরীতে কি রত্না আর কখনো ফেরত যাবে?'
কাঠি বেগম প্রশ্ন করার আর বিষয় পায় না। কলেজ তো তার লতানো পাতানো আত্মীয়তা দেখানোর জায়গা নয়। শুধু শিক্ষিকা বলেই কি একচেটিয়া যা ইচ্ছে তাই করবে।
পরের দিন রত্নার ভাইবার তারিখ পড়েনি। তাই রত্না কলেজে যায়নি। ভাইবা দেখার জন্য যেতে পারতো। কিন্তু কিছুটা অসুস্থতা বোধ করছিল কেন জানি। অসুস্থ সাধারণত সে কখনোই হয়না। তারপরও। যাওয়া হয়নি। আর সেদিনই নিজের ল্যাব ছেড়ে স্বপ্না গেছে বায়োলজি ল্যাবে তার বন্ধুর কাছ থেকে নোট নিতে। যেই না সে কাঠির বায়োলজি ল্যাবে ঢুকেছে, স্বপ্নাকে দেখেই কাঠি বেগম তড়াক্ করে চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠলো। আজ রত্নাকে ধরতে পারছে না। কারণ রত্না তো আসেনি। তাহলে কি করবে এবার? স্বপ্না কেই না হয় আছড়াগুলো দেবে। রত্নার শ্বশুর তার বন্ধু না? তার পরামর্শেই তো আজ সে মাঠে নামবে। মিশন কমপ্লিট করবে। তাতে অনেক উপঢৌকন তার জন্য নিশ্চয়ই অপেক্ষা করছে। তাই স্বপ্নাকে দেখেই চিৎকার করে সে বলা শুরু করল,'রত্না কোথায়?'
স্বপ্না তো তা জানে না। কি বলবে? বলার সুযোগই বা কোথায়? তার আগেই কাঠি বেগম তার গলা তারস্বর সপ্তমে চড়ালো। 'রত্নারা গরীব। বিয়ের আয়োজন ভালো ছিল না। খাবার নিম্নমানের ছিল। তাদের পরিবার নীচু শ্রেণীর। রত্নার ১৪ গুষ্টি নিচু শ্রেণীর। হাড় হা-ভাতে।'
অথচ অফিসার্স মেসের ভি.আই.পি. ডাইনিংয়ের ভেন্যুতে কাঠি বেগম সাথে তার স্বামী, তার ভাই -বোন, বাবাশুদ্ধ পুরো পরিবার গিয়েছিল নেমন্তন্ন খেতে। বিয়ের খাবারও তৈরি হয়েছিল ঢাকার নামকরা বাবুর্চি দিয়ে। সে খাবার তো কাঠি বেগম আর তার ভাই বোন সকলে গলধঃকরণ করে বাড়িতে এসে হজমও করে ফেলেছিল।
৩
রত্না তার কষ্টের এই কথাগুলো একবার তার প্রাণপ্রিয় রুবি আন্টিকে বলেছিল। অনেক দুঃখ পেয়ে, কষ্ট পেয়ে আন্টি তাকে খুব আদর করে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, 'তোমায় কেউ যা তা বললেই কি তুমি ভস্ম হয়ে যাবে?'উনার কথা আজও মনে পড়ে রত্নার।
ল্যাবের ভেতর রত্নাকে তার পরিবারসহ অপমান করার পুরো ঘটনাটি ওই লাইভে অবস্থিত বেয়াড়া টাইপের এক ছাত্রী ল্যাবের বাইরে এসে রত্নার ব্যাচের সকলের কাছে রসিয়ে রসিয়ে পরিবেশন করে ফেলল। সেই মেয়েটি তো রত্নার জন্য আক্রমণের শিকার হয়নি। শিকার হয়েছিল স্বপ্না। কিন্তু স্বপ্না তো ল্যাব থেকে বের হয়ে একটুও মুখ খুলেনি। স্বপ্না নিজেই যে তার দানবীয় শ্বশুর বাড়িতে থেকে রত্নার মতই ক্লান্ত। বাড়ীতে তাদের অত্যাচার, কলেজের রত্নার হয়ে তার উপর আবার কাঠি বেগমের আক্রমণ- কোনটা সামলাবে? তাই নীরবে চলে এসেছিল সেদিন। বাসায় এসেই ল্যান্ড-ফোনটা তুলে রত্নাকে বলল,'খবর আছে। মারাত্মক খবর। তোমাদের বাড়ির সকলের শোনা উচিত।' রত্না তঠস্থ হয়ে তার বাবা মাকে বলল, 'ফোন ধরো।' তিনজন তিন প্রান্তে। সেই সময়কার ল্যান্ডফোন। একপ্রান্তে রত্নার বাবা, আরেকপ্রান্তে রত্নার মা এবং আরেক ফোনে রত্না নিজে। তখন স্বপ্না বর্ণনা করল, স্টিকি মানে কাঠি বেগমের বিভৎস রূপের বিবরণ। তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার ঘটনা। যদিও তাকে নিয়ে তো