সেদিন ছিল খুব সকালে ক্লাস। ঘন কুয়াশায় সারা কার্জন হল মোড়ানো। কোন এক অজ্ঞাত কারণে ছেলেমেয়েরা কেউই আসেনি সেদিন ক্লাসে। আমি হঠাত করেই পুরো বিল্ডিং – এ একদম একা হয়ে পড়লাম। হলের টানা বারান্দার সেই সামনের এগুনো চত্বরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। দৃষ্টি দূরে বহুদূরে। চারিদিকে কুয়াশায় ঢাকা ভীষণ এক নীরবতায় সময় যেন ঠাঁয় থেমে আছে। হঠাতই মনে হল সাদা কুয়াশা ভেদ মেরুন সোয়েটার পরে বহুদূরের ঐ গেইট দিয়ে কে যেন একজন এগিয়ে আসছেন। এতক্ষণ পর সারা কার্জন হল চত্বরে কোন একজনের দেখা পাওয়া। চেনা যাচ্ছে না, স্পষ্ট দেখাও যাচ্ছে না। তবে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হলেন তিনি। এবার সত্যিই অবাক হবার পালা। সেই চিরচেনা ভঙ্গী। দুহাত পকেটে ভরে কি যেন ভাবছেন আপন মনে নীচের দিকে তাকিয়ে। আমাদের সেই প্রিয় মানুষটি। ব্যক্তিত্ব, সৌন্দর্য আর স্মার্টনেসে যিনি কার্জন হলের সকলের হৃদয় হরণকারী। কিন্তু এখনই বা কেন, এখানেই বা কেন? এই দীর্ঘ পথ ধরে তার ধীর পদক্ষেপে হেঁটে আসা উপভোগ করলাম অনেকক্ষণ ধরে। মানস সুন্দর! খুব কাছাকাছি যখন এলেন বারান্দা থেকে নিজেকে আড়াল করে সরে এলাম। সংকোচ বোধ। পাছে তিনি দেখে ফেলেন।
কুয়াশা কেটে গেল একঘন্টার মাঝে। এরইমধ্যে ছেলেমেয়েরা এসেছে সবাই। জানতে চাইলাম কেন কেউ আসেনি ক্লাসে আজ সকালে, এমনকি স্যারও। তারা একযোগে বলে উঠলো, ‘তুমি জানতে না আজকের ক্লাস যে হবে না।’ আমিই একমাত্র বান্দা যে কিনা জানতাম না। জানলে হয়তো বা সেই সাত সকালে আসতাম না। আর ওনাকে দেখতেও পেতাম না এত কাব্যিক রূপে।
বন্ধুরা বললো, আজ আর পড়ালেখায় তাদের মন নেই। কেউ ক্লাস করবে না, শুধু ঘুরে বেড়াবে।
-‘কেন?’ আমার আবার প্রশ্ন।
ওরা এবার আমায় পালটা প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করলো। বললো, ‘তুমি জান না আজ যে ভ্যালেন্টাইন্স ডে?’
এবার আমি বাকরুদ্ধ। আজ সকালে আমার কৃষ্ণদর্শন তাহলে কি ছিল আমার জন্য ভ্যালেন্টাইন্স ডে'র সারপ্রাইজ? আমার অজান্তে পাওয়া ভ্যালেন্টাইন্স ডে’র শ্রেষ্ঠ উপহার?!
কার্জন হল, ঢাকা
১৯৯৪