আঁচিল

পূর্বকথা

যাত্রা পালার চল্ তো আজকাল উঠেই গেছে। আগের কালে যাত্রাপালাতে  কতকগুলো চরিত্র অবশ্যই থাকতো, যেমন রাজা , রাণী, উজির, রাজার চাটুকার, এবং বিবেক। চাটুকারের কাজ ছিল রাজার সামনে ভাঁড়ামি করা, সত্যকে মিথ্যা বানিয়ে রাজার মন সন্তুষ্ট রাখা, হাতে হাত ঘষে, মাথা নীচু করে জ্বী হুজুর, জ্বী হুজুর করা।   রপসজ্জাকার  বরাবরই চাটুকারের দৃশ্যায়নের ক্ষেত্রে অভিনেতার গালে এত্ত বড় একটা আঁচিল বসিয়ে দিত।

ভিক্ষুকের চরিত্র যেমন সজ্জিত থাকবে ছেঁড়া ময়লা পোশাকে, রাজার চরিত্র থাকবে ঝলমলে গলায় মালা, কোমরে তলোয়ার ঝুলানো, মাথায় মুকুট পরা পোশাক। বিবেক আসবে তার উদাত্ত কন্ঠের গান নিয়ে। তার  পোশাকটা হবে দেশের ঐ বুদ্ধি বেচা, থান কাপড় পরা লোকটার মতন। তাকে দেখলেই মনে হবে পার্থিব আকাঙ্ক্ষা জলাঞ্জলি দিয়ে পরকালের দিকেই তার নিজেকে নিজের নির্বাসন দেয়ার ভাব। চিতায় যেন এখনি ঝাঁপ দেবে। 

আর চাটুকার মঞ্চে তার আগমণ ঘটিয়ে  পরের দৃশ্যে কি করবে? তার গালের সেই বড় আঁচিলটা নিয়ে মাথা নুইয়ে রাজার সামনে উপবিষ্ট হবে।  হাতের সাথে হাত ঘষে ইনিয়ে বিনিয়ে হাসতে শুরু করবে।  যাত্রা  শেষে র্দশকরা  প্রস্থান গ্রহনকালে  কারো গালে আঁচিল দেখলে ঐ ভাঁড়ের কথাই মনে করবে। মুখে আঁচিল থাকা যেন  চাটুকারেরই বৈশিষ্ট্য। যাকে ইংরেজিতে বলে signature.


আজ কলেজে সুমনার প্রথম দিন।

ক্লাশে প্রবেশ করেছে সুমনা।       

সামনে তাকাতেই দেখে কেইংঠা একটি মেয়ে মুখে পুরানা আমলের এক টাকার সমান বড় একটা আঁচিল নিয়ে সামনের বেঞ্চে বসে আছে। আঁচিল দেখেই মনে পড়ে গেল যাত্রাপালার সেই চাটুকারদের কথা। এরও কি মিশন  সেই চাটুকারদের চরিত্রের মত। সারা জীবন শুধু পা চেটে যাবে বড় কর্তাদের? দেখে তো বেশ ভারিক্কী মনে হয়। ভাঁড় ভাঁড় লাগে না। আরেকটু খেয়াল করে দেখলো শুধু গালের পাশেই নয় আরেকটা আঁচিল আছে তার কপালের বাঁ পাশে। তাহলে তো মিশন তার আরো জটিল। তার কি তাহলে ডাবল্ চাটুকারী মিশন? দেখে তো ভাঁড় মনে হয় না মেয়েটিকে। বেশ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মনে হয়। ভেতরে ভেতরে লুজ থাকলেও তা তো আবার এদের ক্ষেত্রে ধরা পড়ে না।

সুমনা তাকে দেখে ভাবলো, চেহারায় কারোর হাত নেই। কিন্তু দেখতে তো কুৎসিত লাগছে। বিশ্রী এক অনুভূতি সৃষ্টি করছে। সে কি নিজেকে আয়নায় দেখে না? এই আঁচিলগুলো  পেলে পুষে কি করছে? অন্যদের কে একটা বিশ্রী বিনোদন দিচ্ছে? কেন?

