কাব্যের ঘোর

অনাম্নী স্বাক্ষর  

বয়সটা তখন নিতান্তই ছোট। পা ছড়িয়ে কান্না জুড়লে আকাশ তাকে ছুঁতেই হবে। ওইযে মাঠের শেষে আকাশ নেমে আসে, দিগন্ত যায় ছুঁয়ে, ওইখানেতেই আকাশ ছোঁয়া যায়। সারাবাড়ীতে উঠলো ভীষণ সোরগোল। কেউ মুখ বাঁকায়, কেউ বা করে করুণা। তবে একটা ব্যাপারেসব্বাই একমত দাদুর আদরে  বাঁদর হয়েছেমেয়েটা। ছোট্ট পায়ে আকাশমুখো হয়ে এক পা এক পা করে পৌঁছে গেলি তুই যৌবনবেলায়। ফেলেআসা কিশোরীবেলা তখনও ডাকে দুপুরের নির্জন ক্ষণে। বৃন্দার জ্বোরো–কপালে হাতখানি  রেখে কতগুলো দুপুর পার করেছিলি?  দূরন্ত কাশির দমকে রক্ত উঠে গড়িয়ে পড়েছিল তোরহাতে। সেই রক্তের মধ্যে কিলবিল করা জীবাণুগুলো তোকে ভয় পেয়েছিল। কিছুতেই ভাঙ্গতেপারেনি তোর ফুসফুসের দুয়ার। শুধু প্রসারিত করেছিল হৃদয়ের অলিন্দখানি। আজও একটুএকটু করে চলেছে সেই প্রসারণ।

সপ্তদশী তখননায়িকার ঘোরে। চলতে ফিরতে মুখ দেখে নেওয়া মুকুরে। শরৎ কিম্বা রবির নায়িকাদের সঙ্গেমিল খুঁজে হয়রান। আর তারই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নায়কের আসা যাওয়া। কেউ বা গোরারআর্ধেক শারিরীক, কেউ বা শচীশের আর্ধেক মানসিক। পুরোপুরি হয় না কেউ। তবু তারই মাঝেআধাআধি মন দেওয়া – নেওয়া খেলা। কখনো মৌনবটের নীচে স্তব্ধ দুপুর নিরালায়।কখনও শ্যাওলার দুখঘেরা একলা পুকুরঘাটে। নির্জন কাকচক্ষু জলে নিজেরই মুখখানি দেখেভালবেসে ফেলা। আকাশের ডানামেলা গভীর ছায়ায় খেয়ালী পানকৌড়ির অকারণ ডুব। অথচ নায়কেরবৃথা মান অভিমান। প্রতিসৃত সাত রঙে রামধনু মন নিয়ে নিজেকেই ভালবাসা, ওরা শুধুআয়নার স্বচ্ছতা  নিয়ে অপেক্ষায় থাকে।সত্যিটা ঢাকা পড়ে মিথ্যের ফাঁদে। প্রেম ঘুরে মরে মদনের শরে। তবু আমূল বিধঁলো নাকোন শর তোর প্রাণে। ডুব দিলি তুই প্রেমসায়রে তবু মৃত্যু হলো না তোর। নিভৃত প্রাণমরণ কামনায় জারিত করে আপনাকে। আশ্লেষে স্পর্শ করার অঙ্গীকার নিয়ে ডুব দেয় অবুঝউদাসীনতায়। ও মেয়ে তোর বেলা যে পড়ে এলো জলকে চল। 

পরিযায়ীপাখি উড়ে যায় সময়ের ফেরে। সপ্তদশ কখন যে বিশের কোঠা পেরিয়ে যায়, যেতে যেতে দেখেযায় তোর মুখখানি। তখনও সারা মাঠ জুড়ে সবুজের সমারোহ। মহুয়া মাতাল মন খুঁজে ফেরেআপনাকে। রোদ্দুর শরীর ছায়া ছায়া মন, একটু সবুজ অলিন্দের খোঁজ। কস্তুরিমৃগ তুইপাগলপারা হে। 

মনের মানুষ খুঁজতে গেলিঅচিনপুরে তবু তার নাগাল পেলি নে। 

সময়টা তখনঅসময়ের গন্ডি পেরিয়ে যাবার পণ করে বসেছে, হঠাৎ দেখা হয়ে গেল সুজনের সঙ্গে। সু টাযদি হয় সুন্দর তবে জন অর্থে মানুষ। মানে পুরোটা জুড়ে একটা সুন্দর মানুষ। তবে ওই যেদেখার কথা বললুম ওইখানে আছে কিছু গোড়ায় গলদ। সুজন যে অশরীরী, তাকে কি শরীরে ধরাযায়? মন দিয়ে ছোঁয়া যায়। প্রেমজুরি তার ঝলকে উঠে মনের আবেগে। মারবি যখন মরবি তখন,তবু মরার কথা জানবি না। অথচ মেয়েটা সেইখানেই মরল। চোখের আলোয় দেখা হলো না শুধুশুনে শুনেই মরণ হলো চোখের বাহিরে।

