স্টিকি ওরফে কাঠি বেগম

 

জীবনে চলার পথে অভিজ্ঞতার ঝুলি যখন  উপচে উঠে, বা বলা যায় অনেকটা ভরে উঠে, তখন অভিজ্ঞতাগুলোকে একটু সরিয়ে সরিয়ে দেখতে ইচ্ছে করে।

তার মধ্যে তিক্ত অভিজ্ঞতা যেমন অনেক থাকে, মধুর স্মৃতিও  অনেক থাকে। আজ  রুমার মনে পড়লো তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এক  মহিলার কথা । তিনি খুব স্টিকি ফিগার ছিল। লম্বা এবং খুব চিকন।  বর্ডার অঞ্চলের মানুষেরা যেমন চাইনিজদের মতন হয় দেখতে, তার  পিতা অনেকটা  সেরকম ছিল।   সে সূত্রে কাঠি বেগমের  মধ্যেও একটু চাইনিজ চাইনিজ ভাব এসে গিয়েছিল।

রুমার তখন ঊনিশ কি বিশ বছর বয়স। মাত্র ফার্স্ট ইয়ার ফাইনাল ।  ভাইভা বোর্ডে, ঢুকে সেই অল্প  বয়সে অত বাঘা বাঘা প্রফেসরদেরকে দেখে সকলের অবস্থা হতো থরহরি কম্প। যদিও বোর্ডের বাইরে বা ভিতরের পরিবেশ কলেজ প্রশাসন সবসময় ভাল রাখায় সচেষ্ট থাকতন।  রুমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাই সকল শিক্ষকদেরকে রুমা খুব ভাল পেয়েছে। সকলের  ব্যবহার খুব ভাল ছিল। সে কারণে গত এক বছর কলেজে থাকার পর ইয়ার ফাইনালের ভাইভা এক্সামের সময়ে,  রুমা কখনোই মনে করে নি যে,  এবার তাকে কেউ  বধ করবে।

রুমার ডাক আসার আগেই, যখন এক্সাম হচ্ছে অন্যান্য স্টুডেন্টদের, এক্সাম রুমের দরজাএকটু খোলা ছিল বলে রুমা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল কিভাবে এক্সামটা হয়।  জীবনে প্রথম এই ইয়ার –ফাইনাল   ভাইভা  এক্সাম । রুমা উঁকি দিয়ে দেখলো অনেকে ওখানে আছেন। প্রায় ছয় জন তো হবেই। সকলেই প্রফেসর র‍্যাংকের। ইনাদের সাথে ক্লাস পায় নি কখনো। কেমন কে জানে ? সদ্য  ফার্স্ট ইয়ারে  এসে সবাইকে তো ভাল মতো  চেনা যায়  না। মিস স্টিকির ক্লাস ও কখনো করেনি। চেনার তো প্রশ্নই উঠে না।  

কিন্তু রুমাকে  দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হন্ত দন্ত হয়ে সে বের হয়ে এলো। কিছু বুঝে উঠার আগেই অতর্কিতে যেন  রুমার  উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো।  চোখের বদলে  দাঁত কট্মট  করে,  চিবিয়ে চিবিয়ে কি যেন বলতে শুরু করলো? কি মারাত্মক এক্সপ্রেশান তার চোখে মুখে। খেয়ে ফেলতে চাইছে। অনর্গল  বলতে থাকলো, ‘এখানে কি? এখানে কি? এখানে কি  তোমার?’