কারণ বিশ্রী কিছু উপহার দিতেই তার ভাল লাগে। বা অন্যভাবে বলা যায় এর চেয়ে বেশী বুঝার ক্ষমতা তার নেই কিন্তু বুদ্ধু  তো না। সুমনা শুনেছে সে বেশ ভাল ছাত্রী । বেশ মেধাবী। মেয়েদের লিস্টে স্ট্যান্ড  করে নারী জাতির মুখ উজ্জ্বল করেছে। ছেলে মেয়ে মিলে বলার মতন না তাই মেয়েদের লিস্ট কথাটা সামনে আনে। চালাক বুদ্ধিও আছে। অবশ্য ভাল রেজাল্ট তো লুকিয়ে রাখারও জিনিস না। 

মেয়েটির ভাবখানা এমন যেন ষাটের দশকে বসে আছে। সে আমলের ছাত্রীদের মতো সুতি শাড়ি পরে আসে, যখন কিনা সেই নব্বই দশকে মেয়েদের  শাড়ি পরার চল নেই বললেই চলে। কোন ফরমাল অনুষ্ঠান হলে মেয়েরা শাড়ি পরে নাহলে না। কিন্তু প্রতিদিন শাড়ি ম্যনেজ করে পরে আসাটা বেশ পারদর্শীতার ব্যাপার।  তবে সে সময়ও কিছু পরিবার চাইতো বিয়ে শাদী হলে তাদের বউ শাড়ি পরুক। সেই থিওরি অনুসরণ করতে গেলে প্রশ্ন আসে মনে, মেয়েটি বিবাহিত নাকি? একে ওকে জিজ্ঞাসা করে সুমনা জানতে পারল মেয়েটি অবিবাহিত। তবে প্যান্ট শার্ট পরা তার একটা মেয়ে বন্ধু আছে। তারা খুব ঘনিষ্ঠ। বিদেশে এই কম্বিনেশানের বন্ধুত্ব দেখলে নির্ঘাৎ লেসবিয়ান তকমা লেগে যেত। দেশে তখনো সে দৃষ্টি চালু হয়নি। তাই তারা দুজনা আরো গভীর হবার সুযোগ পায় নি।  মানে পার্টনার হয়নি। 

বোধহয় জাস্ট বান্ধবী ছিল। বোধহয় বলার কারণ, সুমনা ক্লাশে আসতেই খেয়াল করলো বাঙ্গালী জাতির এভারেজ হাইটের সব ছেলে বাদ দিয়ে ভীষণ লম্বা আরেকখনা কাঠি মার্কা  প্যান্ট শার্ট পরা মেয়ে নয় -  প্যান্ট শার্ট পরা এক ছেলেকে এবার বন্ধু বানিয়ে ফেলেছে। কিভাবে কিভাবে জানি দুজনের মাঝে একটা বোঝাপড়াও হয়ে গেছে। কিন্তু   কাঠি বাবু নামের ছেলেটিকে  ধরার পরও সুমনার কেন জানি মনে হতো কেংঠি বেগম ঠিক যেন পুরোপুরি মেয়ে নয়। হাত ভর্তি বড় বড় লোম দেখে  মনে হতো তার সমতল বুকেও বুঝি ওরকম বড় বড় লোম আছে।  কেইংঠির আগা পাছারও তো তফাৎ করা যেত না। তাই বোধহয় শাড়িকে সে বেছে নিয়েছিল পোশাক হিসাবে।  শাড়ি পরে জানান দিত কোনটা তার পাছা। কোনটা তার পাছা না। এদিকে  কাঠি বাবু  নামের  ছেলেটি কি তার রোমশ বুক পছন্দ করে বসে আছে ? নাকি  এক টাকার সমান বড় বড় আঁচিল দুটোকে ভালবেসে ফেলেছে? এই জিনিস তো এই দুনিয়াতে  আর কারো নেই। তারপর ইদানিং আবার আঁচিল ফুঁড়ে ঘাস গজিয়েছে।  এতেই কি  এই ছেলের বিকৃত ভাল লাগা?