নয়, সম্পূর্ণটুকু রত্নাকে নিয়ে। কিন্তু শুনে রত্না হতবিহ্বল। ভাবলো কি করবে? কোথায় যাবে? কার কাছে সাহায্য চাইবে? তার সুপারভাইজার যে ভাইবা -বোর্ডের অভ্যন্তরে এখন । সেখানে যেতেও পারছে না। কলেজের অধ্যক্ষ ভালো লোক নন । তিনি কাঠি বেগমের স্বভাবের এবং কাঠিবেগমের দলের লোক। তার কাছে বলার কোন মানে নেই। সমস্যা আরো জটিল হবে। তখন রত্না ছুটে গেল খুবই স্বনামধন্য কলেজের শিক্ষক প্রফেসর এল-এম এর কাছে। জানালো কলেজের ক্যাম্পাস জুড়ে কাঠি বেগমের কোপ। কাঠির কোপ। দায়ের কোপ নয় কাঠির কোপ। কারণ হিসেবে শ্বশুর বাড়ি থেকে তার ষড়যন্ত্রে পারদর্শী ধুরন্ধর শ্বশুরের হাতের ফাঁক গলিয়ে রত্না যে প্রাণটুকু নিয়ে ফেরত আসতে পেরেছে তাতে শ্বশুর মনে করে রত্নার কাছে তার হার হয়েছে। সুতরাং কাঠি ম্যাডামের সাথে বিশেষ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করে রত্নার শ্বশুর এ ধরণের একটা কাজ কাঠি বেগমকে দিয়ে করিয়েছে। কিন্তু কাঠি বেগম তো ছোট খুকি নয়। তার কি কোন বোধবোধ শক্তি কাজ করেনি? কলেজের এক ছাত্রীর বাবা-মা ও তার চোদ্দ গুষ্টি তুলে কলেজের ক্যাম্পাসে তারস্বরে চিৎকার করা যে তাকে মানায় না, সে কি তা বুঝেনি? সবকিছুর বর্ণনা শুনে প্রফেসর এল-এম শুধু এই বলেছিলেন, 'কাঠির স্বভাব রাস্তার কুকুরের চেয়ে অন্যরকম নয়।' কলেজের অন্যান্য কলিগরাও তাকে কুটিল মহিলা হিসেবেই পরিগণিত করে। তার মুখের ভাব, আর ভাষা যেন বলে দেয় রত্নার শ্বশুরবাড়ির চালচিত্র। স্যার প্রশ্ন করলেন রত্নাকে, 'কুকুরের কাজ কুকুর করবেই। কিন্তু ক্লাসের অন্যান্যরা এই ঘটনা জানলো কিভাবে?' উত্তরে রত্না বলেছিল, কলেজের বেয়াড়া মেয়ে যাকে সবাই রেশমী চুরি বলে ডাকতো, সেই মেয়েটি রসিয়ে রসিয়ে কাঠি বেগমের সমস্ত কথা বাইরে এসে রসিয়ে রসিয়ে বয়ান করেছে ল্যাবের বাইরে এসে তৎক্ষণাৎ। প্রফেসর এল-এম আঁতকে উঠলেন শুধু ওই একটি নাম শুনে। রেশমী! তিনি উচ্চারণ করলেন নামটা অসম্ভব রকমের আতঙ্ক নিয়ে। অর্থাৎ রেশমীর বেয়াড়াপনা যে প্রফেসর পর্যন্ত গিয়েছে এটা আবার রত্নার জানা ছিল না। কিন্তু তার প্রতি শিক্ষকদের এই ইমপ্রেশান রেশমীর জন্য অবশ্যই সম্মানের নয়। আর ওই ল্যাবে তখন অনেক ছাত্রদের সাথে সেও কাজ করছিল বলেই সেদিন রেশমির পোয়াবারো হয়েছিল। সে সুযোগ বুঝেই ম্যাডামের আক্রমণ শেষ হলে রত্নাকে আরো বেকাদায় ফেলতে ল্যাবের বাইরে এসে রসালো করে গল্পটা শুরু করে দিয়েছিল। আসলে বেয়াড়ারা যদি অন্য কাউকে বেকায়দায় না ফেলে আর কেইবা ফেলবে? বেয়াড়া উপাধি পাওয়া অথবা অসভ্য মেয়ে হিসেবে কলেজে পরিচিতি পাওয়া তো চাট্টিখানি কথা নয় । কাজকর্মে, আচরণে সর্বোচ্চ উগ্র হতে পারলেই তাকে বেয়াড়া উপাধি দেওয়া যায় এবং রেশমি তাই-ই। তার উপর যদি থাকে ল্যাবের প্রফেসর কাঠির বেয়াড়াপনা তাহলে তো কথাই নেই। দুই অসভ্য মিলে ঘটনা কতদূর এগিয়ে নিতে পারবে, কতটুকু রসালো করতে পারবে তা চিন্তা করো। আমাকে সেইফ রাখার চিন্তা থেকেই স্বপ্না বুদ্ধি করে জেনে নিয়েছিল কাঠির পরের দিনের স্কেডিউল। যেহেতু সেদিন রত্নার ভাইভা - ভোসি এক্সামের তারিখ। স্বপ্না জিজ্ঞাসা করেছিল, 'ম্যাডাম কি আসবেন পরের দিন?'