স্টিকির খিঁচড়ানো শব্দগুলো কানে  এলো যখন রুমা অনেক লম্বা এই তালগাছ মার্কা মহিলার দিকে ঘাড় উঁচু করে তাকালো। সে বলে  যাচ্ছে, এখানে কি, এখানে কি তোমার? তালগাছের ঐ চূড়ায় তার চাইনিজ মার্কা চেহারাটা  দেখে আর তার মুখ থেকে প্রক্ষিপ্ত শব্দগুলোর তোড়ে  ঠিক কম্পিত বক্ষে নয় বরং অবাক চক্ষে তার দিকে তাকালো। তারপর  বললো, ‘এক্সাম হচ্ছে তো। আমি এক্সাম দেখছি।‘

উত্তর শুনেই কাঠি বেগম জ্বলে উঠলো যেন। দাঁত কড়মড়  শুরু করে দিল। হাঁপাতে শুরু করলো। রুমাকে আবার বলা শুরু করলো,’এখানে তো তোমাদের থাকার কথা না। এখানে কেন?’

বাহ্‌।

কি যে মুশকিল।

এখানে থাকবে না তো কোথায় থাকবে? পরীক্ষা তো এখানেই হচ্ছে। রুমা কি বিল্ডিং এর বাইরে খোলা আকাশে দাঁড়িয়ে থাকবো। আর ভাইভা বোর্ড থেকে চিৎকার করে মাইকে রুমার নাম উচ্চারণ করলে রুমা তা শুনে পড়ি কি মরি করে রুমের  পানে দৌড় দেব?

আলাদা কোন খালি ক্লাস রুমও দেয়া হয় নাই, যেখানে রুমাদের অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে। একজন একজন করে সেখানে থেকে ডেকে নেয়া হবে ভাইভা কক্ষে তেমন কোন ব্যবস্থাও তো নেই। আর সেই দিনে রোল নম্বর অনুযায়ী রুমাদেরই পরীক্ষা সূচি নির্ধারিত।

তারপর আবার চিবানি।

রুমা  বেশ অবাক!   হঠাত কোন টিচারের কাছ থেকে এরকম আক্রমণাত্মক ভাব সে  আশা করে নাই। কারণ কোন টিচারদের   মাঝে এরকমের আচরণ এর আগে রুমা দেখে নি। কলেজে এসবের চর্চা যে  হয় তাও না। কেউ কখনো অপদস্তমূলক ব্যবহার ছাত্রদের সাথে আজ অব্দি করে নি। এ যেন অন্যরকম একটা ব্যাপার এই মহিলার।  তেড়ে মেরে ডান্ডা মারতে আসছে কাঠি বেগম।   কি মহিলারে বাবা। খুব অবাক হলো  রুমা।

ভাবলো, কে ইনি? একে তো চিনেই না রুমা । 

সেদিন কেইংঠা বেগমের মুখের ধারে  রুমার অবস্থা  তখন থরহরি কম্প। ভয়ে? না। ভয় না পেয়েছিল   যত, থ্‌ হয়েছিল বেশী। কারণ  এরকম আক্রমণাত্মক ভাব ভংগী আর কারো মাঝে তো সে দেখেনি। আর বস্তি অ্যাটাচিউড, বস্তি কালচার কেনই বা তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সে আশা করবে? সে জন্য তো মাঠের পাশ, রাস্তার ধার ধরে বস্তি আছেই। খিস্তি খেউড়ি যদি শুনতে  ইচ্ছে হতো তাহলে কলেজে পড়তে আসা কেন?

কাঠি বেগম তখন ও কোন ব্যাচেরই অনার্স ক্লাস নিত না । রুমাদের ব্যাচও তাকে অন্য কোন প্রশাসনিক কাজে পায়নি।   তাকে ডিপার্ট্মেন্টে  দেখেছে শুধু  একজন সাধারণ টিচার হিসাবে। অনেকেই তো শিক্ষক হিসাবে  ছিল  রুমাদের বিভাগে। শিক্ষকদের সংখ্যা এত বেশী ছিল যে, অনেক শিক্ষকরা অনার্স পড়ানোর মত সিনিয়ারিটি পেতে পেতে অবসরে চলে যেতেন । তবুও অনার্স কোর্স পড়ানোর টার্ন  তাদের আসতো না।  চেয়ারম্যান হওয়া তো দূরের কথা। হয় ল্যাবের শিক্ষক  বা সাবসিডিয়ারির কোর্স নেয়া বা অন্যান্য অ্যাকাডেমিক কাজ করা –এসব দায়িত্ব ভারে  তাদের জীবনটা কেটে যেত। বাঘা বাঘা কেউটে গোছের যেগুলো ছিল, আর উপরের মহলে  লাইন রাখতে পারতো  তারাই সামনে আসতো। যোগ্যতা বলতে ছিল ধরাধরি। সর্বত্র  ভয়ংকর পলিটিক্সের ছোবল। তবে বিদেশ থেকে পিএইচ ডি থাকলে তাদের আলাদা কদর দেয়া হতো। অনার্সের একটা আধটা কোর্স নেয়ার সুযোগ পেলে তারা পেয়েও যেত।