কুৎসিত কদাকার কিছু দেখার মত অস্বস্তিকর অনুভূতি যেন আর না হয়, তাই সুমনা ক্লাশে ঢুকেই মাথা নীচু করবে, নাকি চোখ বন্ধ করে ফেলবে ,বুঝে পেত না। তবে মাসখানেক পরেই সুসংবাদ এলো যে, কেইংঠি সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার  আঁচিল দুটো থেকে সে পরিত্রাণ গ্রহন করবে। আফটার অল্ মহামান্য মিস্টার কাঠি বাবু এসেছে  তার বিশ বছর পার হওয়া এ জীবনে। মহামান্যর পরিবারের সামনেও তো নিজেকে উপস্থাপন করার একটা ব্যাপার আছে। তাই না? 

অতঃপর তার ধরাবান্ধা তিনখানা চ্যালার মাধ্যমে, তার আঁচিল অপারেশানের জন্য দু’দিন সে ক্লাশ করতে পারবে না বলে একটা খবর চারিদিকে ছড়িয়ে দিল। চার নম্বর চ্যালা তখনো অফিশিয়ালি চ্যালার খাতায় নাম লেখায় নি, কিন্তু সুমনার সাথে কাইংঠির  খবর আনা নেওয়া করতো। তাদের মনের অবস্থা এমন দাঁড়ালো যেন  কেইংঠির অনুপস্থিতিতে ক্লাশের সবাই দু’দিনের জন্য  শোকদিবস পালন করবে।  কেংঠির আঁচিল -মুক্ত দিবস উপলক্ষে চ্যালাগুলো তাকে বাড়িতে দেখতে যাবে। স্যুপ, পায়েশ, আম, কলা , জাম নিয়ে অবশেষে দেখতেও গেল।  কেইংঠির  সদ্য অপারেশানের স্থানে ব্যন্ডেজ দেয়া হয়েছে । তার ভেতর দিয়েও এখনো ঘাস উঁকি দিচ্ছে, বলেই ভ্যাক করে আওয়াজ করে উঠলো সেই চার নম্বর চ্যালা। বুঝানোর চেষ্টা করলো তার বমনের উদ্রেক হচ্ছে ওসব কথা ভাবতে গিয়ে।

এদিকে জীবনের দু’দশক পার হয়ে কেইংঠির সাথে পরিচিত হতে পেরে মহামান্য মিস্টার কাঠি বাবুর জীবনও একরকম ধন্য হবার পথে।  তাদের পরিচয় কোন দিকে যাচ্ছে কে জানে? তবে এক সপ্তাহের মাথায় কাঠি বাবুর বড় বোন  কেইংঠিকে   একখানা শাড়ী, প্রীতি উপহার স্বরূপ পাঠিয়েছে। কারণ উপহার , সম্পর্ককে সুসম্পর্কে রূপান্তর করে। আবার পরের বছর কেইংঠি ক্লাশের ১৫ টি মেয়েকে ৩০০ টাকা দামের একটি করে বেগুনী থান শাড়ি উপহার দিয়েছে।  এছাড়া প্রতি বছর সকলের জন্মদিনের তারিখ মনে রেখে সবাইকে জন্মদিনের শুভেচ্ছাও জানায় নিয়মিত। এ সকল উপহার সুমনার ভাগেও পড়ে। উপহার হাতে নিয়ে হা করে  দাঁড়িয়ে থেকে সুমনা ভাবে,এখন কি করবে? খুশী হবে নাকি হবে না?