উত্তরে তিনি বলেছিলেন,সেদিন তো তার কোন ছাত্রের পরীক্ষা নেই, তাই তিনি আসবেন না।
বাঁচোয়া।
এদিকে প্রফেসর এল-এম ভাইভা বোর্ডে সকলকে জানিয়ে দিলেন, যদি কাঠি বেগম হুট করে বোর্ডের ভেতর প্রবেশ করে রত্নাকে আক্রমণ করার চেষ্টা করে, তাকে যেন সতর্কতার সাথে প্রতিহত করা হয়। রত্নার বাবা, মা সেদিন বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন সর্বক্ষণ। ক্লাশের সহপাঠী সকল ছেলে মেয়েরা রত্নাকে মনে হয় সারা জীবনের সকল সহমর্মিতা উজাড় করে দিয়েছিল।বেয়াড়া মেয়েটা কেন জানি রত্নার ধার পাশ দিয়ে সেদিন ঘেঁষে নি।
৪
আজ ৩০ বছর পর রত্নার মনে পড়ে যায় সেসব কথা। রত্নার শ্বশুর তার জীবদ্দশায় উদ্ধত প্রকৃতির কাঠি বেগমের সাথে মিলে মিশে রত্নাকে,তার বাবা মা - কে কিভাবে তার কলেজ চত্বরে অপদস্ত, অপমান করেছে সে সব কথা। কাঠি বেগমের প্রাণের সখা রত্নার শ্বশুর গত হয়েছেন কিছুদিন হলো। কাঠির স্বামীও বিগত। কিন্তু কাঠি বেগম খুব ধারস। খুব ভালো আছে। চিৎকার চেঁচামিচি করার মত তাকত্ সে এখনো রাখে। কলেজে তার ডাক পড়লে লাফ দিয়ে চলে যায় । বিভাগের অনুষ্ঠান, সেমিনার, ভাইবা - ভোসি কোন কিছুই বাদ দেয় না । তার জন্য এটেন্ড করা কোন বিষয়ই না। সর্বক্ষন ও সর্বত্রই -সে।
আকাশে, বাতাসে, মাটিতে চারিদিকে। কোথায় সে নেই? শুধু পাহাড়ে নেই। বাংলাদেশ তো আর পাহাড়ি অঞ্চল না। পাহাড়ি অঞ্চল হলে পাহাড়েও থাকতো। দিগ্বিদিক কাঁপিয়ে এসে জানান দিত - আমি আছি, আমি থাকবো অপদস্ত করার জন্য, অপমান করার জন্য। না জেনে, না শুনে অপবাদ দেবার জন্য, আমি থাকব অনন্ত কাল এ ধরায়, এ ভূমিতে, এ কলেজের চত্বরে।রত্নাকে ঘাড়ে ধরে হেনস্তা করব ।তারপর বিকৃত হাসি হেসে প্রাণের সখা রত্নার শ্বশুর মহাশয়ের সাথে উল্লাসে মত্ত হব। তারপর আমাদের বিকৃতি, ঔদ্ধত্য আমাদেরকে অসম্ভব রকমের এক আনন্দ দেবে। এক চিবানোর আনন্দ। পৈশাচিক তৃপ্তি আর অসুস্থ মানসিকতাকে বহন করাই হবে আমাদের সারা জীবনের পরিণতি।
...............
গল্প লেখার শুরু ০৩/১২/২০২৫
গল্প লেখার শেষ ১৩/০৪/২০২৬
আরো গল্প -
স্টিকি ওরফে কাঠি বেগম
অম্বা যখন ননাস
বাবা ছেলের এক রা
আঁচিল
No comments:
Post a Comment