অনেক সংখ্যক টিচার ইনটেকের  কারণও ছিল । দর্শন বিভাগ সবচেয়ে পুরনো ডিপার্ট্মেন্ট। কলেজে বিশাল পরিসরে তার কার্যক্রম বিস্তৃত  সেই প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে।  স্টিকি যদিও পি এইচ ডি নাই। কিন্তু লিঙ্ক করে জীবনে একবার  অনার্সের হাফ কোর্স নেবার সোভাগ্য সে অর্জন করেছিল। অর্জন নয় বলা চলে সৌভাগ্য বাগিয়ে নিয়েছিল। এ জন্য যার পর নাই কাঠ খড় সে পুড়িয়েছে।

 

একবার মিডটার্ম পরীক্ষার দিন রুমা খেয়াল করলো এক্সাম হলে রুমার ঘাড়ের পাশে দাঁড়িয়ে রুমার দিকে  ঠাঁয় তাকিয়ে আছে কাঠি বেগম। রুমাকে দেখছে। এমন ভাবে দেখছে  যেন পাত্রী দেখছে। তখন অবশ্য রুমা একটু সিনিয়র ক্লাশেই পড়ে। ঘটনাটা তাই অনেক পরের দিকে । তবে  রুমার জন্য  টুকটাক বিয়ের প্রস্তাব আসতে শুরু করেছে। কিন্তু ফার্স্ট ইয়ার থেকে সেই অব্দি রুমা তাকে  একটা শাড়িতেই দেখেছে। উপর মহলে লাইন করে দ্বিতীয় বর্ষের হাফ কোর্স পড়ানো ম্যানেজ করে ফেললো একবার।  তখন রুমাদের ভাগ্যে পড়েছিল স্টিকি বেগম।

ভদ্রমহিলা খুব লম্বা ছিল  বলে তার সাইজের পেটিকোট  হয়তোবা বাজারে পাওয়া যেত না। আর তখন থেকেই তো মিস স্টিকির শাড়ি সমাচার শুরু। খাটো পেটিকোট তার নাইলনের শাড়ির মাঝ দিয়ে পায়ের কাছে প্রকট হয়ে উঠতো।

ক্লাসে যখন সকল ছাত্রদের সামনে কাঠি বেগম দাঁড়াতো, তখন কি কারণে কে জানে , রুমার চোখ যেয়ে পড়তো স্টিকির পায়ের কাছে। পায়ের শাড়ির দিকে। তারপর দৃষ্টিটা শাড়ীর মধ্য দিয়ে উঠে যেত  পা থেকে  হাঁটুর দিকে। কি যে বিশ্রী লাগতো রুমার তখন নিজেকে নিজের কাছে।

এমন কেন হয়? মহিলাকে দেখলে চোখ শুধু ওভাবে তাকে দেখে কেন?  নিজের চোখ খারাপ?

 নাকি মহিলা বদ ভাবে সামনে এসে হাজির হয়?

সে অভিজ্ঞদের একদিন জিজ্ঞেস করেই বসলো –  কি কারণে কাঠি বেগম সব মনোযোগ কেড়ে নেয় তার পায়ের  দিকে?

কি আকর্ষণ সেখানে?