কেইংঠির এমন উদার আচরণে কি করা উচিত সুমনা আসলে ভেবে পায় না। পরের সপ্তাহে পহেলা বৈশাখে মেয়েদের নামকরণ করে ক্লাশের দরজায় টাঙ্গিয়ে রেখেছিল ছেলেরা। নামকরণে অন্য কলেজের  মতন অশ্লীলতা কখনই হয়না এই কলেজে। তবুও   কেইংঠি যখন লিডার, সে তো পড়তেই দেবে না কাউকে। এক টানে ছিঁড়ে ফেললো কাগজটা।  কারণ মজাটা সে একাই লুটবে আর খ্যাক খ্যাক করে হাসবে।  সাথে কাঠি বাবু আর চ্যালা চামুন্ডরা থাকতে পারে। কিন্তু কাগজটা সেই-ই হাত করে ফেললো এক ঝটকায়। পান্ডা গিরি তার ইনহেরিটেড নেচার নাকি তার  পুরুষ ভাবের প্রতিফলন, সুমনা ঠিক বুঝে উঠতে পারেনা। তবে শুনেছে তার বাবা ছিল মস্ত বড় বিজ্ঞানী। আর মা এক মস্ত বড় দার্শনিক। তাদের মিলনে-জাত এই জিনিস তো ফেলনা হবার কথা না। জাতির গর্বই হবে সে একদিন নিশ্চিত।

  ৩

কাঠি ছেলেটিকে LGBQT –র দলে ফেলানো যায় না। কাঠি তারপর ও কি পারবে এই ব্যাটা মার্কা মেয়েটির সাথে চালিয়ে নিতে? এখন তো না হয় আঁচিলগুলো উধাও হয়েছে। তাই ঐ মুখের দিকে তাকানো যায়। কিন্তু তারপর? আর কি করে তারা? সুমনার একদিন সুযোগ এলো জানবার ।  কাঠি বাবু তার লম্বা ঘাড়টা উঁচা করে মুখটা হাঁ করে সবাইকে পর্যবেক্ষণ করে, খুব মৃদু স্বরে সকলকে নিয়ে, কেইংঠির সাথে ঠাট্টা করছিল। দুজনই একসাথে  বাজে মন্তব্য করে  চলছে সকলকে নিয়ে অনবরত।  এই –ই তাহলে তাদের  প্রেমালাপ। বাহ্ ! কোথায় নিজেরা নিজেদের নিয়ে মগ্ন থাকবে তা না, তারা সমাজ নিয়ে ব্যস্ত। মানুষকে হেয় করে নিজেকে  এক নম্বর মনে করে আত্মতৃপ্ত হতে ব্যস্ত । তা তৃপ্তি পেলে  মন্দ কি! সুমনা তো প্রম করে নি কখনো, অত সব জানবে কি ভাবে, কিসে তৃপ্তি মেলে?

কেইংঠির সাথে  যদিও ছেলেটি আঠার মত লেগে থাকে কিন্তু, ক্লাশের অন্য ছেলেদের সাথেও তো বাতচিৎ করে। মানে  কিছু ছেলে আছে না, প্রেম করলে প্রেমিকা ছাড়া আর কিছুই বুঝে না, ঐ মেয়েরে পিছন পিছন ঘুরে, তবে এই ছাগলটি তেমন নয়। মানে  মাইগ্যা না। তবে সে এই কয়েক মাসেই  এখন কেইংঠির বান্ধা ছাগলে পরিণত হয়েছে। ঘাড় লম্বা বলে ক্লাশের শেষ বেঞ্চে বসে পুরো ক্লাশের রিঅ্যাকশান দেখে সে একদিন তো বেশ অবাক।  সে খেয়াল করেছে,  ক্লাশের সকল ছাত্ররা কেইংঠির আচরণে যখন পিছন থেকে  হো হো করে উঠে,  কাঠি বাবু তার হা মুখ নিয়ে  (অবাক হয়ে) সকলের দিকে  তাকায়। ভাবে ব্যাপারটা কি হচ্ছে? তার পূজনীয় কেইংঠির আকর্ষণীয় মোহনীয় সাপের মতন কুটিল চরিত্র কি এই ছেলেগুলো পছন্দ করছে না? কাঠি বাবু  তো গাধা নয়। বুঝে সবই। কিন্তু উত্তর খুঁজে পায় না। যদিও সবার মতামত নিয়ে সে মেয়েটিকে পছন্দ করতে বসেনি। তার সাথে কাঁপে কাঁপে মিলেছে বলেই তো এত কাছে চলে এসেছে তারা।  কিন্তু তারপরও, খটকা লাগে তার। প্রশ্ন জাগে মনে। সবাই তার মনের মানবীকে  এতো অপছন্দ  করে কেন? 