প্রেম কিদেয়, বিনিময়ে কি বা চায়? সমস্ত প্রাত্যহিকতার বাইরে সে নিয়ে যেতে চায় বটে কিন্তুদামও সে কিছু ধরে। ব্যক্তিস্বরূপের পরীক্ষা হয় সেখানে।  সুজনের আয়নায় নিজেরই চিন–পরিচয়। নির্মেদ প্রেমে রাতভেজা শিশিরের স্পর্শ নিয়ে প্রেমের সংজ্ঞা ফাঁদলিমেয়ে। তবু তুই ঘ্রাণ নিলি নে শরীরে অবুঝ যন্ত্রণার। অস্ফুট চুম্বন স্ফুরণ পেল নাকোনদিন। অথচ ন হন্যতে তখনও আঁচড় কাটে ঠোঁটের কিনারায়। আলিঙ্গনের আকাঙ্ক্ষাপৃষ্ঠাবদ্ধ হয়ে যায় জীবনের পাতায়।

প্রকৃতির হাটেবাটে অনেকগুলো বসন্ত পার হয়ে আসে মেয়েটা।জীবনের পাতাগুলো ক্রমশ হলুদ। সেদিন রাতে আকাশ মেতেছে প্রলাপে। বর্ষার ঘনঘোর রাতকুহকে জাগিয়ে রাখে তোকে।  সহসা শরীর  মন্থন করে উঠে আসে অদম্য ইচ্ছা। একবার যাচাইকরে নিতে চায় নিজেকে। সুজনের প্রেমজুরিতে ঝঙ্কার ওঠে নিভৃতে।  থৈথৈ আকাঙ্ক্ষার ঘূর্ণিতে নিঃশব্দ বিগব্যাং ঘটেযায়। ক্রমশঃ প্রসারিত হতে থাকে ব্রহ্মান্ডের মতো। দূর থেকে আরো দূরে অশরীরী মন্থনে। ভেসে যায় যত সু যত কুআর সমাজের কঠিন বন্ধন। রাতের গভীরে নামে অঝোর বৃষ্টি। ভিজে যায় জীবন যৌবন অকারণ।গোপন প্রেম রাতের অন্ধকারে ঝাড়লন্ঠন জ্বালিয়ে দেয়। অশরীরী প্রেম তবু ছুঁয়ে যায়শরীরের কানায় কানায়। প্রেমের অলখদুয়ার খুলে কাব্য ওঠে ঝলকে। প্রেমজুরি বেয়ে উঠেআসে নতুন জগৎ, কাব্যের জগৎ।  

একসিন্ধুশরীরী আকাঙ্ক্ষা নিয়ে অকাল সন্ধিক্ষণ বিষ উদ্‌গিরণে বিহবল তবু মন্থনে অচঞ্চল। অবুঝপ্রেমের দারুণ দাহে বল্গাবিহীন তৃষ্ণা জ্বালায় পোড়ায় তবু সবুজাভ অব্যয়। অশ্রুরবৃষ্টিকাহিনী আঁচড় কাটে, ফোঁটা ফোঁটা হৃদয়ের গ্রন্থন তবু উদাসী অকারণ কাব্যের ঘোর।

মেয়ে তুই কাব্য করিস? চোদ্দটা আকাঙ্ক্ষাজুড়ে লাইন সাজাস। এরে তুই কাব্য বলিস? ছি ! হেতু দিয়ে জীবনখানা মাপ। অহেতুক কথাসাজিয়ে ধোঁয়াশা  লাগাস প্রাণে। লিখবি যদিখাড়া লাইনে লেখ। সমাজের সমস্যাটা বোঝ, তারপরেতে লেখ না কেন যত ইচ্ছে তোর। 

কাব্যের মোহ ভেঙে ভেঙেযায়। জীবনের সহজপাঠের পাতাখানি আবার উল্টে দেখা। কবি তো কেউ চায় না, সবাই যেনসমাজসংস্কারক! মিথ্যে হৃদয়, মিথ্যে হৃদয়ের আকাঙ্ক্ষা। অথচ আমার হৃদয় তোমার হৃদয়দিয়েই তো সমাজের হৃদয়খানি গড়া। 

ধুত্তোরিতোর নিকুচি করেছে আকাঙ্ক্ষায়। অ – হেতুবাদী হৃদয়মার্কা মতবাদখানা আস্তাকুঁড়েফেল রে মেয়ে। একটু বাস্তববাদী হ। নিজের ভেতর থেকে বেরিয়ে পৃথিবীটাকে দুচোখ মেলেদেখ্‌, কাব্যের জগতে বাজিমাৎ।

অমন অবুঝচোখে তাকাস কেন মেয়ে? আমিও বুঝি রে বিজ্ঞানের প্রথম সূত্রটা বাইরে থেকে আসেনি,এসেছে মানুষের ভেতরের জটিল আবর্তের উদ্‌ঘাটন থেকে। বাইরে থেকে কি কেউ যাত্রা করে? ভেতর থেকে যাত্রা করতে হয়। দেখিস নিজের ভেতরের জটিল আবর্তের জট খুলতে খুলতে আমরাএকদিন পৌঁছে যাব মানবতার দ্বারে। সেদিন তোকে ছেড়ে সমাজের অস্তিত্ব থাকবে না।সুজনের প্রেমজুরিতে কাব্য গেঁথে মেয়ে তুই পথে নামিস। গলা ছেড়ে তোর পেটেন্ট ছাড়িস ‘প্রেমজুরিতে প্রেম বাজেনা, প্রেমেতে বাজে প্রেমজুরি।’

Reincarnation Cycle - Hindu and Buddhist samsara models

🌀 1. The Whole Diagram → Samsara (Cycle of Existence) The circular, repeating structure directly corresponds to Samsara : Continuous cycle ...