এক কথায় অভিজ্ঞরা বললেন, ‘হয়তো  তার পেটিকোট খাটো। সেজন্য তোমাদের মনোযোগ যেয়ে ওখানে পড়ে।‘ তারপর আরোও জিজ্ঞাসা করলেন, ‘পাতলা শাড়ী পড়ে নাকি?’  

রুমা বললো, ‘তেমন পাতলা না। তবে  নাইলনের।‘

- ‘তাহলে তো ভারী পেটিকোট লাগবেই।‘ ফের উত্তর। 

টিচার হিসাবে যখন স্টুডেন্টদের সামনে কেউ লেকচার দেবার জন্য ক্লাসে এসে সবার সামনে দাঁড়ায় , তখন  তাদের ড্রেস –আপ একটা বিশাল ভূমিকা পালন করে। ড্রেস –আপ যে একটা বিরাট ব্যাপার, স্টিকির খাটো পেটিকোটের কান্ড না দেখলে রুমা বোধহয় এ বিষয়ে এত সচেতন হতো না। যার যা রুচি।অন্যান্য মেয়েরা তার যাবার পথে তাকিয়ে তাকিয়ে তাকে দেখে বলতো, ‘কোন কালচার নাই, মহিলাটার।‘

 রুমার এ ভাবনা  তখনো মাথায় আসেনি। সহপাঠীদের মন্তব্য শুনে সে সেদিন আরো বেশী সচকিত হয়েছিল।

তাইতো!

সারা বছর  সেই একটা শাড়িই  পরে। মহিলা মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা। বা নিম্ন মধ্যবিত্ত হতে পারে। তার বাবা স্বনামধন্য কলেজের প্রিন্সিপাল ছিল বলে দাবী করতো সবসময়য়। সব ছেলেমেয়েদের শিক্ষিত করেছেন সেই বাবা। রিটায়ার করে ঢাকায় থাকে ছোট ছেলের বাসায়। পয়সা কড়ি তেমন বানাতে পারেননি  বলে নিজের কোন থাকার বাসস্থান নেই । শেষ বয়সে স্ত্রীকেও অন্য ঘরে আলাদা রেখে তিনি কোণার ঘরে ময়লা কাপড় চোপড় পরেই দিন কাটাত। তাদের পূর্ব পুরুষের কথা রুমা জানে না তেমন। তবে কাঠি বেগমের  ব্যকগ্রাইউন্ড এতটুকুই তার জানার মধ্যে ছিল। 

 তার ওপর অবহেলিত এই পেশায় শিক্ষকদের বেতন  বরাবরই কম থাকে ।  সেজন্য  মিস স্টিকির এই ফকিরি হাল কি তাহলে পয়সার অভাবে হয়েছিল?

নাকি আসাবধানতা বশতঃ?

সংসারের চাপে কি আনমনা? আনমনা তো সে নয়। চোখ তার চারদিকে নজর রাখে। মুখ সাপের হিস্‌ হিস্‌ ।  বোধবুদ্ধি নাই, তা তো বলা যায় না। 

বিকৃত রুচির প্রভাব নাতো?   

কলেজের  একনামে চেনা, উপর মহলের সাথে  লাইন থাকা অসভ্য এই মহিলাকে নিয়ে রুমার সবসময় একটু খট্‌কা লাগতো। আর ছেলেমেয়েরা তো বলতোই, মহিলার কোন কালচার নাই।