প্রশ্ন জাগা  ভাল । এতে যদি কাঠি বাবুর হা করা ভাবটা একটু কমে! তবে কলেজের শেষের দিকে ৭ বছর অতিক্রান্ত হবার পরও  কেইংঠির ব্যাটা ভাবখানা নিয়ে  কাঠি বাবুর  আক্কলের উদয় হয়নি। সুমনা শুধুই ভাবতো কাঠি –কেইংঠির  বাসর রাতে বউ যদি একটা ব্যাটা মার্কা ঘুরান দেয় তাহলেই তো স্বামীর কাজ সারা!

কিন্তু সুমনা এসব কেন ভাবে ? বেশী ভাবনা ও তো ভাল না। 

তবে খুব পাতলা মল্মল্  কাপড়ের ব্লাউজ পরে সবার সামনে ব্রা দেখাতে বেশ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতো কেইংঠি।   

কেন? 

সবাই বলাবলি করতো কেইংঠির বুক, পিঠ সমান তো, তাই  তাকে যে  প্রমান করতে হবে তারও  বুকের পাটা আছে। 

কিন্তু পাতলা  ব্লাউজ ভাইভা এক্সামের  দিনে কেন?

কারণ ভাইভা পরীক্ষার সেট আপ এমন ছিল যে,  কিছু লেখার জন্য বোর্ডের দিকে ঘুরে   দাঁড়ালে  স্যারদের সামনে  তার পুরো পিঠ  প্রতীয়মান হবে।  সে সুযোগে  পাতলা ব্লাউজ ভেদ করে ব্রা-এর স্ট্র্যাপটা সকলকে দেখাতে পারবে। এই বিকৃত প্রদর্শনিতে তার কামবাসনা পূর্ণ হবে। আনন্দিত হবে এই ভেবে যে  তার নারীত্বকে সে  উপস্থাপন করতে পেরেছে। 

কিন্তু ভাইভা বোর্ড কি এই কাজটা করার জায়গা?

হ্যা। এটাই যথার্থ জায়গা বলে সে মনে করে। বিকৃতি যে এদের ভাল লাগে। এই উপস্থাপনেই যে কেইংঠির  সার্থকতা। অর্থাৎ কাহাকে, কখন, কি দেখাতে হবে ,কোথায়  দেখাতে হবে,  কিভাবে দেখাতে হবে সব বুদ্ধি  সে  রাখে।  

অন্য  মেয়েদের নেই সেই বুদ্ধি? নেই বোধহয়। তবে ভারী বুকের মেয়েদের এই ইচ্ছাটা ভারী হওয়া উচিত ছিল । কিন্তু নাহ্।  তদের কেন জানি ইচ্ছাটা হয়ই না। ক্লাশের অন্য মেয়েরা বেশ রেখে ঢেকেই চলতো। শুধু কেইংঠি একটু অন্যরকম আধুনিক। যত ইচ্ছা শুধু কেইংঠির মনেই একা জমা হয়ে আছে। 