তার  আরেকটা বৈশিষ্ট্য ছিল, যা নিয়ে তার কলিগরা  পরবর্তীতে  খুব বলাবলি করতো।  ভাইভা –ভোসি এক্সামের সময় যদি  সে  সেই ভাইভা বোর্ডের মেম্বার নাও হয়, তারপরও সে ভাইভা চলাকালীন  সটাং করে  বোর্ডে  ঢুকে পড়তো। ঠাঁয় বসে থাকতো। পোদ্দারি কতটুকু করতো তা নিয়ে তার কলিগদের মন্তব্য যদিও রুমা শুনতে পায়নি, তবে রুমা পরবর্তীতে বুঝেছে যে,  ভাইভা বোর্ডে  সে ঢুকে  পড়তো তার পেয়ারের স্টুডেন্টদের জন্য।  তাদেরকে সুযোগ সুবিধা দেওয়ার জন্য। বা স্টুডেন্ট কে একটু আরাম বোধ করানোর জন্য। যাকে ইংরেজীতে বলে একটু ‘ইজ ফিল’ করানো।  মানে সেখানে উপস্থিত থেকে ছাত্রকে  মানসিক ভাবে নিশ্চিন্ত করে  মনে মনে বুঝিয়ে দেয়া, ‘ মার্কস নিয়ে  চিন্তা করো  না বাবা। আমি আছি। পাশ শুধু করাবো না, তদবির করে কলেজের চাকরিও জুটিয়ে দেব, যদি আমার তল্পি বহন করো।। ছাত্র রা তাই-ই করতো। টুক টাক  সুযোগ সুবিধা তো না, ক্যারিয়ার পর্যন্ত গড়ে দেবার আশ্বাস ! এ কি কম কথা?

রুমা এটা যদিও অনেক পরে বুঝেছে। কিন্তু অবশেষে  তো বুঝেছে?

মিস স্টিকি কেন তাদের ব্যাচের সব ভাইভা বোর্ডে  উপস্থিত থেকে খুব সরব থাকতো কার জন্য?

তার পেয়ারের ছাত্র কে ছিল?

রুমা খেয়াল করেছে, ওর ব্যাচে আরেকখানা পিস্‌ আছে স্টিকির  মতন।  স্বভাবে  চেহারায় সবদিক দিয়ে । শুধু  লম্বায় একটু কম।  সবাই তাকে ‘ভবিষ্যতের স্টিকি’  বলেও সম্বোধন করে। স্বভাবে তাদের মিল মনে হয় সকলেরই  চোখেই পড়তো। সেই ছাত্রীটাই ছিল কাঠি বেগমের  পেয়ারা স্টুডেন্ট ।   সেই প্রথম বর্ষের প্রথম দিন থেকেই স্টিকির চেষ্টা তার পেয়ারা সেই কাঠিটাকে ক্লাসে প্রথম বানাবে। যেমন করেই হোক সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়াবে। আগে থেকে প্রশ্ন বলে দিয়ে , নাহলে এটা করে, নাহলে সেটা করে তাকে তার সুযোগ করে দিতে চাই-ই চাই। কাঠিকে সর্বোচ্চ নম্বর যদি পাইয়ে দিতে পারে তাহলে আর পায় কে। তাকে কলেজের শিক্ষকতার সুযোগটাও পরবর্তীতে দেয়া যাবে। এত সম্মানীয় এই কাজে একবার যোগদান করতে পারলে আর তো কিছু চাইবার থাকে না ।   আজীবনের জন্য একটা নিশ্চিন্ত জীবন। । একদম কবরে যাওয়া অব্দি।কলেজের  চাকরি মানেই সবচেয়ে নিরাপদ জীবন । তাই তারা ঠিক করেছিল সে বছর,    শিক্ষক সমিতিকে  দিয়ে কলেজ প্রশাসনকে সুপারিশ করিয়ে জীবনের শেষ পরিণতিকেও নিরাপদ করতে।  কলেজ থেকে  কবরের জন্য জমি। লাইব্রেরী সম্প্রসারণের জন্য যেটুকু জায়গা রাখা আছে তার থেকে না হয় কিছুটা নিয়ে বা আস্তে আস্তে পুরোটা নিয়ে একবার কব্জা করতে পারলে তাদের পরকালও নিশ্চিন্ত। 