 ৪

এদিকে কেইংঠির চার নম্বর চ্যলা গেছে মা বোন সহ ব্যাংককে বাজার করতে। স্বামী পরিত্যক্তা তার মা সর্বদাই এখান সেখান থেকে বাজার সদাই করে দেশে এনে একটু লাভ রেখে বিক্রি করে। এ থেকে কিছু আয় রোজগার হয়। এছাড়া বিদেশে গেলে খদ্দের পাওয়ার চ্যানেলও  তৈরী হয়।  খদ্দের পটাতে ভীষণ ওস্তাদ তিনি। খদ্দেররাও তার উপর সন্তুষ্ট। বিশেষ করে হাফ বয়সের খদ্দেরদের ভীড় তো লেগেই থাকে তার বাড়ীতে। তার আনমনা ভাবের মাঝে হঠাৎ আঁচল খসে পড়াটা, ইয়ং ছেলেরা কেন জানি বেশী লাইক করে।

মায়ের মতো তার কন্যারাও এ গুণে পারদর্শী  হয়েছে নিশ্চয়ই। কিন্তু সুমনা তা কিভাবে জানবে? সুমনা তো তার মায়ের খদ্দের না। বা মেয়ে –লোক  কেনা বেচার দালালও না। সে যে ভিন্ন এক জগত। তবে আজ বিদেশ থেকে আনা সদাই-এর মধ্য থেকে  মসলিনের একটা ওড়না, প্যাকেটে মুড়িয়ে এনেছে চ্যালা নম্বর চার,  তার গুরুর জন্য। নরম কাগজের মোড়ক ব্যাগ থেকে বের করে মুখটা কাঁচুমাচুর ভংগী করে  কেইংঠিকে সে বললো, ‘তোমার জন্য আমার একটি সামান্য উপহার।‘ ক্লাশের সবার কাছে সে তাদের বাজার সদাই বিক্রি করেছে। কিন্তু তার গুরু র জন্য  আলাদা করে সে রেখে দিয়েছে এই দামী মসলিনের উপহার। এটা সে কাউকে বিক্রি করেনি।  খুব যত্নের সাথে আজ তা অর্পণ করবে কেইংঠিকে। 

অন্য ভাবে বললে বলা যায়, আজ সেই দিন, যেদিন সে কেইংঠিকে উপহার প্রদানের তাকত্ অর্জন করেছে । এ অর্জন যেন তার চ্যালাত্ব-কে  আরো এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল।  তার এই বিশেষ অর্জনে সে মহিমান্বিত। সে তার আনুগত্যের পরীক্ষায় সফল হয়েছে। কাঠি বাবু যথাযথই  মুখটা হা করে ঘাড়টা উঁচু করে কেইংঠির  চ্যালার উপহার প্রদান দেখছিল। আর সুমনা দেখছিল কাঠি বাবুর  হা করে থাকা মুখটাকে ।  

সাপে সাপে কি মহা মিলন। 

কিন্তু এসবের  সাক্ষী কেন সুমনাকে হতে হবে?  প্রকৃতিই যেন  তার সামনে এনে এসব ঘটায়। সুমনা কারণ ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। 

কেইংঠি তার চ্যালার কাছ থেকে সদর্পে উপহারটা গ্রহন করলো। যদিও কাজটা একটু নীচু মার্গের হয়ে যায়। চ্যালার কাছ থেকে কিছু গ্রহন করা কি গুরুর মানায় ? চ্যালা নাম্বার চার সেদিন শুধু ষাষ্ঠাংগে প্রণাম করাটুকু বাকী রেখেছিল। কিন্তু  উপহার সমর্পণের মাধ্যমে নিজেকে সমর্পণ করে চেলী বেগম বিগলিত চিত্তে  তার গুরুর প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করে নিজেকে বিজিত প্রমাণ করেছিল। সেই মুহূর্ত থেকে সে কেইংঠির একজন  আজ্ঞাবহ  অনুসরী হিসাবে নিজেকে প্রমান করল। দাস  প্রথার  জামানা থাকলে অনুসরণকারী না বলে আজ্ঞাবাহী দাস বললেও মন্দ হতো না। কিন্তু সে যুগ তো এখন নেই। তবে পূর্বজন্মের  কানেকশান থেকে এই চ্যালাগুলো চ্যাল -চ্যালামি করছে কি না কে জানে?