 ডিগ্রী নাই, পাব্লিকেশান নাই বলে প্রমোশন আটকে আছে বহুবছর।  বড় বড় কর্তাদের সাথে লুটোপুটি করে অনেক কে ডিঙ্গিয়ে সে তার কাজ হাসিল করছিল রুমাদের সেকেন্ড ইয়ারে । অনেক করিৎকর্মা  মহিলাবটে। লজ্জা সম্ভ্রম বাদ দিয়ে তার  খাটো পেটিকোট প্রয়োজনে সে গায়ে জড়াবে বা প্রয়োজনে সে খুলে ফেলে দেবে কিন্তু কাজ উদ্ধার হলেই তো হলো।   এসব করতে করতে শেষের দিকে  বড় প্রমোশনও বাগিয়ে নিল। ছাত্রী হস্টেলের প্রভোস্টও হলো। কিন্তু ক্লাসে তেজ দেখালেও হস্টেলে তো ছাত্রীদের কাছে পাত্তা পায় না। তাকে সাইজ করবার জন্য একদিন সবাই মিলে ১৮ ঘন্টা তালা দিয়ে হলের ভেতর তাকে আটকে রেখেছিল।

কি গরম (কাল) তখন।

সব রুমে কি এ.সি. থাকে?

কত কষ্ট না সেদিন হয়েছে। পড়ে তার হোমরা চোমড়া বন্ধুরা, পুলিশ এনে তাকে ছাড়িয়ে নিয়েছে।

উপর মহলে তার উঠা বসার কথা সবার মুখে মুখে। তার অত্যাচারের মাত্রা সমগ্র কলেজকে  অতিষ্ঠ, করে ছাড়লো । ডিপার্ট্মেন্টের  চোর নয়, তস্কর নয়, দস্যুরানী হয়ে উঠেছিল সে ক্রমান্বয়ে। 

পরীক্ষা হলে এসে ছাত্রদের পেন্সিল বক্স খুলে, প্রবেশ পত্র মেলে ধরে নকল আছে কিনা চেক করতো। জামা কাপড় সে খুলে ফেলতে বলতো না এই বেশী।  ভাবখানা এমন ছিল যেন সে মহান দায়িত্ব পালন করে কলেজকে সে ধন্য করে ফেলছে। স্টুডেন্ট দের চেক করতে গিয়ে পরীক্ষা হলে কাঁদিয়ে ছাড়তো। কিন্তু পরীক্ষা হলে সবার আগে তার চিৎকারই শোনা যেত। আর বাকী শিক্ষকরা তার কাছে বিল্লু। তার কর্মকান্ড নিয়ে  তার দীর্ঘদিনের সহকর্মীরা তাকে নিয়ে এভাবে বলতে দ্বিধা বোধ করতো না, ‘রাস্তার কুকুর আছে না? কুকুর? ও তার থেকেও অধ্ম।’

কিন্তু কলেজের শুরুর দিকে সেই  ফার্স্ট ইয়ার ফাইনালের ভাইভা পরীক্ষার দিনের  আক্রমণ তো ভোলার মত নয়। কাঠি বেগমের দাঁত খিঁচড়ে কথা বলা আর  হল- ওয়ে থেকে পারলে রুমাকে ঘাড়টা ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় এমন অবস্থায় রুমা ভয় না যত পেয়েছে , অবাক হয়েছে তার থেকেও বেশী। এই কলেজের এত সুনাম। টিচার- রা শ্রদ্ধার পরম আসনে উপবিষ্ট। 

সেখানে এই ডাইনী টা? 

কে ছিলরে বাবা!

তাই আজ এত বছর হয়ে গেল, রুমা এই মহিলার  আক্রমণাত্মক ভংগীটা এখনো ভুলতে পারে না। সেই ভাইভা –ভোসি এক্সামে  এ ধরণের আক্রমণাত্মক আচরণের কথা  ভাবতেই পিছনে ফিরে যায় রুমা।।

ইংরেজী শব্দ খুব সুন্দর করে উচ্চারণ করতো। ইংরেজীতে vacation শব্দটিকে ভ্যেকেই---শান , ভ্যেকেই---শান করে একদিন রুমাকে ডেকে শুরু করলো তার প্রলাপ।

-কোথায়  সবাই?

-খেলা দেখতে গিয়েছে?

-ক্লাস করবে না?

আমি কিভাবে বলবো? আমি কি জানি তারা কি করবে। রুমা ভাবলো মনে মনে। তারপর বললো,  

-খেলা শেষ হলে চলে আসবে।

সাথে সাথে প্রলাপ শুরু করলো, ‘তোমরা যদি সেলফ্‌ ভ্যেকেই---শান এ যেতে চাও.., ভ্যেকেই---শান  নিতে চাও..........’।

ওরে বাবা!

কি ইংরেজী রে বাবা!

ভ্যেকেই---শান!

কোন দেশে  যেন উচ্চশিক্ষার জন্য গিয়েছিল। পি .এইচ. ডি. না হলেও কিছু একটা  তো করেছে। বিদেশে ঘোরাঘুরি করাও তো একটা কোয়ালিফিকেশান। তাই ইংরেজী শব্দগুলো বেশ কট্‌কট্‌ করে, ইংরেজদের মত করে চিবিয়ে চিবিয়ে উচ্চারণ করার চেষ্টা করত। ইংরেজরা যদিও শব্দ উচ্চারণ করার সময় তা পিসলে পিসলে বলে, কিন্তু সে চিবিয়ে চিবিয়ে বলতো। যেন শব্দগুলোকে পিষে পিষে সে তার সামনে যে আছে তাকে তার দাঁতের চিপায় ফেলে পিষে ফেলতে চাইছে।

রুমা যেহেতু কখনো বিদেশ দেখে নাই, সে তো ইংরেজী উচ্চারণ এভাবে  আগে কখনো শুনে নাই।  ইন্টারনেটের প্রযুক্তিও তো তখন ছিল না যে,   বিদেশীদের কথাবার্তা   শুনে বিদেশ সম্বন্ধে কিছু জ্ঞান গম্ম্যি  অর্জন করবে।   

তাহলে  কি করবে সে ?  কেউ পিষতে চাইলে পিষ্টই তো হবে!

 ৭

৩৬ বছর পেরিয়ে গেছে। আজ এত দিন পর সেই কথাগুলো রুমার মনে পড়লো। আর মনে যখন পড়েছে তখন ভাবলো ভুলো মন কবে সব ভুলে যাবে কে জানে । আজ না হয় ডায়েরির পাতায় লিখে রেখে  কথাগুলোকে কোথাও  জমা  রেখে দিক। তার কথা। সেই লম্বা, চাইনিজ চেহারার  কাঠি মহিলার কথা।  পরনে  হাঁটু  অব্দি উঠানো ফিকে নাইলনের শাড়ি, রোদ বৃষ্টি ঝড় সব আবহাওয়ায় পরা যায়। একবার দেখেছে পরনে  ফিনফিনে  সূতির শাড়ী। সেটাও হাঁটু অব্দি। ভেতরে  খাটো পেটিকোট।  

কাঠি বেগম কলেজের গেইট দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ঢুকছে। মনে মনে মতলব আঁটছে আজ কাকে  ছিঁড়ে খাওয়া যায় । তারস্বরে কাঁপাবে তার গলা। সারা কলেজ কাঁপবে। দিগ্বিদিক প্রকম্পিত করে সে তার উপস্থিতি প্রমাণ করবে। তারপর সে শান্ত হবে।

.............

লেখার শুরু ১৭/০৯/২০২৫

লেখার সমাপ্তি  ০৩/০৪/২০২৬

আরো গল্প -

কাঠির কোপ

অম্বা যখন ননাস

বাবা ছেলের এক রা

আঁচিল

No comments:

Post a Comment

ব্লগে আমার ১৮ বছর পূর্তি

এমনি একদিন  ২০০৭ । অনলাইন   একটি ই- ম্যাগাজিন সম্পাদনার কাজ করি। অবনী অনার্য  পাকা লেখক। তার থেকে লেখা নিয়ে আমার ই- ম্যাগাজিন সমৃদ্ধ। যার  হ...