কেইংঠি যেন সর্পোলোকের রাণী। আগের জন্মেও  ছিল, এখনো আছে। এ নিয়ে সুমনার কোন দ্বিধা নেই। তাই ঐ সাপ সাপ ভাব নিয়ে কাছে আসলেই সুমনার  তীব্র অস্বস্তি শুরু হয়। এক মিনিটও  টিকতে পারে না তার আশপাশে। অবশ্য শুধু কেইংঠি কেন, কোন সাপ জাতীয়, যাদুকরী, বিকৃত মানুষদের আশপাশে সুমনা টিকতে পারে না। চেলী নাম্বার চারের  শরীরের খসখসে, ছোপ ছোপ, চামড়া দেখেই তো সুমনার একদিন অজ্ঞান হবার মতন অবস্থা হয়েছিল।

সুদীর্ঘ পাঁচ বছর সহপাঠী থেকে আজ কেইংঠিকে মাথার মুকুট বানাতে পেরে নিজের কাছে নিজের বিজয় অনুভব করছে চেলী। সে যে অবশেষে তার পায়ের ধুলার যোগ্য  হয়েছে। পাঁচ বছর আগে,  আঁচিল কাটার সময়ে কোন এক অমোঘ আকর্ষণে চেলী তার বাড়ি ছুটে গিয়ে নিজেকে ধন্য মনে করেছিল । পরিশ্রম আর সাধনার বিনিময়ে কেইংঠির কাছে  তাকে সঁপে দিয়ে  আজ আরেকটি বিজয় কেতন উড়াতে সে সক্ষম হয়েছে। আরো কতজনার আঁচিল জন্মেছে এ কয়েক বছরে। বয়সের ভারে সর্বাংগে এই পরিবর্তন তো হতেই থাকে। কিন্তু সেগুলো দর্শনে কেইংঠির চেলী চ্যলারা তো ছুটে যায় নি। 

কেইংঠির শক্তি অসাধারণ। ব্যক্তিত্ব ভয়ঙ্কর। সে পারে সবাইকে তার অনুগত চ্যালা বানাতে। তার মৃদু স্বরে আড্ডার মাঝেও  সকলের হৈ চৈ থেমে যায়। বক্তারা তাদের কথা থামিয়ে মাথা নুইয়ে সশ্রদ্ধ ভরে তার দিকে মনোযোগ দেয়। তার সামনে মাথা নুইয়ে ফেলে।  কারণ সে ভীষণ ক্ষমতাধর এক অপ –ব্যক্তিত্ব। গল্পে পড়েছে ডাইনীদের শক্তি ভয়ংকর থাকে।   সে এক ভয়ংকর শক্তি । তার প্রতি মাথা নোয়ানো আপনা থেকেই মনের মাঝে জন্ম নেয়। সবাই মেনে যে কেইংঠি-ই শ্রেষ্ঠ। সে পারে সবাইকে মোহাচ্ছন্ন করতে। সবাই অজান্তে তার  চ্যলায় পরিণত হয়, অনুসারী হয়। শুধু সুমনা পারে না।  বাদ পড়ে যায়  দল থেকে।   ছিটকে পড়ে যায় চ্যালাদের পাল থেকে।

...............

 লেখা শুরু ০৩/০৪/২০২৬

লেখা শেষ ১১/০৪/২০২৬    

আরো গল্প -
স্টিকি ওরফে কাঠি বেগম 
ঘাড় ঘুরানি
আবদার মিয়ার চর দখল

No comments:

Post a Comment

ব্লগে আমার ১৮ বছর পূর্তি

এমনি একদিন  ২০০৭ । অনলাইন   একটি ই- ম্যাগাজিন সম্পাদনার কাজ করি। অবনী অনার্য  পাকা লেখক। তার থেকে লেখা নিয়ে আমার ই- ম্যাগাজিন সমৃদ্ধ। যার  হ...